অপরাজেয় – ৭

শেষ পর্ব

বিকেলবেলা গাড়ি করে ওরা চললো উৎসের বাড়ি। রোহিত শুধু বাড়িতে রইলো। ওর মনে ভয়টা উধাও হয়ে গেছে। বরং দিল্লি ফেরার জন্য তাগিদ অনুভব করছে। অজস্র কাজ পড়ে আছে, কিন্তু যাবার আগে বাবার জন্য একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। সোমালীর জন্য একটু অনুশোচনা ও মনের কোণে জমা হচ্ছে। ও মনেপ্রাণে চাইছে সোমালীর প্রেত অবস্থা থেকে মুক্তি।

উৎসদের বাড়ির সামনে এসে গাড়ী দাঁড়াল। ড্রাইভারকে সুজিত বললো ঘন্টা তিনেক পরে আমরা বেরোব। সময়টা রুদ্রনাথের কাছ থেকেই জেনে নিয়েছিলো। উনি বলেছিলেন কালভৈরবের পুজোর পর এমনিতেই সোমালীর আত্মা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। তাছাড়াও একটু আগেই আর এক পিশাচিনীর করুন অবস্থা দেখেছে। তাই ওই সময়ের মধ্যেই হয়ে যাবে।

তালা খুলে উৎস বাড়িতে ঢুকলো। মনে হলো বাড়িটা কেমন যেন জুবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ঢুকতেই একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ পেলো। বোধ হয় কাল থেকে সব বন্ধ হয়ে পড়ে আছে বলেই এমন গন্ধ ছাড়ছে। কিন্তু রুদ্রনাথ স্থির হয়ে দালানে দাঁড়িয়ে গেলেন। যেন অন্তর্দৃষ্টিতে কিছু দেখতে পাচ্ছেন।

বাইরে পড়ন্ত বিকাল। সেই জন্য বাড়ির মধ্যে আবছা অন্ধকার। আলোগুলো উৎস জ্বালিয়ে দিলো। সুলোচনা বললো, “আসুন, এই চেয়ারে বসুন।” রুদ্রনাথ কোনও জবাব না দিয়ে ওদের সিঁড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেটা একটা ভাঁজ খেয়ে সটান ছাদে উঠে গেছে। ওরাও রুদ্রনাথের দেখাদেখি সিঁড়ির দিকে তাকাতেই ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো।

অস্পষ্ট একটা মূর্তি সিঁড়ির বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে জমাটবাঁধা কালো ধোঁয়ার মেঘ। হঠাৎ রুদ্রনাথ উচ্চস্বরে মন্ত্র উচ্চারণ করলেন কালভৈরবের মন্ত্র। সঙ্গে সঙ্গে ছায়ামূর্তিটা খিলখিল করে হাসতে হাসতে অদৃশ্য হয়ে গেলো। অমানুষিক হাসির শব্দ দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনী হতে থাকে। তিনজনের মুখের চেহারা দেখে, রুদ্রনাথ শান্তকণ্ঠে বলেন, “ভয় পেওনা। জানবে তোমাদের শরীর রক্ষাকবচ বন্ধনে বাঁধা আছে। ও ক্ষতি করতে পারবে না। তবে তোমাদের ভীত হতে দেখলে ও অধিক শক্তি সঞ্চয় করে ফেলবে। সুলোচনার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কোনও ভয় নেই মা। আমি ওর সব প্রেতশক্তি নষ্ট করে দিয়ে তবে যাবো। ঠাকুর ঘরে চলো- কেননা বাড়িতে এখন ওটাই সুরক্ষিত স্থান তোমাদের বাড়ি এখনো বাঁধা হয়নি।” সুলোচনার শোবার ঘরের পাশেই এক চিলতে ঠাকুরঘর। সেখানেই একটা আসন পেতে দিল রুদ্রনাথের জন্য। কাঁধের ঝোলা থেকে একটা করোটি বার করলেন। মড়ার খুলির কপালে সিঁদুর লেপা। প্রথমে ওরা এটা দেখলো সুজিত সেনের বাড়িতে হয়তো ওদের অলক্ষ্যে বার করেছিল।

ছোট ঠাকুর ঘর। সেই জন্য ওরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। গত দুদিন ধরে রুদ্রনাথের ওপর দিয়ে অনেক পরিশ্রম যাচ্ছে, কিন্তু ওর মুখে সেসবের চিহ্ন নেই। শান্ত মুখের চেহারা। সেখানে কোনও উত্তেজনা বা ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই।

“আবার তোমাদের মনে করিয়ে দিই, যেহেতু বাড়িটা বন্ধন করা হয়নি, তাই সোমালীর প্রেত ঘরের মধ্যেও নানা রকম অলৌকিক কান্ড ঘটাতে পারে। তবে তোমাদের স্পর্শ করার ক্ষমতা ওর হবে না, অযথা ভীত হয়ে পড়বে না।” কথাগুলো ওদের মনে সাহস জোগালো। রুদ্রনাথ দু হাতে করোটি তুলে মাথায় ঠেকালেন। এরপর খুব নিচু স্বরে মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন। একটু পরেই সিঁড়ির উপর থেকে কিছু নড়াচড়ার শব্দ পাওয়া গেল। শব্দ শুনে উনি ঠাকুর ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। বাম হাতে ধরা মরার খুলিটা, আর ডান হাতের তালু দিয়ে ওটা ধরে সিঁড়ির দিকে তাকালেন। চোখের দৃষ্টিতে প্রতিজ্ঞার ছাপ। চোয়ালদুটো শক্ত। ওরা কিন্তু সিড়িতে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। রুদ্রনাথের লক্ষ্য সিঁড়ির পঞ্চম ধাপে। যেন কাউকে ওখানে দেখতে পাচ্ছেন! এবার ওরা পরিষ্কার শুনতে পেলো রুদ্রনাথের কথাগুলো।

“আর আমি বেশি সময় দেবো না। তোর মুক্তির পথ খুলে দিয়েছি। প্রেতযোনীতে তুই খুবই কষ্ট পাচ্ছিস। মুক্তির পথ ধরে চলে যা। তুই এই মুহূর্তে একজন মৃত মানুষ। জীবন্ত আত্মার সঙ্গে তোর আর কোন যোগ নেই। এটা সব সময় স্মরণ রাখবি। তোর এখন অন্য জগৎ। মাটির জগত থেকে তোকে মুক্তি দিলাম। সেখানে তুই পরজন্মের রাস্তা খুঁজে পাবি।” বার দুয়েক একই কথা বলার পর চুপ করলেন তিনি।

উৎস অনুভব করছে দালানের অংশটা ক্রমশ শীতল আকার ধারণ করছে। কেউ যেন অদৃশ্য হাতে ঠান্ডার বাতাবরণ সৃষ্টি করে চলেছে। গরম ভাবটা কখন যেন বদলে গেছে। তাহলে কি আবার কালবৈশাখীর সঙ্গে বৃষ্টি আসছে? কিন্তু খোলা জানলা দিয়ে সন্ধের পরিষ্কার আকাশ দেখা যাচ্ছে। নীল নীল দু-একটা তারা চোখে পড়ছে।

আচমকা সিঁড়ির ওপরের ধাপ থেকে এক ঝলক শীতল বাতাস নেমে এলো। দালানের চারপাশে ঘুরতে লাগলো ঘূর্ণিঝড়ের মতো। সিঁড়ির ধারে রাখা ফুলঝাড়টা হঠাৎ উড়ে এলো বাতাসের ঝটকায়। ওটা গিয়ে খোলা জানলার গরাদে আছড়ে পড়লো। তারপর নেমে এলো এক অসীম নীরবতা। ঘরের তাপমাত্রা পুনরায় আগের মতো গরম হয়ে উঠলো, রুদ্রনাথের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। শীতল বাতাস জানালার ফাঁক গলে বোধহয় উধাও হয়ে গেলো।

“নিশ্চিন্ত হওয়া গেলো।” সোমালীর অতৃপ্ত আত্মা মুক্তিলাভ করলো। এবার চলো বাড়িটা বেঁধে দিয়ে যাই, যাতে দুষ্ট আত্মা বাড়িতে প্রবেশ না করতে পারে।” উৎস টর্চ হাতে রুদ্রনাথের সাথে বাইরে গেলো। সেই অবসরে সুলোচনা রান্নাঘরে ঢুকলো। রুদ্রনাথ পন্ডিতের জন্য নিজের হাতে কিছু করে খাওয়াবে। ওঁর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধায় সুলোচনার মাথা নত হয়ে আসছে। শুধু মন্ত্র শক্তির দ্বারা যে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়, তা উনি করে দেখালেন। মনটা কয়েকদিন পর খুব প্রফুল্ল লাগছে।

রুদ্রনাথ ও সুজিত বাবুকে খাওয়ার কথা বলতে ওরা রাজি হলেন না। সুলোচনা হাতজোড় করে বললো, “এইটুকু সুযোগ অন্তত আমায় দিন, নাহলে, খুব দুঃখ পাবো।” উৎস ও অনুরোধ করলো। রুদ্রনাথ সম্মতি দিলেন,

“বেশ এটাই আমি গুরুদক্ষিণা হিসেবে গ্রহণ করবো।” উৎস ওদের নিজের ঘরে গিয়ে বসালো। তখনই সুজিত বাবুর ইচ্ছেটা শুনতে পেলো। রুদ্রনাথকে বললো,

“আমি আপনার আশ্রমে চলে যাবো, জীবনের বাকি দিনগুলো তারা মায়ের চরণে কাটাতে চাই। আপনি অমত করবেন না। রোহিতকে আমার মনের ইচ্ছে জানিয়েছি, ও রাজি হয়েছে।” রুদ্রনাথ হালকা হাসিতে বললেন, “ছেলের আবার বিয়ে দেবেটা কে?”

“আর ওই দায়িত্ব নেব না, ছেলে নিজেই তার ভবিষ্যত সঙ্গিনীকে বেছে নিক। ও এখন সাবালক। বাড়িটা প্রোমোটারের হাতে দিয়ে দেবো। কিছু অর্থ আমি আশ্রমে দান করতে চাই।”

“উত্তম প্রস্তাব।” সানন্দে রাজি হলেন রুদ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। সুলোচনা প্লেটে করে লুচি আর আলুর দম নিয়ে এসে ঢুকলো। পরম তৃপ্তিতে ওরা খেতে শুরু করলো। খেতে খেতে রুদ্রনাথ অনেক হাসির মজার কথা বলতে লাগলেন। যেন অতি সাদামাটা এক সাধারণ মানুষ। উৎস ও সুলোচনা অবাক চোখে রুদ্রনাথের সেই রূপ দেখতে থাকে। এখন ওনাকে দেখলে কেউ বলবে- একজন বিরাট সাধক? তার ভেতরের ঐশ্বরিক ক্ষমতা দিয়ে মানুষের চারপাশে কুশক্তিকে পরাস্ত করেন? শাস্ত্র ও তন্ত্র একযোগে যার মধ্যে বিদ্যমান।

বাড়ি থেকে বেরোবার আগে সুলোচনা ও উৎস পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন ওনাকে।

“বেঁচে থাকো। সুখ, শান্তিতে থাকো। যদি কোনদিন গৌহাটি যাও আমাদের আশ্রমে নিশ্চয়ই এসো।”

“কথা দিলাম, আমি ছেলেকে নিয়ে যাবো। আপনার এই উপকার কোনদিন ভুলতে পারব না। তার সঙ্গে সুজিত বাবুকেও জানাই ধন্যবাদ। ওনার সাহায্যেই আপনার মতো গুণী মানুষের সাথে পরিচয় হলো। গাড়িতে ওঠার আগে সুজিত উৎসের দিকে তাকিয়ে বললো।

“কালকেই উনি চলে যাবেন বলছেন। আমরা সেই মতো বিকেলের ট্রেনে ওনাকে চড়িয়ে দিতে হাওড়া স্টেশনে যাবো।” উৎস বলে উঠলো,

“আমিও স্টেশনে থাকবো।” সুজিত সেন খুশি হলো।

“তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে উৎস। এখান থেকে চলে যাবার আগে তোমার জন্য একটা ভালো চাকরির বন্দোবস্ত করে দিয়ে যাবো। সুজিত সেনের কথাটা শুনে মা ও ছেলে দুজনেই আনন্দিত হলো। গাড়ি স্টার্ট নিলো- এগিয়ে চললো রাস্তা ধরে সুজিত সেনের বাড়ির দিকে। ওদের দুজনের চোখজুড়ে রুদ্রনাথের সৌম্য মুখটা ভাসতে লাগলো।।

সমাপ্ত