প্ৰথম পৰ্ব
উত্তর কলকাতার এই মান্ধাতা আমলের বাড়িটার সামনে এসে মোটর বাইকের স্টার্ট বন্ধ করল উৎস। ঠিকানা অনুযায়ী এই ভাঙাচোরা, রংচটা দোতলা বাড়িটাতে পার্সেল পৌঁছে দিতে হবে কুরিয়ার বয় উৎসকে। গরমকালের দুপুরে নির্জন গলি। বাড়ির সামনে নীলরঙের সদর দরজা বন্ধ। কোনো কলিং বেল নেই। একটা কাঠের লেটার বক্স দরজায় সাঁটা, যেমন পুরোনো বাড়িগুলোতে থাকে।
বাইক থেকে নেমে কাঁধে কোম্পানির লোগো লাগানো ঢাউস ব্যাগটা থেকে পার্সেলটা বার করে সে। লেটার বক্সে রোদ জলে নাম ও ঠিকানা অর্ধেক উঠে গেছে। তবু মালিকের পদবী সেন কথাটা সে পড়তে পারল বাড়ির নম্বরটাও পড়া গেল। এইতো পার্সেল এর উপরে লেখা রয়েছে সুজিত সেন। ১২/২, মিত্র ঘোষ লেন, এই যথেষ্ট।
দরজায় লাগানো মরচে ধরা লোহার কড়াটা নাড়াবার আগেই পাল্লাটা খুলে গেল। তার মানে, কেউ আগে থেকেই ওকে লক্ষ্য করছিল। উৎসের চোখে যেন একটা ঘোর লেগে গেল। সে ভেবেছিল কোনো বয়স্ক বা বয়স্কা চোখে পাওয়ারের চশমা এঁটে বেরিয়ে আসবে। তার পরিবর্তে
রূপোলি পর্দা থেকে তার চোখের সামনে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল অসামান্যা এক সুন্দরী অল্পবয়স্কা বিবাহিতা মহিলা, পরনে তার উজ্জ্বল লাল রঙের শাড়ি। একরাশ কালো চুল পিঠ ছাড়িয়ে কোমরের দিকে নেমেছে। চাঁপা ফুলের মতো গায়ের রং। উৎসের ছাব্বিশ বছরের জীবনে এই রকম সুন্দরী নারী সে দেখেনি। মায়াবী দুটো কাজল টানা চোখে কত মধুর স্বপ্নের প্রতিশ্রুতি। ছোট্ট কপালে একটা বড় মানানসই কালচে টিপ। মাঝারি হাইট, স্লিম চেহারা। ও বিভোর হয়ে সেই সৌন্দর্য পান করতে লাগল।
মেয়েটির সুরেলা কন্ঠে ওর স্বপ্নভঙ্গ হলো। একটু লজ্জিত হয়ে বলল, “সুজিত সেনের নামে একটা পার্সেল আছে।”
“আমার হাজব্যান্ড। দিন আমি সই করে দিচ্ছি।” মেয়েটার বয়স কত হবে? তার থেকে ছোটই হবে! উৎসের কানে যেন জলতরঙ্গ বাজল, মন্ত্রমুগ্ধের মতো পার্সেলটা মেয়েটির হাতে দেবার সময় আঙ্গুলে আঙ্গুলে স্পর্শ লাগল। উৎসের শরীরে যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল। এক সুপ্ত যৌন উত্তেজনা ওকে গ্রাস করল, এক মিনিটের মতো স্থায়ী হলো। কেননা মেয়েটা হাতে পার্সেল নিয়ে মৃদু হেসে দরজার ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। উৎস এক মুহূর্তের মধ্যে দেখতে পেল মৃদু হাসির মধ্যে আমন্ত্রণের ডাক।
পরক্ষণেই নিজের মনকে সংযত করল সে, কোথায় চাঁদ আর কোথায় বাঁদর। বাইকে স্টার্ট দিল, ততক্ষণে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এগিয়ে চলল পরবর্তী ডেলিভারি দিতে, কিন্তু তার মন ও মস্তিষ্ক জুড়ে রয়েছে সুজিত সেনের পরমাসুন্দরী স্ত্রীর মুখটা।
মেয়েটার মধ্যে অজানা অচেনা আকর্ষণ আছে। উৎস মাথা থেকে সুন্দরীর ছবিটা মুছে ফেলে কাজে মন দিলো। পরপর ডেলিভারি করে যেতে লাগল। বিকেল হয়ে এসেছে, আর মাত্র একটা ডেলিভারি বাকি। পার্সেলটা চোখের সামনে তুলে ধরতে ও অবাক হয়ে গেল। পার্সেল এর উপর জ্বলজ্বল করছে সুজিত সেনের নামটা। এ কী করে সম্ভব? সে তো অনেক আগেই সুন্দরী মহিলার হাতে ডেলিভারি দিয়ে এসেছে। তাহলে এটা কোথা থেকে আসলো? কাগজের লিস্টটা বার করল। সুজিত সেনের প্রাপকের জায়গায় কারো কোনো সই নেই।
ওর মাথা কাজ করছে না। এইতো ঠিকানা- মিত্র ঘোষ লেন। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে, মেয়েটার মুখটা মনের গভীরে ভেসে উঠল। ও কি তাহলে স্বপ্নে ডেলিভারি করে দিয়ে এল? ও পার্সেলে লেখা ফোন নম্বরে ডায়াল করল।
এক ভদ্রলোকের গলা ভেসে এল। সুজিত সেন জানাল সে কোনো পার্সেল পায়নি। অগত্যা পুনরায় সে মিত্র ঘোষ লেনের দিকে বাইক ছোটাল। এই রহস্যের কিনারা করা তার একান্তই প্রয়োজন। এ যে একেবারে আশ্চর্যজনক ঘটনা। এরকম কি হতে পারে? তাছাড়া বাড়িটায় গেলে বিবাহিতা মহিলাটিকে আরেকবার দেখা যাবে। সন্ধ্যে হয়ে আসছে, ও দ্রুত বেগে ছুটে চলল সুজিত সেনের ঠিকানার দিকে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে ও সেই রংচটা নীল দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বাইকের স্টার্ট বন্ধ করে দরজায় কড়া নাড়ল। দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করে চলল। মনেপ্রাণে চাইছিল যেন তার স্বপ্নের সুন্দরী দরজা খুলে বেরোয়। কিন্তু ও হতাশ হলো। দরজা খুলে বেরিয়ে এল ষাটোর্ধ্ব এক বয়স্ক ব্যক্তি-
“আমার নাম সুজিত সেন।” ভাঙা গলায় বলল।
উৎস ভাবল একবার সকালের ঘটনা একে বলে। তারপর নিজেই চুপ করে গেল। কারণ ব্যাপারটা অবাস্তব হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া পার্সেল তার নিজের হাতেই রয়েছে। মেয়েটা বলেছিল, ওর স্বামী সুজিত সেন। এই বুড়ো লোকটা ওই সুন্দরীর স্বামী হয় কী করে? বয়সের এত তফাত?
রহস্য ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। সুজিত সেন সই করে পার্সেল নিয়ে ভেতরে চলে গেল। উৎস চেষ্টা করল দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরটা দেখার। নিরাশ হলো। ভেতরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। বাধ্য হয়ে বাইকে স্টার্ট দিল। এরকম আজগুবি ঘটনা সে কার কাছে বলবে? তবে কি তার স্মৃতিভ্রম হচ্ছে? হেলমেটের ভেতরে কপালে কয়েক ফোঁটা ঘাম জমে উঠেছে। কোম্পানির অফিসে ছুটল হিসেব বুঝিয়ে দেবার জন্যে। মাথাটা ভার ভার লাগছে। গরমটা ভালোই পড়েছে।
রাত্রে বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল। এবার চিন্তার সাগরে ডুব মারল। সকালের কথাটা চিন্তা করতে লাগল। ও যদি ডেলিভারি না করে থাকে- তাহলে ওই মেয়েটিকে দেখল কীভাবে? এমনকি তার আঙুলের স্পর্শ এখনো তার মন জুড়ে। কিছু একটা অজুহাতে ওই বাড়িতে সে একবার যাবে এবং সেটা কালকেই। এই রহস্যের জট যতক্ষণ না খুলছে সে শান্ত হতে পারবে না। ও এবার ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করল। ঘুমের মধ্যে মেয়েটাকে স্বপ্নে দেখল। যেন ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে জলখাবার খেয়ে কোম্পানিতে যাবার জন্য তৈরি হলো। মা সুলোচনা দেবী বললেন, “তোর কি রাতে ভাল ঘুম হয়নি?”
“কেন? হঠাৎ এই প্রশ্ন?” রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে উৎস বলল।
“চোখমুখ একটু বসা বসা লাগছে। কাজকম্মো ঠিক আছে তো?” সুলোচনা দেবীর উৎস কে নিয়ে বেশি চিন্তা করে। কেননা এই সংসারে ও একমাত্র উপার্জনশীল ছেলে। উৎসের বাবা বছর তিনেক আগে ক্যান্সারে মারা গেছে। সাধারণ গ্র্যাজুয়েট ছেলে অন্য কোথাও কাজ না পেয়ে কুরিয়ার কোম্পানিতে ঢুকেছে। মা, ছেলের সংসার। জমানো যা টাকাপয়সা ছিল ওর বাবার চিকিৎসায় সব শেষ হয়ে গেছে।
“তোমার মনের ভুল।” মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয় উৎস। তখনই উৎসের মনে কালকের ঘটনাটা প্রতিফলিত হয়। কপালে চিন্তার রেখা পড়ে। সুলোচনা দেবী কথা বাড়ালেন না।
উৎস জলখাবার খেলে দুপুরে টিফিনটা কাঁধের ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। সকালে সে ভাত খায় না। রাত্রে এসে খায়। ভাত খেলে কেমন জোলো জোলো লাগে।
“মা আমি বেরোচ্ছি।”
সুলোচনা দেবী বললেন, “সাবধানে যাস, আর বাইকটা একটু আস্তে চালাস। পাড়ার মন্টু বলছিল, তুই নাকি খুব জোরে ড্রাইভ করিস।”
“ডেলিভারির ওপর নির্ভর করে, তুমি ওসব ভেবো না মা। আমি দেখেশুনেই চালাই।” ব্যস্তভাবে বেরিয়ে পড়ল ও। কোম্পানি যেতে হয় বাসে, ওখান থেকে মোটর বাইক পাওয়া যায়। আবার ফেরার সময় জমা রেখে আসতে হয়।
বাসে উঠে চিন্তা করে সে, সুজিত সেনের বাড়ি যাবার কী অজুহাত করা যায়? ভদ্রলোককে আসল কথাটা বললে বোকার মতো শোনাবে। তাছাড়া ভদ্রলোক কোম্পানিকে জানালে ফল খারাপ হবে। কিন্তু তখনও সে জানত না একটা সুযোগ ওর কাছে এত তাড়াতাড়ি চলে আসবে।
