তৃতীয় পৰ্ব
বাড়িতে ঢুকে খাওয়ার ইচ্ছেটাও ওর চলে গেল। খাবার হাতে একটু নাড়াচাড়া করে উঠে পড়ল সে। মা ভাবল ছেলে নিশ্চয়ই বন্ধুর বাড়িতে কিছু খেয়ে এসেছে। তাই আর কথা বাড়াল না। উৎস সোজা নিজের শোবার ঘরে চলে এল। শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে। পাখা চালিয়ে শরীরটাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। কিন্তু ঘুম এল না। নানা রকম উদ্ভট- চিন্তা মাথায় ঘুরছে। যখনি ভাবছে সোমালী মৃতা! তখনি একটা চোরা ভয় তার বুকে দানা বাঁধছে। সোমালীর সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? বেছে বেছে তাকেই বা দেখা দিল কেন? সুজিতবাবু বা তার ছেলেকে তো আগে দেখা দেবে। ভদ্রলোক ওই ফাঁকা বাড়িতে একা একা দিন কাটাচ্ছে- কই সে এতদিন সোমালীর দেখা পেল না কেন? তাহলে কি অশরীরী আত্মা উৎসের মাধ্যম দিয়ে কিছু বলতে চায়? তার মৃত্যুটা কি আত্মহত্যা নয়? এরা জোর করে তাকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে? কিন্তু সোমালীর কিছুদিন আগে থেকে যে পরিবর্তন সে তো তার বাবা-মাও জেনেছিল। এমনকি ডাক্তার পর্যন্ত দেখিয়েছে। কথার চাষ শুরু হয়ে গেছে উৎসের মাথায়।
বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে শুধু ভেবেই চলেছে। মাথাটা ক্রমশ উত্তেজিত হচ্ছে। একে গরম, তার ওপর পাখার হাওয়াটা গায়ে আগুনের হল্কার মতো এসে বিঁধছে। ও জানে এত চিন্তা নিয়ে তার ঘুম আসবে না। এদিকে কাল সকালেই কাজে বেরোতে হবে। কয়েক ঘণ্টা আগেও এরকম পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে বুঝতেই পারেনি। বিছানায় উঠে বসল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। একটু মুখে হাত পায়ে জল দিয়ে আসা যাক। ঘরের লাইটটা জ্বালিয়ে দিতে ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল- বারোটা কুড়ি।
সব্বোনাশ! এতক্ষণ ধরে শুধু ভাবনার সাগরে সাঁতার কেটেছে? বাথরুমে গিয়ে মুখে চোখে জল দিতে খানিকটা আরাম বোধ করল। এবার আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ দুটো বুজতে গিয়ে নতুন একটা চিন্তা মাথায় এল। অশরীরীরা সর্বত্র বিরাজমান। আত্মা সব জায়গায় যেতে পারে। একটা বইয়ের লেখা মনে পড়ে গেল।
মনে পড়তেই সোমালীর মুখটা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। এখন যেন তাকে অতটা সুন্দরী লাগছে না! এলো করা চুলে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ভয় চোখ দুটো খুলে ফেলল! সারা ঘর অন্ধকার। এর ফলে আতঙ্কটা দ্বিগুণ আকার ধারণ করল। ও তাড়াতাড়ি উঠে আলো জ্বালাতে ভয়টা একটু কমলো। ভয়ার্ত চোখে এদিক ওদিক তাকাল। বাগানের দিকের জানালাটা খোলা। ওদের একতলা বাড়ি। বাগানে হয়ে থাকা জাম গাছটা ঝাঁকড়া মাথায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। গাছটার ডালপালা আর পাতাগুলোর জন্যে অন্ধকারটা আরো বেশি লাগছে। দু-একটা জোনাকি পোকা জ্বলছে। যেন কোনো দৈত্য এক মাথা চুল নিয়ে ওর দিকে মিটমিট করে তাকিয়ে আছে। অন্যদিন হলে ও গাছটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কত রকম চিন্তা করতে করতে ঘুমোত। কিন্তু আজ যেন সবকিছু দানবীয় লাগছে।
তাহলে কি ওর মন দুর্বল হয়ে পড়েছে? অবশ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক দুদিন ধরে যে ঘটনা পরম্পরা উৎসের মনের ওপর দিয়ে যাচ্ছে! যে কোনো স্বাভাবিক মানুষের ওপর রেখাপাত করতে বাধ্য। আচমকা খুট করে একটা শব্দে ও সতর্ক হলো! কান সজাগ করল! খাটের ওপর চুপ করে সে বসে আছে। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছে। এবার পরিষ্কার তার কানে শব্দটা এল। কেউ যেন বন্ধ দরজায় টোকা দিচ্ছে। এতো রাত্রে কে দরজা ধাক্কাবে? মা তো ওঘরে ঘুমিয়ে আছে। ওর বুকে যেন হাতুড়ি পেটাবার শব্দ হলো। সোমালীর মুখটা ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ও ভয়ে সাড়া পর্যন্ত দিতে পারছে না। স্থবিরের মতো দরজার দিকে চেয়ে বসে আছে। একটু পরেই মায়ের গলা পেল। “এত রাত্রিরে তুই ঘরের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিস কেন? ঘুমোস নি?” মায়ের গলা পেয়ে ওর মনে হারানো শক্তি ফিরে এল। সারা শরীর ঘামে জবজব করছে। পাখার বাতাসও যেন গায়ে লাগছে না। কোনোরকমে উচ্চারণ করল– “তু-তুমি শুয়ে পড়গে যাও। আমি ঘুমিয়ে পড়ব।”
“শরীর ঠিক আছে তো?” সুলোচনা প্রশ্ন করল।
“সব ঠিক আছে, তুমি শুয়ে পড়ো।” একবার ভাবল মায়ের কাছে গিয়ে শুয়ে পড়ে। তারপর ভাবল মা অন্য কিছু ভাববে? প্রশ্নের পর প্রশ্ন করবে। এদিকে মা-কেও এসব বলা ঠিক হবে না।
“তুই শুয়ে পড়, কাল আবার কাজে যাবি।” মায়ের কণ্ঠস্বর থামল। উৎসের মনে ভয়টা স্তিমিত। কিন্তু আলো নেভাতে সাহস হলো না। জানলার দিকে পিছু ফিরে শুয়ে পড়ল। চোখ বুজে ঠাকুরের নাম করতে করতে ঘুমোবার চেষ্টা করল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সে জানে না। যখন ঘুম ভাঙল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। সাতটা বেজে গেছে। মা সকালে ডাকেনি। জানে ছেলে অনেক রাত্রিরে ঘুমিয়েছে। মুখে ব্রাশ লাগিয়ে দরজা খুলল। রাত্রের দুঃস্বপ্ন এখন মন থেকে উধাও। সূর্যের আলো আমাদের মনকে সতেজ করে তোলে। যাবতীয় অশুভ শক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখতে সমর্থ হয়। সুলোচনা দেবীর রান্না প্রায় কমপ্লিট। উৎস লিকার চা খেয়ে টয়লেটে যায়। টয়লেট থেকে বেরোতে মায়ের কণ্ঠস্বর কানে এল। ঘরে এসে দেখে মা ওর বিছানা করতে করতে থমকে দাঁড়িয়ে আছে।
“কী হলো ডাকছ কেন?” উৎসের গলায় জিজ্ঞাসা।
“কাল কোন বন্ধুর বাড়ি তুই গিয়েছিলিস?” হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন, ভেবে পায় না সে।
“কেন? কী হয়েছে?”
“তোর বিছানায় মাথার বালিশের পাশে এগুলো কোথা থেকে এল?” মা আঙুল তুলে দেখাল। দৃশ্যটা দেখে উৎসের মুখটা ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। এ কী দেখছে সে? বালিশের পাশে লম্বা লম্বা কালো চুল একগোছা পড়ে আছে!
“আমি তো তোর বিছানায় শুই না। তাহলে মেয়েদের চুলের জটলা কোথা থেকে এখানে এলো? তুই আমায় সত্যি কথা বল বাপি, (উৎসের ডাকনাম) কাল কোথায় গিয়েছিলিস?” সুলোচনার চোখে-মুখে জিজ্ঞাসার চিহ্ন! উৎস সম্মোহিত এক মানুষের মতো স্থির হয়ে পড়ে থাকা চুলগুলো দেখছে। তার মনের মধ্যে পুনরায় বিভীষিকা দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সোমালী কি তার সঙ্গে সঙ্গেই রয়েছে? সুলোচনা ছেলের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। ছেলের মুখে ভয়ের চিহ্ন। এ ভয় অন্যরকম। মা হয়ে সে বুঝে যায়। ছেলেকে ঠ্যালা দিয়ে বলে ওঠে, “তুই কি কোনো কিছুতে ভয় পাচ্ছিস? আমার কাছে কিছু লুকোস না বাপি।” কাতর কণ্ঠ সুলোচনার। উৎস কোনো কিছু বানিয়ে বলার অবস্থায় নেই। কারণ তার মনে শুরু হয়ে গেছে ভয়ের ঝড়। এই বেলাতেও মনে হচ্ছে চারিদিকে অন্ধকার ঘনাচ্ছে। ধপ্ করে সে বিছানায় বসে পড়ে। দিন কয়েক ধরেই তার শরীরের উপর একটানা একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে। যা তার মস্তিষ্ককে সুস্থ থাকতে দিচ্ছে না। সে স্থির করে মাকে সব ঘটনা বলা দরকার। কারণ এই রকম চিন্তা ও ভয় নিয়ে সে বেশিদিন চলতে পারবে না। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলতে শুরু করে এই কদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।
উৎসের কথাগুলো শুনতে শুনতে মিনিটে মিনিটে সুলোচনার মুখের ভাব পরিবর্তন হতে থাকে। অবশেষে মুখটা ভয়ের মুখোশে পরিণত হয়।
“বাপি, এ যে ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কী যে করব, মাথায় কিছুই আসছে না!” কাঁদো কাঁদো গলা তার। মা ও ছেলে দুজনেই খাটে চুপ করে বসে থাকে। দুজনেই ভাবতে থাকে এসব কথা কাকে বলবে? কে উদ্ধার করবে তাদের এই মহা বিপদ থেকে? সুলোচনা পরিষ্কার বুঝতে পারছে কোনো এক অদৃশ্য অশুভ শক্তি তার ছেলের সামনাসামনি রয়েছে। কিন্তু কারণটা বুঝে উঠতে পারছে না।
উৎস বলে উঠলো, “সারাক্ষণ ভয়ের মধ্যে বাস করতে হলে, আমার পক্ষে চাকরি করা সম্ভব? সে রকম কাউকে চিনি না যে তার কাছে গিয়ে সাহায্য চাইব। বন্ধুবান্ধবদের বলতে গেলে হেসে উড়িয়ে দেবে। সুলোচনা জানে ছেলের প্রতিটা কথা সত্যি। ভূত প্রেত এসব ব্যাপারে গুণিন বা তান্ত্রিক হলো সমস্যার সমাধান। কিন্তু তার তো ছোট্ট জগৎ। সেরকম পরিচিত কেউ নেই।
এই সময় উৎসের ফোনটা বেজে উঠল। উৎস জানে কোম্পানির ফোন, কিন্তু এখনও তো তার যাবার দেরি আছে। অচেনা নম্বর।
“হ্যালো, কে বলছেন?” ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল সুজিত সেনের কণ্ঠস্বর।
“মাথা থেকে উদ্ভট চিন্তা দূর হয়েছে নিশ্চয়ই? এখন কি কাজে বেরোেচ্ছ?” এক মিনিট চিন্তা করল সে। আসলে কী উত্তর দেবে ভাবছে। ভদ্রলোককে আসল কথাটা বলাই ঠিক মনে করল। যেহেতু ওনার বাড়ি নিয়ে এই ঘটনার সূত্রপাত। কালকের রাতের ঘটনাটা সে বলল। সুজিত বাবু চুপ করে শুনে গেলেন। তারপর বললেন, “তুমি একটু সাবধানে থাকো। পারলে কয়েকদিন কাজে যেও না। ব্যাপারটা আমার খুব একটা ভালো মনে হচ্ছে না। এরমধ্যে দেখি আমি কিছু করতে পারি কিনা! কোনও ভালো গুনিনের সন্ধান করছি। কারণ আমার মন বলছে কোনও অলৌকিক শক্তির চক্করে তুমি পড়েছ, না হলে এসব কেন হবে? আমি এখন রাখছি, এর মাঝে আরও যদি কোনো ঘটনা ঘটে আমায় জানাবে। যে নম্বর থেকে ফোন করেছি ওটাই আমার নম্বর। আর বিষয়টা এখনই পাঁচকান কোরো না।” সুজিত বাবু লাইন ছেড়ে দিলেন। উৎস ও সুলোচনা দুজনেই নীরব হয়ে ভেবে চলল- আগামী দিনে আরও কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে কিনা?
উৎস গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল মায়ের মুখ চেয়ে। কেননা সুলোচনাকে মনে হচ্ছে এক স্থবির অকর্মণ্য মানুষ। দু চোখে কোনও আশার আলো নেই। নিরাশায় ভরা মায়ের কাঁধে হাত রেখে উৎস বলে ওঠে, “ওসব কথা মন থেকে তাড়িয়ে দাও দিকি। জলখাবার করবে চলো। কয়েকদিন কাজে যাব না। তাছাড়া সুজিত বাবু ফোনে বললেন—তিনি একটা ব্যবস্থা করবেন। আমি ভেবে দেখলাম, যতক্ষণ আমি জানতে পারিনি মেয়েটা মৃত, ততক্ষণ আমি স্বাভাবিক ছিলাম। মনে হয় সবই মনের ব্যাপার।” মাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে।
সুলোচনা বিড়বিড় করে বলে, “কিন্তু ওই চুলের গোছাটা?” কাঁপা আঙুল তুলে দেখায় সে।
“মনে হয় বাইরে থেকে উড়ে এসে পড়েছে।” হাত ধরে মা-কে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়। সুলোচনা ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। উৎস ফোন মেলায় কুরিয়ার অফিসে। জানিয়ে দেয় শরীর খারাপের জন্য কয়েকদিন আসতে পারবে না। সে জানে এই কদিনের টাকাও সে পাবে না। আসলে সে বুঝতে পারছে এইসব চিন্তা মাথায় নিয়ে ডেলিভারি দিতে গেলে ভুল অবশ্যম্ভাবী। তাছাড়া বাইক চালানোটাও তার পক্ষে সুখকর হবে না।
প্রখর রৌদ্রে ভয়টা এখন অস্তমিত। শুধু মাথার ভেতর ঘটনাগুলো লাফালাফি করে চলেছে। যা এই মুহূর্তে সে বন্ধ করতে পারছে না। মনটাকে ঠিক রাখার জন্যে বাগানের দিকে গেলো ও। গ্রীষ্মে গোলাপ গাছ গুলো শুকিয়ে গেছে। উৎস বালতি আর মগ নিয়ে জল দিতে থাকলো গাছগুলোতে। কিছুক্ষণ বাদেই মায়ের ডাক পেল খেতে আসার জন্যে। ন’টার মধ্যেই সূর্যের তেজ বেড়ে উঠেছে। হাত ধুয়ে এসে ও টেবিলে বসল। রুটি আর বেগুন ভাজা করে দিয়েছে মা। খেতে খেতে সুলোচনা বলে, “তুই বাড়িতে একটু থাক। আমি কালীবাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসছি। কারণ মধুর মা বাসন মাজতে আসবে।”
“ছেলের জন্যে সত্যি তুমি চিন্তায় পড়ে গেছ।” জোর করে মুখে হাসি ফোটাল। সুলোচনা শাড়ি চেঞ্জ করে বেরিয়ে গেল। ওদের একতলাটা বাড়িটা এমনিতেই নিস্তব্ধ। কারণ পাড়ার এক কোণে অবস্থিত। শূন্য বাড়িটায় এখন যেন নিস্তব্ধতা আরো বেশি করে অনুভূত হচ্ছে উৎসের
গতকাল সারারাত ভাল ঘুম হয়নি তার। জানে না আজকেও তার ভাগ্যে কী লেখা আছে? সে এরকম ভীতু প্রকৃতির ছেলে কোনোদিন ছিল না। আসলে মরা মানুষ যদি সূক্ষ্ম শরীরে ফিরে আসে! তাহলে যেকোনো লোকই হার্টফেল করবে। যদি সবই ওর মনের ভুল হয়, তাহলে লম্বা লম্বা চুলগুলো কোথা থেকে আসবে? তাছাড়া সোমালীর বাড়ি যাওয়া, ওর সঙ্গে কথা বলাটা কি সব দিবাস্বপ্ন?
দরজার কলিং বেলটা আচমকা বাজতে ও চমকে উঠল। আসলে এক মনে চিন্তার রাজ্যে বাস করছিল, মনে পড়ল মধুর মা আসবে। দরজা খুলে দিল। ওকে দেখে মধুর মা অবাক হলো। “দাদাবাবু কাজে যাওনি?” আসলে উৎস বড়ো একটা ছুটি নেয় না।
“না শরীরটা ভালো নেই।” ও ভেতরে চলে এল। শোবার ঘরে এসে আজকের খবরের কাগজটা খুলে মুখের সামনে ধরল। মনটাকে একটু অন্যমনস্ক করা প্রয়োজন, এক জিনিস চিন্তা করতে করতে সকালেই না আবার সোমালীকে দেখতে পায়…। কাগজটা একমনে দেখছিল। মাঝে মাঝে কাজের লোকের বাসন মাজার শব্দ কলতলা থেকে ওর কানে এসে এসেছে ঢুকছে। হঠাৎ কানে একটা অন্যরকম শব্দ এসে ঢুকতেই, ইন্দ্রিয়গুলো সজাগ হয়ে উঠল। কেউ যেন গুনগুন করে কোনো গান গাইছে, খুবই অস্পষ্ট গানের কলিগুলো। মধুর মা গান গাইছে নাকি? অত বয়স্ক মহিলার কণ্ঠ এত সুমধুর? রীতিমতো গান জানা কোনো মহিলার সুরেলা কন্ঠস্বর। একটু শুনলেই কেমন যেন নেশা ধরে যায়। কোনো পরিচিত গানের সুর নয়। দু’মিনিট শোনার পর উঠে দাঁড়ায়। খুঁজে বার করতেই হবে গানের উৎসস্থল। ও পায়ে পায়ে বাইরে কলতলায় এসে দাঁড়াল, দেখলো এক মনে মধুর মা বাসন মাজছে। তার মানে সে গাইছে না। গানের সুর ভেসে আসছে ছাদে যাবার সিঁড়ি বেয়ে। এবার উৎসকে তার ইন্দ্রিয়গুলো সচেতন করল। তারা যেন মিলিতভাবে ছাদে যেতে ওকে বাধা দিচ্ছে…!
সিঁড়ির ধাপে এক পা রেখেও সে সরিয়ে নেয়। ভেবে পাচ্ছে না কিসের জন্যে এত ভয় লাগছে? সামান্য একটা গান… কে গাইছে এটা জানার জন্যেও ওর এত সঙ্কোচ হচ্ছে কেন? এই কয়েকদিনে তার মনটা এত দুর্বল কে করে দিল? মধুর মা তো বাড়িতে আছে! তার ওপর প্রখর রৌদ্রের বেলা, তবু সাহস সঞ্চয় না করতে পেরে ঘরে ঢুকে এল। আচমকা ফোনটা বেজে উঠল! যেন একটা ঘোর থেকে বাস্তবের মাটিতে এসে পড়ল। মোবাইলটা কানে ঠেকাল। অপরপ্রান্ত থেকে সুজিত সেনের গলা ভেসে এল।
“তোমাকে আবার একটু বিরক্ত করছি।”
“না না বলুন।”
“তুমি কি মনে করতে পারবে সোমালীকে যেদিন প্রথম দেখো, তার পরনে কি রঙের শাড়ি ছিল?” উৎসের ভ্রু দুটো কুঁচকে উঠল। হঠাৎ একথা কেন জিজ্ঞাসা করছেন সুজিত বাবু? সোমালীর শাড়ীর রঙটা চোখ বুজলেই মনে পড়ে যায়। উজ্জ্বল রঙের শাড়ি। ও সেটাই বলল। ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল একটা দীর্ঘশ্বাস।
“আ-আমি ওদের শোবার ঘরে একটা লাল শাড়ি দেখলাম। বিছানার ওপর পাট করা রয়েছে। বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা, তুমি ওকে দেখা পাওয়ার কথা বলাতে, একটু আগেই ছেলের ঘরে গিয়েছিলাম। শাড়িটা ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যাই। তোমার কথা শুনে বুঝলাম ওটা সোমালীরই শাড়ি। কিন্তু শাড়িটা আলমারি থেকে বেরিয়ে খাটের ওপর এল কী করে? বিশ্বাস করো এখন আমারও ভয় লাগছে।” ঢোঁক গিলল সুজিত সেন।
“এত বড়ো খালি বাড়িতে আমি একা এক বৃদ্ধ মানুষ। তবু এখনো মনটাকে শক্ত করে রেখেছি। কারণ একটু আগেই আমার এক বন্ধুর সঙ্গে আমি যোগাযোগ করতে পেরেছি। একমাত্র সেই আমাদের এই বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করতে পারবে। অবশ্য সত্যিই যদি কোন অতীন্দ্রিয় শক্তি জাগ্রত হয়ে থাকে।”
“কে তিনি?” উৎসের গলায় উৎকণ্ঠা।
“রুদ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়…।” কেটে কেটে নামটা উচ্চারণ করলো সুজিত বাবু। “তুমি বিকেলের দিকে একবার চলে এসো, সন্ধ্যে নামার আগে ফিরে যেও। ফোনে সব কথা হবে না।” লাইনটা ছেড়ে দিল সে। উৎসের মনে ভেসে উঠল সুজিত সেনের আলো-আঁধারিতে ভরা দোতলা বাড়িটা যেখানে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সোমালী ছিল।
উৎস জানে যদি সে মাকে সত্যি কথা বলে, তাহলে মা কখনো ওকে ওই ভুতুড়ে বাড়িতে যেতে দেবে না। তার মানে একটা মিথ্যে কথা বলে যেতে হবে। কারণ যাওয়াটা দরকার। সুজিত বাবু নিশ্চয়ই কোনো ভালো গুণিন বা ওঝাকে খুঁজে পেয়েছে। ভদ্রলোক তবু তার জন্যে চেষ্টা করছে। হয়তো ভেবেছে তার বাড়ি বা পরিবারের জন্য উৎসের জীবনে নেমে এসেছে কালো ছায়া। তাছাড়া সে চাইবে না তার বাড়ির এই ভৌতিক ঘটনা চারপাশে রটে যাক।
এই সময় কালীবাড়ি থেকে মা এসে বাড়ি ঢুকল। মধুর মায়েরও কাজ শেষ হয়ে গেছে। উৎস একবার কান খাড়া করে গানের কলি শোনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। গান বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু নতুন একটা ভাবনা তার মনে ঢুকল। আজ রাত্রে আবার নতুন কী উপদ্রব শুরু হয় কে জানে? সুলোচনা এসে ছেলের মাথায় ঠাকুরের ফুল ছুঁইয়ে দিল। উৎস বলল, “খেয়ে দেয়ে বেরোব, অবশ্য সন্ধ্যের আগে ফিরে আসব। সারাদিন বাড়িতে ভালো লাগছে না।”
“কোথায় যাবি শুনি?” সুলোচনার কপালে ভাঁজ পড়ে।
“পুরোনো ক্লাবে গিয়ে একটু আড্ডা মেরে আসি।” সুলোচনা কথাটাতে খারাপ কিছু দেখল না। যদি বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে অন্যদিকে মনটা যায়, তাই বাধা দিল না।
বিকাল চারটের সময় উৎস বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল, তার গন্তব্যস্থল হলো সুজিত সেনের অভিশপ্ত বাড়ি। বাইকটা থাকলে সুবিধে হতো। কিন্তু ওটা কোম্পানির। যত মিত্র ঘোষ লেনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ততই মনে পুরোনো কথা গুলো ভেসে উঠছে। যদি আজকে ও দরজায় শব্দ করার সাথেসাথে সোমালী দরজা খুলে দেয়? ও নির্ঘাত হার্টফেল করবে।
ঘড়িতে সাড়ে চারটে বাজছে। গলিটা প্রখর রৌদ্রে শুনশান। এখানে বেশিরভাগ বাড়ি পুরোনো আমলের। মনে হয় অর্ধেক বাড়িতে বাসিন্দা থাকে না। পাশাপাশি কোনো দোকানপত্তর নেই। বেচাকেনা হয়তো ভালো হয় না বলেই দোকান নেই। ও এসে দাঁড়াল সুজিত সেনের বাড়ির সামনে। বাড়িটা এই গরমে ঘর্মাক্ত দেহে যেন ঝিমোচ্ছে। দুবার করার পর দরজা খুলল। উৎসের সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সুজিত বাবু ওকে ভেতরে আসতে বললেন। বাড়ির সিলিং আর কড়ি-বরগার জন্যেই বোধহয় বেশ ঠান্ডা। একটু আরাম বোধ করল সে।
পরিচিত বৈঠকখানায় ওর নির্ধারিত চেয়ারে বসে রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছল উৎস। সুজিত বাবু সেন্টার টেবিল থেকে কাঁচের জগটা তুলে ওকে এক গ্লাস জল দিল। বিনা বাক্যব্যয়ে জলটা খেয়ে নিল সে।
“তোমাকে কয়েকটা কথা বলার জন্যেই এখানে ডাকা। আমার বাড়িতে এসে তুমি এক অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছ। আগে বিশ্বাস না হলেও, রুদ্রনাথের সাথে কথা বলার পর আমি নিঃসন্দেহ হয়েছি। যে কোনও অতীন্দ্রিয় শক্তির স্পর্শ তোমার লেগেছে।
“রুদ্রনাথ ইনি কি কোনও তান্ত্রিক অথবা গুণিন?” প্রশ্ন করল উৎস। কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে সুজিত সেন কবিতার মতো করে বলে।
“আঁধার ঘনায় দিনে, মুছে যায় আলো। কান্না ও ভয়ে রাত হয় ঘোর কালো। সজল চোখেতে বলি হবে কি ও ভালো? ভয় নেই বলে সে, দীপটুকু জ্বালো। যেখানে অন্ধকার, সেখানে অশুভ, সেখানেই তাকে পাশে পাই আমরা। সে রুদ্রনাথ পণ্ডিত।” কথাগুলো শুনে উৎসের মনে একটা আশার সঞ্চার হলো।
“রুদ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, কণ্ঠে রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে ত্রিশূল, কপালে রক্ততিলক, মাথায় জটাধারী কোনো তান্ত্রিক নয়। থাকেন গৌহাটিতে, কামাখ্যা মায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত। তারা মায়ের সাধনায় সারাদিন ব্যস্ত থাকেন। চেষ্টা করেন মায়ের শক্তির সাহায্যে মানুষের উপর অতীন্দ্রিয় শক্তির কালো প্রভাবকে দূরীভূত করতে।”
আমার থেকে কয়েক বছরের বড়ো। ছ’ফুট লম্বা, ফর্সা স্লিম শরীর টিকোলো নাক, বাবরি করা কাঁচাপাকা চুল। পরনে থাকে খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা। চোখদুটো উজ্জ্বল ও অন্তর্ভেদী। তখন রোহিতের মা বেঁচে ছিল। কামরূপ কামাখ্যা মন্দিরের সামনে পরিচয়। সেই পরিচয় ক্রমশ গাঢ় হয়। তারপর আমার স্ত্রী বিয়োগের পর সেই যোগাযোগে ঘাটতি পড়ে। আসলে আমার স্ত্রী ছিল ওর অন্ধভক্ত। গুরু বলে মেনে ছিলেন তাঁকে। বেশ কয়েকবার ওনার টানে আর স্ত্রীর অনুরোধে ওনার আশ্রমে গিয়েছিলাম। কামরূপ থেকে কয়েক মাইল দূরে। তখনই দেখেছিলাম তার আধ্যাত্মিক শক্তির কিছু নমুনা। তাই তোমার কথা শুনে ওই নামটাই মাথায় এল। গতকাল ফোনে যোগাযোগ করেছিলাম।” থামল ভদ্রলোক।
উদ্বেগে উৎস বলে উঠল, “উনি কী বললেন?”
“তোমার সব কথা বলেছি। এমনকি আমার পুত্রবধূ কীভাবে মারা যায় সেই কথাও।” সুজিত বাবু ফ্লাস্ক থেকে দুটো কাপে চা ঢালে। একটা কাপ উৎসের দিকে এগিয়ে দেয়, এক চুমুক চা খেয়ে দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটা দেখলেন, সবে পাঁচটা পনেরো। বাইরে এখনও রোদের তেজ, কিন্তু ঘরে কাঠের খড়খড়ির জানলা থাকার জন্যে ঘরে আলোর প্রভাব কম।
“উনি সব শুনে এই বাড়িতে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।”
“কিন্তু কবে?” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উৎস।
“বুঝতে পারছি। তুমি ধৈর্য হারিয়ে ফেলছ, যা তোমার পক্ষে স্বাভাবিক। তোমার বাড়িতে মা ছাড়া আর কেউ আছে?” প্রশ্নটার মানে উৎস বুঝতে পারে না। উত্তর দেয়, “না।” চা খেতেও ভুলে গেছে সে।
“তোমাদের বাড়ি একতলা। খুব পুরোনো বাড়ি কি?” চায়ের কাপ হাতে নিয়ে প্রশ্ন করে।
“খুব একটা পুরোনো নয়। এসব প্রশ্ন কেন করছেন?”
“চা খাও সবই বলছি। সেই জন্যই তো এখানে ডেকে পাঠিয়েছি।” উৎসের কৌতূহল চরমে। পুরো চা এক ঢোঁকে গিলে ফেলল সে। একটু কেশে সুজিত বাবু গম্ভীর গলায় বললেন, “সব শুনে রুদ্র বাবু বললেন ব্যাপারটা খুব হালকা নয়। সোমালীর মৃত্যু সময় জেনে কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, একেই অপঘাতে মৃত্যু! তার ওপর দোষ পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সঠিকভাবে আমি পরে জানাচ্ছি। তখনই তিনি বলেন একবার সোমালীদের শোবার ঘরটা দেখে আসতে, যদি কোনও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ে তাহলে যেন সঙ্গে সঙ্গে ওনাকে জানানো হয়। আমার মনে এসব প্রশ্নের কখনো উদয় হয়নি। তোমার ঘটনাটা জানার পর খটকা লাগে, তারপর সোমালীর লাল শাড়ি খাটের ওপর দেখাতে ওনাকে জানাই। তুমিও যে ওকে লাল শাড়ি পরা অবস্থায় দেখেছ সেটাও বলেছি। তখনই তোমাকে ডেকে পাঠাতে বলেন। এবং কিছু নির্দেশ তিনি দেন যা তোমাকে পালন করতে হবে। যতদিন না রুদ্র পণ্ডিত এখানে এসে উপস্থিত হচ্ছেন। খুব সম্ভবত আগামী পরশু তিনি আসবেন। রোহিতকে ডেকে পাঠিয়েছি।” থামল সুজিত সেন। উৎসের মুখে ভয়ের কালি। ভাবে কি কুক্ষণেই না এই মিত্র ঘোষ লেনে মাল ডেলিভারি দিতে এসেছিল! মা জানলে আরো আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। এতদিন ও গল্পে এসব পড়ত, কখনো তার জীবনেও যে এসব ঘটবে ভাবতে পারেনি। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী কী বলেছেন উনি?”
“তোমাদের বাড়িতে যে সিলিন্ডারের গ্যাসে রান্না হয়, রান্না হয়ে যাবার পরে সিলিন্ডারটা যেন কাপড় দিয়ে মুছে রাখা হয়। সিঁড়ির নিচে কোনো পুরোনো জিনিসপত্র থাকে কি? তা সরিয়ে নিচটা যেন পরিষ্কার রাখা হয়। বিশেষ করে তুমি একা একা ছাদে যাবে না। বিশেষ প্ৰয়োজন থাকলেও না।” তার মনে পড়ে যায় একটু আগেও গানের সুরের উৎস খুঁজতে ছাদে যাবার সিঁড়িতে পা দিয়েছিল। শরীরটা কেমন যেন শিরশির করে ওঠে।
“কিন্তু কেন?” জিভ দিয়ে ঠোঁটটা চেটে ও প্রশ্ন করে।
“উনি সন্দেহ করছেন সোমালীর আত্মা এখনও মুক্তি পায়নি। তাই যদি হতো? তুমি ওকে দেখতে পেতে না। বা বাড়িতেও কোনো সূক্ষ্ম শরীরের উপস্থিতি অনুভব করতে পারতে না। সবকিছু দুর্বল মনের ব্যাপার নয়। সোমালীর আত্মার অতৃপ্ততার কারণ কী? কেন ও ওইভাবে মৃত্যুবরণ করল? কেন তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর যতক্ষণ না জানা যাবে ততক্ষণ ওর আত্মা আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবেনা। এখন তুমি উপলব্ধি করছ, এরপর সে তার পরিধি বাড়াবে। তার পরিধির মধ্যে রোহিত, আমিও থাকব। তাই তোমাকে সাবধান করে দিয়েছেন তিনি। বাড়িতে কিছু নিয়ম তোমায় পালন করতে হবে। যতক্ষণ না তিনি এখানে এসে উপস্থিত হন। সন্ধ্যেবেলা ধূনো পোড়াতে হবে। তুমি বা তোমার মা যে ঘরে থাকো, সেখানে ধূপ জ্বালিয়ে রাখতে হবে। এসব প্রেতাত্মারা সিড়ির নিচে বা চিলেকোঠায় থাকতে খুব পছন্দ করে, বাথরুমেও তাদের মাঝে মাঝে দেখা যায়…।” একটানা কথা বলে থামলেন সুজিত বাবু। উৎসের দেহে যেন প্রাণ নেই। বুকের মধ্যে তারুণ্যের শক্তি ধীরে ধীরে অস্তমিত হচ্ছে। সুজিত বাবু উঠে দাঁড়ালেন।
“আর বেশিক্ষণ তোমায় আটকাব না। সন্ধ্যা নামছে। তুমি মাকে সব কথা বলবে, আর এও বলবে ভয় না পেতে। কেননা আমি রুদ্রনাথ পণ্ডিতকে যেটুকু দেখেছি বা তার শক্তির কথা শুনেছি, আমার স্থির বিশ্বাস, এ মহা বিপদ থেকে তিনি ঠিক আমাদের উদ্ধার করে দেবেন।” উৎস উঠে দাঁড়াল।
“যেদিন রুদ্রবাবু আসবেন, সেদিনই তোমায় ডেকে পাঠাব। মনে শক্তি রাখো। এই বয়সে এত বড়ো বাড়িতে আমি একা রয়েছি।” বললো–বটে কথাগুলো, কিন্তু উৎস বুঝল সুজিত বাবুর কণ্ঠে কেমন যেন খামতি আছে। তাহলে কি উনিও ভয় পাচ্ছেন? দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে রাস্তায় নামল। বিকাল হয়ে গেছে। সে এগোলো বাসের জন্য। সামনে ক্রমশ এগিয়ে আসছে রাত্রি। আজ মায়ের সঙ্গে শুয়ে পড়বে মনস্থির করল। বাসে উঠেই মোবাইলটা বেজে উঠল, মা ফোন করেছে। হয়তো ছেলের জন্য চিন্তা হচ্ছে। রাস্তায় জ্যাম থাকার জন্য বাস বাসটা চলছে শামুকের মতো গতিতে। ও জানিয়ে দিল কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরছে।
মনের মধ্যে চিন্তার পাহাড়। এখনো অভিশপ্ত দুটো রাত তাকে কাটাতে হবে। তারপর রুদ্রনাথ পণ্ডিত আসবেন। সে জানে না তিনি কতখানি সাফল্য লাভ করতে পারবেন। বাড়ির সামনে সে যখন নামল তখন আকাশে সূর্যের বিদায়ী দিনের ঘোষণা হয়ে গেছে। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেল, ল্যাম্পপোস্ট গুলোর আলো একে একে জ্বলে উঠেছে। সুলোচনা উৎসের আসার অপেক্ষায় ছিল। বাড়ি ঢুকতে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সুলোচনা ছেলের জন্য চা করতে গেল। উৎস বাথরুমে ঢুকে ভালোভাবে স্নান করল। হঠাৎ তার নাকে একটা উৎকট গন্ধ ভেসে এল! দু একবার নাকটা টানল। ঝরঝরে শরীরটাতে আবার উৎকণ্ঠা খেলে গেল। সুজিত বাবুর কাছ থেকে শোনা রুদ্রনাথের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। তবে এখানেও কি সোমালীর আত্মার আবির্ভাব ঘটেছে? সে কি উৎসের সঙ্গে সর্বক্ষণ রয়েছে? তাড়াতাড়ি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল। সুলোচনা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো। ওর মুখে এত ভয়ের ছাপ কেন? নতুন করে আরো কিছু ঘটল?
চা হাতে নিয়ে বলে উঠল, “বাপি তোর শরীর ঠিক আছে তো? আমার মন বলছে তুই নিশ্চয়ই ঐ অভিশপ্ত বাড়িটাতে গিয়েছিলিস?” উৎস অস্বীকার করতে পারল না। তাছাড়া মাকে এখন থেকে সব কথা বলাই ভালো। চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে সবকিছু বলল। সুলোচনার চোখ দুটো কপালে উঠল ।
“হ্যাঁ-রে বাপি? আমাদের কী হবে রে?” চোখ দুটোতে কান্নার চিহ্ন।
“তুমি এত নার্ভাস হয়ে পড়ো না। আমার মন বলছে রুদ্রনাথ পণ্ডিত আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করে দেবেন। কেননা সুজিত বাবুর মুখেও আমি বিশ্বাসের চিহ্ন দেখে এসেছি।” সুলোচনা দু’হাত জোড় করে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানায়।
“বরং চলো আমরা ওনার কথামতো সিঁড়ির তলায় যে সব আবর্জনা আছে পরিষ্কার করে ফেলি। তিনি নিশ্চয়ই কোনো কিছুর উদ্দেশ্যে নির্দেশ দিয়েছেন।”
“তুই এইমাত্র স্নান করে এলি, এই গরমে ওসব ঝুলপড়া নোংরা বস্তা, বাক্স সরাবি?”
“সরাতেই হবে মা। দরকার হলে আবার স্নান করব।” গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায় উৎস। দুজনে মিলে অন্ধকারাচ্ছন্ন সিঁড়ির নিচে থেকে ঝুল ধরা বাক্সগুলো টেনে বার করতে থাকে। সেই সময় দালানের আলোটা দপদপ করে ওঠে। কেন জানে না দুজনের বুকটা একটা চোরা ভয়ে কেঁপে উঠল। মনে হয় পরিস্থিতি ও পরিবেশ এর জন্য দায়ী! দু- একবার আলোটা দপদপ করে পুনরায় ঠিক হয়ে গেল।
বিড়বিড় করে উৎস বলল, “এর মধ্যে দেখছি, টিউবটা খারাপ না হয়ে যায়।”
“কতদিন বদলানো হয়নি…।” সুলোচনা যোগ করে। আধঘণ্টার মধ্যে ওরা জায়গাটা পরিষ্কার করে ফেলে। এরপর সুলোচনা রান্নাঘরে যায় রাতের খাবার তৈরি করার জন্য। উৎস ভাবছে রাতে একসঙ্গে শোবার কথা মাকে বলবে কিনা? কেমন যেন একটা সংকোচ হচ্ছে মনের মধ্যে।
রাত্রে খেতে বসেও বলতে পারল না। মা ভাববে ছেলে রাম ভীতু। তাছাড়া আমার নিজেও ভয়ার্ত হতে পারে। বরং মায়ের মনে সাহস যোগাতে হবে। খাওয়া-দাওয়া রাত সাড়ে দশটার মধ্যে শেষ হয়ে গেল। মিনমিনে গলায় উৎস বলল, “যাও, শুয়ে পড়ো গে। তেমন বুঝলে দরজাটা খুলে রেখো। আমিও দরজা খুলে রেখেও শোব। আশাকরি কিছু হবে না।” আসলে ও নিজের মনকেই সান্ত্বনা দিচ্ছে।
সুলোচনা চিন্তিত মুখে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। উৎস ঘরে ঢুকে গুমোট গরমটা আরো বেশি অনুভব করল। বাগানের দিকে দুটো জানলা হাট করে খোলা থাকা সত্ত্বেও একফোঁটা বাতাস নেই। জানলার বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকারটা চোখে পড়ল। তখনই মনে পড়ল ছাদের দরজাটা খোলা আছে। ওটা দিয়ে আসতে হবে। কেননা চুরি হতে কতক্ষণ? দালান পেরিয়ে সিঁড়ির বাল্বটা জ্বালাল। সিঁড়িটা দু’ভাঁজ খেয়ে ছাদে উঠে গেছে। বাড়িটা একতলা বলেই গরমটা বেশি মালুম হচ্ছে। ছাদটা সূর্যের আলোয় তেতে উঠেছে। তাত কমতে অনেক সময় লাগবে। অন্য সময় হলে ছাদে একটু পায়চারি করা যেত, কিন্তু এখন সে কথা কল্পনার বাইরে। ছাদে যাবার কথায় বুকটা কাঁপছে। মনের সব শক্তি একত্র করে ঠাকুরের নাম করতে করতে সিঁড়িতে পা দিল। সবথেকে শেষ ধাপে পা দিতেই চোখের সামনে অন্ধকার ন্যাড়া ছাদটা চোখে পড়ল। দরজার পাল্লায় হাত দিল সে। আচমকা নজরে পড়ল বাগানের দিকে ছাদের শেষ প্রান্তটা! মনে হচ্ছে একটা উঁচু বস্তা পড়ে আছে। এটা আবার কে এখানে এনে রাখল? মা তো সিঁড়ির তলার বস্তাগুলো বাগানে রেখে এসেছিল? তাহলে? কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল ওর। ওই সময় ওর কানে একটা সুমধুর গানের সুর ভেসে এল। এতো সুন্দর নারী কণ্ঠ কার? সুরের মূর্ছনায় সারা মনে একটা আবেগ সৃষ্টি হলো তার। চোখে একটা ঘোর লাগল। মনে হলো সারা জীবনভর এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শোনে। সমস্ত মস্তিষ্ক জুড়ে সুর খেলা করে চলল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনে চলেছে মন মাতানো গানের কলি। কোনো চেনাজানা গান নয়। সম্পূর্ণ অজানা এক তাল, লয়, ছন্দ। ও বিভোর হয়ে যায়! একসময় ওর চেতনা জাগ্রত হয়। লক্ষ্য করে সে ছাদের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে। মাথার উপর কালো চাদর বিছানো আকাশটায় ছোট ছোট তারা গুলো জ্বলছে। ছাদে পড়ে থাকা বস্তাটা যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। চাঁদের একফালি আলোয় বোঝা যাচ্ছে বস্তাটা অল্প অল্প কাঁপছে। কিন্তু বস্তাটা ছাদের ধারে ছিল! এতখানি টেনে ছাদের মাঝামাঝি কে নিয়ে এল? অলৌকিক কাণ্ড নাকি? অলৌকিক শব্দটা মাথায় আসতেই ও সাবধান হলো। সোমালীর সুন্দর মুখটা মনের ভিতর ভেসে ওঠে সমস্ত কথা মনে পড়িয়ে দিল। ও বিস্ফারিত চোখে দেখল বস্তার ভেতর থেকে আবছা একটা মূর্তি বেরিয়ে আসছে। ছুটে নিচে চলে যেতে ইচ্ছে করলেও উৎস পারছেনা। কোনো এক অদৃশ্য চুম্বক শক্তি তাকে টেনে রেখেছে। বস্তার ফাঁক থেকে সোমালীর মুখটা উঁকি মারছে। চাঁদের আলোয় ফর্সা মুখটা আরো সাদাটে দেখাচ্ছে। সোমালীর মুখে মরা একটা হাসি। উৎসের পা দুটো ভয়ে কাঁপছে। উবু হয়ে চটের বস্তার মধ্যে বসে থাকা সোমালী আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে উঠল। কত কাছে! যেন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে তারা। একজন মৃত, আরেক জন জীবিত। উৎসের শরীরে কোনো শক্তি নেই। সারা দেহ যেন অবশ হয়ে গেছে। কেননা সোমালীর সুন্দর মুখটা ক্রমশ বীভৎস হয়ে উঠছে। ওর কুটিল হাসিতে ভরা মুখখানা, সাদা দাঁতগুলোতে চাঁদের আলো পড়ে ঝলকানি দিচ্ছে। সোমালী ডান হাতটা তুলে ওকে ইশারায় কাছে ডাকছে। ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে। এক পা বোধহয় আরও এগোল উৎস। এবার হাত বাড়ালেই সে সোমালীর শরীরটা ছুঁয়ে ফেলতে পারে।
উৎসের শিথিল ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্যে একটা যৌন উত্তেজনা জাগ্ৰত হচ্ছে। মনের ভয়টা ক্রমশ কমে যাচ্ছে কোনো অদৃশ্য শক্তির স্পর্শে। সুঠাম দেহের অধিকারী উৎস। তার মনে জেগে উঠছে কামভাব। সোমালীর যৌবনে ভরা দেহটা ওকে আকর্ষণ করছে। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস গভীর ও ঘন হচ্ছে। জিভ বার করে শুকনো ঠোঁটটা চেটে নিল। সোমালী হাতের ইশারা করে আরো কাছে আসতে বললো। সুউচ্চ, সুঠাম বুক দুটো আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। তরতাজা যুবক উৎসের মনে উষ্ণ রক্তের স্রোত। ভয়, আতঙ্ক, বিভীষিকা এক মুহূর্তে মন থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সারা শরীরে যৌবনের আলোড়ন। সামনে একজন পরস্ত্রী, তাছাড়া সে আত্মঘাতী। বেমালুম ভুলে গেছে সে। সোমালীর শরীরের আমন্ত্রণ যে অগ্রাহ্য করতে পারছে না সে। আজ যেন চাঁদের আলোয় সোমালী আরও মোহময়ী হয়ে উঠছে। একপা, একপা করেও অগ্রসর হয় সোমালীর দিকে, সোমালী ক্রমশ পিছু হটছে।
আচমকা পিছন থেকে কে যেন দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। পরক্ষণেই কানের কাছে মায়ের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। “একি করছিস বাপি! একেবারে ছাদের ধারে চলে এসে ঝুঁকে পড়েছিস!” ওকে জাপটে ধরে সুলোচনা ছাদের মাঝখানে টেনে আনে। সম্বিত ফিরে পায় উৎস। যেন এক স্বপ্নের ঘোর থেকে জেগে ওঠে। প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় নেয়। সুলোচনা কান্নার গলায় বলে ওঠে, “ভাগ্যিস তোকে খুঁজতে ছাদে এসেছিলাম! না হলে তোকে আর ফিরে পেতাম না।”
“আ-আমি তো ছাদের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম।” তোতলায় উৎস, ধীরগতিতে ওর ইন্দ্রিয়গুলো স্বাভাবিক হচ্ছে।
“মোটেই নয়। তুই ন্যাড়া ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলিস…। ঠিক সেই সময়ে ধরে না ফেললে…।” কথা শেষ করতে পারেনা সুলোচনা। এখনও তার বুকটা ভয়ে কাঁপছে। মাকে সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে ও বলে, “এবার নিচে চলো, আসলে তুমি পুরনো বস্তাটা ছাদে রেখেছিলে…।”
“কী সব আবোল তাবোল বকছিস?” ছেলের মুখের দিকে তাকায়। “বস্তা আসবে কোথা থেকে?” উৎস ছাদেতে কোনও বস্তা দেখতে পায় না। তাহলে কি ওর চোখের ভুল? সোমালীর ওই ডাক… সেটাও কি মিথ্যে! মাথাটা আবার জট পাকাতে শুরু করেছে। সুলোচনা বুঝলো ছেলের কথাবার্তা ঠিক স্বাভাবিক নয়। যেন কোনো সম্মোহিত মানুষ! ওকে হাত ধরে নিচে নামিয়ে আনে। এই সময় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উৎস চমকে ওঠে। রাত একটা বাজছে, এতক্ষণ ধরে সে একা ছাদে ছিল?
“তুই আমার কাছে শুয়ে পড়।” মিনতির কণ্ঠে বলল সুলোচনা। উৎস না করতে পারল না। কেননা ছাদের ঘটনাটা তার সম্পূর্ণ মনে পড়ে গেছে। সত্যিই যদি মা ছাদে না যেত, তাহলে এতক্ষণে উৎস মৃত। চিন্তা করতেই তার বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল। মা ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। হয়তো ভাবছে অশরীরীকে এভাবে আটকানো যাবে। বিছানায় শুয়ে ছেলের মাথায় হাত দিলো সে, “নে এবার ঘুমিয়ে পড় আমি জেগে আছি।”
“তোমাকে জাগতে হবেনা। আমি এখন ঠিক আছি।” উৎস মিনমিনে কণ্ঠে বলে, তারপর নিজে থেকেই ছাদের ঘটনাটা মাকে বলে। সুলোচনা শিউরে ওঠে। ভয়ে মুখ শুকিয়ে যায়। সারা বাড়িটা নিস্তব্ধ। শুধু পাখা চলার আওয়াজটা কানে আসছে। দুজনেই জেগে আছে। এরকম অবস্থায় কোনও মানুষের ঘুম আসে? সুলোচনা বলল, “রুদ্রনাথ বাবুকে কাল নিয়ে আসা যায়না?” উৎস এ কথাটাই ভাবছিল। কিন্তু গৌহাটি থেকে আসা এত তাড়াতাড়ি সম্ভব নয়। আর এলেই কি সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে? মনের মধ্যে একটা সন্দেহ উঁকি মারছে উৎসের।
“মনে হয় কাল আসতে পারবে না। কেননা গতকাল ট্রেনে চাপলে পরশু এসে পৌঁছবে। সে রকম কথাই ঠিক হয়ে আছে।” উৎসের কথার মাঝেই ছাদে একটা শব্দ হলো। দুজনেই খাড়া হয়ে উঠল। কেউ যেন কোনো ভারি বস্তা টানছে।
“বাপি, ঠাকুরের নাম স্মরণ কর।” ভয়ার্ত কন্ঠে সুলোচনা বলে। একটু পরেই শব্দটা মিলিয়ে গেল। সুলোচনা বিছানা থেকে উঠে বাগানের দিকে জানালাটা বন্ধ করে দেয়। একেই গরম, তার উপর সব জানালা দরজা বন্ধ করতেই ঘরটা যেন বৈদ্যুতিক চুল্লিতে পরিণত হল। পাখার হাওয়া আগুনের হলকার মতো গায়ে এসে বিঁধছে। ঘরে নীলচে আলোটা জ্বলছে।
উৎস বলে ওঠে, “এভাবে সারারাত থাকলে দম বন্ধ হয়ে মরে যাব।” তার সারা শরীরে ঘামের বিন্দু। সুলোচনা কোনো জবাব দিল না। দুজনের মনেই আশঙ্কার কালো মেঘ। কখন ভোর হবে সেটাই একমাত্র চিন্তা। চিন্তা ভাবনায় কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল নেই। বাইরের সদর দরজায় কলিংবেলের শব্দে সুলোচনা চোখ মেলে তাকাল। ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে আটটা দশ মিনিট। জানলার কাঁচের শার্সিতে রৌদ্র লুটোপুটি খাচ্ছে।
সুলোচনা বুঝল মধুর মা কাজ করতে এসেছে। তড়িঘড়ি উঠে সে সদর দরজা খুলে দেয়। মধুর মা বলে ওঠে, “বাবা এই গরমে এত অবেলায় ঘুমাচ্ছ কী করে?” জবাব না দিয়ে মুখ ধুতে বাথরুমে ঢুকে যায়। যাবার আগে ঘরের জানলাগুলো খুলে দিয়ে যায়। বাইরের বাতাস আসুক। ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক উঠলেই তো ওই ভয়ঙ্কর চিন্তা কুরে কুরে খেতে শুরু করবে।
