পঞ্চম পৰ্ব
উৎসের ফোনটা বার তিনেক রিং হবার পর ঘুম জড়ানো চোখে ও ফোনটা ধরল রান্নাঘর থেকে সুলোচনা ফোনের রিং শুনতে পাচ্ছিল কিন্তু ও জল খাবার করছিল বলে আসতে পারেনি। সুজিত সেনের গলা ভেসে এলো।
“তুমি কি কোন কাজে ব্যস্ত?”
“না না বলুন” ঘুম ছেড়ে যায় চোখ থেকে।
“একটু আগে রুদ্রবাবুকে স্টেশন থেকে নিয়ে এলাম উনি বিকালে তোমার মাকে নিয়ে আসতে বলে দিয়েছেন অবশ্যই আসবে।” উৎসের মুখে স্বাভাবিকতা ফিরে এলো।
“নিশ্চয়ই যাবো।” ও কালকে রাতের কথাটা বলতে যেতেই ও প্রান্ত থেকে সুজিত থামাল।
“এখানে এস। সব ঘটনা রুদ্র বাবুও শুনবেন। তাই দুবার কষ্ট করতে হবে না কেননা আমাদেরও কালকের রাত ভালো কাটেনি।আচ্ছা রাখছি। তাহলে বিকেলে দেখা হচ্ছে।”
লাইন ছেড়ে দিল সুজিত সেন। উৎস বুঝল রুদ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় কে নিয়ে ব্যস্ত আছে ভদ্রলোক। ও দেখল মোবাইলে ফুল চার্জ হয়ে গেছে বেলা দশটা বেজে গেছে ও বাথরুমের দিকে এগোলো মনের মধ্যে দ্বিধা এখনো যায়নি কায়মনোবাক্যে কামনা করছে যেন রুদ্র পন্ডিত এই কাজে সাফল্য লাভ করে না হলে তার জীবনে নেমে আসবে অমাবস্যার অন্ধকার। মায়েরও অবস্থা করুন হবে।
জলখাবারে মাত্র একটা রুটি খেলো উৎস। খিদেটা একদম মরে গেছে। মাকে বললো বিকেলে যাওয়ার কথা।সুলোচনাও সেটাই চাইছিল কারণ তার মনের ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে এর থেকে পরিত্রান চাইছে। এরপরে যদি অতৃপ্ত আত্মা আরো শক্তিশালী আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে ভাবতেই হাত পা শিথিল হয়ে যাচ্ছে।
বিকালে ওরা দুজন এসে উপস্থিত হল সুজিত সেনের বাড়িতে। উৎসের মনে কৌতূহল–রুদ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় কে সামনে থেকে দেখার। মানুষ দেখলেই খানিকটা বোঝা যায় তার মধ্যে ক্ষমতা কতখানি। বৈঠকখানার চেয়ারে বসা রুদ্র পন্ডিতকে দেখে তার উৎসাহ অনেকটা কমে গেল।
সুলোচনাও অবাক হল ওরকম সাদামাটা এক ভদ্রলোককে দেখে। সুজিত সেন অবশ্য আগেই বলেছিল উৎসকে। রুদ্রনাথ চেয়ারে কোলকুজো হয়ে বসে ছিলেন। ফর্সা স্লিম চেহারা লম্বায় প্রায় ছ ফুট হবে।মাথায় লম্বা লম্বা কাঁচাপাকা চুল পর্যন্ত বিস্তৃত।টিকালো নাক। গোঁফ দাড়ি নিখুঁত করে কামানো।
চোখ দুটো যেন বৃষ্টিধোয়া অসম্ভব রকমের উজ্জ্বল অন্তভেদী দৃষ্টি মনে হয় চোখে ক্যামেরা ফিট করা আছে এক লহমায় দেখলে ভদ্রলোকের বয়স আন্দাজ করা খুব কঠিন। পঞ্চাশও হতে পারে আবার সত্তরও হতে পারে।
সুজিত সেন বলে উঠলেন, ইনি হলেন তারা মায়ের পূজারী অসীম ক্ষমতার অধিকারী শ্রী রুদ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়-” গম্ভীর স্বরে বাধা দিলেন।
“আমি সামান্য একজন মায়ের ভক্ত। সুজিতের স্বভাব একটু বাড়িয়ে বলা। “কথার মধ্যে একটা আকর্ষণ আছে।
একেবারে আসল কথায় চলে এলেন তিনি। উৎস বুঝল উনি আজেবাজে কথায় সময় নষ্ট করার মতো লোক নন যে কোন গুনীন তান্ত্রিক ভালবাসে তার নাম গান করা কিন্তু ইনি এককথায় সেটা থামিয়ে দিলেন যেন তার কথাটাই নির্দেশ সুজিত বাবু চুপ করে গেলেন ঘরেতে সবাই বসে আছে। রোহিত আড় চোখে উৎস কে দেখছে কেননা এই প্রথম দেখলো তার মনে সন্দেহ প্রকট হয়ে উঠল। সোমালীর সঙ্গে এর সংগে প্রেম থাকলেও থাকতে পারে কারণ উৎস কে দেখতে খারাপ নয় রোহিতের থেকে অনেক গুণ ভালো।
রুদ্রনাথ শিরদাঁড়া সোজা করে বসলেন-” আমি কিছু কিছু ঘটনা সুজিতের মুখ থেকে শুনেছি রোহিতও এর মধ্যে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে” উৎসের মুখের দিকে তাকালেন তিনি। উৎসের মনে হলো উনার চোখ দুটো উৎসের চোখ ফুড়ে গভীরে ঢুকে গেল। সে সম্মোহনের মত তার দিকে তাকিয়ে রইল। এক মিনিট তাকিয়ে ছিলেন তিনি। এর মধ্যেই রুদ্রনাথের কপালে ভাঁজ পড়ল। ঘরের সবাই চুপ।
তিনি চোখ সরিয়ে নিলেন উৎসের দিক থেকে তারপর ভারিক্কি গলায় বললেন, “তুমি কাল রাতের ঘটনাটা আমাদের বল।”উৎস শুরু করলো ঝড় জল রাতের ভয়ার্ত কাহিনী। রুদ্রনাথ গরমের জন্য খাকি রঙের পাঞ্জাবিটার হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রেখেছিলেন। সাদা পাজামাটা একটু টেনে নিলেন। উৎস বলে চলেছে ভয়ঙ্কর ঘটনা টা একমনে সবাই শুনছে মিনিট পাঁচেক বাদে ওরা বলা শেষ হলো।
প্রত্যেকের মুখেই ভীতির চিহ্ন। একমাত্র রুদ্রনাথ বাদে তার মুখে চিন্তার জাল। চোখ বুজে কিছু ভাবলেন তারপর কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন–খুবই চিন্তার ব্যাপার সমস্ত ঘটনা শুনে আমার মনে হচ্ছে এই বাড়ি থেকেই সোমালি কোনও প্রেতাত্মার কবলে পড়ে কিন্তু উৎস যখন দিনের আলোয় সোমালীকে দেখেছে তার মানে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারীনী হয়েছে সোমালী। নাহলে সূর্যের আলোয় দেহ ধারণ করা সম্ভব নয়।”
ঘরেতে শ্মশানের নীরবতা বিরাজ করছে।
“উৎসের কথা মত গানের সুর সে শুনতে পেয়েছে। এই কথাতে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে। বিশেষ শ্রেনীর প্রেতিনির কথা “ সবাইয়ের চোখ রুদ্রনাথের দিকে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা তে পা দিতে চলেছে ধরিত্রী। রোহিত উঠে দাঁড়ায়।
“আমি একটু আসছি” ও ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সুলোচনা এই প্রথম মুখ খোলে।
“বাবা- উৎস আমার একমাত্র ছেলে। সংসারের উপার্জন কারী বলতে ও একাই। আপনি কিছু একটা বন্দবস্ত করুন।” কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে। চিন্তা মগ্ন মুখে রুদ্রনাথ ঘরের কড়ি কাঠের দিকে তাকায়। তারপর সুজিতের দিকে তাকিয়ে বলেন
“তুমি যে মৃত্যু সময় টা আমায় বলেছিলে–তাতে আমি দেখেছি তোমার পুত্র বধূ মৃত্যুর সময় অনেক দোষ পেয়েছিল।শ্রাদ্ধ শান্তি করেছ ঠিক ই কিন্তু দোষ গুলো কাটেনি। “ সুজিত হাতে হাত ঘষে বলে, আপনি বলুন কি কি করতে হবে? কেননা এই ছেলেটির সঙ্গে আমরাও খুব একটা ভাল নেই। কালকের কথা আপ নাকে বলেছি। রোহিত আর আমিও খুব সুখে নেই। গতকাল রাতে ঘুমের ঘোরে রোহিত ও খুব ভয় পেয়েছে।”
এই সময় রোহিত ট্রে তে করে চা আর বিস্কুট নিয়ে ঘরে ঢুকল। উৎস বুঝল–ও নিজেই বানিয়ে আনল। কেননা এদের বাড়ীতে রান্নার লোক নেই। রোহিত বোধ হয় বাইরে থেকে রুদ্রনাথের কথা শুনেছিল তাই বলল, “ দিল্লি তে থাকার সময় আমি কিছু অনুভব করিনি। কিন্তু এখানে এসেই–”
কথা শেষ না করে সবাইয়ের হাতে চা বিস্কুট তুলে দিল। চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে রুদ্রনাথ বললেন, “ আমি চেষ্টা করব যথাসাধ্য প্রেতযোগী থেকে সোমালী কে মুক্ত করার। যদি করতে পারি তমাদের সবার বিপদ ই কেটে যাবে।”
উৎস হটাত বলে ওঠে, “ আমি ভেবে পাচ্ছিনা–আমি কেন এই ঘটনায় জড়িয়ে পড়লাম?”
* * *
রুদ্রনাথ উৎসের দিকে চেয়ে বললো, “আমি যা বলি স্পস্ট করে বলি, হয়তো তোমাদের খারাপ লাগতে পারে। সত্যি কথাটা খুলে বলাই আমি পছন্দ করি।” ওনার কথার মানে তো কেউ বুঝতে পারলো না। ওদের মুখ দেখেই বুঝতে পারলেন তিনি।
“তুমি যেদিন সোমালীকে প্রথম দেখলে, তখনই তোমার সোমালীর সুন্দরতার উপর একটা টান অনুভব করে। সেই টানেই সে তোমাকে কব্জা করে ফেলেছে। কারণ সোমালীর যৌবনেই তার ওপর নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া, অতৃপ্ত সে। এই অতৃপ্ততা তাকে সুঠামদেহী পুরুষকে আকৃষ্ট করে। কেননা মানুষ মৃত্যুর পরেও তার ‘স’কার বোধ থেকে সহজে মুক্তি পায় না।” উৎস ঢোক গিললো। বর্ণে বর্ণে সত্যি বলেছেন রুদ্রনাথ, একটা বিশ্বাস তার মনে উদয় হলো। এরপর রুদ্রনাথ রোহিতের দিকে ফিরলো।
“হয়তো তোমাকে সে ঠিক পছন্দ করতে পারেনি। বাবা-মায়ের চাপে বলতেও পারে নি। তোমাকেই মেনে নিয়েছিল বাধ্য হয়ে। তবে সবথেকে ভুল করেছে তোমার বাবা।” সুজিত বাবু অবাক দৃষ্টিতে তাকায়।
“ঠিক তাই।” সুজিত সেনকে লক্ষ্য করে বলেন।
“সোমালীর যখন আত্মহত্যা করার প্রবণতা জাগে, এটা জেনেও তোমরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতে। হয়তো অকালে তার প্রাণটা নাও যেতে পারতো। সেই করলে যোগাযোগ, তবে অনেক বিলম্বে।” চায়ে শেষ চুমুক দেন তিনি। সুজিত মাথাটা নীচু করে থাকে।
“ঠিকই বলেছেন।” অনুতপ্ত কন্ঠে সুজিত বলে। “প্রথমে বুঝতেই পারিনি। এটা কোনও অশরীরি কাণ্ড। হয়তো আমার স্ত্রী বেঁচে থাকলে আগেই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতো।”
“হয়তো নয়, সে করতোই।” জোরের সঙ্গে বলে রুদ্রনাথ। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বলে। “যাক, গতস্য শোচনা নাস্তি। বরং এখন যেটা করার প্রয়োজন, সেটাই আমাকে করতে হবে।”
“সন্ধ্যা নামছে। চলো ঠাকুর ঘরে গিয়ে বসি, সকাল থেকে এতক্ষণ পর্যন্ত বাড়িতে থেকে যা বুঝেছি, সোমালীর সূক্ষ আত্মা এখানে খুব কম সময় থাকে। তার মনোযোগ উৎসের প্রতি। সে সর্বক্ষণ তার কাছাকাছি আছে।”
কথাটা শুনে মা ও ছেলে ভয়ে চমকে ওঠে। সুলোচনা হাতজোড় করে বলে, “বাবা আপনি এই বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করুন। আমার আর চিন্তা শক্তি কাজ করছে না।” এবার কেঁদেই ফেললো সে। রুদ্রনাথ সুলোচনার মাথায় হাত রেখে বললেন, “মা আমি যখন এতদূর এসেছি, যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। বড় একটা এসব কাজে আমি থাকি না বা করি না। মায়ের সাধন-ভজনেই ব্যস্ত থাকি।” এবার সুজিত রুদ্রনাথের দিকে তাকিয়ে অনুনয়ের সুরে বললো, “বুঝতে পারছি আমি দেরী করে ফেলেছি। আরও বিপদ ঘটার আগে আপনি একটু আমাদের দয়া করুন।”
রুদ্রনাথ দাঁড়িয়ে উঠলো। “প্রথম কাজই হলো তোমাদের রক্ষাকবচ পরানো। এরপর বাড়ি দুটোই বাঁধতে হবে। তোমরা ঠাকুর ঘরে গিয়ে বসো। আমি আমার গেরুয়া বসন পড়ে আসছি।” ওদের নিয়ে সুজিত দোতলায় ঠাকুর ঘরের দিকে পা বাড়ালো। কয়েক মিনিট বাদেই রুদ্রনাথ ঠাকুর ঘরে এলেন। পরণে গেরুয়া রঙের কাপড় গায়ে আর গেরুয়া রঙের ফতুয়া। এই পোশাকে কয়েক মুহূর্ত আগে দেখার মানুষটার আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেন এক দণ্ডায়মান মহাপুরুষ। পুজোর আসনে বসতে বসতে বললেন, “কবজগুলো বানাতে একটু সময় লাগবে, এই কবজ ধারণ করে থাকলে বিদেহী আত্মারা কাছে ঘেঁষতে পারবে না।” সবাই মন থেকে সেটাই চাইছে। সুজিত বাবু ইশারায় রোহিতকে কিছু বললো। ও উঠে দাঁড়িয়ে বললো, “আমি এক্ষুনি আসছি।” সুজিত বাবু ওদের দিকে তাকিয়ে বললো, “বাড়ি যেতে দেরি হয়ে যাবে। তোমরা আজ রাত্রে এখানেই খেয়ে যেও। অমত করো না।” ওরা রাজি হলো।
“সব থেকে ভালো হয় আজ রাতটুকু ওরা এখানেই থেকে যাক। “ বক্তা স্বয়ং রুদ্রনাথ, “কেননা ওদের বাড়ী এখনও বাঁধা হয়নি। সেই কারণে অশুভ শক্তিরা আজ আপ্রাণ চেষ্টা করবে কোনও ক্ষতি করার। শরীরে স্পর্শ করতে না পারলেও বিভিন্ন অলৌকিক ক্রিয়ার মাধ্যমে ওদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে পারে, বিপদ ঘটতে সময় লাগবে না। “ মা ও ছেলের মনে ভয় এমনিতেই দানা বেঁধেছিলো, সেটা আরও গভীর রূপ নিলো। ওদের দুজনেরই বাড়ি যেতে মন চাইছিলো না। বিশেষ করে কথাগুলো শোনার পর, সেইজন্য সানন্দে রাজি হলো ওরা।
রুদ্রনাথ বললেন, “আজ সারারাত আমি পুজোতে ব্যস্ত থাকবো। অবশ্য তোমাদের থাকার প্রয়োজন নেই।” সঙ্গে নিয়ে আসা ঝোলার ভেতর থেকে পুজোর আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রগুলো তিনি বার করতে থাকলেন। সুজিত প্রশ্ন করলো, “রাত্রে আপনি কিছু খাবেন না?”
“না। তোমরা খেয়ে নিও।”
উৎসের মনে এখনো সন্দেহ দানা বেঁধে আছে। উনি পারবেন তো দুষ্ট আত্মার হাত থেকে তাদের রক্ষা করতে? মনের সন্দেহ শত চেষ্টাতেও দূর হচ্ছে না। রুদ্রনাথ লাল রঙের সুতো গুলো খুলতে খুলতে বললেন, “তন্ত্রের সাধনার দ্বারাই এইসব খারাপ শক্তি বা নেগেটিভ এনার্জিকে দূর করতে হয়। আজকালকার ছেলেমেয়েদের মনে এসব নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে। তারা ভাবে সব বুজরুকি-মিথ্যে। সন্দেহ করে সবেতেই। সন্দেহ থাকা ভালো, না হলে তন্ত্রের আসল রূপ অনুধাবন করা যায় না।” উৎস অবাক হলো, তার মনের কথা কিভাবে পড়ে ফেললেন উনি।
“তন্ত্র কাকে বলে?” নিজেকেই নিজে যেন প্রশ্ন করে।
রুদ্রনাথ। “যে শাস্ত্রের দ্বারা তনু বা শরীরকে রক্ষা করা যায়, অথবা মানব কল্যাণের জন্য যে সাধনা তাকেই বলে তন্ত্র। তন্ত্র প্রণেতা স্বয়ং ভগবান মহাদেব। মন্ত্র কি? মন + এ = মন্ত্র, এক কথায় বললে মন্ত্র হলো দেহ-মনের রক্ষাকবচ। কিছু বিশেষ বিশেষ অক্ষর ও শব্দের এমনই সংগঠন আছে, যাকে বারবার উচ্চারণ করলে তার সংঘর্ষ আবহাওয়ায় বিশেষ প্রকার বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়ে সাধকের ইঙ্গিত ভাবনাচিন্তাকে অভিষ্ঠ উদ্দেশ্যে পুষ্ট করতে থাকে। এই হলো মন্ত্র।” রুদ্রনাথের কথাগুলো সবাইয়ের মনে এক অদ্ভুত শক্তির রচনা করতে থাকে। উৎস আর সুলোচনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো রুদ্রনাথের কথাগুলো শুনতে থাকে।
“কথাগুলো এই জন্য বলছি যে, যাতে তোমাদের মনের অন্ধতা খানিকটা দূর হয়। হৃদয়ে আধ্যাত্মিক শক্তি জাগরিত হয়। যাকে বলে পজিটিভ এনার্জি। তোমাদের কি সবার গুরু দীক্ষা নেওয়া হয়ে গেছে?” রোহিত আর উৎস ছাড়া, দুজনে মাথা নাড়ে। সেদিকে তাকিয়ে পুরনো কথার জের টানেন তিনি।
“অনেকেই জ্যোতিষী বা তান্ত্রিকদের কাছে গিয়ে উপকার পায় না। ধরো তোমাদের কোন কবজ বা মাদুলি দেওয়া হলো। যেমন আমি রক্ষাকবচ দেবো। কিছুদিন বাদে দেখলে সেই মাদুলি বা কবজ কাজ করছে না। এর একটাই কারণ, যে জ্যোতিষী বা তান্ত্রিক তোমাকে মাদুলি দিয়েছে তার মন্ত্রে কোন জোর নেই। মন্ত্রকে শক্তিশালী করতে গেলে মোটামুটি সাত থেকে আট বছর সময় লাগে কিন্তু তার আগেই টিভিতে বা পেপারে বিজ্ঞাপন দিয়ে সবাই বড়ো বড়ো জ্যোতিষী বা তান্ত্রিক বনে যান। কেউ পাঁচ মিনিটে বশীকরণ করান, কেউ বা আবার ত্রিকালদর্শী হয়ে চব্বিশ ঘণ্টায় সব কাজ উদ্ধার করে দেবেন বলে। এরা সব লোকনাথ বাবা, বামাক্ষ্যাপা, রামকৃষ্ণদেবের থেকেও নিজেদের বড় সাধক মনে করে। সেই জন্যই আজ অনেকের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়। অনেকে এদের ভন্ড বলে মনে করে। যেটা ভাবা স্বাভাবিক।”
রুদ্রনাথের প্রতিটি কথার মধ্যে যুক্তি আছে। ধীরে ধীরে উৎস আর রোহীতের মনে রুদ্রনাথ সম্বন্ধে ভক্তিভাব জেগে ওঠে। মনের অন্ধকার ভেদ করে একটা আলো জ্বলে ওঠে।
“তন্ত্র ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু গভীর তার অন্তর্নিহিত অর্থ। তন্ত্র হলো এক বৃহৎ ও অতিপ্রাচীন গুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় বিষয়। মুক্ত বিশ্বকোষ বলা আছে, তন্ত্র হিন্দু সমাজে প্রচলিত ঈশ্বর উপাসনার একটি পথ বিশেষ। শিব ও মহাশক্তির উপাসনা সংক্রান্ত শাস্ত্রগুলিকেও তন্ত্রসাধনা নামে অভিহিত করা হয়। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, এই মহাবিশ্ব হলো শিব ও মহাশক্তির দিব্য লীলা। তন্ত্রে যে সব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতির বর্ণনা রয়েছে তার উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে অজ্ঞানতার হাত থেকে মুক্তি দেওয়া।” থামলেন রুদ্রনাথ, হাতে তৈরী লাল সুতো দেওয়া মাদুলি চারটে তৈরি হয়ে গেছে। ঝোলার ভেতর থেকে সিঁদুর মাখানো একটা করোটি অতি সন্তর্পনে বার করে, একটা পিতলের থালার ওপর রাখলেন। উৎস বিস্মিত চোখে হলদেটে-মার্কা করোটিটা দেখতে লাগলো। সারা ঘর নিস্তব্ধ। সুজিত বললো।
“আপনি বললেন—এক বিশেষ শ্রেণীর প্রেতিনির আবির্ভাব হয়ে…।”
“উৎসের কথামতো, অর্থাৎ ও বলেছিলো সুরেলা গান সে শুনেছে। উৎস মাথা নাড়ায়। কেননা সেই সুমধুর কন্ঠ এখনও কানে ভাসছে।
“এক ধরনের আত্মা আছে-এদের ইয়েল বলে। এরা সুন্দরী যুবতীর রূপ ধরতে পারে। সুমধুর কন্ঠে গান গেয়ে ও রুপ দেখিয়ে পুরুষদের আকৃষ্ট করতে পারে। কারো মতে ইয়েলরা হলো সেইসব নারীদের আত্মা, যাদের জীবিতকালে কোনও কারণে অভিশপ্ত করা হয়েছে বা মনের সব আশা আহ্লাদ পূরণ হয়নি।”
রুদ্রনাথের কাছ থেকে নতুন অনেক তথ্য জানা যাচ্ছে। যা ইতিপূর্বে তাদের অজানা। যত শুনছে, ওদের মনে রুদ্রনাথ পণ্ডিতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জন্মাচ্ছে। উৎসের মন এখন বলছে- ইনি পারবেন তাদের মহাবিপদ থেকে উদ্ধারের পথ দেখাতে। মাদুলি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রুদ্রনাথ। মুখে বিড়বিড় করে অনবরত মন্ত্রপাঠ করতে শুরু করলেন। মাদুলিতে কিছু সাদা গুঁড়ো ঢোকালেন, তারপর মন দিয়ে মুখটা বন্ধ করে দিলেন। এরপর করোটিতে ছোঁয়ালেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা-ই করলেন। সুজিত বাবুর দিকে চেয়ে বললেন, “আজ রাত্রে তোমরা নিরামিষ আহার করো।” রোহিত বলে উঠলো, “হোম ডেলিভারীতে নিরামিষই বলা হয়েছে।” সন্তুষ্ট হয়ে ঘাড় নাড়লেন তিনি।
“আমি এবার আধঘন্টা মতো জপ করবো। তোমরা ইচ্ছে করলে বাইরে যেতে পারো। কারন এখানে গরমে কষ্ট হবে।” রুদ্রনাথ পণ্ডিতের ফতুয়াটা ঘামে জবজব করছে। সুলোচনা বলে উঠলো, “বাবা আমি এখানেই থাকবো। খুব ভাল লাগছে। মনে একটা শান্তি পাচ্ছি।”
“বেশ তাই হোক, তবে কোনও কারণে বিচলিত হবে না। কেননা আমি ধ্যান জপের মাধ্যমে চেষ্টা করব অপশক্তিকে দূর করবার। যদি না পারি তখন অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে।” ওরা সবাই বসে রইলো। সবে সন্ধ্যে সাতটা বাজে, রোহিত জানে হোম ডেলিভারী দিতে আসবে সাড়ে আটটার সময়।
“ভালো কথা-সুজিত।” রুদ্রনাথ বলে। “সকালে যে ফদটা দিয়েছিলাম তোমায় যত্ন করে রেখেছো তো? কাল সকালে ফর্দ অনুযায়ী জিনিসগুলো আমাকে এনে দেবে।”
“নিশ্চয়ই।” সংক্ষিপ্ত গলা সুজিতের। রুদ্রনাথ পদ্মাসনে বসে চোখ বুজলেন। ধীরে ধীরে সমস্ত শরীর তার স্থির হয়ে গেলো। বিস্ময়ের সঙ্গে ওরা দেখলো- যেন একটা পাথরের শরীর আসনে বসে আছে। মিনিট দশেক বাদেই ওদের কানে একটা কান্নার শব্দ ভেসে এলো, কোনও অল্প বয়সী মেয়ে করুণ সুরে একটানা কেঁদে চলেছে। কান্নার মধ্যে দুঃখ ঝরে পড়ছে। কান খাড়া হয়ে গেলো সবার। খালি বাড়িতে কান্নার শব্দ গুমড়ে গুমড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোথা থেকে আসছে বোঝা যাচ্ছে না। কখনো মনে হচ্ছে সোমালীর ঘর থেকে, আবার কখনও বা নিচের দালান থেকে। রুদ্রনাথ এখানে উপস্থিত না থাকলে ওরা ভয় হার্ট ফেল করতো। রুদ্রনাথ পণ্ডিতের সাবধানবাণী সবাইয়ের মনে পড়ে গেলো। কোনও কারনে বিচলিত হবে না। ওরাও হাতজোড় করে চোখ বুজে বসে যে যার ঠাকুরের নাম জপ করতে শুরু করলো।
ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্নাটা ক্রমশ চাপা আক্রোশে পরিণত হচ্ছে। আক্রোশ থেকে গর্জনে…। মনে হচ্ছে কেউ যেন সিলভারের হাঁড়ির ভেতর মুখ ঢুকিয়ে চেঁচাচ্ছে।
ঠাকুরঘরের দরজাটা খোলা। এবারে মনে হলো ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে কেউ নেমে আসছে। ওদের মুখে ভয়ের ছাপ পড়লো। মনের জোর রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে ওরা। এত জোরে কান্নার শব্দ কি রুদ্রনাথের কানে ঢুকছে না? উনি নিশ্চল, স্থির, মুখটা সম্পূর্ণ শান্ত। যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এই জগতেও যেন তিনি নেই। সাধনা কি একেই বলে!
সিঁড়িতে পায়ের শব্দটা থেমে গেলো। পা টিপে টিপে কেউ একতলায় নেমে গেলো। তারপর সব নিশ্চুপ হয়ে গেলো। আরও কিছুক্ষণ বাদে রুদ্রনাথ চোখ মেললেন। গরমে সবাই জবজব করছে, আশ্চর্যজনকভাবে ওরা লক্ষ্য করলো রুদ্রনাথ পন্ডিতের সারা শরীরে একফোটা ঘাম নেই। কপালে নেই কোন বিন্দু বিন্দু ঘামের চিহ্ন। সুলোচনার মনে হলো- ইনি সত্যিই আধ্যাত্মিক পুরুষ এবং অসীম ক্ষমতার অধিকারী।
কঠিন গলায় উনি বলে উঠলেন, “তোমার পুত্রবধূ সোমালীর শরীরে দুষ্ট আত্মা এ বাড়ি থেকেই প্রবেশ করে। তোমার ছাদের চিলেকোটায় আছে সেই শক্তিশালী আত্মা। যেহেতু রাশ হালকা ছিলো, অতি সহজে গ্রাস করতে পারে। তোমার স্ত্রী যে অত রুগ্ন ছিলো, সেও একই কারণে। আমার মাদুলি পড়ার পর কিছুটা ভালো হয়েছিল। কিন্তু অনবরত অশুভ শক্তির সংস্পর্শে থাকলে তাবিজের গুনও নষ্ট হয়ে যায়। আমি জানলে ব্যবস্থা করতে পারতাম। চেষ্টা করতাম ওকে এখান থেকে তাড়াবার, কিন্তু ফললাভ হলো না। সোমালীর আত্মা পর্যন্ত এখানে থাকতে না পেরে উৎসদের বাড়িতে আছে। তাই অতি সহজে এরা কথা শুনবে না।” সবাইয়ের চোখে নিরাশা খেলা করতে লাগলো।
সুজিত শুকনো গলায় বললো, “তাহলে এখন আমাদের কি করনীয়?” উনি চিন্তামগ্ন মুখে মাদুলিগুলো প্রত্যেকের হাতে পরিয়ে দিতে দিতে বললেন, “কাল ভৈরভ সাধনা করতে হবে।” সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো। উৎস এই সাধনার নাম কোনদিন শোনেনি। সুলোচনা শুনেছে, কিন্তু চোখে কখনো দেখেনি।
রোহিত থাকতে না পেরে বলে ওঠে, “সেটা কি?”
রুদ্রনাথ পন্ডিত বলে উঠলো, “সে এক শক্ত সাধনা। মহাদেবের আরেক রূপ হলো কাল ভৈরব। তন্ত্র সাধনা যারা করেন, তারা মহাদেবের এইরূপটিরই আরাধনা করেন। সুজিতের মুখ থেকে যতটুকু শুনেছিলাম, তখনই আমার মনে হয়েছিল এই প্রেতকে তাড়াতে গেলে এই সাধনাই আমাকে করতে হবে। সেই অনুযায়ী সব ব্যবস্থা করে এখানে এসেছি। কাল সকালে আমি সাধনায় বসবো। আরো কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস লিখে দেবো।” একটু কাশলেন পন্ডিত। তারপর রোহিতের দিকে ফিরে বললেন, “ভগবান শিবের এই রুদ্র অবতারের পুজো যারা করে জীবন নিয়ে কোনও চিন্তা থাকে না। মা তারার পূজোর সাথে আমিও কালভৈরবের সাধনা করেছি। কালভৈরবকে শিবের অংশ হিসেবে মনে করা হয়। কালভৈরবের পুজোর দ্বারাই ভুত, প্রেত, পিশাচ বা অপশক্তির হাত থেকে বাঁচা যায়। গ্রহদোষ বা কেতুর অশুভ প্রভাব নষ্ট হয়ে গিয়ে শুভদৃষ্টি প্রাপ্তি হয়। শনির সাড়ে-সাতি কেটে যায়। সব সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে এ পুজো অত্যন্ত কঠিন, সারাদিন উপবাসে থাকতে হয়। কালভৈরবের বিভিন্ন রূপ আছে। যেমন- বটুক ভৈরব, রুদ্র ভৈরব, অস্তিনাগ। এই পুজো দুই উপায়ে করা যায়। স্বাত্তিকভাবে আবার তামসিকভাবে। আমি স্বাত্তিকভাবেই করবো।” একটু থামলেন তিনি, রুদ্রনাথের অপার জ্ঞান দেখে সবার মাথা নুইয়ে এলো।
“কালভৈরব বিষয়ে একটু জেনে রাখা ভালো। পুরান মতে একবার ব্রহ্মা এতটাই দাম্ভিক হয়ে উঠেছিলেন যে নিজ দায়িত্ব পালন করা থেকে বেশির ভাগ সময় বিরত থাকতেন। তার মনে হতে শুরু হয়েছিলো, তিনি সর্বশক্তিমান। তাই যাই করুন না কেন কেও তাঁর কিছু করতে পারবে না। ভগবান ব্রহ্মার এমন দম্ভ দেখে অবাক দেবাদিদেব সিদ্ধান্ত নিলেন, সময় থাকতে থাকতে যদি ব্রহ্মার দম্ভের বিনাশ করা না যায়, তাহলে সমূহ বিপদ। কিন্তু কিভাবে করবেন এই কাজটি?
এমনটা ভাবতে ভাবতে নীলকন্ঠ এতটাই রেগে গেলেন যে, তাঁর ক্রোধ থেকে জন্ম নিলো এক রুদ্র অবতার। কালভৈরব। দেবের ভয়াল বিকট এইরূপই অবশেষে নখের আঘাতে ব্রহ্মার পাঁচ মাথার মধ্যে একটা মাথা ছেদ করে তাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। দম্ভের ফল হয় বিনাশ, কালভৈরবের হাতে থাকে ব্রহ্মার সেই মাথার খুলি। প্রাচীন গ্রন্থে তাঁকে “ব্রহ্মাকল্পা” নামেও ডাকা হয়ে থাকে। মহাদেবের কালভৈরব রুপের শরীরে কোন বস্ত্র থাকে না। তার বাহন হল কালো কুকুর। অনেকে বিশ্বাস করে যে নিয়মিত কালো কুকুরকে খাবার খাওয়ালে কালভৈরব খুশি হন। এবং নানাবিধ সুফল পাওয়া যায়।” একটানে ঘটনাটা বলে রুদ্র পন্ডিত থামে। ওদের মনে একটা ভক্তিভাব জন্মায়। রুদ্রনাথ উঠে দাঁড়ায়। “এবার নীচে চলো, আমি একটু বিশ্রাম নিয়ে গভীর রাত্রে পুজোয় বসবো। মা তারাকেও একবার স্মরণ করা দরকার। চারিদিকে আটঘাঁট বেঁধে এই প্রেতাত্মাদের শক্তিহীন করতে হবে।” সকলে নীচে চলে আসে। উৎস চারপাশে তাকায়, বাড়িটাতে বিজলি আলোর বড়োই অভাব। আসলে পুরনো বাড়ি বলেই আলোর উজ্জ্বলতা অনেক কম। এর ফলেই ভয়টা শরীরে দানা বাঁধে। পরক্ষণেই হাতের বাহুতে বাঁধা রক্ষাকবচটা দেখে মনে হারানো শক্তিটা ফিরে আসে। ও রুদ্রনাথের সঙ্গ ছাড়তে চাইছে না। ওনার প্রতি একটা বিশ্বাস জন্মে গেছে। অনেক জ্ঞানের অধিকারী। প্রথমে দেখে বোঝা যায়নি, এতো ঐশ্বরিক ক্ষমতা সম্পন্ন পুরুষ।
