অপরাজেয় – ৬

ষষ্ঠ পর্ব

খাওয়া-দাওয়া সেরে ওরা একটা ঘরে এলো। সুজিত বাবু বললো,” এই ঘরে রাতটা কাটিয়ে দিন।”জবাবে সুলোচনা বলল, “আপনাদের খুব কষ্ট দিলাম”।

“মোটেই না বরং পার্সেল ডেলিভারি দিতে সে আপনার ছেলেই বিপদে পড়ল।” শুভরাত্রি জানিয়ে ও বেরিয়ে গেল। বেশ বড় ঘরখানা। অবশ্য বাড়িতে অনেক ঘর। সবই তালা বন্ধ পড়ে আছে। মা ও ছেলে দুজনে শুয়ে পড়ল গতকাল রাত্রে ভালো ঘুম হয়নি দেখা যাক আজ রাত্তিরে আবার কি হয়?

উৎস মাকে জিজ্ঞেস করল, “ তোমার কি মনে হচ্ছে উনি পারবেন বিপদ থেকে উদ্ধার করতে?”

“নিশ্চয়ই পারবেন। কয়েক ঘণ্টায় সে বিশ্বাস আমার হয়েছে। ইতিমধ্যে আমার বুকে পুরনো সাহসটা ফিরে এসেছে।”সুলোচনা’র কন্ঠে দৃঢ়তা।

“একমত তোমার সাথে সঙ্গে। কবচ টা বাধার পর থেকেই মনটা শান্ত লাগছে গত কয়েকদিন চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে গিয়েছিল এখন ঘুম পাচ্ছে।”

“বাপি কাল যেমন করে পারিস ওনাকে নিয়ে গিয়ে আমাদের বাড়িটা প্রেতাত্মার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বাঁধিয়ে নিতে হবে।”

“নিশ্চয়ই আমি সুজিত বাবু কে বলব।” হাই তোলে উৎস।

“ঘুমিয়ে পড়।”

বাড়িটা নিঝুম এক পুরী। শুধু কানে আসছে গুনগুন করে মন্ত্রপাঠ রুদ্রনাথ পন্ডিতের কন্ঠ থেকে। ভদ্রলোকের ক্ষমতা আছে। ওরা ক্রমশ ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করল।

সুজিত বাবু খাটে শুয়ে শরীরটা এলিয়ে দিল। মনস্থির করে নিল এরপর বাড়ি বিক্রি করে ছেলের কাছে চলে যাবে না হয় রুদ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় কে অনুরোধ করবে ওনার আশ্রমে একটু আশ্রয় দেবার জন্য। যতই বাড়ি সুরক্ষিত করে যাক।

মন্ত্রের বাঁধন নষ্ট হতে কতক্ষণ? কালকের দিনটা ভালোয় ভালোয় কাটলে মঙ্গল। কানে আসছে রুদ্রনাথের মন্ত্রোচ্চারণ। পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমের চেষ্টা করতে লাগলো সে।

রোহিত ঘড়িতে সময় দেখলো। রাত বারোটা বেজে গেছে। এতদিন বিশ্বাস করতো- অপশক্তি, ভুত-প্রেত সব গল্পকথা। বিজ্ঞানের যুগে সব কিছু অবাস্তব, মিথ্যে। আজ সেই বিশ্বাসের ফাটল ধরেছে। বাবা যতই আপত্তি করুক, এখান থেকে বাবাকে নিয়ে যেতেই হবে। এত বড়ো বাড়িতে একা থাকা একপ্রকার অসম্ভব। দিন-রাতের লোক দেখে দিলেও সে নিশ্চিন্ত হতে পারবে না। সোমালীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। মেয়েটার জন্য এখন সহানুভূতি জাগছে। ইস, কিছুদিন আগেও যদি রুদ্রনাথের কথা বাবা তাকে মনে করিয়ে দিতো? হয়তো প্রাণটা বেঁচে যেত। একটা আড়মোড়া ভেঙে ও শুয়ে পড়লো। মন্ত্রের শব্দ কানের ভিতর দিয়ে ঢুকে মনের ভেতর একটা তরঙ্গ ছড়াচ্ছে। সেই তরঙ্গ শরীরের স্নায়ুগুলোতে এক অদ্ভুত কম্পনের সৃষ্টি করে চলেছে…। ঘুম নেমে আসছে ধীরে ধীরে।

* * *

ভোরবেলা রোজকার মতো ঘুম ভাঙলো সুলোচনার। প্রথমে ভেবেছিলো নিজের বাড়িতেই শুয়ে আছে, তারপর মনে পড়ে গেলো সুজিত বাবুর বাড়ি। দেখলো উৎস অঘোরে ঘুমাচ্ছে। কান খাড়া করেও মন্ত্রের শব্দ কানে এলো না। তার মানে ওনার পূজো সমাপ্ত হয়েছে। খাট থেকে নেমে দরজাটা খুললো। বৈঠকখানার পাশেই ওদের ঘরটা। সুলোচনা দেখলো বৈঠকখানার চেয়ারে রুদ্রনাথ বাবু ও সুজিত বাবু বসে আছে। ওকে দেখে সুজিত এগিয়ে এলো, “যদি কিছু মনে না করেন, আমার স্ত্রীর অনেক শাড়ি আছে। স্নান করে একটা পরতে পারেন।” মুখে অসংকোচের চিহ্ন, সুলোচনা সম্মতি সূচক মাথা নাড়ায়। তারপর বলে, “আপনাদের রান্নাঘরটা কোথায় বলুন, আপনাদের জন্য একটু চা করে দিই।”

“আমরা অনেক আগেই করে খেয়ে নিয়েছি। সবাই উঠুক, তখন না হয় বানিয়ে দেবেন।” সুজিত স্ত্রীর একটা হালকা রঙের শাড়ি বার করে এনে দিলো। সুলোচনা মনে মনে সুজিত বাবুর প্রশংসা করলো। কারণ সে জানে, সুলোচনা বিধবা। তাই রংচঙে শাড়ি আনে নি।

একটু বেলায় দোকান থেকে রোহিত সবাইয়ের জন্য জলখাবার নিয়ে এলো। রুদ্রনাথ শুধু বাদ, কেননা তিনি আজ নিরম্বু উপবাস করবেন। কাল রাত্রে শুধু দুটো মিষ্টি খেয়েছিলেন। সুজিত বাবু উৎস কে নিয়ে সকালেই বেরিয়েছিলেন, রুদ্রনাথের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী জিনিসপত্র কিনতে। ঠিক হয়েছে যে, দুপুরের মধ্যে পুজো সমাপ্ত হবে। তারপর উৎসদের বাড়ি যাবেন। রোহিত একটা ভাড়ার গাড়ি বলে রেখেছে।

পুজোয় বসার আগে শুধু রুদ্রনাথ বললেন, “আজকে ছাদটা তোমরা কেউ ব্যবহার করবে না। বিশেষ করে চিলেকোঠার ঘরটা, কারণ ওখানে বিশেষ আত্মাটি আছে। যে সোমালীর মৃত্যুর কারণ। আশা করি এই বাড়ি থেকে ওকে তাড়াতে সক্ষম হবো। তবে ওর মুক্তির পথ নেই।” কথাটা শুনে সুজিত সেন ঢোঁক গিললো, তার মানে বিপদ রয়েই যাবে। আবার কখনও সে এখানে হানা দিতে পারে।

এবারে রুদ্রনাথ ঠাকুর ঘরের দিকে এগোলেন। ওদের আসতে মানা করলেন, কেননা একাগ্রতা ভঙ্গ হতে পারে। আবার একবার সাবধান বাণী করলেন। সূর্যদেব যখন মাথার উপরে যাবেন, তখনই আমার পূজা সমাপন হবে সেই সময় তোমরা সবাই একত্রে এই বৈঠকখানায় থাকবে, কারণ সে যাবার আগে শেষ চেষ্টা করবে কারো কোন ক্ষতি করবার। যদিও তোমরা সবাই কবজের শক্তিতে আবদ্ধ। তবু খারাপ বা নিম্নশ্রেণির আত্মা অত সহজে পরিত্রান দেয় না। ক্ষতি না করতে পারলে কোন কিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সে নরকে বিলীন হয়ে যায়।

সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হন রুদ্রনাথ। ওর কথাগুলো ঘরে প্রতিধ্বনি হতে থাকে। সবাইয়ের মনে ভয়ের উপস্থিতি। যেন কোনও মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস। সূর্য মধ্যগগনে মানে ঠিক দুপুর বেলা। তারা অপেক্ষা করে চলে নীরবে। পুরনো বাড়ীটা থমথম করছে। সুজিত সেনের পাড়াটা এমনিতেই নির্জন। মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে টোটো চলে যাওয়া শব্দে মনে হচ্ছে। পৃথিবীতে প্রাণ বলে কোনও বস্তু আছে।

সময় গড়িয়ে চলে তার নিয়ম অনুযায়ী। প্রতিটি মিনিট কাটছে এক অনিশ্চয়তায়। তবে সাহসী বটে রুদ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। সাবধান বাণী দেবার সাথে সাথে অভয়ও দিচ্ছেন। এখনও ওঁর মুখে নিরাশার চিহ্ন দেখা যায়নি। কিছু সময় পরে পরেই ওরা ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে! ঘড়ির একটানা টিকটিক শব্দ। ওপরে ঠাকুর ঘর থেকে এবার ভেসে এলো দুর্বোধ্য মন্ত্র পড়ার আওয়াজ। ঘরে পাখা চললেও তাপমাত্রা বাড়ছে। উৎসের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সে চিন্তা করছে তাদের বন্ধ খালী বাড়িতে একা একা সোমালী ঘুরে বেড়াচ্ছে। আত্মা শক্তি তাদের ক্ষমতায় নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে, তার বিপদ আসন্ন সে কথা ভেবে সোমালী কী করছে কে জানে? অদৃশ্য একটা জগৎ আছে, তা এখন উৎস হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে। সবার মনেই একটা ভয় ভয় ভাব। মনের উৎকণ্ঠা চেপে চলেছে।

দুপুর বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে রুদ্রনাথের কন্ঠের মন্ত্রোচ্চারণের জোর দ্বিগুন হলো। সারা বাড়ী গমগম করতে লাগল মন্ত্র ধ্বনিতে। আচমকা ছাদের চিলেকোঠার ঘর থেকে তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এলো। আর্তনাদে বোঝা যাচ্ছে না নারীকণ্ঠ না পুরুষ! কিন্তু এমন বীভৎস চিৎকার যে হাত পা অবশ হয়ে যাবে। সুতীব্র আর্তনাদ ক্রমশ কান্নায় পরিণত হলো। কান্নার তীব্রতা ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগলো। কেউ যেন মরণ কান্না কাঁদতে কাঁদতে দূর থেকে বহুদূরে চলে যাচ্ছে।

আচমকা দড়াম করে একটা শব্দ হতে সবাই শিউরে উঠলো। সিলিংয়ে ঘুরন্ত পাখাটা খুলে ওদের সামনে রাখা কাঁচের সেন্টারে টেবিলের ওপর আছড়ে পড়লো। কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে ওরা দাঁড়িয়ে উঠলো। একটু উনিশ বিশ হলে উৎসের মাথায় ভারী পাখাটা পড়তো। সারা ঘরে কাঁচের টুকরোগুলো ছড়িয়ে গেলো। ওই শব্দে তাড়াতাড়ি রুদ্রনাথ নিচে নেমে এলেন। ওর চোখ মুখেও শঙ্কার চিহ্ন। ঘরে ঢোকার আগেই সুলোচনা বলে উঠলো,

“দাঁড়ান, আগে আমি কাচগুলো পরিষ্কার করে দিই। ঝাঁটাটা কোথায়?”

সুজিত বাবু ঘরের কোনটা দেখিয়ে দিলো, অতি সন্তর্পনে সুলোচনা গিয়ে ফুলঝাড়ুটা নিলো। সকলেই চেয়ারে তটস্থ হয়ে বসে আছে।

রুদ্রনাথ বললেন, “তারা মায়ের ইচ্ছেয় কারো কোন ক্ষতি হয়নি। কাল ভৈরভ রক্ষা করেছেন। আর ভয় নেই, সেই অশুভ শক্তি নরকের পথে বিলীন হয়েছে। এবার তোমরা মাথা নিচু করে শান্তির জল নাও। “ ওনার হাতে ধরা ছোট পিতলের ঘট থেকে সবার মাথায় মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে দিলেন।

সুজিত বললো, “এরপর আপনি একটু বিশ্রাম নিন, কাল থেকে আপনার শরীরের ওপর দিয়ে যা ধকল যাচ্ছে।”

“এ কিছুই নয়।” শান্ত গলায় উচ্চারণ করলেন, “এর থেকেও কষ্টদায়ক সাধনা আমি করেছি। এক কাজ করো বাবা রোহিত।”

“বলুন…।” রোহিত উঠে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে ঘর পরিষ্কার করে পাখাটাকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। পাখা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে ঘরটা গরমে আগুন হয়ে উঠেছে।

“আমার সঙ্গে ঠাকুর ঘরে চলো। ওখানে কিছু প্রসাদ রাখা আছে। রাস্তায় গিয়ে কোন কুকুরকে খেতে দিয়ে এসো। কালো কুকুর পেলে আরো ভালো।” রোহিত ও উৎস দুজনে প্রসাদ নিয়ে রাস্তায় বেরোয়। আশ্চর্যজনকভাবে দেখলো নর্দমার ধরে একটা কালো কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। রোহিত বলে ফেলে, “রুদ্রনাথ বাবা সত্যিই একজন বড়ো সাধক। কিন্তু দেখলে বোঝা যায় না।”

“সত্যি কথা। একশো ভাগ সঠিক। উনি যেন অন্তর্যামী। সবার মনের কথা পড়ে ফেলেন।” উৎস সায় দেয়। কেননা এখনও উৎসের কানে কালভৈরবের মন্ত্র বাজছে। সুন্দর উচ্চারণে মনের মধ্যে গেঁথে গেছে তার, ওম হ্রিম হ্রোম হারিম হ্র-হম কাশম কস্ট্রপাল্য কাল ভৈরব নমহঃ…।

“এবারে তোমাদের বাড়ির কাজটা সুষ্ঠুভাবে মিটলেই শান্তি।” রোহিত বলে। ওরা কুকুরটাকে খেতে দিয়ে বাড়ি চলে আসে। একটু পরেই বাইকে করে এসে হাজির হলো হোম ডেলিভারির লোক। আজকেও রুদ্রনাথের কথানুযায়ী নিরামিষ খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। উনি বলেছেন, দুপুরে তিনি আহার করবেন। রোহিত ব্যাগ হাতে বেরোলো, একটু দই আর মিষ্টি আনতে।

রুদ্রনাথ হাতে পিতলের ঘটটা নিয়ে সুজিতকে বললেন, “চলো বাড়ির চারপাশে এই জল ছিটিয়ে বাড়িটা বেঁধে দিই।” দুজনে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো, বৈঠকখানা ঘরটাতে আর বসা যাচ্ছে না। উৎস উঠে দালেন পায়চারি করতে থাকে। সুলোচনা মনে মনে ঠাকুরকে ডেকে চলেছে। রুদ্রনাথের ওপর বিশ্বাস থাকলেও তার নিজের পোড়া কপালের কথা সে ভালোভাবেই জানে। অবশ্য এত শক্তিধারিণী পেতনীকে যদি উনি জব্দ করতে পারেন, তাহলে সোমালীর আত্মাকেও পারবে।