অপরাজেয় – ২

দ্বিতীয় পৰ্ব

কোম্পানিতে ঢুকে ও ক্লার্কের কাছে গেল। ওর হাতে একটা লিস্ট ধরিয়ে দিল গম্ভীরমুখে ক্লার্ক অনিমেষ সামন্ত। অন্যান্য ছেলেরাও এসে পড়েছে যে যার লিস্ট অনুযায়ী বিরাট ব্যাগের পার্সেল আর চিঠিগুলো বোঝাই করতে শুরু করেছে এইসময় উৎসের চোখে লিস্টে শুধু সুজিত সেনের নামটা আটকায় ওর মুখে এক ঝলক আলো খেলে গেল। একটা বড় খাম ভদ্রলোকের নামে রয়েছে। অযাচিত এত তাড়াতাড়ি সুযোগ এসে যাবে ও ভাবতে পারেনি। মনটা অজানা আনন্দে নেচে ওঠে আজ! যেভাবেই হোক ভদ্রলোককে ওই মহিলাটির কথা জিজ্ঞেস করতেই হবে তার আগে একটা গল্প বানিয়ে নিতে হবে যাতে সুজিত সেন অন্যরকম কিছু না ভেবে বসে। ও মালগুলো ব্যাগে পুরে কাঁধে ঝুলিয়ে হেলমেট পড়ে নিল প্রথমেই ১২/২ মিত্র ঘোষ লেনে যাবে যেমন আগের দিন সকালে গিয়েছিল হয়তো মেয়েটার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে আশা-নিরাশায় দুলতে দুলতে ও বাইকে স্টার্ট দিল একজন বিবাহিতা মহিলা হঠাৎ কেন তাকে আকর্ষণ করছে সে ভেবে পাচ্ছে না।

পায়ে করে গিয়ার তুলে সে গতি দিল বাইকে। কালকে মেয়েটি বলেছিল, সুজিত সেন ওর স্বামী। তা কী করে সম্ভব? একজন বৃদ্ধ ওই কম বয়সী মেয়েটির স্বামী হয় কী করে? সম্পূর্ণ মিথ্যে! কিন্তু মিথ্যে বলে ওর কী লাভ? তাছাড়া উৎসের এখনও বেশ মনে আছে পার্সেল নিয়ে মেয়েটা বাড়ির ভিতরে চলে গিয়েছিল। চোখের সামনে সেই দৃশ্য এখনও ভেসে উঠছে। আশ্চর্যভাবে পার্সেল আবার তার কাছে ফিরে এল কীভাবে, এই প্রশ্নটাই তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে ঘোরাফেরা করছে কাল থেকে।

একটু বাদেই মিত্র ঘোষ লেনে ও ঢুকে পড়ল। তার আগে তিনটে ডেলিভারি ইচ্ছে করে দেরি করে দিলো। ও সময় কাটাতে চাইছে। গতকাল যেমন বেলা সাড়ে ১১ টা নাগাদ গিয়েছিল আজ ওই সময়েই যাবে। যদি তার দেখা মেলে! দূর থেকে গলির ভেতর বাড়িটাকে দেখতে পেল। গরম পড়েছে। হেলমেটের ভেতর মাথা আর মুখটা ঘামে জবজব করছে তার। সেই ভাঙা রংচটা দরজার কাছে দুরুদুরু বুকে এসে সে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে পেটমোটা খামটা বার করল। বাইকের স্ট্যান্ড দিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে গেল। নির্জন গলি। যেন কালকের দৃশ্য পুনরায় প্রতিফলিত হচ্ছে। দরজায় কড়া নাড়ল। ওর বুকের ভেতর একটা তোলপাড় চলছে। অজস্র প্রশ্নের ঝড়। সে কী পাবে তার উত্তর? দরজাটা বন্ধ রয়েছে। আবার কড়া নাড়ল ধীরে ধীরে। দরজার একটা পাল্লা খুলে গেল। সেই মধুমাখা রহস্যের হাসিভরা মুখ দেখা দিল। মুখে ওর প্রশ্ন। নিজেকে সংযত করল উৎস। আকর্ষণীয় মুখটা পুনরায় তাকে আকর্ষণ করছে।

“একটা ডেলিভারি আছে।” বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে সে। সুরেলা কণ্ঠ ভেসে এল, “সুজিত সেন এখন বাড়ি নেই, আমি কি তার হয়ে গ্রহণ করতে পারি?”

—“উনি তো আপনার স্বামী হন তাই না?” মেয়েটার মুখে এক চিলতে হাসি খেলে গেল।

—“না উনি আমার বাবা হন।”

—“কাল যে বললেন—আপনার স্বামী?”

মেয়েটা মিথ্যেবাদী।

–“কখন আপনাকে বললাম? কালকে আপনি বিকেলে এসে ওনাকেই তো পার্সেল ডেলিভারি করলেন।”

উৎস চুপ করে গেল। মাথায় আসছে না এরপর কী বলবে। যদি বলে ওর হাতে পার্সেল দিয়েছে, প্রশ্নটা বোকার মতো হয়ে যাবে না কি? ওর গলা শুকিয়ে গেছে। সে ওর দুটো গভীর আয়ত চোখদুটোর দিকে চেয়ে বলল, “একটু জল খাওয়াতে পারেন?”

“নিশ্চয়ই! আপনি ওই রোদ থেকে ভেতরে এসে দাঁড়ান, আমি নিয়ে আসছি।” ও লঘু পায়ে ভেতরে চলে গেল। উৎস দুপা এগিয়ে ভেতরে ঢুকল। বাড়ির ভেতরটা বেশ ঠান্ডা।পুরোনো আমলের বাড়ির সামনেই বিরাট দালান। এটা বোধহয় বৈঠকখানা। পুরোনো আমলের গদী আঁটা হাতল ওয়ালা চারটে চেয়ার আর সিংহের পাওয়ালা কাঠের সেন্টার টেবিল। বাড়ির ভিতরটা নিঃশব্দ। এত বড় বাড়িতে আর মনে হয় না কেউ থাকে। না হলে গলার শব্দ পাওয়া যেত। কান খাড়া করেও কোনো শব্দ সে পেল না। মেয়েটা কি এখানে একা থাকে? তাহলে ওর স্বামী কোথায়? সুজিত সেনের মেয়ে না পুত্রবধূ? একটা একটা করে প্রশ্ন ওর মনে উদয় হচ্ছে। এসব প্রশ্নের উত্তর সে বোধহয় জীবনেও পাবে না। কেননা ডেলিভারি দিয়ে তাকে এখনই চলে যেতে হবে। কোন অছিলায় সে প্রশ্নের উত্তরগুলো জানবে?

মেয়েটা হাতে কাঁসার গ্লাসে জল নিয়ে এগিয়ে এল। বাসনপত্রগুলো সাবেকি ধাঁচের। এখনো কাঁচের জিনিস এদের কাছে স্থান পায়নি। শুধুমাত্র মেয়েটির সাজপোশাকই আধুনিক ধাঁচের। গ্লাসটা হাতে নিতে গিয়ে আরো একবার আঙুলের স্পর্শ লাগল। সারা শরীর রোমাঞ্চিত হলো। মেয়েটার গা থেকে সুন্দর মিষ্টি গন্ধ বেরিয়ে এসে ওর নাকে লাগল। কোনো পারফিউম এর সুবাস। জলটা খেয়ে নিয়ে উৎস বলল, আপনাদের বাড়িতে আর কেউ থাকে না? মেয়েটা এক মিনিট চুপ করে রইল। উৎস ভাবল তার প্রশ্নটা কি বেখাপ্পা হয়ে গেল নাকি? উত্তর এল- “আমার হাজব্যান্ড দিল্লিতে কাজ করে আমি এখানে ওর বাবাকে দেখাশোনা করি।”

ওর মুখে বিষন্নতার ছাপ। মেয়েটা কথা ঘোরাল। আপনার যদি ডেলিভারি দিতে অসুবিধা থাকে আপনি বিকেলের দিকে আসুন, যেমন কাল এসেছিলেন?

তারমানে বিকেলে যখন উৎস এসেছিল আড়াল থেকে মেয়েটি ওকে দেখেছিল। কিন্তু সকালে ব্যাপারটা কেন ও এড়িয়ে গেল, উৎসের এই প্রশ্নটাই জানার একমাত্র প্রয়োজন। তাছাড়া ডেলিভারি দেওয়া জিনিস ওর ব্যাগে পুনরায় ফিরে গেল কী করে? কীভাবে? এই উত্তরটা যতক্ষণ সে না জানতে পারছে তার ঘুম হবে না। উদ্বেগ না চাপতে পেরে বোকার মত বলল-

“আচ্ছা আমি তো কাল আপনার হাতে পার্সেলটা ডেলিভারি করেছিলাম। আপনি সই পর্যন্ত করেছিলেন। ভেবে পাচ্ছিনা এত বড় ভুল আমার হলো কীভাবে! এখন আপনি বলছেন আমি সকালে আসিনি, আমার ভালোভাবে মনে আছে।”

মেয়েটার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।

“মনে হয় আপনি ভুল করছেন। ডেলিভারি জিনিস আপনার কাছে ফিরে গেল কীভাবে?”

—“সেটাই তো প্রশ্ন আমারও!”

মেয়েটা মুচকি হাসল- “অনেক সময় আমাদের এরকম ভুল হয়। কোনো মানুষকে দেখলে মনে হয়, একে আগে কোথাও দেখেছি। এছাড়া আর কী বলব বলুন?” উৎস নিরাশ হলো। তাহলে কি ও জেগে জেগে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিল? কিন্তু এ তো জ্যান্ত স্বপ্ন! নিজের মনকেও বিশ্বাস করতে পারছে না সে!

অবশ্য মেয়েটা যদি সই করেই থাকে সে লেখাটা অদৃশ্য হয়ে যাবে কীভাবে? তবে কি তার মাথার দোষ দেখা দিল? জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা শুরু করল? ঢোঁক গিলল। আর বেশি সময় এখানে দাঁড়িয়ে থাকা সমীচীন নয়। অন্য কিছু ভাবতে পারে। কিন্তু মেয়েটার রূপ তাকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করছে। এরকম কেন হচ্ছে তার? সে কি বিবাহিত মহিলার প্রেমে পড়ল নাকি? মেয়েটার আরো একবার দেখা পাবার আশায় সে বলল, ঠিক আছে আমি বিকেলের দিকে বরং আসব। আপনি সুজিত বাবুকে বলে রাখবেন। না হয় আমি আগে ফোন করে আসব।

“বেশ, তাই হবে।”

অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে বাইরে বেরিয়ে এল। ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন। কিন্তু উত্তরগুলো কোনোটাই জুতসই নয়। বাইকে কিক মারল। সেই সময় বুক পকেটে রাখা ফোনটা কুঁইকুঁই করে বেজে উঠল। কানে হেডফোন লাগানো কোম্পানির আঞ্চলিক অফিসের গলা ভেসে এল- “তুমি সুজিত সেনের চিঠিটা অফিসে নিয়ে চলে এসো ভদ্রলোক এখানে বসে আছেন। খুবই দরকারী চিঠি। উনি এখানে অপেক্ষা করছেন। বাড়ি বন্ধ করে এসেছেন, তাই ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব নয়। উনি এখান থেকে রিসিভ করবেন।”

আবার একটা ধাক্কা খেলো উৎস। বিষয়টা আরো জট পাকিয়ে গেল। বাড়িতে ওনার পুত্রবধূ রয়েছে আর সুজিত বাবু বলে কিনা বাড়ি বন্ধ করে এসেছেন? ফোনে ও শুধু বলল, “পনেরো মিনিটের মধ্যে আসছি।” ও প্রান্ত থেকে ফোনটা কেটে গেল। মাথার মধ্যে থাকা গ্রে সেলগুলো উত্তেজিত হয়ে উঠছে। রহস্য, বিরাট রহস্য। যা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে।

এই রহস্যের জট তাকে ছাড়াতেই হবে, না হলে সে নিশ্চিন্ত হতে পারবে না। শ্বশুর ও পুত্রবধু মিলে তার সঙ্গে এরকম লুকোচুরি কেন খেলছে? কী তাদের উদ্দেশ্য? কিন্তু যে ঘটনাটা ওকে সবথেকে বেশি ভাবিয়ে তুলছে, তা হলো ডেলিভারি দেওয়া পার্সেল তার কাছে ফিরে গেল কীভাবে?

দ্রুতগতিতে ও কোম্পানির দিকে ছুটে চলল। সুজিত সেন ওর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। চিঠিটা রিসিভ করে উঠে দাঁড়ালেন। পাঞ্জাবি পাজামা পরা দোহারা চেহারা, মুখের মধ্যে নাকটা একটু উঁচু। চোখদুটোতে ঘৃণার আভাস। কার প্রতি এত ঘৃণা কে জানে!

উৎস বলে উঠল- “আপনার বাড়ি থেকেই এলাম। আপনার পুত্রবধূ চিঠিটা রিসিভ করে নিলে এতখানি আমায় ছুটে আসতে হতো না।”

কথাগুলো সুজিত সেনের কানে যেতে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মুখে একরাশ বিস্ময়। কয়েক সেকেন্ড উৎসের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন, “বাড়িতে আমার পুত্রবধূকে কোথায় পেলে? বাড়িতে তো চাবিমারা।” পকেট থেকে চাবির গোছাটা বার করে দেখালেন। উৎসের মুখেও প্রশ্নের ছোঁয়া।

“তার মানে? আপনার পুত্রবধূ আমাকে ভেতরে ডাকল, জল খাওয়াল, আর আপনি বলছেন বাড়িতে তালা মারা?”

কিছু একটা জবাব দিতে গিয়েও সুজিত সেন চুপ করে গেলেন তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। উৎসের হাতে এখনো অনেক পার্সেল রয়েছে, সব ডেলিভারি করতে হবে।

ওদের কথাবার্তা শুনে কাউন্টারে বসে থাকা ক্লার্ক অনিমেষ অবাক হলো। উৎস সেদিকে না তাকিয়ে ভারি ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। তার মনের মধ্যে সবকিছু জট পাকিয়ে গেল। মনে হচ্ছে ও যেন কোনো রহস্য গল্পের একটা চরিত্র, তার চোখের সামনে প্রতিক্ষণে রহস্যের ঘনঘটা। ও ভাবছে, কখন গোয়েন্দা এসে উপস্থিত হবে যে তার সূক্ষ্ম বুদ্ধির দ্বারা রহস্যগুলো ভেদ করবে।

রাস্তায় রৌদ্রের মধ্যে ও বেরিয়ে এল। বেরিয়েই চোখে পড়ল রাস্তার ল্যাম্পপোস্টটার দিকে। সেখানে সুজিত সেন যেন তার অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছেন। ওকে দেখে দ্রুতপায়ে উৎসের দিকে এগিয়ে এলেন। উৎস দেখল চোখ দুটোতে ঘৃণার স্থানে একটা অজানা ভয় রয়েছে। ওর সামনে এসে উৎকণ্ঠার স্বরে বললেন, “তুমি বললে আমার বাড়িতে গিয়েছিলে। সেখানে নাকি আমার পুত্রবধূ সোমালী ছিল। তুমি বলতে পারবে সোমালীকে কীরকম দেখতে?”

এ আবার কী ধরনের প্রশ্ন! উৎস ভেবে পায় না।

“আপনি কি আমাকে মিথ্যাবাদী ভাবছেন?”

“মোটেই নয় শুধু মিলিয়ে নিতে চাইছি আমার প্রশ্নের উত্তর।” ভাঙা গলায় সুজিত সেন বলেন।

উৎস হাতে হেলমেটটা নিয়ে তার স্বপ্নের নারীর চেহারার বর্ণনা বলতে থাকে। সুজিত সেনের চোখ দুটোতে রাজ্যের বিস্ময় খেলা করে চলেছে। সারা মুখের পরতে পরতে সূক্ষ্ম একটা ভয় দানা বাঁধছে। উৎসকে মাঝপথেই সে হাত তুলে থামিয়ে দেয়। উৎস দেখে সুজিত বাবুর হাতটা রীতিমতো কাঁপছে। বয়সের দোষ নাকি?

“থাক আর বলতে হবে না!” ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন—তিনি। কণ্ঠের জোরটাও যেন কমে গেছে। উৎস অবাক হয়। হেলমেটটা মাথায় পরতে পরতে বলে, “বিশ্বাস হয়েছে আমার কথা? চাইলে আপনার বাড়ির ভিতরকার বর্ণনাটাও দিয়ে দিতে পারি।”

ভদ্রলোক বিড়বিড় করে বলে ওঠেন, “এ কী করে সম্ভব?”

“তারমানে এখনও আপনার মনে সন্দেহ আছে।” বিরক্তির সঙ্গে

বলে উৎস। “যাক আমি চলি দেরি হয়ে যাচ্ছে!”

—“তোমার ছুটি কবে থাকে?” সুজিত বাবু প্রশ্ন করেন।

“আমাদের ছুটির দিন বলে কিছু নেই, অবান্তর প্রশ্ন করে আমায় দেরি করিয়ে দিচ্ছেন।”

—“তুমি সময় করে কালকে আমার বাড়ি একবার আসতে পারবে?” নরম গলা ভদ্রলোকের। উৎস একটু অবাক হয়, লোকটার মাথা ঠিক আছে তো?

—“বিশেষ কোনো প্রয়োজন?” মুখে বললেও উৎসের মনে সোমালীর সেই সুন্দর চেহারাটা ভেসে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে দেখা করার আকাঙ্ক্ষাটাও বাড়তে থাকে। সুবর্ণ সুযোগ। সুজিত সেন নিজে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।

“বেশ কাল সন্ধ্যেবেলা গেলে আপত্তি আছে?”

—“মোটেই না, আমি অপেক্ষা করে থাকব।” ভদ্রলোক যাবার জন্য পা বাড়ালেন। উৎস বাইকে স্টার্ট দিল। বাইক চালাতে চালাতে ওর মনে নতুন একটা প্রশ্নের উদয় হলো। ভদ্রলোক হঠাৎ কেন তাকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন?

বাড়িটাই যেন রহস্যে ভরা। এখনও অবশ্য সোমালীর স্বামীর সাথে পরিচয় হয়নি। বাড়ির বাসিন্দারাও কোনো অংশে রহস্যজনক কম কিছু নয়, তাছাড়া সুজিত সেনের মুখের চেহারাও বারবার বদলাচ্ছিল কেন? ভদ্রলোক যেন কোনো কঠিন অংকের উত্তর মেলাতে পারছিলেন না। যাক কাল সন্ধ্যেবেলা আবার দেখা হবে সোমালী ও তার শ্বশুর নতুন কী রহস্য নিয়ে তার সামনে অবতীর্ণ হয়। আচমকা সোমালীর একটা কথা উৎসের মনে ভেসে উঠল। প্রথমদিন প্রথম সাক্ষাতে নিজের শ্বশুরকে ও স্বামী বলল কেন? উৎসের পরিষ্কার মনে আছে, সোমালি মিষ্টি কণ্ঠে বলেছিল- “সুজিত সেন আমার হাজব্যান্ড।” অদ্ভুত রহস্য। সে মনে মনে ঠিক করে নিল কালকেই সমস্ত রহস্যের কিনারা সে করে নেবে। অহেতুক চিন্তা তার ভালো লাগছে না। কাজেও এর ফলে ভুল হয়ে যাবার সম্ভাবনা। আগামীকাল দুজনের সামনেই প্রথম দিনের ঘটনা থেকে সবকিছু সে আলোচনা করবে। তবে যে জিনিসটা ওর মনকে বিঁধছে, সেটা হল সোমালীর হাতে পার্সেল ডেলিভারি করে দেওয়া সত্ত্বেও সেটা উৎসের ব্যাগে ডানা মেলে ফিরে এল কীভাবে? এই ধাঁধার জট ছাড়ানো তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

আজ উৎস একটু ভালো ড্রেস পরল। কেন পরল সেটা বোধগম্য হলো না। হয়তো সোমালীর প্রতি গোপন ভালোবাসার জন্য প্রথম দিনে সোমালীর চোখে সে আমন্ত্রণের আহ্বান দেখেছিল। একটা মেয়ের চোখের ভাষা পড়ার মতো বয়স তার হয়েছে। হাফহাতা সবজে টিশার্ট আর সাদা ফুলপ্যান্ট বেশ স্মার্ট লাগছে তাকে। আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিল। কম দামে কেনা একটা পারফিউম পোশাকে স্প্রে করে নিল। কাকে আকর্ষিত করতে চলেছে সে? এক পর-পুরুষের বিবাহিত স্ত্রীকে? এবার মাকে বলল, “আমি একটু বেরোচ্ছি। এক বন্ধুর বাড়ি যাব।”

আজ কোম্পানি থেকে বাইকটা নিয়ে এসেছিল। বাইকে স্টার্ট দিয়ে সুজিত সেনের বাড়ির দিকে চলল। মনটা হঠাৎ যেন একটু ফুরফুরে হয়ে উঠল। কারণটা হলো সো-মা-লী। উৎসের মাথায় একবারও এল না সোমালী হলো পরস্ত্রী।

গ্রীষ্মকালের সন্ধ্যা। আকাশের আলো ক্রমশ মরে আসছে। মিত্র ঘোষ লেনের পুরোনো পাড়াটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে রয়েছে। এখানে বেশিরভাগ বাড়ি পুরোনো আমলের। দেখলে মনেই হবেনা কলকাতারই একটা অংশ। সুজিত সেনের বাড়ির সামনে এসে মোটরবাইকের গর্জনটা বন্ধ হলো। হেলমেট খুলে চুলটা আরো একবার আঁচড়ে নিল সে। বিরাট বাড়িটার মধ্যে শুধু বৈঠকখানার ঘরে এক চিলতে আলোর রেখা। কলিংবেল না থাকার জন্যে অগত্যা সেই মরচে ধরা লোহার কড়াটায় সে শব্দ করল। বাড়ির ভেতর থেকে সুজিত সেনের গলার শব্দ ভেসে এল। দরজা খুলে তাকে ভেতরে আসতে বললেন সুজিতবাবু। নিরাশ হলো উৎস। সে ভেবেছিল তার স্বপ্ন সুন্দরী দরজা খুলে দেবে। বাড়িটার ভেতরে কোনো ঘরে আলো জ্বলছে না শুধুমাত্র বৈঠকখানা ছাড়া। সামনের পুরোনো আমলের চেয়ারটায় বসতে বললেন সুজিত সেন। কোলকুঁজো হয়ে বসল উৎস। ভদ্রলোক ওর মুখোমুখি বসলেন। চোখ দুটো উৎসের মুখের উপর সাঁটানো। যেন একমনে সুজিত বাবু উৎসের মনের কথা পড়ার চেষ্টায় ব্যস্ত। শালা পাগল না ছিটিয়াল? মনে মনে উচ্চারণ করল উৎস।

অস্বস্তি লাগতে সে নিজেই প্রশ্ন করল, “আমায় ডেকেছিলেন কেন?” ওর প্রশ্নে ভদ্রলোকের যেন চটকা ভাঙল। হাতে হাত ঘষে বললেন, “তুমি বলেছিলে এ বাড়িতে এসেছিলে?”

যাহ শালা এই কথা একই কথার পুনরাবৃত্তি! কাঁধটা ঝাঁকিয়ে সে বলে ওঠে, “নিশ্চয়ই। আপনার পুত্রবধূ জলও খাইয়েছিল এবং সেই দিন এই চেয়ারে এসেই বসেছিলাম।’

“মিথ্যে কথা!” জোর গলায় বলে উঠলেন সুজিত বাবু।

“তার মানে? আমার মিথ্যে কথা বলে কী লাভ? আমি আপনার কোনো পরিচিত লোক নই যে মিথ্যে বলব, তাছাড়া মিথ্যে বলে আমার কী লাভ?” বিরক্ত কণ্ঠ ওর।

অবিশ্বাসের চোখে তাকান সুজিত বাবু। উৎসের দৃষ্টি দরজার দিকে পড়ে। খুব সম্ভবত ওদের কথার আওয়াজে সোমালী দরজার কাছে এসে উপস্থিত হয়েছে। উৎসের বুকে এক রোমাঞ্চকর উত্তেজনা ও কথার খেই ধরে বলে ওঠে, “বেশ তো আমার কথা আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না, তাহলে দরজার কাছে আপনার পুত্রবধূ দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাকে ভেতরে ডাকুন।” সুজিত সেন চমকে উঠে দরজার দিকে তাকান। তারপর বলে ওঠেন, “কী পাগলের মতো প্রলাপ বকছ হে? মরা মানুষ তোমার কথা সাক্ষী দিতে এখানে আসবে? তোমার নিশ্চয়ই অন্য কোনো অভিসন্ধি আছে।”

উৎসের কানে প্রতিটা কথা আছড়ে পড়ে এবং পরক্ষণেই সে দেখে দরজার কাছে কেউ নেই, শুধুমাত্র একরাশ অন্ধকার। একি শুনছে উৎস! তিনদিন ধরে যাকে নিজের চোখে সে দেখেছে সে নাকি মৃত! আজকালকার ছেলের পক্ষে এই কথা হজম করা যায়! বিস্ময় কাটাতে একটু সময় লাগল তার।

“কী বলছেন আপনি?” এরপর সে সোমালীর চেহারার হুবহু বৰ্ণনা আবার দিয়ে যায় এবং এও দেখিয়ে দেয় সে গত পরশু এসে কোথায় দাঁড়িয়েছিল এবং একটা কাঁসার গ্লাসে জল খেয়েছিল। ওর কথাগুলো শুনে কিছুটা বিশ্বাস হয় সুজিত সেনের। চোয়ালটা খানিকটা ঝুলে পড়ে। ভাঙা ভাঙা গলায় বলে ওঠেন, “এ কী করে সম্ভব! বিশ্বাস করাও খুব কঠিন!”

উৎসের মনেও একটা সুপ্ত উত্তেজনা খেলা করছে। “এই তো একটু আগেও উনি দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।” সুজিতবাবু দরজার দিকে আবার তাকালেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়াল আলমারি খুলে একটা ছবি বার করে আনলেন।

“একেই তুমি দেখেছিলে?”

“আলবাত!” জোর কণ্ঠে বলে উৎস। “চিন্তা করে দেখুন আপনি যে ওনার শ্বশুর, আমি কী করে জানব উনি না বলে থাকলে?”

“বিশ্বাস করছি বলেই বিরাট সমস্যায় পড়ে যাচ্ছি।” সুজিত বাবুর কপালে ভাঁজ পড়ে।

“স-ম-স্যা!” উৎস কথাটার পুনরাবৃত্তি করে।

“ঠিক তাই! কেননা সোমালী মাস চারেক আগে আত্মহত্যা করে–” কথাটা উৎসের কানে আছড়ে পড়ল! “অসম্ভব!” উত্তেজিত স্বরে ও বলে উঠল।

“এটাই সত্যি!” সুজিত সেনের কণ্ঠে দৃঢ়তা।

“তোমার কথাগুলো শুনে পর্যন্ত আমি মেলাতে হিসাব মিলাতে পারছিলাম না বাধ্য হয়ে সেই জন্য তোমায় বাড়িতে ডাকলাম!” অসহায়ের মতো মুখভঙ্গি ওঁর। হাতের ছবিটায় আর একবার চোখ বোলাল সুজিত। “বাবু, বিশ্বাস করো এই ঘটনার পর থেকেই আমার ছেলে আর এ বাড়িতে আসেনি। পনেরো ষোল দিন ধরে আমাদের পুলিশের উৎপাত সহ্য করতে হয়েছে কিন্তু আমরা ছিলাম নির্দোষ।”

উৎস যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। সুজিত সেনের কথাগুলোয় ওর মস্তিষ্কে একটা চোরা ভয় বাসা বাঁধছে। ঘটনাটা যদি সত্যি হয় তাহলে…? এই তাহলে কথাটার কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না সে। ওর মুখ দিয়ে একটা প্রশ্ন বেরোল- “হঠাৎ কী কারণে উনি আত্মহত্যা করলেন সেটা বলা যাবে কি?” আসলে উৎস সম্পূর্ণরূপে নিঃসন্দেহ হতে চাইছে। তার চোখ আর মন এখনও অবিশ্বাসের দোলায় দুলছে। ভূতের গল্প বইতে পড়েছে, সিনেমাও দু-একটা দেখেছে কিন্তু ও জানে এগুলো সবই দুর্বল মনের ছায়া। কেননা ভৌতিক কোনো সত্ত্বার প্রমাণ বড় একটা পাওয়া যায়নি বা বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যাও নেই। তাছাড়া দুপুরের আলোতে নিজের চোখে ভূত দেখাটাও বিশ্বাস করতে পারছে না। তবে এরই মধ্যে কয়েকটা ঘটনা ওকে ভাবাচ্ছে। সেগুলো হলো ডেলিভারি দেওয়া পার্সেলটা ওর ব্যাগে ফিরে গেল কী করে? ওর ডেলিভারি লিস্টে সোমালীর সই করা হস্তাক্ষরটা অদৃশ্য হলো কী উপায়ে? সুজিত বাবু টেবিলে রাখা ফ্লাক্স থেকে দুটো কাপে চা ঢাললেন। একটা কাপ ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই এত বড় বাড়িতে আমি একাই থাকি। দুবেলাকার খাবার হোম কিচেন থেকে ডেলিভারি দিয়ে যায়। তাই শুধু চা বিস্কুট খেয়েই গলাটা ভিজিয়ে নাও।” কৌটো থেকে দুটো বিস্কুট উৎসের দিকে বাড়িয়ে দিলেন তিনি। এরপর ভদ্রলোক চায়ে চুমুক দিয়ে গলাটা একটু ঝেড়ে পরিষ্কার করলেন। উৎস ঘড়িতে সময় দেখল, সন্ধ্যে সাতটা বাজছে। সুজিতবাবু কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন- “রোহিত আমার একমাত্র ছেলে। ওর যখন ১০ বছর বয়স তখন ওর মা মারা যায় এরপর থেকে ওকে কোনোদিন আমি বুঝতে দিইনি মায়ের অভাব। অনেকেই আমাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে বলেছিল কিন্তু সেসব কথায় কোনদিন কান দিইনি। ছেলেকে মনের মতো করে মানুষ করেছিলাম।” চায়ে চুমুক দেন সুজিত বাবু। উৎস একমনে শুনে চলেছে তার কথা। সে ভাবছে সুজিত সেন কখন আসল পয়েন্টে আসবেন, অর্থাৎ সোমালীর সুইসাইড ঘটনায়। কেননা তাকে বাড়ি ফিরতে হবে ওর মা অপেক্ষা করে থাকবে। উৎসের উসখুসানি সুজিতবাবু বুঝতে পারলেন। “বুঝতে পারছি তুমি অসহিষ্ণু হচ্ছ।”

“না না আসল কথা কালকেই আবার ডিউটি আছে।” চা শেষ করে

জবাব দেয় সে।

“আমি সংক্ষেপ করছি আমার কাহিনি।” চা শেষ করে কোলকুঁজো হয়ে বসলেন তিনি।

“রোহিত চাকরি নিয়ে যখন দিল্লি চলে গেল তখন এত বড় বাড়িটা এক নিমেষে খালি হয়ে পড়ল। ওদিকে দিল্লীতে তাকে একা হাতে সবকিছু করতে হচ্ছে। প্রতিদিন ফোন করত আমায়। আমার এখানে কাজের লোকদুটো আছে। আর রোহিত এই দু মাসে কোনো কাজের লোকও জোটাতে পারেনি। তখন ওকে আমি বিয়ে করার প্রস্তাব দিই।” একনাগাড়ে বলে একটু থামল সে। উৎস আড়চোখে হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাল। সময় সাড়ে সাতটা। অনেকটা পথ ফিরতে হবে, এদিকে ঘটনাটা জানার জন্য সে ব্যস্ত। কারণ এর পরেও তাকে পাশাপাশি বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানতে হবে সুজিত সেনের কথা যদি সত্যি হয়? তারপর? এই তারপরটাই তাকে বেশি করে ভাবাচ্ছে।

“ছেলের সঙ্গে আমার বন্ধুর মত সম্পর্ক ছিল তাই বললাম তোর যদি কোন ভালোবাসার পাত্রী থাকে তাহলে বল, আমি কথাবার্তা চালাব। ও জানাল সেরকম কেউ নেই। তখন আমিই উপযাচক হয়ে কাগজে বিজ্ঞাপন দিলাম। এক সপ্তাহের মধ্যে আট দশ খানা ছবি সমেত পাত্রীর বায়োডাটা এসে গেল আমার ঠিকানায়। সোমালীর ছবি দেখে আমার মনে ধরল। ফোন করলাম ওদের পাঠানো নম্বরে। তারপর এক মাসের মধ্যেই পাকা কথা হয়ে গেল। রোহিত এসে মেয়ে দেখে গেল। সোমালীকে দেখলে যেকোনো ছেলেরই পছন্দ হয়ে যাবে। বিয়ের ডেট ফাইনাল হয়ে গেল। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। বিএ পাস, একটু আদুরে গোছের। নির্বিঘ্নে বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পনের দিন বাদেই ওরা দিল্লী চলে গেল।” এক নাগাড়ে কথা বলে একটু দম নেবার জন্য থামলেন তিনি। উৎস একমনে শুনে চলেছে কথাগুলো। মনটা এখনো বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলছে। এখনও সে ঘটনাটাকে ভৌতিক পর্যায়ে ফেলতে পারেনি। কেমন যেন সন্দেহ মনে দানা বাঁধছে। আবার শুরু করলেন সুজিত বাবু।

প্রথম টেলিফোনটা পেলাম মাস ছয়েক আগে রোহিতের কাছ থেকে। ওর অদ্ভুত কথাগুলো শুনে চমকে উঠলাম। ফোনে রোহিতের কণ্ঠস্বর- “বাবা সোমালী কিছুদিন হলো কীরকম অস্বাভাবিক আচরণ করছে।”

“সে আবার কী!” আমার কণ্ঠে প্রশ্ন।

“ঠিক তাই! কিছুদিন আগে কিচেনে কুটনো কুটতে কুটতে ছুরিতে হাতের আঙুল কেটে ফেলেছিল। আমি তখন দাড়ি কামাচ্ছিলাম, ওর অস্ফুট আর্তনাদ শুনে ছুটে এলাম। বেশ অনেকখানি কেটে গেছে, ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ফাস্ট এড বক্স থেকে তুলো বের করে আঙুলটা চেপে ধরলাম। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম ওর মুখে যন্ত্রণার জায়গায় এক সুপ্ত আনন্দের ছাপ। ব্যাপারটা বিসদৃশও লাগল।”

“তারপর?” আমার গলায় উত্তেজনা।

“ওর যেন নিজের রক্ত দেখে সন্তুষ্ট চোখেমুখে তৃপ্তির ছাপ কোনোরকমে রক্ত বের হওয়া বন্ধ করলাম।”

সোমালী বলল, “ছেড়ে দাও। কমে যাবে। তুমি বরং স্নান করে এসো।”

“ভাবলাম, খুব শক্ত মনের মেয়ে। অত রক্ত দেখে আমি নিজেই নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। পরের ঘটনাটা ঘটল গত সপ্তাহে।”

আমি ওর কথাগুলো একমনে শুনে যাচ্ছি।

“অফিস থেকে ফিরে দরজায় বেল বাজাচ্ছি, কোনো শব্দ নেই। আমার মনে হলো আবার কিছু দুর্ঘটনা ঘটল নাকি! পরপর তিন-চারবার বেল টেপার পরেও দরজা খুলল না। পকেট থেকে ডুপ্লিকেট চাবিটা বার করে ঢুকলাম। নজরে পড়ল, বেডরুমে চোখ বুজে শুয়ে আছে। বুকটা আমার ধড়ফড় করে উঠল। কেননা চোখ বুজে ও খাটে শুয়ে, কিন্তু ফর্সা মুখ জুড়ে বড় বড় কালো ফোসকা! কী বীভৎস লাগছে! আমি চেঁচিয়ে উঠলাম! “একি কাণ্ড! কী করে এমন ভাবে পুড়ল!” সোমালী চোখ দুটো খুলল, অতিকষ্টে বলল, “মাছ ভাজতে গিয়ে তেল ছিটকে পড়েছে।”

“আমাকে ফোন করোনি কেন?”

অল্প মুখ কুঁচকে বলল, “তোমাকে ডিস্টার্ব করতে চাইনি। ব্যস্ত হয়ো না, কয়েকদিন বাদে কমে যাবে। আমি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তাই কলিংবেলের শব্দ শুনতে পাইনি।”

ওর সহ্যশক্তি দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। তখনও মনে অন্য কোনো সন্দেহ দানা বাঁধেনি।”

রোহিতের কথা আমি শুনে যাচ্ছি। মনের ভেতর একটা তোলপাড় চলছে। ছেলে কী বলতে চাইছে, বুঝতে পারছিলাম না। ওর মনে কীসের সন্দেহ?” সুজিত বাবু একটু কাশলেন।

উৎসের মুখে বিস্ময় খেলা করছে। ঘটনাতে একটা নতুন মোড় এসেছে, যা তাকে আকর্ষণ করছে। কৌতূহলও ক্রমশ বাড়ছে। বাড়ি যাবার ব্যস্ততাটা এখন উধাও হয়েছে হয়ে গেছে। এরপরে সুজিত সেন কী বলবেন জানতে ওর মনে টানটান উত্তেজনা সৃষ্টি হল। তাই অস্ফুট স্বরে বলল, “তারপর?”

“রোহিতের স্বর- সন্দেহ দানা বাঁধল গত পরশুর ঘটনায়। যা আমাকে বাধ্য করল তোমায় ফোন করতে।”

“কী বলছিস? কী বলছিস তুই? মাথায় কিছু ঢুকছে না! কেন মনের মধ্যে শুধু একটা অশুভ চিন্তা ঘোঁট পাকাচ্ছে!”

রোহিত শুরু করল তার কথা, “দিন দুয়েক আগের কথা, আমি ফ্ল্যাটের ছাদে সন্ধ্যেবেলা সোমালীকে নিয়ে পায়চারি করছি। আজ ইচ্ছে করেই অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি কেননা ও ঘরে একা একা বোর ফিল করে। বাতাসে শীতলতার ছোঁয়া। বোধহয় এবারে ঠান্ডাটা একটু তাড়াতাড়ি পড়ে যাবে।

সেই সময় সোমালী মৃদু স্বরে বলে, “এই জানো আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই ছাদের পাঁচিলে উঠে পাশের ফ্ল্যাটের ছাদে লাফিয়ে চলে যাই!”

কথাটা যে ইয়ার্কি মেরে বলছে না ওর কথার টানে স্পষ্ট। আমার বুকের মধ্যে একটা শিরশিরানি উপলব্ধি করলাম। এক মিনিটের জন্য বোবা হয়ে গেলাম। এসব কী বলছে ও?” সোমালী বলে চলেছে, “আচ্ছা সত্যি যদি আমি যাই, যেতে পারব? ওর মুখের দিকে বিস্ময়ে তাকালাম। মরা আলোয় ওর মুখটা ফ্যাকাসে লাগছে। মনে হচ্ছে ও অন্য কোনো জগতে বিচরণ করছে। কেননা ওর দু চোখে কেমন একটা স্বপ্নের ঘোর। “তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি?” একটু জোরেই বলে উঠলাম “এই দশ তলা উঁচু ফ্ল্যাট থেকে তুমি ঝাঁপ দিয়ে পাশের ফ্ল্যাটে চলে যাবে?”

“কেন? ওটার দূরত্ব এমন কিছু বেশি নয় তো! তুমি যদি পারমিশন দাও আমি এখনই একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি।”

ওর গলায় মজার লেশমাত্র নেই। ওর মস্তিষ্ক সম্বন্ধে আমার একটা খারাপ ধারণা জন্মাচ্ছে। ধমকের সুরে বলে উঠলাম, “তুমি কি জেনেশুনে মরতে চাও নাকি?”

“মরা কি এত সহজ? এর আগেও তো কিচেনে আঙুলটা কাটলাম। রান্না করতে গিয়ে ইচ্ছে করে গরম তেল মুখে ছেটালাম। কই আমি মরতে পারলাম?” খিলখিল করে হেসে উঠল ও। ও কি পাগল হয়ে গেছে? আমার মনে হতে লাগল, আমার হাত ছাড়িয়ে যদি সত্যিই ও ছুটে যায় এত উঁচু থেকে লাফ দিতে? শরীরটা অবশ লাগল। আমারই মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। আর এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক মনে হলো না। ও তাহলে এসব দুর্ঘটনা ইচ্ছে করে ঘটিয়েছে! কিন্তু কেন মস্তিষ্ক বিকার? হঠাৎ ভালো মানুষটা এরকম আচরণ করছে কেন? সত্যি যদি কোন বিপদ ঘটায় তাহলে লোকে বিশ্বাস করবে নিজের ইচ্ছেতে সোমালী আত্মহত্যা করেছে? ওর বাবা-মা কি আমাদের ছেড়ে দেবে? সেই জন্য তোমায় ফোন করছি বাবা। এই অবস্থায় ওকে একা ফেলে রেখে অফিস করার মতো অবস্থা আমার নেই।” রোহিত থামল।

* * *

আমি বলে উঠলাম, “তুই কালকের ফ্লাইটেই এখানে চলে আয়। ওর বাবা মাকে আমি এখনি ফোন করে সব জানাচ্ছি।” সুজিত সেন থামলেন। তারপর উৎসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। চেষ্টা করেও আর সংক্ষেপে বলতে পারছি না। ঘটনাটা তাহলে তুমি বুঝতেই পারবেনা।” উৎস গোলগোল চোখে সুজিত বাবুর দিকে তাকায়। তার চোখে ভয়মিশ্রিত বিস্ময়ের খেলা।

“আপনি বলে যান পুরোটা না শুনে এখন আমারও যাবার উপায় নেই কারণ—” একটু কি ভাবল সে, তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “আপনি বুঝতে পারছেন, আমি নিজের চোখে আপনার পুত্রবধূকে একবার নয়, তিনবার দেখেছি। কথা বলেছি, এমনকি তার নিয়ে আসা জল খেয়েছি। এগুলো তো স্বপ্ন নয়। ভেবে পাচ্ছি না আমাকেই বা সে দেখা দিল কেন?” উৎসের গায়ের রোমকূপ গুলো খাড়া হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সোমালী কে ঘিরে ওর মনে যে সুপ্ত উত্তেজনা জাগ্ৰত ছিল, সেটা এখন কপূরের মতো মিলিয়ে গেছে। বরং সেই স্থানে জমাট বাঁধছে একটা ভয়ের আস্তরণ।

সুজিত বাবুর কপালে চিন্তার রেখা। “ঠিকই বলেছ। আমি একা একা এতদিন এই বাড়িতে আছি। সোমালীর ছায়া পর্যন্ত দেখিনি। এমন কি কোনো অনুভূতি পর্যন্ত হয়নি। সে হঠাৎ কেন এভাবে তোমার সামনে প্রকট হলো!”

উৎস বলে ওঠে, “আপনি শেষটুকু তাড়াতাড়ি বলুন।” ভদ্রলোক হাতের আঙ্গুল মটকালেন। পাতলা চুলের ওপর একবার হাত বুলিয়ে বলতে শুরু করলেন-

“এর মধ্যে সোমালীর বাবা-মাকে ডেকে আমি সবকিছু বললাম। ওরা আমার মতোই আশ্চর্য হলো। ওর বাবা বলল- “বুঝতে পারছি না কিছুই। এমন কি ঘটল যে সোমালী এরকম অদ্ভুত আচরণ করছে! যাই হোক, ওরা এলেই আমি মেয়েকে আগে মনোবিদের কাছে নিয়ে যাব। দেখি কাউন্সেলিং করে ডাক্তার কী বলে?” রোহিত দুদিন বাদেই এসে হাজির হলো। সোমালীর সুন্দর মুখে এখনো পোড়ার দাগ। রোহিতের চেহারায় একটা বিমর্ষতার ছাপ। চোখের কোলে কালি। এমনি দেখে বা কথাবার্তায় সোমালীকে কিছু বোঝা গেল না। ওর বাবা এসে পরের দিনই মেয়েকে নিয়ে চলে গেল। রোহিত বলল ডাক্তারের কাছে সেও যাবে। আমি বাধা দিলাম না, কেননা ওরও একটা ডিউটি আছে। এখনও ছ’মাস হলো বিয়ে হয়নি। এখন কোথায় শখ-আহ্লাদ করবে, সে জায়গায় এই কাণ্ড! আমি ওকে ভরসা দিলাম। বললাম- “এসব সাময়িক ব্যাপার। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তার দেখানো হলো, তিনি ওষুধপত্র দিলেন। এবং বললেন—আবার পনেরো দিন পরে দেখবেন। কিন্তু এই পনেরো দিনের মধ্যেই অঘটন ঘটে গেল। সোমালী কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। ওই সব উল্টোপাল্টা আজগুবি কথাবার্তাও বলত না। রোহিতের মনেও অল্প শান্তি ফিরে এসেছিল। সেদিন সোমালীকে বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এখানে এল। কারণ সোমালী বায়না ধরেছিল এখানে আসার জন্যে।

সেদিনটা ছিলো শনিবার। বেশ একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। শীত এসে গেলেও খুব একটা জমিয়ে ঠান্ডা পড়েনি। সন্ধ্যেবেলা রোহিত বলল- “আজকে রাত্রে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার নিয়ে আসছি। রান্না করতে হবে না। কাজের মাসিকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হলো। আমি নিচে এই বৈঠকখানায় বসে সকালের পেপারটা পড়ছি। ছেলে বেরিয়ে গেছে খাবার আনতে। সোমালী ছিল ওপরের ঘরে। ও যে এরই মধ্যে ছাদে চলে যাবে বুঝতে পারিনি, একটু পরেই ধপাস করে একটা শব্দ হতেই আমি চমকে উঠলাম। মনে হলো ওপর থেকে ভারি কোনো জিনিস রাস্তার ওপর আছড়ে পড়ল। তারপরেই রাস্তার লোকজনের চেঁচামেচি কানে এল। দরজা খুলে বেরিয়ে দেখি রাস্তার ওপর সোমালীর দলাপাকানো রক্তাক্ত শরীরটা পড়ে আছে! সেই দৃশ্য দেখে মনে হলো আমি জ্ঞান হারাব। রোহিতও সেই সময়ে এসে পৌঁছল। সোমালীকে ধরাধরি করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে এলাম। ও যে বেঁচে নেই সে কথা বুঝতে আমাদের কারো অসুবিধা হলো না। পাড়া-প্রতিবেশী ভাবল সুইসাইড করেছে। কেউ বোধহয় পুলিশেও ফোন করে দিয়েছিল। থানা থেকে পুলিশ এসে হাজির। কিন্তু সোমালীর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার পর তারা সোমালীর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দিল।” একটানা কথা বলার জন্যে সুজিত সেনের কাশি এসে গেল, অল্প কেশে বললেন, “এরপর ছেলে দিল্লী চলে গেল, আমি এখানে এত বড় বাড়িতে একা। কাজের লোক এসে বেলায় কাজ করে দেয়। আর দুবেলা হোম ডেলিভারি থেকে এসে আমার খাবার দিয়ে যায়। কিন্তু বিশ্বাস করো একদিনের জন্যেও আমি সোমালীর অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভব করিনি….। সেইজন্যে তোমার কথা প্রথমে বিশ্বাস করতে মন চায়নি। কিন্তু তুমি যখন জোর গলায় বললে আর বাড়ির সবকিছু বর্ণনা করলে তখন আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।” সুজিত সেন উৎসের মুখের দিকে তাকাল। দেখলো সেখানে ভয়ের খেলা চলছে। উৎস সব শুনে ঘড়ি দেখতে ভুলে গেছে। মাথার মধ্যে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেছে মনের মধ্যে শুরু হয়েছে একটা ভয়ের ঝড়। কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ওর মনকে শান্ত করতে পারছে না। নিজের চোখকে সে অবিশ্বাস করবে কি করে? রাত বাড়ছে দেখে উঠে দাঁড়াল। ওর মুখ থেকে কতকগুলো অসংলগ্ন কথা বেরিয়ে এল।

“এতদিন ভূত প্রেত, আত্মা এই সব বইয়ে পড়েছি, গল্প শুনেছি। কিন্তু এখন…?” সারা কপালে ঘাম জমে উঠেছে তার। “বুঝতে পারছিনা- সোমালীর অতৃপ্ত আত্মা আমাকে কেন দেখা দিল? ওর সঙ্গে তো আমার কোনো সম্পর্ক নেই। একটু আগেও ওকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, তখনও জানতাম না সে মৃত!”

“বুঝতে পারছি তুমি ভীত হয়ে পড়েছ। যা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সাবধানে বাইক চালিয়ে যেও। তোমার ফোন নম্বরটা আমাকে দাও। কিছুক্ষণ বাদে ফোন করে জানব তুমি নিরাপদে বাড়ি ফিরলে কি না? এই মুহূর্তে কি করা উচিত তা আমার মাথায় আসছে না।” সুজিত বাবুর চিন্তিত কণ্ঠস্বর।

উৎস বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে। এই গরমেও তার কেমন শীত শীত লাগছে। শরীরের রোমকূপগুলো খাড়া হয়ে গেছে। কেন এত অস্বাভাবিক লাগছে? যা একটু আগেও হয়নি। হয়তো আসল সত্যটা জানার পর তার ইন্দ্রিয়গুলো কমজোরি হয়ে গেছে। এই শরীর নিয়ে এতখানি পথ বাইক চালিয়ে তাকে যেতে হবে। আপ্রাণ চেষ্টা করল মনকে দৃঢ় করার, তারপর বাইকে স্টার্ট দিয়ে মন্থর গতিতে বাড়ির দিকে চলল। তবু চিন্তা তাকে ছাড়ল না। অজস্র প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরে চলেছে। এর থেকে মুক্তি কিভাবে পাবে ভেবে পেল না।