চতুর্থ পৰ্ব
সুজিত সেন বৈঠকখানায় বসে আছেন। একটু আগেই একমাত্র ছেলে রোহিত দিল্লি থেকে এসে পৌঁছেছে। বয়সের তুলনায় ওকে একটু ভারিক্কি লাগে। গালে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, ব্যাক ব্রাশ করা চুল। রোহিত নিজেই দুজনের জন্য চা করেছে। জানে বাবার বয়স হচ্ছে। সোমালী মারা যাবার পর ও বাবাকে অনেকবার বলেছে দিল্লি চলে যাবার জন্য, তাছাড়া এই বাড়িতে স্ত্রীর দুর্ঘটনার পর থেকেই বাড়িটা কেমন যেন অপয়া লাগে তার কাছে। এরপর যখন উৎসের ঘটনাটা শুনেছে- সে একেবারেই চাইছে না বাবা একা-একা এত বড় পুরোনো বাড়িতে থাক। কিন্তু সুজিত বাবুর বাড়ির প্রতি একটা টান আছে। কত পুরোনো স্মৃতি এই বাড়ি জুড়ে। তার বিয়ে… ফুলশয্যা… সন্তানের জন্ম কত কী! তখন বাড়িটা থাকত সারাক্ষণ জমজমাট। সুজিত বাবুর বাবা-মা বেঁচে, তাছাড়া ছিল ঠাকুমা, সেইসব সুন্দর স্মৃতিকে হারিয়ে তার ছেলের ওই দু কামরা ফ্ল্যাটে যেতে মন চায় না।
কিন্তু উৎসের ব্যাপারটা ঘটাতে তার মনেও এখন দ্বিধা দেখা দিয়েছে। কেননা সেও এ কদিনে অদৃশ্য কারো উপস্থিতি অনুভব করছে। পুত্রবধূর লাল শাড়িটা কীভাবে খাটের ওপর পড়ে থাকতে পারে? কেননা শাড়ীটা ছিল আলমারির মধ্যে। তাছাড়া গতকাল রাত্রেও সোমালীর শোবার ঘরে খুটখুট শব্দ পেয়েছে, মাঝরাত্রে কারো পা টিপে টিপে চলার শব্দ কানে এসেছে। রাত্রের সেজন্য ভালো ঘুম হয়নি। সেও ভাবছে কখন রুদ্রবাবু এসে উপস্থিত হবে? গতকাল রাত্রে উৎসের কেমন কেটেছে সেটাও এখনও জানা হয়নি।
রোহিত বাবার চিন্তিত মুখ দেখে বলে, “তুমি কি কারো জন্য চিন্তা করছ?”
“ঠিক ধরেছিস।” তিনি চায়ের কাপটা টেবিলে রাখেন। “উৎসের কথা। কাল রাতে কেমন রইল কে জানে? ওর শরীরে ভয় যেন লেপ্টে আছে।”
“একবার ফোন করো।” রোহিত চা শেষ করে। সুজিত ফোন মেলায়। উৎস সবে বিছানা ছেড়ে উঠেছে। ফোন ধরে সুজিত বাবুর গলা পেয়ে, কালকের ঘটনাটা সবিস্তারে। জানায় এমনকি, ওর মা যদি আরেকটু দেরি করে ফেলত তাহলে ও আর বাঁচত না। সোমালীর দশা তার হতো। এরপর অনুনয় করে যদি ওই ভদ্রলোককে আজকে হাজির করা যায়, কারণ আবার একটা কালরাত্রি তাদেরকে কাটাতে হবে। দুর্ভাবনায় এমনিতেই তারা আধমরা, এরপরে ওই রকম ভৌতিক কার্যকলাপ আর সহ্য করা যাচ্ছে না। সুজিত বাবু মন দিয়ে উৎসের কথাগুলো শুনলো, তারপর বলল, “রুদ্র পণ্ডিত যে এতদূর আসছেন এটাই আমাদের সৌভাগ্য। আজ রাতেই তিনি ট্রেনে চাপবেন। আর একটা রাত ঠাকুরের নাম করে কাটাও।” এরপর উৎস আর কি বলবে।
সুজিত ফোন ছাড়ার আগে বলল, “কাল সকালেই এসে পৌঁছবেন, তারপর ওনার কথামতো তোমাকে আমি ফোন করব।” লাইন কেটে গেল। সুলোচনা চা নিয়ে এসেছে ছেলের জন্য, উৎসের দু চোখে রাজ্যের ক্লান্তি, এই কদিনেই চোখ মুখ বসে গেছে। সুলোচনা রান্নাঘর থেকে ছেলের কথাগুলো শুনছিল। বুঝল- আজকেও একটা অভিশপ্ত রাত তাদের কাটাতে হবে। এদিকে এসব কথা কাউকে বলাও যাচ্ছে না। তাহলে চারিদিকে ঢিঢিকার পড়ে যাবে। রং চড়িয়ে তিলকে তাল করবে প্রতিবেশীরা, শেষে অন্য বিপদ দেখা দেবে। জলখাবার খেতে ডাকল উৎসকে।
মধুর মা কাজ করে দিয়ে চলে গেছে। দুজনে খেতে বসেছে, কিন্তু কারো খাবারে রুচি নেই। চিন্তা মানুষকে এই পর্যায়ে নিয়ে যায়। সুলোচনার মনে কাল রাতের দৃশ্য বারবার ভেসে উঠছে। এক সেকেন্ড দেরি হলে তার ছেলেকে সে ফিরে পেত না। ছাদ থেকে এক পা শূন্যে বাড়িয়ে দিয়েছিল উৎস। কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার তার মনে ঘোরাফেরা করছে। আর থাকতে না পেরে ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, “বাপি, আমি ভেবে পাচ্ছি না সোমালী বলে মেয়েটার সঙ্গে তোর কী সম্পর্ক? তার আত্মা তোকেই বা বারবার দেখা দিচ্ছে কেন? তোকেই বা মরণের বুকে ঠেলে দিতে চাইছে কেন?” এই প্রশ্নগুলো ধাক্কা মারছে। সোমালী আত্মঘাতী হলে আগে নিকটাত্মীয়, প্রিয়জন এদের দেখা দেবে। তাই তো এতদিন জেনে এসেছি লোকমুখে। সোমালীকে দিন কয়েক আগেও সে চিনত না। কপালে চিন্তার রেখা নিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকায়।
“এ প্রশ্ন আমারও মা। আমার প্রতি কিসের আকর্ষণ?” ওর মনের এক কোণে ছোট্ট একটা উত্তর ভেসে ওঠে, সোমালীর রূপের আকর্ষণ তাকে বশীভূত করে ফেলেনি তো? প্রথম দেখাতেই সে একটা আকর্ষণ বোধ করেছিলো। কিন্তু মাকে সেই কথা বলা যায় না কি? দুজনেই জলখাবার অর্ধেক খেলো। সুলোচনা বললো, “একবার বাজারে যাবি, আনাজ পত্র কিছু নেই। পারলে একটু মাছ নিয়ে আয়, তোকে রেঁধে দেবো। এমনিতে কিছু খেতে পারছিস না।” উৎস জামা প্যান্ট পড়ে নেয়। বাইরে ইতিমধ্যে রোদের তেজ বেড়েছে। হাতে থলি নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। সুলোচনা ঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের জন্য ভাবনার ভূত ঘাড় থেকে নেমে যায়।
* * *
হোম ডেলিভারির খাবার সুজিত আর রোহিত টেবিলে সাজিয়ে নিয়েছে।
রোহিত এখনো পর্যন্ত ব্যাপারটা হজম করতে পারছে না। কই তার স্ত্রী তাকে তো একটিবারের জন্য দেখা দিচ্ছে না। অথচ উটকো কে এক ডেলিভারি বয়কে সর্বক্ষণ দেখা দিয়ে চলেছে। তাছাড়া বাবা ও নাকি পুত্রবধূর ঘোরাফেরা অনুভূত করতে পারছে! তবে একটা খটকা তার মনে লেগেছে, সেটা হলো বিয়ের পরেই সোমালীর আশ্চর্য পরিবর্তন। আত্মহত্যা করার এক অদ্ভুত প্রবণতা। সেই প্রশ্নের উত্তর সে এখনো খুঁজে পায়নি। উৎস যে ধরনের বিবরণ দিচ্ছে সে সব কথাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যে ছেলে এই বাড়িতে কোনোদিন পা রাখেনি, বা সোমালীকে কোনদিন দেখেনি! আচ্ছা এমনও হতে পারত সোমালীর সাথে ছেলেটার আগে থাকতে পরিচয় ছিল? কোনও প্রেমঘটিত ব্যাপার থাকতে পারে, কেননা উৎসের চেহারার বর্ণনা তার বাবার মুখ থেকে শুনেছে, রোহিতের থেকে অনেক হ্যান্ডসাম। সোমালী হয়ত বাবা-মায়ের চাপে বিয়েটা করতে বাধ্য হয়েছিল। মন থেকে রোহিতকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। এদিকে উৎস ভালো কাজ করে না, বিয়ে করে সংসার চালানোর মতো সে স্বাবলম্বী নয়। তাই মনের দুঃখে সোমালী সুইসাইড করার বারবার চেষ্টা করত। অবশেষে ছাদ থেকে পড়ে নিজের জীবন শেষ করে দেয়। কথাটা মনঃপূত হয় রোহিতের। সঙ্গে সঙ্গে সোমালীর প্রতি তার একটা ঘৃণার ভাব জেগে ওঠে।
“কীরে কী এত ভাবছিস খেতে খেতে?” বাবার কণ্ঠে রোহিত বাস্তবে ফিরে আসে।
“না তেমন কিছু নয়। ভাবছি রুদ্র কাকা এসে যদি এই অদ্ভুত ঘটনাটার সমাধান করে দিতে পারে, খুব ভালো হয়।” রোহিতও ছোটবেলায় একবার মা-বাবার সঙ্গে গৌহাটি গিয়েছিল। রুদ্র কাকার ক্ষমতার ওপর তারও একটা বিশ্বাস আছে।
“আমিও তো সেটাই চাইছি।” ভাত মুখে তুলতে তুলতে বলে সুজিত। “অতো তরতাজা ছেলেটা ভয়ে শুকিয়ে গেছে। আগে এসব বিশ্বাস করতাম না। রুদ্র বাবুর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর ধারণা পাল্টেছিল এই কয়েক বছরে ওইসব অতীন্দ্রিয় শক্তি, আত্মা, প্রেতাত্মা মনের মধ্য থেকে অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ উৎসের কথা আর ঘটনা শুনে পুনরায় মনের মধ্যে উদয় হচ্ছে। বেশ, এতদিন একা একা এত বড় বাড়িতে থাকতাম। এখন যেন মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে শিরশিরানি লাগে। বিশেষ করে সোমালীর ওই ভয়ঙ্কর মৃত্যু দেখার পর থেকে।” রোহিত চুপ করে থাকে, খাওয়া শেষে সুজিত বলেন, “একটু ভাত ঘুম দিয়ে নিই। তুই বরং তোদের শোবার ঘরটা শোবার ঘরটা বাদ দিয়ে ডান পাশের ঘরটায় শুয়ে পড়। কারণ রুদ্রবাবু এটাতে না থাকার নির্দেশ দিয়েছে।” মুখ হাত ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মোছে সে।
“ভালো কথা…।” রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলে, “কাল সকালে হাওড়া স্টেশনে যেতে হবে রুদ্রবাবুকে আনার জন্য।”
“যদি বলো আমি গাড়ি ভাড়া করে আনতে যাচ্ছি।” রোহিত বাসনগুলো বেসিনে রাখতে রাখতে বলে। কাজের মাসি এসে বিকেলে মেজে দিয়ে যাবে। কয়েকদিন হলো রাখা হয়েছে।
“তুই ছোটবেলা একবার দেখেছিস, যদি না চিনতে পারিস? বরং গাড়ি ঠিক করে দে আমি যাব।”
“তাই হবে।” রোহিত দোতলায় চলে যায়। নিজের শোবার ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে যায়। সকাল থেকে এসেও এখনও ওই ঘরেই ঢোকেনি। ফুলশয্যার স্মৃতি মনের কোণে ভেসে এল। দরজাটা বন্ধ, দোনামোনা করেও দরজাটা খুলল। তারপর পাল্লাটা খুলে ফেলল। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ঘরটা একবার পর্যবেক্ষণ করল। কাঠের জানালার খড়খড়ি গুলো বন্ধ থাকায় ঘরের ভেতরে আলোর আভাস কম। কেমন যেন গুমো গুমো গন্ধ ছাড়ছে। নাকটা দুবার টানল সে। খাটের ওপর সোমালীর একটা লাল শাড়ি পড়ে আছে। এই শাড়িটার কথা বাবা তাকে বলেছিল। সে অবাক হলো। আলমারি থেকে কে শাড়ীটা টেনে বার করল? বাবা নিশ্চয়ই বার করে মিথ্যা কথা বলবে না। তাছাড়া বাবার লাভ কী? এই খাটেই এই ওরা দুজনে কয়েক রাত কাটিয়ে দিল্লী চলে গিয়েছিল। হঠাৎ ওর ঘাড়ের কাছে কেউ যেন নিঃশ্বাস ফেলল। চমকে উঠে পিছনে তাকাল। কেউ নেই! বুঝল ওর মনের ভুল! আবার ঘরের দিকে তাকাতেই ও বিষম খেল। খাটের উপর লাল শাড়ীটা নেই, কেউ যেন জাদু মন্ত্রের সাহায্যে অদৃশ্য করে দিয়েছে। এবার রোহিতের স্নায়ুর শক্তি কমতে শুরু করল। এটা তো তার চোখের ভুল নয়। সে স্পষ্ট দেখেছে শাড়িটা! মুখ দিয়ে ভয় মিশ্রিত বিস্ময়ে “বা-বা-” বলে ডাকটা বেরিয়ে এল। সুজিত বাবু নিচ থেকে ছেলের ডাক শুনতে পেলেন। ছেলের অস্বাভাবিক কণ্ঠ তাকে দ্রুত সিড়ি বেয়ে উপরে আসতে বাধ্য করল। এসে দেখেন দরজার পাল্লা দুটো ধরে বড় বড় চোখে খাটের দিকে তাকিয়ে আছে।
“কি হলো? তুই আবার এই দরজাটা খুললি কেন?”
রোহিত বাবার দিকে কাঁপা গলায় বললো, “খাটের উপর লাল শাড়িটা…।” কথা আটকে যায় তার।
“শাড়ি?” সুজিতের গলায় প্রশ্নের চিহ্ন, “সেটা তুই পাবি কোথায়? আমিতো আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছি।”
“কিন্তু…” মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না ওর।
“খুলে বল কি হয়েছে?” সুজিতের মুখেও ভীতি।
“একটু আগে দেখলাম লাল শাড়িটা খটে রয়েছে।”
“ভুল দেখেছিস।” সুজিত বাবু ঘরে ঢুকে আলমারি খোলে ছেলের ভুল ভাঙাবার জন্য, তারপর লাল শাড়িটা বার করে ছেলের মুখের সামনে ধরে।
“এইতো শাড়ি…” রোহিত ভাঁজ করা শাড়িটা বড় বড় চোখ মেলে দেখতে থাকে। যেন চোখের সামনে জ্যান্ত অজগর সাপ দেখছে। তাহলে কি সত্যিই ভুল দেখেছে? তার চোখ দুটো তাকে ভুল দেখিয়েছে? কিন্তু ওর মস্তিষ্ক সে কথা সমর্থন করছে না। আলমারির মধ্যে শাড়ীটা দেখে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল, “যা দিয়ে এগিয়ে একটু শুয়ে পড়। অনেক জার্নি করে এসেছিস। তাছাড়া মাথায় ঘটনাগুলো ঘুরছে, তাই ভুল দেখেছিস।” রোহিত পায়ে পায়ে পাশের ঘরের দিকে এগোয়। কিন্তু সে বুঝতে পারছে এক লহমায় তার মনের জোর অনেকটাই কমে গেছে। সুজিত বাবু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল। তার মনে এক অজানা আশঙ্কা, ছেলে নিশ্চয়ই কিছু দেখেছে! সে কথা ওর চোখ মুখ জানান দিচ্ছে। মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকলো- আজকের রাতটা যেন ভালোয় ভালোয় কাটে। একই মিনতি উৎস আর ওর মায়ের। কিন্তু কিসের উপর এতোখানি বিশ্বাস করে তারা নিশ্চিন্ত হচ্ছে? রুদ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষমতা যদি না পারে সোমালীর বিদেহী আত্মার সদগতি না করতে? তারপর কি হবে? মনের কোণে চিন্তা থাকলেও তারা সেটা প্রশ্রয় দিচ্ছে না। মানুষ বিপদে পড়লে একটু আশার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। বর্তমানে তাদের কাছে আশার আলো রূপে বিরাজমান রুদ্রনাথ পণ্ডিত ।
* * *
বিকেলবেলা উৎস বাগানে পায়চারি করছিল। যত সন্ধ্যা এগিয়ে আসছে ওর মন তত অশান্ত হয়ে উঠছে। আজকের রাতে নতুন কী অভিজ্ঞতা ওর জন্য অপেক্ষা করে আছে, কে জানে? সুজিত বাবু জানিয়েছে কাল বেলায় ওকে ফোন করবে। রুদ্র পণ্ডিতের নির্দেশ কি দেয় কে জানে? সবকিছু দেখে যদি উনি হাল ছেড়ে দেন, তারপর? তাহলে এই বিপদ থেকে মুক্তির পথ কোথায়? কে দেবে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার হদিশ!
“বাপি চা খেয়ে যা।” ঘরে ভেতর থেকে মায়ের গলা কানে আসে। সারা বাগান জুড়ে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। গাছের পাতাগুলো স্থির। সূর্যের তাপ এখনও চারদিকে। ও বাগান থেকে ঘরে এসে ঢুকল। মায়ের মুখেও আর আগের হাসি নেই। এদিকে কাজ কামাই করে সে বসে আছে। এই টাকাতেই তাদের সংসার চলে। আর ব্যাঙ্কে বাবার কিছু টাকা আছে, তা থেকে কিছু সুদ পাওয়া যায়। তবু সুজিত বাবু যে সব শুনে গুণিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ও তাকে এখানে নিয়ে আসছে। এই যথেষ্ট। চা খেতে খেতে মাকে সে বলে, “দেখবে আমার মন বলছে উনি একটা ঠিক পথ বাতলে দেবে।” সুলোচনার মনের মধ্যেও একই চিন্তা কাজ করে চলেছে।
“তাই যেন হয় ঠাকুর…।” দু হাত জোড় করে মাথায় ঠেকাল সুলোচনা। চা খেয়ে উৎস বললো, “এখনও তো রাত্রি নামেনি। যাই ছাদে একটু পায়চারি করে আসি। ঘরের মধ্যে এই গুমোট গরমে থাকা যাচ্ছে না।” কথাটা শুনে মায়ের মনে শিহরণ খেলে গেল। কাল রাতের ঘটনাটা চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল।
“না বাপি। তুই এর মধ্যে সব ভুলে গেলি?” উৎসও বুঝতে পারছে না- ছাদটা তাকে হঠাৎ আকর্ষণ করছে কেন? সে কি শুধু গরমের জন্য না অন্য কিছু?
“যদি যেতেই হয় রাস্তায় খানিকটা ঘুরে আয়, আমি বরং ছাদের দরজাটা দিনের আলো থাকতে থাকতে দিয়ে আসি।” সিঁড়ি ভেঙে ছাদে চলল সুলোচনা। উৎস মায়ের ভয়ের কারণটা বুঝতে পারছে। দরজা বন্ধ করে নিচে চলে এল সুলোচনা।
“পশ্চিম আকাশে কালো মেঘ করেছে, মনে হয় ঝড়, জল হবে।” কথাটা শুনে উৎসের মুখ শুকিয়ে যায়। ঝড়, জল হওয়া মানেই কারেন্ট চলে যাওয়া। তাদের বাড়িতে ইনভার্টারও নেই। যদি সারারাত বিদ্যুৎ না আসে? অন্ধকারে ঝড় জলের মধ্যে একটা দুর্যোগ যেন ওকে গ্রাস করতে ক্রমশ এগিয়ে আসছে। অসহ্য গরমে সবাই চাইছে একটা কালবৈশাখী। কিন্তু ওরা সেটা মনেপ্রাণে চাইছে না। যেন অলক্ষ্যে বসে কেউ রচনা করে চলেছে তাদের সর্বনাশ।
খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় আশ্রয় নেবার সঙ্গে সঙ্গেই ঝড় উঠল। ঘরের দরজা-জানালাগুলো বাতাসের আঘাতে সশব্দে কেঁপে উঠল দালানের দিকে একটা জানালা শুধু খোলা। একটু ঠাণ্ডা বাতাসের জন্য ওদের মন আকুলি-বিকুলি করতে লাগল। ঘরের আলোটা দপদপ করে দু- তিনবার করল। উৎস হাতের কাছেই মোমবাতি আর দেশলাই রেখেছিল, আলো নেভার আগেই ও বাতি জ্বালাল। দালানের দিকে জানলা দিয়ে হাওয়া আসে না। ঘড়িতে সবে দশটা বাজে।
* * *
দুজনেই আজকেও একসাথে শুয়েছে। বাইরে শুরু হয়ে গেছে ঝড়ের তাণ্ডব। এখনো বৃষ্টি নামেনি।তাহলে ওরা বৃষ্টির শব্দ শুনতে পেত। বাগানে শুকনো পাতা আর কাঠি কুটো গুলো জানলা এসে পড়ছে। যেন মনে হচ্ছে কেউ জানলা খুটখুট করে শব্দ করছে। অন্য সময় হলে এই আবহাওয়া ওরা উপভোগ করতে পারত, রাতের ঘুম টাও ভালো হতো। কেননা একটু বাদেই ধরিত্রী ঠান্ডা হয়ে যাবে। বাইরে ঝড়ের শোঁ শোঁ শব্দের মধ্যেই বৃষ্টির কণাগুলো জানলার শার্সিতে পট পট শব্দে আছড়ে পড়তে শুরু করল। ঝড়ের গতি ক্রমশ বাড়ছে। ওরা দুজনে কান খাড়া করে বসে আছে. মনে হয় অন্য কিছু অস্বাভাবিক শোনার আশায়। তাহলে কি ওদের অবচেতন মন অন্য কাউকে আশা করছে?
“বাপি ঝড় দেখছি ক্রমশ বাড়ছে”- মায়ের গলায় আশঙ্কার সুর। ঘরের মধ্যে বাতির আলোয় দেওয়ালে ওদের ছায়া গুলো কাঁপছে।
দুশ্চিন্তার মুখে উৎস বলে, কখন থামবে কে জানে?
এই সময় কড় কড় করে বাজ পড়লো কাছে কোথাও। জানলার কাঁচগুলো সেই শব্দে ঝনঝন করে কেঁপে উঠল। কানে তালা লাগিয়ে দেবার মত শব্দ। এরপরেই শুরু হল ঘন ঘন বজ্রপাত। ক্রমশ বৃষ্টির বেগ বাড়তে লাগল। এরকম যদি কয়েক ঘণ্টা চলে রাস্তা ঘাটে জল জমে যাবে। বাতিটা ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে।
“মা, ঘরে আর বাতি আছে? এটা তো ছোট হয়ে এল!” অসহায় গলা উৎসের।
“রান্নাঘরের তাকে আছে.. দাঁড়া আমি নিয়ে আসছি।” মা খাট থেকে নামতে যায়। উৎস বলে ওঠে, “তুমি বস। আমি যাচ্ছি। অন্ধকারে পড়ে যেতে পারো।”
উৎস মোবাইলের টর্চ টা ব্যবহার করল। দরজা খুলে দালানে গেল। রান্না ঘরের দরজা খুলতেই একটা বোঁটকা আঁশটে গন্ধ নাকে এসে লাগল। তার মানে বাস্কেটে খাবারের টুকরোগুলো গরমে ইতিমধ্যে পচে গেছে। রান্নাঘরের তাক হাতড়েও বাতির খোঁজ পেল না। অগত্যা মা কে ডাকল। দুজনে মিলে তন্নতন্ন করে খুঁজেও বাতির হদিশ পেল না। জানলা দিয়ে বিদ্যুতের ঝলকানি চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। শেষকালে সুলোচনা বলে উঠল-
“বিকেলবেলা আকাশের অবস্থা দেখে দুটো বাতি এই সামনের তাকে রেখে দিয়েছিলাম।”
“কোথায় যাবে? ডানা মেলে উড়ে গেল?” এই প্রথম একটা রাগ এসে উৎসের শরীরে প্রবেশ করল। হয়ত ভয়টা চাপা দেওয়ার জন্য রাগ আসছে।
“চলো এবার না মোবাইলের ব্যাটারী শেষ না হয়ে যায়।”
সুলোচনা বিড়বিড় করে বলে, “তুই অযথা আমার উপর রেগে যাচ্ছিস।”
ওরা রান্নাঘর থেকে বেরোতেই অন্ধকারে ধাক্কা খেল। শোবার ঘরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। ওদের মুখ ভয়ার্ত আকার ধারণ করল। সুলোচনা অন্ধকারেই ছেলের হাত জড়িয়ে ধরল।
“বাপি, আমার মনে হয় এসব ওদেরই কারসাজি।” কথাটা কানে যেতেই উৎসের শরীর দিয়ে একটা শীতল বাতাস বয়ে গেল তাড়াতাড়ি ঘরে এসে মোবাইলের আলো টেবিলে ফেলল যেখানে বাতিটা জ্বলছিল। আশ্চর্য, আধপোড়া বাতিটা নেই! ঘরে কালো অন্ধকারের মধ্যে সরু ফিতের মত মোবাইলের আলোটা জ্বলছে তার ফলে ঘরে এক ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। দুজনে এখন কথা পর্যন্ত বলতে ভয় পাচ্ছে। খাটের ওপর জড়োসড়ো হয়ে দুজনে বসল। একটু সময় পরে মোবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে যাবে যার ফলে সারা দুনিয়ার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ঘন কালো অন্ধকারের মধ্যে প্রতিটা মুহূর্ত তাদের আতঙ্কে কাটাতে হবে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ ধীরে ধীরে কমে আসছে। বাতাসের করুণ বিলাপ ধ্বনিও কমতির দিকে তারমানে ঝড় জল কমছে। এখন একটাই মাত্র আশা যদি কারেন্টটা চলে আসে। মোবাইলে সময় দেখাচ্ছে রাত এগারোটা। ব্যাটারি চার্জ আর কিছু অবশিষ্ট আছে। ও মোবাইল টর্চটা নিভিয়ে দিতে ঘন ঘোর আঁধার ওদের উপর এসে পড়ল। এত অন্ধকার যে মায়ের মুখটা ও দেখা যাচ্ছে না।
ঘরের ভেতরটা ক্রমশ গরম হয়ে উঠেছে দরজা-জানলা বন্ধ থাকাতে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে সুলোচনা বলে উঠল, “বাপি বাগানের দিকে একটা জানালা খোল না হলে দম বন্ধ হয়ে মারা যেতে হবে।”
অনিচ্ছাসত্ত্বেও উৎস উঠল।
জানলার পাল্লা খুলতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া ঘরে এসে ঢুকল। আরাম বোধ হল। উৎস জানলার সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে শীতল বাতাস চোখে মুখে লাগাতে লাগল। কেমন যেন ঘুমঘুম ভাব চলে আসছে। মনে হচ্ছে কেউ হিমশীতল কোমল হাত দিয়ে তার সারা মুখে বুলিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে। সারা দেহে এক নরম অনুভূতি ছড়িয়ে যাচ্ছে চোখ খুলতে ইচ্ছে করছে না।
মায়ের ডাকে সম্বিত ফেরে উৎসের। “কিরে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে অতক্ষণ ধরে কি করছিস?” হুঁশ ফিরতেই জানলার কাছ থেকে ফিরে আসে উৎস। অন্ধকারে খাট টার সঙ্গে ধাক্কা লাগে। কোনোরকমে নিজেকে সামলায়। ফোনটা মেঝেতে পড়তে গিয়েও ধরে ফেলে।
“টর্চটা জ্বালা। পড়ে যাবি তো এই অন্ধকারে!” ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে সুলোচনা।
“আর ব্যাটারি নেই। জানিনা সারারাত এই অন্ধকারে কাটাব কী করে?” বিড়বিড় করে বলে উৎস। বাগানের দিকের জানলাটা খোলা রেখেই বিছানায় শুয়ে পড়ে। বাইরের ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢোকার জন্য চোখে ঘুম নেমে আসছে। দুজনেই এখন ঘুম চাইছে।
যাতে কোনোরকমে রাতটা কেটে যায়! সারা ঘর অন্ধকারে ঘুটঘুট করছে। উৎসের মাথায় ভাবনার ভুত হঠাৎ ভর করল। বাতিগুলো গেল কোথায়? কথাটা নতুন করে চিন্তা ঢোকাল। রান্নাঘরের বাতিটা না হয় মা ভুলে অন্য কোথাও রেখেছে কিন্তু ঘরের আধ জ্বলন্ত মোমবাতি টা কোথায় উধাও হলো? কেউ কি চাইছে বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে থাকুক? কে সে? অন্ধকারে চোখ খুলে তাকিয়ে থাকা আর না থাকা সমান। চোখের সামনে তাল তাল অন্ধকারের ডেলা। ঘুম আসতে গিয়েও আসছে না। একটা অচেনা ভয় সমস্ত শরীরে ঘিরে ধরছে। একটু পরেই মায়ের নাক ডাকার শব্দ কানে এল। সমস্ত দিন সংসারের খাটাখাটুনিতে ক্লান্ত তার ওপর এই ভৌতিক কান্ড! তাই ঘুমিয়ে পড়েছে সুলোচনা।
* * *
নিজেকে খুব একা মনে হচ্ছে উৎসের। মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকে কারেন্ট টা যেন চলে আসে। আলোর উৎসে মনের আঁধার অনেকটা কেটে যায় মায়ের নাক ডাকার আওয়াজ কে ছাপিয়ে অন্য একটা শব্দ ওর কানে আসছে সজাগ হলো ও। জানলার দিকে চোখ পড়ল বাইরের অন্ধকার ভেদ করে এক টুকরো আরো কালো অন্ধকার জানলার গরাদে আটকে আছে, মনে হচ্ছে কেউ যেন জানলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে! ওর দেহের ইন্দ্রিয়গুলো শিথিল হতে শুরু করল আশ্চর্যজনকভাবে সে দেখতে পাচ্ছে দেহহীন একটা মাথা জানলা ভেদ করে ঘরে ঢুকতে চাইছে!
চেষ্টা করল মাকে জাগাবার কিন্তু ব্যর্থ হলো। হাতদুটো কখন শিথিল হয়ে গেছে, দেহটা যেন অবশ হয়ে গেছে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর মত চিৎকার করার চেষ্টাও বিফল হলো। ফাঁক গলে অমানিশার মেঘ ঘরের মধ্যে চলে এসেছে। উৎসের মেরুদন্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বইছে কেননা দেহহীন মুন্ডটা ক্রমশ বিছানার কাছাকাছি চলে এসেছে। শূন্যে ভাসছে যেন। ওর মনে পড়ে গেল মোবাইলটার কথা। মনের সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করে টর্চটা জ্বালাল। সরু ফিতের মত টর্চের আলোতে সে ধড়হীন মাথাটাকে দেখতে পেল না। কিন্তু সেই অল্প আলোতে দেয়ালের দিকে চোখ পড়ল ঘরের কোণে একটা নারী ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। কী ভয়ঙ্কর তার মূর্তি! মুখের গঠন দেখলে যে কোনও সাহসী পুরুষও অচৈতন্য হয়ে পড়বে! এইবার উৎসের গলা চিরে অস্পষ্ট একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। সেই আওয়াজেই সুলোচনা’র ঘুমটা ভেঙে গেল। ছেলের গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিল- “এই বাপি কী হয়েছে! কোনো ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখছিস নাকি!”
মায়ের গলার শব্দে উৎসের মনে একটু সাহস জাগল। ভাঙা গলায় বলল, “ঘরের কোণে কে দাঁড়িয়ে আছে, দেখতে পাচ্ছ না?” উৎসের কথা শুনে মায়ের বুকটা ভয়ে হিম হয়ে যায় কেননা ছেলের গলায় বিশ্বাসের ছোঁয়া ও যে মিথ্যে বলছে না সেটা সুলোচনা বুঝতে পারে কিন্তু দেখার আগেই মোবাইলের ব্যাটারী শেষ হয়ে গেল। সারা ঘরে শুধু অন্ধকার হাহাকার করতে লাগল।
সবকিছু ভুলে সুলোচনা ছেলেকে জাপ্টে ধরে ঠাকুরের নাম করতে শুরু করল। বুকের মাঝে তার একমাত্র ছেলেটা ভীরু বালকের মত কাঁপতে লাগল যেন ছোট্ট ছেলে তার মায়ের বুকে আশ্রয় নিয়েছে।
“বাপি ওসব তোর মনের স্বপ্ন দুশ্চিন্তার ফল।” মিথ্যে সান্ত্বনার বাণী মায়ের কন্ঠে। কারণ ভেতরে ভেতরে সুলোচনাও উতলা হচ্ছে সেও এক পলকের জন্য দেওয়ালের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামূর্তিটা দেখেছে কিন্তু এই সময় দুজনে ভয় পেলে ভয় আরো দ্বিগুণ হয়ে তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে সেখান থেকে তারা ত্রাণ পাবে না। ইষ্টনাম জপ করতে থাকে সুলোচনা। ঘরময় একটা পচা চামড়ার গন্ধ খেলে বেড়াচ্ছে। কত সময় কেটেছে বলা যাবে না, হঠাৎ ঘরের আলোটা জ্বলে ওঠে। মুহূর্তে মনের মধ্যে থাকা ভয়গুলো লুটপুটি করে পালাতে শুরু করল। উৎস চোখ মেলে তাকায় মায়ের দিকে। মা বিড়বিড় করে তখনো ইষ্টনাম জপ করে যাচ্ছে। আলো আসাতে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। দুটো শরীরই ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইছে। উৎস কোনোরকমে চার্জারটা মোবাইলে গুঁজে দেয়। কেননা কাল সকালেই সুজিতবাবুকে ফোন করতে হবে। এই রকম দুঃসহ রাত আরো কাটাতে হলে সে হয় পাগল হয়ে যাবে, নয়তো আত্মহত্যা করে বসবে। যেমন সোমালী করেছিল।
ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে রাত বারোটা সেই সময় ওদের দুজনের চোখ গিয়ে আটকায় ঘরের কোণে যেখানে একটু আগেই কালো ধোঁয়ার মতো মূর্তিটা দাঁড়িয়েছিল সভয়ে দেখে সেখানে রান্নাঘরে থাকা বাস্কেটে মাছের এঁটোকাঁটা গুলো পড়ে আছে। মুখ শুকিয়ে ওঠে দুজনের। ভয়ের আস্তরণটা পুনরায় শরীরময় পুরু হচ্ছে। টেবিলে আধপোড়া বাতিটা রয়েছে, একটু আগেও যা ছিল না।
উৎস ভয়ে বলে ওঠে– “মা চলো বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশের বাড়ি অলোকদার কাছে যাই এখানে সারাটা রাত কাটানো খুবই মুশকিল।”
এত রাতে ওখানে গিয়ে কী বলবি? এসব কথা বলতে পারবি? কাল সকালেই সারা পাড়ার লোক জানবে। অনেকে আবার হাসি ঠাট্টা করবে নয়তো আমাদের বাড়ির বদনাম দিয়ে দেবে সুলোচনা ছেলে কে বোঝায়।
—কি- কিন্তু এখনো সারা রাতে আরো যদি কিছু ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে? পারব আমরা সামাল দিতে? আমরা দুজনে ভালোভাবে বুঝতে পারছি কোনো কালো ছায়া আমাদের চারপাশে এখনো রয়েছে। হতাশ কণ্ঠে সে বলে। সুলোচনা বুঝতে পারছে উৎস ক্রমশ ভেঙে পড়ছে তার নিজের মনের অবস্থাও তথৈবচ এই সময় একটা কথা তার মনে আসে।
“চল বাপি আমরা ঠাকুর ঘরে গিয়ে বসি সারাটা রাত ওখানে বসেই কাটিয়ে দেব আশাকরি ওখানে আত্মার আবির্ভাব ঘটবে না!” কথাটা মনে ধরে তার।
“তাই চলো” দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে ঠাকুর ঘরে ঢোকে। মা ও ছেলে দুজনে হাতজোড় করে ঠাকুরদের ছবিগুলোর সামনে বসে পড়ে। মনের মধ্যে একটা শুভশক্তি জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে মনটা শান্ত হতে থাকে রাত গভীর থেকে গভীরতর হয় ঠাকুর ঘর থেকেই শুনতে পায় সারা দালানে কে যেন দ্রুত পায়ে চলছে কখনো রান্নাঘরে বাসন পড়ার শব্দ পায় কখনো বা সরু গলায় গানের সুর খিলখিল করে হাসি। কিন্তু কখনোই তা সবকিছু ডিঙিয়ে ঠাকুর ঘরে প্রবেশ করে না। যেন কেউ ঠাকুরঘরের সামনে একটা লক্ষ্মণরেখা টেনে দিয়েছে এর ফলে দুজনেরই মনে সাহস ফিরে আসে। বুঝতে পারে ঠাকুর ঘরে তারা সুরক্ষিত।
সারা বাড়ি জুড়ে তান্ডব এক সময় বন্ধ হয়। শ্মশানের নীরবতা নেমে আসে। ঠাকুর ঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে বাইরের নীলচে আকাশ দেখা দেয়। আকাশের ফর্সা রং ওদের মনের মধ্যে এক স্বস্তির ছাপ ফেলে।
ভোরবেলা ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে উৎস বিছানায় আশ্রয় নেয়। সারারাত জেগে শরীর আর বইছে না। সুলোচনা দেখল এখন শুয়ে আর লাভ নেই, শুয়ে পড়লেই ঘুমিয়ে পড়বে। এদিকে ঘরের নোংরা গুলো পরিষ্কার করতে হবে, তাছাড়া রান্না ঘরে গিয়ে দেখলো থালা বাটি গ্লাস সব এদিক- ওদিক ছড়ানো বাসনপত্রে হাত দিতে গিয়েও বুক কাঁপল। অশরীরীর হাতের স্পর্শ লেগে আছে ঠাকুর ঘর থেকে গঙ্গাজলের ক্যানটা বার করে সারা বাড়িময় ছেটাতে শুরু করল তারপর গুছিয়ে স্নান করতে ঢুকলো।
