৪. যৌনতার ‘সন্দর্ভ’ একটি উনিশ শতকীয় প্রেক্ষিত

যৌনতার ‘সন্দর্ভ’ একটি উনিশ শতকীয় প্রেক্ষিত

‘সন্দর্ভ’ ও যৌনতা

ফুকোর ‘সন্দর্ভ’তত্বে তিনটি স্পষ্ট পর্যায়ক্রমিক বিভাজন লক্ষ করা যায়: ‘প্রত্নতত্ব’, ‘বংশানুচরিত’ এবং ‘সমস্যায়িতকরণ’ ৷ যে কোনো সামাজিক/জাগতিক বিষয়বস্তু যখন প্রণালীবদ্ধভাবে ‘বাচন’ বা মতবাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ওঠে, তখনই তা পরিণত হয় ‘সন্দর্ভ’ বা ‘ডিসকোর্সে’ ৷ যেকোনো যুগপরিসরে ‘ডিসকোর্স’ গড়ে ওঠে ‘জ্ঞান’ ও ‘ক্ষমতা’র যৌগপত্যে ৷ ফুকোর ডিসকোর্স-ভাবনা মূলত গড়ে উঠেছে দুই দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, প্রথমটিকে বলা যেতে পারে ‘উপাদানগত’ বা ‘গঠনমূলক’ দৃষ্টিকোণ এবং দ্বিতীয়টি হল ‘কৌশলগত’ দৃষ্টিকোণ ৷ প্রথম দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী ‘ডিসকোর্স’ গড়ে ওঠে ‘স্বয়ংক্রিয়’ পদ্ধতিতে—এর অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক নিয়মকানুনগুলিই ফুকোর অন্বিষ্ট ৷ উত্তর-রেনেসাঁস পর্বে ইউরোপীয় সমাজে ‘উন্মাদনা’, ‘চিকিৎসাকেন্দ্র’ প্রভৃতি গড়ে ওঠার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিগুলিই ফুকো খুঁজেছেন এই ‘প্রত্নতাত্বিক’ অনুসন্ধানপ্রণালী দ্বারা ৷ পরবর্তী সময়ে ‘অনুশাসন ও শাস্তি’ থেকে শুরু করে ‘যৌনতার ইতিহাস’-এর প্রথম খণ্ড পর্যন্ত ফুকো অনুসরণ করেছেন ‘বংশানুচরিত’ প্রণালী ৷ এক্ষেত্রে ফুকোর অনুসন্ধানের ‘ক্ষেত্র’ হল সামাজিক পরিসরে কোন কোন ক্ষমতাতন্ত্র ওই সকল ডিসকোর্সের ঐতিহাসিক উদ্ভাবন সম্ভব করেছে, কোন কোন ‘ডিসকার্সিভ’ অনুশীলন, অনুসন্ধান ও প্রযুক্তির যৌথ প্রয়াসে ‘অপরাধ’ বা ‘যৌনতা’ নামক ‘সন্দর্ভ’টি কার্যকরী রূপ পায় ৷ উপরোক্ত দুই প্রণালীর সম্মিলিত রূপই ফুকোর শেষ জীবনের ‘সমস্যায়িতকরণ’-সংক্রান্ত ভাবনা, যেখানে সামাজিক ‘জ্ঞান’/‘ক্ষমতা’র দ্বারা ডিসকোর্স নির্মাণের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘বিষয়ী’ নিজে ৷ বর্তমান আলোচনায় প্রথম দুটি পদ্ধতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ফুকোর মতে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগপর্যায়ে (যাকে তিনি বলেছেন ‘এপিস্টেম’), ‘ডিসকোর্স’ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় ওই নিয়মগুলিই ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয় ৷ এক্ষেত্রে, আঠারো-উনিশ শতকের ইউরোপীয় সমাজে যে ‘আধুনিক’ যৌনতার ডিসকোর্স গড়ে ওঠে, তার পরিচয় গ্রহণ করব আমরা ৷ অতঃপর দেখতে চাইব, ঔপনিবেশিক বাংলায় ওই পাশ্চাত্য ডিসকোর্সের প্রভাব কতোখানি পড়েছিল, কীভাবে পড়েছিল বা আদৌ পড়েছিল কিনা ৷ বলাই বাহুল্য, ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় ‘সাদৃশ্য’ নয়, বরং ‘পার্থক্য’ই পাশ্চাত্য ডিসিপ্লিন ও ডিসকোর্সের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করেছে ৷

ফুকোর ‘প্রত্নতাত্বিক’ সন্দর্ভতত্ব প্রথমেই খারিজ করে দেয় ডিসকোর্সের ভিতর কোনো নিহিত উৎস বা পরম অর্থের উপস্থিতির সম্ভাবনা ৷ বিপরীতে, ফুকো ব্যাখ্যা করতে চান সেই অসমসত্ব, পরস্পরবিরোধী অসংখ্য ‘স্টেটমেন্ট’গুলিকে, যেগুলি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিসরে উৎপাদন করে ‘সন্দর্ভক্ষেত্র’ ৷ এই ‘সন্দর্ভক্ষেত্র’ গড়ে ওঠে ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত অথচ অনিশ্চিত কয়েকটি ‘গঠনমূলক নিয়মাবলি’র দ্বারা ৷ ‘জ্ঞানের প্রত্নতত্ব’ বইতে তিনি বিস্তৃত আলোচনা করে দেখিয়েছেন ‘ডিসকোর্স’ গড়ে ওঠে মূলত চারটি নির্দিষ্ট উপাদানকে কেন্দ্র করে, যথাক্রমে: ‘বিষয়’ উৎপাদন, নিয়মতান্ত্রিক ‘উচ্চারণপ্রণালী’, ‘ধারণা’র নির্মাণ এবং ‘কৃৎকৌশলে’র উদ্ভাবন ৷ এই চারটি উপাদান নিয়ে একটু বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন ৷

‘ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিস’গুলি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন নতুন ‘বিষয়’-এর উদ্ভাবন ঘটায়, যেগুলি কেন্দ্র করে ‘ডিসকোর্স’ গড়ে ওঠে ৷ ডিসকোর্সের অন্তর্গত নিয়মাবলির সঙ্গে সম্পর্কিত থেকেই তারা ‘বিষয়’ হিসেবে মান্যতা লাভ করে এবং এর মধ্য দিয়েই তাদের আবির্ভাবের ঐতিহাসিক প্রাকশর্তসমূহ নির্ধারিত হয় ৷ এরকমই দুটি নতুন ডিসকোর্সের বিষয় হল: ধ্রুপদী যুগে ‘উন্মাদনা’ এবং উনিশ শতকে ‘যৌনতার বিজ্ঞান’ ৷ ‘সেক্সুয়ালিটি’ যে একটি পুরোদস্তুর বিজ্ঞানের বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তা যেন এর আগে ঐতিহাসিকভাবেই সম্ভব ছিল না ৷ একইভাবে উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাংলাতেও চিকিৎসাশাস্ত্র, ‘আধুনিক’ পাশ্চাত্য চিকিৎসাব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান এবং ভাবধারার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘যৌনতার বিজ্ঞান’ও একটি নতুন এথিকো-মেডিক্যাল ডিসকোর্সের বিষয়বস্তু হিসেবে উদ্ভুত হয় এবং পত্র-পত্রিকা, যৌনবিজ্ঞানের বই প্রভৃতির মধ্য দিয়ে এর ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় কার্যকর হয়ে ওঠার গঠনমূলক নিয়মগুলি বিকশিত হতে থাকে ৷ এক্ষেত্রে ডিসকোর্সের ‘বিষয়’গুলি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে আরো তিনটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন ফুকো: প্রথমটি ‘উৎপাদনের ভিত্তিভূমি’, দ্বিতীয়টি ‘নির্ধারক কর্তৃক’ এবং তৃতীয়টি ‘নির্দিষ্টকরণের কৌশল’ ৷ প্রথম ক্ষেত্রে সেই সামাজিক সম্পর্কগুলিকে চিহ্নিত করা হয়, যেগুলির মধ্য দিয়ে কোনো একটি সামাজিক অভ্যাস বৈজ্ঞানিক ডিসকোর্সের উপাদানে পরিণত হয় ৷ দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সেই সামাজিক কর্তৃত্বের কথা ভাবা হয়, যারা কোন উপাদান কোন নির্দিষ্ট ডিসকোর্সের অন্তর্ভুক্ত হবে, সেটি নির্ধারণের অধিকারী; তৃতীয় ক্ষেত্রে ডিসকোর্সের উপাদানগুলিকে তাদের নিজস্বতা অনুসারে প্রণালীবদ্ধ করা হয় ৷ যেমন, উনিশ শতকের ইউরোপে কোনো কোনো পাগলামির লক্ষণকে ‘মানসিক’, আবার কোনো কোনো পাগলামিকে ‘শারীরিক’ উন্মাদনা হিসেবে পৃথগীকৃত করা হত ৷

ডিসকোর্সের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘নিয়মতান্ত্রিক উচ্চারণপদ্ধতি’ ৷ ‘আধুনিক’ সমাজে বিধিবদ্ধ শিক্ষা এবং অনুশীলনের মধ্য দিয়ে ‘বিষয়ী’ কোনো একটি সামাজিক ডিসকোর্স সম্পর্কে কথা বলার বিশেষ অধিকার লাভ করেন (যেমন, ডাক্তারই কেবলমাত্র শরীর/মন-সংক্রান্ত কোনো বৈজ্ঞানিক ঘোষণার অধিকারী হন) ৷ এক্ষেত্রে কয়েকটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র’ গড়ে ওঠে, যেখান থেকে বিশেষজ্ঞের উক্তি উচ্চারিত হয় (যেমন, ক্লিনিক বা হাসপাতাল, যেখান থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা তাঁদের মতামত জানান) ৷ এর ফলে অনেকগুলি নতুন ‘বিষয়ী অবস্থান’ গড়ে ওঠে, যেখান থেকে উচ্চারিত উদ্ধৃতিসমূহ বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে (যেমন, আধুনিক ‘মনোচিকিৎসক’ নামক বিষয়ী-অবস্থান, যে কোনো ব্যক্তি ‘ডিসকার্সিভ’ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে ওই অবস্থান গ্রহণের অধিকারী হয়ে ওঠেন এবং একমাত্র তখনই তাঁর উক্তি সামাজিকভাবে মান্যতা লাভ করে) ৷ উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রচলন ও প্রতিষ্ঠা ঘটতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে ‘শরীর’/‘যৌনতা’-সংক্রান্ত এধরনের ‘বিষয়ী’ অবস্থানগুলি বিকশিত হতে শুরু করে ৷ যদিও, উপনিবেশের নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী এই বিশেষ অবস্থানগুলিও পাশ্চাত্য ডিসকোর্সের অনুরূপ হয়নি ৷ উনিশ শতকের বাংলা সেক্স-ম্যানুয়াল ও চিকিৎসাশাস্ত্র-বিষয়ক পত্রিকার এথিকো-মেডিক্যাল প্রবন্ধাবলিই তার প্রমাণ ৷

তৃতীয়ত, ‘ধারণা’র নির্মাণ ৷ এক্ষত্রে ফুকো খুঁজতে চান ‘বিবিধ ডিসকার্সিভ’ উচ্চারণের ভিতরকার আন্তঃসম্পর্ক ও যৌক্তিক পরম্পরা, যার সাপেক্ষে কোনো একটি উচ্চারণ ডিসকোর্সের অন্তর্ভুক্ত হয়, অথবা, ডিসকোর্স থেকে বহিষ্কৃত হয় ৷ ‘ডিসকোর্স’ হল প্রত্যক্ষ জ্ঞানের পুঞ্জীভূত রূপ—এ হেন মতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ফুকো বলতে চান, ‘ডিসকোর্স’ হল জাগতিক বিষয়বস্তুর গভীরে এক ধরনের হস্তক্ষেপ করার পদ্ধতি যার মধ্য দিয়ে একটি ‘স্টেটমেন্ট’ আরো অনেক ‘স্টেটমেন্ট’-এর জন্ম দেয় ৷ ফুকো এই প্রক্রিয়াকে ‘অনুবাদ’, ‘প্রতিবর্ণীকরণ’ এবং ‘পুনঃবর্ণীকরণ’ ব্যাখ্যা দিতে চান ৷ এক্ষেত্রে উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য যৌনতার ডিসকোর্সের দেশীয় প্রেক্ষিতে ‘অনুবাদে’র প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ, যেটির উপরে বর্তমান আলোচনায় আলোকপাত করা হবে ৷

চতুর্থত, ‘কৃৎকৌশল’র প্রসঙ্গ ৷ যে মতবাদ বা মতাদর্শের সাপেক্ষে ‘ডিসকোর্স’ মান্যতা লাভ করে, তাকেই বলা হয়েছে ‘কৃৎকৌশল’ ৷ যেমন, আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের ‘ডিসর্কোর্স’ হিসেবে ‘মাকর্সবাদে’র আবির্ভাব ৷ ফুকোর মতে, ‘কৃৎকৌশল’ হল কয়েকটি অবচেতন নিয়ম, যেগুলি নেপথ্যে কার্যকর থেকে ‘ডিসকোর্স’কে ফলপ্রসূ করে তোলে ৷ এক্ষেত্রে, যেকোনো ‘ডিসকোর্সে’র ভিতরেই রয়ে যায় ৷ কয়েকটি ‘ব্যবর্তনবিন্দু’, যার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী একাধিক ‘স্টেটমেন্ট’ একই ‘ডিসকোর্সে’র ভিতর অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয় ৷ যার ফলে মীমাংসার অযোগ্য একাধিক উপাদান তাদের যাবতীয় বৈপরীত্য সমেত একই ‘ডিসকার্সিভ প্র্যাক্টিসে’র ভিতর স্থান পায় ৷ ফুকো একেই বলেছেন ডিসকোর্সের ভিতর নন-ডিসকার্দিভ উপাদানের অনুপ্রবেশ ও অস্তিত্ব বজায় রাখা ৷ আমাদের উনিশ শতকীয় সামাজিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে এই ‘নন-ডিসকার্সিভ’ প্র্যাকটিসের উপস্থিতি অপরিহার্য ৷ কারণ, পাশ্চাত্য জ্ঞানের ‘ডিসকোর্স’ আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় কোনোদিন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি ৷ বরং প্রাক-ঔপনিবেশিক আচার-আচরণ, অভ্যাস ও জ্ঞানকাঠামো এখানে পাশ্চাত্য ডিসকার্সিভ জ্ঞানকাঠামোর পাশাপাশি বজায় থেকেছে ৷ এ প্রসঙ্গেও ফুকোর তাত্বিক পরিকাঠামো আমাদের সাহায্য করতে পারে ৷ যে কোনো যুগপর্যায়ে ‘ডিসকোর্স’ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় তিনি দেখেছিলেন, একই সন্দর্ভের ভিতরের অন্তঃস্থ উপাদানসমূহ, একাধিক সন্দর্ভের ভিতর আন্তঃসম্পর্ক এবং সন্দর্ভ-বহির্ভূত উপাদানের উপস্থিতি ও পারস্পরিক প্রভাব ৷১০

‘প্রত্নতত্ব’ যদি হয় ‘সন্দর্ভ’ গড়ে ওঠার অন্তর্গত নিয়মাবলীর অনুসন্ধান এবং সেই নিয়মাবলীর বর্ণনা ও ব্যাখ্যা, ‘বংশানুচরিত’ তবে সন্দর্ভ গড়ে ওঠার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখা ৷ স্বতঃস্ফূর্ত নিয়মের প্রযুক্তি নয়, বরং এখানে বিবেচ্য ইতিহাসের সেই অন্তর্গত গঠন, যা গড়ে তোলে ডিসকোর্স ও জ্ঞানকাঠামোকে ৷১১ ফুকোর মতে ইতিহাসিক ‘সত্য’ আসলে গড়ে ওঠে ‘জ্ঞান’/‘ক্ষমতা’র যৌগপত্যে ৷ ‘যৌনতার ইতিহাস’-এর প্রথম খণ্ডে এই ‘জিনিওলজিক্যাল’ অনুসন্ধানপদ্ধতি প্রযুক্ত হয়েছে ৷ এর মধ্য দিয়ে ফুকো খুঁজতে চেয়েছেন ‘সত্য’, ‘ক্ষমতা’, ‘যৌনতা’ ও ‘শরীর’-এর জটিল আন্তঃসম্পর্ক ৷ দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই ধারণাই বলবৎ ছিল যে, ধ্রুপদ’ যুগের খোলামেলা যৌন উচ্চারণে ঐতিহ্য ক্রমশ অন্ত্য-আঠারো শতক এবং উনিশ শতকীয় ভিক্টোরীয় বুর্জোয়া আধুনিকতার অবদমন প্রক্রিয়ার চাপে নৈঃশব্দ্যে পর্যবসিত হয়েছে ৷ কিন্তু ফুকো দেখাতে চেয়েছেন ঠিক এর উলটো ছবি ৷ তিনি দেখিয়েছেন, ওই ‘আধুনিক’ কালপরিসরে যৌনতার উপর সামাজিক/পারিবারিক/রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন যেমন সত্য, তেমনই সত্য ‘যৌনতাবিষয়ক সন্দর্ভের বংশবিস্তার’ ৷ অসংখ্য বইপত্র, আলোচনা, নৈতিক চিকিৎসাশাস্ত্রীয় লেখালেখির মধ্য দিয়ে যৌনতা বিষয়ক আলোচনার বিস্তার ঘটতে শুরু করল এবং ‘যৌনতা’ই যে ব্যক্তিসম্পর্কিত ‘সত্য’ উৎপাদনের হাতিয়ার—এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হবার সঙ্গে সঙ্গে যৌনতা সম্পর্কিত উচ্চারণ একটি দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা লাভ করল এবং যৌনতা-সম্পর্কিত উচ্চারণের বিস্তারই এর পাশাপাশি ডেকে আনল যৌনতাকে অবদমিত করার অসংখ্য প্রক্রিয়াকে ৷১২ এভাবেই গোটা উনিশ শতকব্যাপী ইউরোপীয় সমাজে যৌনতার ডিসকোর্সের স্বাভাবিক ধারাবাহিক বিকাশ এবং গুরুত্ব আরোপের প্রক্রিয়াটি বাড়তে থাকে ৷

বস্তুত, আঠারো-উনিশ শতকের ইউরোপীয় সমাজে যৌনতার ‘অবদমনের প্রকল্প’ বা ‘রিপ্রেসিভ হাইপোথিসিস’-সংক্রান্ত ধারণাটি উইলিয়ম রিখ প্রমুখ বিশ শতকীয় মার্কসবাদী তাত্বিকদের ভাবনার ফল ৷ ফ্রয়েড এবং মার্কসের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে রিখ দেখাতে চেয়েছেন ইউরোপীয় উদীয়মান বুর্জোয়া সমাজে যৌনতাকে অবদমিত করা হয়েছিল, প্রধানত, ধনতন্ত্রের উৎপাদন-প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার অন্যতম উপাদান শ্রমশক্তিকে তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা অনুসারে ব্যবহারোপযোগী করে তুলতে ৷ অতিরিক্ত যৌনতা যেহেতু স্বাস্থ্যক্ষয় ঘটায়, তাই শ্রমিকের শরীর ও যৌনতাকে রাষ্ট্রশক্তি ও সামাজিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল কায়েমি স্বার্থে ৷ কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল ঠিক এর উলটো ৷ শ্রমিকশ্রেণির বদলে এই নতুন যৌনতার ডিসকোর্স অনেক বেশি নজরদারি প্রয়োগ করতে চেয়েছিল বুর্জোয়া সমাজের উপরেই ৷ উচ্চবিত্ত সমাজের গৃহিনী, ভদ্রলোক এবং স্কুলছাত্রই হয়ে উঠল এই নতুন ‘প্যানঅপটিক্যান’-এর কেন্দ্রবিন্দু ৷ অতীতে সামন্ততান্ত্রিক অভিজাত সমাজ যেমন তাঁদের ধমনীতে প্রবাহিত রক্তের ভিতর নিজেদের আভিজাত্যের প্রমাণ খুঁজত, তেমনই নতুন বুর্জোয়া সমাজের কাছে নিজেদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, নৈতিক মান, তেজস্বিতা, ধারণশক্তি এবং প্রজননক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়াল যৌনতা ৷ যৌনতা হয়ে উঠল সমগ্র জীবনপ্রণালী ও প্রক্রিয়াকে সঠিক পথে পরিচালনা এবং সংরক্ষণের প্রতীক ৷ ‘অনুশাসন’-ক্ষমতা প্রযুক্ত হল দুটি পৃথক কেন্দ্রে: প্রথমটিকে বলা যেতে পারে, ‘ব্যক্তিগত’ শরীর এবং দ্বিতীয়টি জনসমষ্টির সমগ্র অংশকে মিলিয়ে ‘সামাজিক’ শরীর ৷ উভয়ের একত্র চেহারাই হল আধুনিক ‘জৈব-ক্ষমতা’ বা ‘বায়ো-পাওয়ার’ ৷ পূর্বোক্ত ‘অবদমনের প্রকল্প’ যদি হয় ক্ষমতাসম্পর্কিত ‘আইনি সন্দর্ভে’র ধারণা, যেখানে ‘ক্ষমতা’ সর্বদাই যৌনতার বিপরীতে অবস্থান করে, শেষোক্ত ‘জৈব-ক্ষমতা’ সেখানে নিয়ে আসে আরো বেশি সূক্ষ্ম, নিয়ন্ত্রণক্ষম এবং ইতিবাচক উৎপাদিকা শক্তির ধারণা, যার মধ্য দিয়ে ‘স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া’ এবং ‘অনুশাসনের প্রযুক্তি’ ব্যক্তির শরীরের উপর কাজ করে দুই পৃথক স্তরে:

প্রথমত, নিয়ন্ত্রণ, অনুশীলন, অনুশাসনের মধ্য দিয়ে শরীরের অন্তর্গত শক্তি ও কার্যকারিতার সর্বোচ্চ বিন্দু স্পর্শ করা ৷ এক্ষেত্রে শরীরকে উৎপাদনযন্ত্রের মতই একটি ব্যবহারযোগ্য, প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক একক হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে ৷ এর বাহ্যিক উদ্দেশ্য শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়ানো হলেও, ফুকো দেখাচ্ছেন, এর মধ্য দিয়ে ‘শরীর’ আসলে পরিণত হচ্ছে ‘বন্দী শরীর’-এ ৷

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিশরীর নয়, বরং জনসমষ্টিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘শারীরিক’ একক হিসেবে ধরে নিয়ে জনজীবনের ভিতর ‘ক্ষমতা’র নিরন্তর অনুপ্রবেশ ও নজরদারি বজায় রাখা ৷ জনসমষ্টির গড় বংশবৃদ্ধির হার, জন্ম-মৃত্যুর অনুপাত, জন্মনিয়ন্ত্রণের আনুপাতিক সাফল্য, সামাজিক স্বাস্থ্য, জীবনীশক্তি, যে কোনো ধরনের সামাজিক বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার শক্তি সব কিছুই এক কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকাঠামোর অধিকারে নিয়ে আসা ৷ প্রথম ক্ষেত্রের তুলনায় দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ‘ক্ষমতা’-র রাজনৈতিক চেহারাটি আরো বেশি পরিস্ফুট হচ্ছে, কারণ রাষ্ট্রশক্তি এখানে সরাসরি গোটা সমাজকেই পরিণত করছে একটি ব্যবহারযোগ্য, নিয়ন্ত্রণযোগ্য ‘শরীর’-এ ৷

এর ফলেই গড়ে ওঠে ‘মানবজীবনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা’ ৷ বৃহত্তর উপযোগিতা, সক্ষমতা এবং উৎপাদনক্ষমতার সূত্রেই এই নতুন ‘জৈবক্ষমতা’ একদিকে ব্যক্তিশরীরের ‘অণুপদার্থবিদ্যা’ এবং ‘সামাজিক শরীর’কেও ‘যৌনশরীর’-এ পরিণত করার অধিকারী হয়ে ওঠে ৷ এভাবেই যৌনতা হয়ে ওঠে ‘সামাজিক ক্ষমতা’র সূচক ৷১৩ এই ‘ জৈবক্ষমতা’র রাজনৈতিক চেহারাটিকেই ফুকো আখ্যা দিয়েছেন ‘প্রশাসনিকতা’ বা ‘শাসনতান্ত্রিকতা’ এবং ‘রাখালিয়া ক্ষমতা’ বা ‘প্যাস্টোরাল পাওয়ার’ ৷ ‘শাসনতান্ত্রিকতা’ হল ‘রাষ্ট্রক্ষমতা’ ও ‘সামাজিক ক্ষমতা’র সেই নৈর্ব্যক্তিক চেহারা, যেখানে ‘ক্ষমতা’ আদৌ দমনপীড়নের পথে যায় না, বরং এক সুবিস্তৃত ও সুগভীর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের জাল গড়ে তোলে, যা বাস্তবে নিজের প্রয়োগ ঘটায় জীবন-যাপনের প্রত্যেকটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে ৷১৪ বিপরীতে, ‘প্যাস্টোরাল ক্ষমতা’ কোনো ভাবেই আইনি প্রক্রিয়ায় যায় না, বলপ্রয়োগ করে না, এই ‘ক্ষমতা’ অনেক বেশি সৃজনশীল, তা রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনে modesty, charity, loyalty, industriousness, friendly co-operation, honesty সৃজিত করে ৷১৫ ফুকোর মতে, ‘আধুনিক ক্ষমতা’র এই দুই পৃথক মাত্রাই একত্রে প্রযুক্ত হয়ে ‘ক্ষমতা’কে করে তুলেছে তীব্রভাবে ‘শরীর-কেন্দ্রিক’ ৷

আধুনিক ইউরোপ ও যৌনতার ‘সন্দর্ভ’

ফুকোর ‘যৌনতার ইতিহাস’-এর প্রথম খণ্ড শুরু হয়েছে ‘অবদমনের প্রকল্পে’র ধারণাটিকে সমস্যায়িত করার মধ্য দিয়ে ৷ সতেরো শতক থেকেই যৌনতা ও শরীর-সংক্রান্ত যেকোনো উচ্চারণকেই নৈঃশব্দ্যের অন্তরালে নিয়ে যাবার প্রক্রিয়া শুরু হয় ৷ শ্লীলতা-অশ্লীলতা সংক্রান্ত ধারণাকে পুনর্গঠিত করার পাশাপাশি সামাজিক জীবনের সর্বত্রই যৌন অভিব্যক্তি প্রকাশের পৃথক বৈধ-অবৈধ এলাকা নির্মাণের ধারণাটি গুরুত্ব পেতে থাকে ৷ পিতামাতা ও সন্তান, শিক্ষক ও ছাত্র, প্রভু ও ভৃত্য—এগুলি পৃথক বর্গের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় ৷ এবং সর্বত্র যৌন উচ্চারণ-সংক্রান্ত অলিখিত নৈতিক নির্দেশনামা গড়ে ওঠে ৷ কিন্তু এই নেতিবাচক মনোভাবের পাশাপাশি ক্রমান্বয়ে যার বৃদ্ধি ঘটতে থাকে, তা হল যৌনতা-বিষয়ক ডিসকোর্স, যৌনতা সম্পর্কে আরো বেশি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যৌনতার অনুপুঙ্ক্ষ উচ্চারণকে শুনে যাওয়া, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তোলা ৷ এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটিই হল খ্রিস্টীয় ‘স্বীকারোক্তি’ বা ‘কনফেশন’, যাকে আঠারো-উনিশ শতকীয় যৌনতার ডিসকোর্সের ‘সত্যের এষণা’র সঙ্গে সম্পর্কিত ভেবেছেন ফুকো ৷ আঠারো শতক থেকেই পূর্ববর্তী দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ‘কনফেশন’-পদ্ধতিতে কয়েকটি লক্ষণীয় পরিবর্তন আসে ৷ যৌনতা-বিষয়ক স্বীকারোক্তি ক্রমশই ঝুঁকে পড়ে অনুপুঙ্ক্ষ তথ্যসন্ধানের দিকে ৷ সঙ্গমকালে নারী-পুরুষের অবস্থানগত পার্থক্য, তাদের মিলনমুদ্রা বা আসন, সঙ্গমকালীন শারীরিক আচরণ, শরীরের কোন কোন অংশ স্পর্শ করা হচ্ছে, চরম রতিমুহূর্তে অনুভূতি সব কিছুই কনফেশনের সময় পুঙক্ষাণুপুঙক্ষভাবে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ল ৷ ‘মাংসের স্বীকারোক্তি’ যুক্ত হল একধরনের ‘আত্মপরীক্ষণ’ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ৷ ‘শরীর’ হয়ে দাঁড়াল যাবতীয় ‘অশুভ’র উৎস ৷ যৌন আকাঙক্ষা, ফ্যান্টাসি, ‘অস্বাভাবিক’ শারীরিক চাহিদা সবই হয়ে উঠল স্বীকারোক্তির উপাদান ৷ এভাবেই ‘কনফেশন’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যৌনতার ডিসকোর্স স্পর্শ করতে চাইল ‘শরীর’ এবং ‘আত্মা’র সংযোগস্থলটিকে ৷ ইউরোপের ইতিহাসে বরাবরই যৌনতাকে ডিসকোর্সে পরিণত করার প্রক্রিয়াটি সীমিত ছিল ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিক মানুষজনের মধ্যেই ৷ সতেরো শতকের পর থেকে যৌন আকাঙক্ষাকে ডিসকোর্সে পরিণত করার প্রক্রিয়া সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছেই হয়ে দাঁড়াল বাধ্যতামূলক ৷ যথার্থ খ্রিস্টান হয়ে ওঠার একটি শর্ত হয়ে দাঁড়াল তা ৷ ‘কনফেশন’ এই প্রক্রিয়ায় প্রধান চাবিকাঠির কাজ করল ৷

ফুকোর মতে ১২১৫ খ্রিস্টাব্দের ‘ল্যাটেরান কাউন্সিল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ‘কনফেশন’ এক ধরনের বৈধতা লাভ করে ৷১৬ অপরাধবিজ্ঞান এবং অপরাধের শাস্তির কৌশলগুলিও নতুন করে সাজানো হয় ৷ অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং তার নিজেকে দিয়েই নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করিয়ে নেবার প্রক্রিয়া চালু হয় এবং এর কেন্দ্রে থাকে ‘কনফেশনে’র বাধ্যবাধকতা ৷ একেই ফুকো বলেছেন ‘ক্ষমতার প্রাতিস্বিকীরণ’ ৷১৭ কেবল রতিক্রিয়া নয়, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, পারিবারিক জীবন ও প্রেমসসম্পর্ক—প্রতিদিনের তুচ্ছ জীবনযাপনের ভিতরও ঢুকে পড়ে ‘কনফেশন’ ৷ ব্যক্তির মানসিক আকাঙক্ষাগুলির সবকিছুই হয় স্বেচ্ছায় নয়ত বলপূর্বক, মৌখিক উপায়ে বা লিখিতভাবে স্বীকারোক্তির বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে ৷ মধ্যযুগের পর থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য হিংসাত্মক পদ্ধতির প্রয়োগ একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় ৷ ইউরোপীয় ব্যক্তি পরিণত হয় ‘কনফেশন অ্যানিম্যাল’-এ ৷১৮ ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই ধারণাই বদ্ধমূল হয় যে ‘কনফেশন’ হল ‘সত্য’ উৎপাদনের একমাত্র হাতিয়ার ৷ ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে একজন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টধর্মাবলম্বীর পক্ষে বছরে অন্তত একবার যাজকের সামনে হাঁটু মুড়ে স্বীকারোক্তি প্রদান বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে ৷ এক্ষেত্রে যে স্বীকারোক্তি দিচ্ছে এবং যে তা গ্রহণ করছে—সেই দুজনের অবস্তান এক সমতলে নয় ৷ যে কথা বলছে, সে পুরোপুরি বাধ্য হচ্ছে উলটোদিকের ব্যক্তির প্রাধান্য মেনে চলতে, এই উলটোদিকের ব্যক্তির হাতেই প্রাধান্যমূলক ‘ক্ষমতা’ ৷ স্বীকারোক্তি যে দিচ্ছে, সে নৈর্ব্যক্তিক, অবদমের মাধ্যম মাত্র ৷ যদিও এই সামগ্রিক প্রক্রিয়া একই সময়ে, একই পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়নি ৷ একটা সময় পর্যন্ত ‘কনফেশনে’র উদ্দেশ্য ছিল প্রায়শ্চিত্তকরণ ৷ ক্রমে প্রোটেস্টান্ট ধর্মের উত্থান, কাউন্টার-রিফর্মেশন, আঠারো শতকের ‘পেডাগজি’, উনিশ শতকীয় চিকিৎসাশাস্ত্রের বিকাশ এই ধর্মীয় অনুষঙ্গের দিকটিকে ক্রমেই গৌণ করে তোলে ৷ এর পরিধি প্রসারিত হতে শুরু করে আরো অনেক ধরনের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিতর, যেমন: পিতামাতা ও শিশুসন্তান, শিক্ষক ও ছাত্র, মনোবিদ ও মনোরোগী প্রভৃতি ক্ষেত্রেও ৷ রূপবদল ঘটে এর প্রকাশভঙ্গিতেও ৷ এখন থেকে প্রশাসনিক জিজ্ঞাসাবাদ, ডাক্তারি পরামর্শ, আত্মজীবনীর বয়ান, চিঠিপত্রের ভাষা, নথিপত্র রচনা—সবকিছুর ভিতরেই ‘কনফেশনে’র কৌশল প্রযুক্ত হতে শুরু করে ৷ এর ফলে কনফেশন হয়ে ওঠে ব্যক্তির ‘আত্মন’-কে প্রকাশ করার এক নতুনতর মাধ্যম, যার মধ্য দিয়ে ব্যক্তির কামনা-বাসনা, অবশেসন, সুখবোধ—সবকিছুই পুনর্নির্মিত হয় ৷ ফুকো দেখিয়েছেন এত বছর ধরে নৈঃশব্দ্যের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য স্বীকারোক্তি এবার চিকিৎসাশাস্ত্র, মনোবিদ্যা, যৌনবিকার-এর মধ্য দিয়ে গড়ে তুলল যৌনবোধ সম্পর্কিত এক সুবিপুল জ্ঞানভাণ্ডার, যা, ক্যাম্প, সালজম্যান, ক্রাফট-এবিং থেকে হ্যাভলক এলিস পর্যন্ত লেখকদের রচনার মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পূর্ণাঙ্গ চেহারা লাভ করেছে ৷১৯ অর্থাৎ একটা সময়ের পর থেকে ‘কনফেশন’ আর পাপ ও পাপমুক্তির প্রক্রিয়া হিসেবেই সীমাবদ্ধ রইল না, ‘শরীর’ এবং জীবনযাপনের প্রতিটি মুহূর্তকে কেন্দ্র করে এবার গড়ে উঠল ‘স্বীকারোক্তির বিজ্ঞান’ যা যৌনতার ডিসকোর্সের কাঠামোর কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থেকেছে বহুদিন ৷ এভাবেই ‘কনফেশনে’র বৈজ্ঞানিক ‘মেডিক্যালাইজেশন’ ঘটল ৷২০ ফুকোর মতে, উনিশ শতকীয় ইউরোপে ‘কনফেশন’কে ডিসকার্সিভ নিয়মনীতির ভিতর নতুনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল মোট পাঁচটি পদ্ধতিতে:

 ক. ‘কনফেশনে’র মধ্য দিয়ে প্রকাশিত ‘বাচন’কে ক্লিনিক্যাল পদ্ধতিতে অর্থবোধক ‘চিহ্নে’ রূপান্তরিত করা ৷ যে স্বীকারোক্তি দিচ্ছে, তার বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য, অর্থময় নিরীক্ষণের মধ্যে নিয়ে আসা ৷

 খ. ‘কনফেশনে’র ভিতর কয়েকটি স্বতঃসিদ্ধ ও প্রাকনির্ধারিত যুক্তি পরম্পরা খুঁজে বের করা ৷ এর ফলে যে কোনো ধরনের মানসিক বা শারীরিক বিচ্যুতির পিছনেই যৌনতার অমোঘ উপস্থিতি অনুভূত হয় ৷

 গ. যৌনতার ভিতর কোনো এক অন্তর্নিহিত ‘অর্থ’ অনুসন্ধান ৷ যেহেতু যৌনতার অন্তরালে লুকোনো সত্য গুহাহিত, তাই ‘কনফেশনে’র মাধ্যমে তাকে বের করে আনার জন্য বলপ্রয়োগও বৈধ ৷

 ঘ. যে শুনছে, তার হাতেই ‘স্বীকারোক্তি’কে ব্যাখ্যা করা ও মতামত প্রদানের অধিকার দান ৷ সর্বদাই ধরে নেওয়া হচ্ছে, যে স্বীকারোক্তি প্রদান করছে, তার বক্তব্য অসম্পূর্ণ, তা সর্বদাই অতিরিক্ত পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে এবং এই ব্যাখ্যাদানের ক্ষমতা রয়েছে ‘শ্রোতা’র কর্তৃত্বের অধিকারে ৷

 ঙ. ‘কনফেশন’ প্রক্রিয়ার সামগ্রিক চিকিৎসাশাস্ত্রীয়করণ ৷ এর মধ্য দিয়ে যৌনতা একটি পুরোপুরি ‘মেডিক্যাল’ সমস্যায় পরিণত হল ৷ যৌনতার ‘রোগনির্ণয়’ পদ্ধতির মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হতে শুরু করল কে ‘স্বাভাবিক’ আর কে-ই বা ‘অস্বাভাবিক’ ৷২১

এই ‘কনফেশন’ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতাতেই সতেরো শতক থেকে ইউরোপে এক ধরনের কেচ্ছাসাহিত্য লেখা হতে থাকে, যেখানে লেখক নিজের যৌনজীবনের অকপট স্বীকারোক্তি করেছেন ৷ সমকালীন একাধিক ধর্মীয় নির্দেশিকায় ব্যক্তির নিহিত জীবনের এই গোপনতম দিকগুলিকে তুলে ধরতে বলা হয়েছে বারবার ৷২২ উনিশ শতকের শেষদিকে জনৈক অজ্ঞাতনামা রচিত একটি বই প্রকাশিত হয়: My Secret Life ৷ এই ব্যক্তি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর ইউরোপীয় ‘লিবারটাইন’ চরিত্র, যিনি জীবনের প্রায় সবটুকুই ব্যয় করেছেন বিচিত্র ও রোমাঞ্চকর উত্তেজনায় ভরপুর যৌন অ্যাডভেঞ্চারে ৷ আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে তিনি বলেছেন: তাঁর অভিজ্ঞতা হয়তো সমাজের আরো অসংখ্য মানুষের জীবনযাপনেরই অংশ, তবু এই গোপন জীবনযাপনকে প্রকাশ্যে আনতে উৎসুক তিনি ৷ কারণ ব্যক্তির নিহিত জীবনের যাবতীয় খুঁটিনাটি প্রকাশ্যে আনাই কাম্য২৩ ৷ কিন্তু নিজের গোপন যৌনজীবনের এই অনুপুঙ্ক্ষ বর্ণনাকে ভিক্টোরীয় যৌন অবদমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে না দেখে একে বরং উনিশ শতকীয় ইউরোপের যৌনতাবিষয়ক ‘অ্যানালিটিক্যাল ডিসকোর্সে’র অংশ হিসেবেই বর্ণনা করেছেন ফুকো ৷ তাঁর মতে এটিও যৌন স্বীকারোক্তির মান্য ধরন ৷২৪ এর পাশাপাশি তিনি রাখতে চেয়েছেন ১৮৬৭ সালের একটি ঘটনা ৷ ল্যাপকোর্ট নামক প্রত্যন্ত গ্রামের এক হতভাগ্য দরিদ্র খামারশ্রমিক, যে সামান্য টাকার বিনিময়ে গ্রামের সম্পন্ন কৃষকদের বাড়ির ফাইফরমাস খাটত, তাকে ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত করা হয় গ্রামেরই এক অল্পবয়সী মেয়ের সঙ্গে ‘নিষিদ্ধ’ যৌনাচারে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ৷ প্রথমে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তারপর ‘আধুনিক’ মনোচিকিৎসার যাবতীয় উপকরণ ব্যবহার করে বোঝার চেষ্টা হয়, লোকটির যৌন আকাঙক্ষা ও অভিব্যক্তির এক অনুপুঙ্ক্ষ ‘বৈজ্ঞানিক’ অনুসন্ধান কোন ‘সান্দর্ভিক’ সত্যের খোঁজ দিতে পারে ৷ এভাবেই প্রত্যন্ত গ্রামীণ জীবনের এক তুচ্ছ, অতি সাধারণ যৌন অভ্যাস, যা গ্রামীণ নারীপুরুষেরা স্বেচ্ছায় বজায় রেখেছিল বহুযুগ থেকে, তা-ই এবার কেবল সামাজিক অসহিষ্ণুতারই জন্ম দিল না, হয়ে উঠল নতুন বিধিব্যবস্থা, চিকিৎসাশাস্ত্রীয় উদ্যোগ, শারীরবৃত্তীয় কাটাছেঁড়া এবং তাত্বিক জটিলতার এক উপভোগ্য বিষয়বস্তু ৷ মেয়ারভিল মানসিক চিকিৎসালয়ে ঐ কৃষিশ্রমিকের বাকি জীবনটা নজরবন্দী অবস্থায় কাটে আর সেই গ্রামের স্কুলশিক্ষকেরা পরবর্তীকালে শিশু ছাত্র-ছাত্রীদের মনে যাতে এই গোটা ঘটনার কোনো ছায়াপাত না ঘটে, সে বিষয়ে যথাসম্ভব সতর্ক থাকতেন ৷ এভাবেই একক যৌনজীবনের স্বীকারোক্তি লিখে চলা ওই অজ্ঞাতনামা লেখক এবং প্রত্যন্ত গ্রামের অখ্যাত কৃষিশ্রমিকের যৌনবিচ্যুতির তথাকথিত ‘আবিষ্কার’—একটাই ‘ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিসে’র অঙ্গীভূত হয়ে যায়, যা ইউরোপের ইতিহাসের তিনশো বছরের আলোকপর্বের ‘জ্ঞান ও সত্যের এষণা’র সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ৷ এটাই আধুনিক যুগে যৌনতার বৈশিষ্ট্য—যৌনতাকে যথাসম্ভব অবদমিত করেও তাকে ক্রমবিবর্ধিত ‘বাচনে’র অন্তর্ভুক্ত করা ৷২৫

আলোকপর্বের যুগ শুরু হবার আগে পর্যন্ত ইউরোপে যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তিন ধরনের বিধিনিষেধ চালু ছিল: রোমান আইন বা ‘ক্যাননিকাল ল’, খ্রিস্টীয় বিধি বা ‘ক্রিশ্চান প্যাস্টোরাল’ এবং নাগরিক আইন বা ‘সিভিল ল’ ৷ এই আইনগুলি মূলত কেন্দ্রীভূত ছিল বিবাহসংক্রান্ত নীতিনিয়ম এবং দাম্পত্য যৌনতার বৈধতা/অবৈধতার পৃথগায়নে ৷ বৈধ দাম্পত্যের বাইরে যেসব যৌনাচার রয়ে যায়, সেগুলিকে মূলত আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হত এবং সেগুলিকে কোনো বৈজ্ঞানিক ডিসকোর্সে অন্তর্ভুক্ত করা হত না ৷ যে কারণে পায়ুকাম, শিশুর যৌনতা, বিবাহবহির্ভূত যৌনাচার, ধর্ষণ, অজাচার—সবকিছুকেই ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ’, অতএব ‘আইনবিরুদ্ধ’, এভাবেই দেখা হত ৷ দীর্ঘদিন পর্যন্ত ‘হারমাফ্রোডাইট’দের ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হত ৷ কিন্তু আঠারো-উনিশ শতকের ‘আলোকপ্রাপ্ত’ যৌনতার ডিসকোর্স দাম্পত্য-বহির্ভূত যাবতীয় প্রান্তিক যৌনতাকেই ‘বিকার’ বলে চিহ্নিত করল ৷ এই ‘যৌনবিকার’ আবিষ্কারের পদ্ধতিকেই ফুকো বলেছেন ‘বিকারবীজের রোপণপ্রণালী’২৬ যা মূলত দুটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রযুক্ত হয়েছিল:

 ক. বিপরীতকামী একগামিতাকেই বৈধ/সামাজিক যৌনতার একমাত্র ‘ক্ষেত্র’ হিসেবে নির্ধারণ করা ৷ এর বাইরে থাকা অন্যান্য যৌন অভ্যাস এক্ষেত্রে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং অবদমনের উপাদানে পরিণত হয় ৷

 খ. যৌনবিকারের এক সুবিস্তৃত জগৎ আবিষ্কৃত হল এবং শিশু, উন্মাদ নারী-পুরুষ, অপরাধীর যৌনতা এক ধারাবাহিক নিরীক্ষণের বিষয়বস্তুতে পরিণত হল ৷ তাদের ‘moral folly’, ‘genital neurosist’, ‘aberration of the genetic instinct’, ‘degenerescene’ প্রভৃতি অভিধায় ভূষিত করা হতে থাকে ৷

কিন্তু এই গোটা প্রক্রিয়াটিকে ফুকো নিছক ‘অবদমন’ হিসেবে মানতে নারাজ ৷ তাঁর মতে, ‘জ্ঞান’/‘ক্ষমতা’ এক্ষেত্রে চারটি পৃথক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের বিস্তার ঘটিয়েছে ৷ প্রথমত, শিশুর যৌনতা, বিশেষত, হস্তমৈথুন-সংক্রান্ত ডিসকোর্স গড়ে উঠেছিল এক বিশেষ মেডিকো-সেক্সুয়াল বিশ্লেষণপদ্ধতিকে স্থায়িত্ব দেবার উপযোগী অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে হস্তমৈথুনকে চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে ৷ এক্ষেত্রে হস্তমৈথুনকে অদৃশ্য ‘পাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল ৷ যাতে তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায় ৷ ফুকো এই প্রক্রিয়াটিকে ব্যক্তির শরীরে বৈজ্ঞানিক ডিসকোর্সের ‘অনুপ্রবেশ প্রণালী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ৷ দ্বিতীয় পদ্ধতিটির নাম তিনি দিয়েছেন ‘যৌনবিকারের অন্তর্ভুক্তিকরণ’ এবং ‘ব্যক্তির বিশেষীকরণ’ ৷ যেমন, সমকামিতাকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সাময়িক শারীরবৃত্তীয় বিচ্যুতি হিসেবে ধরা হত, এবার ‘মনস্তাত্বিক’/‘বৈজ্ঞানিক’ ডিসকোর্স সমকামিতাকে এক বিশেষ প্রজাতির রোগ হিসেবে চিহ্নিত করল ৷২৭ পরবর্তীকালে ক্রাফট-এবিং এই বিশেষ যৌনতায় অভ্যস্তদের বিচিত্রভাবে প্রণালীবদ্ধ করেন—automonosexualists, mixo-scopophlis, gynecomasts, presbyophilis, sexoesthetic inverts প্রভৃতি ৷ তৃতীয়ত, ‘ক্ষমতা’ এবং ‘উপভোগ’ পুরোপুরি পরস্পরসাপেক্ষ ৷ ‘ক্ষমতা’ এবং ‘অবদমন’ প্রক্রিয়ার উপস্থিতিই উপভোগের অস্তিত্ব ও বৃদ্ধিকে নিশ্চিত করে ৷ উলটোদিকে ‘উপভোগ’ রয়েছে বলেই ‘ক্ষমতা’ও নিজের প্রয়োগকৌশলকে প্রতিনিয়ত ধারালো ও সূক্ষ্ম করে তুলতে পারছে ৷ ফুকো একেই বলেছেন ‘ক্ষমতা ও সুখবোধের চিরস্থায়ী আবর্ত’ ৷ চতুর্থত, ফুকোর মতে, উনিশ শতকের বুর্জোয়া সমাজেই ‘শরীর’ হয়ে উঠল যৌন সম্পৃক্তির চরম ‘ক্ষেত্র’ ৷ যৌনতার বিজ্ঞান পূর্ববর্তী যুগের মতো বিভিন্ন ধরনের যৌন অভ্যাসের ভিতর পার্থক্যের সীমাই কেবল নির্ধারণ করল না, বরং পরস্পর-নিরপেক্ষভাবে বিচিত্র ধরনের যৌনতার নিত্যনতুন ক্যাটেগরির জন্ম দিল ৷ এই দিক থেকে দেখলে উনিশ শতকের ইউরোপীয় সমাজে আদৌ হিপোক্রেসির চর্চাই মুখ্য নয়, উলটোদিক থেকে এই সমাজ ছিল প্রত্যক্ষভাবে, সরাসরি ‘যৌনবিকার’ অভ্যাসকারী ৷২৮

এ প্রসঙ্গেই ‘যৌনতার বিজ্ঞান’ আলোচনা করতে গিয়ে ফুকো ‘সেক্স’ এবং ‘সেক্সুয়ালিটি’র মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করেছেন ৷ দুটোই দুই ধরনের ‘ঐতিহাসিক’ নির্মাণ ৷ ‘সেক্স’ কোন প্রকৃতিদত্ত বিষয় নয় ৷ ‘সেক্স’ বলতে ফুকো বুঝিয়েছেন প্রাক-আলোকায়ন যুগের ‘সম্বন্ধের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার’কে, যা মূলত পারিবারিক ও আইনি বিষয়, অর্থাৎ, বিবাহের নীতিনিয়ম, কৌম/জ্ঞাতি-সম্পর্কের নির্দিষ্টকরণ ও বিকাশ, যৌনাচরণের ধর্মীয় ও আইনি বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি ৷ আঠারো শতকের পর থেকে, যখন অর্থনীতি, রাজনীতির প্রকরণগুলি আরো জটিল হতে শুরু করল, জাতিরাষ্ট্রের ক্ষমতাপ্রকরণ ব্যক্তির শরীর ও যৌনতাকে আরো অধিকতর সূক্ষ্মতায় অনুধাবন করতে চাইল, তখন আরো উন্নত ধরনের সম্বন্ধের বিস্তার ঘটানোর প্রয়োজন দেখা দিল ৷ এই নতুন ধরনের যৌনতার ডিসকোর্সই হল ‘সেক্সুয়ালিটি’ ৷ পূর্বোক্ত উপাদানটি যদি গড়ে ওঠে বৈধ/অবৈধ সামাজিক রীতির সাপেক্ষে, যার দ্বারা দাম্পত্য, প্রজননের মধ্য দিয়ে সামাজিক উৎপাদনশীলতার দিকটিই মুখ্য হয়ে ওঠে, তবে ‘সেক্সুয়ালিটি’র মুখ্য উদ্দেশ্য ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব শরীরকে কেন্দ্র করে একধরেনর চলিষ্ণু, বহুস্তরবিশিষ্ট, শর্তসাপেক্ষ ‘ক্ষমতা’র জন্ম দেওয়া ৷ যে ‘শরীর’ একইসঙ্গে উপভোগ করে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, সেই শরীরকে ‘ক্ষমতা’র অধীনে নিয়ে আসার আধুনিক কৃৎকৌশলকেই বলা হয় ‘সেক্সুয়ালিটি২৯ ৷ ফুকো দেখাচ্ছেন আঠারো/উনিশ শতক জুড়ে এই ‘ডিপ্লয়মেন্ট অফ সেক্সুয়ালিটি’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘চারটি প্রকরণগত ঐক্যে’র মধ্য দিয়ে, যে প্রকরণগুলি, আমাদের উনিশ শতকীয় বাংলার সমাজেও একইভাবে প্রযুক্ত হয়েছে:

ক. নারীশরীরকে উন্মাদনার কেন্দ্রস্থল হিসেবে ধরে নেওয়া

খ. শিশুর যৌনমনস্তত্বকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা

গ. সন্তান উৎপাদন ও দাম্পত্য-যৌনতার সামাজিকীকরণ

ঘ. ‘যৌনবিকার’কে মনস্তাত্বিক বিজ্ঞান দ্বারা চিহ্নিতকরণ ও সংশোধন৩০

আঠারো-উনিশ শতকের জ্ঞান-আলোকায়ন এবং চিকিৎসাবিদ্যা নারীশরীরের ‘হিস্টেরাইজেশন’ প্রক্রিয়াটির প্রয়োগ ঘটাল তিনটি পদ্ধতিতে ৷ প্রথমত, ধরে নেওয়া হল নারীশরীর কেবলই পরিপূর্ণ যৌনতার আধার ৷ দ্বিতীয়ত, এবার থেকে নারীশরীর হয়ে উঠল বিজ্ঞাননির্ভর কাটা-ছেঁড়ার বিষয়বস্তু, যুক্তিপ্রয়োগ তাকে ‘স্বাভাবিক’ বিকারসমূহ থেকে মুক্ত করবে ৷ তৃতীয়ত, বৃহত্তর সামাজিক শরীরের উপযোগবাদিতার সঙ্গে নারীশরীরের জৈবসংযোগ গড়ে তোলা, নারীর প্রজননশক্তি যেহেতু পরিবারে তার মাতৃত্বের ভূমিকাটি নির্দিষ্ট করে, তাই সামাজিক ক্ষমতা এই সামগ্রিক জৈব-নৈতিক পরিসরে নারীশরীর যে বাধাবন্ধনহীন কামনার আধার, শিক্ষা-আলোকায়ন দ্বারা তার সংশোদন ও উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন—এই ধারণা উনিশ শতকীয় শিক্ষিত বাঙালি মমনেও দীর্ঘ প্রভাব ফেলেছিল ৷ সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত ঔপনিবেশিক মনোরোগবিদ্যা কীভাবে উনিশ শতক থেকেই নেটিভ সমাজের ‘শরীরসর্বস্ব উন্মাদিনী নারী’কে স্বতন্ত্র গবেষণার ‘ক্ষেত্র’ হিসেবে ক্রমশ ‘অপরায়িত’ করে ৷৩১

জ্ঞান-যুক্তি-ক্ষমতার কৃৎকৌশল এবার শিশুর যৌনতাকেও প্রণালীবদ্ধ করতে চাইল ৷ ধরে নেওয়া হল, সব শিশুই কোনো না কোনো যৌন অভ্যাস-আচরণের শিকার, যা প্রকৃতিবিরুদ্ধ এবং যা ব্যক্তিগত ও সামাজিক নৈতিকতার পক্ষে হানিকর ৷ শিশুকে চিহ্নিত করা হল বয়স্ক যৌনতার প্রাথমিক সংস্করণ হিসেবে ৷ পরিবার, পিতামাতা, শিক্ষক, চিকিৎসক সকলেই শিশুর ধাতুগত বিপজ্জনক প্রবণতাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন ৷ অসংখ্য উপদেশ, অনুশাসন, নিয়মাবলি, মাথার মধ্যে পাপবোধ গেঁথে দেওয়া, ঠিক-ভুল স্বাস্থ্যবিধি আরোপ, পারিবারিক সম্মান বজায় রাখার কলাকৌশল দ্বারা শিশুর যৌনতাকে সতর্ক পাহারায় রাখা শুরু হয় ৷ শিশুর মন থেকে যৌনভাবনা, যৌন আচরণ, বিশেষত হস্তমৈথুনকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য যাবতীয় নৈতিক নির্দেশনামা জারি হতে থাকে ৷ এভাবেই শিশুর শরীর, যৌনতার উপর সামাজিক ক্ষমতা বহুগুণিতক হারে নিজের কার্যকারিতা বাড়িয়ে চলে প্রতিদিন ৷

বাবা-মার শারীরিক সঙ্গমের ফলে জন্ম নিল যে শিশু, সেই হবে ‘জাতিরাষ্ট্রে’র ভবিষ্যৎ নাগরিক ৷ তাই শিশুর জন্মদানসংক্রান্ত অজস্র ম্যানুয়াল লেখা হতে থাকল বাবা-মার যৌন আচরণকে একটা বিশেষ খাতে বইয়ে দেবার জন্য ৷ রাষ্ট্রের নজর কেন্দ্রীভূত হল বাবা-মার যৌনক্রিয়ায় ৷ রাষ্ট্র তাঁদের উপর দায়িত্ব চাপাল—তাঁরা যেন নীরোগ শরীরের অধিকারী হন, কোনো ‘অসতর্ক’ বিকৃত যৌনাচারের ফলে অযাচিত রোগ ডেকে না আনেন নিজের শরীরে, কারণ সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভবিষ্যতের নাগরিক—তাঁদের সন্তান ৷ সেই সঙ্গে ‘নেশন স্টেট’কে শক্তিশালী করার জন্য জনসংখ্যার উপরেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ প্রয়োজন ৷ তাই দাওয়াই বাতলানো হল—বাবা-মার যৌনক্রিয়াকে সীমিত রাখতে হবে, কারণ, অবাঞ্ছিত বাড়তি সংখ্যক সন্তান রাষ্ট্রের পক্ষে বোঝাস্বরূপ ৷ আমাদের উনিশ শতকের বাংলাতেও অসংখ্য ‘সেক্স ম্যানুয়াল’ লেখা হয়েছে দাম্পত্যের যৌন নির্দেশিকা হিসেবে ৷ উনিশ শতকীয় জাতীয়তাবাদী ভাবনায় যেহেতু ‘পরিবার’ই হল কাল্পনিক ভবিষ্যৎ জাতিরাষ্ট্রের একক, তাই পরিবার থেকেই জাতীয়তাবাদী নির্মাণের উদ্দেশ্যে যৌনতার নিয়ন্ত্রণের ভাবনা সেখানে কার্যকর হতে থাকে ৷

এছাড়াও, তথাকথিত ‘সুস্থ’ যৌনতার বিপরীতে চিহ্নিত করা হল অসংখ্য যৌনবিকারকে এবং সেগুলিকে ‘মনস্তাত্বিক’ রোগ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হল ৷ যাবতীয় ব্যতিক্রমী যৌন অভ্যাসের উপরে দেগে দেওয়া হল বিকৃতির শিলমোহর ৷ মনস্তত্ববিদ ভাবতে শুরু করলেন, যেহেতু একজন বিকৃতকামী মানুষের যৌনতা তার জীবনের সবকটি দিককেই প্রভাবিত করে, সুতরাং ব্যক্তি ও সমাজের সামগ্রিক মঙ্গলের জন্য সব ধরনের যৌন বিকৃতির ‘আবিষ্কার’ প্রয়োজন, যাতে বিকৃতকামীর উপর আরোগ্যের মেডিক্যাল পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় ৷ এভাবেই তথাকথিত রোগগ্রস্তকে রোগমুক্ত করে তোলার কলাকৌশল ব্যক্তির উপর সামাজিক ক্ষমতাপ্রয়োগের একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায় ৷ আসলে গোটা উনিশ শতক জুড়েই ইউরোপের বুর্জোয়া সমাজে ব্যাপাক ভাবে ছড়িয়ে পড়ল এমন কিছু যৌনাচার যা প্রথাসিদ্ধ সন্তান উৎপাদনের উদ্দেশ্যে কৃত যৌনক্রিয়া নয় ৷ মনস্তত্ববিদের চোখে এগুলিই ‘বিকার’ বা ‘পারভারসান’ হিসেবে চিহ্নিত হল ৷

উনিশ শতকের বাংলা সেক্স ম্যানুয়ালগুলিতেও আমরা যৌন বিকারের মেডিক্যাল বিশ্লেষণ কিছু কিছু হলেও পাই ৷ তবে ইউরোপীয় চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রায় নেই বললেই চলে ৷ ক্রমশ, ভিক্টোরিয়ান যুগে যৌনতা পর্যবসিত হল এক নিতান্ত প্রয়োজনীয়, কিন্তু ‘নোংরা’ কার্যকলাপে ৷ যেন যৌনতার ভিতর কামনা-আনন্দ-রোমাঞ্চ কোনো কিছুই নেই ৷ আছে কেবল এর কার্যকর দিকটুকু, অর্থাৎ সন্তান উৎপাদন ৷ যৌনতা-সম্পর্কে এক সার্বিক নৈঃশব্দ্য ছড়িয়ে পড়ল শিষ্ট সমাজে ৷ যৌনতার নিঃসঙ্কোচ উল্লেখ, যৌনতা-বিষয়ক কথাবার্তা ‘অশালীন’ বলে গণ্য হতে শুরু করল ৷ খোদ ইংল্যান্ডের সমাজে শরীর-যৌনতা-অশালীনতা সংক্রান্ত এই নব্য উদ্ভুত নৈতিক মাপকাঠি তৈরি হবার পিছনে কয়েকটা কারণ ছিল ৷ শিল্পবিপ্লবের ফলে যে নতুন বুর্জোয়া শ্রেণি তৈরি হল সেখানে, তারা নিজেদের ভুঁইফোঁড় চরিত্র ঢেকে রাকার জন্য বিভিন্ন কৃত্রিম রীতিনীতির জন্ম দিয়েছিল ৷ নিম্নশ্রেণির জনসাধারণের চেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও পৃথগত্ব জাহির করার প্রয়োজনে তারা শরীর, যৌনতা, শরীরের বিশেষ অংশ ঢেকে রাখা, শরীরসংক্রান্ত কথাবার্তার নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক উচ্ছলতা রোধ—ইত্যাদি বহুবিধ অবশ্যমান্য নিয়মকানুন তৈরি করল ৷ এই আচরণবিধিকে ধর্মীয় ভিত্তি দান করল তৎকালীন গোঁড়া নীতিবাগীশ খ্রিস্টীয় ‘ইভ্যানজেলিস্ট’ সম্প্রদায় ৷ এরা শরীর-যৌনতা সংক্রান্ত চারিত্রিক শুদ্ধাচারকেই একমাত্র মান্য আদর্শরূপে খাড়া করেছিল ৷ টেবিল চেয়ারের খুঁটিকে ‘পা’ বলে উল্লেখ করাও ছিল এদের চোখে অশালীন ব্যাপার ৷ ১৮০২ সালে ইংল্যান্ডে ‘সোসাইটি ফর দ্য সাপ্রেশন অফ ভাইস’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় ৷ এরা জনসাধারণের ভিতর প্রচলিত যাবতীয় প্রকাশ্য নৃত্যগীতের উৎসবকেই ‘অশালীন’ আখ্যা দেয় ৷ এরপর ১৮১৮ সালে Thomas Bowdler নামে এক ব্যক্তি শেক্সপিয়রের নাটক থেকে শরীর-সম্পর্কীত ‘অশ্লীল’ অংশগুলি সম্পাদনা করে সম্পূর্ণ ‘ভদ্র’ সংস্করণ প্রকাশ করেন, যাতে নব্য উদ্ভুত বুর্জোয়া নীতিবাগীশতায় আঘাত না লাগে ৷ এভাবেই বিভিন্ন সামাজিক প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে শরীর-যৌনতা প্রভৃতি বিষয়গুলোর অবাধ, মুক্ত বহিঃপ্রকাশের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত হচ্ছিল ও তা মান্যতাও পাচ্ছিল ৷ কিন্তু সামগ্রিক সমাজের বাস্তবিক ছবিটা ঠিক এরকম ছিল না ৷ সাম্প্রতিক গবেষকের মতে, ‘ভিক্টোরীয়’ সমাজে সামাজিক শালীনতার পক্ষে ধারাবাহিকভাবে প্রচার চালিয়ে আসছিলেন যাঁরা, তাঁরা সংখ্যায় খুব একটা বেশি ছিলেন না ৷৩২ যে কোনো সমাজেই যৌননৈতিকতা নির্ধারিত হয় কয়েকটি লক্ষণ অনুসারে: যৌনক্রিয়া, যৌন আচরণ, প্রকাশ্য নৈতিকতার ঘোষণা এবং বাস্তবজীবনে অনুসৃত প্রকৃত আচরণের টানাপোড়েন দ্বারা ৷ এই দিক থেকে ভিক্টোরীয় সমাজ ছিল চরম দ্বিচারিতার অধিকারী ৷৩৩ সমসাময়িক লেখক ফ্রান্সিস প্লেস অথবা উইলিয়ম কবেট-এর লেখায় উনিশ শতকীয় ভিক্টোরীয় ইউরোপীয় সমাজের এই ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ তীব্রভাবে পরিস্ফুট হয় ৷ ফ্রান্সিস প্লেস-এর Autobiography অথবা কবেট-এর Advice to Young Men-এ আমরা দেখতে পাই শালীনতার ডিসকোর্সের আড়ালে সমাজের সম্পূর্ণ বিপরীত চেহারা ৷ কবেট-এর ভাষায়:

In spite, however, of all this, ‘refinement of the human mind’, which is everlastingly dinned in our ears; in spite of the ;small clothes’, and of all the other affected stuff, we have this conclusion, this indubitable proof, or the falling of the delicacy; namely, that common prostitutes, formerly unknown, now swarm in our towns, and are seldom wanting even in our villages; and where there was one illegitimate child (including those coming before the time) only fifty years ago are now twenty.৩৪

কিন্তু কেবল অবদমন ও অবদমনের বিরুদ্ধে শরীরের বিদ্রোহ নয়, আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, ভিক্টোরীয় যৌনতার বৈশিষ্ট্যই হল: ‘সন্দর্ভের বংশবিস্তার’ ৷ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য সমকালীন দুই লেখকের সাক্ষ্য ব্যবহার করা যেতে পারে ৷ প্রথমজন হলেন আর্থার. কে. মানবি, দ্বিতীয়জন জনৈক অজ্ঞাত ছদ্মনামধারী লেখক ‘ওয়াল্টার’ ৷ প্রথমজন নিজের ব্যক্তিগত যৌনজীবনের কথা লিখে গিয়েছেন ডায়েরিতে ৷ দ্বিতীয়জন লিখেছেন উনিশ শতকের বহুচর্চিত My secret Life নামক বইটি ৷ প্রথমজন এক মহিলার সঙ্গে আজীবন বসবাস করলেও নিজের অক্ষত কৌমার্য বজায় রেখেছেন—ভিক্টোরীয় রক্ষণশীল নীতিবাগীশতার এক মূর্ত প্রতীক তিনি ৷ দ্বিতীয়জন অসংখ্য মহিলার সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হয়েছেন ৷ ভিক্টোরীয় সমাজের উদ্দাম যৌন ‘অবসংস্কৃতি’র প্রতিনিধি তিনি ৷ কিন্তু উভয়েই উনিশ শতকীয় যৌনতার ডিসকোর্সের কয়েকটি সাধারণ প্রবণতার সঙ্গে একমত ৷ উভয়েই মনে করতেন হস্তমৈথুন একটি গর্হিত অপরাধ, তা অল্ববয়সী পুরুষকে ‘নির্বীর্য়’য় পরিণত করে ৷ এমনকি অন্যত্র যৌন আসক্তির তীব্রতাকে জীবনবোধের সম্পূর্ণতা হিসেবে মেনে নিলেও ‘ওয়াল্টার’ মনে করতেন অতিরিক্ত ‘শৃঙ্গার’ ‘পৌরুষে’র হানি ঘটায় ৷ কোনো এক ডাক্তার নাকি তাঁকে বলেছিলেন ‘unlimited indulgence would lead to impotence, and perhaps worse’ ৷ রাস্তায় দাঁড়ানো সারি সারি দেহপসারিণীদের দেখে তাঁর মন্তব্য ‘Looking at them, pleased and yet sorry as they often made me feel, when in philosphical mood!’৩৫ অর্থাৎ, উনিশ শতকীয় ভিক্টোরীয় মানসিকতার বশে ওই হতভাগ্য রমণীদের জন্য তাঁর মনে দুঃখবোধ জাগলেও, দার্শনিক অভিব্যক্তির তাড়নায় তিনি ওই মহিলাদের প্রতি কামনাও অনুভব করতেন ৷ ডিসকোর্স এবং আকাঙক্ষার তীব্র দ্বন্দ্ব এই মনোভাবের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত ৷

একদিকে যেমন সতেরো-আঠারো শতক থেকেই সন্ত ফ্রান্সিস কথিত ‘হাতি আদিকল্পে’র৩৬ বিস্তার ঘটতে থাকে পাশ্চাত্য সমাজে, তেমনি, উনিশ শতক থেকেই নৈতিক/সামাজিক সংস্কারের দায়বোধ থেকে লেখা অসংখ্য লেখালেখির মধ্য দিয়ে যৌনতা-বিষয়ক নৈঃশব্দ্য ভেঙে ফেলারও উদ্যোগ শুরু হয় ৷ ১৮৮৪ সালে Moral Reform Union উচ্চবিত্ত সমাজের যৌন দ্বিচারিতা এবং নীচুতলার সমাজের বেশ্যাবৃত্তি-সম্পর্কিত ‘নৈঃশব্দ্যের ষড়যন্ত্র’ ভেঙে দেওয়ার ডাক দেয় ৷ ১৮৪৩ সালে উইলিয়ম লোগান-এর লেখা An Exposure from Personal Observations of Female Prostitution in London, Leeds and Rochdale, and Especially in the City of Glasgow বইতে উচ্চবিত্ত সমাজের যৌন ভণ্ডামি, লাম্পট্যের বিরোধিতা করা হয় ৷ এর ফলে, যৌনতাবিষয়ক ডিসকার্সিভ আলোচনার একটি ধারাবাহিক স্রোত চলতে থাকে ৷৩৭

ডাক্তার, মনোচিকিৎসক, শিক্ষাবিদরা এভাবেই শরীর-যৌনতা বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ, সমৃদ্ধ জ্ঞানভান্ডার গড়ে তুললেন ৷ এর মধ্যে দিয়ে যৌনতা যেমন প্রণালীবদ্ধ হল, তেমনই নৈঃশব্দ্যের অন্তরাল থেকে বিষয়টিকে প্রকাশ্যেও আনা হল ৷ ১৮৭০ সালের পর থেকে শিশু-কিশোরদের জন্য যৌনশিক্ষা, সামাজিক ব্যভিচারের বিরুদ্ধে নৈতিকতা পুনঃস্থাপনের লড়াই থেকে শুরু করে দাম্পত্য যৌনতাকে সুখদায়ক এবং ফলপ্রসূ করে তোলা পর্যন্ত সব কিছুই এক সামগ্রিক ডিসকার্সিভ প্র্যাক্টিসের অন্তর্গত হয়ে পড়ে ৷ বিষয়টি আমাদের উনিশ শতকীয় ইতিহাসেও একইভাবে ঘটেছে ৷ উনিশ শতকের ব্রিটিশ ভিক্টোরীয় সমাজের এই নতুন যৌনতার ডিসকোর্স যাদের সব থেকে বেশি প্রভাবিত করেছিল, তারা মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ৷ উচ্চবিত্ত সমাজে যৌননৈতিকতার ব্যত্যয় ঘটত অনায়াসেই ৷ উলটোদিকে, দরিদ্র শ্রমিকশ্রেণিও মধ্যবিত্তের তৈরি যৌনতার ডিসকোর্সের আওতায় পড়েনি ৷ মধ্যবিত্তরাই কেবল এই ডিসকার্সিভ প্র্যাক্টিসগুলিকে অনুসরণের চেষ্টা করত এবং অচিরেই প্রমাণ হত এর প্রয়োগিক অসম্ভাব্যতা ৷ যৌন ভন্ডামিই হয়ে দাঁড়ায় এই সমাজের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য ৷ একদিকে বেশ্যাবৃত্তির ক্রমিক বৃদ্ধি, গুপ্ত যৌনাচার, জারজ সন্তানের সংখ্যাবৃদ্ধি, অসংখ্য প্রকাশ্য-গোপন যৌনাচারের আখড়া সৃষ্টি, পর্নোগ্রাফি ও যৌনকেচ্ছা বিষয়ক পত্র-পত্রিকার রমরমা, অন্যদিকে, অন্তঃপুরের মহিলাদের অবদমিত যৌন আকাঙক্ষা, কাম্য নৈতিকতার মাণ স্পর্শ করতে না পারার কারণে মনস্তাত্বিক উৎকণ্ঠা, হিস্টিরিয়া ও অন্যান্য মনোরোগের আবির্ভাব, ভিক্টোরীয় যৌনতার অন্যতম চরিত্রলক্ষণ হয়ে ওঠে ৷৩৮ উনিশ শতকের শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং উঠতি নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনে এই উৎকণ্ঠার ছাপ অতো প্রকটভাবে না পড়লেও মান্য নৈতিকতার কাঠামো এবং বাস্তবজীবনে অনুসৃত যাপনপদ্ধতির দ্বন্দ্ব আমাদের সমাজেও একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে থেকেছে ৷

এভাবেই উনিশ শতকীয় আধুনিকতায় ‘যৌনতার বিজ্ঞান’-এর আবির্ভাব আমাদের প্রাত্যহিক অস্তিত্বকেই এক ধরনের ‘যৌন অস্তিত্ব’য় পরিণত করেছে ৷ আবির্ভূত হয়েছে এক নতুন ধরনের জ্ঞানকাঠামো, নতুন যুক্তিক্রম ও ধারণার নির্মাণ ৷ ফুকোর উত্তরসূরি আর্নল্ড ডেভিডসন দেখিয়েছেন উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই ‘যৌনবিকার’-সংক্রান্ত ধারণার আভির্ভাব ঘটে ৷ আঠারো শতক অবধি ধারণা ছিল যে কোনো রোগেরই একটি শারীরবৃত্তীয় অধিষ্ঠান সম্ভব ৷ এই দৃষ্টিকোণ চিকিৎসাশাস্ত্রীয় পরিভাষায় ‘অ্যানাটোমো প্যাথলজিক্যাল’ দৃষ্টিকোণ হিসেবে পরিচিত ছিল ৷ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই ওই শারীরবৃত্তীয় অনুসন্ধান প্রক্রিয়া বদলে যায় ‘মনোরোগবিদ্যা’য় ৷ ‘যৌনবিকার’ যে একটি মনস্তাত্বিক প্রবৃত্তিগত সমস্যা—এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭০ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে ৷ প্রথমদিকে যৌনবিকারের উৎস হিসেবে মস্তিষ্কের গড়ন-সংক্রান্ত বিচ্যুতিকে চিহ্নিত করা হলেও ক্রমশ ধারণাটি সরে আসে ‘ইনস্টিংকটিভ’ ব্যাখ্যায় ৷ ধর্ষকাম-মর্ষকাম-বস্তুকাম থেকে শুরু করে সমকামিতা পর্যন্ত নিত্যনতুন ‘বিকার’-এর জন্ম হতে লাগল এবং তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত প্রণালীবদ্ধ আলোচনাও শুরু হল ৷৩৯

দেশীয় প্রেক্ষিত, ‘যৌনতার বিকার’ ও ঔপনিবেশিক ‘জাতীয়তাবাদ’

শরীর-যৌনতার প্রকাশ্য পাবলিক বহিঃপ্রকাশ ছেড়ে আমরা যদি ঢুকে পড়ি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত নিজস্ব শরীরবোধ ও যৌন আচরণের এলাকায়, তবে দেখব ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি ফুকো-বর্ণিত ‘স্ট্র্যাটেজিক ইউনিটি’গুলোকে কীভাবে কলোনির প্রজার জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিল ৷ পাশ্চাত্য শিক্ষা কলোনির ‘আলোকপ্রাপ্ত’ প্রজাকে শিখিয়েছিল কলোনির জীবনের প্রতিটি দিককে এক বিশেষ ধরনের জ্ঞান-যুক্তির আলোয় পুনর্নির্মিত করতে ৷ কিন্তু বিষয়টি এতো একমাত্রিক নয়, বরং অনেকটাই জটিল এক প্রক্রিয়াকে ধারণ করে আছে ৷ উনিশ শতকের শেষার্ধের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ধারাবাহিক ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার যুক্তিক্রম-নিয়মরীতি-মীমাংসাপদ্ধতি মাফিক লেখাগুলোকে সাজানো হলেও, কলোনির লেখকরা সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন তাঁদের একান্ত নিজস্ব দেশীয় জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যের উপর ৷ সভ্য পাশ্চাত্যের উন্নত জ্ঞানকাঠামো দেশীয় জ্ঞানচর্চার আবহমানকালব্যাপী ধারাবাহিকতাকে ‘প্রাক-আধুনিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে ‘অপরায়িত’ করলেও, দেশীয় বুদ্ধিজীবীরা পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সঙ্গে সমান্তরাল প্রক্রিয়ায় নিজেদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানভান্ডারকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে চান, নিজেদের জ্ঞানকাঠামোকে পাশ্চাত্যবিজ্ঞানের আদলে সাজাতে চান, কখনো কখনো ও পাশ্চাত্য জ্ঞানকাঠামোর ভিতর ঢুকে পড়ে নিজস্ব জ্ঞান-অভিজ্ঞতার সাহায্যে তার রূপান্তরও ঘটান ৷ ফলে একধরনের ‘বর্ণসংকর’ জ্ঞানচর্চার উদ্ভব ঘটে ৷ নতুন নতুন ক্যাটেগরির জন্ম হয় ৷ আবার ‘জাতীয়তাবাদে’র বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দাবি করা হতে থাকে দেশীয় জ্ঞানচর্চার উৎকর্ষ পাশ্চাত্য জ্ঞানভান্ডারের থেকে অনেক বেশি ৷ এভাবেই পাশ্চাত্য বিজ্ঞানকে দেশীয় জ্ঞানের ধারায় অন্তর্ভুক্ত করে ঐতিহ্যের পরিধিকে আরো বেশি প্রসারিত করার চেষ্টা চলতে থাকে ৷

জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার তুলনায় এই সময় পর্বে চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত লেখালেখি ক্রমশ বাড়তে থাকে ৷ বোঝা যায়, লেখকরা অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় এটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ৷ ১৮৫১ সাল থেকে কলকাতা মেডিকেল কলেজে বাংলায় পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যা পড়ানো শুরু হয় ৷ তখনো অবধি উচ্চবর্গীয় বাঙালি সমাজে পাশ্চাত্য ডাক্তারিবিদ্যাকে খুব একটা সুনজরে দেখা হত না ৷ কিন্তু কলেজের লাইসিন্সেয়েট ও অ্যাপথিকারি পাঠ্যক্রম খুব তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ৷ ক্রমশ, প্রতি বছর এতে অধিক সংখ্যায় ছাত্র এসে যোগদান করতে থাকে ৷৪০ এ থেকে বোঝা যায় পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে শরীরের ‘মেডিক্যালাইজেশন’ পদ্ধতিটি এদেশের বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজের কাছে মান্যতা পেতে শুরু করেছে ৷ ১৮৭৫ থেকে ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ভিতর ৪৭২টি বাংলা চিকিৎসাবিজ্ঞান-সংক্রান্ত বই প্রকাশিত হয় ৷ বেশ কয়েকটি চিকিৎসাশাস্ত্রের পত্র-পত্রিকা বেরোতে শুরু করে ৷ যেমন—চিকিৎসা সম্মিলনী (১৮৮৫-৯৪), গার্হস্থ্য বিজ্ঞান (১৮৮৬), চিকিৎসক ও সমালোচক (১৮৯৫-৯৬), স্বাস্থ্য (১৮৯৮-১৯০১), অনুবীক্ষণ (১৮৭৫) প্রভৃতি ৷ এইসব পত্রিকায় লেখকদের শরীর ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভাবনা দুটি পৃথক ধারায় প্রবাহিত হয়:

ক. জাতীয় স্বাস্থ্য বা ‘সামাজিক শরীর’-এর ধারণা ৷

খ. ‘ব্যক্তিগত শরীর’ বা যৌনতা ও যৌনসম্পর্ক বিষয়ক আলোচনা ৷

বাঙালির প্রকৃতি, শরীর, যৌনতা, সবই তার পরিবেশ, সংস্কৃতি ও সমাজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তাই বাঙালির জাতীয় স্বাস্থ্য রক্ষায় দেশীয় চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা ও যৌক্তিকতা উড়িয়ে দেওয়া যায় না—অধিকাংশ লেখকের মত ছিল এটাই ৷ এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেশীয় আয়ুর্বেদ চিকিৎসাপদ্ধতি ও পাশ্চাত্য চিকিৎসাপদ্ধতির মেলবন্ধনের ধারণা তৈরি হয় ৷ এই সামঞ্জস্যবাচক চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ এ সময়ে লেখা অসংখ্য প্রবন্ধে পাওয়া যায় ৷ ‘সামাজিক শরীর’ ও ‘ব্যক্তিগত শরীর’ যেহেতু ওতপ্রোত জড়িত, তাই ‘ব্যক্তিগত শরীর’-কে সুস্থ রাখতে পারলে ‘সামাজিক শরীর’-এর উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো যাবে, বাঙালির দৈহিক উন্নতি ও অবনতি নির্ভর করে রয়েছে এই ‘ব্যক্তিগত শরীর’-এর স্বাভাবিক বাড়বৃদ্ধি, তার চিকিৎসা ও রোগ নিরাময়কে কেন্দ্র করে—এমনটাই ছিল শরীরবিদদের অভিমত ৷

‘মেডিক্যালাইজেশন অব সেক্স’-এর ধারণা বিকশিত হবার ফলে শরীর-যৌনতা নতুন ভাবে সংগঠিত হল মূলত তিনটি বিষয়কে আশ্রয় করে—‘ক্ষমতা’, ‘জ্ঞান’ ও ‘সুখবোধ’ ৷ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধব্যাপী এই দৃষ্টিকোণ থেকেই অনেকগুলি সেক্স ম্যানুয়াল লেখা হয় ৷ যেমন, অন্নদাচরণ খাস্তগীরের মানবজন্মতত্ব, ধাত্রীবিদ্যা, নবপ্রসূত শিক্ষা ও স্ত্রী জাতির ব্যাধি সংগ্রহ  (১৮৭৮), সূর্যনারায়ণ ঘোষের বৈজ্ঞানিক দাম্পত্য প্রণালী (১৮৮৪), যোগেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়র জীবনরক্ষা  (১৮৮৭), কেদারনাথ সরকারের ঋতু-রক্ষা (১৮৯২), ভারতচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুশ্রূষাপ্রণালী (১৮৯৬) ইত্যাদি ৷ এই বইগুলি এবং পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধে দেখা যায় শরীর-যৌনতা সংক্রান্ত পাশ্চাত্য নীতিবাগীশতার সঙ্গে দেশীয় ব্রাহ্মণ্য রক্ষণশীলতা ও শুচিতাবোধ যুক্ত হয়ে একধরনের চিকিৎসাশাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যৌনসম্ভোগ ও যৌন ক্রিয়াকলাপের বিশ্লেষণ করা হচ্ছে ৷ যৌনতার পাশ্চাত্য উপযোগিতাবাদী ব্যাখ্যাই এখানেও গৃহীত হতে থাকে ৷ বলা হতে থাকে—যৌনতা ও যৌনাচারের মধ্যে সুখানুভূতি ও আনন্দের কোনো ভূমিকা নেই ৷ এর একমাত্র প্রয়োজনীয় উপযোগিতাবাদী তাৎপর্য যদি কিছু থেকে থাকে, তবে তা হল সন্তান উৎপাদন ৷ বস্তুত, সন্তান উৎপাদনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে এসময়ের যাবতীয় যৌনভাবনা ৷ যৌনতার বস্তুগত প্রয়োজনীয়তা-নিরপেক্ষ কোনো মূল্য বা তাৎপর্যও যে থাকতে পারে—এধরনের ভাবনা নির্বাসিত হয়ে যায় ৷ এমনকী, যৌনসম্ভোগজনিত কারণে একাধিক স্বাস্থ্যহানিকর বিকারের জন্ম হয়—এহেন ধারণাও গড়ে ওঠে ৷ এই বিকারের কারণগুলি এরকম:

ক. যৌনসম্ভোগ মূলত স্বাস্থ্যহানি ঘটায় ৷ এর ফলে মানুষ তার প্রকৃতিদত্ত স্বাস্থ্যের অপব্যবহার ঘটায় অমিতাচার, অসংযম, ইন্দ্রিয়তৎপরতার দ্বারা ৷

খ. যৌনসম্ভোগের ফলে মানুষের শরীর-মন-চরিত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য ব্যাহত হয় ৷ ফলে যৌনতা মানুষকে ‘অ্যাবনর্মালিটি’র দিকে নিয়ে যায় ৷ অর্থাৎ, যৌনসম্ভোগ একটি অস্বাভাবিক, প্রকৃতিবিরুদ্ধ এবং চরম স্বাস্থ্যহানিকর কাজ ৷

এক্ষেত্রে আরোও কয়েকটি কথা বলে নেওয়া দরকার ৷ প্রথমেই বোঝা প্রয়োজন পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক ডিসকোর্স ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে ঠিক কী ভূমিকা পালন করেছে ৷ উপনিবেশের সামাজিক পরিবর্তন, প্রগতি, সমাজসংস্কারের বাহক হিসেবে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান এক্ষেত্রে প্রথম যে সমস্যার সম্মুখিন হয়, তাকে বলা যেতে পারে ‘সাংস্কৃতিক পার্থক্যে’র বাস্তবতা ৷ একদিকে যেমন ঔপনিবেশিক প্রভুর দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাক-ব্রিটিশ দেশীয় সংস্কৃতিকে ‘পশ্চাৎপদ’ ও ‘প্রগতিবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হল, পাশাপাশি এই ‘অনা-আলোকিত’ সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোর উন্নতির জন্যই পাশ্চাত্য বিজ্ঞান হয়ে ওঠে অপরিহার্য ৷ কিন্তু, পাশ্চাত্য বিজ্ঞান দেশীয়-জ্ঞানকাঠামোকে কখনোই পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত করতে পারেনি ৷ কারণ, সেক্ষেত্রে পরাজিত জাতির আত্মপরিচয় পুরোপুরি মুছে যাবার সম্ভাবনা থেকে যায় ৷ একদিকে দেশীয় জ্ঞানকাঠামোর যথোপযুক্ত পরিবর্তন/প্রতিসরণ যেমন প্রয়োজন, তেমনই পাশ্চাত্য জ্ঞানভাণ্ডারকে সম্পূর্ণ পৃথক পরিপ্রেক্ষিতে ‘স্বাভাবিকীকৃত’ করাও জরুরি ৷ এর ফলে বিজাতীয় সাংস্কৃতিক জ্ঞানভাণ্ডারকে দেশীয় উপাদানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘অনুবাদ’ করে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে ৷৪১ জ্ঞান প্রকাশ দেখিয়েছেন এই অনুবাদের প্রক্রিয়ায় পাশ্চাত্যের ‘সভ্যতাবিস্তারের ব্রত’ ঔপনিবেশিক প্রেক্ষিতে এসে নিজের সর্বজনীনতার দাবি থেকে সরে গিয়ে এক ধরনের সঙ্কুচিত দেশীয় স্থানাঙ্ক নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে ৷ ফলত, ‘বর্বর’ প্রাচ্যকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য বর্বরতাই একমাত্র পথ—জন স্টুয়ার্ট মিলের এই মনোভাবকে কার্যকর করতে গিয়ে সাদা/কালো, সভ্য/অসভ্য, শিক্ষিত/অশিক্ষিত, প্রগতি/পাশ্চাৎপদতা-জাতীয় দ্বৈত বিপরীত জোড়ের স্পষ্ট বিভাজন এক্ষেত্রে অপসারিত হতে বাধ্য হয়েছে ৷৪২

এর ফলে যা ঘটল, তাকে বলা যেতে পারে ‘বর্ণসংকর জ্ঞানকাঠামো’-র আবির্ভাব ৷ অর্থাৎ, এক্ষত্রে দেশীয় প্রাক-ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাঠামো এবং পাশ্চাত্য বহিরাগত ‘বিজ্ঞান’ কোনো প্রত্যক্ষ দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে গ্রথিত নয় ৷ এক্ষেত্রে কোনো ‘ডায়লেকটিক’ গড়ে উঠছে না, যা হেগেলীয় পরিভাষায় দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে কোনো উন্নত মাত্রায় পৌঁছবে ৷ প্রাক-ঔপনিবেশিক দেশীয় জ্ঞানকাঠামো ‘থিসিস’, পাশ্চাত্য উন্নত বিজ্ঞান ‘অ্যান্টিথিসিস’, উভয়ের দ্বান্দ্বিক পরিণতি দেশীয় প্রেক্ষিতে কোনো উন্নত ‘সিন্থেসিস’-এর জন্ম দিচ্ছে—ব্যাপারটা মোটেই এরকম নয় ৷ শিক্ষিত দেশীয় এলিট কর্তৃক পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক ধারণাকে গ্রহণ করার প্রক্রিয়াটি, হোমি ভাভার মতে, আদৌ ‘ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের সশব্দ আধিপত্য এবং দেশীয় ঐতিহ্যের নীরব আত্মসমর্পণ’ নয় ৷৪৩ এক্ষেত্রে দুই পৃথক জ্ঞানকাঠামোর কেউই নিজস্ব স্বরূপ বজায় রাখতে পারছে না, ফলত, একধরনের ‘সংকরায়ণ’ ও ‘বৌদ্ধিক সম্প্রসারণ’ ঘটছে ৷৪৪ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, এটিই দেশীয়, স্থানীয় প্রেক্ষিতে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের ‘পুনর্নিয়োজিত’ হওয়া ৷৪৫

ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের আলোচনার সূত্র ধরে জ্ঞান প্রকাশ অনুবাদের এই প্রক্রিয়াকে ‘Inter-linear or between- the line-translation’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন৪৬ ৷ দেশীয় এলিট পাশ্চাত্য আধুনিকতার শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, গ্রহণ করেছিল, একইসঙ্গে পাশ্চাত্য আধুনিকতার ক্যাটেগরিগুলোকে বদলে নিচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে, তার নিজস্ব আধুনিকতার কৌশলগত ভিত্তিকে আমরা ফুকোর ভাষায় বলতে পারি ‘সন্দর্ভের প্রেক্ষিতে আকাঙক্ষার অবস্থান’ ৷৪৭ এর ফলস্বরূপ আমাদের দেশীয় ‘আধুনিকতা’র প্রকরণটি গড়ে উঠল পাশ্চাত্য ডিসকার্সিভ কাঠামোর ভিতরে অসংখ্য দেশীয় নন-ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিসের অনুপ্রবেশের মধ্য দিয়ে ৷ বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায় উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময় থেকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিকাশ এবং এক কাল্পনিক প্রাচীন হিন্দু বিজ্ঞানের ধারণা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ৷ এই বৈজ্ঞানিক কল্পনাকে আমরা ‘প্রত্নবিজ্ঞান’ নাম দিতে পারি ৷ পরাধীন জাতির অধঃপতিত বর্তমান থেকে মুক্তি পাবার জন্য এক কাল্পনিক হিন্দু অতীতের পুনর্নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছিল, যে অতীতের উপাদান গড়ে উঠেছে এক ‘শূন্য, সমসত্ব সময়ে’র৪৮ ধারণাকে আশ্রয় করে এবং যে সময় বিস্তৃত হয়ে রয়েছে একদিকে স্মৃতিহীন অতীত এবং সম্ভাবনাময় পূর্ণ অনন্ত ভবিষ্যতের ভিতর ৷ পাশ্চাত্যের ‘যুক্তিবাদী’ আধিপত্য থেকে মুক্তি পাবার জন্য এই সময়কল্পনাই ছিল ঔপনিবেশিক জাতীয়তাবাদের আত্মপরিচয়কে সংহত করার অস্ত্র ৷ দীর্ঘ সময়পরিক্রমার মধ্য দিয়ে ‘হিন্দু প্রত্নবিজ্ঞান’ যে ক্ষয় ও অপচয়ের সম্মুখিন হয়েছে, তার না-বাচক দিকগুলি অপসারিত করে প্রকৃত বিশুদ্ধ প্রাচীন চেহারাটির পুনর্নির্মাণ ঘটানোই এই জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের উদ্দেশ্য ৷ ফলত, এই অভীপ্সাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ‘কোনো এক অতীতের বিলম্বিত উপলব্ধি’র মধ্য দিয়ে ৷৪৯

এই জাতীয়তাবাদী অভীপ্সার তাৎপর্য বুঝতে পারলেই স্পষ্ট হবে, কেন উনিশ শতকের শেষার্ধের পত্রপত্রিকা এবং বইপত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত ‘যৌনতার বিজ্ঞান’ সর্বদাই কোনো এক প্রাচীন ভারতবর্ষীয় জ্ঞানতত্বের সাপেক্ষে বর্তমান সমাজের যৌনতা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নৈতিকতার কাম্য ধারণাগুলিকে ব্যাখ্যা করেছে ৷ ঔপনিবেশিক প্রশাসনিকতা, পাশ্চাত্য চিকিৎসাশাস্ত্র, যুক্তিবাদী বিজ্ঞানের আধিপত্য দ্বারা ভারতবাসীর ‘দুর্বল’ ‘পরমুখাপেক্ষী’ ‘কম পৌরুষসম্পন্ন’ ‘শরীর’-কে দখল করতে চেয়েছে, বিপরীতে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা চেয়েছে নিজস্ব ‘প্রশাসনিকতা’র জন্ম দিতে ৷ যাতে ‘ব্যক্তিগত’ এবং ‘জাতীয়’ শরীর-এর পুনর্গঠন প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি ঔপনিবেশিক প্রভুর হাতে চলে না যায় ৷ এর ফলস্বরূপ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্থ থেকেই পরিবার, পারিবারিক মূল্যবোধ, পারিবারিক অনুশাসনের আওতায় সন্তানের চরিত্রগঠন-সংক্রান্ত নতুন কয়েকটি তথাকথিত ‘যৌক্তিক’ ধারণার জন্ম হয় বাংলার শিক্ষিত সমাজে ৷ যেহেতু ঔপনিবেশিক শাসনের আওতায়, বাইরের জগতে, সাধারণ মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোকে’র পক্ষে কোনো ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রকেই করায়ত্ত করা সম্ভব ছিল না, কোনো ধরনের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক এমনকী সামাজিক নিয়ন্ত্রণের শক্তিও ছিল না তার, সেকারণেই বাইরের জগৎ থেকে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের দৃষ্টি সরে এসে পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত হল পারিবারিক অন্তঃপুরে ৷ পরিবার, পিতা-মাতা, শিশুর শৈশব ও তার চরিত্রগঠন পদ্ধতি—ইত্যাদি হয়ে উঠল ‘বৈজ্ঞানিক’ আলোচনার বিষয়বস্তু ৷ যেহেতু বাইরের জগতে ‘নেশন’-সংক্রান্ত ধারণার বাস্তবায়ন ঘটানোর কোনো উপায়ই ছিল না, তাই ‘পরিবার’ হয়ে উঠল বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘কাল্পনিক’ সার্বভৌম ‘ক্ষেত্র’, যেখানে বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত তার মনের মতো পরিসর খুঁজে পেতে পারে ক্ষমতা প্রয়োগের ৷ ‘অন্তঃপুর’ হয়ে উঠল বাইরের জগতে অ-সম্ভব এক ‘নেশন’-এর বাস্তব রূপায়ণ ৷৫০

এই সার্বভৌম, ঘরোয়া, পারিবারিক ‘নেশন’-এর একচ্ছত্র অধিপতি হলেন পিতা—যিনি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের প্রতিভূ ৷ মা-র কাজ পিতার আধিপত্যে মদত ও সহায়তা দেওয়া ৷ বাইরের পৃথিবীতে ব্রিটিশ কলোনির প্রজা হলেও, ঘরের ভিতর পিতাই শাসক, তার যৌক্তিক স্বেচ্ছাচার চালানোর উপযুক্ত ক্ষেত্র হল—সন্তান ৷ এখানে শিশুসন্তানই ‘প্রজা’-র ভূমিকা নিচ্ছে ৷ ঔপনিবেশিক প্রভাবে ‘প্রাপ্তবয়স’ এবং ‘শৈশব’-এর ধারণাও নতুন করে, পুনর্নির্মিত হয়েছিল শিক্ষিত বাঙালির মননে ৷ ‘শৈশব’-কে প্রাপ্তবয়সের ‘অসম্পূর্ণ ক্ষুদ্র সংস্করণ’ হিসেবে ধরে নিয়ে নিরন্তর শিক্ষা, নিয়মানুবর্তিতা, শাসন, শাস্তি, জ্ঞানানুশীলনের মধ্য দিয়ে তাকে যুক্তিবাদী’ পূর্ণাঙ্গ, প্রাজ্ঞ-প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গড়ে তোলার ধারণা প্রাধান্য পেতে থাকে ৷ কিন্তু এক্ষেত্রে নিরন্তর নিয়ন্ত্রণ-নজদারি-শাসনের প্রক্রিয়াটির মসৃণ ‘স্বাভাবিকীকরণ’ এমনভাবে ঘটানো হয়, যাতে, শিশু কখনোই বুঝতে না পারে যে, সে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, বরং সে ‘আত্মশৃঙ্খলা’ এবং ‘আত্মগঠন’-এর প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয় ৷ আর এই প্রক্রিয়ায় শিশুর ‘শরীর’ এক সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে যায় ৷৫১

এভাবেই প্রতিটি শিশু পারিবারিক ক্ষমতাকাঠামোর ঘেরাটোপে বাবা মা-র ২৪ ঘণ্টাব্যাপী স্ক্রুটিনির আওতায় চলে আসে ৷ শিশুর শরীরের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর যৌনতাও এই তত্বাবধানের পরিসরে ঢুকে পড়ে ৷ যৌনতা, যৌন-আচরণের ভালো-খারাপ দিক, যৌনাঙ্গের অপ্রয়োজনীয় উদ্দেশ্যহীন ব্যবহার, বীর্যসংরক্ষণের গুরুত্ব—সবকিছুই এই তত্বাবধানের এলাকায় অজস্র শাসনের ‘রীতি’ গড়ে তোলে ৷ তবে এক্ষেত্রেও পাশ্চাত্য ‘বৈজ্ঞানিক’ ধারণার সঙ্গে দেশজ ধারণার মিল এবং বৈষম্য—দুইই চোখে পড়ে ৷ খ্রিস্টীয় ধারণায় ‘হস্তমৈথুন’ পাপ হলেও, আমাদের লেখালেখিতে একে ‘পাপ’ অথবা ‘উন্মাদনা’র সঙ্গে একীভূত করা হয়নি ৷ উনিশ শতকীয় লেখালেখিতে ‘ব্রহ্মচর্যে’র ধারণাটি মূলত গড়ে উঠেছে বীর্যসংরক্ষণ-এর একমাত্রিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ৷ বারবার প্রাচীন ব্রাহ্মণ্যবাদী আচার-আচারণসমূহের সাপেক্ষে এর গুরুত্ব বোঝানো হলেও সমসাময়িক প্রেক্ষিতে ‘জাতি’ নির্মাণের সাম্প্রতিক চাহিদাই এর চালিকাশক্তি ৷ যদিও যে দেশজ যুক্তিক্রম এক্ষেত্রে সাজানো হচ্ছে তা পুরোপুরি উচ্চবর্ণীয়, পুরুষতান্ত্রিক, জাতীয়তাবাদী লক্ষণ দ্বারা সম্পৃক্ত ৷ সমকালীন চিকিৎসাশাস্ত্রীয় পত্র-পত্রিকা থেকে এধরনের কয়েকটি লেখাপত্র উদ্ধৃত করলেই বিষয়টি বোঝা যাবে ৷

চিকিৎসা সম্মিলনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় দেশীয় স্বাস্থ্য বিজ্ঞান: অভিগমন বা স্ত্রী-পুরুষ সংসর্গ’ প্রবন্ধটি ৷ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্থে প্রচলিত যৌনতার ডিসকোর্সের সবকটি ক্যাটেগরিই এখানে আলোচিত হয়েছে ৷ এই প্রবন্ধের শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘বাঙ্গালী জাতির দেহ স্বভাবতই যারপরনাই মৃদু এবং ক্লেশসহিষ্ণু এবং অত্যল্প লোকেরই দেহ স্বভাবত বলশালী দেখিতে পাওয়া যায় ৷’ প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্যের একটি বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে বালক ও কিশোরদের হস্তমৈথুন প্রবণতার বিরুদ্ধে একতরফা ক্যাম্পেন, তজ্জনিত আতঙ্ক ও হতাশা ৷ লেখক বলছেন:

কি শহরস্থ, কি পল্লীগ্রামস্থ, কি ইতর লোক অথবা কি ভদ্রলোক, সকল শ্রেণীর অধিকাংশ বালকের মধ্যে এই ভয়ানক কুরীতির প্রচলন থাকিলেও ইহার বিষময় পরিণাম কিন্তু ইতরলোক অপেক্ষা ভদ্রলোকের ছেলেদেরই অধিক ভোগ করিতে হয়, এই ভদ্র শ্রেণীর মধ্যে আবার যারা পাঠ্যাবস্থায় থাকে, তাহাদের অদৃষ্ট আরো মন্দ ৷ ইহার বিশেষ কারণ এই যে, যাহারা প্রতিনিয়ত বিদ্যাভ্যাস বা অন্য কোন অতিরিক্ত মানসিক কার্যে সর্ব্বদা ব্যাপৃত থাকেন, সাধারণের অপেক্ষা একেই তো তাঁহাদের কামপ্রবৃত্তি বা ইন্দ্রিয়শক্তি অপেক্ষাকৃত অল্প হইয়া পড়ে ৷ তাহাতে সেই অবস্থাতে যদি আবার হস্তমৈথুনাদি দ্বারা অনুত্তেজিত ও অপরিস্ফুট শুক্রকে বলপূর্বক অতিকষ্টে উত্তেজিত করিয়া শরীর হইতে প্রতিনিয়ত নির্গত করিয়া দেওয়া যায়, তাহা হইলে আর কি রূপে দেহস্থ শুক্রধাতু অব্যাহত থাকিতে পারে?৫২

লক্ষণীয়, হস্তমৈথুনের কুফল বোঝাবার জন্য অবিকল খ্রিস্টীয় কনফেশনের কায়দায় দুজন প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীর দীর্ঘ স্বীকারোক্তি উদ্ধৃত হয়েছে এই প্রবন্ধে ৷ দুজনেই পত্রিকার নিয়মিত পাঠক ৷ দুজনই এই প্রথম লোকলজ্জা, ভয় অতিক্রম করে সম্পাদককে দীর্ঘ চিঠি লিখে জানিয়েছেন তাঁদের যৌন ক্ষমতার চুতি, শুক্রের ঘনত্ব হ্রাস, পুরুষাঙ্গের বক্রাকার লাভ এবং কোষ্ঠকাঠিন্য, ক্ষুধামান্দ্য ইত্যাদি আনুষঙ্গিক রোগভোগের (যেগুলো সেকালে হস্তমৈথুনের প্রত্যক্ষ ফল বলেই মনে করা হত) কথা ৷ উভয় পত্রলেখকের বয়ানেই সবচেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে তীব্র অনুতাপের কণ্ঠস্বর ৷ এছাড়াও হস্তমৈথুনের কারণে তীব্র পাপবোধ, নিঃসঙ্গতা এবং প্রতিমুহূর্তে গোটা ব্যাপারটা গোপন করার চাপ তাদের মানসিকভাবে পঙ্গু ও প্রান্তবাসী করে দিয়েছে অনেকটাই ৷ ধর্মযাজক, পুরোহিত কিংবা পিতামাতা নয়, আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক সম্পাদককেই তারা দুজনেই সর্বপ্রথম জানাতে পারল নিজেদের প্রান্তিক অবস্থানের কথা ৷ এর ফলে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের জ্ঞানযুক্তি-সম্পন্ন কর্তৃত্বের কাছে ব্যক্তির নিজস্বতার আত্মসমর্পণের ইতিহাসটাই আরেকবার স্পষ্ট হয় আমাদের সামনে ৷

কিন্তু লেখক যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত, তা হল স্ত্রী-পুরুষ সংসর্গ এবং তার ফলে গর্ভাধানজনিত প্রাচীন আর্য ঐতিহ্য থেকে সমকালীন বাঙালি সমাজের বিচ্যুতি ৷ লেখক দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়েছেন:

স্ত্রী-সংসর্গের উদ্দেশ্য সাধারণতঃ দ্বিবিধ, কাম রিপুর চরিতার্থ এবং অপত্যোৎপাদন ৷ জ্ঞানবান মাত্রই ইহা জানেন যে, কাম রিপুর চরিতার্থ জনিত যে সুখ, তাহা অতি ক্ষণস্থায়ী; প্রকৃতপক্ষে তাহা সুখের মধ্যেই গণ্য করা যাইতে পারে না ৷ সুতরাং অপত্যোৎপাদনই একমাত্র প্রধান উদ্দেশ্য বলিয়া গণ্য করা কর্তব্য ৷ অতএব, কিরূপ প্রণালীতে স্ত্রীসংসর্গ করিলে সুসন্তান উৎপন্ন হইতে পারে তাহা সাধারণের জ্ঞান থাকা উচিত ৷ পুরাকালে আর্য্যাবর্ত্তে এ বিষয়ে সমধিক আলোচনা ছিল ৷৫৩

অর্থাৎ, প্রাচীন আর্যরা কীভাবে, কোন কোন ঋতুতে কি পরিমাণে, তিথি, বার, নক্ষত্র, শারীরিক ও মানসিক অবস্থা মেনে স্ত্রী-সংসর্গ করতেন—তার নিরিখে আজকের অধঃপতিত হিন্দুসন্তানের যৌনজীবনকে পুনর্নির্মিত করাই পত্রিকা-সম্পাদকের উদ্দেশ্য ৷ তাই এই লেখায় ‘সংস্কারতত্বে গর্ভাধান’ নামে একটি পূর্বপ্রকাশিত প্রবন্ধের পুনর্মুদ্রণ যুক্ত করা হয়েছে ৷ এতে গর্ভাধানের গুরুত্ব হিসেবে বলা হয়েছে:

প্রাচীন আর্যের মতে গর্ভ হইতেই জীবের সংস্কার কার্যের আরম্ভ ৷ গর্ভাধানাদি দশবিধ সংস্কারই জীবের ঐহিক ও পারত্রিকের পক্ষে একমাত্র শ্রেয়…গর্ভকে সংস্কৃত কর—হৃষ্ট, পুষ্ট,বলিষ্ঠ ওই ধার্মিক সন্তান সকল জন্মগ্রহণ করুক, তাহা হইলেই সামাজিক উন্নতি, জাতীয় উন্নতি, ধর্ম্মনীতির উন্নতি—সকল উন্নতিই আপনা-আপনি হইবে ৷৫৪

এমনকী বিবাহের ক্ষেত্রেও চরম রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টিকোণকেই প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং গোটা ব্যাপারটাই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে ‘বিজ্ঞান’ হিসেবে: ‘সগোত্রা, সপিন্ডা, অসবর্ণা কন্যাতে আর্যে্যর দার পরিগ্রহ একেবারে নিষেধ… তাঁহারা পুত্রার্থে ভার্য্যা পরিগ্রহ বিবেচনা করেন, সুতরাং ভার্য্যা পরিগ্রহের পূর্বে সুরূপ, বলবান ও গুণান্বিত পুত্রকামনায় সুক্ষেত্রের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখিয়া থাকেন ৷ প্রাচীন আর্য্যগণ কামপ্রবৃত্ত হইয়া পরস্ত্রীগমন করা দূরে থাকুক, নিজ ভার্য্যাতেও অজ্ঞানে উপরত হইতেন না ৷ চতুর্দ্দশী, অষ্টমী, পূর্ণিমা, অমাবস্যা ইত্যাদি যে যে পর্বকালে এবং সায়ংকালে যে ভাবে গমন করিতে নিষেধ, এই সমুদয় মানিয়া তাঁহারা স্ত্রীগমন করিয়া থাকেন ৷’৫৫

এছাড়াও, বালক-বালিকাদের ইন্দ্রয়চাঞ্চল্য রোধে, সংযম বৃদ্ধির উপায় হিসেবে ‘পুষ্টিবিজ্ঞান’-এর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে ৷ যেসব খাদ্যগ্রহণ করলে শারীরিক পুষ্টি ঘটে অথচ অসংযমের বহিঃপ্রকাশ ঘটে না, সে ধরনের খাদ্যতালিকার সুদীর্ঘ তালিকা দেওয়া হয়েছে এই লেখায় ৷ চিকিৎসা সম্মিলনীতে প্রকাশিত একটি লেখায় বালিকাদের হস্তমৈথুন প্রবণতা এবং অতিমাত্রায় সম্ভোগেচ্ছার বিরুদ্ধে রীতিমতো জেহাদ ঘোষণা করা হয়েছে:

স্ত্রীলোক গোপনে হস্তকৃত সম্ভোগদোষে আক্রান্ত হইলে তাহারা প্রায়ই লোকসমাজে যাইতে অনিচ্ছুক হয়, তাহাদের শরীর কর্কশ, মুখ মলিন ও চক্ষু বসিয়া যায় ও উহার চারিদিকে কালিমা পড়ে, হৃৎকম্প, নাড়ী ধীরগামী এবং শরীর হইতে একপ্রকার দুর্গন্ধযুক্ত ঘ্রাণ নির্গত হয় ৷ স্বামীর সঙ্গে অতিরিক্ত সম্ভোগে রমনীদের স্বাস্থ্যভঙ্গাদি ও স্বভাবের অতিশয় পরিবর্তন ঘটে ৷ …ইহারা স্বামী হইতে দীর্ঘকাল পৃথক থাকিলে প্রায় সুস্থ থাকে এবং একত্রে বাস করিতে থাকিলে প্রবল রজসাধিক্য, রজঃকৃচ্ছ্র, ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয় ৷৫৬

স্কুল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক এবং বিশেষত অভিভাবকদের হাতে হস্তমৈথুন নির্মূল করার পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যক্তির শরীর এবং যৌনতাকে এক কঠোর নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা যেমন চলেছে, তেমনই সমকালীন সমাজে এই বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা করতে গিয়েও এক ধরনের দ্বন্দ্ব এবং টানাপোড়েনের শিকার হয়েছেন লেখকরা ৷ যদিও তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব এই সুখভোগ উদ্রেককারী শারীরিক অভ্যাসটির বিরোধিতা করার জন্য প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়েছেন ৷ এক্ষেত্রেও ফুকো-কথিত ‘সন্দর্ভের বংশবিস্তার’-এর ধারণাটিই কার্যকর হতে দেখি আমরা ৷ লেখক কিন্তু যৌনতার অবদমনই শুধু ঘটাতে চাইছেন না ৷ তিনি চাইছেন যৌনতাকে বৈজ্ঞানিক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করতে ৷ যেকারণে বারবার এই বিষয়টিকে একধরনের এথিকো-মেডিক্যাল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ৷ আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, সব লেখকই মূলত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের বালক-বালিকাদের যৌনতাকেই একমাত্রিক ভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু ভেবেছেন ৷ ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডেও যৌনতাবিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রস্থলে ছিল শিক্ষিত মধ্যশ্রেণির পরিবারের শিশু-কিশোর, মধ্যশ্রেণির নারীপুরুষের দাম্পত্য ও যৌন সম্পর্ক ৷ এই নিজের শ্রেণিকেই সামাজিক স্বাস্থ্যরক্ষার নৈতিক দায়বোধ অর্পণ করার প্রক্রিয়াটিকে আমরা অনায়াসেই ‘বাঙালি ভিক্টোরিয়ান সমাজে’র ডিসকোর্স হিসেবে অভিহিত করতে পারি ৷ চিকিৎসা সম্মিলনী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায় বলা হয়েছে:

দুঃখের বিষয় অধিকাংশ বালকদিগের পক্ষে হস্তমৈথুন ব্যাপার সর্বনাশজনক হইলেও বিষয়টার মধ্যে একটু অশ্লীলতার আভাস আছে বলিয়া দেশের বর্তমান সুশিক্ষিত মহাশয়রা এসকল কথার আন্দোলন আলোচনার আদৌ পক্ষপাতী নন ৷৫৭

আবার, অণুবীক্ষণ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায় বলা হয়েছে:

পিতা মাতা শিক্ষক অভিভাবক এবং দেশহিতৈষী সহৃদয় ব্যক্তি সকলেই আলস্য ত্যাগ করিয়া মোহনিদ্রা হইতে গাত্রোত্থান করুন ৷ আর সময় নাই, চীৎকার ধ্বনিতে মুক্ত কণ্ঠে অল্পবয়স্ক সন্তানদিগকে অনৈসর্গিক উপায়ে রেতঃপাতন হইতে সাবধান করুন ৷ বৃথা লজ্জার পরবশ হইয়া পূণ্যভূমি ভারতকে আর অবনত করিবেন না ৷ অশ্লীল কথা কি প্রকারে মুখে আনিয়া অশ্লীল ব্যবহার হইতে বালকদিগকে নিরস্ত হইতে উপদেশ করিব এই বৃথা লজ্জায় আমাদের সর্বনাশ হইতেছে ৷৫৮

আরও একটা ব্যাপার খুবই গুরুত্বপূর্ণ ৷ যৌনতার ‘মেডিক্যালাইজেশন’ প্রক্রিয়ার আলোচনায় লেখকেরা পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যার চেয়ে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের উপর অনেক বেশি নির্ভর করতে চাইছেন ৷ পূর্বোল্লিখিত প্রবন্ধেই লেখক বলেছেন:

অস্মদ্দেশীয় ধর্মশাস্ত্র, স্মৃতি ইত্যাদি যত উপযোগী, বোধহয় পৃথিবীর আর কোনও দেশীয় শাস্ত্রই এত উপযোগী নহে ৷ কিছুদিন পূর্বে অনেকের নিকটে শাস্ত্রোক্ত ব্যবস্থা সদভিপ্রায়হীন কুসংস্কার বলিয়া বোধ হইত ৷ কিন্তু এক্ষণে বয়োবৃদ্ধি ও চিন্তাশীলতার প্রসাদাৎ তাঁহারাই বলেন, ইউরোপীয় হাইজিন শাস্ত্র (চিকিৎসাশাস্ত্রান্তর্গত স্বাস্থ্যসংরক্ষক শাস্ত্র) অপেক্ষা অস্মদ্দেশীয় ধর্মশাস্ত্র সহস্রগুণে শ্রেষ্ঠ ও হিতকারী… ইউরোপীয় চিকিৎসকেরা এদেশীয় লোকের শারীরিক অবস্থা বিষয়ে এত অনভিজ্ঞ যে, তাঁহাদিগের ব্যবস্থা অনেক সময়ে আমাদের অহিতকর হইয়া উঠে ৷৫৯

এভাবেই জ্ঞান, যুক্তি, দর্শন, রাজনীতি, সংস্কৃতির মতই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগের বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা পাশ্চাত্যের জ্ঞানকাঠামোর ধারায় নিজেদের ধারণাকে প্রণালীবদ্ধ করতে চেয়েছেন, পাশাপাশি তাদের নিজেদের দেশীয় ঐতিহ্যের থেকে লব্ধ জ্ঞানও বারবার প্রাধান্যমূলক অবস্থানে চলে আসতে চেয়েছে ৷ এই দ্বন্দ্ব-আপসের প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের নিজস্ব ‘আধুনিকতা’র পৃথক ইতিহাস, যা শরীর-যৌনতার ইউরোপীয় অবদমন প্রক্রিয়াকে আত্মস্থ করেছে নিজেদের অভিজ্ঞতালব্ধ সংস্কারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, হয়ে উঠেছে এক সম্পূর্ণ মিশ্র ধরনের জ্ঞানভাণ্ডারের জগৎ, যদিও এর ফলে কলোনির প্রজার ব্যক্তিগত জীবনে ‘ক্ষমতা’র অবদমন প্রক্রিয়াটি হয়ে উঠেছে আরও হিংস্র, আরও জটিল ৷ চিকিৎসা সম্মিলনীর লেখক যখন বলেন: ‘পশুরাও অযথা কামাচার এর না… আর মনুষ্য কি বুদ্ধিমান জীব হইয়া এমন গুরুতর বিষয়ে সম্যক অবহেলা করিয়া আপনার সভ্যতার পরিচয় দিবে?৬০ অথবা, যৌন সম্পর্ক যে স্বাস্থ্যহানিকর, এর সঙ্গে শারীরিক বলবীর্য-সক্ষমতার যে কোনো সম্পর্ক নেই, তা বোঝাতে গিয়ে সমসাময়িক একটি প্রবন্ধে যখন বলা হয়, যেহেতু ছিন্নমুষ্ক পুরুষেরা সবসময়ই বলিষ্ঠ ও পালোয়ান হয়, ফলে:

প্রমাণ হইতেছে যে পুরুষ ও স্ত্রীদের অন্ডকোষ ও ডিম্বকোষযন্ত্র সন্তানসন্ততি উৎপাদনের জন্যই আবশ্যক, শরীরের কিছুমাত্র হিতসাধন করে না…উৎপাদনযন্ত্র যখন শরীরের কোন উপকার করে না ৷ তৎসম্বন্ধীয় ক্রিয়া বা স্ত্রী-পুরুষ সংসর্গ স্বাস্থ্যরক্ষা সম্বন্ধে কিছুমাত্র সাহায্য করে না…৬১

তখন, সন্ত ফ্রান্সিস-কথিত ‘হ্যাতি-আদিকল্পে’র’ বিস্তার কীভাবে ঔপনিবেশিক সমাজেও প্রভাব ফেলেছে তা যেমন বোঝা যায়, তেমনি উপরে উদ্ধৃত লেখাগুলির মধ্যে দিয়ে এর পাশাপাশি ‘জাতীয় স্বাস্থ্যে’র বাহক হিসেবে ব্যক্তির যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে এবং যৌন অসুস্থতার কারণতত্ব, বিকারতত্ব, রোগের শ্রেণিবিভাজন ও রোগসংক্রান্ত আলোচনায় বারবার প্রাচীন হিন্দু চিকিৎসশাস্ত্রের ঘোষিত নিরিখে বর্তমানের নিরাময় খোঁজার চেষ্টার ভিতরেই পূর্বোল্লিখিত ‘বৌদ্ধিক সম্প্রসারণ’ প্রক্রিয়াটিও প্রমাণিত হয় ৷ আলোচনার পরবর্তী অংশে আমরা দেখতে চাইব পাশ্চাত্য ডিসকোর্স কীভাবে, দেশীয় ‘নন-ডিসকার্সিভ’ যৌনতার জ্ঞানতত্বের সঙ্গে মিলেমিশে উনিশ শতকীয় বাংলার ‘বর্ণসংকর’ ‘কামশাস্ত্র’ গড়ে তুলেছিল ৷

‘যৌনবিজ্ঞান’ থেকে দেশীয় ‘কামশাস্ত্র’, পার্থক্য ও মিশ্র জ্ঞানকাঠামো

পাশ্চাত্য ‘মেডিক্যালাইজেশন অব সেক্স’-এর প্রাণালীতে লেখা সর্বপ্রথম বাংলা পূর্ণাঙ্গ ‘সেক্স ম্যানুয়াল’ হল অন্নদাচরণ খাস্তগীর রচিত মানবজন্মতত্ব, ধাত্রীবিদ্যা, নবপ্রসূত শিশু ও স্ত্রীজাতির ব্যাধি সংগ্রহ (১৮৭৮) ৷ অবশ্য এটি এই বইয়ের উপশিরোনাম ৷ মূল নামকরণটি ইংরেজিতে—A Treatise on the Science and Practice of Midwifery with Diseases of Children and Women. বোঝাই যাচ্ছে সমকালীন ইউরোপে প্রচলিত সন্তানজন্ম ও ধাত্রীবিদ্যা-সংক্রান্ত ইংরেজি বইপত্রের আদলেই অন্নদাচরণের বইটি রচিত ৷ বইটিতে সুবিস্তৃতভাবে অসংখ্য চিত্রের সহায়তায় বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে নারীপুরুষের শারীরিক মিলন, গর্ভাধান, সন্তান-উৎপাদন প্রক্রিয়া আলোচিত ৷ এটি পুরোপুরি পাশ্চাত্য মেডিক্যাল ডিসকোর্সের বঙ্গীয় প্রতিলিপি ৷ পূর্বোক্ত অংশে আমরা যে ‘বর্ণসংকর’ জ্ঞানকাঠামো এবং ‘বৌদ্ধিক সম্প্রসারণ’ পক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছি, তার প্রত্যক্ষ নিদর্শন পাওয়া যায় ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত সূর্যনারায়ণ ঘোষ-এর বৈজ্ঞানিক দাম্পত্য প্রণালী বইটিতে ৷ এটি নিছক সেক্স ম্যানুয়াল নয়, বরং উনিশ শতকীয় ইংরেজিশিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা এথিকো-মেডিক্যাল দাম্পত্যসম্পর্ক, যৌনমিলন ও অপত্যোৎপাদন-সংক্রান্ত নৈতিক নির্দেশনামা ৷ বইটির উপশিরোনামও সেকথাই প্রমাণ করে: বিবাহ, ইন্দ্রিয়সেবন ও সন্তান উৎপাদন বিষয়ে বিজ্ঞানের বিধি এবং অবৈধ ইন্দ্রিয়সেবনের প্রতিফল ও প্রতিকার, ইন্দ্রিয় সংযমন, নারীজাতির জননেন্দ্রিয়ের ব্যাধি ইত্যাদির বিবরণ সংগ্রহ ৷ অর্থাৎ চিকিৎসাবিজ্ঞানের আদলেই এটি ‘ব্যক্তি’র আত্মগঠনসংক্রান্ত একটি বিস্তৃত জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের বহিঃপ্রকাশ ৷ লক্ষণীয়, সূর্যনারায়ণ ঘোষ নিজে ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল স্কুলের ‘কেমিকেল এসিস্ট্যান্ট’ অর্থাৎ সমকালীন পাশ্চাত্য চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে তিনি ছিলেন সম্যকভাবে ওয়াকিবহাল ৷ অথচ দাম্পত্য, যৌনসম্পর্ক, ইন্দ্রিয়সেবন সম্পর্কে তাঁর নৈতিক অবস্থান পাশ্চাত্য অবদমন প্রক্রিয়াকে আত্মস্থ করেও দেশীয় রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ্যবাদী অবস্থান থেকেই নিজেকে প্রকাশিত করেছে ৷ বইয়ের শুরুতেই একটি কাঠখোদাই ছবির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে: ‘অত্যাচারী, ব্যভিচারী, নাস্তিক ও কুলটা নরকে দারুণ যন্ত্রণা পাইতেছে, সচ্চরিত্র সদাশয় ধর্ম্মপরায়ণ নরনারী, ঐ ভয়ানক দুস্তর পুন্নামনরক অবহেলে উল্লঙঘন করিয়া স্বর্গে যাইতেছেন ৷’’ লেখকের ঘোষণা:

আপদের পথ ইন্দ্রিয়ের অদমন ৷

সম্পদের পথ হয় ইন্দ্রিয় দমন ৷ ৷

এইরূপ দুই পথ আছে বিদ্যমান ৷

যে পথে হইবে ইচ্ছা করহ প্রয়াণ ৷৬২

বইয়ের ‘বিজ্ঞাপন’ অংশে প্রাচীন আর্যজাতির জীবনধারণের দোহাই দিয়ে বর্তমান অধঃপতিত হিন্দুর উন্নয়নপ্রকল্প ঘোষণা করেছেন লেখক:

যে আর্যজাতি, প্রকৃতির প্রকৃত ইচ্ছানুরূপ বিবাহ, ইন্দ্রিয়সেবন, অপত্য উৎপাদন ইত্যাদি দাম্পত্যকর্মের বিধি সংস্থাপন করিয়া সবংশে নীরোগ সবল দীর্ঘজীবন প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, সেই বংশোদ্ভাব ব্যক্তিগণকে এক্ষণে মঙ্গলময় কৌলিক আচারভ্রষ্ট হইয়া, দাম্পত্যকর্ত্তব্য পালনে যথেচ্ছাচারী হইতে দেখিয়া ‘বৈজ্ঞানিক দাম্পত্য প্রণালী’ প্রণয়ন করিতে অগ্রসর হইয়াছি ৷

তাঁর আক্ষেপ, বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি অন্যান্য লেখকেরাও বই লিখেছেন, ‘‘…কিন্তু সেগুলির অনেক স্থান বিজ্ঞান ও প্রকৃতির বিরুদ্ধ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদ্বারা লিখিত… ৷’’ অর্থাৎ, সূর্যনারায়ণের অভিমত, তাঁর রচনার যাথার্থ্য নির্ভর করছে এর ‘বৈজ্ঞানিক ভিত্তি’র উপর, এখানে পাশ্চাত্য ধাঁচের ‘বৈজ্ঞানিক সত্য’-কেই অনুসরণ করতে চাইছেন তিনি ৷ অথচ, সমগ্র বইটি যে যুক্তিকাঠামোর দ্বারা গ্রথিত, তা কখনোই পাশ্চাত্য ‘রিজন’-কে শিরোধার্য করেনি ৷

‘সৃষ্টিরক্ষা বিষয়ে প্রকৃতির কৌশল’ নামক প্রথম অধ্যায়ে লেখক নরনারীর পারস্পরিক আকর্ষণের হেতু যে কামবাসনা, তার একটি প্রথাগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন: ‘‘স্ত্রীপুরুষের মিলনের প্রবৃত্তি জন্মাইবার জন্য প্রকৃতি একটি শক্তি নিযুক্ত করিয়াছেন, সেই শক্তির নাম ‘সম্মোহনী শক্তি’… সে শক্তি যে সামান্য মানবকে অনুক্ষণ মুগ্ধ ও অধীর রাখিয়া প্রকৃতির উদ্দেশ্য শতগুণে সাধন করিবে তাহাতে বিচিত্র কি?’’ কিন্তু প্রাক-ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাঠামোর অনুকরণেই সূর্যনারায়ণও মানবপ্রবৃত্তির সর্বাঙ্গীণ বিকাশের অঙ্গ হিসেবে চতুর্বর্গ সাধনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কামসাধনার নিদান দিয়েছেন: ‘‘ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ এই চারিটি বিষয় যিনি সংসাধন করিতে পারিলেন তিনিই প্রকৃতির নিকট ঋণমুক্ত হইলেন…ঐ চারিটির কোন একটি সাধন পূর্ণাকারে বা অতিরিক্ত সাধন করিয়া অন্যগুলির প্রতি তাচ্ছিল্য করিলে প্রকৃতির দায়মুক্ত কৈ হইল এবং শরীর ধারণের সার্থকতাই বা কি পূর্ণ হইল?’’

এই বইয়ে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে ‘ইন্দ্রিয়সেবন’, ‘অবৈধ ইন্দ্রিয়সেবন’ এবং ‘অবৈধ ইন্দ্রিয়সেবনের পরিণাম’ সম্পর্কে ৷ লেখকের স্পষ্ট ঘোষণা:

অভিনিবেশ পূর্বক চিন্তা করিয়া দেখিলে, স্পষ্টই উপলব্ধি হইবে যে, সন্তান উৎপাদন করাই ইন্দ্রিয়সেবনের প্রধান উদ্দেশ্য, প্রধান কেন একমাত্র উদ্দেশ্য বলিলেও অধিক হয় না ৷ পিতামাতা কেবল সন্তান উৎপাদনের জন্য প্রকৃতির নিকট দায়ী নহেন, দেহমন পূর্ণতাপ্রাপ্ত নীরোগ বলিষ্ঠ সন্তান উৎপাদনের জন্য বিশেষ দায়ী ৷… সবল পূর্ণাঙ্গ বিশিষ্ট নীরোগ সন্তান উৎপাদন করা ইন্দ্রিয় সেবনের মুখ্য উদ্দেশ্য ধরিলে যে যে অবস্থায় তাহার অন্যথা হয় তাহাকে অবৈধ ইন্দ্রিয়সেবন বলা যাইতে পারে ৷

এখানে স্পষ্টতই ফুকো-কথিত ‘ইকোনমি অফ প্লেজার’-এর ধারণা ক্রিয়াশীল ৷ সন্ত ফ্রান্সিসের মতই সূর্যনারায়ণও বলেছেন, ‘‘গো, মেষ, কুক্কুর, বিড়ালাদি ইতর জন্তুগণ’’ বিশেষ বিশেষ সময় ছাড়া সঙ্গম করে না ৷ এবং ‘‘মাসিক রজঃস্রাবের চতুর্থ, ষষ্ঠ, সপ্তম বা অষ্টম দিবসে বারেক সহবাস অথবা উক্ত কয়েক দিবস মধ্যে দুই তিন দিবসে ২ বার সহবাস করিলেই প্রকৃতি যে উদ্দেশ্যে মানুষকে জননেন্দ্রিয় প্রদান করিয়াছেন সেই উদ্দেশ্য পূর্ণাকারে সাধিত হয়’’ এবং এটাই লেখকের মতে ‘বিজ্ঞানসম্মত মিতাচার’, যা ‘‘পূর্বকালে ধর্ম্মপরায়ণ ভারতবাসী আর্যগণ’’ অনুসরণ করতেন ৷ অবৈধ ইন্দ্রিয়সেবনকে চারভাগে ভাগ করেছেন সূর্যনারায়ণ:

১. পাত্র পাত্রী বিচার না করিয়া অতিরতি উপভোগ

২. অপ্রাপ্তবয়সে ইন্দ্রিয়সেবন

৩. অস্বাভাবিক উপায়ে ইন্দ্রিয়সেবন

৪. অসুস্থ অবস্থায় ইন্দ্রিয়সেবন

এর ভিতরে ‘অস্বাভাবিক উপায়ে ইন্দ্রিয়সেবন’ বা ‘হস্তমৈথুন’ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন সূর্যনারায়ণ ৷ তাঁর মতে, এই রোগের অনিবার্য ফলাফল—‘আত্মবিকৃতি’ ৷ ‘আত্মবিকৃতি’র স্বরূপ আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন:

আজকাল ঘোর কলি মূর্তিমানে অবতীর্ণ সুতরাং মানবজাতি সভ্যতার দোহাই দিয়া স্বাভাবিক উপায়ে অনাদর ও পরম হিতকর মঙ্গলময় উপায় ত্যাগ করিয়া বিবিধ উপায়ে কৃত্রিম প্রক্রিয়ানুষ্ঠানে রত হইতেছেন, যাহা হউক কেবল সেই জন্যই আত্মবিকৃতি পাপ জগতে দিনে দিনে বিস্তৃত হইতেছে ৷ …পল্লীগ্রামবাসী ও সকল স্থানের শ্রমজীবীগণ মধ্যে এই পাপের অধিকার নিতান্ত কম, আজকাল বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীগণের মধ্যে ইহা যেন একটি কৌলিক রোগ হইয়া দাঁড়াইয়াছে…

অবিকল ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণির বালকবালিকাদের মতই এখানেও ‘হস্তমৈথুনের প্রকল্প’টি আক্রমণের লক্ষ্যস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছে দেশীয় মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর-কিশোরীদেরই ৷ তবে এক্ষত্রে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি রীতিমতো ‘লিঙ্গাত্মক’ ৷ কারণ, তাঁর ভাবনার কেন্দ্রস্থলেও রয়েছে রক্ষণশীল পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ ৷ পূর্বোক্ত চিকিৎসা সম্মিলনীর লেখকের মতই সূর্যনারায়ণও মনে করেন:

এস্থলে উল্লেখ করা আবশ্যক যে আমাদের দেশে সৌভাগ্যক্রমে নারীজাতি আত্মবিকৃতি পাপে অতি অল্প লিপ্ত হইলেও ইউরোপ প্রভৃতি অতি সুসভ্য দেশ সকলে ঐ পাপের প্রচলন নারীজাতির মধ্যে অনেক অধিক ৷ এই পাপে পাপী নারীগণের জননেন্দ্রিয়ের নানাপ্রকার ক্রিয়া ও নির্মাণগত বৈলক্ষণ্য উৎপন্ন হয়, দেহমন নানাপ্রকারে প্রপীড়িত হয় ৷ অধুনাতন ভারতললনাকুলে লজ্জার খর্বতা অনুসারে নানাপ্রকার অত্যাচার প্রবিষ্ট হইতে আরম্ভ হইয়াছে…

এখানে ‘অশুভ পাশ্চাত্য’/‘পবিত্র স্বদেশ’-জাতীয় বৈপরীত্যের ভাবনা ক্রিয়াশীল ৷ তবে হস্তমৈথুনের প্রাদুর্ভাবের কারণ সম্পর্কে সূর্যনারায়ণ যা বলেছেন তার কয়েকটি দিক রীতিমত অনুধানযোগ্য ৷ যেমন, সমকালীন ইউরোপীয় ‘অ্যানাটোমো-প্যাথলজিক্যাল’ দৃষ্টিকোণের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাঁর অভিমত:

কোন ২ বৈজ্ঞানিক চিকিৎসক বলেন যে, মস্তিষ্কের বিশেষ প্রকার অবস্থাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণের বিশেষ ২ প্রকার প্রক্রিয়া অনুষ্ঠান করিতে আসক্তি থাকে সুতরাং হস্তমৈথুনে স্পৃহাও ঐ প্রকার কোন মস্তিষ্কগত বিকারজন্য হইয়া থাকে ৷

পূর্বোক্ত গবেষণায় আর্নল্ড ডেভিডসন দেখিয়েছেন, মধ্য-উনিশ শতকের ইউরোপে যৌনবিকারের উৎস খুঁজতে গিয়ে মানবমস্তিষ্কের গড়ন-সংক্রান্ত আলোচনা প্রাধান্য পেয়েছিল ৷৬৩ বঙ্গীয় যুবসমাজের যৌনবিচ্যুতি রুখতে সূর্যনারায়ণের দাওয়াইগুলিও সমকালীন জাতীয়তাবাদী যুক্তিক্রমের চেয়ে খুব আলাদা নয়, যেমন, ‘বালকগণের মধ্যে আদিরসপূর্ণ নাটকাদির বহুল প্রচার ও বিকৃত রসপূর্ণ পুস্তকাদির প্রচার’ বন্ধ করা, ‘বহুজনাকীর্ণ নগরীতে… কূলটাগণকে সদৃচ্ছ সর্ব্বত্র অবস্থান করিতে দেওয়া, তাহাদের মন্ত্রপূত কটাক্ষ, ঐন্দ্রজালিক গান, সম্মোহন, কৃত্রিম রূপমাধুরী ও বেশভুষা’-কে নিয়ন্ত্রণ করা প্রভৃতি ৷ সর্বোপরি, সূর্যনারায়ণের প্রস্তাব বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে কোনো এক কাল্পনিক অতীতের পুননির্মাণ ৷ তাঁর আক্ষেপ:

পূর্বে সমাজবন্ধন দৃঢ় ছিল, সকলেই ধর্ম্মনীতি, লজ্জা, চরিত্র ইত্যাদির বিশেষ আদর করিতেন ঐ দৃষ্টান্ত চারিদিকে পরিবার ও প্রতিবেশীর আবালবৃদ্ধ বণিতাকে সুশিক্ষা দিত কিন্তু আজকাল যেমন সমাজবন্ধন শিথিল, বালকগণের প্রতি পিতা-মাতার শাসনও সেইরূপ শিথিল হইয়াছে ৷ আজকালকার ছেলেরা বিশেষতঃ যাহারা বিদ্যালয়ে পাঠ করে পিতামাতা প্রভৃতি অভিভাবকের নিকটে তাহাদিগকে একটি ক্ষুদ্র নবাব বলিলেও অধিক হয় না, আবার আজকাল দশদিক কুদৃষ্টান্তে পরিপূর্ণ সুতরাং হালভঙ্গ নৌকা তরঙ্গের যে দিকে পায়, ভাসিতে থাকে ৷

আলোচনার গোড়ায় আমরা দেখেছি যে কোনো ‘ডিসকোর্স’ গড়ে ওঠে ‘নন-ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিস’ সমূহের সঙ্গে এক ধরনের বিনিময় সম্পর্কের ভিত্তিতে ৷ সূর্যনারায়ণও যে সেই প্রক্রিয়ার বাইরে নন, তা বোঝা যায় সমকালীন সমাজে প্রচলিত ইন্দ্রিয়সেবন-বিষয়ক কিছু সহজাত মতামতের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে ৷ যেমন, এক জায়গায় তিনি বলেছেন, একটি প্রচলিত সামাজিক মত অনুযায়ী: ‘‘অন্যান্য যন্ত্রের ন্যায় জননেন্দ্রিয়ের যথাবিধি ব্যবহার না করিলে উহা বিকৃত বা নষ্ট হইয়া যায়; ইন্দ্রিয়সেবন অন্যান্য নিত্যকার্যের ন্যায় নিতান্ত প্রয়োজনীয়, শরীররক্ষার জন্য বিশেষ হিতকারী এবং ইহার অভাবে অগণিত ব্যাধি আসিয়া আক্রমণ করে’’—এই মতামতকে এক কথায় ‘অ-বৈজ্ঞানিক’ হিসেবে খারিজ করে দিয়ে সূর্যনারায়ণের অভিমত:

আজকালের অধঃপতিত জাতির বাঞ্ছিত বলিয়া এই অবৈজ্ঞানিক কথাই বা কি সাহসে জনসাধারণের নিকট উপস্থিত করিব? মৃত্যুকালে রেগী ঔষধ অবহেলা করিয়া কুপথ্য প্রিয় হয়, তাই বলিয়া কি তাহার জন্য কু-পথ্য ব্যবস্থা করাকে ন্যায়, ধর্ম্ম ও নীতিগত কর্ত্তব্যকার্য্য মনে করিব?… এরূপ বিবেচনার অধিকাংশই নিশ্চয় কাল্পনিক কারণ বহুবিধ উপায়ে অনায়াসেই কামরিপুর প্রভাব খর্ব্ব ও উদয়ের কালবিলম্ব করা যাইতে পারে ৷ ইন্দ্রিয় সংযমন কি যৌবন কি প্রৌঢ় কোন সময়েই অনায়ত্ত নহে…

উনিশ শতকের একেবারে শেষ দিকে প্রকাশিত ক্ষেত্রমোহন ঘোষ প্রণীত ধাতুদৌর্ব্বল্য (১৮৯৭) শীর্ষক সেক্স ম্যানুয়ালটি অনুসরণ করলেও আমরা পূর্ববর্তী যুক্তিক্রমের সম্প্রসারণ দেখতে পাই ৷ ‘বিজ্ঞাপন’ থেকে জানা যায়, আলোচ্য বইটি আসলে ‘আমেরিকাদেশীয় সুবিচক্ষণ চিকিৎসক ও অদ্বিতীয় গ্রন্থকার ড: এলভিন. ই. স্মল রচিত Decline of Manhood নামক একখানি ‘অত্যুৎকৃষ্ট গ্রন্থের অনুকরণে’ লেখা ৷ বলাই বাহুল্য, উনিশ শতকে ইউরোপ-আমেরিকায় প্রচলিত ‘সেক্সুয়ালিটি’র ডিসকোর্স এখানে ছত্রে ছত্রে অনুসৃত হয়েছে ৷ বিশেষত, এই বইয়ের তৃতীয় পরিচ্ছেদটি, যার বিষয়বস্তু ‘হস্তমৈথুন’, সেখানেই পাশ্চাত্য যুক্তিক্রমের অনুসরণ সর্বাধিক: ‘‘১০/১২ বৎসরের বালক-বালিকারা সাধারণত হস্তমৈথুনে রসবোধ করিতে পারে; তৎকালে তাহাদের ভাবী অনিষ্টের সম্ভাবনা স্পষ্টরূপে বুঝাইয়া নিবৃত্ত না করিলে, ঐ বদভ্যাসে এরূপ অভ্যস্ত হয়, আর পরিহারের সম্ভাবনা থাকে না’’ ৷ এই প্রস্তাবনার পর, যে যে প্রণালীতে কিশোর ও বালকদের হস্তমৈথুন প্রবণতার নিবৃত্তির উপায় নির্দেশ করা হয়েছে, সেই প্রণালীসমূহ পুরোপুরি পরিবার ও সামাজিক ‘ক্ষমতা’ কর্তৃক আরোপিত ইউরোপীয় পদ্ধতিতে সৃষ্ট ‘অনুশাসনমূলক ক্ষমতা’-র হুবহু অনুকরণ ৷ এবং এক্ষেত্রেও বেন্থাম-প্রবর্তিত ‘প্যান-অপটিক্যান’ বা ‘সর্বাত্মক নজরদারি’র ইউরোপীয় ছাঁচটি অনুকরণ করা হয়েছে:

উপযুক্ত অবসরে এবং উপযুক্ত অভিভাবকের নজরে নজরে রাখিয়া, বালক-বালিকাদিগকে বহির্ভূমিতে ক্রীড়া করিতে দিলে, বোধ হয়, কোন অনিষ্টের সম্ভাবনা নাই, কারণ, পরস্পরের সংস্রব ত্যাগ করাইয়া নির্জনে বন্ধ করিয়া রাখিলেই যে তাহাদের মনে ধর্মভাবের উদয় হইবে, এ বিশ্বাস অতীব ভ্রান্ত ৷* …বালকেরা এই কু-কার্যে্য রত হইয়াছে, মনে এরূপ সন্দেহ উদয় হইলে, চুপিসারে তাহাদের কার্যের অনুসন্ধান করা আবশ্যক ৷ বালকগণের নির্জ্জনপ্রিয়তা দেখিলেই, এই সন্দেহের মূল সত্য বলিয়া প্রমাণিত হয় ৷ তাহাতে আবার এই কালে যদি তাহারা বিবর্ণ, ক্ষীণ, দুর্বল ও বিমর্ষ হইয়া পড়ে, তাহা হইলে তো সন্দেহের সত্যতা সম্পর্কে আর কোন আপত্তি থাকে না ৷৬৪

*তারকা -চিহ্নিত অংশের সাপেক্ষে একটি পাদটিকা যোগ করে লেখকের অভিমত: ‘অবশ্য, এটা English Idea, অনুবাদকের ইহা অনুমোদনীয় নহে’—এখানে বিদেশি ‘সন্দর্ভে’র ভিতর দেশীয় অভিজ্ঞতার নিজস্বতার অনুপ্রবেশের প্রয়াস স্পষ্ট ৷ তবে এরপর লেখক হস্তমৈথুনের নৈতিকতা সম্বন্ধে যে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, তা পুরোপুরি ইউরোপীয় প্রভাবজাত:

হস্তমৈথুন সমধিক দোষাবহ ও ঘৃণাজনক; যেহেতু ঐ ব্যক্তি সমাজ ছাড়িয়া নির্জনে বাস করে; তাহাতে মনোমধ্যে কুপ্রবৃত্তি ও কুচিন্তা বিস্তৃত হইয়া, তাহাকে চিরবিষাদগর্ত্তে পতিত করে; তজ্জন্য স্বাস্থ্য ও তাহার ভবিষ্যৎ জীবন একেবারে ক্ষয়সাগরে নিমগ্ন হয় ৷

হস্তমৈথুনের সাংস্কৃতিক রচয়িতার মতে, ১৭১২ সালে ইংল্যান্ডে প্রকাশিত জনৈক অজ্ঞাতনামা হাতুড়ে ডাক্তার কর্ত^ৃক রচিত Onania, or, The Henious Sin of Self Pollution বইটি থেকেই আধুনিক ‘হস্তমৈথুন’-সংক্রান্ত ডিসকোর্সের সূত্রপাত ৷ আধুনিকতা এবং আলোকায়ন-জ্ঞান-যুক্তি ব্যক্তির যে স্বাধীন, আত্মনিয়ন্ত্রক সত্তার জন্ম দিয়েছিল, ব্যক্তির একান্ত নিভৃত যৌন আচরণ হিসেবে হস্তমৈথুন ছিল সেই স্বয়ংক্রিয় স্বতশ্চল আত্মসত্তার অন্ধকার উলটো পিঠ ৷ সে কারণেই এই একান্ত নিজস্ব যৌনক্রিয়াটি সমগ্র ‘আধুনিক’ কালপরিসর জুড়ে তীব্র উৎকণ্ঠা, নৈতিক ও সামাজিক অনুশাসনের জন্ম দেয়: প্রায়-অদৃশ্য, সহজে হদিশ পাওয়া যায় না, এমন একটি একান্ত ব্যক্তিগত অভ্যাস কীভাবে এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির কল্পনাশক্তি, আকাঙক্ষা, সুখবোধ এবং আত্ম-র উপর সর্বাত্মক নজরদারির প্রকল্পে পরিণত হয়, হস্তমৈথুনের ডিসকোর্স তার প্রমাণ ৷ পূর্বোক্ত ধাতুদৌর্ব্বল্য বইয়ের উদ্ধৃতিটিও সেই পাশ্চাত্য ডিসকোর্সেরই হুবহু অনুকরণ ৷৬৫

পরবর্তী পর্যায়ে আমরা এমন কয়েকটি টেক্সট নিয়ে আলোচনা করব, যেখানে পাশ্চাত্য যৌনতার ডিসকোর্স আদৌ প্রবেশ করেনি ৷ স্ত্রী লক্ষণ, স্ত্রী-পুরুষ প্রকারভেদ, স্ত্রী-পুরুষ মিলনসংক্রান্ত লক্ষণবিচার ও রীতিনীতি, বিবাহের প্রাকশর্ত, মিলন, সন্তানোৎপাদন-সংক্রান্ত প্রাক-ঔপনিবেশিক জ্ঞানভাণ্ডারই মুখ্য এই টেক্সটগুলিতে ৷ বোঝাই যায়, মুষ্টিমেয় শিক্ষিত এলিটকে বাদ দিয়ে জনসমাজের বৃহত্তর অংশের ভিতর এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানভান্ডারই তুলনামূলকভাবে বেশি পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য ছিল ৷ টেক্সটগুলির আদি উৎস হিসেবে সর্বত্রই কোনো প্রাচীন সংস্কৃত কামশাস্ত্রের উল্লেখ এবং অনুসরণ করা হয়েছে ৷ প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতীয় সংস্কৃতিতে কামসূত্র, কোকশাস্ত্র, অনঙ্গরঙ্গ—প্রভৃতি যে সব টেক্সট-এর প্রচলন ছিল, উনিশ শতকীয় জনসমাজও বহন করে চলেছিল তার উত্তরাধিকার ৷ কেবল লক্ষণীয় পার্থক্য হল, এই সব বইয়ের টেক্সটে প্রচলিত কথাবস্তুর ভিতর বারবার ঢুকে পড়েছে সমকালীন অসংখ্য উপাদান ৷ বইগুলিতে যেসব কাঠখোদাই ছবি ব্যবহৃত হয়েছে নায়ক-নায়িকার লক্ষণ বোঝাতে, সেগুলি সমকালীন নব্য যুবক-যুবতীর বাজারচলতি আর্কেটাইপ অনুসরণেই সৃষ্ট ৷ এমনকী কোথাও কোথাও নব্য নারীর যে ভিক্টোরীয় রূপময়ী অলঙ্করণ দেখতে পাওয়া যেত সমকালীন ইংরেজি বইয়ের ইলাস্ট্রেশন-এ, এখানেও ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলির অনুকরণ ৷ সব মিলিয়ে এই উনিশ শতকীয় নব্য ‘কামশাস্ত্র’গুলি বহু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ ৷

এরকমই একটি বই রাখালদাস কবিরত্ন রচিত দাম্পত্যবিজ্ঞান (সন ১২৯৪, ইং ১৮৮৭) ৷৬৬ এই বইয়ের সর্বাপেক্ষা লক্ষণীয় দিকটি হল, বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটি চিরাচরিত দেশীয় সামাজিক রীতিনীতিরই নতুন করে সুসজ্জিত উপস্থসাপনা হলেও, দেশীয় জ্ঞানকাঠামোকেই এখানে ‘বিজ্ঞান’ শিরোনামে ভূষিত করা হচ্ছে ৷ বইটির উপশিরোনাম সন্তানোৎপাদিকাবৃত্তি সম্বন্ধে লিখিত ৷ আগেই বলেছি উনিশ শতকীয় জাতীয়তাবাদী অভীপ্সার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ক্ষেত্র’ ছিল: দাম্পত্য, সন্তান উৎপাদন, সুসন্তানের জন্মদান ও তাদের পূর্ণাঙ্গ চারিত্রিক বিকাশ ৷ দাম্পত্যবিজ্ঞান বইটিকেও আমরা সেই ‘জাতীয়তাবাদী’ ‘আধুনিক’ আকাঙক্ষার অংশভুক্ত হিসেবে পড়তে পারি, যদিও এর যুক্তিকাঠামো দেশীয় জনসমাজের সর্বাপেক্ষা ঐতিহ্যবাহী লক্ষণগুলিকেই আধুনিক সময়ের উপযোগী করে দেখাতে চেয়েছে ৷ বলাই বাহুল্য, এই দৃষ্টিকোণ দেশজ সমাজের ‘লিঙ্গাত্মক’ দৃষ্টিকোণের ফসল ৷ যেমন, এই বইয়ের প্রথম অংশটির শিরোনাম: ‘অথঃ স্ত্রীলক্ষণং’ ৷ এখানে রক্ষণশীল পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নারীশরীরের ভেদ অনুযায়ী রমণীর চারিত্রিক লক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে ৷ যেমন:

 ক. গম্ভীরা দক্ষিণাবর্ত্তা নাভি স্যাৎ সুখসম্বদে

 বামাবর্ত্ত সমুত্তানা ব্যক্তগ্রন্থীন শোভনা ৷ ৷

অনুবাদ: যে রমণীর নাভি গম্ভীর ও দক্ষিণাবর্ত্ত সে সম্পত্তিশালী হইয়া সুখভোগ করে ৷ যাহার নাভি বামাবর্ত্ত, উন্নত কি গ্রন্থী স্পষ্ট দেখা যায় তিনি চিরদিন অসুখে কালযাপন করেন ৷

 খ. ঘনৌ বৃত্তৌ পৃথুদূঢ়ৌ পীনৌ শস্তৌ পয়োধরৌ ৷

 স্থ²লাগ্রৌ বিরলৌ সূক্ষ্মৌ বামেরূনাং ন শর্ম্মদৌ ৷ ৷

অনুবাদ: স্ত্রী জাতির স্তনযুগল যদি বর্তুলাকার, উচ্চ, কঠিন ও স্থ²ল হয় তাহা হইলে সেই স্ত্রী প্রশংসনীয়া, স্তনযুগল বিরল ও সূক্ষ্মাগ্র হইলে অমঙ্গলের কারণ হয় ৷

পরবর্তী অংশ ‘অথো প্রথম রজোদর্শনে বারাদিভেদে শুভাশুভবিবেচনা’ ৷ সপ্তাহের কোন দিন রজঃস্বলা হলে নারীর চরিত্র কী প্রকার হয়, তা বোঝাতে গিয়ে একটি শ্লোকে (আদিত্যে বিধবা নারী সোমে চির পতিব্রতা…) বলা হয়েছে: ‘‘রবিবারে প্রথম রজঃস্বলা হইলে স্ত্রী বিধবা হয় এবং সোমবারে পতিব্রতা, মঙ্গলবারে বেশ্যা, বুধবারে সৌভাগ্যশালিনী, বৃহস্পতিবারে পতি শ্রীমান, শুক্রবারে পুত্রবতী এবং শনিবারে রজঃস্বলা হইলে বন্ধ্যা অর্থাৎ সন্তান জন্মে না ৷’’ বিবাহের উদ্দেশ্য যেহেতু সন্তান উৎপাদন, তাই সুসন্তান উৎপাদনের বিস্তৃত উপায় আলোচিত হয়েছে এখানে:

যুগ্মরাত্রবৃতুস্নাতা কৃতমাল্যবিভূষিতা ৷

ভূক্তা কান্দর্পিকং দ্রব্যং পুত্রকামা পতিং বহজেৎ ৷ ৷

অনুবাদ: ঋতুস্নান করিয়া পুষ্প ও মাল্য বেশভূষা করতঃ কান্দর্পিক দ্রব্য ভোজন করিবে ৷ পুত্রোৎপাদনের ইচ্ছুকা কামিনী যুগ্ম রাত্রিতে অর্থাৎ চতুর্থ, ষষ্ঠ, অষ্টম, দশম, চতুর্দ্দশ ও ষোড়শ রাত্রিতে পতিসহবাস করিবে ৷ কোন গ্রন্থকার বলেন, দীর্ঘায়ুযুক্ত সৎপুত্রর কামনা করিয়া যদি কোন নারী পতিসেবানুরক্ত হয়, তবে তাহার চতুর্থ, ষষ্ঠ ও অষ্টম রাত্রিতে পতিসঙ্গ উপযুক্ত নহে, কারণ ঐ সকল দিনে গর্ভোৎপত্তি হইলে ক্ষীণজীবী ও হীনবল সন্তান হয় ৷

উনিশ শতকীয় জনপ্রিয় কামশাস্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সচিত্র লজ্জতন্নেছা নামক বইটি ৷৬৭সম্ভবত এটি কোনো মুসলমান লেখকের রচনা, কারণ বইটির উপশিরোনাম মহর্ব্বতে দুনিয়া (মহব্বত-ই দুনিয়া) ৷ লেখকের নাম নেই ৷ তবে লেখা রয়েছে ‘কোকা পণ্ডিত কর্ত্তক বিরচিত’ ৷ অর্থাৎ এটি প্রাচীন কোকশাস্ত্রের সাম্প্রতিক অনুবাদ ৷ অথচ মধ্যযুগে কল্যাণমল্লের অনঙ্গরঙ্গ বইটির ফার্সি অনুবাদ হয়েছিল—লজ্জৎ অল নিসা বা ‘রমনীগণের আনন্দ’—এই নামে ৷ এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কোকশাস্ত্রের পয়ারে রচিত উনিশ শতকীয় বাংলা সংস্করণে ওই ফার্সি নামটিই ব্যবহৃত ৷ অর্থাৎ এগুলি বহুযুগব্যাপী দেশীয় সমাজে প্রচলিত মোটামুটি একই ধরনের ‘কামশাস্ত্র’ গ্রন্থেরই রকমফের ৷ নিম্মবর্গীয় জনসমাজে এগুলির প্রচলন ছিল এবং এই পাঠকগোষ্ঠীর কাছে কল্যাণমল্ল বা কোকা পণ্ডিত—রচয়িতার এই পৃথক পরিচয় খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না ৷ আলোচ্য সংস্করণটিতে প্রকাশকাল না থাকলেও ছাপার হরফ, কাঠখোদাই ছবি, ইত্যাদির সাপেক্ষে অনুমান করা যায় এটি অন্ত্য-উনিশ শতকে প্রকাশিত হয়েছে ৷ লক্ষণীয়,এই বইতেও রমণীভেদ, পুরুষভেদ, লক্ষণবিচার, রজোদর্শনের তিথি, মিলনের উপযুক্ত দিন—প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা থাকলেও বেশ কিছু কাহিনির অন্তর্ভুক্তি ঘটানো হয়েছে, যেগুলি জনসমাজের নিজস্ব সৃষ্টি ৷ অর্থাৎ দেশীয় লোকসমাজের যে অংশটি পাশ্চাত্য যৌনতার ডিসকোর্সকে আদৌ গ্রহণ করেনি, সেই অংশের কাছে আদৃত ছিল এই বইটি ৷ বইয়ের সূচনায় বলা হয়েছে:

মহর্ব্বতে দুনিয়া এই পুস্তকের নাম ৷

স্ত্রী পুরুষের ভেদাভেদ ইহাতে তামাম ৷ ৷

দেখিনু অনেক লোক এই সংসারেতে ৷

না পারে করিতে বশ আপন আওরতে ৷ ৷

স্ত্রীলোকের বশীভূত সর্ব্বদাই রয় ৷

কেহ স্বামী ঘৃণা করি পলাইয়া যায় ৷ ৷

কেমনে রহিবে বশ তাহার রমণী ৷

কোকা পণ্ডিতের বাক্য আশ্চর্য্য কাহিনী ৷ ৷

‘কাম’ এখানে পাশ্চাত্য উপযোগবাদী যুক্তির দ্বারা ব্যাখ্যাত নয় ৷ লেখক শুরুতেই বলেছেন সমগ্র পুরুষ এবং নারীজাতিকে চারটি পৃথক পৃথক মৌলিক বিভাজনে বিভক্ত করা যায় এবং এই পৃথক নির্দিষ্ট লক্ষণগুলির সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই নারীপুরুষের সম্বন্ধনির্ণয় করা উচিত:

নারী পুরুষের জাতে যদি নাহি মেলে ৷

মহব্বত তাহাদের নাহি হয় দেলে ৷ ৷

সংসারেতে আছে দেখ চারিজাতি নর ৷

শশ, মৃগ, বৃষ, অশ্ব খ্যাত চরাচর ৷ ৷

আর চারি জাতি দেখ আছয়ে রমণী ৷

পদ্মিনী, চিত্রানী আর শঙ্খিনী, হস্তিনী ৷ ৷

এই চারপ্রকার নারীপুরুষের লক্ষণভেদ এবং তাদের দাম্পত্যসম্পর্কের নানাবিধ ব্যাখ্যা দেবার আগে লেখক কোকাপণ্ডিত সম্পর্কিত একটি লোকপ্রচলিত গল্পের অবতারণা করেছেন ৷ ভোজরাজার আদেশ অনুসারে কোকাপণ্ডিত যান সুরতনগরে (‘সুরত’ শব্দটি লক্ষণীয়) ৷ পাঁচ কোটি টাকা রাজা তাকে দেন একশত শ্রেষ্ঠ, সর্বদোষমুক্ত সুন্দরী কুমারী কন্যা ‘খরিদ’ করে আনবার জন্য ৷ পথিমধ্যে মাঝসমুদ্রে জাহাজ চলাকালীন সেইসকল রমণী পুরুষশ্রেষ্ঠ কোকাপণ্ডিতের সঙ্গে রতিমিলনে লিপ্ত হয় ৷ ভোজ রাজা যখন জানতে পারেন: ‘‘একে একে ভ্রষ্টা দেখ সকল রমণী/নষ্ট করি আনিয়াছে কোকা গুণমণি’’, তখন ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি অবিলম্বে কোকাপণ্ডিতকে কারারুদ্ধ করেন ৷ ইতিমধ্যে ভোজরাজার সভায় জনৈক ‘পাতরা যোগিনী’ উত্তেজক নৃত্যগীতে রাজা এবং সভাসদদের মোহিত করে ৷ যোগিনীর যৌবনছটায় রাজা প্রায় মুগ্ধ হয়ে যান ৷ যোগিনী তখন রাজাকে পরামর্শ দেয় রমণীবশীকরণের উপযোগী ‘কামশাস্ত্র’ শিক্ষা করার জন্য:

 স্ত্রীলোকের নৃত্য দেখি কেন রাজা হইলে দুঃখী

 মুখে তব বাক্য নাহি সরে ৷

 কামশাস্ত্র শিক্ষা কর তবে মোর হাত ধর

 কহিলাম তোমার গোচরে ৷ ৷

 কামশাস্ত্র জানে যেই আমারে পাইবে সেই

 লভিবেক আপন বলেতে ৷

 প্রথমে আবদ্ধ হয়ে রঙ্গে রসে মিশাইয়ে

 রব আমি তাহার বশেতে ৷ ৷

ভোজরাজা এরপর কোকাপণ্ডিতকে মুক্ত করেন এবং তার কাছ থেকে কামশাস্ত্র শিক্ষা করেন ৷ কোকা প্রথমেই ব্যক্ত করে ‘পুরুষভেদ’ ও ‘স্ত্রীভেদ’ ৷ চারপ্রকার পুরুষের বিবরণ দেয় সে ৷ প্রথমে ‘শশকজাতির’ পুরুষ:

নাতি খর্ব্ব নাতি হ্রস্ব মধ্যবিত্ত কায় ৷

সুলক্ষণ দেহকান্তি কন্দর্পের প্রায় ৷ ৷

কিছুমাত্র পাপ নাহি তাহার অন্তরে ৷

ভক্তিমান সদা সেই ভক্তিযোগ্য নরে ৷ ৷

বইতে ‘শশকজাতি’ পুরুষের যে কাঠখোদাই ছবিটি দেওয়া হয়েছে, সেটি সমকালীন হিন্দু মধ্যবিত্ত বাঙালি ভদ্রলোকের ৷ পাশাপাশি যে ‘মৃগজাতি’-র পুরুষের ছবিটি রয়েছে, সেটি একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমান ভদ্রলোকের ৷ এ থেকে জনসমাজে এই জাতীয় ন্যারেটিভের সর্বধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি বোঝা যায় ৷ ‘মৃগজাতি’র লক্ষণ:

বড় বড় চক্ষু আর বেশ মনোহর ৷

বিদ্যায় পণ্ডিত হয় দেখিতে সুন্দর ৷ ৷

কঠোর হৃদয় কিন্তু কপট অন্তর ৷

এরপর ‘বৃষজাতি’ পুরুষের বর্ণনা:

চরণ খরব হয় সুদীর্ঘ রসনা ৷ ৷

নারী দরশন তার সতত বাসনা ৷ ৷…

কথা সুমধুর খুব জানহে রসিক ৷

আমোদে প্রমোদে আর রহস্য অধিক ৷ ৷…

মদনার্ত্ত চিত্ত তার সদা সর্বক্ষণ ৷

নিদ্রা নাহি যায় বহু প্রফুল্ল নয়ন ৷ ৷

পরিশেষে ‘অশ্বজাতি’ পুরুষের লক্ষণসমূহ:

স্থ²ল দেহ কৃষ্ণবর্ণ যায় শীঘ্রগতি ৷

সদা সর্বক্ষণ সেই মদনার্ত্ত মতি ৷ ৷

এসব বিষয়ে হয় বড়ই অবোধ ৷

নাহি মানে জাতিভেদ সদাই অমোদ ৷ ৷

পরনিন্দা করি সদা মন তুষ্ট করে ৷

রমণী দেখিলে থাকে প্রফুল্ল অন্তরে ৷ ৷

মিথ্যা কথা পাপকার্য করয়ে সর্ব্বদা ৷

যাকে যাহা কথা দেয় সকল অন্যথা ৷ ৷

এই চার প্রকার ‘পুরুষ’ জাতির পাশাপাশি চারপ্রকার পৃথক লক্ষণবিশিষ্ট ‘রমণীভেদ’ও ব্যক্তি করেন কোকাপন্ডিত! তার প্রথম ভেদটি ‘পদ্মিনী’ রমণী:

 গায়েতে পদ্মের বাস যদি লাগে সুবাতাস

 মূর্চ্ছা যায় রসিক জনায় ৷ ৷

 বুকেতে কমলদ্বয় আহা কি বাহার তায়

 কোথা লাগে ডালিমের ফল ৷

 মিলন পুরুষ দেখি মনেতে হইয়া দুঃখী

 না পাইয়া হয়তো আকুল ৷ ৷

 স্বভাব যে হয় তার সদা মনে তোলপাড়

 পাই যদি গোপন উদ্যান

 যাইব যে সেইখানে মজে রব রাত্রি দিনে

 নির্ভয় হইয়া মন প্রাণ ৷ ৷

দ্বিতীয় ভেদ ‘চিত্রানী’ রমণী:

 দেহ অতি স্নিগ্ধকর বহে সদা কামেশ্বর

 মগ্ন সেই প্রেমবাণে রয় ৷ ৷

 অধিক রসিক ধনি নৃত্য গীতে আমোদিনী

 কথা বার্ত্তা মিষ্ট তার অতি ৷ ৷

 চিত্রানী যে গুণবান জানে পন্ডিতের মান

 সমাদর আদর বা কত ৷

 থাকবে স্বামীর বশ সংসারে আপন যশ

 স্বামীর আজ্ঞায় অবিরত ৷ ৷

এরপর কোকা বর্ণনা দিচ্ছেন ‘শঙ্খিনী’ রমণীর:

 ছাড়িয়ে সকল ধ্যান মজাইয়ে মন প্রাণ

 ঘুরে ফিরে প্রেমের আশায় ৷

 বুকের কমল দুটি যেন ছোট ছোট ফুটী

 রসেতে করিছে টলমল ৷

 কিন্তু নারী যে শঙ্খিনী বিদ্যায় সে পূর্ণ ধনী

 আর হয় অতিশয় ধূর্ত্ত ৷

 রঙ্গ রস আছে যত সমস্ত সে অবগত

 আবোগেতে সর্ব্বদা উন্মত্ত ৷ ৷

 আর এক আছে রোগ দিবানিশি উপভোগ

 মন আশা পূরণ কারণ ৷

অবশেষে রয়েছে ‘হস্তিনী’ রমণীর লক্ষণের অনবদ্য বর্ণনা:

ক্ষার গন্ধ বহে সদা তাহার শরীরে ৷

অল্পমাত্র কেশ তার মস্তিষ্ক উপরে ৷ ৷

মন্দ মন্দ হাস্য শোভে তাহার বদন ৷

প্রকান্ড শরীর তার অতি বিভীষণ ৷ ৷

কঠিন উন্নত তার দুই পয়োধর ৷

প্রবীণা সুন্দরী হয় সুগভীর স্বর ৷ ৷

মদন বশেতে লজ্জা কভু নাহি করে ৷

নিরন্তর রহে কাম বিহ্বল অন্তরে ৷ ৷

পুরুষ স্পর্শিলে হয় সুখের উদয় ৷

পুলকিত হয় অঙ্গ আর সে হৃদয় ৷ ৷

উন্মাদের মত রহে দিবস রজনী ৷

কামভাবে রবে সদা শুন নরমণি ৷ ৷

হস্তিনী রমণী ত্যজি নিজ পরিজনে ৷

অন্যসহ প্রেম করে আনন্দিত মনে ৷ ৷

‘চারিজাতি পুরুষের উপযুক্ত কন্যা নির্ণয়’ অংশে ‘শশকজাতি’ পুরুষের সঙ্গে ‘পদ্মিনী’ রমণী, ‘মৃগজাতি’ পুরুষের সঙ্গে ‘চিত্রানী’ রমণী, ‘বৃষজাতি’ পুরুষের সঙ্গে ‘শঙ্খিনী’ নারী এবং ‘অশ্ব’ জাতির পুরুষের সঙ্গে ‘হস্তিনী’ রমণীর মিলনকেই যথোপযুক্ত হিসেবে ধরা হয়েছে ৷ এর অন্যথা হলে যে কী ভয়ানক পরিণাম ঘটতে পারে তার বিবরণও দিয়েছেন লেখক:

বৃষ হতে পদ্মিনীতে যে পুত্র হয় ৷

দুষ্ট পুত্র হয় সেই নাহিক সংশয় ৷ ৷

অথবা তনয়া যদি জন্মগ্রহণ করে ৷

দ্বিচারিনী হয় সেই কহিনু তোমারে ৷ ৷

বিবাহযোগ্য কন্যার নির্বাচনের সময় মোট আট প্রকার স্ত্রীচিহ্নের লক্ষণবিচার বিবৃত হয়েছে এরপর ৷ নারীর ঊরুস্থল, গমনভঙ্গি, দক্ষিণাবর্ত নাভি, ভাষাভঙ্গিমা, দন্ত, জিহ্বা, কেশবিন্যাস, গোড়ালি, পদদ্বয়, বক্ষঃস্থল—সবই বিভিন্ন প্রকার চিহ্নের আওতায় পড়ে ৷ আকৃতি, চেহারা, পতি ও শ্বশুরবাড়ির প্রতি আচরণের নিরিখে রমণীদের ‘উত্তমা’, ‘মধ্যমা’ এবং ‘অধমা’—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে ৷ ‘রমণীদের ঋতু বিবরণ ও চাঁদের হিসাব’ অংশে অনেকাংশেই কল্যাণমল্লের অনঙ্গরঙ্গ-এর অনুকরণ করা হয়েছে ৷ কয়েকটি অনুশাসন:

চতুর্থ তিথিতে যদি রজঃস্বলা হয় ৷

বন্ধ্যা হবে সেই নারী নাহিক সংশয় ৷ ৷

সপ্তমীতে যেই নারী, আদ্যরিতু ধরে ৷

কাকবন্ধ্যা হয় সেই শাস্ত্রের বিচারে ৷ ৷

অষ্টমী তিথিতে যদি রজঃস্বলা হয় ৷

নাগিনী হইবে কন্যা শুনহ নিশ্চয় ৷ ৷

দশমীতে আদ্যারিতু করিলে ধারণ ৷

রাক্ষসিসমান হয় সে কন্যা রতন ৷ ৷

এই বইতে অন্যান্য বাংলা কামশাস্ত্রের মতোই ‘রিতুকালীন নিয়ম ও দিবসগণনা ভেদে নারীগমন’-এর বিবিধ অনুশাসন লিপিবদ্ধ হয়েছে: ‘‘প্রথম দিনেতে নারীর কাছে না যাইবে ৷/সংসর্গ করিলে আয়ু বিনাশ হইবে ৷ ৷/দ্বিতীয় দিবসে হয় মহা পাপীয়সী/স্পর্শ না করিলে কভু সেই ত রূপসী ৷ ৷/তৃতীয় দিবসে যদি করয়ে গমন ৷/বেশ্যা হয় সেই নারী না হয় খন্ডন ৷’’ এভাবেই ‘নারীগমনের নিষিদ্ধ দিন’, ‘রাত্রিপ্রহরভেদে নারীগমনের ফল’, ‘রজঃস্বলার চতুর্থ দিবস হইতে চতুর্দশ দিবস যাবৎ নারীগমনের ফল’ বর্ণিত হয়েছে এখানে ৷ এরপর পদ্মিনী, চিত্রানী, শঙ্খিনী এবং হস্তিনী নারীর কাঠখোদাই ছবি সহ ‘শয্যা বর্ণনা’’ করা হয়েছে ৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বিলাসী শেষ দুই প্রকৃতির রমণী ৷ যেমন, ‘শঙ্খিনী’ রমনী—‘‘অতিশয় ভালবাসে সফেদ বিছানা ৷/মখমল বালিশ তাহে কি দিব তুলনা ৷ ৷…কেবল আপনি শোব এই ইচ্ছা হয় ৷/অন্যকে না শুতে দিব এই বিছানায় ৷ ৷’’ এসবের পাশাপাশি হস্তিনী রমণী: ‘‘উত্তম বিছানা তার নাহি ভাল লাগে ৷/মাটীতে শয়ন সদা করে দিবা ভাগে ৷ ৷/মৎস্য মাংস আহারাদি অতি ভালবাসে ৷/সর্বদাই রহে সেই নিদ্রার আবেশে ৷ ৷’’ সচিত্র লজ্জতন্নেছা-র শেষাংশে মোট দশ প্রকার বশীকরণ, কামরূপ কামাখ্যার মন্ত্র, ফুল পড়া বা পান পড়ার মন্ত্র, মোহিনীমন্ত্র, পুরুষের বীর্যহানি বা ধাতুদৌর্ব্বল্যের ওষুধের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা থেকে বাংলার নিম্নবর্গীয় জনসমাজে এধরনের বইয়ের ব্যাপক গ্রহণয্যেগাতার বিষয়টি আরও পরিস্ফুট হয় ৷

এই জাতীয় আর একটি বই শ্রীকালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন রচিত সচিত্র শিবোক্ত রতিশাস্ত্র৬৮ ৷ এটির বিষয়বস্তু হল ‘কৈলাসে শিবের নিকট পার্বতীর রতিশাস্ত্র সম্পর্কে প্রশ্ন এবং শিব কর্তৃক তদুত্তরে সম্ভোগোৎপত্তি কথন ৷’ পশ্চাত্যপ্রভাববর্জিত সম্পূর্ণ দেশীয় যৌনতার ডিসকোর্সের উনিশ শতকীয় মান্য চেহারাটি এখানেও লভ্য ৷ এর শুরুতেই ‘রতি ও কামের উৎপত্তি এবং জগতে নর-নারী সৃজন’ বর্ণিত, অর্থাৎ আলোকায়ন-উদ্ভূত যৌনতার বৈজ্ঞানিক ডিসকোর্স থেকে এর যুক্তিকাঠামো সম্পূর্ণই আলাদা ৷ পূর্বোক্ত গ্রন্থের মতই এখানে বর্ণনা করা হয়েছে ‘চতুর্ব্বিধ নারী’র লক্ষণ ৷ এক্ষত্রে পদ্মিনী, চিত্রানী, শঙ্খিনী ও হস্তিনীর বর্ণনায় বিভিন্ন আদিশাস্ত্র থেকে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা সংযুক্ত করা হয়েছে ৷ এদের মধ্যে ‘হস্তিনী’ রমণীর বর্ণনা চিত্তাকর্ষক:

গজেন্দ্রগমনা ধনী হস্তিনী রমণী ৷

ঠমকে ঠমকে চলে কাঁপয়ে মেদিনী ৷ ৷

বিশাল শরীর তার বিশাল নয়ন ৷

বিশাল নিতস্বদেশ বিশাল যে স্তন ৷ ৷

রতিরসে রসবতী রহে নিরন্তর ৷

কটাক্ষ সদত হানে পরের উপর ৷ ৷

নিজ পতি মনে তার কভু নাহি ধরে ৷

প্রত্যহ নতুন পতি অভিলাষ করে ৷ ৷

বিনয়ে পরের মন তিলেকে ভুলায় ৷

একদিন পরে আর ফিরে নাহি চায় ৷ ৷

বিহারে মনের সাধ মিটে না তাহার ৷

হরিষে সদত কত করে কদাচার ৷ ৷

ছারে খারে কত নরে দেয় কলঙ্কিনী ৷

মায়ায় মোহিত করে সেই মায়াবিনী ৷ ৷

হেন নারী প্রতি কভু দিও নাহি মন ৷

কবি কহে তার মায়া বুঝে কোন জন ৷ ৷

এখানেও ‘স্ত্রীজাতির ঋতুবিবরণ’, ‘আদ্যঋতুর মাসফল’, ‘ঋতুমতী নারীর কর্তব্য’ বর্ণিত হয়েছে ৷ ‘নারীগমন নিরূপণ’ অংশটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ পাশ্চাত্য খ্রিস্টীয় যৌনতার ডিসকোর্সের মতন কোনো ধরনের অবদমনের প্রয়োজনীয়তাই স্বীকার করা হয়নি এখানে:

ঋতুকালে স্বীয় নারীতে উপগত হইবে ৷ সকাল হইলে ঋতু ব্যতীত অন্যকালেও রমণীগমন করা যায় ৷ যদি অন্তর্বর্তী নারী কামাতুরা হয়, তাহা হইলে প্রসবের পূর্ব্বকাল যাবৎ স্বামীসহবাস করিতে পারে ৷ এরূপ করিলে গর্ভহানির কোন সম্ভাবনা নাই ৷ অন্তর্বর্তী নারী অত্যন্ত কামাতুরা হইলে তৎসহ সহবাসে দোষ জন্মে না ৷

এরপর ‘গর্ভাধান অর্থাৎ দিনবিশেষে ও কারণবিশেষে নারীগমনের ফল ও তজ্জাত সন্তানের অবস্থা’, ‘ঋতুস্নাতা নারীগমন না করিলে তাহার ফল’, ‘ত্রিবিধ কুমারী লক্ষণ’, ‘নারীজীতির শুভাশুভ লক্ষণ’, ‘শুভাশুভ পুরুষলক্ষণ’ বর্ণিত হয়েছে ৷ তবে এই বইয়ের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় দিক ‘চারিজাতির রমণীর তুষ্টিবিধান’ অংশটি ৷ এদের মধ্যে চিত্রানী, শঙ্খিনী এবং হস্তিনী রমণীকে বশীকরণের উপায়সমূহ উল্লেখযোগ্য:

 ক. চিত্রানী: চিত্রানী নারীকে স্বীয় বামভাগে উপবেশন করাইয়া নানাবিধ প্রেমালাপ দ্বারা সাদরে তাহার তুষ্টিবিধান করিবে ৷ বুদ্ধিমান ব্যক্তি উপন্যাসগর্ভ বাক্য দ্বারা এবং ইতিহাস বর্ণন দ্বারা আদর সহকারে চিত্রানীর তুষ্টি বিধান করিবে ৷

 খ. শঙ্খিনী: সর্ব্বদা দিব্যবস্ত্র প্রদান, নানাবিধ অলঙ্কার প্রদান এবং সর্ব্বদা প্রেমালাপ—এই সকল দ্বারাই শঙ্খিনীর প্রীতিসাধন হইয়া থাকে, নচেৎ মিষ্ট বাক্যে কদাচ তাহার সন্তোষলাভের উপায় নাই ৷

 গ. হস্তিনী: কি রত্ন, কি মিষ্টবাক্য, কি অলঙ্কার, কি প্রণয়বাচন কিছুতেই হস্তিনীর তুষ্টিসাধন হয় না ৷ সর্ব্বদা কদাচার ও কুক্রিয়ায় আসক্ত থাকিতে পারিলেই হস্তিনী নারীর চিত্তাবিনোদন হইয়া থাকে ৷ …যদি সে স্বীয় পতিকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য পুরুষের সহিত বিহার করিতে পারে তাহা হইলে তাহার পরম আনন্দ সঞ্চার হয় ৷

উনিশ শতকীয় ইংরজিশিক্ষিত এলিট মননে দেশজ সমাজের যৌনরুচি ও যৌন অভ্যাস এক চূড়ান্ত অশ্লীলতার পরাকাষ্ঠা হিসেবে বিবেচিত হত ৷ শিক্ষিত ভদ্রলোক-পরিবারে যৌনতা এবং শরীর-সংক্রান্ত যে কোনো উচ্চারণই এক আরোপিত নৈঃশব্দ্যের আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হয় ৷ উনিশ শতকের সমাজসংস্কারমূলক এলিট লেখালিখিতে এই ‘ডিসকার্সিভ’ আলোচনার পরিসর সৃষ্টি করে অবদমিত নৈঃশব্দ্যের বাতাবরণ তৈরির প্রক্রিয়াটি আমাদের বর্তমান বিশ্লেষণের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৷ কিন্তু পাশ্চাত্য-প্রভাবিত যৌনতার ডিসকোর্সের পাশাপাশি দেশজ সমাজের সম্পূর্ণ নিজস্ব যুক্তিকাঠামো ও জ্ঞানভান্ডারও যে যৌনতার সাপেক্ষে বজায় ছিল, উনিশ শতকের একেবারে শেষ পর্বে প্রকাশিত সচিত্র শিবোক্ত রতিশাস্ত্র বইটিই তার প্রমাণ ৷ এখানে যৌনতাকে খ্রিস্টীয় অর্থে ‘পাপ’, শরীরকে ‘পাপের আধার’ হিসেবে না দেখে জীবনের প্রয়োজনীয় উপভোগ এবং ‘আত্ম-র যত্ন’ সূচক উপাদান হিসেবেই ভাবা হয়েছে—এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে জরুরি ৷

উল্লেখপঞ্জি

 ১. এই তিনটি পর্ববিভাজনকে বলা যেতে পারে: ‘archaelogy’, ‘genealogy’ এবং ‘problematization’; দ্র. Foucault’s Mapping of History, Thomas flynn; The Cambridge Companion to Foucault; edited by Garry Gutting, New York, 2005; p-29-p. 48.

 ২. দেরিদার ভাষায়: ‘when language invaded the universal problematic…everything becomes discourse’. দ্র. Writing and Difference; Jacques Derrida, London, 1978. p. 280.

 ৩. প্রথমটিকে বলা হয়েছে constitutive view, দ্বিতীয়টি strategic view, বিস্তৃত আলোচনার জন্য দ্র: Discourse, David Howarth, New Delhi, 2005, p.48-p.66

 ৪. ফুকোর জবানিতে: “The ensemble of discursive and non-discursive practives that makes something enter into play of the true and the false and consititutes it as an object of thought (whether in the form of moral reflection, scientific knowledge or political analysis”; দ্র. Foucault’s interview wth Francois Ewiald “Le Souci de la verite,” Magazine Literaire 207 (May 1984) p. 48; উদ্ধৃত, পূর্বোক্ত প্রবন্ধ; Thomas Flynn, p. 38.

৫. ‘episteme’ বা যুগপর্যায়’ বলতে ফুকো বোঝান ‘The totality of relations that can be discovered, for a given period…at the level of discursive regularities’. দ্র. The Archaeology of knowledge, Michel Foucault, London, 1972, p. 191.

 ৬. ফুকোর ‘প্রত্নতাত্বিক’ (archaeological) ভাবনায় statement একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে ৷ একে বলা যায় ডিসকোর্সের একক ৷ ফুকো ‘স্টেটমেন্ট’কে বিবৃতি (proposition), ‘উচ্চারণ’ বা ‘বাক্য’ (utterence or sentence) অথবা ‘উক্তি’ (speech acts)  অপেক্ষা পৃথক হিসেবে দেখেছেন ৷ তাঁর মতে, ‘স্টেটমেন্ট’ এমন এক ভাষাতাত্বিক প্রদর্শন, যার মাধ্যমে একটি স্বতঃস্ফূর্ত ‘উক্তি’ বা ‘বাচন’ সত্য উৎপাদন ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতা এবং পরিশীলিত অবস্থান থেকে উচ্চারিত হবার জন্য ৷ ‘হস্তমৈথুন শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর’—এই উক্তিটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সমেত হাজির হলে ‘আধুনিক’ চিকিৎসাশাস্ত্রীয় ডিসকোর্সের অন্যতম একক হিসেবে ‘স্টেটমেন্টে’র মর্যাদা লাভ করবে ৷

 ৭. ‘rules of formation’ গুলি গড়ে ওঠা সম্পর্কে ফুকোর উক্তি: ‘I… explore scientific disccourse… from the point of view of the rules that come into play in the very existence of such discourse’, The Order of Things: An Archaeology of the Human Sciences; Michel foucault, London, 1970, p. xiv.

 ৮. ‘formation of objects’, ‘enunciative modalities’, ‘production of concepts’, এবং ‘formation of strategies’—এই চারটি উপাদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্র: The Archaeology of knowledge, Michel Foucault, London, 1970.

 ৯. ফুকোর ভাষায়: “these are the systems according to which the different ‘kind of madness’ are divided, contrasted, related, classified, derived from one another as objects of psychiatric discouse”; দ্র: পূর্বোক্ত p. 46.

 ১০. দ্র: Politics and the Study of the discourse; Michel Foucault, Foucault Effect: Studies in Governmentality, edited by G. Burchell, C. Gordon and P.H. Miller, Chicago, 1991, p. 58.

 ১১. ‘a form of history which can account for the constitution of knowledge, discourse, domainism of objects’… দ্র: Power / knowledge: Selected interviews and Other Writings 1972-77, Michel Foucault, New York, 1980, 1980, p. 117.

 ১২. ‘an institutional incitement to speak about it, and to do so more and more; a determination on the part of the agencies of power to hear it spoken about, and to cause it to speak through explicit articulation and endlessly accumulated details…’ দ্র: The History of Sexuality: Vol-I; Introduction: Michel Foucault, Penguin, 1979, p. 18.

 ১৩. বুর্জোয়া সমাজের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যকেই ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফুকো বলেন: ‘Sex was a means of access both of the life of the body and the life of the species. It was employed as a standard for the disciplines and as a basis for regulations. This is why in the nineteenth century sexuality was sought out in the smallest details of individual existences; it was tracked down in behaviour, pursued in dreams; it was suspected of underlying the leastfollies, it was traced back into the earliest years of childhood; it became the stamp of individuality… it was put forward as the index of a society’s strength, revealing of both its political energy and its biological vigor’. দ্র: পূর্বোক্ত, p. 145-p. 146.

 ১৪. পূর্ব্বেক্ত; Politics and the Study of the Discourse; Michel Foucault; The Foucault Effect. p. 93.

 ১৫. দ্র: Politics and Rason; Michel Foucault; Politics, Philosophy, Culture: Interviews & and Other Writings: 1977-84. Michel Foucault; edited by L.D. Kritzman; London. 1988 p. 77-78.

 ১৬. দ্র: The History of Sexality: Vol I: Introduction; Michel Foucault; Penguin. 1979, p. 58.

 ১৭. ফুকোর ভাষায়: ‘procedures of individualization by power’; পূর্বোক্ত পৃ. ৫৯.

 ১৮. পূর্বোক্ত; p. 59.

 ১৯. পূর্বোক্ত; p. 63.

 ২০. ফুকোর ভাষায় এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা হল ‘a deployment that spans a wide segment of history in that it connects the ancient injucnction of confession to clinical listening methods’. দ্র: পূর্বোক্ত; p. 68.

 ২১. পূর্বোক্ত; p. 65-p. 67.

 ২২. যেমন, এরকমই একটি সমকালীন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে: ‘Tell everything…not only consummated acts, but sensual touchings, all impure gazes, all obscene remarks…all consenting thought’; Alfonso de’ liguori রচিত একটি ১৮৩৫ সালের নির্দেশিকা; উদ্ধৃত, The History of Sexuality, Vol I: Foucault Reader, Edited by Paul Rabinow, USA, 1984, p. 304.

 ২৩. লেখকের ভাষায়: ‘a secret life must not leave out anything, there is nothing to be ashamed of… one can never know too much concerning human nature, My Secret Life: Anonymous, উদ্ধৃত, পূর্বোক্ত, p. 305.

 ২৪. ফুকোর মতে ঐ পূর্বোক্ত আত্মজীবনটি হল: ‘the most naive representative of a plurisecular injunction to talk about sex.’ পূর্বোক্ত, p. 305.

 ২৫. ফুকোর ভাষায়: ‘What is peculiar to modern societies, in fact, is not that they consignd sex to a shadow existence, but that they dedicated themelves to speaking of it ad infinitum, while exploiting it as secret’ পূর্বোক্ত, p. 316.

 ২৬. পূর্বোক্ত, p. 316-p. 328.

 ২৭. এক্ষেত্রে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কার্ল ওয়েস্টফল রচিত ‘Contrary sexual sensations’ রচনাটির উল্লেখ করেছেন ফুকো, যার মধ্য দিয়ে সর্বপ্রথম ‘সমকামিতা’কে বৈজ্ঞানিক ডিসকোর্সভুক্ত করার প্রক্রিয়াটি সূচিত হয় ৷ দ্র: পূর্বোক্ত, p.322.

 ২৮. ফুকোর অনবদ্য বিশ্লেষণে: ‘The growth of perversons is not a moralizing theme that obsessed the scrupulous minds of the victorians. It is the real product of the encroachment of a type of power on bodies and their pleasures. It is possible that the west has not been capable of inventing any new pleasures, and it has doubt less not discoverd any original vices. But, it has defined new rules for the games of powers and pleasures. The frozen countenance of the perversions is a fixture of the game. পূর্বোক্ত, p. 316-p. 327.

 ২৯. ফুকোর ভাষায়: ‘In a word, the deployment of alliance is attuned to a homeostasis of the social body, which it has the function of maintaining; Whence its privileged link with the law; Whence too the fact that the important phase for it is ‘reproduction’. The deployment of sexuality has its reason for being, not in reproducing itself, but in proliferating, innovating, annexing, creating and penetrating bodies in an increasingly detaild way, and in controlling populations in an increassingly comprehensive way,’ দ্র: The History of Sexuality: Vol-I; p. 107.

 ৩০. পূর্বোক্ত, p. 104-p. 105.

 ৩১. এক ঔপনিবেশিক পাগলিনীকে জানার রূপরেখা; অনুপ ধর ও তাপস দাস, আলোচনাচক্র, সংকলন ২০, জানুয়ারি ২০০৩, পৃ. ৯১-পৃ.১০৪, এবং দ্র: কালো পাগল মেয়ে, তোমায় জানতে চেয়ে: ঔপনিবেশিক বাংলায় মনঃসমীক্ষণ; অনুপ ধর ও তাপস দাস, আলোচনাচক্র, সংকলন ২১, অগাস্ট ২০০৩—জানুয়ারি ২০০৪, পৃ: ৯১-১০২ ৷

 ৩২. এই গবেষকের মতে: ‘the professed moralism of the period was actually only uttered by a minority of people who commanded the organs of opinion;’ দ্র: The Making of Victorian Sexuality;Mecheal Mason, Oxford, 1994, p. 40.

 ৩৩. পূর্বোক্ত গবেষকের বয়ানে: ‘the orthodox picture of Victorian hypocrisy is more extreme… assent to the public code was a matter of conscious and often reluctant lip-service, with actual behaviour being guided by a fully formed alternative standard.’ পূর্বোক্ত, p. 43.

 ৩৪. Advice to Young Men: Willian Cobbet; 1980 edition, p. 225-p. 226.উদ্ধৃত, পূর্বোক্ত, p. 39.

 ৩৫. My Secret Life, Walter, 1966 Edition, p. 129, উদ্ধৃত, পূর্বোক্ত, p. 47.

 ৩৬. Introduction to the Devout Life (1609) বইতে, সস্ত ফ্রাপিস বলেছিলেন, হাতি অত্যন্ত সৎ, সে কখনোই তার সঙ্গিনী বদল করে না ৷ তাছাড়া, তিন বছরে মাত্র পাঁচদিনের জন্য সঙ্গিনীর সাথে সঙ্গম করে পুরুষ হাতি ৷ ষষ্ঠ দিনে নদীর জলে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিয়ে আবার ভিনদেশে পাড়ি দেয় সে ৷ ফ্রান্সিসের মতে, এটা মানবদম্পতির ক্ষেত্রেও আদর্শস্থানীয় হওয়াই কাম্য ৷

 ৩৭. প্রখ্যাত ফরাসি গবেষক ফ্রাঁসোয়া ব্যারট-ডুক্রকের মত এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য: ‘The fact is that alongside the victorian period’s undeniable modesty in matter of speech, gesture and clothing, there is at all times a public, respectable discussion on sexuality, an explicit and prolific discourse from which sexual enjoyment is absent, erotic excitement perhaps less so. This ambiguous road is thronged with a gallery of contrasting portraits: ruling class debauchee, mastrubating adolescent, frigid middle-class housewife, the incestous alcoholic, the mother pimping for her daughters; and more idealized types; fulfilled wife, attentive husband, chaste and informed student, innocent child. Each has his or her moment in the limelight,’ দ্র: Love in the Time of Victoria: Sexuality. class and Gender in Nineteenth Century London. fraceoise Barret-Ducroeq. translated by John Howe. London, 1991, Introduction, p. 2.

 ৩৮. ওই যুগের প্রধান ঐতিহাসিকের বয়ানে: ‘By striving too hard for an almost unattainable level of sexual respectability, by refusing to admit that they were constantly falling down on this target, the middle class Victorian found that the whole subject of sex became forbidden, confused, and diffused into the most unlikely areas;’ The Worm in the Bud: The World of Victorian Sexuality: Ronald Pearsall, 1980. p. xiii; ভিক্টোরীয় যৌনতার অনুপুঙ্ক্ষ আলোচনার এক আকরগ্রন্থ এই বই ৷

 ৩৯. আর্নল্ড ডেভিডসনের ব্যাখ্যায়: ‘Perversion was not a disease candidate until it became possible to attribute diseases to the sexual instinct, and there were no possible diseases of the sexual instinct, before nineteenth century.When the notion of diseases of this instinct loses its last remaining grasp upon us, we will get rid of the perverts.’ দ্র: The Emergence of Sexuality. Armold I. Davidson: London, 2001, p. 24.

 ৪০. আমাদের আধুনিকতা; ইতিহাসের উত্তরাধিকার; পার্থ চট্টোপাধ্যায়; কলকাতা ২০০০, পৃ. ১৮১

 ৪১. ‘অনুবাদ ’-এর ধারণাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন জ্ঞান প্রকাশ ৷ তাঁর মতে; ‘Translation in the colonial context meant trafficking between the alien and the indigenous, forcing negotiations between modemity and tradition, and rearranging power relations between the colonizer and the colonized. This is preciously what the western-educated indigenous elite attempted as they sought to make their own what was associated with colonial rulers. Enchanted by Science,. they saw reason as a syntax of reform, a map for the rearrangement of culture, a vision for producing Indians as a people with scientific traditions of their own… Translation meant a realignment of power, a renegotiation of the unequal relationship between western and indigenous languages.” দ্র: Another Reason: Science and the Imagination of Modern India, Gyan Prakash, New Delhi, 2000, p.6-p.50.

 ৪২. জ্ঞান প্রকাশের ভাষায়: ‘Western knowledge, fully formed in the centre, was tropicated as it was diffused in the periphery. The paradox of the “civilizing mission” was that it was forced to undo the very opposition upon which it was founded’. পূর্বোক্ত, p. 47.

 ৪৩. দ্র: ‘Signs Taken for Wonders: Questions of Ambivalence and Authority under a Tree Outside Delhi; May, 1817; Homi Bhabha, Critical Inquiry 12 (Autumn 1985) p. 144-p. 165.

 ৪৪. ‘বৌদ্ধিক সম্প্রসারণ’ কথাটি আমরা বাবহার করেছি ‘dissemination’-এর ধারণাটি ব্যাক্যা করতে ৷ জ্ঞান প্রকাশের ভাষায়: “The delineation of one language into another, then, worked as a process of dissemination, not dialectic, from which neighter One, nor the other could reappear with its orifinal position and meaning intact” দ্র: পূর্বোক্ত, Another Reason, p. 50.

 ৪৫. পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে বলেছেন: The process of translation and negotiation did not define a dialectic; science did not negate tradition and produce a new and higher unity. Rather, translation became a process of dissemination and hybridization in which science’s authority was renegotiated and relocated. Science no longer possessed a language independent of the place and event of it’s enunciation, it was subjected to discrete, local strategies of redeplyoment. দ্র: The Disciplines in Colonial Bengal, Partha Chatterjee, Texts of Power: Emerging Disciplines in Colonial Bengal, Ed. Partha Chatterjee, Calcutta. 1996. p. 20.

 ৪৬. দ্র: Illuminations: Walter Benjamin, Ed. Hanna Arendt, New York, 1969, p. 82.

 ৪৭. ফুকোর ভাষায়: ‘position of desire in relation to discourse.’ দ্র: The Archaeology of Knowledge, Michel Foucault, London, 1972, p. 68.

 ৪৮. এই ‘শূন্য, সমসত্ব সময়ে’র ধারণাটি ব্যাখ্যা করেছেন বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন ৷ তাঁর ভাষায় এই সময়কল্পনা ‘looms out of an immemorial past, and, still more important, glides into a limitiess future.’ দ্র: Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism; Benedict Anderson, London,, 1983, p. 19.

 ৪৯. জ্ঞান প্রকাশের ভাষায়: ‘The modern nation was seen as a belated realization, of the “before”. In such a representation, the past must appear as an anteriority, not as an origin, Unlike the organicist concept, which drawn an unbroken line between the origin and the present, the idea of the modern nation as the return of the archaic introduces a sharp break between the past and the present: the past irrupts, it does not evolve, into the present. As the contemporary national self emerges in the differential sign of the return, as its time is expressed in the repitition of another time, an alienating otherness becomes the medium of expressing the fullness of the nation.” দ্র: another Rason, Gyan Prakash, p. 90.

 ৫০. তনিকা সরকারের মতে: ‘The management of household relations becomes a policital and administrative capability, providing traning in governance that one no longer attains in the political sphere. The intention is to establish a claim to share of power in the world, apolitical role that the Hindu is entitled to, via successful governance of the household.” দ্র: Hindu Wife, Hindu Nation: Domensticity and Nationalism in Nineteenth Century Bengal, Hindu Wife, Hindu Nation: Community, Religion and Cultural Nationalism:  Tanika Sarkar; New Delhi, 2003. p. 38.

 ৫১. ‘The family is here viewed as a ministate in operation, Within the confines of the family, children are segregated in a professionally supervised environment, as in the prison or in asylum, and the child’s character is molded by means of dominance and punishment. The method assumes effective control over the child’s body, indeed, the body becomes the site of the disciplinary exercise,’ দ্র: Sons of the Nation: Child Rearing the New Family; Pradip Kumar Bose; Texts of Power; Emerging Disciplines in Colonial Bengal, ed. partha Chatterjee, Calcutta, 1996, p. 134.

 ৫২. দ্র: দেশীয় স্বাস্থ্যবিজ্ঞান: অভিগমন বা স্ত্রী-পুরুষ সংসর্গ; অবিনাশচন্দ্র কবিরত্ন; চিকিৎসা সম্মিলনী, ১৮৮৫, বৈশাখ, ১২৯২ বঙ্গাব্দ ৷

 ৫৩. পূর্বোক্ত প্রবন্ধ ৷

 ৫৪. পূর্বোক্ত প্রবন্ধ ৷

 ৫৫. পূর্বোক্ত প্রবন্ধ ৷

 ৫৬. দ্র: জাতীয় দৈহিক পুনরুজ্জীবন; চিকিৎসা সম্মিলনী, বৈশাখ ১২৯২ বঙ্গাব্দ ৷

 ৫৭. দ্র: হস্তমৈথুনে বালক ও নবযুবকগণ, প্যারীমোহন সেনগুপ্ত; চিকিৎসা সম্মিলনী, বৈশাখ, ১২৯২ বঙ্গাব্দ ৷

 ৫৮. দ্র: ভারতের অবনতি, অনুবীক্ষণ, পৌষ, ১২৮২ বঙ্গাব্দ (১৮৭৫)

 ৫৯. পূর্বোক্ত প্রবন্ধ ৷

 ৬০. পূর্বোক্ত, দেশীয় স্বাস্থ্য বিজ্ঞান: অভিগমন বা স্ত্রী-পুরুষ সংসর্গ; চিকিৎসা সম্মিলনী, ১৮৮৫

 ৬১. পূর্বোক্ত, জাতীয় দৈহিক পুনরুজ্জীবন, চিকিৎসা সম্মিলনী, ১৮৮৫ ৷

 ৬২. বৈজ্ঞানিক দাম্পত্য প্রণালী অর্থাৎ বিবাহ, ইন্দ্রিয়সেবন ও সন্তান উৎপাদন বিষয়ে বিজ্ঞানের বিধি এবং অবৈধ ইন্দ্রিয়সেবনের প্রতিফল ও প্রতিকার, ইন্দ্রিয় সংযমন, নারীজাতির জননেন্দ্রিয়ের ব্যাধি ইত্যাদির বিবরণ সংগ্রহ, সূর্যনারায়ণ ঘোষ; ঢাকা গিরিশযন্ত্রে মুন্সি মওলাবক্স প্রিন্টার কর্তৃক মুদ্রিত, ১৮৮৪ খ্রি. ৷

 ৬৩. ডেডিডসনের মতে : ‘Since it was believed that there were distinct diseases of sexuality, and since these diseases could not be explained by defects of the reproductive organs, the only plausible organ that remained to provide an explanation was the brain. The dominance of brain was as much as a consequence of a complicated web of epistemic and conceptual conditions as it was of any empirical evidence. Indeed, for these early psychiatrists it does not seen as if anything could have counted as evidence against the proposition that sexual perversions are ultimately traceable to brain disease.’ দ্র: The Emergence of Sexuality; Arnold I. Davidson, p. 10.

 ৬৪. দ্র: ধাতুদৌর্ব্বল্য; ক্ষেত্রমোহন গোষ প্রণীত, ১০৯, মেছোবাজার রোড, কলিকাতা, ১৮৯৭ খ্রি ৷

 ৬৫. ‘modern masturbation was born of a new secular world; it was that world’s dark, other side. The enlightement project of liberation—the coming into adulthood of humanity—made the most secret, private, seemingly harmless and most difficult to detect the sexual acts the counterpiece of a program for policing the imagination, desire, and the self that modernity itself had unleashed’; দ্র: Solitary Sex: A Cultural History of Masturbation; Thomas W. Laqueur, New York, 2003, p. 19.

 ৬৬. দাম্পত্যবিজ্ঞান: সন্তানোৎপাদিকাবৃত্তি সম্পর্কে লিখিত; শ্রীরাখালদাস কবিরত্ন কর্তৃক সংগৃহীত, কলিকাতা, সন ১২৯৪ খ্রি ৷

 ৬৭. সচিত্র লজ্জতন্নেছা অর্থাৎ মহর্ব্বতে দুনিয়া, কোকা পন্ডিত কর্তৃক বিরচিত, নদেরচাঁদ পাইন দ্বারা মুদ্রিত; প্রকাশকাল নেই ৷

৬৮. সচিত্র শিবোক্ত রতিশাস্ত্র অর্থাৎ পুরুষের দেহরক্ষা, যৌবনরক্ষা, পরমায়ুরক্ষা এবং ধনোপার্জ্জন প্রভৃতির উপায় নিরূপক গ্রন্থ, যশহর মল্লীকপুরনিবাশী শ্রীকালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন কর্তৃক সংগৃহীত, অনুবাদিত ও প্রকাশিত, কলিকাতা, ৩, নিমু গোস্বামী লেন, কমলাকান্ত যন্ত্রে শ্রীকুঞ্জবিহারী সরকার দ্বারা মুদ্রিত, ১২০৪ বঙ্গাব্দ ৷সহ

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *