২.১১ দ্য পারফেক্ট ক্রাইম

দ্য পারফেক্ট ক্রাইম
[স্টোনম্যান
বারোটি মামলায় একাধিক তদন্তকারী অফিসার ছিলেন।]

ক্রিং ক্রিং…

কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে যা হয়, মেজাজটা খিঁচড়ে গেল গোয়েন্দাপ্রধানের। অনেক রাত অবধি একটা কেস ডায়েরি দেখেছেন। ডাকাতির মামলা। ঘটনার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ধরা পড়ে গিয়েছিল ডাকাতরা। তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে আড়াই মাসের মধ্যেই তদন্তকারী অফিসার চার্জশিট তৈরি করে ফেলেছেন বিস্তর খেটেখুটে। কাল-পরশুর মধ্যেই জমা পড়বে আদালতে। কোথাও কোনও ফাঁকফোকর যাতে না থাকে, একবার তাই খুঁটিয়ে দেখতেই হত। ফাইলটা বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। ডিনারের পরে বসেছিলেন কেসটা নিয়ে। চার্জশিটের খুচরো ভুলগুলো লাল পেনে মার্ক করে যখন শুতে গিয়েছিলেন, ঘড়ির কাঁটা দুটো ছাড়িয়েছে। জমাট ঘুমের মধ্যপথে ছন্দপতন পৌনে পাঁচটা নাগাদ ..ক্রিং ক্রিং..।

কথায় বলে, ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়, সে ভাল হোক বা মন্দ। ভোরের স্বপ্নের সত্যি-মিথ্যে জানা নেই। তবে পুলিশের চাকরিতে কাকভোরের ফোন অশনিসংকেতই বয়ে আনে সচরাচর। দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর কেউ ভোরে সিনিয়র অফিসারের ঘুম ভাঙাতে বাধ্য হচ্ছে মানে, অবধারিত কোথাও ডাকাতি, নয়তো খুন। কিংবা দাঙ্গা, বা আরও খারাপ কিছু। ঘুমচোখেই বেডসাইড টেবলে রাখা ফোনের রিসিভারটা তুললেন গোয়েন্দাপ্রধান। অন্য প্রান্ত থেকে যে উদ্বিগ্ন আওয়াজটা ভেসে এল, সেটা দীর্ঘদিনের পরিচিত। ওসি হোমিসাইড।

—নমস্কার স্যার, আবার!

আবার! শুনেই বিছানা ছেড়ে উঠে বসেন গোয়েন্দাপ্রধান।

—মানে?

—আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজের কাছে স্যার.. সিইএসসি-র ট্রান্সফর্মার আছে একটা …

—কখন হল?

—খবরটা থানায় এসেছে মিনিট দশেক হল, আমি থানার ফোনটা পেয়েই…

—তুমি শিয়োর? আই মিন মোডাস অপারেন্ডি…

—হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্যার.. যা শুনলাম .. জাস্ট দ্য সেম..

—হুঁ .. তোমরা বেরও.. পৌঁছও অ্যাজ় আর্লি অ্যাজ় পসিবল..আসছি।

ফোনটা কেটে দেওয়ার পর মিনিটখানেক থম মেরে বসে থাকেন গোয়েন্দাপ্রধান। আবার? তা হলে যে অস্বস্তিটা কাঁটা হয়ে বিঁধছিল মাসখানেক ধরে, সেটাই সত্যি হল? ইংরেজিতে বলে না.. ‘worst fears coming true?’

সিপি-কে এখনই জানানো দরকার। বেরনোর জন্য তৈরি হতে হতেই ফোনে ধরলেন। সিপি শুনলেন এবং একটিই শব্দ খরচ করলেন, ওসি হোমিসাইডের একটু আগের ফোনে ‘নমস্কার স্যার’-এর পর যে শব্দটা ছিটকে এসেছিল।

—আবার!

গোয়েন্দাপ্রধানের গাড়ি যখন মৌলালির কাছাকাছি, আলো আলতো আঁচড় কাটতে শুরু করেছে আকাশে। রাত তখন ভোরপ্রবণ।

.

—স্যার, সুভাষবাবুর পরের সভাটা কখন কোথায়, বলবেন প্লিজ়?

সুদূরতম কল্পনাতেও উলটোদিকের চেয়ারে বসে থাকা মাঝবয়সি লোকটির থেকে এ প্রশ্ন আশা করেননি ওসি হোমিসাইড। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকেন যুবকের মুখের দিকে। ভুল শুনলেন না তো? জিজ্ঞেস করেন ঠান্ডা গলায়, ‘কার সভা?’

উত্তর আসে নির্বিকার।

—সুভাষবাবুর স্যার, নেতাজি সুভাষ।

মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন গোয়েন্দারা। ইয়ার্কি করছে? লালবাজারে এসে মশকরা করবে, তা-ও হাতেনাতে ধরা পড়ার পর? না কি সেয়ানা পাগলের ভেক ধরেছে মার এড়াতে?

এক অফিসার কলার চেপে ধরেন মাঝবয়সির।

—চ্যাংড়ামি হচ্ছে? ইয়ার্কি মারার জায়গা পাননি? নেতাজি? সোজাসুজি সবটা খুলে বলুন, একটা একটা করে। আদরযত্ন তো এখনও শুরুই করিনি। শুরু করলে একটা মারও বাইরে পড়বে না, গলগল করে বেরিয়ে আসবে সব। যত্নআত্তি করব, না এমনিই বলবেন? ব্যাটা বলে কিনা সুভাষবাবু!

অবাক হয়ে অফিসাররা লক্ষ করেন, কোনও ভাবান্তর নেই লোকটির। শরীরী নড়াচড়ায় না আছে কোনও উদ্বেগের আভাস, না আতঙ্কের। মৃদু হেসে জবাব দেয় পুলিশি হুমকির, ‘হ্যাঁ স্যার, নেতাজি। কী অপূর্ব বললেন আজ! বললেন, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব! মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলাম। গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। পরের সভাটা কোথায় হবে স্যার?’

ধৈর্য বিপদসীমা অতিক্রম করে ওসি হোমিসাইডের। হাড়মাস কালি হয়ে গেছে এই লোকটার জন্য। চাকরিটাই যেতে বসেছিল প্রায়। আর ধরা পড়ার পর টাইমমেশিনে নেতাজির আমলে ফিরে যাওয়ার অভিনয় করে চলেছে আধঘণ্টা ধরে। এখনই একটি প্রবল চপেটাঘাত প্রয়োজন। এমন একটি বিরাশি সিক্কা, যা দ্রুত বর্তমানে ফিরিয়ে আনবে শ্ৰীমানকে।

থাপ্পড়টা অসমাপ্তই থেকে যায় গোয়েন্দাপ্রধানের হন্তদন্ত আবির্ভাবে। যিনি খবর পেয়েই ছুটে এসেছেন পড়িমরি। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান ওসি, ‘আসুন স্যার.. বসুন..।’

বসেন না গোয়েন্দাপ্রধান। একদৃষ্টে স্থির তাকিয়ে থাকেন চেয়ারে বসা স্মিতহাস্য লোকটির দিকে। এই লোকটা? এ-ই স্টোনম্যান? যে শুধু লালবাজার নয়, পুরো শহরের ঘুম কেড়ে নিয়েছে গত ন’মাস ধরে? শান্তভাবে প্রশ্ন করেন মাঝবয়সিকে, ‘কী নাম আপনার?’

.

ফিরে দেখা সেই মামলাকে, প্রায় তিন দশক পেরিয়েও যা নিয়ে আমজনতার ঔৎসুক্যের পারদ কণামাত্র নিম্নগামী হয়নি, কৌতূহলের তীব্রতার নিরিখে যা কলকাতা পুলিশের শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসে আজও তর্কাতীত শীর্ষবাছাই।

১৯৮৯-এর চৌঠা জুনের সাতসকাল। হেয়ার স্ট্রিট থানার ডিউটি অফিসার ফোনটা ধরলেন, শুনলেন এবং বুঝলেন, দিনটা খারাপ ভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। খুন হয়ে গেছে একটা। কোথায়? লালবাজারের নাকের ডগায়।

‘নাকের ডগা’ বলতে বিবাদী বাগের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনা। মধ্যতিরিশের মহিলা পড়ে আছেন প্রাণহীন। গভীর ক্ষতচিহ্ন মৃতার মাথার ডান দিকে। মাথার পাশেই পড়ে রয়েছে একটা বড় পাথর। যাতে রক্তের লাল-কালচে ছিটে জানান দিচ্ছে, খুনির হাতিয়ার ছিল ওই পাথরটাই। যার ওজন প্রায় সাড়ে নয় কেজির মতো। ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়াই বোঝা যাচ্ছিল সাদা চোখে, একেবারে কাছ থেকে খুনি পাথরটা আছড়ে ফেলেছে মহিলার মাথায়। অত ভারী পাথর মাথায় সজোরে আঘাত করলে যা হয়, ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু এসেছে অনিবার্য। ডাক্তারি পরিভাষায়, ‘Death was due to the effects of injuries, ante-mortem and homicidal in nature.’

মৃতার পরিচয়? আলেয়া বিবি, ফুটপাথবাসিনী। স্থায়ী আস্তানা বলতে কিছু ছিল না। স্বামী মোহন সাউয়ের খুচরো বিক্রিবাটার কাজে টুকটাক সাহায্য করতেন। রাস্তাতেই দম্পতির দিন গুজরান, রাস্তাতেই নিশিযাপন। রাত এগারোটা নাগাদ ঘুমিয়েছিলেন রোজকার মতো। ভোরে আবিষ্কৃত হল মৃতদেহ। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জানাল, খুনটা হয়েছে রাত চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে। শরীরের অন্য কোথাও কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই, চিহ্ন নেই কোনওরকম বলপ্রয়োগের। মৃতা তিন মাসের সন্তানসম্ভবা ছিলেন।

কে খুনটা করল-র থেকেও ‘কেন করল’-টাই ধন্দে ফেলল হোমিসাইড শাখার গোয়েন্দাদের। মোহন সাউ স্ত্রী আলেয়াকে নিয়ে বিহারের দ্বারভাঙা থেকে জীবিকার খোঁজে কলকাতায় এসেছিলেন কয়েক বছর আগে। দিন আনি দিন খাই-এর চালচুলোহীন সংসার। ঠিকানা ফুটপাথ। আলেয়াকে খুন করে অর্থলাভের সম্ভাবনা শূন্য। মোটিভ হিসাবে অন্য যে সম্ভাবনাটা মাথায় আসবেই, যৌন-ঈর্ষা? স্বামী-স্ত্রী-র সম্পর্কে কোনও তৃতীয় ব্যক্তির আবির্ভাবজনিত টানাপোড়েন? খোঁজখবর নেওয়া হল যতটা তলিয়ে সম্ভব, কিন্তু মোহন-আলেয়ার সম্পর্কে ন্যূনতম অশান্তি-অস্থিরতার আঁচ পাওয়া গেল না। তা হলে?

‘তা হলে?’-র উত্তর অমিলই থাকল প্রায় মাসদেড়েক। তার পরেও যে ধাঁধার জবাব পাওয়া গেল, এমন নয়। বরং ঘটল উলটোটা। ১৯ জুলাইয়ের রাত রাতারাতি অন্য মাত্রা দিল পঁয়তাল্লিশ দিন আগের আলেয়া-হত্যাকে, যাকে স্রেফ একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করার বিলাসিতা আর রইল না লালবাজারের। থাকবেই বা কী করে? এবার তো জোড়া খুন!

প্রথমটা তালতলা থানা এলাকায়। জিয়োলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র উত্তরমুখী গেটের অদূরে, পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশনে ঢোকার সিঁড়ির মুখে। চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছরের নিথর রক্তাক্ত দেহটা ছ’টা-সোয়া ছ’টা নাগাদ নজরে আসে পথচারীদের। ছেঁড়াখোঁড়া জামাপ্যান্ট, শীর্ণ চেহারায় অপুষ্টির ছাপ প্রকট। মাথার ডান দিকটা তীব্র আঘাতে চুরমার হয়ে গেছে প্রায়। যা দিয়ে আঘাত, সেটা পড়ে আছে মাথার পাশে। পাথর, প্রমাণ সাইজ়ের। ওজন? তা কুড়ি কেজি তো হবেই।

গোয়েন্দারা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছে ছবি তুলছেন নিহতের, ওসি হোমিসাইড যখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষার আয়োজনে, কন্ট্রোল রুম মারফত ওয়ারলেস বার্তা এল, ‘সাসপেকটেড মার্ডার ইন মুচিপাড়া পিএস এরিয়া… নিয়ার শিয়ালদা স্টেশন সাবওয়ে… ভিকটিম আ টিনএজার ..।’

গোয়েন্দাপ্রধান কিংবা নগরপাল স্বয়ং, সকাল-সকাল জোড়া খুনের খবরে বিচলিত হননি কেউই। গড়পড়তা পুলিশি রোজনামচার মাঝে হয় কখনও কখনও এমন। আসে, এমন এক-একটা দিন আসে, কোনও এক অদৃশ্য ষড়যন্ত্রীর অঙ্গুলিহেলনে যাবতীয় খারাপ যেন একসঙ্গে ঘটতে থাকে।

বিচলিত হওয়ার কারণ ঘটল ওসি মুচিপাড়ার বার্তায়, ‘স্যার.. বাচ্চা ছেলে … বয়স এই চোদ্দো-পনেরো হবে .. আইডেন্টিটি এস্ট্যাব্লিশড হয়নি এখনও… যেটুক পাচ্ছি, স্টেশনের ফুটপাথে থাকত .. ভিক্ষে করত … হেড ইনজুরি মাথার বাঁ দিকে.. একটা বড় পাথর দিয়ে মাথায় মারা হয়েছে .. পাথরটায় ব্লাড স্টেইনস আছে…।’

মানে? আবার পাথর? দুটো খুনই পাথর দিয়ে মাথায় মেরে? দুটোই ফুটপাথে? আলেয়া বিবির খুনের মোডাস অপারেন্ডির সঙ্গে হুবহু মিল? তা হলে কি ..? কী-কেন তো পরে, ঘটনার ঘনঘটায় গোয়েন্দারা দিব্যি বুঝতে পারছিলেন নির্যাস— ‘নিশ্চিন্ত আর থাকা গেল না রে তোপসে!’

আধঘণ্টার মধ্যে ফের বার্তাবাহকের ভূমিকায় কন্ট্রোল রুম, ‘সিপি ডিজ়ায়ার্স টু মিট ডিসি ডিডি অ্যান্ড অফিসার্স অফ দ্য হোমিসাইড স্কোয়াড অ্যাট টেন ইন দ্য লালবাজার কনফারেন্স রুম। ডিসি সেন্ট্রাল শ্যাল অলসো রিমেইন প্রেজ়েন্ট উইথ দ্য ওসি-জ় অফ তালতলা, মুচিপাড়া অ্যান্ড হেয়ার স্ট্রিট পুলিশ স্টেশনস।’

.

ঘণ্টাখানেকের বৈঠকে তিনটে খুন নিয়েই কাটাছেঁড়া করলেন নগরপাল। অফিসারদের প্রত্যেকের মতামত জানতে চাইলেন। শুনলেন ধৈর্য ধরে। অল্পসময়ের ব্যবধানে একই ধাঁচের অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে যা আশু জরুরি হয়ে ওঠে, আলোচনা হল তা নিয়েই।

এক, ‘ডিটেকশন’। ঘটে যাওয়া খুনগুলোর কিনারা করা যত দ্রুত সম্ভব। দুই, ‘প্রিভেনশন’। যতক্ষণ না সমাধানসূত্র পাওয়া যাচ্ছে, একই ধরনের খুন আর ঘটতে না দেওয়া।

সিপি এবং ডিসি ডিডি তো বটেই, অন্য অফিসাররাও টের পাচ্ছিলেন, আলোচনা করা এক, আর তার সফল প্রয়োগ আরেক। ‘ডিটেকশন’-এর দিক থেকে ভাবলে, আলেয়া বিবির খুনে আপ্রাণ চেষ্টা করেও সামান্যতম ‘লিড’ও অধরা এখনও। তার মধ্যেই এই জোড়া খুন।

নিহত তিন। একজন মহিলা, পুরুষ একজন, তৃতীয়জন নেহাতই কিশোর। মহিলার পরিচয় জানা গেছে। বাকি দু’জনের এখনও নয়। হয়তো জানা যাবে কয়েকদিনের মধ্যে। কিন্তু পরিচয় সে যা-ই হোক, তিনটে খুনেই কমন ফ্যাক্টরগুলো তীব্র অস্বস্তি উৎপন্ন করছে। খুনির হাতিয়ার তিনটে ক্ষেত্রেই পাথর। তিনটে ঘটনারই সময়কাল শেষ রাত থেকে ভোরের মধ্যবর্তী। এবং ‘ভিক্টিম প্রোফাইল’ তিনটে ক্ষেত্রেই সমগোত্রীয়। আততায়ী বেছে নিয়েছে নিরাশ্রয় ফুটপাথবাসী কাউকে। যাদের খুন করে অর্থাগমের সম্ভাবনা নেই কোনও।

পদ্ধতি এক। টার্গেট-চরিত্র এক। আঘাত হানার সময়টাও এক। ‘ক্রাইম প্যাটার্ন’-এ এত যখন মিল, আততায়ীও এক? যদি আশঙ্কাই সত্যি হয়, যদি একই লোক হয়, তা হলেও নাগাল পাওয়ার মতো সূত্র কই? পার্ক স্ট্রিট মেট্রোর কাছে খুন হওয়া মাঝবয়সি এবং শিয়ালদায় নিহত কিশোরের পরিচয় জানতে পারলে দিশা মিলবে কিছু? যোগসূত্র কোনও?

এ তো গেল ‘ডিটেকশন’-এর সাতসতেরো। কিন্তু ‘প্রিভেনশন’? কী করে হবে ‘প্রিভেনশন’? অত সোজা? এ শহরের পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ, হাজার হাজার মানুষ ফুটপাথে রাত্রিযাপন করেন এখানে-ওখানে-সেখানে। সম্ভব পাহারা দেওয়া?

সংকট যখন চোখ রাঙায়, সম্ভব-অসম্ভব নিয়ে মাথা ঘামানোর অত সময় থাকে না। অগ্রাধিকার পায় যে ভাবেই হোক মুশকিল আসানের রাস্তা খোঁজা। সিদ্ধান্ত হল, নৈশ নজরদারি বাড়ানো হবে শহরে। তিনটে খুনই হয়েছে সেন্ট্রাল ডিভিশনে, মধ্য কলকাতায়। ঠিক হল, মধ্য কলকাতার সব ওসি নিয়ম করে থাকবেন রাতপাহারায়, চলবে টহলদারি। শুধু গাড়িতে নয়, পায়ে হেঁটেও চালু হবে নৈশ-নজরদারি। শহরের বাকি এলাকার ডিসি-ওসি-দেরও শোনানো হল সতর্কবার্তা, বলা হল রাতের শহরে পুলিশি উপস্থিতি বাড়াতে।

মিটিংয়ের শেষে গোয়েন্দাপ্রধান অর্থাৎ ডিসি ডিডি-কে ঘরে ডেকে নিলেন নগরপাল। কথাচালাচালি হল খানিক।

—কী বুঝছ… খোলাখুলি বলো…

ডিসি ডিডি কয়েক সেকেন্ড ভাবার পর উত্তর দিলেন।

—লুকস কোয়াইট স্ট্রেঞ্জ স্যার … কোনও কানেক্ট এখনও পাওয়া যাচ্ছে না.. অথচ তিনটে খুনই একই ভাবে … সিমিলারিটিটা …

মাঝপথে থামিয়ে দেন নগরপাল।

—সেজন্যই তো বললাম খোলাখুলি বলতে। কী মনে হচ্ছে… সিরিয়াল কিলিং?

উত্তর দেন না গোয়েন্দাপ্রধান। স্রেফ তাকান সিপি-র দিকে। নগরপালও নিরুত্তরই থাকেন।

আশঙ্কা আর উদ্বেগ কবেই বা আর শব্দের তোয়াক্কা করেছে?

.

আশঙ্কা সত্যি হল আপাদমস্তক, উদ্বেগ ঊর্ধ্বগামী হল মাসখানেকের মধ্যেই। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খুনে নিহতদের পরিচয় মেলেনি তখনও, অফিসারদের জানকবুল চেষ্টা সত্ত্বেও। চলছে নৈশপ্রহরা পরিকল্পনামাফিক। তবু ২৭ অগস্ট ফের খুন, ফের ফুটপাথ, ফের পাথর! শিয়ালদা ফ্লাইওভার থেকে নেমে সাবওয়ের পথে এবার, টার্গেট এবারও রাস্তায় ঘুমন্ত, হা-ক্লান্ত, আশ্রয়হীন। মধ্যতিরিশের ভবঘুরে ভিক্ষুক। হননকাল, ভোর চারটে থেকে পাঁচটার মধ্যে।

যে সময়ের কথা, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দাপট তখনও মাথাচাড়া দেয়নি। একচেটিয়া আধিপত্য ছাপার অক্ষরের। লেখালেখি হচ্ছিল বটে তিনটে একই ধাঁচের খুন নিয়ে, কিন্তু উদ্বাহু হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার উপকরণ ছিল না পর্যাপ্ত। যে সমস্যা রইল না একই কায়দায় চতুর্থ খুনের পর। খবরের কাগজ যা যা ছিল শহরে, একযোগে মাঠে নামল। শিরোনামে চলে এল পুলিশি ব্যর্থতা, ফ্রন্ট পেজ দখল করল রাতের শহরের রহস্যময় ঘাতক। একটি জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিকের সাংবাদিক লিখলেন, ‘Stoneman Strikes Again!’

সেই প্রথম ব্যবহৃত হল ‘স্টোনম্যান’ শব্দটা। যা সমার্থক হয়ে গেল মামলার সঙ্গে, এবং তার চেয়েও ঢের জরুরি, আতঙ্কের আহ্বায়ক হিসাবে দেখা দিল শহর কলকাতার মননে-মানসে।

লালবাজারে বৈঠক হল ফের। কিন্তু প্রয়োজন হল না মিটিং-শেষে কর্তাদের একান্ত আলাপচারিতার। সত্যিটা তখন পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টার মতো বাজতে শুরু করেছে কলকাতা পুলিশের ‘ভিতর-বাহিরে অন্তরে অন্তরে’।

সিরিয়াল কিলিং! সিরিয়াল কিলার!

.

স্ট্র্যাটেজি তৈরি হল নতুন করে। ‘নতুন’ বলতে ‘প্রিভেনশন মেকানিজ়ম’-কে ঢেলে সাজানো। হাজার চেষ্টাতেও যখন ‘ডিটেকশন’ এখনও দূর অস্ত, উপায় কি আর? নৈশ প্রহরার জাল আরও বিস্তৃত করা ছাড়া আর কী-ই বা এই পরিস্থিতিতে করণীয়?

‘করণীয়’-র তালিকার সংক্ষিপ্তসার?

এক, শহরের বিভিন্ন থানার অফিসারদের এবং ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট-এর গোয়েন্দাদের যার যেখানে যা সোর্স আছে, সবাইকে পত্রপাঠ মাঠে নামতে হবে। ‘ডিটেকশন’-এর জন্য শহরজুড়ে সোর্স লাগানো হয়েছিল আগেই, লাভ হয়নি। এবার কাজে লাগাতে হবে, ‘প্রিভেনশন’-এর জন্যও। সোর্সদের উপর নির্দেশ থাকবে রাত দশটা থেকে ভোর ছ’টা অবধি রাতপাহারার। এলাকা ভাগ করে দেওয়া হবে প্রত্যেককে। হাতে দিয়ে দেওয়া হবে নির্দিষ্ট এলাকার ম্যাপ। ‘নির্দিষ্ট এলাকার ম্যাপ’ মানে শহরের যে যে জায়গায় ফুটপাথবাসীদের সম্মিলিত রাত্রিবাস, সেই জায়গাগুলোর হাতে আঁকা ভূগোল। রাস্তায় কাউকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে সোর্স খবর দেবে পুলিশকে। নজরদারিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে মধ্য কলকাতা, যা এখনও পর্যন্ত স্টোনম্যানের বিচরণভূমি।

দুই, সোর্স তো নজরদারির সহায়ক-শক্তি মাত্র, আসল কাজটা তো পুলিশকেই করতে হবে। কী ভাবে? ত্রিমুখী রাতপাহারা, সিদ্ধান্ত নিল লালবাজার। গাড়িতে, পায়ে হেঁটে এবং সাইকেলে। শহরের সমস্ত ওসি এবং এসিপি-দের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হল এলাকা। তৈরি হল এলাকাভিত্তিক ‘পেট্রোলিং চার্ট’। ফোকাস, ফুটপাথ। কিন্তু কোন ফুটপাথ? ফুটপাথ তো অসংখ্য। ‘যত মত তত পথ’, আর ‘যত পথ তত ফুটপাথ’, শহরের এ-মাথা থেকে ও-মাথা। স্টেশন চত্বর, বাস টার্মিনাস, হাসপাতালের বাইরের রাস্তা, এমন কিছু জায়গায় তবু একত্রে রাত্রিবাস করেন ফুটপাথবাসীরা। কিন্তু তার বাইরেও পড়ে থাকে হাজার হাজার অলিগলি, পড়ে থাকে অগুনতি আনাচকানাচ। সর্বত্র সম্ভব নজরদারি? অসম্ভবকে যতটা সম্ভব করা যায়, ঝাঁপাল কলকাতা পুলিশ। হেঁটে, গাড়িতে, সাইকেলে।

তিন, জিআরপি-র ( গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ) সঙ্গে সমন্বয়ে হাওড়া-শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে-ভিতরে নৈশপ্রহরায় সামান্যতম ঢিলে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে শিয়ালদায়। এমন হতেই পারে, ঘাতক আসছে শহরের বাইরে থেকে রেলপথে। কাজ হাসিল করে চম্পট দিচ্ছে রেলপথেই, ভোরের ট্রেনে। কাকভোরের ট্রেনগুলোর যাত্রীদের উপর নজরদারির তীব্রতা থাকতে হবে বিরামহীন।

চার, নজরদারির উপর নজরদারি। প্ল্যানমাফিক প্রহরা চলছে কিনা, তার সরেজমিন তদারকির দায়িত্বে প্রতি রাতে রাস্তায় থাকবেন একজন ডিসি পদমর্যাদার অফিসার। এবং নৈশ অভিযানের খুঁটিনাটি সমন্বয়ের ভার সামলাবেন আরেকজন ডিসি, লালবাজারের কন্ট্রোল রুম থেকে।

কিন্তু এত করেও শেষরক্ষা আর হল কই? মুচিপাড়া এলাকায় চতুর্থ খুনটা হয়েছিল ২৭ অগস্ট। তার ঠিক দশদিনের মাথায়, ৬ সেপ্টেম্বর, ফের লালবাজারের রক্তচাপ বাড়িয়ে দিল স্টোনম্যান। হাওড়া ব্রিজে ওঠার মুখে উত্তরদিকের ফুটপাথে অজ্ঞাতপরিচয় বছর পঁয়ত্রিশের যুবক খুন। চেহারা ভবঘুরে প্রকৃতির, মাথায় বাঁ দিকটা থেঁতলানো প্রায় কুড়ি কেজি ওজনের পাথরের আঘাতে। যে পাথরটা, অন্য খুনগুলোর মতোই, পড়ে মৃতদেহের পাশে। দেহ আবিষ্কৃত হল ভোরের দিকে। ময়নাতদন্ত জানাল, হত্যার সময় রাত তিনটে থেকে সাড়ে তিনটের মধ্যে।

পঞ্চম খুনের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই খুন নম্বর ছয় আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে। ৮ সেপ্টেম্বর। ঘটনাস্থল এবার ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটে, লালবাজার থেকে বড়জোর সাত-আটশো মিটার দূরত্বে। নিহত দৃশ্যতই ভিক্ষে করে জীবিকানির্বাহ করতেন। বয়স তিরিশের কোঠায়। পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজনই, তবু লিপিবদ্ধ থাক তথ্যের স্বার্থে, খুন একই কায়দায়, খুনির হাতিয়ারও একই। পাথর।

শহর জুড়ে ততদিনে ত্রাসের নাম স্টোনম্যান। আতঙ্কের ঠিকানা ফুটপাথ। খবরের কাগজ না হয় ছেড়েই দিলাম, পথেঘাটে-বাসে-ট্রামে-পাড়ার রকের সান্ধ্য আড্ডায় চর্চার বিষয় একটাই। স্টোনম্যান। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে আমবাঙালির কথাচালাচালি।যাতে উদ্বেগ যত না,স্বীকার করা ভাল, তার চেয়েও বেশি ধরা পড়ছে রহস্যযাপন, ধরা পড়ছে কিছুটা ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ মার্কা মধ্যবিত্ত স্বস্তিও।

—মারছে তো ফুটপাথে শুয়ে থাকা লোককে। মোদ্দা কথা, মাথার উপর ছাদ আছে যাদের, তারা সেফ। তোর-আমার রিস্ক নেই।

—সেলফিশ মিডলক্লাস মাইন্ডসেট একেই বলে! ফুটপাথের লোকগুলো মানুষ নয়? ওদের জীবনের দাম নেই কোনও?

—তা তো বলিনি। স্টোনম্যানের টার্গেট গ্ৰুপ যে ফুটপাথে রাত কাটানো লোকজন, এতে তো কোনও ডাউট নেই আর। আমি শুধু ভাবছি, একটা লোক খুনের পর খুন করে যাবে এভাবে, আর পুলিশ আঙুল চুষবে, অপেক্ষা করবে পরের খুনটার জন্য?

—কাগজে তো পড়লাম স্পেশ্যাল নাইট পেট্রোলিং শুরু হয়েছে…

—তাতে লাভ তো কিছু হচ্ছে না! খুন তো করেই যাচ্ছে ইচ্ছেমতো। টিকিটাও ছোঁয়া যাচ্ছে না খুনির। লালবাজারের সঙ্গে নাকি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের তুলনা করা হয়। এই তো নমুনা!

—তা যা বলেছিস! এদের একজন ফেলুদা বা ব্যোমকেশ দরকার, বুঝলি? না হলে কিস্যু হওয়ার নয়।

ছিছিক্কার চলছিল খবরের কাগজেও দিনের পর দিন। ‘ছ’টি খুনের পরও অন্ধকারে পুলিশ’, ‘লালবাজারের জবাবদিহি চাইল মহাকরণ’, ‘স্টোনম্যানকে ধরতে ল্যাজেগোবরে কলকাতা পুলিশ’… এই জাতীয় হেডিংসংবলিত খবর তখন নিত্যনৈমিত্তিক।

পড়তে-শুনতে খারাপ লাগলেও স্বীকার্য, সমালোচনা প্রাপ্যই ছিল। একটা লোক একই কায়দায় রাতের শহরে খুন করে যাচ্ছে একের পর এক, আর কিস্যু করতে পারছে না কলকাতা পুলিশ, জটিল থেকে জটিলতর মামলার সফল কিনারার জন্য যাদের দেশজোড়া নাম, ‘স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড’ অভিধাপ্রাপ্তি?

অথচ চেষ্টায় তিলমাত্র খামতি ছিল না লালবাজারের। রাতের শহরে একাকী পথচারী দেখলেই পথ আটকে জেরা করছিল পুলিশ। উত্তরে সামান্যতম অসংগতি পেলেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল লালবাজারে, চলছিল জিজ্ঞাসাবাদ ঘণ্টার পর ঘণ্টা। জনাপঞ্চাশ ভবঘুরে প্রকৃতির লোককে আটক করেও তবু সূত্র থাকছিল নাগালের বাইরে। তদন্ত যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই আটকে থাকছিল স্থাণুবৎ। পুলিশে ক্রমশ ভরসা হারাচ্ছিল রাতের কলকাতা।

এবং ভরসাহীনতার মরিয়া প্রতিফলন ঘটছিল, দিন যাচ্ছিল যত। পুলিশ যখন পারছে না, নিজেদের সুরক্ষা-বলয় ফুটপাথবাসীরা নিজেরাই তৈরি করে নিচ্ছিলেন যথাসাধ্য। পালা করে চলছিল রাত জাগা। একদল ঘুমোচ্ছিলেন রাত দশটা থেকে দুটো। তখন বাকিরা তাস খেলছিলেন। দুটো থেকে অন্যদের জাগার পালা, বাকিদের ঘুমের। ভবঘুরে জাতীয় কাউকে দেখলেই রে রে করে তেড়ে যাচ্ছিলেন ওঁরা। চলছিল দেদার চড়থাপ্পড়, ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে রেখে প্রশ্নবাণ এবং কিলঘুসি।

—বল, এত রাতে এখানে কেন?

—বলবে আবার কী, নির্ঘাত এই শালাই স্টোনম্যান! মার ব্যাটাকে!

—হ্যাঁ, মেরে তক্তা করে দি চল…

—কিন্তু পাথরটা কোথায়? বল বল… পাথরটা কোথায় রেখেছিস? না বললে তোর মাথাতেই আজ পাথর ভাঙব।

কত পথচারীকে যে সে-সময় গণপিটুনির হাত থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ, হিসেব নেই। মেরে মুখচোখ ফাটিয়ে দিয়েছে উন্মত্ত জনতা, ‘বিশ্বাস করুন, আমি স্টোনম্যান নই’-এর আকুল আর্তি উপেক্ষা করেই। খবর পেয়ে পুলিশি হস্তক্ষেপে প্রাণে বেঁচেছেন একাধিক নিরপরাধ মানুষ। আর ক্ষোভে-বিদ্রুপে-সমালোচনায় জেরবার পুলিশ ভেবেছে প্রতিটি মুহূর্তে, এর শেষ কোথায়? কী আছে শেষে?

‘শেষ কোথায়’-এর ভাবনার মাঝেই সপ্তম ঘটনা। অকুস্থল, ফের মুচিপাড়া থানা এলাকা। এবার বৈঠকখানা রোড। শিকার এবার তেগা রাই নামের এক অনূর্ধ্ব তিরিশ যুবক। বাড়ি বাড়ি দুধ সরবরাহ করার কাজ করতেন। রাত কাটাতেন ফুটপাথে। রক্তাক্ত অবস্থায় অচৈতন্য পড়ে থাকা তেগাকে যখন পাওয়া গেল রাত তিনটে-সোয়া তিনটে নাগাদ, তখনও প্রাণ আছে দেহে। পাথরের আঘাতে মাথার বাঁ দিক ভেসে যাচ্ছে রক্তে। চুঁইয়ে পড়ে লাল হয়ে গেছে ফতুয়া। তড়িঘড়ি নিয়ে যাওয়া হল মেডিক্যাল কলেজে। জ্ঞান তো হারিয়েইছিলেন, প্রাণ হারাতে লাগল আটচল্লিশ ঘণ্টা। সাত নম্বর খুন।

প্রথমটা ৪ জুন। জোড়া খুন ১৯ জুলাই। তারপর ২৭ অগস্ট, ৬ সেপ্টেম্বর, ৮ সেপ্টেম্বর, ১১ সেপ্টেম্বর। একশো দিনের মধ্যে একই ‘মোডাস অপারেন্ডি’-তে সাত-সাতটা খুন। হয়নি, কখনও এমনটা হয়নি কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে। এতগুলো খুনের পরও ‘লিড’ পেতে ব্যর্থ হয়েছে লালবাজার, এমনটা ঘটেনি কখনও। প্রশ্ন উঠল বিধানসভায়, লোকসভাতেও আলোচিত হল কলকাতা পুলিশের ব্যর্থতা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নিল স্টোনম্যান। বিলেতের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকাতে সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ প্রকাশিত হল কলকাতার মধ্যরাতের সিরিয়াল-কিলারকে নিয়ে।

.

সিরিয়াল-কিলিং। ঠিক কী উপাদানে তৈরি হয় একজন সিরিয়াল-কিলারের অন্তরমহল, সে নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিবিধ গবেষণা হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। কোন ব্যক্তিবিশেষের সিরিয়াল-কিলার হয়ে ওঠার নেপথ্যে কয়েকটি কারণকে সচরাচর নির্দিষ্ট করে থাকেন অপরাধ-বিজ্ঞানীরা।

এক, সম-অনুভূতির অভাব। সহানুভূতির অভাব নয়, অভাব সম-অনুভূতির, পরিভাষায় যাকে আমরা বলি ‘empathy’। মনোজগতে ‘empathy’-র অস্বাভাবিক রকমের অভাব একটা পর্যায়ের পর একজন মানুষকে ‘psychopath’ বা মনোবিকারগ্রস্ত করে তোলে। যে বিকারের বহিঃপ্রকাশ ঘটে কার্যকারণহীন নির্বিচার হত্যায়।

দুই, নিজের প্রতি বহির্বিশ্বের কৌতূহল উৎপন্ন করার উদগ্র বাসনা, পরিভাষায় ‘attention-seeking’।এবং নিজেকে যেনতেনপ্রকারেণ ক্ষমতাবান এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করার মরিয়া প্রবণতা। পরিণতি, জন্ম নেয় বিকার। যে বিকারের উৎস সিংহভাগ ক্ষেত্রে নিহিত থাকে সমস্যাক্লিষ্ট শৈশবে-কৈশোরে। গবেষণালব্ধ তথ্য বলছে, সিরিয়াল কিলারদের অনেকেই নানান যন্ত্রণার শিকার হয়েছে ছোটবেলায়। সে মানসিক হোক বা শারীরিক। কেউ হয়তো ছোট থেকেই সাক্ষী থেকেছে মা-বাবার অশান্ত দাম্পত্যের, সাক্ষী থেকেছে বিচ্ছেদের। কেউ হয়তো প্রাপ্য স্নেহ-ভালবাসাটুকু পায়নি অভিভাবকদের কাছে। কেউ হয়তো আবার শিকার হয়েছে পরিচিত কারও যৌন নির্যাতনের।

তিন, স্রেফ উত্তেজনা আহরণের জন্য খুন। বিজাতীয় আনন্দের জন্য খুন। অন্যকে যন্ত্রণাক্লিষ্ট করার জন্য খুন। লক্ষ্য যেখানে অন্য কিছু নয়, ‘থ্রিল’। সম্পূর্ণ অপরিচিত এবং নিরপরাধ কাউকে যন্ত্রণা দিয়ে শিরা-উপশিরায় বাড়তি অ্যাড্রিনালিনের আমদানি।

আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে ‘সিরিয়াল কিলার’ বলতেই প্রথম যে নামটা উঠে আসে অবধারিত, ‘জ্যাক দ্য রিপার’! যিনি ১৮৮৮ সালে লন্ডনে অন্তত পাঁচজন দেহপসারিণীকে খুন করে শিরোনামে চলে এসেছিলেন রাতারাতি। হইচই পড়ে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে।

নাম আরও করা যায়। যেমন উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরপর ন’টা খুন করা H. H. Holmes কিংবা মোটামুটি সমসময়েই ফ্রান্সে ১১ জন মহিলা এবং শিশুকে উপর্যুপরি খুনের নেপথ্যে থাকা সিরিয়াল-ঘাতক Joseph Vacher, যিনি কুখ্যাত হয়েছিলেন ‘The French Ripper’ নামে।

এ তো গেল বিদেশের কথা। ভারতে? রমন রাঘবের কথা উল্লেখ না করলে অসম্পূর্ণ থেকে

যাবে এই লেখা। ১৯৬৬ থেকে ৬৮–র মধ্যে মুম্বই শহরতলি এবং পুনেতে দু’দফায় অন্তত পঁয়ত্রিশটা খুনের পর গ্রেফতার হয়েছিল এই রমন রাঘব। প্রতিটি খুনেই শিকার ছিল হয় ফুটপাথবাসী, নয় বস্তিতে বসবাসকারী দরিদ্রতম শ্রেণিভুক্ত কেউ। চূড়ান্ত আতঙ্ক গ্রাস করেছিল বাণিজ্যনগরীকে। ধরা পড়ার পর মনোবিদরা রমনের সঙ্গে বহু সময় কাটিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, সে সংশোধনের অযোগ্য মনোবিকারগ্রস্ত। মানসিক অসুস্থতার কথা ভেবেই নিম্ন আদালতের ফাঁসির রায় উচ্চতর কোর্টে বদলে গিয়েছিল যাবজ্জীবন কারাবাসে।

সিরিয়াল-কিলারের আতঙ্ক ফের মুম্বইয়েই ফিরে এসেছিল আটের দশকের মাঝামাঝি। ১৯৮৩ থেকে ’৮৬-র মধ্যে বারোটা খুন হয়েছিল একই কায়দায়। ফুটপাথবাসীদের মাথায় পাথর মেরে। ধরা যায়নি সেই ‘স্টোনম্যান’-কেও। এক ডজন খুনের পর আচমকাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল নিধননাট্য। বারো নম্বরই শেষ।

তা হলে কি সেই ‘স্টোনম্যান’-ই আবির্ভূত ফের কলকাতায়? গোয়েন্দা বিভাগের টিম পাড়ি দিল মুম্বইয়ে, তখনকার খুনগুলোর বিষয়ে আলোচনা করতে। এবং এতসবের মধ্যেই সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’ দেখতে পেল লালবাজার। রাতের শহরের টহলদারি টিমগুলোর একটা শিয়ালদা স্টেশনের কাছ থেকে আটক করল এক সন্দেহভাজনকে।

সন্দেহভাজন তো প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ আটক হচ্ছিল। এক্ষেত্রে উৎসাহিত হওয়ার কারণ? ভবঘুরে প্রকৃতির লোকটির বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ঘুরছিলেন বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিটের পাশে ইতস্তত। পুলিশ আটকেছিল।

—নাম কী আপনার?

—দুনিয়া মালিক।

—মানে?

—দুনিয়া মালিক। মানে দুনিয়ার মালিক।

—ইয়ার্কি মারার জায়গা পাননি? আসল নামটা বলুন।

—নামের আবার আসল-নকল? মা-বাবা নাম রেখেছিল মহম্মদ এক্রাম। কিন্তু ওটা নকল নাম। আসল নাম দুনিয়া মালিক।

—বেশ তো দুনিয়া মালিক, বাড়ি কোথায়? এত রাতে এখানে কেন?

—পুরো দুনিয়াটাই তো আমার বাড়ি। নিজের বাড়িতে ঘুরতে পারব না সাব?

অফিসাররা মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন। ব্যাটা হয় মাথায়-ছিট আধপাগলা, নয় সাতসেয়ানার ক্যাপ্টেন। আন্দাজে ঢিল ছোড়েন এক সাব-ইনস্পেকটর।

—বেশ, বুঝলাম। রাতে থাকেন কোথায়? ঘুমোন কোথায়?

—ঘুমোই না স্যার, ফুটপাথে ফুটপাথে ঘুরি স্যার। দুনিয়ার মালিকের দুনিয়ায় কত লোকের মাথার ওপর ছাদ নেই, রাতে ঘুরে ঘুরে দেখি।

—ঘুরে ঘুরে দেখেন আর পাথর দিয়ে খুন করে বেড়ান, তাই তো?

ভাবলেশহীন উত্তর আসে।

—আমি দুনিয়ার মালিক। কেন খুন করতে যাব স্যার? তবে ফুটপাথে এইভাবে যারা রাত কাটায়, সেটা কোনও বাঁচা হল স্যার? ইয়ে ভি কোই জিন্দেগি হ্যায়?

—গাড়িতে উঠুন।

ভোররাত থেকে লালবাজারে শুরু হল ‘দুনিয়া মালিক’-কে ম্যারাথন জেরা। কথাবার্তা কখনও এলোমেলো, অসংগতিপূর্ণ, কখনও সামান্য হলেও স্বাভাবিক। জানা গেল, বিহারের সীতামারি জেলার বাসিন্দা এই মহম্মদ এক্রাম। কলকাতায় এসেছিলেন বাবার সঙ্গে বছর কুড়ি-পঁচিশ আগে। বাবা মহম্মদ ঈশা দিনমজুরের কাজ করতেন এদিক-ওদিক। বাবা মারা যাওয়ার পর ভবঘুরে জীবনযাপন। এই লোক স্টোনম্যান?

জেরাপর্ব শেষে নগরপাল বৈঠক সারেন গোয়েন্দাপ্রধানের সঙ্গে।

—তোমার ‘গাট ফিলিং’ কী বলছে?

নগরপালের প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দাপ্রধানকে দ্বিধাগ্রস্ত শোনায়।

—কনফেস তো করেনি এখনও। তবে ‘ক্লিন চিট’ দেওয়ার মতো জায়গাতেও নেই আমরা। আরও ডিটেইলড ইন্টারোগেশন দরকার স্যার……

—সে তো দরকারই। মেন্টালি আনস্টেবল একটু, বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু সিরিয়াল কিলারদের ‘মেন্টাল ইনস্টেবিলিটি’ থাকেই নানা ধরনের। এই যে ‘দুনিয়া মালিক’ বলছে, একটা ‘ইমাজিনড সেন্স অফ পাওয়ার’ থেকে বলছে।

—আর সেই ‘পাওয়ার’ বা ক্ষমতা ফলানোর বোধ থেকেই এভাবে পরের পর খুন….

—অসম্ভব নয়… একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

—কিন্তু স্যার… লোকটার চেহারাটা খেয়াল করেছেন?

—হ্যাঁ, আই ওয়াজ় কামিং টু দ্যাট… ওই ল্যাকপেকে চেহারায় পনেরো-কুড়ি কেজি ওজনের পাথর তুলে আছড়ে মারবে… এটা ঠিক…

—কিন্তু এমনও তো হতে পারে, আমরা স্টোনম্যান-স্টোনম্যান ভাবছি, আসলে এটা একটা গ্যাং। স্টোনম্যান নয়, ‘স্টোনমেন’। একাধিক লোক মিলে প্ল্যান করে কাজটা করছে।

—আমার যদিও মনে হচ্ছে একজনই, তবে তুমি যা বলছ, নট এন্টায়ারলি ইমপসিবল। যা অবস্থা এখন, সব অপশনই মাথায় রেখে এগোতে হবে। যেখানে যেখানে খুনগুলো হয়েছে, তার কাছাকাছি তো কোনও পাথরের স্তূপ ছিল না। যে মেরেছে, পাথরটা সঙ্গে নিয়ে এসেছে। বা আগে থেকে কাছেপিঠে এনে রেখেছে।

—ফুটপাথ বলে আরও সমস্যা হচ্ছে স্যার। ধুলোবালি আর ‘একস্টারন্যাল এলিমেন্টস’-এ একটা কেসেও কোনও ডেভেলপ করার মতো ফুটপ্রিন্টসও পাওয়া যায়নি। পেলে অন্তত এই ‘দুনিয়া মালিকের’ সঙ্গে মেলানো যেত। কোথাও কোনও চিহ্ন রেখে যাচ্ছে না লোকটা।

—যা নেই, তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। আপাতত এই মহম্মদ এক্রামের একটা ‘সাইকোলজিক্যাল এগজ়ামিনেশন’ দরকার। মনস্তত্ত্ববিদদের পরামর্শ নেওয়াটাই জরুরি হয়ে পড়ছে।

—রাইট স্যার। কালই ব্যবস্থা করছি। কিন্তু তাতেও কি ডেড শিয়োর হওয়া যাবে… আই মিন… যতক্ষণ না নিজে কনফেস করছে…

—দেখাই যাক… আর মনে রেখো, ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘The proof of the pudding is in the eating’… ডেডশিয়োর হওয়ার ওটাই উপায়। এই ‘দুনিয়া মালিক’-ই যদি স্টোনম্যান হয়, তা হলে সাত নম্বর খুনটাই লাস্ট খুন। আর হবে না। যদি হয়, বুঝতে হবে, এক্রামকে মিথ্যে সন্দেহ করছি আমরা।

—স্যার…

নগরপালের ঘর থেকে বেরনোর পর গোয়েন্দাপ্রধানের কানে বাজতে থাকে কথাগুলো। এ-ই যদি স্টোনম্যান হয়, তা হলে শেষ খুনটাই ‘শেষ’। না হলে বুঝতে হবে…

না হলে যা বুঝতে হবে, সেটাই বোঝা গেল অক্টোবরের ১৯ তারিখ। সপ্তম খুনের এক মাস আট দিন পরে যখন গোয়েন্দাপ্রধানের কাঁচা ঘুমে ছেদ ঘটাল মধ্যরাতের ফোন।

—ক্রিং ক্রিং!!

—নমস্কার স্যার, আবার!

—মানে?

—আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজের কাছে স্যার… সিইএসসির ট্রান্সফর্মার আছে একটা…

—তুমি শিয়োর? আই মিন মোডাস অপারেন্ডি…

—হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্যার… যা শুনলাম… জাস্ট দা সেম…

—তা হলে আশঙ্কাই সত্যি হল? গত এক মাসের খচখচানিটাই দেখা দিল রূঢ়তম বাস্তব হয়ে? ‘আবার সে এসেছে ফিরিয়া?’

‘ফিরিয়া যে এসেছে’, মৃতদেহ দেখার পর সন্দেহ ছিল না আর একচিলতেও। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-দুশ্চিন্তার ত্র্যহস্পর্শ ফের গ্রাস করল লালবাজারকে। এবার?

তদন্তের বিজ্ঞান বলে, অপরাধীকে ধরতে হলে অপরাধীর মনের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করো। এবং ভাবার চেষ্টা করো অপরাধীর মতো করে। কে স্টোনম্যান? ‘কে’, সেটা পরে হবে। আগে চিন্তা করা দরকার, কী ভাবে?

স্টোনম্যানের ভাবনা কোন খাতে বইছে, সেটা নিয়ে মাথা খাটানো বেশি জরুরি। কীভাবে পুলিশকে, ফুটপাথবাসী রাত-জাগা জনতার চোখে ধুলো দিয়ে নিরীহ মানুষকে মেরে যাচ্ছে লাগাতার? আগে থেকেই জরিপ করে নিচ্ছে, পুলিশ প্রহরা কোথায় কোথায়? তারপর খুঁজে নিচ্ছে নজরদারিহীন নির্জন কোনও ফুটপাথ? এটা বুঝে গেছে, হাজার হাজার ফুটপাথবাসীকে সারারাত পাহারা দেওয়া পুলিশের পক্ষে অসম্ভব? সেই মতো শিকার খুঁজে নিচ্ছে? এবং শিকার চিহ্নিত করার পর সম্ভাব্য শিকারের আশেপাশেই কি শুয়ে থাকছে পাথর নিয়ে? আর রাত গভীর হলে আঘাত হানছে নির্মম নৃশংসতায়?

আক্ষরিক অর্থেই দিশেহারা পুলিশ তখন যেভাবে পারল চেষ্টা করল অপরাধীর মনের হদিশ পাওয়ার। এবং ঘটতে থাকল অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড কিছু। স্টোনম্যান মামলার তদন্তের সঙ্গে শুরু থেকে ওতপ্রোত জড়িয়ে ছিলেন, এমন একজন অফিসারের স্মৃতিচারণ তুলে দিলাম।

‘তখন পাগল পাগল লাগছিল নিজেদের। যার যা মনে হচ্ছে করছিলাম। রাতের পর রাত জাগছি, ভোরে ফিরছি। কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে সারাদিন অফিস করে ফের রাতে বেরিয়ে পড়ছি। মাথা কাজ করছিল না বেশিরভাগ সময়। আট নম্বর খুনের পর এক রাতে যখন টহল দিচ্ছি শিয়ালদা স্টেশন এলাকার আশেপাশের ফুটপাথে, হঠাৎ দেখলাম চাদরমুড়ি দিয়ে একজন মুখ বার করে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। তাকানোটা সন্দেহজনক। আরে এ ব্যাটা জেগে আছে কেন? ওভাবে আশেপাশে তাকাচ্ছেই বা কেন?

আমি করলাম কী, সোজা গিয়ে দাঁড়ালাম চাদরমুড়ি দেওয়া লোকটার সামনে। চাদরটা টেনে সরিয়ে দিলাম গা থেকে। টর্চ ফেললাম মুখে। ‘কে রে তুই?’ জিজ্ঞেস করার আগেই থমকে গেলাম চেহারাটা দেখে। আরে! এ তো বহুদিনের চেনা মুখ। ব্যাচমেট। একই সঙ্গে পুলিশ ট্রেনিং কলেজে কাটিয়েছি এক বছর। তারপর কর্মসূত্রে কলকাতা পুলিশে দীর্ঘদিনের সহকর্মী, অভিন্নহৃদয় বন্ধু। এ তো ওসি মুচিপাড়া! এখানে কী করছে?

—কী আর করব বল? আমার এলাকাই তো স্টোনম্যানের বেশি পছন্দ। কী আর করব? শুয়ে আছি ফতুয়া-পায়জামা পরে। যদি ধরতে পারি হাতেনাতে! শুধু আমি নয়, বাঁদিকে চার-পাঁচটা লোকের পরে আমার এক সাব-ইনস্পেকটর শুয়ে আছে।

—এভাবে সারারাত থাকবি?

—উপায় কী আর? চাকরিটা বাঁচাবার শেষ চেষ্টা করছি আর কী! তবে শুধু আমি নয়। মৌলালিতে যা, দেখবি ওসি এন্টালিও শুয়ে আছে ফুটপাথে।

—অ্যাঁ! সে কী রে!

—আরে ভাই হ্যাঁ! তুইও গিয়ে বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের ফুটপাথে অন্যদের সঙ্গে শুয়ে পড়। রাস্তায় ঘুরে তো কিছু হল না, হবেও না আর। তাই স্ট্র্যাটেজি পালটেছি।’

স্ট্র্যাটেজি অবশ্য স্টোনম্যানও পালটে ফেলছিল নিঃশব্দে। চৌঠা জুন থেকে এগারোই সেপ্টেম্বরের মধ্যে সাতটা খুন। গড় ধরলে প্রতি দু’সপ্তাহে একটা। মুচিপাড়ায় অষ্টম খুনটা ঘটেছিল সপ্তমের একমাস আটদিন পরে, যখন পুলিশ সামান্য স্বস্তির অবকাশ পেয়েছে, এবং মনে করছে স্টোনম্যান পর্বের হয়তো ইতি।

নয় নম্বর খুনটা করতেও মাসখানেকের বেশিই সময় নিল স্টোনম্যান। নজরদারি আর রাতপাহারা জারি থাকলেও যখন স্বাভাবিক নিয়মেই শৈথিল্য এসেছে কিছুটা, ঠিক তখন, নভেম্বরের ২৬ তারিখ। ফের শিয়ালদা ফ্লাইওভারের সাবওয়েতে, নীলরতন সরকার হাসপাতাল থেকে ক্রিকেটবল-ছোড়া দূরত্বে। পাথরের আঘাতে ফের এক বছর চল্লিশের অজ্ঞাতপরিচয় ফুটপাথবাসীর ভবলীলা সাঙ্গ।

ফের শুরু তেড়েফুঁড়ে নজরদারি, এবং এবার দু’মাস কোনও সাড়াশব্দ করল না স্টোনম্যান। নিজের উপস্থিতি জানান দিল বছর পার করে, ১৯৯০-এর ২৯ জানুয়ারি, আচমকা। প্রফুল্ল সরকার ষ্ট্রিটে আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসের কাছের ফুটপাথে শায়িতা এক মহিলার মাথা চুরমার হয়ে গেল পাথরের আছড়ানিতে। মৃতার বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি, নাম শান্তি মান্না। স্বামী মারা গিয়েছেন বেশ কিছুদিন হল। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, পেশায় যৌনকর্মী। বেশিরভাগ রাত ফুটপাথেই কাটাতেন।

স্টোনম্যানের ধরা পড়ার আশা তখন প্রায় একরকম ছেড়েই দিয়েছে পুলিশ। মিডিয়াও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে পুলিশি ব্যর্থতা নিয়ে নিউজ়প্রিন্ট খরচা করতে করতে। ‘কে স্টোনম্যান?’, ‘কেন স্টোনম্যান?’ এসব প্রশ্নের থেকে তখন ঢের বেশি কৌতূহল পরের খুনটা নিয়ে। এরপর কবে-কখন-কোথায়?

খুন নম্বর এগারোয় চমকে দিল স্টোনম্যান। প্রথম দশটা খুন হয়েছিল মধ্য কলকাতায়। নজরদারি কেন্দ্রীভূত ছিল বউবাজার-মুচিপাড়া-বড়বাজার-পোস্তা-জোড়াসাঁকো-এন্টালি অঞ্চলে। একাদশতম খুনে নিজের অপরাধ-বৃত্ত বিস্তৃত করল স্টোনম্যান। পা রাখল দক্ষিণ কলকাতায়। দশম খুনের ঠিক একুশ দিন পরে। ২০ ফেব্রুয়ারি।

বেকবাগানের মোড়ে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডের পশ্চিম ফুটপাথে আবিষ্কৃত হল আরেক হতভাগ্যের দেহ। যথারীতি ভারী পাথর দিয়ে মাথাটা থেঁতলানো। নিহতের স্থানীয় নাম ‘মাস্তান’, বয়স বছর চল্লিশের কাছাকাছি। ভিক্ষা করেই দিনযাপন করতেন।

আগের দশটা খুনের সঙ্গে তফাত বলতে, পদচিহ্ন রেখে গেছে স্টোনম্যান। খুনে ব্যবহৃত পাথরটা পড়ে ছিল মৃতদেহ থেকে চার গজ দূরে।একটা ড্রেনের মধ্যে। খুনের পরে আততায়ী স্পষ্টতই পাথরটাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। এবং সরানোর সময়ই মৃতের রক্তস্রোতে পা পড়ে। ফুটপ্রিন্টস সংগ্রহ করতে ছুটে এলেন বিশেষজ্ঞরা বাঁ পায়ের ছাপ পাওয়া গেল তিনটে। ডান পায়ের ন’টা। পায়ে জুতো ছিল না। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল খানিক। বাঁ পায়ের তিনটে ছাপ পড়েছে অস্পষ্ট, বাকি মিলিয়ে গেছে। ডান পায়ের ছাপগুলো অক্ষত এবং মোটামুটি ‘ডেভেলপযোগ্য’।

বিশেষজ্ঞরা পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে দুটো সিদ্ধান্তে এলেন। এক, স্টোনম্যানের চেহারা মাঝারি গড়নের হওয়ারই সম্ভাবনা। খুব লম্বা-চওড়া সম্ভবত নয়। দুই, ঘাতকের ডান পায়ের বুড়ো আঙুল অস্বাভাবিক লম্বা।

কিন্তু এটুকু ‘লিড’ আর কতটাই বা কাজে আসবে? ধরা পড়লে তবেই না পায়ের ছাপ মিলিয়ে নিঃসংশয় হওয়ার প্রশ্ন।

দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন গোয়েন্দা বিভাগের পোড়খাওয়া অফিসাররা, অসংখ্য জটিল মামলার সমাধান যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে করে এসেছেন ঈর্ষণীয় পেশাদারি দক্ষতায়। এবং সর্বগ্রাসী হতাশা মনের দখল নিলে একটা পর্যায়ের পর যা স্বাভাবিক, যুক্তি-বুদ্ধিকে লাস্ট বেঞ্চে পাঠিয়ে দিয়ে সামনের সারিতে কেউ কেউ জায়গা দিলেন অন্ধ বিশ্বাসকে।

ওসি হোমিসাইড স্বয়ং ডেকে পাঠালেন এক পরিচিত জ্যোতিষীকে। জানতে চাইলেন, কবে হতে পারে এই যন্ত্রণামুক্তি? কবে ধরা পড়বে স্টোনম্যান? কেমন দেখতে হতে পারে স্টোনম্যান? কেমন হতে পারে চালচলন?

জ্যোতিষী বিস্তর গণনা-টননা করে রায় দিলেন, সুসংবাদ আসন্ন। স্টোনম্যান ধরা পড়বে শীঘ্রই। জানালেন আরও, স্টোনম্যান বকের মতো লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটে। এমন হাঁটার ধরন যাঁদের রাতের শহরে, তাদের চিহ্নিত করতে পারলে রহস্যভেদ নাকি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

বিচারবুদ্ধিকে বন্ধক রাখলে যা ঘটতে পারে, তার বিবরণী থাকুক এক প্রত্যক্ষদর্শী অফিসারের বয়ানে।

‘নিয়মমাফিক সারারাত টহল দিয়ে ফিরছিলাম লালবাজারে। সঙ্গী এক সাব-ইনস্পেকটর আর দুই কনস্টেবল। গাড়ি যখন আকাশবাণী পেরিয়ে এগোচ্ছে রাজভবনকে ডান হাতে রেখে, হঠাৎ সঙ্গী সাব-ইনস্পেকটরের পরিত্রাহি চিৎকারে হতচকিত হয়ে ব্রেক কষল ড্রাইভার। ‘আরে, থামান থামান। ওই তো!’

‘ওই তো!’ মানে? মানে বোঝার আগেই এক লাফে গাড়ি থেকে নেমে দৌড় দিয়েছে তরুণ সহকর্মী, হাইকোর্টের সামনে শরৎ বসুর স্ট্যাচুর দিকে আপ্রাণ দৌড়ে জাপটে ধরেছে একজনকে। যাঁর মাঝারি গড়ন, গায়ে চাদর। এবং যিনি অতর্কিত আক্রমণে হতচকিত হয়ে চিলচিৎকার জুড়েছেন, ‘বাঁচাও, মার ডালা……!’

কী হল ব্যাপারটা? গাড়ি থেকে নেমে আমরাও ছুটলাম। কাছে গিয়ে দেখি, তরুণ সাব-ইনস্পেকটরের চোখেমুখে উত্তেজনা ঠিকরে বেরচ্ছে, হাঁফাতে হাঁফাতে বলছে, ‘পেয়েছি স্যার! এই ব্যাটাই স্টোনম্যান! কেমন বকের মতো লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটছিল! আমি ঠিক খেয়াল করেছি। বারে বারে ঘুঘু তুমি…’

থামিয়ে দিয়ে বকের মতো পা ফেলে হাঁটা ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকালাম। এঁকে তো চিনি!

পোদ্দার কোর্টের কাছে একটা হার্ডওয়ারের দোকান চালান এই অবাঙালি ভদ্রলোক। নিতান্ত নিরীহ মানুষ। সকালে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। দোষের মধ্যে, একটু লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটেন। বকের মতো।

ক্ষমা-টমা চেয়ে যখন ভদ্রলোককে বিদায় করছি চা খাইয়ে, তখনও তরুণ সহকর্মীর চোখেমুখে অবিশ্বাসের জ্যামিতি। এ-ও নয়?’

এ তো নয়ই, এখনও পর্যন্ত সন্দেহের বশে আটক হওয়া কেউই যে নয়, প্রমাণ মিলল বারো নম্বর খুনে। যেটা ঘটল এগারো নম্বরের ঠিক পাঁচদিন পরে, ২৬ ফেব্রুয়ারি। এবং এবার সমস্ত হিসেব উলটে দিয়ে ঘটনাস্থল তৃতীয় এবং নবম খুনের ঘটনাস্থলের গা ঘেঁষেই, শিয়ালদা ফ্লাইওভারের সাবওয়ের কাছে। ফের মুচিপাড়া থানা এলাকায়। একই জায়গায় সাধারণত বারবার আঘাত হানে না সিরিয়াল কিলাররা। সেই ট্র্যাডিশন বদলে দিল স্টোনম্যান। নিহত এবার এক পনেরো-ষোলোর হতভাগ্য কিশোর, যার পেশা বলতে ছিল স্টেশন-চত্বরে ভিক্ষাবৃত্তি। খুনের সময় মধ্যরাতের কিছু পরে। পদ্ধতি এক। খুনের অস্ত্রও এক। মৃতদেহের কয়েক হাত দূরে পড়ে থাকা রক্তলাল পাথর।

দুঃসময় চললে যা হয়, উটকো উপদ্রবেরও শেষ ছিল না তখন। এক রাতে হেস্টিংস থানা এলাকায় যেমন রাত আড়াইটে নাগদ দ্বিতীয় হুগলি সেতুতে ওঠার মুখে এক যুবককে বসে থাকতে দেখল ‘পেট্রোলিং টিম’। বয়স তিরিশের নীচে। পরে আছেন দামি টি-শার্ট, ব্র্যান্ডেড জিন্‌স। সুদর্শন চেহারা। সঙ্গে একটা ব্যাগ।

—এখানে কেন? এত রাতে কী করছেন?

—স্টোনম্যান-কে ধরতে বেরিয়েছি। সপ্তাহে অন্তত দুটো রাতে নিয়মিত বেরই। ইউ ক্যান কল মি ‘stoneman catcher’.

বোঝো! স্টোনম্যানকে ধরতেই নাকানিচোবানির একশেষ। তার উপর স্টোনম্যানকে ধরতে বেরনো শখের গোয়েন্দাদেরও ধরতে হলে তো দুর্গতির বত্রিশকলা পূর্ণ। যুবকের সঙ্গের ব্যাগে পাওয়া গেল স্টিফেন হকিংয়ের ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’। এ ছাড়াও নাইলনের দড়ি-ক্ষুর-ছুরি, রুল, চওড়া বেল্ট এবং আরও কিছু ওষুধ টুকিটাকি।এগুলো কেন?

—বাহ্! স্টোনম্যানকে ধরতে গেলে এগুলো লাগবে না? তা ছাড়া স্টোনম্যানের আক্রমণে আহত কারও চিকিৎসাতেও তো লাগতে পারে।

কী আর বলার থাকে এর পর, নাম-ঠিকানা জেনে গাড়িতে তুলে দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসা ছাড়া? বাড়িতে গিয়ে জানা গেল, যুবক মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন বেশ কিছুকাল। যুবকের মা-কে হাতজোড় করে হেস্টিংসের ওসি বলে এলেন, ‘মাসিমা, আমরা খুবই চাপের মধ্যে আছি। ছেলেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাতে বাড়িতেই রাখার চেষ্টা করবেন প্লিজ়।’ আর যুবককে দিয়ে এলেন সহৃদয় পরামর্শ, ‘আমরা আর একটু চেষ্টা করি স্টোনম্যানকে ধরতে, না পারলে আপনার সাহায্য চাইব, কেমন?’

ন’মাসের মধ্যে এক ডজন খুন। কিনারাসূত্র অধরা। চেষ্টা তো হয়েছে সর্বস্ব নিংড়ে দিয়ে। কী করার থাকতে পারে আর? কিন্তু কে আর শুনতে চায় ব্যর্থ চেষ্টার ইতিবৃত্ত, কে শুনতে চায় ‘ভাল খেলিয়াও পরাজিত’-র কষ্টকথা? আসল তো ‘ফলেন পরিচয়তে।’ পুলিশের কাজ অপরাধীকে ধরা। সেটাই যখন পারছে না ন’মাস ধরে, কার সময় আছে ক্লান্তি-শ্রান্তি-পরিশ্রমের সাতকাহন শোনার?

রাজ্য প্রশাসন যখন পৌঁছে গিয়েছে অস্বস্তির চরমসীমায়, যখন কলকাতা পুলিশের সর্বস্তরে ঢালাও রদবদলের আলোচনা জমাট বাঁধছে রাইটার্সের অন্দরমহলে, তখনই, মার্চের প্রথম সপ্তাহের এক মধ্যরাতে ওসি এন্টালির ওয়ারলেস বার্তা ছড়িয়ে পড়ল লালবাজারের কন্ট্রোল রুম মারফত, ‘স্টোনম্যান কট রেড হ্যান্ডেড নিয়ার শিয়ালদা, বিইং ব্রট টু লালবাজার!’

স্টোনম্যান ধরা পড়েছে হাতেনাতে? অবশেষে? বারো পেরিয়ে তেরো নম্বর খুনের বেলায় খেল খতম? আনলাকি থার্টিন?

ফোন পাওয়া মাত্র ঊর্ধ্বশ্বাসে লালবাজার ছুটলেন গোয়েন্দাপ্রধান সহ ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সমস্ত অফিসার। জানানো হল সিপি-কে। যিনি জানালেন, যত দ্রুত সম্ভব রওনা দিচ্ছেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছিলেন ওসি হোমিসাইড। গোয়েন্দাপ্রধানকে দেখেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান ওসি, ‘আসুন স্যার, বসুন।’

বসেন না গোয়েন্দাপ্রধান। একদৃষ্টে স্থির তাকিয়ে থাকেন চেয়ারে বসা পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই স্মিতহাস্য মাঝারি গড়নের লোকটির দিকে। এ-ই স্টোনম্যান? এই লোকটা? যে শুধু লালবাজার নয়, পুরো শহরের ঘুম কেড়ে নিয়েছে গত নয় মাসে, সেই জুন থেকে? শান্তভাবে প্রশ্ন করেন গোয়েন্দাপ্রধান।

—কী নাম আপনার?

—কালীপদ দাস।

—বাড়ি কোথায়?

—রায়দিঘি। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা।

—কী করেন?

—রাজ্য সরকারের কর্মচারী স্যার।

—কোন ডিপার্টমেন্ট?

—ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ।

—পোস্টিং কোথায়?

—রানিবাঁধ, বাঁকুড়া। কিন্তু স্যার, আপনারা আমাকে ধরে এনেছেন কেন? কী করেছি আমি?

আর থাকতে পারেন না ওসি এন্টালি, ডিসি-ডিডি-র জেরার মাঝেই চেঁচিয়ে ওঠেন উত্তেজিতভাবে, কী করেছেন মানে? জানেন না কী করেছেন, জানেন না কী করতে যাচ্ছিলেন? হাতেনাতে ধরেছি স্যার, আর এখন বলছে কী করেছি…

হাতের ইশারায় ওসি-কে থামান গোয়েন্দাপ্রধান।

—অত উত্তেজনার কিছু নেই। কীভাবে ধরলেন এঁকে?

—স্যার, রোজকার মতো শিয়ালদা স্টেশনের আশেপাশে টহল দিচ্ছিলাম। ঘুরে দেখছিলাম ফুটপাথগুলো। বৈঠকখানা বাজারের কাছের ফুটপাথে চোখে পড়ে এঁকে। এক মহিলা গোঁ গোঁ করে চিৎকার করছিলেন, আর ঠিক তার পাশে শুয়ে থাকা এই ভদ্রলোক একটা পাথর দিয়ে মারতে যাচ্ছিলেন মহিলার মাথায়। ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরেছি। আর এখন বলছে, কী করেছি?

—পাথরটা কোথায়?

—এই যে স্যার…

একটা প্লাস্টিকের মোড়ক থেকে যেটা বার করলেন ওসি, সেটা পাথর নয়। খুব বেশি হলে একটু বড় সাইজ়ের থান ইট। আগের খুনগুলোয় একটাতেও ইটের ব্যবহার হয়নি। বারোটা খুনেরই অস্ত্র ছিল বড় পাথর, অন্তত পনেরো থেকে কুড়ি কেজি ওজনের। এই ইট দিয়ে মাথায় মারলে আঘাত লাগবে ঠিকই, কিন্তু প্রাণহানি একেবারেই নিশ্চিত নয়। তা হলে?

ফের জেরা শুরু করেন গোয়েন্দাপ্রধান।

—কলকাতায় কী করতে এসেছিলেন? পোস্টিং তো বললেন রানিবাঁধে। অফিসের কাজে এসেছিলেন?

—হ্যাঁ স্যার… তবে সেটা আসল কারণ নয়।

—তবে?

—ভাষণ শুনতে এসেছিলাম।

—ভাষণ মানে? কার ভাষণ?

—সুভাষবাবুর। ওঁর পরের সভাটা কবে কোথায় বলবেন প্লিজ়?

—সুভাষবাবু মানে?

—সুভাষবাবু স্যার! সুভাষচন্দ্র বসু। নেতাজি!

—নেতাজির ভাষণ?

—হ্যাঁ স্যার, শিয়ালদা স্টেশনের সামনে আজ নেতাজির সভা ছিল তো! অনেকদিনের ইচ্ছে, সামনে থেকে ওঁর ভাষণ শুনব। জীবন সার্থক হল আজ স্যার। ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও…… আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব…’ শুনতে শুনতে অন্য জগতে চলে যাচ্ছিলাম স্যার। গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল।

—বেশ তো! তা ভাষণ শেষ হওয়ার পর ফিরে গেলেন না কেন? শিয়ালদার ফুটপাথে রাত কাটাবেন বলে ঠিক করে এসেছিলেন?

—না না, তা কেন হবে স্যার? মিটিং শেষই তো হল রাত সাড়ে আটটায়। ট্রেনের গণ্ডগোল ছিল আজ। ফিরতে পারলাম না। ভাবলাম ভোরে ফিরব। রাতটা থেকে যাই রাস্তায়। এদিক-সেদিক ঘুরে ফুটপাথে শুয়ে পড়লাম। সবে ঘুমটা এসেছে, গোঁ গোঁ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি এক মহিলা উঠে বসে আমাকে ঠেলছে। এমন আওয়াজ করছে মুখ দিয়ে, বাকিরাও জেগে গেল। আমি তখন থামানোর জন্য পাশে পড়ে থাকা ইট তুলে ভয় দেখাচ্ছিলাম, যাতে চুপ করে যায়…

কথার মাঝপথে ফের থামিয়ে দেন ওসি এন্টালি, ‘গল্প দিচ্ছে স্যার। মহা শয়তান! নেতাজির ভাষণ শুনতে এসেছিল! ইয়ার্কি মারার জায়গা পায়নি! কানের গোড়ায় দুটো দিলেই…’

ওসি এন্টালির দিকে এবার কড়া দৃষ্টিতে তাকান গোয়েন্দাপ্রধান, ‘আপনি থামবেন? আমি কথা বলছি তো!’

কালীপদকে নিয়ে লালবাজার থেকে গাড়ি রওনা দিল শিয়ালদায়, যেখান থেকে ওসি এন্টালি ধরেছিলেন ‘হাতেনাতে’। ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়েছে উল্কাগতিতে, ওই মাঝরাতেও। ‘স্টোনম্যান’ ধরা পড়েছে! গোয়েন্দাপ্রধানের নেতৃত্বে যখন টিম পৌঁছল শিয়ালদায়, ভিড় জমে গেছে সাংবাদিকদের। ভিড় জমে গেছে অন্তত শ’তিনেক কৌতূহলী জনতার। কন্ট্রোল রুম থেকে বাড়তি ফোর্স পাঠানো হয়েছে পরিস্থিতি আন্দাজ করে।

তথ্যতালাশে জানা গেল, কালীপদ মিথ্যে বলেননি। সহজেই চিহ্নিত করা গেল সেই মহিলাকে, যাকে মারতে গিয়েছিলেন কালীপদ। স্থানীয়রা জানালেন, বছর তিরিশের ওই মহিলা জন্মাবধি মূক ও বধির। সম্পূর্ণ অচেনা এক পুরুষ পাশে শুয়ে আছেন, এটা হঠাৎ আবিষ্কার করার পর আতঙ্কে গোঁ গোঁ করতে থাকেন। সেই আওয়াজে অন্য দু’-তিনজনেরও ঘুম ভেঙে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে মিলে গেল কালিপদর বয়ান।

‘নেতাজি’-র সভা? সেদিন একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সভা সত্যিই ছিল শিয়ালদা চত্বরে। শেষ হয়েছিল রাত আটটার পর। এবং সত্যিই সেদিন যান্ত্রিক গোলযোগে রাত সোয়া এগারোটা অবধি শিয়ালদা লাইনে ট্রেন বন্ধ ছিল।

লোকটা তা হলে গল্প বানাচ্ছে না? স্রেফ মনোবিকার গ্রস্ত? ভোরেই দুটো টিম রওনা দিল রায়দিঘিতে কালীপদর বাড়িতে এবং রানিবাঁধের অফিসে। বিস্তর খোঁজখবর করে যা জানা গেল, এরকম।

যখন যুবক, সবে চাকরিতে ঢুকেছেন, তখন থেকেই মাথার ব্যামো দেখা দিয়েছিল কালীপদর। কখনও একেবারে স্বাভাবিক আচরণ করতেন, কখনও আবার চলে যেতেন অন্য দুনিয়ায়। ‘হ্যালুশিনেশনস’ হত, টাইমমেশিনে পিছিয়ে গিয়ে নিজেকে কখনও ভাবতেন আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্য, কখনও বা বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনানী।

ডাক্তারবদ্যি দেখিয়েছিলেন বাড়ির লোকেরা। উন্নতি হয়নি বিশেষ। অফিসে হয়তো এক সপ্তাহ মন দিয়ে কাজ করলেন আর পাঁচজন সহকর্মীর সঙ্গে, হঠাৎ পরের সপ্তাহে কাউকে কিছু না বলে দুম করে চলে গেলেন কলকাতা বা অন্য কোথাও। বাড়ির এবং অফিসের লোকেরা ক্রমে মানিয়ে নিয়েছিলেন এই খ্যাপাটে স্বভাবের সঙ্গে।

অফিসের হাজিরাখাতা খুঁটিয়ে দেখা হল গত ন’মাসের। খোঁজ নেওয়া হল গ্রামের বাড়িতেও, খুনগুলোর সঙ্গে দিন মিলিয়ে মিলিয়ে। এবং দেখা গেল, আগের খুনগুলোর দিন হয় অফিস করেছিলেন, নয় বাড়িতে ছিলেন। কোনওভাবেই কলকাতায় আসার সম্ভাবনা ছিল না।

আরও নিঃসংশয় হতে নেওয়া হল পায়ের ছাপ। মিলল না বেকবাগানের খুনের জায়গার থেকে সংগৃহীত ফুটপ্রিন্টের সঙ্গে। না, ইনি নন। স্টোনম্যান অধরাই।

এবং অধরাই রয়ে গেল কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে দগদগে ক্ষতচিহ্ন রেখে। তেরো নম্বর খুনটা আর হয়নি, কে জানে কীভাবে, হঠাৎই থেমে গিয়েছিল রাতের সিরিয়াল-কিলিং। ‘স্টোনম্যান’ কে, সেই রহস্যকে রহস্যাবৃতই রেখে।

কে ছিল স্টোনম্যান? ধরতে পারিনি আমরা। জানতে পারিনি আমরা। যেমন জানতে পারিনি, ‘স্টোনম্যান’ না ‘স্টোনমেন’? এক, না একাধিক? একক বিকার, না কোন চক্রের অঙ্গুলিহেলন? তবে স্বাভাবিক বুদ্ধি যা বলে, তার সঙ্গেই সহমত ছিলেন তদন্তকারী অফিসারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ। ‘স্টোনম্যান’ একজনই ছিল। খুনগুলো করে মনোবিকার চরিতার্থ করা ছাড়া কোনওরকম জাগতিক লাভ হয়নি ঘাতকের। একাধিক সদস্যবিশিষ্ট কোনও চক্রের জড়িত থাকার সম্ভাবনা এই জাতীয় সিরিয়াল-হত্যায় ক্ষীণতমই।

বলা হয়, অপরাধী সে যতই ক্ষুরধার মস্তিষ্কের হোক না কেন, হোক না যতই ধুরন্ধর, কিছু না কিছু চিহ্ন ছেড়ে যায়ই কোথাও না কোথাও, যা মৃত্যুবাণ হয়ে দাঁড়ায় ভবিষ্যতে, আইন যার উপর ভর দিয়ে পৌঁছে যায় অপরাধীর দোরগোড়ায়। বলা হয়, ‘পারফেক্ট ক্রাইম’ বলে নাকি কিছু হয় না। ভুল। হয়, পারফেক্ট ক্রাইমও হয়।

স্টোনম্যান জানিয়েছিল।

1 Comment
Collapse Comments

সুপ্রতীমবাবুর কাছে অনুরোধ, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কিছু অমিমাংসিত মামলার উপর পরবর্তীতে একটি বই প্রকাশিত করুন। যেমন, দেবশ্রী -সত্যনারায়ণ অন্তর্ধান, সঞ্জীব-তীর্থঙ্কর হত্যা, বিজন সেতু গণহত্যা ইত্যাদি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *