হোয়া-হোয়া-হোয়া আ-আ!

হোয়া-হোয়া-হোয়া আ-আ!

ওরা চারজনে ফিতে ধরে একবার মেঝে, একবার দেয়ালের এপাশ-ওপাশ মাপামাপি করছে আর চাপা গলায় কী সব কথাবাতা বলছে। জ্যোৎস্নার পক্ষে বোঝা সম্ভব। কিন্তু আমাদের মুখ খোলা বিপজ্জনক। ওরা টের পেয়ে যাবে।

একটু পরে একজন বেঁটে মোটাসোটা! লোক এদিকে ঘুরে মার্কারি বাতির কাছে এল। বাতিটা কিসের ওপর বসানো। নিশ্চয় ব্যাটারির বাক্‌সে। খুব যোগাড়যন্ত্র করে গুহায় ঢুকেছে তাহলে।

বব আমাকে খুঁচিয়ে দিল। বুঝলাম এই তাহলে রাজবংশীয় টিহো। গায়ের রঙটা ঘোর বাদামী। পেল্লায় গোঁফ মুখে। নাকটা প্রকাণ্ড এবং একটু থ্যাবড়া। মাথায় কীচাপাকা ছোট চুল। কিন্ত গৌফ একেবারে সাদা।

সে আলোর সামনে ঝুঁকে (ও হরি! এ যে আমার সেই সিগারেট কেস!) সিগারেট কেসের ভেতরটা পড়বার চেষ্ট করছিল। কিন্তু বুদ্ধি আছে বটে। একটা আতস কাচও এনেছে। আতস কাচের সাহায্যে পড়ার চেষ্টা করছে।

রাগে আমার ভেতরটা গরগর করতে থাকল। আমার বাল্যবন্ধুর উপহার দেওয়া ওই সিগারেটকেসটা আমার কতকালের সঙ্গী! সবসময়, ওটা ব্যবহার করতাম না। কদাচিৎ ইচ্ছে হলে তবে। এবার আমেরিকা বেড়াতে আসার সময় কী খেয়ালে ওটা সঙ্গে এনেছিলাম।

নাকি জনখুড়ো! যা বলেছেন তাই ঠিক? নিয়তি আমাকে টেনে এনেছে এখানে। সিগারেটকেসটা যেখানকার জিনিস, সেখানে ফিরে আসতে চেয়েছিল যেন।

এইসব কথা ভেবে আমার কেমন একটা অস্বস্তি হতে থাকল। তাই ভাবলাম, চুলোয় যাক। সিগারেটকেস যার হাতে পৌছানোর কথা, পৌঁছে গেছে। তবে শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা দেখে যাওয়া যাক্‌। আমার এই বিদঘুটে স্বভাব—রহস্তভেদী এক বুড়ো ঘুঘুর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে স্বভাবটা বাগে পেয়েছে, বেখানে রহস্যের গন্ধ পাই নাক গলাতে ইচ্ছে করে।

টিহো সিগারেট কেসের ভেতরটা আতস কাচের সাহায্যে ফের দেখে নিয়ে সঙ্গীদের কিছু বলল। তখনই চোখে পড়ল সেই আজব কদর্য প্রাণীটাকে।

প্রাণীটা ব্যাটারিবাকসেতে হেলান দিয়ে কলা খাচ্ছিল। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে প্রচুর কলা ফলে। এই হাওয়াই দ্বীপে কাল লিহিউ বিমানঘাঁটি থেকে আসতে আসতে অজস্র কলাবাগান দেখেছি। একেকটা কলা প্রায় দেড় ফুট পর্যন্ত লম্বা এবং গাঢ় হলুদ রঙ। এসব কলা আমেরিকার মুল ভূখন্ডে প্রচুর বিক্রি হয়। কাজেই এর মধুর স্বাদের সঙ্গে আমার চেনাজানা হয়ে গেছে। বানর জাতীয় জীবটি যদি সত্যি সেই মেনেহিউন বা মিনিহুন হয়, তাহলে বলতে হবে কলাই তার প্রধান খাদ্য। কারণ তার সামনে প্রায় এক কাঁদি কলা রয়েছে।

একটা লোক মার্কারি বাতি ও ব্যাটারি যন্ত্রটা তুলে কাঁধে নিল। তখন খুদে প্রাণীটা দুপায়ে উঠে দাড়াল। তার এক হাতে কলার কাঁদি। কালো হাতটার দাগড়া দাগড়া পেশীর ওপর আলো ঠিকরোচ্ছে। তার মুখটা স্পষ্ট নজরে পড়ল। অবিকল মানুষের মতো। কিন্তু আকারে একটা বড় সাইজের মোসাম্বি লেবুর মতো গোলাকার। কান দুটো বেশ বড়। গায়ে একটুও লোম নেই। সব মিলিয়ে আস্ত একটি .মানুয-চামচিকে বলা যায়—শুধ ডানার বদলে দুটো হাত আছে।

ওরা এগিয়ে গিয়ে বাদিকে.একটা ফাটলে ঢুকে গেল। ক্রমশ আলোর ছটাও মিলিয়ে গেল। আবার গাঢ় অন্ধকারে ভরে গেলে ওয়েইকাপালি গুহা। জ্যোৎস্না ফিসফিস করে বলল, ওরা! সঠিক জায়গাটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। ওয়েইকানালেয়া গুহার যে সুড়ঙ্গপথ এগুহায় এসেছে, সেটাই খুঁজতে গেল ওরা। শুনেছি দুই গুহার মধ্যেকার এ সুড়ঙ্গপথ আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি।

বব উঠে গড়িয়ে বলল, চলো। ওদের পেছন পেছন যাই।

জ্যোৎস্না বলল, আমি একটা কথা ভাবছি। আমাদের বড্ড বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে না? মাঝিরা যদি রাগ করে ক্যানো নিয়ে চলে যায়, খুব বিপদে পড়ে যাব।

বব বলল, তাহলো তোমরা এখানে অপেক্ষা করো। আমি বাটপট ওদের বলে আসি, মানত দিতে আমাদের একটু দেরি হবে। প্রার্থনা করব. কিনা? তিনজনের প্রার্থনা একটু লম্বা চওড়া হবেই।

জ্যোৎস্না বলল, তাই যাও বব। যদি আরও দুডলার বেশি চায় দেরি হবার জন্য। রাজি হয়ো।

বব গুহার মেঝেয় সাবধানে টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে চলে গেল।

বললাম, জ্যোৎস্না! এই মুর্তিটা নিশ্চয় কোনো দেবতার?

জ্যোৎস্মা বলল, হ্যা। পলিনেশীয় জাতির আদিম যুগের এই দেবতার নাম কন-টিকি।

কন-টিকি? অবাক হয়ে বললাম। এ তো খুব চেনা শব্দ মনে হচ্ছে! হ্যাঁ—বিখ্যাত অভিযাত্রী থর হেয়ারভাল কন-টিকি নামে একটা ভেলায় প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন।

জ্যোৎস্না বলল, কন-টিকি আসলে সূর্যদেবতা। আদদিমযুগে প্রশান্ত মহাসাগরের অসংখ্য দ্বীপে এই সূর্যদেবতার পুজো হত। এখন পলিনেশীয়রা প্রায় সবাই খ্রীষ্টান হয়ে গেছে। তাই আর কন-টিকির পুজো হয় না। হায়েনায় এসে শুনেছি, পলিনেশীয়রা এখনও কেউ কেউ কন-টিকির পুজো করে। তবে এ পুজো মানে নেহাত রোগ বা বিপদ আপদে মানত করা। তাও ওরা লুকিয়ে চুরিয়ে মানত করতে আসে। পাদ্রীরা জানতে পারলে জরিমানা করে যে! কিন্তু জানেন জয়ন্তদা বিদেশীরা মানত দিতে এলে পলিনেশীয়রা ভারি খুশি হয়। তবে ভয়ে কেউ এতদূর আসতে পারে না। গুহার দরজার মুখে কিছু ফুল রেখে চলে যায়। কারণ নিশ্চয় বুঝতে পারছেন—ওই সব মড়ার মাথার খুলি হাড় কংকাল! ভূতের ভয়ে এদিকটায় ক্যানো নিয়ে আসতে চায় না। নেহাত টাকার লোভে কেউ আসে।

তুমিও তাহলে এই মুতিটার কাছে আস নি?

মোটেও না। এতদূর আসব, কী দরজার মুখেই যা বিচ্ছিরি গন্ধ।

আমরা ফিসফিস করে কথা বলছিলাম। ইচ্ছে হল, বেদীতে উঠে মুতিটাকে ছুয়ে দেখি কী দিয়ে তৈরি। তাই বললাম, জ্যোৎস্না! আমি বেদীতে উঠে মুতিটা ছুয়ে দেখি। ইচ্ছে করলে তুমিও উঠতে পারো। উঠবে নাকি?

জ্যোৎস্নার কোনো সাড়া পেলাম না। তাই ফের ডাকলাম জ্যোৎস্না! আসবে নাকি?

তবু কোনো সাড়া নেই। একটু জোরে ডাকলাম, জ্যোৎ্স্না গেলে কোথায়?

আশ্চর্য জ্যোৎস্না কি অন্ধকারে তামাশা করছে আমার সঙ্গে? এ কি তামাশার সময়?

রাগ করে বললাম, জ্যোৎস্না! সাড়া দিচ্ছি না কেন?

মেয়েটা ডানপিটে এবং গায়ে জোর আছে। তাই বলে এ ভুতুড়ে গুহায় আমার সঙ্গে এমন ফাজলেমি করা কি উচিত হচ্ছে? আমি হাতবাড়িয়ে ওকে খুঁজলাম। পেলাম না। তখন বেদী থেকে অন্ধের মতো দুহাত বাড়িয়ে কানামাছি খেলতে থাকলাম অন্ধকারে। দেয়ালে ধাক্কা লাগতেই আরও চটে গিয়ে গলা চড়িয়ে বললাম, হচ্ছেটা কী? জ্যোৎস্না! জ্যোৎস্না?

ঠিক সেই সময় অন্ধকারে দূরে আচমকা বীভৎস একটা চেচাঁমেচি শুনতে পেলাম। হোয়া হোয়া—আ—আ? হোয়া হোয়া হোয়া—আ—আ। হোয়া হোয়া হোয়া—আ—আ।

অনেকগুলো রাষ্গুসে মানুষের চিৎকার যেন। বিদেশী ফিলমে জংলীদের চিৎকারের মতো।  হোয়া হোয়া হোয়া (ইউনিকোড)আ—আ! হোয়া হোয়া হোয়া—আ—আ।

অমানুষিক চিৎকার করতে করতে কারা এগিয়ে আসছে এদিকে।

মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলাম না। অন্ধকারে অন্ধের মতো দৌড়তে চেষ্টা করলাম। কোনদিকে দরজা—কোনপথে এসেছি, তা ঠিক করতে পারলাম না। বার বার আছাড় খেলাম। জান্তব চিৎকারটা খুব কাছে বলে মনে হল। তারপর যেই পা ফেলেছি, হড়াৎ করে একটা গর্তে পড়ে গেলাম।

পড়লাম একেবারে কনকনে ঠান্ডা জলে। জলে পড়ায় আঘাত লাগল না। কিন্তু কী তীব্র স্রোত! আমাকে টেনে নিয়ে চলল খড়ের কুটোর মতো।

কতক্ষণ অসহায় ভেসে থাকার পর একখানে স্রোতটা হঠাৎ কমে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার তো  তারপর জলটা আমাকে উল্টোদিকে ঠেলতে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে টের পেলাম সমুদ্রের জল গুহার তলার স্বুডুঙ্গে একবার করে প্রচণ্ড বেগে এগিয়ে আসছে, আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই এরকম ছুমুখো টান জলে। হাত বাড়িয়ে শক্ত কিছু খুঁজলাম। হাতে দেয়াল ঠেকল। কিন্ত জলের ধাক্কায় মসৃণ দেয়াল ধরার উপায় নেই। আবার এক হ্যাঁচকা টানে স্রোতের যুখে ভাসলাম। হাত দুটো অসহায়ভাবে ওপরে বাড়াতেই ছাদে ঠেকল। তারপর ছাদটা,ঢালু হয়ে জলে ডুবেছে টের পেলাম। সর্বনাশ! এবার জলের তলায় দম আটকে মারা পড়তে হবে যে! কিন্তু না ডুবে উপায় নেই। মাথা ভেঙে যাবে।

প্রচণ্ড বেগে জল আমাকে টেনে নিয়ে চলল। দম বন্ধ হয়ে আসছে। আঃ বাতাস! মাথা তোলার জন্য একটুখানি আকাশ!

বুক ফেটে যাবে বুঝি। জলের টান যেন গভীর পাতালে নিয়ে চলেছে। একসময় আর সহ্য করতে পারলাম না। নিঃস্বাস নেবার জন্য ঠেলে মাথা তুললাম। মাথায় কিন্তু ছাদের ধাক্কা লাগল না। আঃ! আবার একটুকরো আকাশ পেয়েছি। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে থাকলাম। এখানে স্রোতটা কমেছে। জলটা ঘুরপাক খাচ্ছে। বাঁদিকে একটু সরলে আবার তীব্র স্রোত পেলাম! তারপর সমানেটা স্পষ্ট হয়ে উঠল ক্রমশ।

একটা কাটল দিয়ে রোদ্দুর ঢুকেছে। বরফগলা! জলে শরীর নিঃসাড়। কিন্তু রোদ্দুর দেখে বাঁচার তাগিদ জোরালো হয়ে উঠেছে। ফাটলের কাছে পৌঁছতেই আঁকড়ে ধরলাম একটা পাথরের খাঁজ। ফাটলটা প্রায় হাত দেড়েক চওড়া। অনেক কষ্টে সেখান দিয়ে ওপরে উঠতে থাকলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *