খুদে মানুষ মিনিজন
গায়ে পগে আলাপ করতে আমেরিকানদের ভুঁড়ি নেই। লসএঞ্জেলিস থেকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের হনলুলু যাবার সময় এই মারকিন খুড়ো-ভাইপোর সঙ্গে খুব ভাব হয়েছিল। খুড়োর নাম জন নর্থব্রুক। ভাইপোর নাম রবার্ট ওরফে বব। খুড়োর বয়স ষাটের কাছাকাছি। গায়ে সাদা হাতি বলা যায়। ভাইপোটি ভার উল্টো। আমার মতো রোগাটে। মাথাতেও প্রায় সমান-সমান। কখায়-কখায় ফিকফিক করে হাসে। ভারি আমুদে ছোক্রারা।
ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের মাঝারি গড়নের প্লেন। জনা ষাটেকে যাত্রী ধরে। মাঝবরাবর করিডোরের মতো যাত্রার পথ আছে এবং প্রতিসারে একদিকে তিনটে, অন্যদিকে দুটো আসন। তিনটে আসনের দিকে জানালার ধারে আসনটি আমার। বাকি সেই খুড়ো-ভাইপো।
খুড়ো জন আমার গায়ে। তিনিই গায়ে পড়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মাফ করবেন। মশাই কি দক্ষিণদেশীয়? স্প্যানিশ, পর্তুগিজ?
আমেরিকানর কথা বলছে। এই ক’মাসে টের পেয়েছি, কী জানি কেন সবখানেই ওরা আমাকে স্প্যানিশ বা পর্তুগিজ ভাবে। ডেনভারে একজন আমাকে ইন্দোনেশিয়ার লোক ভেবেছিল। আসলে দক্ষিণ আমেরিকায় কিছু দেখে স্প্যানিশ বা পর্তুগিজদের গায়ের রঙ মোটোও ফরসা নয়, রোদেপোড়া তামাটে। বংশানুক্রমে ওদের পিতৃপুরুষদের ইউরোপীয় সাদা চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে দক্ষিণ আমেরিকার জলহাওয়ার এবং কড়া রোদ্দুরে। তাছাড়া সেখানে ভীষণ দারিদ্র্য। অপুষ্টিতে তাগড়াই গতর আমার মতো প্যাঁকাটি হয়ে গেছে অনেকের!
জন খুড়ো প্রশ্নের জবাবে নিজের পরিচয় দিলাম, তখন উনি ভারি অপ্রস্তুত হলেন। বললেন, আমার এ ভুলের জন্যে দুঃখিত মিস্টার। তাহলে আপনি ক্যালকুট্টার লোক? আমার এক দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্যালকুট্টায় ছিলেন। ওঃ! সে কত অদ্ভুত সব গন্ন শুনেছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের ভাব হয়ে গেল। বিদেশ-বিভূঁয়ে- বিশেষ করে পথে যেতে যেতে কারুর সঙ্গে আলাপ হলে ভালই লাগে। পথের ক্লান্তি টের পাওয়া যায় না। জন নর্থব্রুক নিজের পরিচয় দিলেন। উনি লসেএঞ্জেলিসে কালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। এমনকি পণ্ডিত লোকের সঙ্গে পরিচয় হওয়া খুব আনন্দের। ওঁর ভাইপো বব আমার মতোই পেশায় সাংবাদিক। এখন নভেম্বরের শেষাশেষিই আমেরিকায় থ্যাঙ্কস-গিভিংডে’র উৎসব। তাই দিনতিনেক ছুটি। খুড়ো-ভাইপো ছুটি কাটাতে যাচ্ছেন হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে।
থ্যাঙ্কস-গিভ ডে’র মতই অথচ হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে
জনখুড়ো বললেন, আর আধঘন্টার মধ্যেই আমার হনলুণুতে নামছি। তা আপনি কি হনলুণুতে থাকেন?
বললাম, আমার ইচ্ছে, বিখ্যাত সমুদ্রতট ওয়াইকিকিতেই কোথায় থাকব।
জন হাসলেন। ওয়াইকিকি খুব সুন্দর জায়গা। সবাই ওখানেই যায়। কিন্তু আমি বলি কি, যদি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের সত্যিকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তাহলে চলুন আমাদের সঙ্গে কাউযাই দ্বীপে।
বব গম্ভীর মুখে বলল, আমরা সেখানে মিনিহুন দেখতে যাচ্ছি।
বললাম, মিনিহুন? সে আবার কী?
জন হাসতে হাসতে বললেন, বব সব সময় তামাশা করে। মিনিহুন নিছক কল্পনা। আপনি নিশ্চয় বিখ্যাত বই গালিভারের ভ্রমণবৃত্তান্ত পড়েছেন ? তাতে লিলিপুট নামে খুদে মানুষদের কথা আছে। এই ‘মিনি হুন?” হল সেই রকম লিলিপুট মানুষ। আশ্চর্য, ক্যাপ্টেন টমাস কুক ১৭৭৮ খ্রীষ্টাব্দে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কাউয়াই দ্বীপে এসেছিলেন—তিনিও স্বচক্ষে ওদের দেখেছেন বলে লিখে গেছেন। তারপর দুশোবছর ধরে এই গুজব সমানে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা মিনিহুন কেউ ধরে ফেলা তো দূরের কথা, ফটো পর্যন্ত তুলে দেখাতে পারে নি। কাজেই এটা নিছক গুলতাপ্পি। আসলে কথাটা এসেছে সম্ভবত মিনি থেকে। মিনি মানে খুদে। আর হুন হল সেই বর্বর ইউরোপীয় জাতের লোকের—যাদের নেতা ছিল অ্যাটিলা। হুনদের শরীর ছিল পেশীবহুল। গায়ে প্রচন্ড জোর। আমাদের সেরা পালোয়ানকেও একজন মিনিহুন নাকি তুলে আছাড় মারতে পারে।
বব তেমনি গম্ভীর মুখে বলল, আমি কিন্তু এবার যাচ্ছি মিনিহুনদের ছবি তুলব এবং আমার খবরের কাগজ্জে তাদের কথা লিখব। চাউড়্রি (চৌধুরী), তুমিও কাগজের লোক। আমার সঙ্গী হও।
জন রাগ করে বললেন, আবার তুমি একটা বিপদ না বাধিয়ে ছাড়বে না বাপু! সেবারকার মতো আর তোমাকে আমি খুঁজতে বেরুব না বলে দিচ্ছি। হায়েনার গুহায় মরে পড়ে থাকবে।
অবাক হয়ে বললাম, হায়নার গুহা মানে?
জন বললেন, কাউয়াই দ্বীপের উত্তর উপকুলে একট! এলাকার নাম হায়না। ওখানে সমুদ্রের খাড়ির মাথায় অসংখ্য গুহা আছে। আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি মিঃ জয়ন্ত চৌধুরী, কক্ষনো ববের কথায় ভুলে ওর পাল্লায় পড়বেন না।
বব আমার দিকে চোখ টিপল।। ঠোঁটের কোনায় হাসি। বললাম, আচ্ছা অধ্যাপকমশাই, মিনিহুন যদি সত্যি না থাকে, এমন গুজব রটল কেন? আমাদের বাংলার প্রবাদ হল যা রটে, তা কিছু-কিছু সত্যি বটে।
এমন বললেন, আমার ধারণা, আফ্রিকার পিগমিদের মতো বেঁটে একজাতের আদিম অধিবাসী ছিল হাওয়াই এলাকার। কয়েকশো বছর আগে তারা লুপ্ত হয়ে গেছে। গল্পটা তাই রটে আসছে। যদি আমাদের সঙ্গে যান কাউয়াই দ্বীপে, গেয়েই শুনবেন মিনিহুন নিয়ে লোকের গল্প করছে। এমন কী, গাইডগুলো পর্যন্ত হলফ করে আপনাকে ‘মিনি হুন’ দেখাতে নিয়ে যাবে। দেখছেন তো নবডংগাটি, খামোকা একগাদা পায়সা গচ্চা যাবে। গাইড আপনাকে সমুদ্রের খাড়ির মাথায় বসিয়ে রেখে বলবে, আপনি ওইখানটায় লক্ষ্য রাখুন—খুদে মানুষ দেখতে পাবেন। সময়মতো আপনাকে এসে নিয়ে যাবে। আপনি তো বসে রইলেন ঘন্টার পর ঘন্টা। ব্যাটা কতক্ষণ পরে এসে বলবে, কী, দেখতে পান নি? তাহলে আজ ওরা বেরোয়নি গুহা থাকে। আপনার বরাত! কালকে চেষ্টা করবেন। অনেকসময় হাজার ফুট নিচে পাথরের ওপর পেঙ্গুইন, একরকম সমুদ্রশকুন দিয়ে গাইড বলবে, ওই দেখুন! ওই দেখুন! আপনি যদি বলেন, ওগুলো তো পাখি—তখন গাইডব্যাটা একগাল হেসে বলবে, মশায়ের চোখ খারাপ। পাখি হলে উড়ত না?
বব মিটিমিটি করে হেসে বলল, কী জায়ন্টো চাউড্রি? যাচ্ছ তো আমাদের সঙ্গে।
বললাম, হায়েনায় হওয়ায় তোমার সঙ্গে চুকতে বেজায় লোভ হচ্ছে বব। কিন্তু আমার নামটা তুমি ভুল উচ্চারণ করছ। আমি জয়ন্ত চৌধুরী।
বব বিড়বিড় করে নামটা আওড়াতে থাকল। জানলায় দেখি প্রশান্ত মহাসাগরের নীল ঢেউ। আমাদের প্লেন সবুজ দ্বীপের ওপর চক্কর দিচ্ছে। হনলুলু এয়ারপোর্ট এসে গেল দেখতে দেখতে।
