মারিয়ার কাহিনী

মারিয়ার কাহিনী

একটা সরু করিডোর দিয়ে মারিয়া আমাকে নিয়ে চললেন। এঘর ওঘর হয়ে একটা ছোট্ট ঘরে ঢুকলেন। তারপর বিস্ময় ও আনন্দে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম, জ্যোৎস্না।

মারিরা আমার মুখ চেপে ধরেছেন সঙ্গে সঙ্গে। এ ঘরে সুন্দর একটা বিছানায় জ্যোৎস্না শুয়ে ছিল। উঠে মিষ্টি হেসে চাপাস্বরে বলল, আসুন জয়ন্তদা। মারিয়াঠাকুমার আমরা অতিথি।

মারিয়াঠাকুমা। বলে কী জ্যোৎস্না। কিন্তু ততক্ষণে মারিয়া কালো আলখেল্লাটা খুলেছেন। এবার দেখি; এ তো এক বৃদ্ধা তখন মনে হচ্ছিল, যুবতী না হলেও প্রৌঢ়া তো ননই—বড় জোর পয়ত্রিশ-ছত্রিশের বেশি বয়স হবে না। এখনই দেখছি, শণচুলো ৰুড়ি। মুখের চামড়া কোঁচকানো। কিন্তু গায়ের জোরটা টিকে আছে, তা বোঝাই যাচ্ছে। মারিয়া বললেন, বসো। তবে চেঁচামেচি করা চলবে না। এখন শয়তান গ্রিনকট ওর ল্যাবরেটরিতে আছে। মিনিহুনগুলোর ওপর পরীক্ষা চালাচ্ছে। গ্রিনকট ওদের মানুষ না বানিয়ে ছাড়বে না।

বললাম, মানুষের কলজে ওদের বুকে ঢুকিয়ে মানুষ বানাবে বুঝি?

মারিয়া বললেন, না, হার্টবদল করবে না। অন্যরকম পদ্ধতি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে।

তাহলে মানুবের কলজে কী কাজে লাগে ওর?

মারিয়া বললেন, আমি ছত্রিশবছর ধরে ওর পাল্লায় পড়ে বন্দী হয়ে আছি বলতে পারো। কারণ এখান থেকে বেরুনোর পথ খুঁজে পাইনি। তাই বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে জানি না। তবে মাবে মাঝে টের পেয়েছি, ফাদার গ্রিনকট মিহিহুনের সাহায্যে মানুষ ধরে আনে বাইরে থেকে। কীভাবে ধরে আনে বলছি। মিনিহুনরা জলচরও বটে। খাড়ির সমুদ্রে ডুবে ওত পেতে থাকে। রাতবিরেতে কোনো দুঃলসাহসী পর্যটক একলা খাড়ির নিচে চাতালে বেড়াতে এলেই মিনিহুনরা তাকে ধরে আনে। আমার ধারণা, হায়েনার লোকেরা বা সরকারীমহল ভাবেন, পর্যটক বেঘোরে ডুবে মারা পড়েছে। খাড়ির সমুদ্রে প্রচুর হাঙর আছে। কাজেই ওঁরা ধরে নেন, হাঙরে লাশটা ধেয়ে ফেলেছে।

জ্যোৎস্সা বলল, আমি একবছর আছি হায়েনায়। তার মধ্যে প্রায় ছ সাতজন পর্যটকের রাতে বেড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার কথা শুনেছি।

মারিয়া বললেন, ফাদার গ্রিনকট তাদের হার্ট ওষুধপত্র দিয়ে জিয়েই রাখে। তারপর দেখেছি, কারা এসে সেগুলো কিনে নিয়ে যায়। ওই টাকায় গ্রিনকট তার ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি কিনে আনে।

জ্যোৎস্না বলল, আপনি চুপিচুপি ওর পেছন ধরলে নিশ্চয় বেরুনোর পথ চিনে রাখতে পারতেন। তারপর সেই পথ দিয়ে….

বাধা দিয়ে মারিয়া বললেন, ও ভীষণ ধূর্ত। মিনিহুনরা আমাকে যতই খাতির করুক, ও তাদের ঈশ্বরের মতো। তক্কে তক্কে থাকে। কিন্তু এই যে আমি তোমাদের বাঁচালাম, মিনিহুনরা টের পেলেও গ্রিকটকে জানাতে পারবে না। কেন জানো? প্রথম কথা, ওরা মানুষের ভাষা বোঝে না। দ্বিতীয় কথা, ওরা হাবেভাবে মানুষের আচরণ টের পেলেও ওদের ওপর যা হুকুম, তার বাইরে কিছু করবে না। ওদের বোঝানো হয়েছে। আমি বা কোনো বন্দী যেন এই পাতালপুরী থেকে না পালাতে পারে। কিংবা ধরো, দৈবাৎ গুহার মধ্যে মানুষ এসে পড়লে তাকে পাকড়াও করে আনতে হবে। অনেকসময় গুহায় সশস্ত্র লোক ঢুকলে গ্রিনকট টের পায়। যেমন আজ কারা ঢুকে গাইতি মেরে স্বড্‌ঙ্গের দেয়াল ভাঙছিল, অমনি গ্রিনকট মিনিহুনদের হুকুম দিলে হায়েনার খাঁচা খুলে দিতে। হায়েনারা গিয়ে তাদের খেয়ে ফেলল।

টিহোর ঘটনাটা আগাগোড়। বললাম। তারপর বললাম সিগারেট কেসের কথা।

শুনে মারিয়া চোখের জল মুছে বললেন, তাহলে এবার শোনো, কীভাবে আমি এখানে ছত্রিশবছর ধরে আটকে রয়েছি।

মারিয়ার কাহিনী সংক্ষেপে হল এইঃ

১৯৪৪ খ্রীষ্টাঝে বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানীরা হঠাৎ মারকিন পার্লবন্দরে হামলা করে। মারিয়া তখন ওখানে ছিলেন হাসপাতালের নার্স হয়ে। বয়স তখন প্রায় তিরিশ বছর। বিয়ে করেন নি। বাবা-মা থাকেন লসএঞ্জেলসে। পার্লবন্দরে যুদ্ধ বাধলে কার্ল অসবোর্ন, পিটার ওলসন, এবং টিহো নামে তিনজন পাইলটকে প্যাসিফিক ব্যাংকের কর্তৃপক্ষ প্রচুর সোনার বাট আমেরিকার ওয়াশিংটন হেড অফিসে পৌঁছে দিতে বলেন। ওরা ছিল বিমানবাহিনীর ভলিট্টিয়ার কোর্সে। মারিয়ার সঙ্গে ওদের চেনা ছিল। পালিয়ে তখন সবাই প্রাণ বাঁচাচ্ছে। মারিয়া ওদের সঙ্গে ছোট্ট বিমানে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেন।

কাউয়াই দ্বীপের হায়েনাতে পৌঁছে ওরা হঠাৎ প্লেন নামায় একটা পাহাড়ী উপত্যকায়। ওদের মতলব, সোনাটা হাতাবে। মারিয়া কী করবেন? ওদের পাল্লায় পড়েছেন তখন। ওদের কথা না মানলে গুলি করে মারবে। আসলে টিহো নামে পলিনেশীয় পাইলটই ওদের এই কুমন্ত্ণা দিয়েছিল। ওরা রাত্রিবেলা সোনার বাট চারটে প্যাকেট বরে নিয়ে এই খাড়ির কাছে পৌছায়। টিহো স্থানীয় লোক বলে এই গুহাগুলোর কথা জানত। ওয়েইকাপালির ভেতর ঢুকে একজায়গায় চারটে প্যাকেট পুঁতে রাখা হয়। তার ওপর দিকে একজায়গার একটা করচ চিহ্ন খোদাই করে রাখে ওরা।

কিন্তু তারপর সমস্য! দেখা দেয়। ওপর থেকে খাড়াই বেয়ে নামা যতটা সোজা হয়েছিল ওঠা ততটাই কঠিন। মারিয়ার পক্ষে ওঠা তো অসম্ভব। কারণ তার পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিং নেই। ওরা তিনজনে উঠে যায় একে একে। কিন্তু মারিয়া অনেক চেষ্টা করেও পারেন নি। যতবার ওঠেন, গড়াতে গড়াতে এসে নিচের চাতালে পড়েন। প্রচণ্ডভাবে আহত হন। তখন ওপর থেকে ওরা আশ্বাস দিয়ে বলে, শিগগির নৌকো নিয়ে আসবে। মারিয়াকে নিয়ে যাবে।

আর আসেনি ওরা। কী হয়েছিল, মারিয়া জানেন না। গুহার ধারে জখম অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে যান। তারপর যখন জ্ঞান হয়, দেখেন একটা পাদরীর পোশাকপরা লোক তার শুশ্রাষা করছে। ফাদার গ্রিনকট তার নাম। কিন্তু তখনও টের পাননি মারিয়া, কে এই ফাদার গ্রিনকট।

ছত্রিশবছর ফাদার প্রিনকটের কাছে বন্দীর মতো জীবন কাটাচ্ছেন মারিয়া। এ ছত্রিশবছরে কয়েকশো মানুষের বুক চিরে হৃৎপিন্ড বের করার, কাজ তাঁকে দিয়েই করিয়েছে শয়তান গ্রিনকট। কিন্তু সজ্ঞানে নয়—অগ্নিদেবী পিলির পোশাক পরিয়ে সেইরকম সাজিয়ে তাকে গ্রিমকট একটা ওষুধ খাইয়ে দেয়। তখন নেশার ঘোরে জ্যান্ত মানুষের বুক চিরে হৃৎপিন্ড উপড়ে ফেলেন হতভাগিনী মারিয়া। বুঝতে পারেন না কী সাংঘাতিক পাপ করছেন!

নেশা চলে গেলে যখন সব টের পান, নির্জনে হুহু করে কাঁদেন। অনুতাপ করেন।

আজ যখন জ্যোৎস্নাকে ধরে আনল মিনিহুনরা, জ্যোৎস্নার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হয়েছিল মারিয়ার। চালাকি করে ওষুধমেশানো পানীয়টা নিজের হাতে খাওয়ার ভান করে জামার ভেতর ঢেলে ফেলেছিলেন।

আমাকেও যখন ধরে আনে, তখন ঠিক তাই করেছিলেন। নৈলে জ্যোৎস্না ও আমি ‘হদয়হীন’ মড়া হয়ে হায়েনাদের পেটে চলে চলে যেতাম।…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *