শয়তানের কবলে

শয়তানের কবলে

কিন্তু ততক্ষণে আমার মাথায় অনেক প্রশ্ন জেগেছে। কে এই ‘অগ্নিদেবী পিলি’? বুঝতে পারছি, ইনি একজন মেমসায়েব তো বটেই, এবং আমেরিকান। কারণ মারকিন মহিলাদের মতো নাকিসুরে ইংরেজি উচ্চারণ করছেন। তাছাড়া ওই ইংরেজিও আমেরিকান ইংরেজি। প্রায় মাসচারেক আমেরিকায় থেকে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে, ব্রিটেন কানাডা আর আমেরিকা তিনটি দেশেই ইংরেজি ভাষায় লোকেরা কথা বললেও বেশ খানিকটা তফাত আছে। ভাষার উচ্চারণ বাচনভঙ্গিতে অনেক অমিল।

তারপরের প্রশ্ন, জ্যোৎস্নাকেও নিশ্চয় মিনিহুনরা তখন আমার মতো করে পাকড়াও করেছিল। তাকে কোথায় রেখেছে? আমাদের ধরে আনার উদ্দেশ্যই বা কী?

অপোগন্ড জীবগুলোর ভূতুড়ে হাসি থামতেই চায় না। অগ্নিদেবী চেঁচিয়ে ধমক দিলে তবে থামল। তখন সাহস করে বললাম, মাননীয়া অগ্নিদেবী! আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না যে আমি একজন ভারতীয়?

অগ্নিদেবী গর্জে উঠলেন, ভারতীয় হও আর যেই হও,—তোমরা সভ্য দুনিয়ার লোকেরা আমার শত্রু। তোমরা বিশ্বাসঘাতক স্বার্থপর ধূর্ত। আমি তোমাদের ঘ্বণা করি…ঘ্বণা… করি…ঘৃণা করি।

বলতে বলতে আরও অস্বাভাবিক এবং হিংস্র হয়ে উঠল ওঁর চেহারা। তারপর দুলতে থাকলেন। দুলতে দুলতে চোখ বুজে ফেললেন। তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

ছত্রিশ বছর ধরে আমি ওদের অপেক্ষা করছি। ওরা এসে আমাকে নিয়ে গেল না। ওরা আমাকে হায়েনার গুহায় রেখে চলে গেল। বলে গেল, ফিরে এসে আমাকে নিয়ে যাবে। ওরা বিশ্বাসঘাতক! ওরা…

কথাগুলো গুনতে-শুনতে চমকে উঠেছিলাম। তারপর হঠাৎ কোথা থেকে ভরাট গম্ভীর গলার ইংরাজিতে কে বলে উঠল, মারিয়া! মারিয়া! তুমি কি চুপ করবে? চুপ না করলে তিন নম্বর শাস্তি তোমার পাওনা হবে। সাবধান!

‘অগ্নিদেবী’র নাম তাহলে মারিয়া? নামটা কেমন যেন চেনা লাগছে। মারিয়া চুপ করেছেন। চোখ খুলে তেমনি হিংস্র চোখে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ আমি চুপ করেছি ফাদার গ্রিনকট।

আদৃশ্য ফাদার গ্রিনকটের আওয়াজ এল, যাও। এবার তোমার কর্তব্য পালন করো।

মারিয়া আমার দিকে হিংস্রমুতিতে তাকিয়ে রইলেন।

মারিয়া! ছুরি আর সাড়াশি কোথায় তোমার?

আমার হাতেই রয়েছে ফাদার গ্রিনকট।

আতঙ্কে কাঠ হয়ে দেখলাম, মারিয়ার একহাতে ছুরি অন্যহাতে একটা সাঁড়াশি।

ফাদার গ্রিনকটের কঠস্বর ভেসে এল আবার, ইয়াকে বলো রেকাব নিয়ে ওই বাদামী ভূতটার কাছাকাছি দাঁড়াক। আর উয়াকে বলো ওর সঙ্গীদের নিয়ে বাদামী ভূতটাকে শক্ত করে ধরে থাক। আর মারিয়া! তুমি ওর বুকটা চিরে হৃৎপিন্ডটা আঁড়াশি দিয়ে উপড়ে নাও। রেকাবে রেখে আমার কাছে নিয়ে এস। ওর ধড়টা আপাতত ওখানে পড়ে থাক পরে একটা ব্যবস্থা করা যবে।

আমার রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। এ কি দুঃস্বপ্ন—না সত্যি সত্যি ঘটছে? ওই ছুরি দিয়ে আমার বুক চিরে সাঁড়াশি দিয়ে আমার কলজে তুলে নেবে ভাবতেই মাথা ঘুরে উঠল। চিৎকার করতে চাইলাম। কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরুল না। মারিয়া এবার হি হি করে হেসে উঠলেন। বেদী থেকে নেমে এলেন একহাতে চকচকে ছোরা আর অন্যহাতে কালো সাঁড়াশি নিয়ে। তারপর দেখি, একটা মিনিহুন প্রকাণ্ড একটা রুপোলী রঙের রেকাব নিয়ে এগিয়ে এল। এদিকে একদল মিনিহুন আমাকে পেছনে ধরে ফেলে আমার বুকটা চিতিয়ে রাখল। জীবনে ভুলেও ঈশ্বরের নাম-টাম করিনি! বিশ্বাসও নেই। কিন্তু এখন যখন মরতে যাচ্ছি, বিশেষ করে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাদয়ক হবে মৃত্যুটা—তখন ঈশ্বরের নাম গলার ভেতর থেকে বেরুতে চাইল কই? বোবা হয়ে গেছি যেন।

মারিয়া ছোরাটা আমার বুকের কাছে এসে ঝুঁকে দাড়াতেই চোখ বুজে ফেললাম। তারপর প্রতীক্ষা করতে থাকলাম, এই এবার তীক্ষধার ছোরা বুকে ঢুকে যাবে—এক সেকেন্ড দু-সেকেন্ড তিন সেকেন্ড…

হঠাৎ কানে এল মারিয়া ফিসফিস কিছু বলছেন। …ভয় পেয়ো না। আমি তোমার শত্রু নই। আমিও তোমার মতে এক বন্দী। তোমার বুকে খানিকটা লালরঙ মাখিয়ে দিচ্ছি। আর একটুকরো স্পঞ্জ আছে আমার কাছে। সেটাতে লালরঙ ভরা রয়েছে। ওটা রেকাবে করে নিয়ে যাচ্ছি। তারপর শোনো…

ফাদার গ্রিনকটের আওয়াজ এল, মারিয়া! দেরি হচ্ছে কেন?

মারিয়া বললেন, মন্ত্র পড়ছি ফাদার গ্রিনকট। বাধা দিলেন, বলে আবার মন্ত্রটা গোড়া থেকে পড়তে হবে।

শয়তান ফাদার গ্রিনকট অদৃশ্য থেকে বলল, হুঁ। ঝটপট মন্ত্রটা আওড়ে নাও! আমার মেশিন গরম হয়ে যাচ্ছে। বেশি গরম হয়ে গেলে মেয়েটার মতো বাদামী ভূতটার কলজেও পুড়ে যাবে। কাজে লাগানো যাবে না।

মারিয়া ফিসফিস করে বলল, শোনে আমরা চলে গেলে তুমি মড়ার মতো পড়ে থেকো সাবধান, একটুও নড়ো না। তারপর এরা তোমাকে হায়েনার ঘরে ফেলে দিয়ে আসবে। ভয় নেই—হায়েনাগুলোকে আমি ঘুমের ওষুধ মেশানো মাংস খাইয়ে রেখে এসেছি। ওরা ঘুমোচ্ছে। তুমি ওঘরে চুপচাপ পড়ে থেকো। তারপর আমি সময় মতো যাব’খন।

মারিয়া ছোরা আর লালরঙ ভরা স্পঞ্জটা বুকে ঠেকিয়ে বলল, সত্যি সত্যি বুক চিরে হৃৎপিন্ড বের করলে মানুষ ফের যেমন আর্তনাদ করে, তেমনি আর্তনাদ করো। সাবধান, শয়তানটা যেন টের না পায় যে তুমি অভিনয় করছ। এর ওপর তোমার বাঁচামরা নির্ভর করছে।

আমি একসময় থিয়েটার করতাম। মৃত্যু-যন্ত্রণায় আর্তনাদের অভিনয় একবারই করেছিলাম। এখন প্রাণের দায়ে সেইরকম রাম চ্যাঁচানি চেঁচিয়ে উঠলাম, ওঃ। ওঃ। ওঃ ও হো হে! হো হো। তারপর গোঙাতে শুরু করলাম। হাতপা ছোঁড়াছুঁড়িও চালিয়ে গেলাম যতটা পারি।

শয়তান ফাদার গ্রিনকটের নেপথ্য অট্টহাসি শোনা গেল হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।

আমার হৃৎপিন্ড রেকাবে রাখলে আমি এলিয়ে পড়লাম। মিনিহুনরা আমাকে চিত করে গুইয়ে দিল। আমার জামা লাল হয়ে গেছে। চবচব করছে একেবারে। মুখ মড়ার মতো করে হাতপা ছড়িয়ে পড়ে রইলাম। মারিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

মিনিহুনরা আমাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে চলল সেই হায়নার ঘরে। গুহার ভেতর যেন প্রাসাদপুরী। কারা বানিয়েছে এই সুন্দর পুরী? মিনিহুনরা তো নয়ই। হয়তে। কোনো প্রাচীন যুগের আদিম রাজ! এই পাতালপুরী বানিয়েছিল। যেভাবেই হোক ফাদার গ্রিনকট নামে এক শয়তান এখানে আস্তানা করেছে।

হায়েনার ঘর একটা জেলখানা যেন। মনে হল, আদিম পলিনেশীয় রাজার বন্দীশালা ছিল এটা। দূগন্ধে বমি আসছে। মাথার ওপর একটা আলো জ্বলছে। সেই আলোয় চোখের ফাঁক দিয়ে দেখলাম প্রায় একডজন কুৎসিত চেহারা হায়েনা দাঁত ছরকুটে ঘুমোচ্ছে। কারুর ঠ্যাং ওপরে, কারুর পাশে। মিনিহুনরা একটা ফাঁকা জায়গায় আমাকে ধপাস করে ফেলে চলে গেল। গরাদের দরজা বন্ধ করতে ভুলল না।

একটু পরে সাবধানে কাত হলাম। আমার চারপাশে হায়েনার পাল মড়ার মতো পড়ে আছে। এরা যদি দৈবাৎ জেগে ওঠে, আমাকে বাঁচতে হবে না। হায়েনা মানুষকে ভয় পায়, জানি। কিন্তু এরা এখন দল বেঁধে আছে এবং নরমাংস খেতে অভ্যস্ত হয়েছে নিশ্চয়।

এদিক ওদিক তাকিয়ে উঠে বসলাম। হঠাৎ একটা হায়েনা ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরতেই বুক ধড়াস করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ফের মড়ার মতো চিত হয়ে শুয়ে পড়লাম। তারপর মনে হল, তাহলে কি ওয়েইকাপালি গুহার ভেতর যে হোয়া হোয়া গর্জন শুনেছিলাম তা এইসব হায়েনারই?

কিন্তু হায়েনা তো মানুষের হাসির মতো শব্ধ করে হাঃ হাঃ হাঃ এইরকম শব্দ। কে জানে, হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের হায়েনারা হয়তো ওইরকম হোয়া হোয়া করে।

কতক্ষণ পরে পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। তারপর দরজা খুলল। আড়চোখে দেখলাম, কালো কাপড়ে ঢাকা মারিয়ার মুর্তি। তথন উঠে বসলাম।

মারিয়া বললেন, চলে এস আমার সঙ্গে। সাবধান, কোনো শব্দ নয়।…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *