রাজবংশীয় টিহোর অন্তর্ধান

রাজবংশীয় টিহোর অন্তর্ধান

রাতের ঘুমটা ভাল হয়নি। শোবার আগে খাটের তলা ভাল করে দেখে নিয়েছিলাম। বাথরুমের ভেতরটাও। রাত দেড়টা অব্দি ফের কর্নেলকে ট্রাংককল করার চেষ্টা করেছিলাম। লাইন পাইনি। যতবার ওভারসিজ কল অফিসে করি, টেপরেকর্ডারে বেজে ওঠেঃ দুঃখিত মশাই। সমুদ্রপারের লাইন এখন ব্যস্ত। আবার চেষ্টা করুন।

সকালে ঢাকুচাচার মেয়ে জ্যোৎস্না এসে হাজির। এখন আর চেনাই যায় না, পুরো মেমসায়েবটি। সাদা শার্ট আর জিনসের প্যান্ট পরেছে। মাথায় হাওয়াই দ্বীপের হলুদ টুপি।

রাতের ঘটনা শুনে সে আতকে উঠল। বলল, এ যে সত্যিকার রহস্যকাহিনী জয়ন্তদা! কিন্তু এবার প্রমাণ হল তো সত্যি মিনিহুন আছে?

বললাম, মিনিহুন কিনা কে জানে! আমার তো মনে হল বাঁদর।

জ্যোৎস্না বলল, যাঃ! বাঁদর কালো হয় নাকি? তাছাড়া বললেন ভীষণ ঠাণ্ডা হাত। হবেই তো! মিনিহুন সমুদ্রেও মাছের মতো ঘুরে বেড়ার কিনা। এখন নভেম্বরে সমুদ্রের জল ঠাণ্ডা না?

গল্প করতে করতে কফির অর্ডার দিলাম ফোনে। সেইসময় বব ফুলবাবু সেজে ঘরে ঢুকল। নকশাকাটা ঘিয়ে রঙের ঢিলে কুর্তা আর আঁটো জিনস পরা। জ্যোৎস্নাকে দেখে বলল, হাই!

জ্যোৎস্নাও বলল, হাই!

এই হল মারকিন সম্ভাষণ। বব বলল, খুঁড়োমশাই পুলিশ দফতরে গেলেন। হোটেলের ম্যানেজার খুব ভয় পেয়ে গেছে। কোকো পামে এই প্রথম চুরি বিশবছর পর। বিশবছর আগে একবার এক পর্যটকের জুতো চুরি গিয়েছিল। এক পাটি কেডস! যাইহোক, বাইরে রোদ্দুরের ফুল ফুটছে। ঘরে বসে থাকার মানেটা কী?

বললাম, বসো। কফি আসছে। খেয়ে বেরুব। তারপর বাংলায় জ্যোৎস্নাকে বললাম, জ্যোৎস্না, তোমার সময় হবে তো?

জ্যোৎস্ন! বলল, অঢেল সময়। আপনাকে নিয়ে ঘুরে সব দেখাব বলেই তো এসেছি।

বব ভুরু কুঁটকে বলল, তোমরা মাতৃভাষায় আমাকে গাল দিচ্ছ কি?

বললাম, সরি বব! ভুল হয়েছে। আমরা তোমার সামনে বাংলা বলব না। কারণ সেটা অভদ্রতা হয়।

একটু পরে পলিনেশীয় শরিচারিকা কফি নিয়ে এল। কফির সঙ্গে প্রকান্ড এক প্লেট বাদাম ফাউ হিসেবে। এ বাদাম, জ্যোৎস্না জানাল, এই স্বর্গোদ্যানেরই ফসল। চিবুলে ছানার স্বাদ পাওয়া যায়। আমার জিভে নারকোল মনে হল। পরিচারিকাটি পলিনেশীয়দের মতোই বেঁটেখাটো মোটাসোটা। গায়ের রং উজ্জ্বল বাদামী। চ্যাপটা মুখ এবং নাকটা সরু। হঠাৎ দেখলে জাপানী মনে হতে পারে। তবে কাল থেকে পথেঘাটে অনেক খাড়ানাক-ওয়ালী মেমসায়েবের মতো মেয়েও দেখেছি—তারাও পলিনেশীয়। কারুর গায়ের রঙ কালোও। কিন্তু সবসময় যুখে হাসিটি লেগে আছে।

জ্যোৎস্না আমাদের অবাক করে পলিনেশীয় ভাষায় ওর সঙ্গে কথা। বলতে লাগল। মেয়েটি চলে গেলে বললাম, বাঃ জ্যোৎস্না! তুমি ওদের ভাষা শিখে ফেলেছ দেখছি?

জ্যোৎস্না বলল, অল্পসল্প। জয়ন্তদা, ওকে জিগ্যেস করলাম টিহো নামে কাকেও চেনো নাকি—আদিম রাজার বংশধর টিহো? ও বলল, টিহো এখানেই চাকরি করে। এ হোটেলের বেল ক্যাপটেন সে। অর্থাৎ পোর্টারদের সর্দার। হোটেলে লোক এলে তার নির্দেশে বেলম্যানরা ব্যাগেজপত্তর ঘরে পৌছে দেয়। হোটেল ছাড়লে ঘর থেকে ব্যাগেজ নিয়ে গিয়ে গাড়িতে ওঠায়। এসব ওদের দায়িত্ব।

বললাম, জানি। টিহোর কথা কী বলল বলো।

জ্যোৎস্না বলল, টিহোকে সকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বব এবং আমি একসঙ্গে বলে উঠলাম, সে কী!

হ্যাঁ। মেয়েটির নাম ওলালা। ওর ধারণা, টিহো সানফ্রান্সিসকোতে তার মারকিন বউটার কাছে ফিরে গেছে। টিহোবুড়োর সংসারটি, বেজায় বড়ো সেখানে। একগাদা নাতিপুতিও আছে। সবাই একসঙ্গে থাকে।

বললাম, টিহো বয়সে বুড়ো নাকি?

জ্যোৎস্না বলল, হ্যাঁ—তাই তো বলল ওলালা।

বব বলল, ওঃ হো! মনে পড়ছে। রিসেপশানে গম্ভীর চেহারার এক বুড়ো! পলিনেশীয়কে দেখেছিলাম। ওহে জায়েন্টো, আমার এ কথাও মনে পড়েছে এতক্ষণে—তুমি রিসেপশানের সামনে দীড়িয়ে তোমার রহস্যময় সিগারেট কৌটটা বের করেছিলে এবং সিগারেট টানছিলে।

জ্যোৎস্না চোখ বড়ো করে বলল, তাহলেই সব রহস্য ফাঁস হয়ে গেল জয়ন্তদা। টিহোবুড়ো তখনই জিনিসটা দেখে চমকে উঠেছিল। তারপর…

সে হঠাৎ থেমে কী ভাবতে লাগল। তারপর ফের বলল, দেখুন জয়ন্তদা! কাল বলছিলাম না। আপনাকে? মিনিহুনরা রাজা হোলাহুয়াকে খুব খাতির করত বলে কিংবদন্তী আছে। আমার মনে হচ্ছে, টিহোর সঙ্গে মিনিহুনদের যোগাযোগ থাকা সম্ভব। একজন মিনিহুনকে সে ডেকে এনেছিল হোটেলে।

বব হাসতে হাসতে বলল, তোমরা বাঙালীরা বড় কল্পনাপ্রবণ জাত। যাক্গে বাইরে কত রোদ্দুর। ঘরের ভেতর বসে বিদঘুটে আলোচনা! করে লাভটা কী? চলো, বেরিয়ে পড়ি!…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *