টিহোর চেলা তুয়া

টিহোর চেলা তুয়া

প্রায় তিনঘন্টা অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে ঘোরাঘুরি করছ। কিন্ত বেরুবার পথ পাচ্ছি না। ঘড়িতে সাতটা বাজে। বুঝতে পারছি, বাইরে অন্ধকার রাত। তাই কোন ফাটলে বাইরের আকাশ দেখা গেলেও আমরা চিনতে পারব না—বিশেষ করে আকাশে যদি মেঘ থাকে। তাহলেও কি বারোঘণ্টা আমাদের এখানে কাটানো উচিত হবে? বাইরের পৃথিবীতে আলো ফুটলে কোনে ফাটলে তার আভাস নিশ্চয় পাব। কিন্তু ততক্ষণে শয়তান গ্রিনকট কি চুপ করে বসে থাকবে?

মারিয়া বললেন, পথ খুঁজে বের না করতে পারলে আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত। গ্রিনকট খুব নিষ্ঠুর। সে আমাদের ক্ষমা করবে না। তিনজনের হৃৎপিন্ড নিজেই ওপড়াবে।

জ্যোৎস্না বলল, এবার আমি চেষ্টা করি। তোমরা আমার পেছনে এস।

সে সামনে গেল। তারপর পেছনে মারিয়া, শেষে আমি।

কয়েক পা গেছি, হঠাৎ আমার ডানহাতের কলার কাঁদিতে হেঁচকা টান পড়ল। থমকে দাড়ালাম। কিন্তু আর কিছু ঘটল না। ভাবলাম অন্ধকারে পাথরে ধাক্কা লেগেছিল।

কিন্তু আবার একটু পরে ফের হ্যাঁচকা টান পড়ল মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আরে আরে এ কী!

মারিয়া ও জ্যোৎস্না বলে উঠলেন, কী কী?

কে কলার কাঁদি ধরে টানল যেন। পরপর দুবার।

জ্যোৎস্না বলল, ভূতে টানছে। অত ভয় যদি, ঠাকুমাকে পেছনে যেতে দাও।

রাগ করে বললাম, ভূতটুত আমি মানিনে। চলো, এবার টান পড়লে দেখছি কী ব্যাপার।

আবার কিছুদূরে যাওয়ার পর ফের সেইরকম হ্যাঁচকা টান। সঙ্গে সঙ্গে কাঁদিদুটো নামিয়ে রেখে লাইটার জ্বাললাম। জ্যোৎস্মা ও মারিয়া থমকে দাড়িয়েছে! আলো কমে প্রায় শেষ হয়ে আসছে লাইটারের মাথার। তবু দেখতে ভুল হল না—আমার পেছনে দাড়িয়ে একটা মিনিহুন গপ্‌গপ্‌ করে কলা গিলছে।

মারিয়া প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন হঠাৎ তুয়া! ভুয়া!

জ্যোংস্না বলল, তুয়া কি ঠাকুমা?

মারিয়া কান করলেন না জ্যোৎস্মার কথায়। লাইটারের গ্যাস আর নেই। ঘন অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর মারিয়ার মিঠে গলা শোনা গেল, তুয়া। এ্যাদ্দিন তুই কোথায় ছিলি?

তারপর টের পেলাম, মারিয়া মিনিহুনটার দিকে এগোচ্ছেন। বললাম, ও ঠাকুমা। ব্যাটাচ্ছেলে তুয়া তোমার ন্যাওটা নাকি?

মারিয়া বললেন, হ্যাঁ। বছর তিনেক আগে তুয়াকে নিয়ে আমি পালানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমি ধরা পড়ে যাই। তুয়া পালিয়ে গিয়েছিল। ওর গলায় আমি আমার সরু চেনটা পরিয়ে দিয়েছিলাম। সেটা এখনও আছে দেখছি। জয়ন্ত, কলার কাঁদি দুটো আমাকে দাও। বাছার বড্ড খিদে পেয়েছে। কতদিন খায়নি মনে হচ্ছে।

কাঁদি দুটো অন্ধকারে ঠাহর করে এগিয়ে দিলাম। তারপর বললাম, ঠাকুমা। মনে পড়েছে, টিহোর কাছে যে মিনিহুনটা দেখেছিলাম, তার গলায় এই চেনটাই তাহলে চিকচিক করছিল।

টিহোর কাছে?

হ্যাঁ, ঠাকুমা।

জ্যোৎস্না! বলল, তাহলে বোঝা যাচ্ছে, টিহো প্রায়ই এসব গুহায় এসে সোনার প্যাকেট খুঁজে বের করার চেষ্টা করত। কোনোভাবে তুয়াকে সে দেখতে পায়। সঙ্গে নিয়ে যায়।

আমি বললাম, বাকিটা আমিও আঁচ করতে পেরেছি। আজ সকালে ওয়েইকাপালি গুহার ভেতর গ্রিনকটের হায়েনারা যখন টিহো ও তার সঙ্গীদের খেয়ে ফেলে, তখন তুয়া পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত গুহার সুড়ঙ্গে সুড়ঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর কারণ কী ওর?

মারিয়া বললেন, মনে হচ্ছে, দলে ফিরে যাবার জন্যে কানাচে কানাচে ঘুরছিল। কিন্ত সাহস পায়নি। আহা, বেচারা আজ সারাদিন না খেয়ে আছে। খাও বাছা, সবগুলো খেয়ে ফেলো।

তারপর ডাবের জল খাবে। জোৎস্না ডাবগুলো দাও।

কিছুক্ষণ ধরে তুয়ার খাওয়াদাওয়া হল। তারপর মারিয়া বললেন, আর ভাবনা নেই। তুয়া আমাদের বাইরে পৌঁছে দেবে। বাছাকে এতটুকুন থেকে আমিই লালনপালন করছি বলতে গেলে। ওর বয়স হল নবছর প্রায়। ফাদার গ্রিনকট ওর বাবা-মাকে নিয়ে উৎকট পরীক্ষা করতে গিয়ে মেরে ফেলেছিল। ওকে আমিই খাইয়ে-দাইয়ে বড় করেছিলাম।

বললাম, তা যাই বলুন ঠাকুমা। আপনার এই শ্রীমান তুয়া বড় নেমকহারাম। টিহোর পোষ মেনেছিল কোন আক্কেলে?

মারিয়া বললেন, প্রাণের দায়ে জয়ন্ত। গ্রিনকটকে মিনিহুনরা বেজায় ভয় করে।

তাই বলে ও আমার ঠ্যাং ধরে টানবে? রাগ দেখিয়ে বললাম। জানেন? কোকো পাম হোটেলে ব্যাটাচ্ছেলে আমার টেবিলের তলায় লুকিয়ে ছিল। তারপর ঠ্যাং ধরে এমন হ্যাঁচকা টান মেরেছিল। যে আমি চিৎপাত একেবারে।

মারিয়া বললেন, চুপ। আর কথা নয়। বাছা তুয়া। এবার চলো আমরা বাইরে যাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *