সিগারেট কেসের রহস্য
খুড়ো ভাইপোর সঙ্গে আধঘন্টা পরে ফের প্লেনে উঠলাম। কাউয়াই দ্বীপে পৌঁছতে মোটে সাতাশ মিনিট লাগল। এই এয়ারপোর্টের নাম লিহিউ। চারিদিকে আখের ক্ষেত, মধ্যিখানে বিমানক্ষেত্র। গেট পেরিয়ে গিয়ে ট্যাক্সিতে উঠলাম তিনজনে। জনখুড়ো ট্যাক্সি চালকে বললেন, হায়না টাউনশিপ।
কাউয়াইকে বলা উদ্যানদ্বীপ। সবুজ গাছের ভরা। দূরে হাজার পাঁচের উচু পাহাড় ‘মাউন্ট ওয়াইয়ালেয়াল’। আসলে দ্বীপটটার চারিদিকে উচু পাহাড়। খাঁড়িগুলো বিপদজনক। কাউয়াইদ্বীপে তাই জাহাজ ভেড়ার জায়গা নেই। কয়েক মাইল দূরে জাহাজ থেমে ছোট ছোট দুঃসাহসীরা খাঁড়িতে যদি বা ঢুকতে পারে, তীরে ওঠা অসম্ভব। খাঁড়া পাহাড়। তাই এ দ্বীপের সঙ্গে বাইয়ের যোগাযোগ শুরু প্লেন। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে টমাস কুক এ দ্বীপে নামতে পারেন নি।
ছোটবড় গোটা আষ্টেক দ্বীপ নিয়ে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ। আমেরিকার শাষনে রয়েছে। তাই আমেরিকা ঘুরে যেমনটি দেখেছি, এখানেও তাই। সুন্দর সুন্দর চকচকে রাঙাঘাটে পায়ে হাঁটার লোক নেই। এই কাউয়াই দ্বীপকে সত্যি একটা বাগানের মতো সাজিয়ে রেখেছে। হায়েনা উপনগরী পাহাড়ী টীলার গায়ে। উত্তর-পশ্চিম জুড়ে প্রশান্ত মহাসাগর। প্রায় হাজার ফুট নিচে সমুদ্রের জল গর্জন করছে। সাদা ফেনা দুলছে। ঝাঁকে ঝাঁকে সমুদ্রপাখী উড়ছে। শব্দে কানঘ পাতা দেয়।
ততক্ষণে লিহিউতে নেমেই জনখুড়ো ফোন করে হোটেল বুক করেছেন। হোটেলের নাম কোকো পাম হোটেল। দোতলা হোটেল। ওপরতলায় আমি একটা সিঙ্গেল স্যুট, খুড়ো ভাইপো একটা ডাবল স্যুট ভাড়া, করেছেন। এ হোটেলেও যা রাজকীয় বিলাস আর আরামের ব্যবস্থা, আমাদের দেশের সেরা হোটেলেও তা কল্পনা করা যায় না। আনলা দিয়ে খাড়ির নিচে সমুদ্র চোখে পড়ছিল। বিকেল চারটে বেজে গেছে। পাশের ঘর থেকে ফোন করলেন জনখুড়ো। ককি খেতে ডাকলেন।
গিয়ে দেখি, নিজেরাই কফি তৈরি করেছেন। প্রতি ঘরে কফি তৈরির ব্যবস্থা আহে। কফি খেতে খেতে জন বললেন, কী মনে হচ্ছে ? কাউয়াই স্বর্গোদ্যান না?
স্বীকার, করলাম।… অবশ্যই সিঃ নর্থব্রুক। এমন জায়গ।থাকতে পারে, ভাবিনি। তাছাড়া…
কথা কেড়ে বব বলল, তুমিও আমার মতো ওঁকে আংকল জন বা জনখুড়ো বলতে পারো জায়েন্টো! তাতে উনি রাগ করবেন না।
জনখুড়ো হাসিমুখে বললেন, মোটেও রাগ করব না। তুমিও আমার ভাইপোর বয়সী জয়ন্ত!
বললাম, আপনি তো দিব্যি জয়ন্ত উচ্চারণ করতে পারছেন, কিন্তু বব আমাকে জায়েন্টো বানিয়ে ছাড়ল। অথচ আমি জায়েন্টো বা দৈত্যের এক শতাংশও নই।
এই সময় দেখলাম, বব সিগারেটের প্যাকেট বের করে খুড়োর দিকে বাড়িয়ে দিল। আমার চোখে এট দৃষ্টিকটু । গুরুজনদের সিগারেট দেওয়া তো দূরের কথা, তাদের সামনেও আমরা ভারতীয়রা সিগারেট খাই না। কিন্তু সায়েবদের রীতিনীতি আলাদা। জন সিগারেট নিলেন। বব আমার দিকে এগিয়ে দিল প্যাকেট। বললাম, ধন্যবাদ বৰ। আমি আলাদা! ব্রান্ডের সিগারেট খাই। আমার কড়া সিগারেট পছন্দ।
বলে পকেট থেকে আমার সিগারেটকেস বের করলাম।
জনখুড়ো আমার সিগারেটকেসটার দিকে তাকিয়েই কেমন যেন চমকে উঠলেন। তারপর খপ করে ওটা প্রায় কেড়ে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে থাকলেন।
আমি তো হতভম্ব। বব মিটিমিটি হেসে বলল, দেখছ কী জায়েন্টো! খুড়ো তোমার সিগারেটকেসটির মধ্যে নিশ্চয় হাজার-হাজার বছরের পুরনোর ইতিহাসের গন্ধ পেয়ে গেছেন! খুড়োমশাই প্রাচীন ইতিহাসের দিগগজ পণ্ডিত কি না। দেখবে, হয়তো! তোমার সিগারেটকেস নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার বক্ততা দিতে দৌড়ুবেন।
ভাইপোর তামাশার দিকে মন নেই জনখুড়োর। সিগারেটকেসটা খুলে উনি সিগারেটগুলো বের করে টেবিলে রাখলেন। তারপর জানলার কাছে গিয়ে ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, হুম! জয়ন্ত, এ জিনিস তুমি কোথায় পেলে? নিশ্চয় লসএঞ্জেলিসের কোন কিউরিও শপে?
বললাম, না খুড়োমশাই। কিউরিও শপের জিনিসের দাম দেবার পয়সা কোথায় আমার? সিগারেটকেসটা আমি পয়সা দিয়ে কিনিনি। ওটা আমার এক বাল্যবন্ধুর উপহার।
জনখুড়ো উত্তেজিতভাবে বললেন, বাল্যবন্ধু! কে সে বাল্যবন্ধু?
বললে কি চিনবেন? হাসতে হসতে বললাম সে থাকে পশ্চিমবঙ্গের এক অজ পাড়াগায়ে। নিছক চাষাভুষো মানুষ। গাঁয়ের পাঠশালায় আমার সঙ্গে দিনকতক অ আ ক খ শিখেছিল। তারপর পড়া ছেড়ে বাবার সঙ্গে জমি চষতে গিয়েছিল। আর পড়াশোনা হয়নি তার। বছর ছুই আগে কলকাতা থেকে গাঁয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম তখন সে এটা উপহার দিয়েছে।
জন নর্থব্রুক আমার মুখোমুখি বসে তেমনি উত্তেজনায় প্রশ্ন করলেন, আশ্চর্য! সে কোথায় পেল এ জিনিস?
মাঠে জমি চাষ করতে গিয়ে লালের ফালে এটা মাটির তলা থেকে উঠে এসেছিল। এবার একটু গম্ভীর হয়েই জবাব দিলাম।
আমার বিস্ময়টা বেড়ে যাচ্ছিল, তাই।
জনখুড়ো চিন্তিতভাবে বললেন, এ বড় আশ্চয় জয়ন্ত! এখন আমার মনে হচ্ছে, যেন তোমার এই কাউয়াই দ্বীপের হায়েনা উপনগরীতে ছুটে আসার মধ্যে নিয়তির অনিবার্য টানে টের পাচ্ছি। জয়ন্ত, এই সিগারেটকেস এখানকারই পোলিনেশীয় জাতির লোকেরা তৈরি করে। এই দেখ, খুদে হরফে লেখা আছে ‘মেড ইন হায়েনা’। কিন্তু তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, এর গায়ে প্রাচীন পোলিনেশীয় ভাষার লেখা! কয়েকটা কথা। ‘আহোয়ায়ালোয়া’। তার পাশে দেখতে পাচ্ছ এই চিহ্নটা? একটা ত্রিবুজুর মাথায় যেন চন্দ্রকলা আঁকা। বড় রহস্যময় ব্যাপার জয়ন্ত! আমি মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না।
খুড়ো মুঠোয় সিগারেটকেসটা আ*কড়ে ধরে চোখ বুজে কী যেন ভাবতে লাগলেন। বব আমার দিকে চোখ টিপে ইশারা করল এবং মিটিংটি হাসতে লাগল।
চোখ খুলে জনখুড়ো বললেন, কাছিমজাতীয় একরকম সামুদ্রিক প্রীণীর খোলা থেকে এসব সিগারেটকেস তৈরি করে ওরা। আমার চোখে পড়ল ওই ত্রিভূজের মাথায় চন্দ্রকলা চিহ্নটা। এটা এই দ্বীপের আদিম রাজের প্রতীকচিহ্ন। আর ‘আহোয়ায়ালোয়া’ কথাটার মানে ‘এর ভেতরে ভূত আছে।’ আমি বুঝতে পারছি না, এটা ভারতের একটা গ্রামের মাঠে চাষের জমিতে কীভাবে গেল?
আমি ব্যাপারটা ভাবছিলাম। এতক্ষণে হদিস মিলে গেল। বললাম, জনখুড়ো! একটা যোগাসুত্র খুঁজে পেয়েছি মনে হচ্ছে। আমাদের গ্রামের যে মাঠে জিসিনটা আমার আমার চাষীবন্ধু কুড়িয়ে পেয়েছিল, ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দে সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটা সমরিক বিমানঘাঁটি বানানো হয়েছিল। তখন আমি নেহাত বাচ্চা। শুনেছি, একদিন একটা ছোট প্লেন কীভাবে সেখানে আছড়ে পড়ছিল নামাবার সময়। প্লেনটায় আগুন ধরে যায়। পাইলট বা তার সঙ্গীরা কেউ বাঁচেনি। এখন মনে হচ্ছে, এই সিগারেটকেসটা ওদেরই কারুর কাছে ছিল। যেভাবে হোক, ওটা ধ্বংসস্তূপে টিকে গিয়েছিল। তারপর বিমানঘাঁটিটা যুদ্ধের শেষে উঠে যায়। অনেকবছর পরে জমিতে চাষ পড়ে। তখন সিগারেটকেসটা বেরিয়ে আসে লাঙলের ফলার।
জন সায় দিয়ে বললেন, ঠিক ঠিক। বোঝো গেল সব। এ নিশ্চয় কোনো আমেরিকার কাছে ছিল। কিন্তু জয়ন্ত, আবার বলছি—যেন তুমি নিয়তির টানেই ছুটে এসেছ হায়েনাতে। কারণ হায়েনার আদিম রাজা প্রতীক-চিহ্ন ওই সিগারেটকেস তোমার কাছে।
ভয় পেয়ে বলেছিলাম, ওরে বাবা! নিয়তি-টিয়তি শুনলে বুক ঢিপ-ঢিপ করে কাঁপে যে!
বব বলল, খুড়ো! ওই হোয়া হোয়া হোয়া ব্যাপারটা কী বলছিলেন যেন?
জন বললেন, তামাশা নয় বব! কথাটা মানে ‘এর ভেতরে গোপন বুতান্ত আছে।’ তার মানে এই সিগারেটকেসটার ভেতর আদিম রাজা হোলাহুয়া সংক্রান্ত কোনো গোপন বিবরণ ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় তা সেই প্লেন দূর্ঘটনার সময় নষ্ট হয়ে গেছে। কিংবা…
বাধা দিয়ে বললাম, জনখুড়ো! আমার চাষীবন্ধু বলেছিল এর ভেতর দলাপাকানো শক্ত কিছু জিনিস ছিল। সেগুলো সে ধুয়ে সাফ করেছিল।
জন বললেন, হুঁ যা ভেবেছি, তাই
বব বলল, দলাপাকানো শক্ত জিনিসগুলো সিগারেট ছাড়া কিছু নয়।
জন ভাইপোর দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ—হ্যাঁ তা হতেও পারে। জয়ন্ত, জিনিসটা আমি ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখতে চাই। তোমার কি আপত্তি আছে?
আমি বলার আগেই বব বলে উঠল, জায়েটো খুব ভাল ছেলে। ওর কোনো আপত্তি নেই। আপনি ওটা নিয়ে গবেষণা লাগে যান। ততক্ষণ আমি জায়েন্টোকে এবার চক্কর দিয়ে আসি।
জনখুড়ো গম্ভীর মুখে বললেন, যেখানে যাবে যাও, গুহা-টুহায় যেন ঢোক না। সাবধান। আর জয়ন্ত ও যদি কোনো গুহায় ঢুকাতে চায়, তুমি ওর চুল খামচে ধরে ঠেকাবে। বব চুলে জব্দ।
বব তার মাথায় লম্বা মেয়েলি চুলগুলো দুহাতে ঢেকে বলল, জায়েন্টো, আমার চুলে কিন্তু বিদ্যূৎ আছে। শক মারবেঅ ছুয়ো না।
বলে সে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে বাইরে নিয়ে গেল।…
