সোনার কাঁটা – ৩

পয়লা অক্টোবর, মঙ্গলবার, 1968।

দার্জিলিঙ-এর আগের স্টেশন, ঘুম। পৃথিবীর সর্বোচ্চ রেলস্টেশন। দার্জিলিঙ স্টেশনের চেয়েও তার উচ্চতা বেশি। ঘুমের অদূরে খেলাঘরের রেললাইনটা জিলিপির প্যাঁচের মতো বার দুই পাক খেয়েছে—তার নাম বাতাসিয়া ডবল-লুপ। তারই পাশ দিয়ে একটা পাকা সড়ক উঠে গেছে ওপর দিকে—ও পথে যেতে পার ক্যাভেন্টার্স অথবা কঞ্চন ডেয়ারিতে কিম্বা ‘টাইগার হিল’-এ। এই সড়কের উপরেই প্রকাণ্ড হাতা-ওয়ালা একটা বাড়ি। এককালে ছিল কোনো চা-বাগানের ইউরোপীয় মালিকের আবাসস্থল। বর্তমানে এটাই ‘দ্য রিপোস’ হোটেল। না, কথাটা ঠিক হল না—আজ নয়, আগামিকাল থেকে সেটা হবে রিপোস হোটেল। আগামিকাল দোসরা তার উদ্বোধন।

মালিক শ্রীমতী সুজাতা মিত্র। সুজাতা বিবাহিতা — স্বামী কৌশিক মিত্র। শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বি-ই। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। সুজাতার বাবা ডঃ চট্টোপাধ্যায় ও ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি কী একটা আবিষ্কার করেছিলেন বলে শোনা যায়। সেই আবিষ্কারের পেটেন্টটা স্বনামে নেবার আগেই সন্দেহজনকভাবে আকস্মিক মৃত্যু হয়েছিল ভদ্রলোকের। আবিষ্কারের সেই রিসার্চ-পেপারগুলো নিয়ে সুজাতা রীতিমত বিপদের ভিতর জড়িয়ে পড়ে। এমনকি শেষ পর্যন্ত এক খুনের মামলায়। রিসার্চের কাগজগুলো হাত করতে চেয়েছিলেন একজন কুখ্যাত ধনকুবের—ময়ূরকেতন আগরওয়াল। তিনিই ঘটনাচক্রে খুন হন। কৌশিক এবং সুজাতা বিশ্রীভাবে জড়িয়ে পড়ে সেই খুনের মামলায়। বস্তুত ব্যারিস্টার পি. কে. বাসু এবং অ্যাডভোকেট অরূপরতনের যৌথ চেষ্টায় ওরা দুজনেই মুক্তি পায়। এর মধ্যে বাসু-সাহেবের ভূমিকাটাও ছিল মুখ্য। যাই হোক শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হল আগরওয়ালের হত্যাকারীর নাম-নকুল হুই। সে ছিল আগরওয়ালেরই অধীনস্থ কর্মচারী এবং নানান পাপ-কারবারের সাথি। সে-সব অতীতের ইতিহাস। ‘নাগচম্পা’ উপন্যাস যাঁরা পড়েছেন অথবা ‘যদি জানতেম’ ছায়াছবিতে উত্তম-সৌমিত্রের যৌথ অভিনয় যাঁরা দেখেছেন তাঁদের কাছে এসব কথা অজানা নয়।

মোট কথা ইতিমধ্যে সুজাতার সঙ্গে কৌশিকের বিয়ে হয়েছে বছরখানেক আগে। এখনও ঠিক এক বছর হয়নি। আগামী পাঁচই অক্টোবর, শনিবার ওদের প্রথম বিবাহ-বার্ষিকী। বিয়ের পরে কৌশিক ডঃ চ্যাটার্জির ঐ আবিষ্কারটা নিয়ে হাতে-কলমে কাজ করতে চায়; কিন্তু সুজাতা রাজি হতে পারেনি। ঐ সর্বনাশা আবিষ্কারটা তার কাছে কেমন যেন অভিশপ্ত মনে হয়েছিল। তিন-তিনজন লোকের মৃত্যু ঐ আবিষ্কারটার সঙ্গে জড়িত। প্রথমত ডঃ চট্টোপাধ্যায়ের রহস্যজনক মৃত্যু, দ্বিতীয়ত গুলিবিদ্ধ হয়ে ময়ূরকেতন আগরওয়ালের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং তৃতীয়ত হত্যাকারী নকুল হুই-এর ফাঁসি। হ্যাঁ—আগরওয়ালের হত্যাকারী নকুল হুইকে শেষ পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়। নকুল চেষ্টার ত্রুটি করেনি—সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়েছিল-কিন্তু লোয়ার কোর্টের বিচার তিলমাত্র নড়েনি। অর্থলোভে সুপরিকল্পিতভাবে নকুল যে হত্যাকাণ্ডটা করেছিল তার জন্য বিচারক চরমতম দণ্ডই বহাল রেখেছিলেন।

তাই কেমন একটা অবসাদ এসেছিল সুজাতার। ঐ রিসার্চের কাগজগুলো থেকে সে মুক্তি চেয়েছিল। নিজের কুমারী জীবনের ঐ অভিশাপকে বিবাহিত-জীবনে টেনে আনতে চায়নি। কৌশিক ইঞ্জিনিয়ার। এসব ভাবালুতার প্রশ্রয় সে প্রথমটা দিতে চায়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেও মেনে নিয়েছিল। ফলে নগদ দেড় লক্ষ টাকায় ঐ পেটেন্টটা ওরা বিক্রয় করে দিয়েছিল বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জীমূতবাহন মহাপাত্রের কাছে। জীমূতবাহন হচ্ছেন অরূপরতনের পিতৃদেব। হয়তো অরূপের প্রতি কৃতজ্ঞতাও এ সিদ্ধান্তের পিছনে কাজ করে থাকবে।

সুজাতা তার সদ্যোবিবাহিত স্বামীকে বলেছিল, ঐ নগদ দেড়লাখ টাকা দিয়ে এবার তুমি ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করো।

কৌশিক হেসে বলেছিল, তুমি যেমন ঐ রিসার্চ পেপারগুলো থেকে মুক্তি চাইছিলে সুজাতা, আমিও তেমনি আমার ঐ ডিগ্রিটা থেকে মুক্তি চাইছি আজ। আমি ভুলে যেতে চাই যে, আমি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার!

সুজাতা অবাক হয়ে বলেছিল, ও আবার কী কথা? কেন?

—ভারতবর্ষে ইঞ্জিনিয়ারের প্রয়োজন নেই। এদেশে ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার অথবা কারিগরি কাজ-জানা মানুষের আর কোনো দরকার নেই! এদেশের প্রয়োজন এখন শুধু রাজনীতিবিদ, ব্যারিস্টার আর আই. এ. এস. অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের!

—হঠাৎ তোমার এই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত?

—দেখতে পাচ্ছ না দেশের হাল? ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-বৈজ্ঞানিকেরা এ দেশে অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। দলে দলে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ইহুদি হওয়ার অপরাধে নাৎসি জার্মানি যেমন আইনস্টাইনকে দেশত্যাগী করেছিল, বৈজ্ঞানিক হওয়ার অপরাধে আজ তেমনি প্রফেসর খোরানাকে ভারতবর্ষ দেশছাড়া করেছে!

সুজাতা হেসে বলে, এ তোমার রাগের কথা। খোরানা নোবেল প্রাইজ পাবার পর তাঁকে পদ্মবিভূষণ খেতাব দেওয়া হয়েছে!

হো-হো করে হেসে উঠেছিল কৌশিক। বলেছিল, ভাগ্যে প্রফেসর খোরানা শিশির ভাদুড়ী কিংবা উৎপল দত্তের পদাঙ্ক অনুসরণ করেনি!

—তুমি কী বলতে চাইছ বলো তো?

—আমি বলতে চাইছি ম্যাট্রিকে আমি তিনটে লেটার পেয়েছিলাম, স্টার পেয়েছিলাম, বি.ই.-তে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলাম! আমাদের স্কুল-ব্যাচের প্রত্যেকটি ভাল ছেলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার অথবা বৈজ্ঞানিক হতে চেয়েছে। যারা ঐ সব কলেজে ঢুকতে পারেনি সেই সব ঝড়তি-পড়তি মালই গেছে জেনারেল লাইনে। তাদের একটা ভগ্নাংশ আজ আই এস. আর একটা ভগ্নাংশ আজ এম. এল. এ.!

সুজাতা তর্ক করেছিল। বলেছিল—তা তুমিই আই. এ.এস. পরীক্ষা দিলে পারতে? তুমিও ইলেকশানে দাঁড়াতে পারতে!

কৌশিক বিচিত্র হেসে বলেছিল, তুমিও যে মন্ত্রীদের মতো কথা বলছ সুজাতা! ছয় বছরের পাঠক্রম শেষ করে আই. এ. এস. পরীক্ষা না দিলে আমার ঠাঁই হবে না এ পোড়া ভারতবর্ষে? কিন্তু মুরারী মুখার্জির মতো একজন সার্জেন, বি.সি. গাঙ্গুলির মত একজন ইঞ্জিনিয়ার অথবা খোরানার মতো একজন বৈজ্ঞানিক যতদিন ফিনান্স কমিশনার, অথবা চিফ সেক্রেটারি হতে না চাইছেন—

অসহিষ্ণু হয়ে সুজাতা বলে উঠেছিল, মোদ্দা কথাটা কী? তুমি কী করতে চাও?

ঐ দেড় লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে রেখে তার সুদের টাকায় আমরা গায়ে ফুঁ দিয়ে ঘুরে বেড়াব? না! ব্যবসাই করতে চাই আমি—

—আমিও তো তাই বলছি। ব্যবসাই যদি করতে হয় তবে যে জিনিসটা জান, বোঝ, তার ব্যবসাই করা উচিত। আমি তো তোমাকে চাকরি করতে বলছি না; আমি বলছি ঠিকাদারি করতে—

—কোথায়? পি.ডাবলু.ডি., ইরিগেশান অথবা কোনও পাবলিক আন্ডারটেকিং-এ তো? সর্বত্রই তো ঐ দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রদল শীর্ষস্থান দখল করে বসে আছেন। তাঁদের তৈলাক্ত করতে না পারলে-

—তবে কিসের ব্যবসা করবে তুমি?

—যে কোনো স্বাধীন ব্যবসা। যাতে কাউকে তোষামোদ করতে হবে না। আর সেটা এমন একটা ব্যবসা হবে যেখানে তুমি-আমি দুজনেই খাটব। ইকোয়ার পার্টনাল!

—যেমন?

—ধরো, আমরা একটা হোটেল খুলতে পারি। তুমি কিচেন-এর ইনচার্জ। কী রঙের পর্দা হবে, কী জাতের বেড-কভার হবে সব তোমার হেপাজতে। আর আমি রাখব হিসাব, ম্যানেজমেন্ট! সারাদিন দুজনে কাছাকাছি থেকে কাজ করব। সকালবেলা দুটো নাকে মুখে গুঁজে ঠিকাদারি করতে বেরিয়ে যাব, আর রাত দশটায় ক্লান্ত শরীরে ফিরে আসব, তার চেয়ে এটা ভাল নয়?

কথাটা মনে ধরেছিল সুজাতার।

তারই ফলশ্রুতি ‘দ্য রিপোস’!

জমি-বাড়ি-ফার্নিচার, ফ্রিজ, কিচেন-গ্যাজেট এবং একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড গাড়ি কিনতেই খরচ হয়ে গেল লাখখানেক টাকা। বাকি টাকা ব্যাঙ্কে রেখে ওরা দুজনে খুলে বসেছে হোটেল বিজনেস। বাড়িটা দোতলা। চারটে ডবল্-বেড বড় ঘর এবং দুটি সিংগল্‌-বেড। এ-ছাড়া এতলায় বেশ বড় একটা ড্রইং-কাম-ডাইনিং রুম। কিচেন-ব্লক, প্যান্ট্রি, স্টোর ইত্যাদি। রীতিমত বিলাতি কায়দায় প্ল্যানিং। প্রতিটি বেডরুমের সঙ্গেই সংলগ্ন স্নানাগার। কৌশিক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়িটার মেরামতি করিয়েছে। গরম জলের গিজার বসিয়েছে। সুজাতা ম্যাচকরা পর্দা, বেড-কভার ইত্যাদি কিনেছে। আয়োজন সম্পূর্ণ। আগামিকাল ‘দ্য রিপোস’-এর উদ্বোধন। গোটাছয়েক বিজ্ঞাপন মাত্র ছাড়া হয়েছে। দুজন সে বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়েছেন। আশা করা যায় পুজো মরসুমে ঘর খালি পড়ে থাকবে না। দার্জিলিং-এর হৈ-চৈ এড়িয়ে নিরিবিলিতে ছুটির কটা দিন কাটিয়ে যেতে ইচ্ছুক যাত্রী নিশ্চয় জুটবে। যে দুজন বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়েছেন তাঁদের একজন পুরুষ একজন স্ত্রীলোক। দুজনেই কলকাতাবাসী। মিস্টার নিজামুদ্দিন আলি এবং মিস্ কাবেরী দত্তগুপ্তা। দুজনেই জানিয়েছেন বুধবার, দোসরা, দুপুরে ছোট রেলে ঘুম স্টেশনে এসে পৌঁছাবেন। কৌশিক লিখেছিল, স্টেশনেই ওঁদের রিসিভ করা হবে। উদ্বোধনের দিন, প্রথম বোর্ডার—তাই এই খাতির।

বোর্ডার

উদ্বোধনের আগের দিন। মঙ্গলবার। পয়লা। সকাল থেকে কালীপদ আর কাঞ্চীকে নিয়ে সুজাতা শেষ বারের মতো ঝাড়াপৌঁছায় লেগেছে। কালীপদ মেদিনীপুরী— সমতলবাসী। চাকরির লোভে এসেছে এতদূর। রিপোস-এর একমাত্র বেয়ারা। আর কাঞ্চী হচ্ছে স্থানীয় নেপালি মেয়ে। সামনের গ্রামটায় থাকে।

দু-জন বোর্ডার অ্যাডভান্স পাঠিয়েছেন। এ-ছাড়াও আরও তিনজন আসছেন আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে। বারিস্টার পি. কে. বাসু সস্ত্রীক এবং অ্যাডভোকেট অরূপরতন। অরূপের জন্য দোতলার নয়-নম্বর ঘরটা ঠিক করা আছে, আর বাসু-সাহেবের জন্য একতলার দু-নম্বর ঘরটা। মিসেস্ বাসুর পক্ষে একতলা ছাড়া উপায় নেই। আলি-সাহেবের জন্য তিন নম্বর আর কাবেরীর জন্য দোতলার সাত-নম্বর ঘরটা মনে মনে স্থির করে রেখেছে সুজাতা। এখন ওঁদের পছন্দ হলে হয়।

বেলা দশটা নাগাদ কৌশিক গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে গেল কাঞ্চন-ডেয়ারির দিকে। ওখান থেকে মাইলপাঁচেক। গাড়ি যাবার রাস্তা আছে। কাঞ্চন-ডেয়ারির মালিক মিস্টার সেন ওদের পরিচিত। মিস্টার সেনের ভাইপো অজিত সেন কৌশিকের সহপাঠী। আপাতত ডজন দুই-তিন ডিম, কিছু হ্যাম, সফটমিট আর মাখন নিয়ে আসবে। আলি সাহেব হ্যাম খাবেন কি না জানা নেই। তাই দু-রকম মাংসের ব্যবস্থাই থাকল। ফ্রিজ আছে, নষ্ট হয়ে যাবার ভয় নেই। সুজাতা বলে দিয়েছে কাঞ্চন ডেয়ারির সঙ্গে যেন এটা অন-অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থা করে আসে। একদিন অন্তর কতটা কী মাল লাগবে তার ফিরিস্তি ও লিখে দিয়েছে। আজ বিকালে সুজাতার একবার দার্জিলিঙ যাবার ইচ্ছে। কৌশিককে তাই বলে রেখেছে সকাল করে ফিরতে। কিছু টুকিটাকি বাজার এখনও বাকি আছে।

বাসু-সাহেব কাল দার্জিলিঙ থেকে ফোন করেছিলেন। সুজাতা অনুযোগ করেছিল—আবার দার্জিলিঙ গেলেন কেন? সরাসরি এখানে এসে উঠলেই পারতেন?

বাসু-সাহেব সকৌতুকে বলেছিলেন, নেমন্তন্নর গন্ধ পেয়ে আমি দিগদিগ জ্ঞানশূন্য হয়ে যে আগেই এসে পৌঁছেছি।

—তাতে কী? আপনি তো ঘরের লোক! রানু মামিমাও এসেছেন তো?

—নিশ্চয়ই। তোমার ‘দ্য রপোস’ পর্যন্ত ট্যাক্সি যাবে তো?

—আসবে। আপনি এখনই চলে আসুন।

—না সুজাতা, কাল আসছি। লাঞ্চ-আওয়ার্সের পরে। ভাল কথা, রমেন গুহকে মনে আছে? আমাদের নাট্যামোদী রমেন দারোগা?

—খুব মনে আছে। কেন বলুন তো?

—বিপুলের কাছে শুনলাম রমেন দার্জিলিঙে বদলি হয়েছে। কাল পরশুর মধ্যে আসছে।

—তবে তাঁকেও নিমন্ত্রণ করবেন আমার হয়ে। আমি থানায় ফোন করে খবর নেব। মিস্টার ঘোষ আর মিসেস্ ঘোষ কিছুক্ষণের জন্য আসবেন বলেছেন।

—জানি। কিন্তু বিপুল বোধহয় শেষপর্যন্ত তোমার নিমন্ত্রণ রাখতে পারবে না। শুনছি গভর্নর-সাহেব স্বয়ং দার্জিলিঙ আসছেন। ফলে ডি. সি. সাহেবের সব স্যোশাল-অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল হয়ে যেতে পারে।

কালীপদ এসে দাঁড়াল। জানতে চায়, বড় ফুলদানিটা কোথায় থাকবে?

সুজাতা স্মৃতিচারণ থেকে বর্তমানে ফিরে আসে। ওর হাত থেকে চিনেমাটির ফুলদানিটা নিয়ে আঁচল দিয়ে মোছে। বলে, একতলায় ড্রয়িংরুমে, পিয়ানোটার উপর। কাল সকালে মনে করে ওতে ফুল দিবি। বুঝলি?

—আজ্ঞে, আচ্ছা।

ঘড়ির দিকে নজর পড়ে। বেলা প্রায় দুটো। এতক্ষণে কৌশিকের ফিরে আসা উচিত ছিল। রান্নাবান্না সেই কখন হয়ে গেছে। সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সুজাতা আর অপেক্ষা করল না। কালীপদ আর কাঞ্চীকে খাইয়ে ছেড়ে দিল। কালীপদর ওবেলায় ছুটি। কোথায় বুঝি পাহাড়িদের রামলীলা হবে, তাই শুনতে যাবে। তা যাক। সুজাতাও তো ওবেলায় দার্জিলিঙ যাবে। থাকবে না। হঠাৎ ঝন ঝন করে বেজে উঠল টেলিফোনটা। কৌশিকই ফোন করছে।

সুজাতা প্রশ্ন করে, কী ব্যাপার? এত দেরি হচ্ছে যে?

—আরে বোলো না। গাড়িটা ট্রাবল দিচ্ছে। মেরামত করাচ্ছি। ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে।

—তার মানে ওবেলা দার্জিলিঙ যাওয়ার প্রোগ্রাম ক্যানসেল?

—উপায় কী বলো! তুমি খাওয়া-দাওয়া মিটিয়ে নাও বরং।

—তা তো বুঝলাম; কিন্তু তুমি কোথা থেকে কথা বলছ? দুপুরে খাবে কোথায়?

—কাঞ্চন ডেয়ারি থেকে। সেন-সাহেবের অতিথি হয়েছি। বুঝলে? আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না!

অগত্যা উপায় কী? সুজাতা একাই খেয়ে নিল। ক্রমে বেলা পড়ে এল। বিকেলের দিকে কোথা থেকে আকাশে এসে জুটল দার্জিলিঙের কিছু খেয়ালি মেঘ। নামল বৃষ্টি। সন্ধ্যার আগেই ঘনিয়ে এল অন্ধকার। কৌশিকের ফোনটা আসার আগেই কালীপদকে ছুটি দিয়ে বসে আছে। আগে জানলে কালীপদকে ছাড়ত না। কাঞ্চী রাত্রে থাকে না। নির্বান্ধব পুরীতে চুপচাপ বসে রইল সুজাতা। জানলা দিয়ে দেখতে থাকে কার্ট-রোড দিয়ে গাড়ির মিছিল চলেছে—উপর থেকে নিচে আর নিচ থেকে উপরে। বাতাসিয়া ডবল লুপ দিয়ে একটা মালগাড়ি পাক খেতে খেতে নেমে গেল।

ঘনিয়ে এল সন্ধ্যা। অন্যদিন হলে দার্জিলিঙ-এর আলোর রোশনাই দেখা যেত। পাহাড়ের এখানে-ওখানে জুলজুলে চোখ মেলে রাতচরা বাতিগুলো তাকিয়ে থাকে। নিত্য দীপাবলীর রূপ-সজ্জা। আজ আকাশ আছে কালো করে। ঝিরঝির করে সমানে বৃষ্টি পড়ছে। আঞ্চলিক পাহাড়ে বৃষ্টি। হয়তো দার্জিলিঙ খটখটে, হয়তো কার্শিয়াঙ রৌদ্রোজ্জ্বল—বৃষ্টি নেমেছে শুধু ঘুমের দেশে। এলোমেলো হাওয়ার খ্যাপামি। সুজাতা সব দরজা-জানলা বন্ধ করে দিয়ে এসে বসে। এমন রাতে আলো ফিউজ হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। সে কথা মনে হতেই বুকের মধ্যে ছ্যাৎ করে ওঠে সুজাতার। এই নির্বান্ধব পুরীতে যদি অন্ধকারে তাকে একা বসে থাকতে হয়! তাড়াতাড়ি উঠে মোমবাতি আর দেশলাইটা খুঁজে নিয়ে হাতের কাছে রাখে। টর্চটাও। কালীপদটার যেমন বুদ্ধি! ঝড় জলে রামলীলার আসর নিশ্চয় ভেঙে গেছে। হতভাগাটা বাড়ি ফিরে এলেই পারে। কিন্তু ওরই বা দোষ কী? হয়তো আশ্রয় নিয়েছে কারও গাড়ি-বারান্দার তলায়। বৃষ্টিটা একটু না ধরলে সে বেচারি আসেই বা কী করে! পাহাড়ে বৃষ্টি, থাকবে না বেশিক্ষণ। দার্জিলিঙের বৃষ্টি ঐ অজাযুদ্ধ-ঋষিশ্রাদ্ধের সগোত্র। আসতেও যেমন যেতেও তেমন। কিন্তু কই, আজ তো তা হচ্ছে না। আবার নজর পড়ল দেওয়াল ঘড়িটার দিকে। প্রতি আধঘণ্টা অন্তর সে সাড়া দেয়। জানিয়ে দিল রাত সাতটা। হঠাৎ বেজে উঠল আবার ফোনটা। গিয়ে ধরল সুজাতা : হ্যালো?

—রিপোস?

—হ্যাঁ বলুন।

—আমি ‘হিমালয়ান মোটর রিপেয়ারিং শপ’ থেকে বলছি। আপনাদের গাড়ি মেরামত হয়ে গেছে। লোক দিয়ে পৌঁছে দেব নাকি মিস্টার মিত্র দার্জিলিঙ থেকে ফেরার পথে নিয়ে যাবেন?

—দার্জিলিঙ থেকে! উনি দার্জিলিঙ গেছেন কে বলল?

—বাঃ! দার্জিলিঙেই তো যাচ্ছিলেন উনি। গাড়ি থেমে যেতে একটা শেয়ারের ট্যাক্সি ধরে চলে গেলেন।

—ও! তা কী বলে গেছেন উনি?

—বলেছেন তো উনি নিজেই নিয়ে যাবেন, তা রাত আটটার সময় আমার দোকান বন্ধ হয়ে যাবে—

—আমার মনে হয় আটটার আগেই উনি ফিরবেন। নেহাত না ফেরেন দোকান বন্ধ করার সময় পৌঁছে দিয়ে যাবেন।

লাইনটা কেটে দিয়ে সুজাতা ভাবতে বসে—ব্যাপারটা কী? কৌশিক যদি একটা শেয়ারের ট্যাক্সি নিয়ে দার্জিলিঙ গিয়ে থাকে তাহলে দুপুরে সে টেলিফোন করে মিছে কথা বলল কেন? আর দার্জিলিঙ গেলে সে নিশ্চয় সুজাতাকেও নিয়ে যেত। সেই রকমই তো কথা ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা কী হতে পারে? ‘হিমালয়ান মোটর রিপেয়ারিং শপ’টা আবার ও-দিকে—মানে দার্জিলিঙ যাওয়ার পথেই পড়বে, কাঞ্চন ডেয়ারির দিকে নয়। তাহলে? কিন্তু কৌশিক তো স্পষ্ট বলল সে কাঞ্চন ডেয়ারি থেকে ফোন করছে, মিস্টার সেনের বাড়িতে দুপুরে খাবে! এমন অদ্ভুত আচরণ তো কৌশিক কখনও করেনি এর আগে। সুজাতা শেষ পর্যন্ত আর কৌতূহল দমন করতে পারে না। কৌশিক ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার মতো মনের অবস্থা তার ছিল না। উঠে গিয়ে টেলিফোনটা তুলে নিল। কাঞ্চন ডেয়ারির মালিক মিস্টার সেনকে ফোন করল। ফোন ধরলেন সেনসাহেব নিজেই। সুজাতা সরাসরি প্রশ্ন করল আজ তার সঙ্গে কৌশিকের দেখা হয়েছে কি না। সেন-সাহেব জানালেন—হয়েছে, দার্জিলিঙে। তাঁর অফিসে। কৌশিক ডিম-মাখন-মাংস ইত্যাদি খরিদ করেছে তাঁর দার্জিলিঙ-এর দোকান থেকে। সপ্তাহে দুদিন সাপ্লাই দিতেও তিনি চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন কৌশিকের সঙ্গে। তারপর সেনসাহেবই প্রতিপ্রশ্ন করেন, মিস্টার মিত্র কি এখনও ফিরে আসেননি?

—না। তাই তো খোঁজ নিচ্ছি। দার্জিলিঙে বৃষ্টি হয়েছে নাকি?

—আদৌ না। আমি তো এইমাত্র ফিরছি সেখান থেকে।

সুজাতা স্থির করল কৌশিক ফিরলে প্রথমেই সে সরাসরি জানতে চাইবে—কেন এমন অযথা মিথ্যা কথা বলল সে! আরও এক ঘণ্টা কাটল। রাত সওয়া নয়টা। না কৌশিক, না কালীপদ

শেষ পর্যন্ত পোর্চে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াবার শব্দ হল। সুজাতা উঠে গেল সদর খুলে দিতে। এতক্ষণে আসা হল বাবুর! বেশ মানুষ যা হোক। হঠাৎ নজর হল—না, ওদের গাড়িটা নয়। একটা ট্যাক্সি। গাড়ি থকে একটা সুটকেস আর একটা হাতব্যাগ নিয়ে একজন অচেনা ভদ্রলোক নেমে এলেন। ভদ্রলোক সুটের উপর বর্ষাতি চাপিয়েছেন। বৃষ্টি চাপিয়েছেন। বৃষ্টি তখনও হচ্ছে। টর্চ জ্বেলে ‘দ্য রিপোস’-এর সাইনবোর্ডটা দেখলেন। ভাড়া মিটিয়ে দিলেন। ট্যাক্সিটা ব্যাক করল। ভদ্রলোক কলিং বেলটা টিপে ধরলেন।

সুজাতার ভীষণ রাগ হচ্ছিল কৌশিকের উপর। কোনো মানে হয়। রাত সওয়া ন’টা। কী করবে সে এখন? লোকটা অচেনা—এই নির্বান্ধব পুরীতে সে একা স্ত্রীলোক। ট্যাক্সিটাও চলে গেল!

দ্বিতীয়বার আর্তনাদ করে উঠল কলিং বেলটা।

উপায় নেই। দরজা খুলতেই হবে। তবে অনেক ঝড়-ঝাপটা এই বয়সেই সয়েছে সুজাতা। ভয়ডর এমনিতেই তার কম। অকুতোভয়ে সে দরজা খুলে মুখ বাড়ায়। ওকে দেখে একটু হকচকিয়ে যান ভদ্রলোক। বলেন, মাপ করবেন, এই রিপোস হোটেল তো?

—হ্যাঁ। কাকে খুঁজছেন?

—ব্যক্তিকে খুঁজছি না, খুঁজছি। বস্তু।

— বস্তু?

—আশ্রয়। আমার নাম এন. আলি–আমার রিজার্ভেশান আছে এখানে।

—ও আপনি! মিস্টার আলি! আসুন, আসুন—আপনার না আগামিকাল আসার কথা?

—কথা তাই ছিল। একদিন আগেই এসে পড়েছি বিশেষ কারণে। অসুবিধা হবে না আশা করি?

—অসুবিধা হবে। আমাদের নয়, আপনার। কিন্তু সে-কথা এখন চিন্তা করে লাভ নেই। এই বর্ষণমুখর রাত্রে আপনি আরাম খুঁজছেন না, খুঁজছেন আশ্ৰয়।

আলি-সাহেব পাপোশে জুতোটা ঘষে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করেন। হেসে বলেন, বর্ষণমুখর রাত্রি! কথাটা কাব্যগন্ধী!

সুজাতা কথা ঘোরানোর জন্য বলে, ভিজে গেছেন নাকি?

—বিশেষ নয়। ভাল কথা, আমার নামে যে ঘরটা বুক করা আছে, সেটা কি আজ এই ‘বর্ষণমুখর রাত্রে’ ফাঁকা আছে?

সুজাতা একটু অস্বোয়াস্তি বোধ করে। ঘুরিয়ে বলে, না-থাকলেও শোবার একটা ঘর পাবেন।

—তার মানে হোটেল আপনার ‘উপচীয়মান’! পুজো মরশুম। তাই নয়?

সুজাতা সত্যিকথাটা স্বীকার করবে কি না বুঝে উঠতে পারে না।

ভদ্রলোক ভিজে বর্ষাতিটা খুলে হ্যাট-র‍্যাকে টাঙিয়ে রাখেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলেন, বেয়ারাদের কাউকে দেখছি না যে?

—আসবে এখনই। কোথা থেকে আসছেন এত রাত্রে?

—দার্জিলিঙ থেকে। আজই সকালে পৌঁছেছিলাম সেখানে।

—তাহলে এই রাত করে বার হলেন যে? ‘রিপোস’ তো আপনি চিনতেনও না।

—দার্জিলিঙ ওভার-বুকড। কোনো হোটেলে ঠাঁই নেই। ভাবলাম আপনারা একটা-না-একটা ব্যবস্থা নিশ্চয় করবেন। আচ্ছা, মিস্টার মিত্র কোথায়? আমার চিঠির জবাব দিয়েছিলেন তো সাম মিস্টার মিত্র।

—হ্যাঁ, কৌশিক মিত্র। আমি মিসেস মিত্ৰ।

—আমি তা আগেই বুঝেছি। মিস্টার কৌশিক মিত্র কোথায়?

—দোতলায়। অফিসে কাজ করছেন। আসুন, আপনার ঘরটা দেখিয়ে দিই—

আলি ইতস্তত করে। আশা করছিল কোন বেয়ারা এসে ওর ব্যাগটা নেবে।

সুজাতা বলে, স্যুটকেসটা এখানেই থাক। রুম-সার্ভিসের বেহারা পৌঁছে দেবে। আপনি শুধু হাত ব্যাগটা নিয়ে আসুন—

—প্রয়োজন হবে না। নিজের ব্যাগ আমি নিজেই বয়ে নিয়ে যেতে অভ্যস্ত। ও-দেশে স্টেশনে-এয়ারপোর্টে এমন কুলির ব্যবস্থা নেই। নিজের মাল নিজেকেই বইতে হয়।

—আপনি বুঝি সদ্য বিদেশ থেকে ফিরেছেন? চলতে চলতে সুজাতা প্রশ্ন করে। আলি সে কথা এড়িয়ে বলে, আমি কিন্তু এখন এক কাপ চা খাব মিসেস্ মিত্র। বিকেলে চা জোটেনি।

এতক্ষণে মনে পড়ে গেল সুজাতার। বৈকালিক চা পান তার নিজেরও হয়নি।

ড্রয়িংরুম পার হয়ে পর্দা সরিয়ে ডাইনিং রুম। তার ও দিকে বাড়ির পশ্চিম-কোনার তিন নম্বর ঘরটিতে পৌঁছালো ওরা। সুজাতাই আগে ঢুকল ঘরে, আলোর সুইচটা জ্বেলে দিতে। বললে, ওয়াশ-আপ করতে চান তো গিজারটা চালু করে দিন। মিনিট দশেকের মধ্যেই গরম জল পাবেন। আমি চা-টা পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করি। মিস্টার মিত্রকেও খবরটা দিই। সরুন—

আলি ঘরে ঢোকেনি। দাঁড়িয়ে ছিল দরজার মুখে। বস্তুত দরজা আগলে। হঠাৎ হাসি-হাসি মুখে লোকটা বলল, একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব মিসেস্ মিত্র?

একটু সচকিত হয়ে ওঠে সুজাতা। লোকটা অমন দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে কেন? তবু সাহস দেখিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, বলুন?

—এমন ‘বর্ষণমুখর রাত্রে’ এই নির্বান্ধব বাড়িতে একেবারে একা থাকতে আপনার ভয় করে না?

হাত-পা হিম হয়ে গেল সুজাতার। মনে হল ওর পিঠের দিকে, ব্লাউজের ভিতর কী যেন একটা সরীসৃপ কিলবিল করে নেমে গেল।

কার্ট-রোড দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। তাদের হেডলাইট বাঁকের মুখে জমাটবাঁধা অন্ধকার-স্তূপে আলোর ঝাঁটা বুলিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। অন্ধকার তাতে একটুও কমছে না। গাড়ি বাঁক নিলেই আঁধারে অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে দু’পাশের আদিম অরণ্য। তা হোক, তবু ঐ গাড়িগুলো মানব সভ্যতার প্রতিনিধি। ওর ভিতর আছে মানুষজন। সুজাতা একা নয়। কিন্তু কার্ট-রোড যে ওখান থেকে তিন-চারশ ফুট!

নিতান্ত কাকতালীয় ঘটনাচক্র। ঠিক এই মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমে বেজে উঠল টেলিফোন। তার যান্ত্রিক কর্কশ শব্দটা জলতরঙ্গের মতো মিঠে মনে হল সুজাতার কাছে। না, সে একা নয়। তাকে ঘিরে আছে এই কোটি পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের শুভেচ্ছা! ও তাদের সব্বাইকে এই মুহূর্তে দেখতে পাচ্ছে না বটে, কিন্তু ঐ তো ওদেরই মধ্যে একজন যান্ত্রিক দূরভাষণে ওর কুশল জানতে চাইছে। দুর্জয় সাহসে বুক বেঁধে সুজাতা বললে আগেকার শব্দটাই, সরুন!

দরজা থেকে সরে দাঁড়াল আলি। সুজাতা ডাইনিংরুম পার হয়ে চলে এল ড্রয়িংরুমে। পিয়ানোটার পাশেই টেলিফোন স্ট্যান্ড। ড্রয়িং আর ডাইনিং রুম-এর মাঝখানে প্ৰকাণ্ড একটা পর্দা। বর্তমানে সরানো। তাই তিন-নম্বর ঘরের প্রবেশ পথে দাঁড়িয়েই দেখতে পাচ্ছিল আলি–শাড়ির আঁচল সামলিয়ে সুজাতা টেলিফোনটা তুলে নিয়ে সাড়া দিল। রিপোস!

দার্জিলিঙ থেবে মণি বৌদি ফোন করছেন। ডি.সি. মিস্টার বিপুল ঘোষ, আই. এ. এস.-এর স্ত্রী। জানালেন—সুজাতার নিমন্ত্রণ রাখতে আসা সম্ভবপর হচ্ছে না ওঁদের পক্ষে। গভর্নর দার্জিলিঙে আসছেন। ফলে ডি.সি. ব্যস্ত থাকবেন। তাছাড়া রেডিওতে নাকি খবর দিয়েছে সমস্ত উত্তরবঙ্গে আগামী দু’তিনদিন প্রবল বর্ষণ হতে পারে।

সুজাতা অপ্রয়োজনে দীর্ঘায়ত করল তার দূরভাষণ। নানান খেজুরে গল্প জুড়ে সময় কাটালো। লক্ষ্য করে আড়চোখে দেখল—আলি পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছে অনেকটা। সে এখন ড্রয়িং-ডাইনিং রুম-এর সঙ্গমস্থলে। মুখ-হাত ধুতে ঘরে যায়নি। বরং পাইপটা জ্বেলেছে।

ঠিক এই সময়ই ফিরে এল কালীপদ। কাক ভেজা হয়ে। তাকে দেখে ধড়ে প্রাণ এল সুজাতার। টেলিফোনটা নামিয়ে রেখে বললে, জামাকাপড় ছেড়ে ফেল। চায়ের জল বসা। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল আলি-সাহেবের। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই সুজাতা বলে ওঠে, মাপ করবেন, তখন কী যেন একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলেন আপনি? টেলিফোনটা বেজে ওঠায় জবাব দেওয়া হয়নি।

আলি হেসে বললে, প্রশ্নটা এতক্ষণে তামাদি হয়ে গেছে!

—ভুলে গেছেন?

—যাব না? ও.সি. ডি.সি. গভর্নর!… তারপর কি আর কিছু মনে থাকে?

—নিজের ঘরের দিকে ফিরে গেল আলি।

রাত দশটায় ফিরে এল কৌশিক। বৃষ্টিতে ভিজে। গাড়ির কেরিয়ারে খাদ্য-সামগ্রী নিয়ে। অভিমান-ক্ষুব্ধা সুজাতাও কোনো কৌতূহল দেখাল না। জানতে চাইল না কেন এত রাত হল। কৌশিক নিজে থেকেই সাতকাহন করে কৈফিয়ত দিতে থাকে। বেশ বোঝা গেল—’হিমালয়ান মোটর রিপেয়ারিং শপ’-এর লোকটা কৌশিককে জানায়নি যে, ইতিমধ্যে সে রিপোস-এ ফোন করেছিল।

রাত্রে খাবার টেবিলে কৌশিকের সঙ্গে পরিচয় হল আলি-সাহেবের। তিনজনে একসঙ্গেই খেতে বসেছিল। ডিনার টেবিলে। সেলফ-হেলপ পরিবেশন ব্যবস্থা। কৌশিক আলি-সাহেবকে বললে, আপনার নিশ্চয় খুব অসুবিধা হয়েছে। আমরা এখনও ঠিকমত প্রস্তুত নই, বুঝেছেন? আগামিকাল থেকে হোটেল চালু হবার কথা

আলি সাহেব আলুভাজার প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিতে নিতে বলেন, বুঝেছি। তাই বুঝি গাড়ি নিয়ে শেষবারের মতো বাজার করতে দার্জিলিঙে গিয়েছিলেন?

—না, না, দার্জিলিঙে তো নয়। আমি গিয়েছিলাম কাঞ্চন ডেয়ারিতে। এদিকে—

–ও, তাই বুঝি! আমি প্রথমটায় ভেবেছিলাম—আপনি বুঝি দোতলার অফিসঘরে বসে কাজ করছেন। মিসেস্ মিত্রই আমার ভুলটা ভেঙে দিলেন। বললেন—না, উনি বাড়িতে একেবারে একা আছেন। চাকরটা পর্যন্ত নেই! আর আপনি নাকি বাজার করতে দার্জিলিঙে গেছেন।

—দার্জিলিঙ! তুমি তাই বলেছে?—কৌশিক প্রশ্ন করে সুজাতাকে।

সুজাতা সে প্রশ্নের জবাব দেয় না। আলি সাহেবকে বলে, আজ কিন্তু সংক্ষিপ্ত মেনু। এই তিনটেই আইটেম—আলুভাজা, ডিমভাজা আর খিচুড়ি।

আলি হেসে বলে, আজ আকাশের যা অবস্থা তাতে অন্যরকম আয়োজন হলে আপনাকে বেরসিকা ভাবতাম মিসেস্ মিত্ৰ!

কৌশিক বললে, সত্যি—কী বিশ্রী বৃষ্টি শুরু হল!

আলি বিচিত্র হেসে বললে, বিশ্রী! সেটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গির দোষ। বিরহকাতরা কোনো বিরহিণী হয়তো এমন রাতেই গান ধরেন “কৈসে গোঁঙাইবি হরি বিনে দিন-রাতিয়া!” কী বলেন মিসেস মিত্র?

সুজাতা মুখ টিপে বলে, আপনাকে কাব্য রোগে ধরেছে মনে হচ্ছে!

—ধরবে না? আমার কাছে রাতটা যে মোটেই বিশ্রী নয়—আমার বারে বারে মনে পড়ে যাচ্ছে এটা ‘বর্ষণমুখর রাত্রি’!

কৌশিক সন্দিগ্ধভাবে দু’জনের দিকে তাকায়। তার হঠাৎ মনে হয়—সুজাতা লজ্জা পেল। কেন? যেন কথা ঘোরাতেই সুজাতা বললে, মুশকিল হয়েছে কি আমার হেড কুক-এর প্রবল জ্বর হয়েছে!

—কার? কালীপদর?—কৌশিক জানতে চায়।

সুজাতা বলে, হ্যাঁ। বৃষ্টিতে ভিজে।

আলি বলে, তবে তো খুব মুশকিল হল আপনার। কাল সকালেই সব বোর্ডাররা আসবেন তো?

—সকালে না হয় সারাদিনে তো আসবেই।

—তাহলে লোকজন আসার আগে আপনাকে জনান্তিকে একটা খবর দিয়ে রাখি মিসেস্ মিত্র। আমি ব্যাচেলার—নিজের রান্না নিজে করি। পিকনিকে গেলে বরাবর আমাকে রাঁধতে হয়েছে। প্রয়োজনবোধে আপনার হেড কুকের অ্যাকটিনি করতে পারি। ভাটপাড়া অথবা নবদ্বীপ থেকে কোনো পণ্ডিতমশাই নিশ্চয় আপনার বোর্ডার হতে আসছেন না?

কৌশিক তাড়াতাড়ি বলে, না না তার প্রয়োজন হবে না। আমিই তো আছি!

—এখন আছেন। কাল সকালেই হয়তো আবার দার্জিলিঙ ছুটবেন…. আই মিন কাঞ্চন ডেয়ারিতে। কৌশিক বিষম খেল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *