শুভদৃষ্টি
চিনু দেখল, কবে যেন বাপকেলে পদবীখানা হাপিস হয়ে গেছে তার। নেড়াবেলতলায় নয় নয় করেও গােটা পাঁচেক চিনু। চিনু দাস, চিনু তালুকদার, চিনু খাঁড়া, চিনু দাঁ আর সে হল গিয়ে চিনু চোর বা চোর চিনু। চিনু চোর বললে পাঁচ বছরের পুঁচকে থেকে আশি বছরের বৃদ্ধ, বাড়ির বউ থেকে পাড়ার জামাই— সবাই এক ডাকে চিনছে। চিনুর তাে শুধু পদবী গেল; কিন্তু গুষ্টির সবাই পদবীর সঙ্গে নামটাও খােয়াল। যেমন চিনু চোরের বাবা, চিনু চোরের মেজো জ্যাঠা, চিনু চোরের ছােট কাকি—ইত্যাদি। মানে, আস্ত একটা বংশ চিনুর আলােয় আলােকিত। গুষ্টির সবাই কুলাঙ্গার-টুলাঙ্গার বলে তেড়ে গাল দিলেও চিনু কিন্তু বেজায় খুশি। যাক বাবা, কাজের একটা স্বীকৃতি তাে বটে। এই বাজারে ক’জনেরই বা জোটে! পরিচ্ছন্ন চুরিটাও মুখের কথা নয়। বেশ ন্যাক লাগে। বেশিরভাগই তাে ধেবড়ে ফেলে। ধরা পড়ে যায়।
সেই কোন বালক বয়েসেই চিনু বুঝেছিল, লাইনটায় তার ভবিষ্যৎ আছে। একটু লেগে থাকতে হবে শুধু। আর কারও না হােক, গর্ভধারিণী মায়ের উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা পেয়েছিল বিস্তর। তাই অন্য পেশায় পেটের ধান্দা করার কথা ভাবেনি কোনােদিন।
হাতেখড়ি বলতে গেলে ইস্কুলেই। চিনু নিতান্ত খেলাচ্ছলেই যেন সহপাঠীর বই-খাতা পেন-পেনসিল সরিয়ে ফেলত। সেই বয়েসেই এমন নিপুণ হাত, যে মাস্টাররা পর্যন্ত কিনারা করতে পারত না। আর বাড়ি ফেরার পর রােজ ছেলের ব্যাগে সেসব দেখে সন্তান গর্বে-গর্বিত হয়ে উঠত তার জননী আন্নাকালী। যাক, ছেলেকে পাঠশালে পাঠানাে বৃথা যায়নি; বিদ্যে না আনুক, অন্য কিছু তাে আনছে। আন্নাকালী রাতে শুয়ে শুয়ে ছেলের মুখে হাত সাফাইয়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারিকুরি বিভাের হয়ে শুনত আর মনে মনে প্রার্থনা করত, ঠাকুর একটাই ছেলে আর, একে তুমি দেখাে। জননীর প্রার্থনার জোরেই হােক বা নিজের প্রতিভার বলে দিন দিন যেন আরও নিখুঁত আর পরিষ্কার হতে লাগল চিনুর কাজ। একটু মাথা চাড়া দিল যখন, তখন উঁচু উঁচু পাঁচিল টপকে বা জল পাইপ বেয়ে পাড়া প্রতিবেশির ঘটিটা-বাটিটা সরিয়ে ফেলত অনায়াসে। হুমদো-হুমদো তালা খােলা ছিল তার বায়া-হাত কা খেল।
চিনুর বাপটা অবশ্য ছিল ব্যাগড়া-মাস্টার। ছেলের এহেন কাজকারবারে ভারী বিরক্ত।
মাথা গরম লােক। তার ওপর টনটনে বংশ গৌরব। তার বাবা, মানে চিনুর দাদু ছিল নেড়াবেলতলার চৌধুরীবাড়ির খাস চাকর। চৌধুরীদের বিয়েশাদিতে সবার নেমন্তন্ন বাঁধা। তারই এক ভাই আবার ছ’কেলাস পাস দিয়ে সরকারি অফিসে পিওন পদে বহাল হয়েছিল। নিজে হাতে সই করে বেতন নিত প্রতি মাসে। সে নিজে কিছু না হােক নেড়াবেলতলা বাজারের সবচেয়ে বড় দোকান মা-চণ্ডী ভাণ্ডারের মাল মাপনদার। সেই বংশের ছেলে হয়ে কিনা চৌর্যবৃত্তি। তাই চিনুর নামে নালিশ হলেই চটিপেটা করত। তখন গাছকোমর বেঁধে ছেলের পক্ষ নিত আন্নাকালী। তার গলার তেজ আর গালাগালির বহর ছিল দেখবার মতাে। শােনবার মতােও বটে। সঙ্গে নিটোল যুক্তি-চোর কি ওর গায়ে লেখা আছে? বটেই তাে! লেখাজোখা না থাকলে প্রমাণ হয় কীসে? ফল যা হওয়ার তাই হল। গর্ভধারিণীর সাপাের্ট খেয়ে চিনু কাজে নতুন উদ্যম পেল। পাড়া ছাড়িয়ে বেপাড়ায় পৌঁছল নাম। আন্নাকালী খুশিতে ডগমগ। মাল মাপনদার স্বামী যেসব শাড়ি-চুড়ি দিতে পারেনি কোনােদিন ছেলের কল্যাণে সেসব হল তার।
কিছুদিন পর চিনুর মায়ের মনে হল ছেলেকে এবার সংসারী করার প্রয়ােজন। একটা বউ পালার হিম্মত এখন চিনুর আছে। নাতি-পুতির মুখ দেখতে বড় সাধ হয় তার।
চিনুকে জিজ্ঞেস করল, কী রে চিনু, বিয়েতে বসবি?
চিনু ঘাড় চুলকে লাজুক হেসে বলল, তাতে যদি-তােমার একটু খাটনি লাঘব হয়, আমার আর আপত্তি কী!
আন্নাকালী বুঝল, ছেলেরও ষােলােআনা ইচ্ছে। সে উঠেপড়ে পাত্রী-সন্ধানে লাগল। ঘটক লাগাল। ঘটক এমন একটা বস্তু যারা কথায় কথায় মানুষের ভােল বদলে দিতে পারে। তখন ভুষি কালাে দাঁত-উঁচু নাক থ্যাবড়া মেয়ে হয়ে যায় ডানাকাটা পরি। ভুঁড়ো বেঁটে-বাঁটকুল টেকো হয়ে যায় রাজপুত্তুর। ভাতের ফ্যান গালতে না পারা হয়ে যায় গৃহকর্মনিপুণা। আর নুন আনতে পান্তা ফুরােয় ছেলের থাকে সাতমহলা বাড়ি।
ঘটকদল নিত্যনতুন কনেপার্টি ধরে ধরে আনতে লাগল। নেড়াবেলতলার চিনুর মতাে সুপাত্র কটা! বাপের তাে বলতে গেলে জমিদারি। দীনু পােদ্দারের মস্ত বাগানটা দেখিয়ে বলল, চিনুদের বাগান, ঘােষালদের মস্ত পুকুরটা দেখিয়ে বলল, চিনুদের পুকুর। এমন বাড়ির ছেলে হয়ে চিনুর চাকরি করার দরকার হয় না, তবু চিনু করে। কলকাতার মস্ত এক অফিসে বড় সাহেবের ডান হাত। অফিসে চিনুরও প্রবল দাপট; তাই বাঁ-হাতের রােজগারও মন্দ নয়।
কয়েকটা পাত্রীপক্ষ তলিয়ে খোঁজতল্লাশ করেই বােধহয় আর ওমুখাে হল না। ফেঁসে গেল তাপি। আসলে তাপির তরফে খোঁজ চালাবার তেমন কেউ নেই। বাপ সদ্য চোখ বুজেছে; ভাইদাদারা সম্পত্তি নিয়ে লাঠালাঠিতে ব্যস্ত। তাপির রূপের কথা বড় মুখ করে বলবার মতাে নয়। রংটা কালাের দিকেই, চোখ-মুখও থ্যাবড়া-থােবড়া। তারপর তাপি স্বভাব ঢলানি। দিনরাত ছেলে ছােকরাদের সঙ্গে গুজুর গুজুর। কবে কোন অজাত-কুজাতের সঙ্গে ভেগে যাবে— সেই ভয় বাড়ির সবার। তাপিকে তাই বেড়াল পার করার তালে ছিল ভাইয়েরা। চিনুর সন্ধান পেতে তাই আর দেরি করেনি। বিয়ের দিন ধরে ফেলল তারা।
বিয়ে হয়ে গেল চিনুর। বিয়ের পর কিছুদিন নবদম্পতির বাহ্যজ্ঞান থাকে না। পাথরে শুলেও মনে হয় তুলাের গদি, মােটা চালের ভাতে কামিনী আতপের স্বাদ লাগে। তাপিরও হল সেই দশা। কিন্তু কিছুদিন পরেই ধাক্কা খেল সে। দীনু পােদ্দারের বাগান থেকে একটা এঁচোড় কেটেছিল। না কাটার কিছু নেই, এ-বাগান তাে তাদেরই, সম্বন্ধ হওয়ার সময় ঘটক নিজেমুখে বলেছিল তার ভাইদাদাদের। কিন্তু এঁচোড় হাতে তাপিকে দেখে পােদ্দার বউয়ের সে কী তম্বি! বাড়ি বয়ে এসে কাঁড়ি কাঁড়ি কথা শুনিয়ে গেল। হাঁড়ির মাপেই নাকি সরা হয়েছে। চোরের বউ চোর হবে না তাে কি সাধিকা হবে!
তখনই খটকা লাগল তাপির। চোরের বউ মানে? চিনু ফিরতেই চেপে ধরল, বাগানের মালিক কে? চিনু আঙবাঙ বকতে লাগল। সন্দেহ জোরদার হল তাপির। খেয়াল হল, তাই তাে, স্বামী তার করেটা কী; এতদিন হয়ে গেল, কই অফিসমুখাে হল না একদিনের জন্যও। তক্কে তক্কে থাকল তাপি।
এদিকে জমানাে রেস্ত ফুরিয়ে আসছে চিনুর। বউও পুরনাে হয়ে আসছে একটু একটু করে। আবার ধান্দায় বের হতে হয়। না হলে হরিমটর শিগগিরি কপালে নাচছে।
একদিন রাতে চুপি চুপি বেরােতে যাচ্ছিল সে। মটকা মেরে ছিল তাপি। উঠে চেপে ধরল— কোথায় যাচ্ছ, এই রাতে?
চিনু দেখল চেপে গিয়ে লাভ নেই। কবুল করল, হ্যাঁ, সে চোর বটে। কিন্তু এটাও ভরসা দিল, ভয়ের কিছু নেই, আজ পর্যন্ত ধরা পড়েনি কোনােদিন; এখন সহধর্মিণী হিসেবে তাপি যদি একটু পাশে থাকে, তাহলে বছর ঘােরার আগেই দীনু পােদ্দারের চেয়ে বড় বাগান সে নিজেই কিনে ফেলতে পারে।
কিছু বলল না তাপি। গুম মেরে গেল শুধু। বুঝল, দায় ঝেড়ে ফেলতে ভাইয়েরা তাকে কুপাত্রের গলায় ঝুলিয়েছে। কিন্তু এখন উপায়ই বা কী! ভাবে, আর নিজের ভাইদাদাদের মুণ্ডুপাত করে রাগে !
এর মধ্যে হঠাৎ একটা সুসংবাদ এল বাপের বাড়ি থেকে। বাপ নাকি তার চোখ বােজার আগে বিষয়সম্পত্তির বিলি ব্যবস্থা করে গেছে। তাপিকেও দিয়ে গেছে কিছু। হিসেব মতাে সে এখন বাস্তুভিটের একখানা ঘর আর কিছু বাগান-জমির মালকিন। লেখাজোখা করে পাকা ব্যবস্থা। ভাইয়েদের ট্যাঁ ফোঁ করার উপায় নেই কোনাে।
সেই ভরসাতেই একদিন গৃহত্যাগ করল তাপি! ঠিক এক কাপড়ে বলা যায় না! কারণ বাপের বাড়ি থেকে যৌতুক দেওয়া গয়নাগুলাে পুটুলি বেঁধে কোমরে গুঁজে নিয়েছিল আসার সময়।
বাপের বাড়ি এসে নিজের ভাগের ঘরে বসল থুপ হয়ে। ভাইয়েরা ঠারেঠোরে বােঝাবার চেষ্টা করল, ফিরে যা, মান-অভিমান কিছু হয়ে থাকলে, মিটিয়ে নে। স্বামীর ঘরের মতাে ঘর হয় না।
কিন্তু ততদিনে ঘা খেয়ে সংসারের সার বুঝে গেছে তাপি। সাফ বলে দিল-ও কলে আমি আর নেই। বলল, তােমরা চিন্তা করছ কেন? তােমাদের বােঝা হয়ে থাকব না; নিজেরটা নিজেই বুঝে নেব।
গয়নাগাটি বুঝে বেচে দিল পাড়ার নয়ন স্যাকরার কাছে। টাকাটা ফেলে দিল পােস্ট অফিসে। হিসেব কষে দেখল সেই সুদ আর জায়গা জমির আয়— একটা পেট দিব্যি চলে যায়।
ওদিকে বউ পালিয়ে যেতে ভারী ভ্যাবলা মেরে গেল চিনু। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে; কিন্তু বউ পালালে? চিনু দেখল, দিন দিন হা-হুতাশ ছাড়া কিছু বাড়ছে না। বন্ধুরা নানা পরামর্শ দিল। কেউ বলল, গিয়ে হাতে-পায়ে ধরে নিয়ে আয়। কেউ বলল, খবরদার নয়; ধাপ্পা দিয়ে বিয়ে করেছিস; এখন ওরা বাগে পেলে চোরের মার দেবে। আন্নাকালী শুনে গালাগালি দিল তাপিকে— বেশ্যা কুলটা ইত্যাদি। পিরিতের অন্য নাগর ছিল; তার টানেই গেছে ঠিক। বলল, আবার বিয়ে দেব তাের; ও মাগির চেয়ে অনেক ভালাে মেয়েছেলে আনব। চোর তাে হয়েছে কী! সােনার আংটি আবার বাঁকা!
কিন্তু এসব শুনে ন্যাতানাে চিনু একটুও খটখটে হয়ে ওঠে না। দিনরাত শুধু ধরা-মাছ-জলে-পড়ে যাওয়া ছিপুড়ের মতাে চোখমুখ করে বসে থাকে। মনটা কেবল তাপি-তাপি করে। আহা, মেয়েমানুষের মতাে মেয়েমানুষ ছিল একটা। আর ভালােবাসাটাও হয়েছিল বটে। একেবারে লাপুর-চুপুর ভালােবাসা। এত রস আর রহস্য ভাবলেও যেন গা-টা কেমন শিরশির করে ওঠে। সবচেয়ে অসহ্য রাতগুলাে। তখন যেন পুরনাে ভালােবাসাবাসির কথাগুলাে কানের কাছে ভোঁ-ভোঁ করে নাছােড় মাছির মতাে। গরম হয়ে ওঠে মাথা। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে শুধু। কাজে বেরােতেও চাড় লাগে না। মনে হয়, কার জন্যে রােজগার ? যাকে সুখে রাখতে চেয়েছিল সে-ই যদি না থাকল…
চিনুর দশা দেখে মা তাে কেঁদেকেটে অস্থির। বউ-শােকে ছেলেটা শেষপর্যন্ত না বিবাগী হয়ে যায়। মতি ফেরাতে ছেলের হাতে কবচ বাঁধল, কোমরে মাদুলি ঝােলাল, ঠাকুরের চরণামৃত খাওয়াল ঘটিঘটি। আর আরও বেশি বেশি করে শাপ-শাপান্ত দিতে লাগল তাপিকে।
বেশ কিছুদিন পর একটু যেন ধাতে এল চিনু।
কবচ-মাদুলির জোরেই হােক বা পেটের জ্বালায় আবার লাইনে নামার তােড়জোড় শুরু করল। মওকাটাও মিলে গেল তাড়াতাড়ি। সে দিন ছিল জামাইষষ্ঠী। মুখুজ্জেদের মেয়ে জামাই এসেছে। মেয়ের গা ভরতি গয়না। চিনুর নিক্তিমাপা চোখ দেখেই মেপে নিয়েছে গয়নাগুলাে। হ্যাঁ, কুড়ি-বাইশ ভরি তাে হবেই। একবার ঝেঁপে দিতে পারলেই চিচিং ফাঁক। জীবনভর আর চিন্তা নেই। বেচে দিয়ে কারবার করবে চিনু। দোকান দেবে। মুদির দোকান। চাল-ডাল তেল-তেজপাতার গন্ধে ম-ম ভেতরটা। ভিড়ের গাদি লেগে আছে সবসময়। সামলাতে হিমসিম চিনু। চান খাবার সময় নেই। তাপিকে ফিরিয়ে এনেছে আবার। কাচ্চা-বাচ্চা হয়েছে তাদের। তাদের কেউ ‘চিনু চোরের ব্যাটা’বলে না; বলে, চিনু মুদির ছেলে।
রাত গভীর হতেই বেরিয়ে পড়ল চিনু। মুখুজ্জে বাড়ির পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকল। যে-ঘরে মেয়েজামাই আছে সেই ঘরের দরজা খুলে ফেলল খুস্ করে। ঘরে ঢুকল সাবধানে। খাটে মেয়ে-জামাই ঘুমিয়ে কাদা। মাথার কাছে জানলা দিয়ে ভাঙা চাঁদের আলাে এসে পড়েছে মেয়েটার মুখে। সেদিকে তাকিয়ে ফের তাপির দুঃখ উথলে উঠল চিনুর। বেশ দেখতে মেয়েটাকে। তবে তাপির চেয়ে ভালাে কিছুতেই নয়। মা তার যতই বলুক, আরও ভালাে মেয়ে আনব, তাপির চেয়ে ভালাে মেয়ে তৈরিই করেনি ভগবান।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই বােধহয় বেখেয়াল হয়ে পড়েছিল চিনু। অন্ধকারে কীসে যেন পা লাগল একটা। স্টিলের ঘটি কি বাটি হবে। ঝনঝন শব্দ উঠল। হইহই করে জেগে উঠল গােটা বাড়ি। জীবনে প্রথমবার ধরা পড়ল চিনু।
২
চিনু খালাস হল দু’বছর পর। জেল হয়েছিল চিনুর। মুখুজ্জেরা গুষ্টিসুদ্ধু তার ওপর হাতের সুখ করে তুলে দিয়েছিল পুলিশের হাতে।
বাড়ি ফিরে চিনু দেখল, স্নেহময়ী জননী তার চোখ বুজেছে। আরও দেখল, নেড়াবেলতলার লােকজন তার ওপর ভয়ানক বিরূপ। চিনুর মতাে দাগি চোরকে নাকি দেশে থাকতে দেওয়া উচিত হবে না। দুঃখের কথা, নিজের বাপও সুর মেলাল তাদের সঙ্গে। বলল, বিদেয় হ, জানব ছেলে আমার মরে গেছে।
এই দুর্দিনে যে চিনুর হয়ে লড়াই দিতে পারত সেই তাে চোখ বুজেছে। অগত্যা দেশত্যাগী হতে হল চিনুকে। ঘাটে-আঘাটায় ঘুরল কিছুদিন। জেলখাটা কিছু পয়সা ছিল সঙ্গে। তাই দিয়ে চলছিল কোনাে প্রকারে। সেই পয়সায় টান পড়ল একসময়। এখন পেট চালাতে হলে চুরিই ভরসা। কিন্তু ধরা পড়ে আত্মবিশ্বাসটা কেমন যেন টাল খেয়ে গেছে তার। কেবল মনে হচ্ছে, আবার ধরা পড়ে যাবে। আর ধরা পড়লেই জেল। জেল মানেই দিনের পর দিন সেই বিস্বাদ লপসি আর দাগি ষন্ডাগুন্ডাদের দাদাগিরি। চাকরের অধম খাটাত তারা। কথা না শুনলেই মার। এসব মনে পড়লেই পেটের ভেতর গুড়গুড় করে উঠত। তাই ভাবল, আত্মহত্যা করবে। কী হবে এই নিঘিন্নে জীবন রেখে! মা মরেছে, বউ ভেগেছে, বাপ খেদিয়েছে। কী জন্যে আর বাঁচা! দেখল রাস্তার ধারে খুব উঁচু বাড়ি উঠছে একটা। দেখে বেশ পছন্দ হল চিনুর। বাহ, এই তাে চমৎকার একটা জিনিস। ওপরে উঠে লাফিয়ে পড়তে পারলেই হল। সব জ্বালা চুকে যাবে।
চুপি চুপি ছাদে উঠল চিনু। কিন্তু নীচের দিকে তাকিয়ে মাথা ঘুরে গেল তার। বাপরে কী নিচু ! হাত-পা কাঁপছে, বুকে ধড়ফড়, গলা শুকিয়ে কাঠ! দরকার নেই বাবা লাফ দিয়ে। তার চেয়ে মরে যাওয়ার অন্য উপায় দেখতে হবে। যেমন উঠেছিল, তেমনই চুপি চুপি নেমে এল নীচে।
তখনও পকেটে দু’চার টাকা পড়ে। ভাবল, বিষ কিনে খাবে। বিষে মরা অনেক সােজা। মাথা ঘুরবে না, হাত-পা কাঁপবে না। শুনেছে খুব তেতাে। কষ্ট করে জল দিয়ে একবার গিলে ফেলতে পারলেই হল। ফট করে মরে যাওয়া যাবে।
ঘুরে ঘুরে বিষের দোকান খুঁজতে লাগল চিনু। হঠাৎ কচুরির গন্ধ এল নাকে। রাস্তার পাশে একটা দোকানে ভাজা হচ্ছে। ঘুরে ঘুরে আর সিঁড়ি ভেঙে খিদেটা বেশ চনচনে হয়ে উঠেছে তখন। ভাবল, মরে তাে যাবই; দুটো কচুরি খেয়েই না হয় মরব। বাকি পয়সা থাকবে বিষের জন্য।
কিন্তু খেতে খেতে কখন যেন বেখেয়ালে পুরাে টাকাটাই গলে গেল কচুরির পিছনে। তখন খেয়াল হল চিনুর। যাহ, এবার কী হবে! বিষ কেনার জন্য আর কানাকড়িও পড়ে নেই। এখন উপায় একটাই। বিনা পয়সায় আত্মহত্যা।
মাগনায় আত্মহত্যার একটা ফিকির খুঁজতে খুঁজতে হাঁটছিল চিনু। গলায় দড়ির জন্য দড়ি লাগবে একটা। শক্তপােক্ত দড়ি কেউ এমনি এমনি দেবে না তাকে। তার চেয়ে রেল লাইনে গলা দেওয়া কিংবা জলে ঝাঁপ একেবারে ফোকোটে হয়ে যায়। এখন একটা রেল লাইন বা পুকুর খুঁজে পেতে হবে তাকে। হঠাৎ এক জায়গায় এসে চমকে উঠল চিনু। জায়গাটা যেন চেনা চেনা লাগে! ভালাে করে ঘুরে ফিরে দেখে সে। হ্যাঁ, ঠিকই, সেই জায়গা। ওই তাে জোড়া মন্দির, তার পাশে হাটচালি, একটু এগিয়ে মিত্তিরদের পােড়াে জমিদার বাড়ি, তারপরে হেলাবটতলা। এই জায়গায় একদিন এসেছিল সে। বরবেশে এসেছিল গাড়ি চেপে। গাড়ি থেকে নেমে বাড়ি পর্যন্ত হাঁটতে হয়নি। কনে পক্ষ কোলে তুলে নিয়েছিল তাকে। তাদের নাকি এমনই নিয়ম। বরের পায়ে মাটি লাগবে না। সে একটা দিন ছিল বটে!
ভাবতে ভাবতে মনটা ভারী উদাস হয়ে গেল চিনুর। সন্ধে হয়ে গেছে। এদিক-ওদিক ঘুরল খানিক। আঁজলা ভরে জল খেল রাস্তার কল থেকে। খেতে খেতে চোখেও জল এল। আর একটু গেলেই শ্বশুরবাড়ি, সেখানে তার জন্যে পােলাও কালিয়া মন্ডামেঠাই বরাদ্দ থাকার কথা। তাকে কিনা কলের জলে পেট ভরতে হচ্ছে। বড় ঘেন্নার জীবন।
রাত হয়েছে। লােকজন কমে আসছে রাস্তায়। চিনুকে যেন বড় টানছে সেই বাড়িটা। যাবে নাকি একবার ? গেলে কি দেখা পাবে? সে কি আছে সেখানে? নাকি অন্য কোথাও…? ভাবতে ভাবতেই চিনু কখন যেন চলে এল বাড়িটার কাছে। হ্যাঁ, সেই বাড়িটাই বটে।
বাইরে দাঁড়িয়ে চিনু জরিপ করল কিছুক্ষণ। হ্যাঁ, একইরকম আছে বাড়িটা। ওই তাে সামনের ওই একটেরে ঘরে বাসর বসেছিল। লাল বেনারসী পরে তাপি বসেছিল তার গা ঘেঁষে। গাঁটছড়া বাঁধা ছিল তাদের। শালিদের কত তামাশা, বউদিদের কত মশকরা-সত্যিই রাতের মতাে রাত ছিল একটা! এইসব ভেবেই তাপিকে একবার দেখার ইচ্ছেটা মনের মধ্যে যেন বুড়বুড়ি কেটে উঠল। সেই মুখ! সেই ভালােবাসাবাসি! আহা, সেসব মনে নিয়েই তাে জেলে কত রাত ঘুমিয়ে পড়ত। মরে তাে যাবেই সে। আজ, না হয় কাল। শুধু বিনাপয়সায় আর আরামে আত্মহত্যার একটা সুযােগ পাওয়া চাই। তার আগে না হয় সেই মুখ দেখে মরবে। শেষ দেখা। তাহলে নরকে গিয়েও শান্তি পাবে চিনু। হ্যাঁ, নরকেই যাবে সে। এ পর্যন্ত তার যা কাজকারবার তাতে নরকে তার জায়গা পাকা হয়ে আছে।
চারপাশ সতর্ক চোখে দেখে নিল চিনু। না, কেউ নেই কোথাও। পাঁচিল টপকাল তখন। অনেকদিনের অনভ্যাস। তবু, সমস্যা হল না কিছু। উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখল, গােটা বাড়ি নিঝুম। পাশাপাশি ক’টা ঘর। কোন ঘরে থাকতে পারে তাপি? ভাবল কিছুক্ষণ। আচ্ছা, ওই কোণের ঘরটাতে কি? জোড়ে এসে ওই ঘরেই তাে ছিল তারা। দেখা যাক একবার।
জানলা দিয়ে উঁকি দিল চিনু। আলাে-আঁধারি ঘরটা; উলটো দিকের জানলা দিয়ে ভাঙা চাঁদের আলাে এসে পড়েছে ঘরে। সে-আলােয় দেখা যাচ্ছে বেশ। ওই তাে তাপি। বসে আছে তক্তপােশের একপাশে। কিন্তু আর একজনও ঘরে রয়েছে যে! ভালাে করে দেখে চিনু। হ্যাঁ, ঠিকই-পুরুষমানুষ একটা। সে ফিসফিস করে তাপিকে বলছে, কাছে এসাে না, অমন করছ কেন!
তাপি বলে, না যাব না।
কেন, কী হল আবার আজ?
তাপি ফোঁস করে ওঠে, তােমার ধান্দা বুঝেছি; কবে বিয়ে করবে বলাে।
করব রে বাবা, করব।
করব করব বলে তাে খালি দিন গড়াচ্ছ!
আহা, রাগ করছ কেন!
করব না! তােমার খালি মধু খেয়ে কেটে পড়ার ধান্দা! সব বুঝি আমি।
ফোঁস করে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল চিনুর। পাশের ঘর থেকে কেউ বুঝি বাইরে উঠেছিল। দেখে ফেলল চিনুকে। চিৎকার করে উঠল— চোর, চোর!
চিৎকার শুনে আশেপাশের ঘরগুলাে থেকে দুরদার করে বেরিয়ে পড়ল লােকজন। সবাই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে-চোর, চোর; ধর ধর!
চিনুর ঘাের ভাঙল। বুঝল বিপদ। লাফ দিয়ে পালাতে গেল। পেরেও যেত। কিন্তু তখনই তাপির ঘর থেকে দুড়কে বেরিয়ে এল একজন। তারও বুঝি প্রাণের ভয়। জোর ধাক্কা লাগল চিনুর সঙ্গে। উলটে পড়ল চিনু। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল।
আলাে এসেছে। ধরাধরি করে তােলা হয়েছে চিনুকে। জল, পাখার বাতাস— সবাই ভারী ব্যস্ত চিনুকে নিয়ে। চিৎকার চেঁচামেচিতে পাড়ার লােকজনও জুটেছে অনেক।
একজন বলল, জামাই এত রাতে এলে, একটু সাড়া শব্দ দিয়ে আসবে তাে।
আর একজন বলল, ভাগ্যিস সময়মতাে এসেছিল; না হলে কার ঘরে যে সিঁধ দিত!
মেজো শালা বলল, ধরতে পারলে ব্যাটাকে জাপটে…
ছােট শালা বলল, ধরতেই তাে গিয়েছিল জামাইবাবু, কিন্তু চোর শালা ধাক্কা দিয়ে পালিয়েছে। শালা অনেকদিনই মনে হয় ঘুরঘুর করছিল; রাতে মাঝে মাঝেই দিদির ঘরের দিক থেকে খুটখাট শুনতে পেতাম যেন।
হ্যাঁ, চোরই এসেছিল বাড়িতে। স্পষ্ট প্রমাণ। তাড়া খেয়ে চটি ফেলে পালিয়েছে। উঠোনে দু’জোড়া চটি। এক জোড়া নতুন চকচকে; সে নিশ্চয়ই জামাইয়ের। অন্যটা ছেঁড়াখোঁড়া। এমন চটি চোরের ছাড়া আর কার হবে!
এত কথার মধ্যে একজন শুধু দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। কথা বলছে না একটাও।
ঠুনঠুনি ঠাকুমা বলল, বলি তাপি, তুই তাে আচ্ছা মেয়ে বটে। নাতজামাই আসবে, বলিসনি তাে কিছু! কাণ্ড দেখ!
কাকিশাশুড়ি মাথার কাপড়টা একটু টেনে বলল, আমি তাে কতবার বলেছি, তাপি, ঝগড়া-ঝাটি যা হয়েছে ভুলে যা, এবার ষষ্ঠীতেই জামাইকে আসতে বলি। তা মেয়ে তখন ফোঁস করে উঠল। আর দেখ, নিজেই কেমন চুপি চুপি… বড় শালা বলল, চলাে সবাই শুয়ে পড়া যাক; কাল সকাল সকাল মাংসের দোকানে লাইন দিতে হবে; জামাইষষ্ঠীর দিন বড় ভিড় হয়।
মেজো শালার বউ বলল, ঠাকুরঝি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ কী— ঘরে নিয়ে যাও, মানুষটা এত দূর থেকে এল।
ঠাকুমা বলল, মাগির আবার লজ্জা! ঢং দেখলে বাঁচি না।
চিনু আড়চোখে তাকাতে গিয়ে চোখে চোখে ধাক্কা লাগল। সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল তাপি। তবে চিনুর হল গিয়ে চোরের চোখ। একঝলকেই যা দেখার দেখে নেয়। ও দৃষ্টিতে রাগ-ঘেন্না নেই। নরম-নরম দৃষ্টি। অনেকটা শুভদৃষ্টির মতাে।

পড়ে বেশ নির্মল আনন্দ পেলাম।