ফুলি ও দুই ভূত
একটা নয়, একসঙ্গে দু’দুটো ভূতকে দেখে পড়িমরি করে দৌড়ল চানু, ফুলির লেটেস্ট প্রেমিক। অথচ একটু আগেই কিস করার সময় ফুলির জন্য জান কবুল করেছিল ছেলেটা। চানু ফুলির তেইশ নম্বর প্রেমিক। পঁচিশ বা সাতাশ নম্বরও হতে পারে। আসলে কুড়ি ক্রস করার পর গােনা ছেড়ে দিয়েছে ফুলি। আপেলহাটির ফুলি ওরফে ফুলমনি জমজমাট সুন্দরী। সেইসঙ্গে মারকাটারি ফিগার। কত বয়স তাই নিয়ে মতবিরােধ আছে। কেউ বলে পঁচিশ, কেউ বলে উনতিরিশ কেউ বলে একচল্লিশের কম কিছুতেই হতে পারে না। তবে একটা ব্যাপারে সকলে সহমত, ওকে দেখলে মনে হবে সদ্য আঠারাে পেরিয়ে উনিশে পা দিয়েছে।
ঠিক কত বয়স থেকে ফুলি প্রেমের লাইনে আছে তারও মীমাংসা হয়নি। কেউ বলে ক্লাস সিক্স, কেউ বলে ক্লাস ফাইভেই তাকে গজানন পার্কে কিংবা রেলস্টেশনে নিয়মিত ছেলেদের সঙ্গে গুজুর-গুজুর করতে দেখা যেত, আবার অন্য অনেকের মতে প্রাইমারি লেভেলে প্রথম ভাগ বা নামতা বইয়ের ফাঁকে প্রেমপত্র চালাচালি করে ফুলির হাতেখড়ি।
এসব আলােচনা ফুলির কানেও আসে। সে জানে, যত আলােচনা তত টি আর পি৷ তাই সে মন দিয়ে শুধু রূপচর্চা করে যায়। ফুলি ঠিকমতাে সাজুগুজু করলে মর্ত্যের পুরুষ কেন, স্বর্গের দেবতারাও টাল খেয়ে যাবে। অমন জ্বালাময়ী রূপ, সেইসঙ্গে মস্ত গুণ কাউকে ‘না’ বলা ধাতে নেই তার। আসলে মনটা বড় নরম। পরের দুঃখ একেবারে সহ্য হয় না।
সব মিলিয়ে লাভারের লিস্টি দিন-দিন লম্বাই হয়ে যাচ্ছে ফুলির। মুশকিল হচ্ছে, কেন কে জানে, কোনও সম্পর্কই ছাদনাতলা পর্যন্ত গড়ায় না ফুলির।
তার আগেই কাটাকাটি হয়ে যায়। ফুলির বিরহে আজ পর্যন্ত তিনজন সংসার ছেড়ে বিবাগী হয়ে গিয়েছে, সাতজন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। (এর মধ্যে দু’জন হঁদুর মারার বিষ, দু’জন পােকা মারার ওষুধ, আর বাকি তিনজন স্লিপিং পিল) সুখের কথা, আত্মহত্যার চেষ্টা একটাও ফলপ্রসূ হয়নি। বিষটিস হজম করে সকলেই বাড়ি ফিরে এসেছে, এবং শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফেলেই ভারী করেছে আপেলহাটির বাতাস। এই ফুলির নবতম প্রেমিক হল মজুমদার বাড়ির চানু। কদিন আগেই একটা বিয়েবাড়িতে আলাপ। চানুই সরাসরি প্রস্তাব দিল। যদিও আপাতত তিনটে স্টেডি সম্পর্ক আছে ফুলির এবং তাদেরই সময় দেওয়া বেশ চাপের হয়ে যাচ্ছে, তবু কোমলমতি ফুলি স্বভাবগুণেই রাজি হয়ে গেল। সেই চানুর সঙ্গে আজ প্রথম অ্যাপাে ছিল গজানন পার্কে। পার্কটা লােকালয় থেকে একটু দূরে। বড়-বড় গাছ আর ঝােপঝাড় আছে। লাইট-ফাইট বেশিরভাগই চুরি হয়ে গিয়েছে। তাই সন্ধের পর ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি একটু নিশ্চিন্তে বসে ভাবের আদানপ্রদান করতে পারে। ঝােপের আড়ালে জুতসই একটা জায়গা নিতে পারলে মন খুলে এবং সময়বিশেষে শরীর খুলেও কথা বলা যায়।
বিকেল পাঁচটায় আসার কথা ছিল ফুলির। দুপুরে সময় দেওয়া ছিল মাধব স্যাঁকরার বড় ছেলে যাদবকে। যাদবদের বাড়ির সকলে কোথায় যেন নেমন্তন্নে গিয়েছে, বাড়ি তাই ফাঁকা। ফাঁকা বাড়িতে সময়ের কাণ্ডজ্ঞান রাখা মুশকিল। ফুলির তাই পার্কে পৌছতে লেট হয়ে গেল একটু। এসে দেখল হানটান করছে চানু।
ফুলি খুশিই হল। তার অভিজ্ঞতা বলে ছেলের হানটান করলে প্রেমটা জমে ভাল। তা সত্যিই প্রেমটা জমল। ফুলির ব্যাগে সবসময় একটা প্লাস্টিকের শিট থাকে। সেইটা পেতে একটা ঝােপের আড়ালে পজিশন নিল তারা। নভেম্বরের বিকেল, আলাে মরে এল ঝপ করে। আর এবারও কোথা দিয়ে যেন সময় কেটে গেল। হুঁশ যখন ফিরল তখন বেশ রাত। বেশিরভাগ ঝােপ থেকে পাখি উড়ে গিয়েছে। হাত ধরাধরি করে ফিরছিল দু’জনে। কাঁসারি পুকুরপাড়েই ঘটনাটা ঘটল। জায়গাটা নির্জন। আকাশে একটা ভাঙা চাঁদ। সেই চাঁদের আবছা আলােয় ওরা দেখল কোথা থেকে যেন দুটো ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়াল সামনে। একটা একটু লম্বা, অন্যটা বেঁটে। দু’জনকে দেখেই ফুলিকে ফেলে চানু দিল দৌড়। ফুলির ভয়ডর চিরকালই কম। সে ঘাবড়াল না।
বরং একটু গলা চড়িয়ে বলল, “কে, কে তােমরা?”
“আমি বিন্টু আর ও বাবাই।” বলল একজন।
“তা কী ব্যাপার।”
“না, মানে ইয়ে, তােমার সঙ্গে একটু দরকার আছে, আর কী…”
তােতলানি দেখে যা বােঝার বুঝে গেল ফুলি। কেউ একজন তার রূপে মজেছে।
ফুলি বলল, “তা দরকারটা কার?”
“ইয়ে মানে, আমাদের দুজনেরই।”
এবার একটু অবাক হল ফুলি। একসঙ্গে দু’জন প্রস্তাব দিচ্ছে এমন ঘটেনি জীবনে। ফুলি মনে মনে খুশিই হল। যাক, নতুন একটা অভিজ্ঞতা হল। বাংলার ক’টা মেয়ের এমন সৌভাগ্য হয় ! ফুলি বলল, “শােন, বুঝতে পেরেছি ব্যাপারটা, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এখন কাউকেই সময় দিতে পারব না, একটু ধৈর্য ধরতে হবে তােমাদের, অপেক্ষা করাে।”
একজন বলল, “মেরেছে, অপেক্ষা করে-করে তাে জীবনটা গেল, মরার পরও অপেক্ষা!”
এবার ফুলি তুতলে ফেলল একটু, “মা-মানে!”
“মানে আমরা আর জিন্দা নেই। মাস ছ’য়েক আগে দু’জনেই মরেছি। এই কাঁসারি পুকুরেই যে জোড়া লাশ পাওয়া গেল, ও দুটো আমাদেরই।”
ফুলির মনে পড়ে গেল, ঠিকই মাস ছ’য়েক আগে দুটো লাশ ভেসে উঠেছিল এই পুকুরে। কেউ বলল আত্মহত্যা, কেউ বলল মার্ডার। পুলিশ এসে তুলে নিয়ে গিয়েছিল লাশদুটো।
কপালে ফুটকি-ফুটকি ঘাম ফুটে উঠল ফুলির। একজন বলল, “আমরা দুজনেই ছিলাম তােমার প্রেমে পাগল।”
ফুলি বলল, “কিন্তু আমি তাে তােমাদের কখনও রিফিউজ করেছি বলে মনে পড়ছে না।”
“না না, তােমার কোনও দোষ নেই, আসলে আমরা প্রস্তাবটাই করে উঠতে পারিনি তােমার কাছে। আমরা দু’জনে ছিলাম বুজুম ফ্রেন্ড, মানে হরিহর আত্মা। এদিকে দু’জনেরই বিশ্বাস তুমি তাকেই ভালবাস। শেষে ঠিক হল, একটা ট্রায়াল হবে। জলে ডুব দেব দু’জনেই। যে বেশিক্ষণ ডুবে থাকতে পারবে, সে প্রপােজ করবে তােমাকে। এদিকে আবার দাসপাড়ার টুনি আমাদের প্রেমে পাগল। কিন্তু ঝগড়ুটে টুনিকে কেউই পাত্তা দিই না। কিন্তু শেষপর্যন্ত টুনিরই শরণাপন্ন হতে হল। ও হবে রেফারি। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে সময় দেখবে। কিন্তু এই মওকায় একটা শর্ত চাপাল টুনি। যে হারবে তাকে প্রেম করতে হবে টুনির সঙ্গে। তা আমরা জলে ডুব দিলাম। দু’জনের মনেই ভীষণ প্রতিজ্ঞা, হারা চলবে না কিছুতেই। হারলে তােমাকে হারাতে হবে, সেইসঙ্গে গলায় ঝুলবে টুনি। যাকে বলে, গােদের উপর বিষফোঁড়া। দশ মিনিট, পনেরাে মিনিট, আধঘণ্টা, এক ঘণ্টা, দু’জনেই ডুবে আছি, হারতে রাজি নই কেউ। শেষকালে দম আটকে মরে গেলাম দু’জনেই। টুনি এদিকে অপেক্ষা করে-করে চলেও গেল এক সময়।
দু’জনের দুটো মােবাইল জমা ছিল ওর কাছে, পুরনাে দামে বেচেও দিল। পরদিন ভেসে উঠল আমাদের লাশদুটো। সেই থেকে ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।”
একটা যেন দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পেল ফুলি। সে বলল, “কিন্তু আমার কাছে কী চাও?”
“মুক্তি।”
“মুক্তি!” অবাক হল ফুলি।
“আসলে আমাদের অতৃপ্ত আত্মা তাে, মুক্তি পায়নি। যমরাজ বলেছে, গয়ায় পিণ্ড-ফিণ্ড নয়, তুমি যদি আমাদের ‘আই লাভ ইউ’ বলাে, তাহলেই আমাদের আত্মার মুক্তি হবে।”
ভারী মায়া হল ফুলির। আহা রে, বেচারারা। ফুলির প্রেমে পাগল হয়েই তাে আজ এদের এই অবস্থা। ফুলি তাই দু’বার ফিসফিস করে বলল, ‘আই লাভ ইউ’, ‘আই লাভ ইউ।
বলার সঙ্গে-সঙ্গেই ছায়ামূর্তি দুটো মিলিয়ে গেল বাতাসে।
বাড়ির পথ ধরল ফুলি। মনটা তার ভারী ভাল। আজ পর্যন্ত কত মানুষকে ‘আই লাভ ইউ’ বলেছে। আজ বলল দুটো ভূতকে। ভাবলেই গা-টা শিরশির করে ওঠে যেন!
