ইঁদুর – উল্লাস মল্লিক

ইঁদুর

নিজের জন্য নয়, বাঙালির জন্যে আজকাল বড়াে দুঃখ হয় সাহিত্যিক কালীকিঙ্করের। দুঃখে স্টিম ইঞ্জিনের মতাে ফোঁস ফোঁস দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ভিতর থেকে। কতকিছু ছিল জাতটার, অথচ কিছুই হল না। দিন দিন যেন পিছন বাগে দৌড়ােচ্ছে। কোনাে এক মহাপুরুষ যেন বলেছিলেন, বাঙালি আজ যা ভাবে গােটা ভারত ভাবে কাল। সেই বাঙালির আজ কী হাল! অবশ্য হবারই কথা। আসল রত্ন, মানে খাটি প্রতিভা চিনতে না পারলে এমনই হবে। তাঁর নিজের কথাই ধরা যাক। এতদিন ধরে নিরলস সাহিত্যচর্চা করে চলেছেন, এতগুলাে গায়েগতরে বই লিখেছেন, কিন্তু দেশের মানুষ আজও চিনল না তাঁকে। তাঁর গুপ্তিপাড়ার গুপ্তধন, মুণ্ডু নিয়ে গেণ্ডু খেলা, ফাঁসির মঞ্চে হাসির গান, নবদম্পতির ন’রাত কিংবা সতীমায়ের সিঁথির সিঁদুর বলতে গেলে এক একটা ক্ল্যাসিক। কী নেই সেখানে? টানটান রহস্য, ছমছমে রােমাঞ্চ, পেটফাটা হাসি, টনটনে ব্যথা, হৃদয় নিংড়ানাে কান্না আর জবজবে প্রেমের রসে টইটম্বুর। অথচ পাঠক একটু উলটে দেখল না পর্যন্ত। না জুটল পুরস্কার না সামাজিক সম্মান। আর ওই যে ভবভূতি জোয়ারদার কিংবা পরিতােষ লাহা, যাদের লেখার কোনাে মাথামুণ্ড নেই, দু-পাতা টানা পড়লেই আত্মহত্যা অথবা মানুষ খুন করার ইচ্ছা প্রবল হয়ে ওঠে, তারাই নাকি প্রকৃত সাহিত্যিক। কত হইচই এদের নিয়ে। একের পর এক পুরস্কার, দূর-দূরান্তে সভাপতি, প্রধান অতিথি, কাগজে কাগজে ইনটারভিউ, আজকাল চতুর্দিকে চোদ্দোগন্ডা চ্যানেল। টিভি খুললেই এঁদের মুখ। গণধর্ষণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, রিগিং, প্রশ্নচুরি, শিশুমৃত্যু, বধূহত্যা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রাভিযান—সবকিছু নিয়েই গম্ভীর মুখে লেকচার দিচ্ছেন। ইদানীং আবার পুজো উদবােধনের হিড়িক উঠেছে খুব। ভবভূতি, পরিতােষরা এখানে সেখানে গিয়ে বারােয়ারি পুজোর উদ্বাধন করে আসছেন। কোনাে একটা সাক্ষাৎকারে যেন ভবভূতি জানিয়েছেন, গতবার নাকি সাত-সাতটা পুজো উদবােধন করেছেন তিনি। কালীকিঙ্কর শুনেছেন, উদবােধনের জন্য নাকি টাকাও হাঁকছেন ভবভূতি। সব মিলিয়ে লােকটার ভারি দেমাক। কালীকিঙ্করের সঙ্গে মােলাকাত হয়েছে কয়েকবার, এমন একটা ভাব, যেন রবীন্দ্রনাথই এ যুগে ফিরে পালটে ভবভূতি হয়ে জন্মেছেন। শুনেছিলেন, কোথায় যেন কালীকিঙ্করের সাহিত্য নিয়ে হাসাহাসিও করেছিলেন খুব। ওগুলাে নাকি বটতলার সাহিত্য, আজগুবি কাহিনি, মূল ভাঁড়ামাে আর রগরগে যৌনতায় ঠাসা। কালীকিঙ্কর তাই অপেক্ষায় আছেন, জুৎমতাে একটা পুরস্কার বাগানাে বা ঘ্যামা কোনাে পূজোটুজোর উদ্ববাধন করেন, তাহলেই ভবভূতিকে একটা মুখের মতাে জবাব দেওয়া যাবে। দেখিয়ে দেবেন, কে বটতলার সাহিত্যিক, আর কে আপেল তলার!

কালীকিঙ্করের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার, এই বিপুল ক্ষোভ-বিক্ষোভের অবসান হতে চলেছে আজ মহাষষ্ঠীর দিন। সকালে উঠে যখন রােজকার মতাে চা খাচ্ছেন, এক ছােকরা এসে হাজির। টপ করে একটা প্রণাম ঠকে ভারি বিগলিত ভঙ্গিতে সে জানাল, তার নাম বিপ্রদাস, সুদূর সেই দোয়েলপুকুর অঞ্চল থেকে আসছে, এসেছে কালীকিঙ্করকে নিয়ে যেতে। দোয়েলপুকুর সর্বজনীন দুর্গাপুজোর উবােধন করতে হবে তাঁকে।

কালীকিঙ্কর প্রথমে ভেবেছিলেন, পাড়ার কোনাে ছেলেছােকরার ফাজলামি। একবার হয়েও ছিল তেমন। একজন ফোন করে জানাল, তাঁকে প্রধান অতিথি হতে হবে। তখন বৈশাখ মাস, কালীকিঙ্কর ভাবলেন রবীন্দ্র জয়ন্তীটয়ন্তি হবে। কিন্তু সেই ছোঁড়া খিলখিল করে হেসে জানাল, না রবীন্দ্র জয়ন্তী নয়, একটা গণবিবাহ অনুষ্ঠানে অতিথি হতে হবে তাকে, আর সংস্থার চিরাচরিত নিয়ম, হচ্ছে, নিজে একটা বিয়ে করে প্রধান অতিথি সেই অনুষ্ঠানের সূচনা করবেন।

তাই এবার কালীকিঙ্কর একটু সতর্ক। ছােকরাকে এপাশওপাশ জেরা করলেন খানিক। করে বুঝলেন, রসিকতা নয়, এ ছেলেটা সত্যিই দোয়েলপুকুর সর্বজনীন পুজো কমিটির পক্ষ থেকে এসেছেন তাঁকে নিয়ে যেতে, এবং যেমন তেমন ভিড়ভাট্টার বাসে-ট্রেনে নয়, নিয়ে যাবে একেবারে চারচাকা গাড়ি চাপিয়ে। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে কালীকিঙ্কর দেখলেন, সত্যি সত্যিই আস্ত একটা চারচাকা দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সামনে। কথা প্রসঙ্গে বিপ্রদাস জানাল, বিনিমাগনা নয়, কালীকিঙ্করকে সম্মানদক্ষিণাও দেওয়া হবে কিছু। কালীকিঙ্কর মনে মনে ভাবলেন, বাবা, এ তাে দেখি অড়হর ডালে ঘি। মুখে বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে, সে না হয় পরে হবে।

দ্রুত দাড়িটাড়ি কামিয়ে ধােপদুরস্ত ধুতিপাঞ্জাবি পরে তৈরি হয়ে নিলেন কালীকিঙ্কর। এর মধ্যে গিন্নি উত্তেজনার বশে পাশের বাড়ির মিত্র-গিন্নিকে জানিয়ে দিলেন কালীকিঙ্করের এই অভিযানের খবর। বেলেঘাটা থেকে ছােটোবােন ফোন করেছিল, তাকেও শুনিয়ে দিলেন, এখন ছাড়ছি রে, খুব ব্যস্ত, তাের জামাইবাবুকে নিতে এসেছে। পুজো উদবােধনের জন্য, বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছে।

গাড়িতে উঠতে গিয়ে কালীকিঙ্কর দেখলেন, দু-এক জায়গায় একটু তােবড়ানাে, দরজার হ্যান্ডেলটাও লগবগ করছে। প্রথমে একটু দমে গেলেও ভাবলেন, যাইহােক, চারচাকা তাে বটে, চললেই হবে! সাইকেল, মােটরসাইকেল নয়, রিকশা-অটোরিকশা নয়, এ হল গিয়ে চারচাকা। এর কিনা জাতই আলাদা। সােনার আংটি যেমন বাঁকা হলেও কিছু যায় আসে না, চারচাকাও তেমনি।

তবে বাড়ির উলটো দিকের চায়ের দোকানটা দেখে একটু হতাশ হলেন। অন্যদিন এখানে পাড়ার একদল ছােকরা বসে বসে গুলতানি করে। ছেলেগুলাে কালীকিঙ্করের লেখকসত্তাকে একেব্বারেই স্বীকার করে না। ফি-বছর পাড়ায় যে জলসা বসায় তাতে বেপাড়া থেকে অতিথি-টতিথি ধরে আনে। কিন্তু নাকের ডগাতেই অমন এক জলজ্যান্ত সাহিত্যিক আছে সেটা একবারও মনে পড়ে না। কালীকিঙ্কর দেখলেন, আজ দোকান শুনসান। ব্যাপার কী? ছেলেগুলাে গেল কোথায়? ওরা কি আড্ডা তুলে দিল নাকি! সব কাজের লােক হয়ে গেছে? তাহলে কিন্তু মস্ত ভূল করবে। আচ্ছা বাঙালি জীবনে একটা গুরুতর ব্যাপার। বাংলা সংস্কৃতির অঙ্গ। আড্ডা থেকেই কত সাহিত্য, গান, শিল্প সৃষ্টি হয়েছে এককালে। সেই আড্ডাও যদি আজ বাঙালি তুলে দেয় তাহলে আর রইল কী! অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে কালীকিঙ্করের।

গাড়িতে বসেই কাচগুলাে নামিয়ে দিলেন কালীকিঙ্কর। বসলেনও একেবারে জানালার ধার ঘেঁষে। দেখুক—দেশের জনগণ দেখুক, সাহিত্যিক কালীকিঙ্করকে কত খাতির করে নিয়ে যাচ্ছে এরা।

পকেটে সিগারেট আহে। তবু সামনের মােড়ে পানগুমটির সামনে গাড়ি থামিয়ে সিগারেট কিনলেন কালীকিঙ্কর। তাঁকে গাড়িতে দেখে দোকানদার ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল, কাকাবাবু, কোথায় চললেন পুজোর সময়, শ্বশুরবাড়ি? কাকিমা যাবেন না?

এই সুযােগটার অপেক্ষায় ছিলেন কালীকিঙ্কর। বললেন, আরে না না, শ্বশুরবাড়ি নয়, যাব দোয়েলপুকুর, একটা পুজোর উদ্ববাধন করতে হবে, এরা ধরেছে খুব। ছেলেটি একটু অবাক হয়ে বলল, পুজো? কী পুজো?

এই না হলে বুদ্ধি! কালীকিঙ্কর ক্ষুব্ধ হয়ে ভাবলেন, ষষ্ঠীর দিন সকালে কি মনসা পুজো হবে! এই জন্যেই ছেলেটার উন্নতি হল না। বছরের পর বছর পানগুমটিই চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ কালীকিঙ্কর একজনকে জানেন, যে পানগুমটি থেকে শুরু করে, আজ মােটরগাড়ির শাে-রুমের মালিক। কালীকিঙ্কর বললেন, কী পূজো আবার, দুর্গা পূজো! দোয়েলপুকুর সর্বজনীনের নাম শুনেছিস, ওই অঞ্চলের সবচাইতে জাঁকের পুজো, সেই পুজোর উবােধন করতে যাচ্ছি।

ছেলেটি বেশ অবাক হয়ে তাকাল কালীকিঙ্করের দিকে। দোকানের আরও দু-জন খদ্দেরও দেখছে। সিগারেট ধরিয়ে একমুখ তৃপ্তির ধোঁয়া ছাড়লেন কালীকিঙ্কর।

বাজারের কাছে জ্যাম ছিল একটু। গাড়ি থমকাচ্ছিল বার বার। ড্রাইভার আর বিপ্রদাস একটু বিরক্ত হচ্ছিল। কালীকিঙ্কর ভাবলেন, মা চণ্ডী যা করেন মঙ্গলের জন্যেই করেন। জানলা দিয়ে মুণ্ড গলিয়ে যতটা সম্ভব প্রকটিত করলেন নিজেকে। পরিচিত অনেকের সঙ্গেই দেখা হল। খেয়াল করলেন, প্রত্যেকের চোখেমুখে কমবেশি বিস্ময়। কিন্তু কেউই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল না কিছু। ভারি মর্মাহত হলেন কালীকিঙ্কর, আজকাল লােকের কৌতূহল বলে কিছু নেই নাকি! এই জন্যই বাঙালির কিছু হল না।

কৌতুহলই পারে একটা জাতিকে উন্নতির চরমে নিয়ে যেতে। কৌতূহল মানুষের জ্ঞানতৃষ্ণার প্রকাশ। কৌতূহল থেকেই নতুন নতুন আবিষ্কার হয়। গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখে নিউটনের কৌতূহল হয়েছিল বলেই তাে মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কৃত হল। আজ কালীকিঙ্কর নিশ্চিত, নিউটন বাঙালি হলে কিছুতেই এই আবিষ্কার হত না। অবশেষে স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ভজহরিবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কালীবাবু চললেন কোথায়? হাসপাতালে যাবেন, শরীর খারাপ নাকি? অ্যাম্বুলেন্স নিলেই তাে পারতেন, শুয়ে শুয়ে যাওয়া যেত।

কালীকিঙ্কর বললেন, আরে না না, হাসপাতালে যাব কেন? যাচ্ছি দোয়েলপুকুর, পুজোর উদ্‌বােধন করতে।

ভুরু কুঁচকে ভজহরিবাবু বললেন, পুজো করতে! আপনি তাে জাতে বদ্যি মশাই, বদ্যি হয়ে পুজো করছেন, তাও আবার দূর্গাপূজো! দেশে ব্রাহ্মণের এত ক্রাইসিস নাকি, আর আপনাকেও বলি, রাজি হলেন কী করে, পাপতাপের ভয় নেই!

কালীকিঙ্কর এবার বেশ জোর গলায় বললেন, আরে দূর, পূজো করতে যাব কেন! যাচ্ছি পুজোর উদ্বােধন করতে, বড্ড ধরেছে এরা।

এবার ভারি সন্দিগ্ধ গলায় ভজহরি বললেন, পুজোর ফিতে কাটা! তা এরা আবার পৌঁছে দেবে তাে? বেশিরভাগ সময় এই সব পূজো কমিটি কাজ মিটিয়ে এমনি ছেড়ে দেয়। তখন বাস, ট্রেন ঠেঙিয়ে ফেরােরে। ভালাে করে কথা বলে নেবেন কিন্তু।

কালীকিঙ্কর বললেন, হ্যাঁ-হ্যাঁ পৌছে তাে দেবেই, অ্যাপিয়ারেন্স মানি পর্যন্ত দিচ্ছে।

ভজহরি এমন একটা মুখভঙ্গি করলেন, যার অর্থ-অমন সবাই বলে, কিন্তু কাজের বেলায় করে না।

কালীকিঙ্কর কিছু বললেন না আর। কী হবে বলে। অবিশ্বাসীকে কি সহজে বিশ্বাস করাতে পারবেন? এই, জন্যই তাে বাঙালির কিছু হল না, সব কিছুতেই অবিশ্বাস আর সন্দেহ। কিন্তু বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। শিষ্য সাঁতার জানে না। গুরু তাকে ভাঁজকরা এক টুকরাে কাগজ দিয়ে বলেছে, এর মধ্যে মন্ত্র আছে, মন্ত্রের জোরে তুই জলের উপর দিয়ে হাঁটতে পারবি। শিষ্য সত্যিই নদীর উপর দিয়ে দিব্যি হেঁটে যাচ্ছিল। মাঝনদীতে মনে হল, কী এমন মন্ত্র, যার জোরে জলের উপর দিয়ে হাটতে পারছি! দেখি তাে খুলে একবার। খুলে দেখল, কৃষ্ণনাম লেখা। ভাবল বাবা, শুধু কৃষ্ণনামের এত শক্তি! মনে যেই সন্দেহ এল, অমনি সেখানেই ডুবে গেল শিষ্য। কালীকিঙ্কর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, এসব থেকেও শিক্ষা নিল না বাঙালি।

ততক্ষণে বাজারের জ্যামজট পেরিয়ে হু হু করে ছুটছে গাড়ি। কালীকিঙ্কর আলাপ জুড়লেন বিপ্রদাসের সঙ্গে। কথায় কথার অনেককিছু জানতে পারলেন। দোয়েলপুকুরের এই বিখ্যাত পুজো প্রতিবছর উদবােধন করেন তাবড় তাবড় মানুষ। নেতা থেকে অভিনেতা হয়ে খেলােয়াড়-কে নেই লিস্টে? তা এবার নাকি কমিটি থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সাহিত্যিক দিয়ে উবােধন করানাে হবে। তাই কালীকিঙ্কর। বিপ্রদাস খুব বিগলিত গলায় জানাল, আমাদের ওখানে স্যার আপনার প্রচুর ভক্ত।

শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল কালীকিঙ্করের।

সিটে শরীর এলিয়ে চোখ বুজলেন কালীকিঙ্কর। মনের মধ্যে ছবিটা ভেসে উঠল—তিনি গাড়ি থেকে নামলেন, লালপাড় সাদা শাড়ি পরা যুবতি মেয়েরা ফুল ছুড়ে দিচ্ছে মাথায়। এর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা মাথায় ধান-দুব্বো দিয়ে বরণ করল তাঁকে, কতজন খাতা এগিয়ে দিচ্ছে-স্যার একটা অটোগ্রাফ দিন, ক্যামেরায় ছবি উঠছে সটাসট…। না, ক্যামেরার দিকে তাকালে হবে না, আদেখলে ভাববে। একটা নির্লিপ্ত মুখ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে সামনে… যেন এমন আদর-আপ্যায়নে তিনি অভ্যস্ত, গা সওয়া হয়ে গেছে। উহ, ভাবলেই আবার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে কালীকিঙ্করের।

হঠাৎ মনে হল ভবভূতিকে একটু জানানাে দরকার। বড্ড গুমাের। কথা প্রসঙ্গে একদিন বলেছিলেন, অনুষ্ঠানে যেতে হবে শুনলেই নাকি আতঙ্ক হয় আজকাল। অথচ কোনাে অনুষ্ঠানে তাে কামাই নেই, সর্বত্রই সেজেগুজে হাজির হচ্ছে। নম্বরটা সেভ করা ছিল। ফোন লাগালেন কালীকিঙ্কর। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ধরলেন ভবভূতি। –হ্যালাে!

প্ৰথমেই উদবােধনের কথাটা বলা যাবে না। ভাববে ওই কারণেই ফোন করেছে। তাই শরীরের খবরাখবর, জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা ইত্যাদি নিয়ে দূ-চার কথা বললেন কালীকিঙ্কর। তারপর হঠাৎ যেন মনে পড়েছে এমন একটা ভাব দেখিয়ে বললেন, আর বলবেন না, এই সাতসকালেই যেতে হচ্ছে দোয়েলপুকুর।

ভবভূতি বললেন, দোয়েলপুকুর যাচ্ছেন, ও আপনার শালির বাড়ি বােধহয় ওদিকেই, তাই না? তা পুজোর জামাকাপড় নিয়ে যাচ্ছেন বুঝি!

‘আরে না না, কালীকিঙ্কর বললেন, যাচ্ছি পুজোর উদবােধন করতে। দোয়েলপুকুর সর্বজনীন আছে না, ওখানে ওটাই সবচেয়ে বড়াে পূজো, ওটার উদবােধনে যাচ্ছি।

একটু চুপ করে থেকে ভবভূতি বললেন, কালীবাবু, আপনি মদ্যপান করেন বলে শুনেছি, বিশেষ করে পরের পয়সায় পেলে ছাড়েন না, কিন্তু গাঁজা ধরলেন কবে?

প্রচণ্ড অপমানিত হলেন কালীকিঙ্কর। ফোন কেটে দিলেন। এই জন্যই বলে বাঙালি কাঁকড়ার জাত। অন্যের উন্নতি একেবারে সহ্য করতে পারে না। ঠিক আছে, তিনিও প্রমাণ দেখিয়ে দেবেন। বিপ্রদাসকে বললেন, ভাই, তােমাদের অনুষ্ঠানের ছবিটবি উঠবে তাে?

বিপ্রদাস বলল, নিশ্চয়ই স্যার, স্টিল, ভিডিয়াে দু-রকমই থাকবে।

অনুরােধটা ঠিক অতিথিসূলভ হচ্ছে না জেনেও করে ফেললেন, আমাকে দুটো ছবি পাঠিয়ে দিও তাে!

গাড়িটা ঘ্যাচ করে ব্রেক কষল তখনই। বিপ্রদাস বলল, নিশ্চয়ই। আসুন স্যার, আমরা পৌঁছে গেছি।

একা একটা ঘরে বসে আছেন কালীকিঙ্কর। গাড়ি থেকে নামিয়ে বিপ্রদাস এখানেই বসিয়ে গেছে তাঁকে। না, নামার সময় পুষ্পবৃষ্টিটিষ্টি হয়নি। ক্যামেরা হাতেও কাউকে দেখলেন না। পুজো কমিটিরও ছিল না কেউ। শুরুর অভ্যর্থনটা কেমন যেন ন্যাড়া ন্যাড়া। কিছুটা হতাশই কালীকিঙ্কর। ভাবছেন, প্যান্ডেলে ঢুকে যখন ঠাকুর উদবােধন করবেন, তখন ঠিক ওসব হবে। প্যান্ডেলটা কাছেপিঠেই মনে হয়। মাইকের গান ভেসে আসছে। এর মধ্যে কয়েকবার হন্তদন্ত হয়ে বিপ্রদাস বলে গেছে, একটু বসুন স্যার, একটুখানি, ব্যবস্থা হচ্ছে। ছেলেটাকে কেমন যেন উদ্ভান্ত আর দিশেহারা লাগছে। একটু চিন্তিত হলেন কালীকিঙ্কর। গণ্ডগােল কিছু হল নাকি? ঠাকুর কি এখনও এসে পৌঁছােয়নি? নাকি ফোটোগ্রাফার আসেনি। এইসব সিজনে ফোটোগ্রাফারদের খুব ডিমান্ড হয়। পােটোরাও ঠিক সময়ে ঠাকুর ফিনিশ দিয়ে উঠতে পারে না। যাইহােক, কালীকিঙ্করের অসুবিধে কিছু নেই, উদ্‌বােধনের জন্য যদি দশমী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, তাও রাজি।

না, বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না কালীকিঙ্করকে। একটু পরেই ফের উদয় হল বিপ্রদাস। এবার সঙ্গে পুজো কমিটির সেক্রেটারি। সেক্রেটারিমশাই প্রচুর ক্ষমাটমা চেয়ে বললেন, একটু গণ্ডগােল হয়ে গেছে স্যার!

কালীকিঙ্কর স্মিত হেসে বললেন, বুঝেছি, ঠাকুর এসে পৌঁছােয়নি তাে?!

না স্যার, ঠাকুর এসে গেছে অনেকক্ষণ।

তাহলে ফোটোগ্রাফার আসেনি তাে!

স্যার, তাও ঠিক নয়।

ও বুঝেছি। কালীকিঙ্কর বললেন, প্যান্ডেলের কাজ এখনও শেষ হয়নি। ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করছি।

সেক্রেটারি ভারি করুণ গলায় বলল, না স্যার, তাও নয়, আসলে স্যার উদবোধন হয়ে গেছে।

হয়ে গেছে! কালীকিঙ্কর প্রায় আর্তনাদ করে বললেন।

হ্যাঁ স্যার, হয়ে গেছে। প্রায় কাঁদ কাঁদ গলায় সেক্রেটারি বলল, একটু আগেই হয়ে গেছে স্যার।

কিন্তু আমাকে তাে উদবােধনের জন্যই আনা হয়েছে। বিপ্রদাস তাে তেমনই বলল।

ওর দোষ নেই স্যার। সেক্রেটারি বলল, আসলে স্যার হয়েছে কী, উদবােধন করার কথা ছিল সাহিত্যিক ভবভূতি জোয়ারদারের। কিন্তু কাল রাতে ফোন করে জানালেন, আসতে পারবেন না, শাশুড়ি মায়ের বুকে ব্যথা, হার্ট অ্যাটাক। আমাদের তাে তখন মাথায় হাত। এই ফুল সিজনে এখন কাকে পাই? ভােরবেলা বাসিমুখেই বিপ্রদাস গাড়ি নিয়ে দৌড়ােল সাহিত্যিক খুঁজতে, ভাগ্য বলে স্যার পেয়েও গেল আপনাকে। এদিকে তারপরেই ভবভূতিবাবুর ফোন। বললেন, যাচ্ছি উবােধন করতে। ওনাকে না কি মা দুর্গা স্বয়ং দেখা দিয়েছেন স্বপ্নে। বড়াে অভিমানে বলেছেন, আমি জগতের মা, আমার চেয়ে তাের শাশুড়ি মায়ের বুকের ব্যথা বড়াে হল! তাও যদি গুরুতর কিছুহয়, হয়েছে তাে গ্যাস-অম্বল থেকে, অ্যান্টাসিডেই সেরে যাবে। ওরে, এই জন্যই আজ বাঙালির এই হাল। নার্সিংহােমের রিসেপশনে বসে একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল ভবভূতিবাবুর, তখনই মায়ের এই দর্শন। ঘুম ভাঙার পর নার্সিংহােম থেকে জানানাে হল, সত্যিই ভারী কোনাে রােগ নয়, হয়েছে গ্যাস-অম্বল থেকেই। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলেন—আসবেন। ফোন করে জানালেন, যাচ্ছি। এদিকে বিপ্রদাস তখন বেরিয়ে গেছে, তাড়াহুড়ােয় ফোনটা ফেলে গেছে বাড়িতে। ওর স্যার দোষ নেই তেমন। আপনি আসার একটু আগেই ভবভূতিবাবু উদবােধন করে চলে গেলেন।

কালীকিঙ্কর কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। একবার তাকাচ্ছেন সেক্রেটারির দিকে আর একবার বিপ্রদাসের দিকে। দু-জনেই ঘাড় হেঁট করে মাথা চুলকোচ্ছে।

সেক্রেটারিই নীরবতা ভাঙল। বলল, তবে স্যার আপনি যদি চান, আপনাকে খালি হাতে ফেরাব না। উদবোধনের কথা বলে আনা হয়েছে যখন…।

কালীকিঙ্কর ভুরু কুঁচকে তাকালেন।

সেক্রেটারি বলল, মানে স্যার প্যান্ডেলে তােলার সময় গণেশের ইঁদুরটা ভেঙে গিয়েছিল। ভবভূতিবাবু ইঁদুর ছাড়াই উদবােধন করে দিয়েছেন। আমাদের একজন গিয়ে এইমাত্র নতুন একটা ইঁদুর নিয়ে এল। আপনি স্যার ইঁদুরটা উদবােধন করে দিন। এবছরটা স্যার ইঁদুর দিয়েই হােক, সামনের বছর না হয়…।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *