মৃত্যুমুখে খগেন খামরুই
খগেন খামরুই মৃত্যুশয্যায়। খাবি খাচ্ছে। অর্থাৎ পটল তোলার প্রহর গুনছে। যে কোনও সময় তুলবে।
খগেন খামরুই থাকে হুগলী জেলার জয়কৃষ্ণহাটি নামে এক অজ গাঁয়ে। দামোদর তীরবর্তী এই গ্রাম এখন বন্যা কবলিত। ভরা বর্ষায় দামোদর এমনিতেই টইটুম্বুর ছিল। গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মত টি ভি সি, যাকে এলাকার মানুষ টি ভি ছি বলে থাকে, সেই কোম্পানি জল ছেড়ে দিয়েছে। জলের ওই ভীম চাপ সহ্য করতে না পেরে নদী বাঁধ ভেঙে গেছে আর ভেসে গেছে গোটা গ্রাম।
জয়কৃষ্ণহাটির বেশিরভাগ মানুষই চাষবাসের ওপর নির্ভরশীল। কারও একটু কম, কারও একটু বেশি চাষের জমি আছে। পুকুর ডোবা আগান বাগানও আছে কিছু মানুষের। হাতে গোনা কয়েকজনকে বাদ দিয়ে এই জনপদের অধিকাংশ মানুষই গরীবগুর্বো ধরনের। তারমধ্যে খগেন একেবারে হতকুচ্ছিত রকমের গরিব। তার না আছে জমিজিরেত, না আছে আগান-বাগান, না পুকুর-ডোবা। থাকার মধ্যে শুধু পড়ো পড়ো মাটির দেওয়াল আর টালির চালের একটা ঘর।
খগেনের অবশ্য সাংসারিক কোনও ঝুট ঝামেলা নেই। তার না আছে বাপ-মা, না ভাই-বোন। বউও নেই, তাই ছেলেপুলের কথাই ওঠে না। অর্থাৎ গরীব হলেও খগেন এক মুক্ত পুরুষ।
কথায় আছে, যে শুয়ে থাকে তার ভাগ্যও শুয়ে থাকে। খগেনেরও ডিটো তাই। শুয়ে-বসে, নদীর হাওয়া খেয়ে, হাই তুলে সে বিন্দাস কাটিয়ে দেয়। অল্প খিদে পেলে আঁচলা করে টিপকলের জল খেয়ে নেয়, বেশি খিদের সময় প্রতিবেশী কারও বাড়িতে পাত পাড়ে। একটা কলাপাতা কেটে নিয়ে গিয়ে বলে, আজ দুমুঠো ভাত খাব তোমাদের বাড়ি।
খেতে চাইলে গৃহস্থ মানুষ ‘না’ করে না। ডালভাতের সঙ্গে একটু আলু ভাতে, একটু পুঁইশাকের ঘ্যাঁটও পেয়ে যায়। কোনও বাড়িতে জুটে যায় মাছের টুকরোও। খেয়ে দেয়ে খগেন গলা ছেড়ে গৃহস্থের মঙ্গলকামনা করে, তারপর তারই বাড়ির দাওয়ায় কিংবা কোনও ঝাঁকড়া গাছের ছাওয়ায় শরীর ছেড়ে দেয়। অর্থাৎ ‘ভোজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে’ বলে যে চালু কথাটা আছে তার পারফেক্ট উদাহরণ এই খগেন খামরুই।
সেই খগেন, বন্যা কবলিত জয়কৃষ্ণহাটির খগেন এখন মৃত্যু মুখে। সত্যি বটে, যে কোনও বানভাসি এলাকায় বহু মানুষ বেঘোরে মরে। জলে ডুবে, দেওয়াল চাপা পড়ে, অনাহারে মরে। মরে নিউমোনিয়া, আন্ত্রিক সর্পাঘাতে বা বজ্রাঘাতেও। তাজ্জব ব্যাপার, এসবের কোনওটাতেই প্রাণ-সংশয় হয়নি খগেনের। সে মরতে বসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে।
এ বছর আষাঢ়ের গোড়া থেকেই ঘন কালো মেঘে আকাশ ভারি হচ্ছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি। উহ্,সে কী বৃষ্টি! মনে হচ্ছিল ইন্দ্রদেব এবার একটা এস্পার ওস্পার না করে ছাড়বে না।
জয়কৃষ্ণবাটির কৃষিজীবী মানুষজন প্রথমে বেশ পুলকিত হয়েছিল। আকাশ কিপটেমি করেছে আগের বছর। মাঠ ফুটিফাটা হয়ে ফসল জ্বলে গেছে। এ বছর বাকি বকেয়া সব পুষিয়ে দিচ্ছে ওপরওলা। সবাই এবার গোলাভরা ফসল তুলবে মাঠ থেকে।
কিন্তু খুব অতিরিক্ত কোনও কিছুই ভালো নয়। যেমন অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ, অতি চালাকের গলায় দড়ি, অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট। তেমন বৃষ্টিও যদি অতি হয় তো বিপদ। তাই হল। ডোবা খানা খাল বিল পুকুর ভরে উঠল অচিরে। দামোদরও টইটুম্বুর। সুযোগ বুঝে জমা জল ছেড়ে দিয়ে ষোলোকলা পূর্ণ করল টি.ভি.সি।
বাঁধের একটা জায়গা অনেকদিন ধরেই নড়বড়ে। সরকার থেকে বাঁধ মেরামতির টাকা এসেছিল পঞ্চায়েতে। কিন্তু অঞ্চল প্রধান হরিপদ হালুই ভুল করে সে টাকায় বাঁধ মেরামতি না করে নিজের দোতলা বাড়িখানা মেরামত করে ফেলেছে। হরিপদ হালুই হচ্ছেন মানুষ পার্টির নেতা। এই মানুষ পার্টিই এখন গদিতে। যাই হোক, ভুল তো মানুষ মাত্রেই করে; এবং কথায় আছে, যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হয়। হরিপদ ভুল করেছেন, সুতরাং চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, তিনি কাজের লোক।
অবশ্য এই প্রথম নয়, এর আগেও বাঁধ সারাইয়ের টাকা এসেছিল। সে সময় রাজ্যে জানুস পার্টির রাজত্ব। জানুস পার্টির লোকাল লিডার জগন্নাথ জোমরাল অঞ্চল প্রধান। জগন্নাথের বড় মেয়ে চম্পাকলির বিয়ের ঠিক হয়েছে। বিয়ে হচ্ছে, জানুস পার্টির জেলা কমিটির মেম্বার কমরেড পরিমল পাত্রের ছেলে প্রশান্তের সঙ্গে। প্রশান্ত অতি সুপাত্র। বাপের মতো রাজনীতি না করলেও, একটা ইটভাটা, একটা তেলকল আর একটা রাইস মিল করে ফেলেছে এই বয়েসেই। বিয়ের কথা দিব্যি এগোচ্ছিল। হার্ড ক্যাশ, সোনাদানা, আসবাবপত্র, যাবতীয় যৌতুকের ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন জগন্নাথ। কিন্তু হঠাৎই একটা মোটর গাড়ি চেয়ে বসল কমরেড পরিমল।
জগন্নাথ দেখলেন বাঁধের যে খুঁতটা ধরা পড়েছে, তা বড়সড় কিছু নয়। তার ওপর তখন পোষ মাস, বর্ষা আসতে ঢের দেরি। তারপর ভয়ঙ্কর রকমের অতিবৃষ্টি না হলে বিপদের কোনও সম্ভাবনা নেই। কিন্তু মোটর গাড়ি না দিতে পারলে অমন হীরের টুকরো জামাই ফসকে যেতে পারে। এতকিছু বিবেচনা করে বিচক্ষণ জগন্নাথ বাঁধ মেরামত না করিয়ে মোটরগাড়ি কিনে ফেলেন। তখন অবশ্য হরিপদ হালুই অঞ্চল প্রধানের দুর্নীতি নিয়ে বিস্তর চোঙা ফুঁকেছিলেন। মোদ্দা কথা, সরকারের ঘর থেকে বাঁধ সারাইয়ের টাকা দু’বার এসেছিল। কিন্তু একজনের অন্যমনস্কতা আর একজনের বিচক্ষণতায় সে টাকা অন্য খাতে খরচ হয়ে গেছে।
এখন বৃষ্টির জল আর টি ভি সির ছাড়া জলের চাপে ওই নড়বড়ে জায়গা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল আর জল বর্গি সেনার মতো রে রে করে ঢুকে ভাসিয়ে দিল গোটা এলাকা। জল বাড়তে বাড়তে জয়কৃষ্ণহাটির বাড়ি বাড়ি ঢুকে পড়ল। প্রথমে উঠোন, তারপর দাওয়া,শেষে দাওয়া থেকে শোবার ঘরে। গর্তে জল ঢুকলে গর্ত থেকে যেমন ইঁদুর বেড়িয়ে আসে পিলপিল করে তেমনই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলো মানুষজন। জয়কৃষ্ণহাটি হাই স্কুল বেশ উঁচু জমির ওপর। বাড়িটাও দোতলা। অগত্যা বানভাসি আশ্রয় নিলো স্কুলে। সেই দলে খগেনও ছিল। জলের তোড়ে খগেনের দাঁত বের করা ঘরটা দেহ রেখেছে। তাতে অবশ্য খগেনের কাঁচকলা;কারণ, ন্যাংটার নেই বাটপারের ভয়। ঘরে তার না ছিল খাট বিছানা, না ঘটিবাটি। কিন্তু খগেনের মনে অন্য ভয় ঢুকল একটা। গ্রামের যে সব মানুষের বাড়ি গিয়ে সে পাত পাড়ে তাদের বেশিরভাগই এখন বাড়িছাড়া। তারাও আশ্রয় নিয়েছে ইস্কুল বাড়িতে। কারও ক্ষেত ডুবে গেছে, কারও পুকুর ভেসে গেছে। শুকনো মুখ করে সব বসে আছে আর মাঝে মাঝে উট মুখো হয়ে আকাশ দেখছে। খগেন এখন পাত পাড়ে কোথায়?
এই সময়েই সিনে এলেন সেই ভুলোমন অঞ্চল প্রধান হরিপদ হালুই। তিনি এইসব ডুবো-ডুবো মানুষদের কাছে খড়কুটো ফেলার ব্যবস্থা করলেন। করলেন, খোদ মুখ্যমন্ত্রীর হুকুমে। আসলে শুধু জয়কৃষ্ণহাটি তো নয়, রাজ্যের আরও বহু জায়গা জলের তলায়। কারণ, এ দেশে তো অন্যমনস্ক অথবা বিচক্ষণ মানুষের অভাব নেই। তাই জায়গায় জায়গায় বন্যা। দেখেশুনে মুখ্যমন্ত্রী উদ্বিগ্ন এবং অগ্নিশর্মা। মানুষ ভাসলে মানুষ পার্টির মাথা তো উদ্বিগ্ন হবেনই। আর অগ্নিশর্মা কারণ, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস টি ভি সি ইচ্ছে করে জল ছেড়ে রাজ্যটাকে ডুবিয়ে দিয়েছে। তলে তলে কেন্দ্রও আছে। অর্থাৎ কেন্দ্র আর টি ভি সি-র যৌথ ষড়যন্ত্রের জন্যই আজ তাঁর ভরাডুবি।
মুখ্যমন্ত্রী লেট করার মানুষ নন। তিনি তড়িঘড়ি মিটিং ডাকলেন। উচ্চ পর্যায়ের মিটিং। মিটিং-এ ঠিক হল, এইসব বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। প্রথমেই ব্যবস্থা করতে হবে খাবারের। তিনি নিচের তলার কর্মীদের নির্দেশ পাঠালেন, ডাঙায় দাঁড়িয়ে না থেকে তোমরাও জলে নামো।
সেই নির্দেশ মোতাবেকই হরিপদ হালুই জলে বা ফিল্ডে নামলেন। পার্টির ছেলেপুলেদের নিয়ে ইস্কুল মাঠে তেরপল টাঙিয়ে লঙ্গরখানা খুললেন। বড় বড় হাঁড়ি কড়া এনে রান্না চাপিয়ে দিল হরিপদর ছেলেরা। মেনু অতি নগণ্য। মোটা চালের ভাত, পাতলা বিউলির ডাল, আর শাক চচ্চড়ি। উপোষী মানুষের কাছে তাই অমৃত। তারা চেটে পুটে খেল। নগেনও খেল পেট পুরে।
মানুষ পার্টির পতাকা টাঙানো হয়েছিল মাঠে। সেই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে হরিপদ স্লোগান দিলেন, মানুষ পার্টি – !
সবাই গলা মেলাল, জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ!
দিকে দিকে মানুষের জন্য মানুষ পার্টি লড়ছে, লড়বে!
লড়ছে, লড়বে!
দিনে রাতে ডাঙায় জলে মানুষ পার্টি থাকছে, থাকবে!
থাকছে, থাকবে।
মানুষকে আমরা ভুলছি না, ভুলব না।
ভুলছি না, ভুলব না।
বানের জলে ভেসে আসা বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি দূর হটো।
দূর হটো, দূর হটো।
কায়েমি স্বার্থকে ডুবিয়ে মারো!
ডুবিয়ে মারো, ডুবিয়ে মারো।
আমাদের প্রিয় মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় এই লঙ্গরখানা চলছে, চলবে!
চলছে, চলবে!
ব্যাপার দেখে প্রমাদ গুনলেন জানুস নেতা জগন্নাথ জোমরাল।
মানুষ পার্টির নাম কেন মানুষ পার্টি সে তো মানুষ মাত্রেই জানেন। এরা সব সময় ‘মানুষ –মানুষ’ করে। মানুষই এদের বীজমন্ত্র। ‘মানুষ-মানুষ’ জপ করতে গিয়ে জীবজন্তুকেও মানুষ জ্ঞানে সেবা করে ফেলে। কিন্তু জানুস পার্টির নাম কেন জানুস পার্টি সেটা বলা যাক। এই দলের নেতা মন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্যাডার কর্মী সবার ব্যাপক জ্ঞান। সব কিছু জানে। কারণ তাঁরা সবাই পার্কসবাদ পড়ে বসে আছে। এই পার্কসবাদের বাইরে কিছু নেই। এ থেকেই প্রবাদ হয়েছে, যা নেই পার্কসে তা নেই পার্কসে। এখানে দ্বিতীয় পার্কস বলতে পৃথিবী বোঝাচ্ছে। এ দলের ক্যাডাররা ভারত-চীন, শিল্প-কৃষি, আলু-রাঙাআলু, কপি-কচুর মেলবন্ধন কেন জরুরি সব জলের মতো বুঝিয়ে দিতে পারেন। সব জানে বলেই এই দলের নাম জানুস পার্টি।
জানুস পার্টি আগে ক্ষমতায় ছিল, এখন আর নেই। পার্টিতে দামোদর বাঁধের থেকেও বড় ফাটল ধরেছে। সেই ফাটল গলে নেতা কর্মী ক্যাডার ভোটার সব পিল পিল করে বেরিয়ে যাচ্ছে। গিয়ে ভিড়ছে মানুষ পার্টি আর হনুস পার্টিতে। হ্যাঁ, হনুস পার্টি নামে একটা দলও জাঁকিয়ে বসেছে এখানে। এরা হনুমানের পুজো করে বলে এই দলের নাম হনুস পার্টি। এই দল আগে পুচকে ছিল, এখন বিরাট বীর হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। হুপ-হাপ ডাক দিচ্ছে, দাঁত কিড়মিড় করছে।
যাই হোক, জ্ঞান বৃদ্ধ জানুস পার্টির কথায় ফিরে আসা যাক। জানুস পার্টির এখন অবস্থা ভালো নয়, হেঁপো রুগীর মতো হাঁপাচ্ছে। ওপর মহল থেকে চাপ আসছে নিচের মহলে – অক্সিজেন দাও, কিছুদিন পরে পার্টি অফিস খোলার লোক পাওয়া যাবে না যে!
জগন্নাথ জোমরাল দেখলেন, এই সুযোগ যদি লঙ্গরখানা খোলা যায়, বুভুক্ষু মানুষজনকে যদি খাওয়ানো যায়, তাহলে পার্টি কিছুটা চাঙ্গা হতে পারে। লোকে বলবে, দেখো জানুস পার্টি ফিনিশ হয়ে যায়নি। তাই জগন্নাথও লঙ্গরখানা খুললেন। পার্টিজান কয়েকটা ছেলে, যারা এখনও ডিগবাজি খায়নি, তাদের নিয়ে পার্টি অফিসের সামনের মাঠে ব্যবস্থা হল লঙ্গরখানার। জানুস পার্টি ফান্ডে মালকড়ি মন্দ নেই। অনেকে এই দলকে কৌটো নাড়া পার্টি বলে। সোমালিয়ায় বোমা পড়লে, পাকিস্তানে ভূমিকম্প হলে, উত্তর কোরিয়ায় দাবানল লাগলে এদলের ক্যাডারকুল কৌটো নেড়ে পয়সা তুলত। তাছাড়াও দলের অন্য সোর্স অফ ইনকামও আছে। জানুস পার্টি চিরকালই পুঁজিবাদের তীব্র বিরোধী। কথায় কথায় পুঁজিবাদের গুষ্টির তুষ্টি করে। তাদের বক্তব্য এই দল সর্বহারাদের দল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, দেখা গেছে পুঁজিবাদের মুণ্ডপাত করলেও পুঁজিবাদীদের সঙ্গে বশ দহরম মহরম। জানুস পার্টি সম্ভবত ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়’ – যিশুর এই বাণীতে বিশ্বাসী। এই পার্টি প্রায় সাড়ে তিন দশক ক্ষমতায় ছিল। এই দীর্ঘ সময় কৌটো নেড়ে, পুঁজিবাদের নিন্দে আর পুঁজিপতিদের তোয়াজ করে নিজেদের পুঁজিটিকেও বেশ নধর করে নিয়েছে। তাই টাকা পয়সার সমস্যা হল না। নেতারা আলোচনা করলেন, শুধু লঙ্গরখানা খুললেই হবে না, মানুষ পার্টির থেকে ভালো মেনু দিতে হবে। তেমনই ব্যবস্থা হল। একটু সরু চালের ভাত, ঘন ডাল, আলু ভাজা আর আলু পটলের তরকারি। অনুমান অব্যর্থ। দেখা গেল, মানুষ পার্টির লঙ্গরখানা ছেড়ে দলে দলে লোক এসে এখানে খেয়ে যাচ্ছে। খেয়ে দেয়ে এঁটো হাত ছুঁড়ে ছুঁড়েই স্লোগান দিচ্ছে-ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।
টাটা-বাটা-আটা-ময়দার মৈত্রী জিন্দাবাদ!
জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।
আমেরিকার সঙ্গে ঘ্যাঁট চুক্তি মানছি না, মানব না!
মানছি না, মানব না!
হনলুলুর আলু চাষি মরল কেন? হনুস তুমি জবাব দাও!
জবাব চাই, জবাব দাও।
মানুষ, হনুস তোমাদের আর একটি ভোটও দিচ্ছি না, দেব না।
দিচ্ছি না, দেব না।
সিন্ডিকেট সরকার!
আর নেই দরকার!
সবার সঙ্গে খগেনও খেল। স্লোগানে গলা মেলায়। তারপর পার্টি অফিসের সিঁড়ির নিচে শুয়ে তৃপ্তির ঘুম দিল।
মানুষ দেখল, এতো মহা কেলো। স্রেফ মেনুর জোড়ে জানুস পাবলিক টানছে। অগত্যা মেনু বদলাল মানুষ। সরু ভাত, ঘন ডাল, আলু পটলের সঙ্গে ছোট এক পিস মাছ। ব্যস, মাছের গন্ধ ছাড়তেই জানুস ছেড়ে লোকজন মানুষে গিয়ে ভিড়ল। খেয়ে দেয়ে আরও জোর গলায় স্লোগান দিল।
ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করল হনুস পার্টি। পর্যবেক্ষণ করে বুঝল, মেনুটাই আসল। মেনু যদি জম্পেশ হয় তো পাবলিক খাবেই। হনুমান মন্দিরের সামনে লঙ্গরখানা খুললেন হনুস নেতা বলাই মোদক। মাছের বদলে মুরগির ঝোল। ব্যস সঙ্গে সঙ্গে জনতার ঢল হনুস শিবিরে। পেট পুরে মাংস ভাত খেয়ে বলাই মোদকের সঙ্গে গলা মেলালো সবাই।
হনুস পার্টি জিন্দাবাদ।
জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ!
মানুষ জানুস অশুভ আঁতাত মুর্দাবাদ!
মুর্দাবাদ, মুর্দাবাদ!
মাঠে-ময়দানে, পার্কে শ্মশানে প্রকাশ্য চুমুর বিরুদ্ধে…!
লড়তে হবে একসাথে!
চোর মানুষের জেল হবে।
জেল হবে, জেল হবে।
রক্তচোষা জানুস তুমি শূলে চড়বে।
শূলে চড়বে, শূলে চড়বে!
আগামীতে আসছে দিন।
মানুষকে ধরে কবর দিন।
তারপর তারা সবাই মিলে – ‘জয় হনুমানজি কি , জয়’ বলে এমন হাঁক পাড়ল, যে বন্যার জমে থাকা জলে ঢেউ খেলে গেল।
সবার সঙ্গে হাঁক ডাক ছেড়ে কেটে পড়ার তাল করছিল খগেন। বলাই খপ করে ধরল – অ্যাই খগেন!
খগেন বিগলিত গলায় বলল, হ্যাঁ বাবু।
খেয়েছিস?
হ্যাঁ বাবু, বড্ড খেয়েছি। তোমাদের খুব ভাল হবে, দেখ।
ভাল আর কী করে হবে; তোরা পাঁচজনে মিলে ভোট যদি না দিস!
দেব বাবু; একশবার দেব, হাজার বার দেব।
ঠিক দিবি তো? এতদিন তো ওদের দুজনকে দেখলি, এবার পাল্টে দিয়ে দেখ।
ঠিকই তো বাবু। পাল্টে দেব।
ঠিক আছে, কালও মাংস ভাত; চলে আসবি বলে, বলাই মোদক বিড়ি ধরাল একটা।
# # #
এরপর ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় নিলো। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। মেনু নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামল তিন দল। উত্তরোত্তর মেনু বদল। এ ফিস ফ্রাই দেয় তো ও চিকেন পকোড়া। এ পোলাও আর পাকা কইয়ের কালিয়া খাওয়ায়, তো অন্য দল বিরিয়ানি। শেষ পাতে একজন রসগোল্লা দিলে অন্যজন লেডিকেনি।
অটো-টোটোতে মাইক লাগিয়ে ঘুরে ঘুরে প্রচার করছে তিন দলই। সেদিনের মেনু বলে দিচ্ছে। বন্যা কবলিত মানুষ হিসেব নিকেশ করে যার যেমন পছন্দ সেখানে পাত পাড়ছে। কিন্তু খগেন পড়ে গেছে মহা খ্যাঁচা কলে। কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবে ঠিক করে উঠতে পারছে না। এসব আয়োজনের কোনওটাই ছাড়া যায় না। তাই সে ঘুরে ঘুরে সব ক্যাম্পেই খেতে লাগল। মানুষ ক্যাম্পে বিরিয়ানি খেয়েই জানুস ক্যাম্পে গিয়ে বসে পড়ল ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন খেতে। সেখান থেকে হাত চাটতে চাটতেই ছুটল হনুস ক্যাম্পে, কারণ সেখানে সেদিন তন্দুরি রুটি, মাটন কষা, নবরত্ন কারি, বেগুন বাহার, সঙ্গে স্যালাড।
কিন্তু তার অনাহারক্লিষ্ট শরীর এই গুরুভোজ নিতে পারল না। খুব তাড়াতাড়ি পেট ছেড়ে দিল। তবু খাওয়া ছাড়তে পারে না খগেন। বার বার বাগান সারতে যেতে হচ্ছে, শরীর দুর্বল লাগছে, কিন্তু খাওয়া দাওয়াও থামা দিতে পারছে না সে। খাওয়ার সময় ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে বসে পড়ছে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবার পথেই বাগান সারতে হচ্ছে কোথাও। তবু হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে ঠিক হাজির হয়। গোগ্রাসে গেলে।
ক’দিন পর আর উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রইল না খগেনের। পাইখানার সঙ্গে শুরু হল ভেদবমি। কোন ক্রমে রবি মণ্ডলের পরিত্যক্ত গোয়াল ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল সে। দয়াপরবশ হয়ে রবি মণ্ডল পাড়ার পাঁচু ডাক্তারকে খবর করল। ডাক্তার এসে নাড়ি টিপে বলল, না কোনও আশা নেই, আর মাত্র কিছুক্ষণ…।
সত্যিই কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ নিশ্বাস পড়ল খগেনের। খগেনের মুখাগ্নি করার মতো কেউ নেই। তাছাড়া গ্রামের শ্মশানও জলের তলায়। তাই গ্রামের লোকজনই কলাগাছের ভেলা করে ডেড বডি ভাসিয়ে দিল।
# # #
না খগেনের মৃত্যু নিয়ে কোনরকম হৈ চৈ হয়নি। কোন দলই মৃত্যু অস্বাভাবিক বলে দাবি করেনি। কোনও মিডিয়াও মাথা ঘামায়নি। কোন গণ সংগঠন কলরব তোলেনি, কোথাও মিছিল বেরোয়নি, কেউ মোমবাতি জ্বালায়নি। কারণ এদেশে অনাহারে মৃত্যু শোরগোল ফেলে দেয়; কিন্তু অতিভোজনে মৃত্যু! চুপ, চুপ, খবরদার না!
