নন্দবাবুর নাতিপুতি – উল্লাস মল্লিক

নন্দবাবুর নাতিপুতি

ভূত দুটো শেষ পর্যন্ত কিনেই ফেললেন নন্দবাবু। একটু দামাদামি করতে হল; পছন্দসই ভূতের জন্য বাছাবাছিও করতে হল কিছু। কিন্তু কেনার পর মনে হল, না, ঠকা হয়নি। আসলে দুটো ভূতের দাম তো দিতে হয়নি তাঁকে; দিতে হয়েছে একটার দাম। একটার সঙ্গে আরেকটা ফ্রি। ভূতওলা লোকটা বার বার বলছিল, নিয়ে নিন স্যার; এটা আমাদের স্পেশাল অফার চলছে, লিমিটেড পিরিয়ড অফার। স্টক শেষ হয়ে গেলে আর পাবেন না। তাছাড়া মালের ব্যাপারে গ্যারান্টি। এ লটের সব মালই দুর্দান্ত। সরেস ভূত সব। কোনও কমপ্লেন থাকলে সাতদিনের মধ্যে আসবেন; চেঞ্জ করে নেব; এমন কি চাইলে রিফান্ডও করে দিতে পারি। নিয়ে নিন স্যার।

 আসলে ভূত কেনার ইচ্ছেটা বেশ কিছু দিনই মনের মধ্যে ঘাই মারছিল নন্দবাবুর। সংসারে একা একলা মানুষ তিনি। বিয়ে শাদি করেননি। বলা ভাল, করার ফুরসৎ পাননি। নন্দবাবুর বাবা যখন মারা যান নন্দবাবু তখন কলেজের ছাত্র। গোটা সংসারের দায়িত্ব পড়ল নন্দবাবুর ওপর। মা আর স্কুলপড়ুয়া দু’বোন। ফলে পড়াশোনা ছেড়ে কাজের সন্ধানে বেরতে হল নন্দবাবুকে। শুরু হল কঠিন সংগ্রাম। সংসারের হাল ধরা, বোনেদের বিয়ে দেওয়া – এই সব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের বিয়ের বয়েস পেরিয়ে এলেন।

 কিছুদিন হল চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন নন্দবাবু। জমানো টাকা কড়ি যা আছে বাকি জীবনটা দিব্যি চলে যাবে। এই বয়সে পৌঁছে একটু আরাম করতে ইচ্ছে হয়। কেউ একটু পিঠে সুড়সুড়ি দিয়ে দিল, গা হাত পা দাবিয়ে দিল। কিংবা রাতে ঘুমবার সময় চুলে হিলিবিলি কেটে দিল। এমন সর্বক্ষণের লোক যদি একজন থাকত, বেশ হত তাহলে। কিন্তু তেমন লোক কোথায় যাকে বিশ্বাস করে চব্বিশ ঘণ্টা বাড়িতে রাখা যায়! চারিদিকে যা অবস্থা। প্রায়ই তো শোনা যায় কাজের লোক গৃহকর্তা বা কর্ত্রীকে খুন করে সব লুঠপাট করে নিয়ে চলে গেছে।

 বিকেলের দিকে মাঝে মাঝে হাঁটতে বেরোন নন্দবাবু। পার্কে গিয়ে বসেন। সেখানে সম্প্রতি বিশ্বনাথ ধর নামে একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। বিশুবাবুও রিটায়ার্ড পার্সন। এবং নন্দবাবুর মতো তিনিও অকৃতদার।

 তা একদিন বিশুবাবুকে সমস্যার কথাটা বললেন নন্দবাবু। মন দিয়ে শুনে বিশুবাবু বললেন, সমস্যা বটে; তবে উপায়ও আছে।

 কী উপায়? খুব আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইলেন নন্দবাবু।

সতর্ক দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটু চাপা গলায় বিশুবাবু যা বললেন শুনে চমকে গেলেন নন্দবাবু। আজকাল নাকি কিছু জায়গায় ভূত বিক্রি হচ্ছে খুব গোপনে। দরকার মতো ভূত পাওয়া যায়। মানুষ এখন মানুষের চেয়ে ভূতের ওপর বেশি বিশ্বাস করছে। পয়সা ফেললেই রান্না করার ভূত, কাপড় কাচার ভূত, বাজার করার ভূত সবই পাওয়া যাচ্ছে। যে যার কাজে খুব দক্ষ। রান্নার ভূত দুর্দান্ত সব রেসিপি বানায়। কাপড় কাচার ভূত জামা কাপড় কেচে শুকিয়ে এমনকি ইস্তিরি পর্যন্ত করে রাখে। বাজারের ভূত দেখে শুনে বেছে বুঝে দরদাম করেই জিনিস কেনে। নন্দবাবু যেহেতু আরাম করতে চান তাই তাঁর আরামের ভূত দরকার। বস্তুত বিশুবাবু নিজেও এই রকম একটা ভূত কিনেছেন। আর ব্যবহার করে দেখেছেন, এক্সসেলেন্ট।

 উত্তেজিত নন্দবাবু পরদিনই বেরিয়ে পড়লেন ভূত কিনতে। ঠিকানা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বিশুবাবু। প্রথমে সাতঘড়া যেতে হবে। সাতঘড়া পাঁচমাথার মোড়ে পৌঁছে দক্ষিণ পশ্চিমের নির্জন সরু পথটা ধরে সোজা এগোতে হবে। তারপর ডানদিকে বেঁকে পর পর দু’বার বাঁদিকে বেঁকলেই দেখা যাবে গাছপালা ঘেরা একটা সাদা একতলা বাড়ি। সেই বাড়ির গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে বলতে হবে – ঘড়ুইকাকা আছেন? ব্যস, ঘড়ুইকাকা আপনার সামনে হাজির হবেন। ঘড়ুইকাকাই দোকানের মালিক। খুবই ভদ্র আর অমায়িক মানুষ। কথাবার্তা যা বলার তাঁর সঙ্গেই বলতে হবে।

 বিশুবাবুর ডিরেকশান অনুযায়ী ঠিকঠাক পৌঁছে গেলেন নন্দবাবু। ঘড়ুইকাকার দেখাও পেলেন। একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে নন্দবাবুকে ভূতের স্টক দেখালেন তিনি। শোকেসের মধ্যে পরপর স্বচ্ছ কাচের শিশি সাজানো । প্রত্যেক শিশির মধ্যে কালো ট্যাবলেটের মতো একটা জিনিস। ওগুলোই নাকি ভূত। ক্রেতাকে একটা কোড মন্ত্র দেওয়া হবে। শিশি খুলে সেই মন্ত্র পড়ে তিনবার ফু দিলেই কালো ট্যাবলেট গলে গিয়ে ভূত বেরিয়ে আসবে; এবং নির্দেশ মতো কাজ করে দেবে। প্লেন এন্ড সিম্পল ব্যাপার।

 ভূত ‘ফ্রি’ শুনে খুব উৎসাহ দেখালেন নন্দবাবু। দারুণ অফার তো! অবশ্য সবকিছুর সঙ্গেই এখন ফ্রি দেবার হিড়িক।

 শিশিগুলো যখন নন্দবাবু নেড়েচেড়ে দেখছেন, ঘড়ুইকাকা তখনই একটা শিশি ধরিয়ে দিলেন হাতে। এই শিশির মধ্যে দুটো ট্যাবলেট। অর্থাৎ ফু দিলে দুটো ভূত বেরবে। একটার সঙ্গে একটা ফ্রি।

 তা দেখেশুনে বেছে বেছে এরকমই একটা শিশি কিনলেন নন্দবাবু। একটু দরদাম করতে হল। MRP যা ছিল তার চেয়ে কিছু কমেই পেলেন শেষ পর্যন্ত। ক্যাশ মেমো দেবার সময় ঘড়ুইকাকা বললেন, গণ্ডগোল যদি কিছু বেরোয় এক সপ্তাহের মধ্যে নিয়ে এলে মাল চেঞ্জ করে দেবেন।

 খুব খুশি মনে বাড়ি ফিরলেন নন্দবাবু। রাতে শুতে যাবার সময় শিশিটা হাতে নিলেন। মন্ত্রটা লিখে এনেছিলেন কাগজে। মন্ত্র পড়লেন আগে; তারপর শিশির প্যাঁচ খুলে ‘ফু’ দিলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দেখলেন, সামনে লিকলিকে সরু কালো রঙের দুটো ভূত দাঁড়িয়ে। প্রথমে বুকটা একটু ‘ধক’ করে উঠল নন্দবাবুর। যতই নগদ পয়সা ফেলে কেনা হোক, ভূত তো।

 কিন্তু ভূত দুটোই ভয় ভাঙিয়ে দিল। দুজনে একসঙ্গে খুব মিহি ফিনফিনে গলায় বলে উঠল, বাবু, কী করতে পারি আপনার জন্যে’ আপনি শুধু হুকুম করুন।

 নন্দবাবু বললেন, ইয়ে, মানে, তোমরা কি একটু গা-হাত টেপার কাজ কর?

 দুজনেই বলে উঠল, বাবু, শুধু গা-হাত কেন, মাথা, কোমর, হাঁটু কনুই সবই টিপে দেব আপনার। আর শুধু টেপাই বা বলছি কেন, চুলকে দেওয়া সুড়সুড়ি দিয়ে দেওয়া, ম্যাসাজ করা সব কাজেই আমরা এক্সপার্ট। আপনি যেমনটা বলবেন, তেমনটাই হবে।

 প্রথম দিন। তাই বেশি কিছু অর্ডার করলেন না নন্দবাবু। বললেন, ঠিক আছে, ঘাড়ে যন্ত্রণা করছে আমার; তোমরা একটু ঘাড় টিপে দাও, আর পিঠে একটু ম্যাসাজ।

 শুয়ে পড়লেন নন্দবাবু। কাজ শুরু করে দিল ভূতেরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন তিনি।

 পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল নন্দবাবুর। তখন শরীর তাঁর ঝরঝরে, মন ফুরফুরে।

 বিকেলে পার্কে দেখা হল বিশুবাবুর সঙ্গে। বিশুবাবু বললেন, আপনি তো লাকি মানুষ মশাই। একটার সঙ্গে একটা ফ্রি পেয়ে গেলেন। আমি যখন কিনি, তখন এমন অফার ছিল না। যাক, এবার ভাল করে আরাম করুন।

 দশ বারোদিন সত্যিই দারুণ আরামে কাটালেন নন্দবাবু। কিন্তু তার পরেই শুরু হল সমস্যা। একদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর শুয়েছিলেন। গা হাত পা টেপার কাজ চলছিল। কিন্তু ঘুম আসার আগেই কাজ থেমে গেল। একটু অবাক হলেন নন্দবাবু। ভাবলেন, কোন কারণে বোধহয় থামা দিয়েছে; এখুনিই শুরু করবে আবার।

 কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পরেও কাজ শুরু হল না। মুশকিল হচ্ছে, এখন তাঁর নেশার মতো হয়ে গেছে। গা-হাত না দাবিয়ে দিলে ঘুমই আসতে চায় না। অগত্যা নন্দবাবু তাগাদা দিলেন, নাও, শুরু করে দাও এবার।

 বলার সঙ্গে সঙ্গে নন্দবাবু শুনলেন ভূত দুটো চাপা গলায় কি সব বলছে। একটু তর্কবিতর্ক কথা কাটাকাটি যেন। নন্দবাবু বেশ অবাক হলেন। অবশ্য অবিলম্বেই কাজ শুরু হয়ে গেল। ঘুমিয়ে পড়লেন নন্দবাবু।

কিন্তু মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল নন্দবাবুর। কাজ বন্ধ। ঘুম জড়ানো গলায় তিনি বললেন, কী হল তোমাদের, থামলে কেন! বললেন বটে,কিন্তু সাড়াশব্দ পেলেন না কোনও। একটু অবাক হয়ে গেলেন নন্দবাবু। বললেন, কোথায় গেলে গো সব?

এবার সাড়া পেলেন নন্দবাবু। মৃদু গলায় একজন বলল, আসলে বাবু মানে, একটু ঝামেলা লেগেছে যে।

ঝামেলা! নন্দবাবু ভারি অবাক।

হ্যাঁ বাবু ঝামেলা।

নন্দবাবু বললেন, কী ঝামেলা?

দুজনেই তখন একসঙ্গে কাঁইমাঁই করে কী সব বলতে লাগল। নন্দবাবু কিছুই বুঝতে পারলেন না। বললেন, একসঙ্গে নয় বাপু, তোমরা এক এক করে বল।

একথায় কাজ হল। দুজনেই বলল সমস্যার কথা। দুজনের একই দাবি; আর সেটাই সমস্যা।

ব্যাপার হল দুজনকে হুবহু একই রকম দেখতে। এমন কী যে ট্যাবলেট থেকে ভূত রূপ ধারণ করেছে তারা সে দুটোও অবিকল এক রকম ছিল। এখন কথা হচ্ছে, কোনজনকে নন্দবাবু কিনেছেন, আর কোনজন ফ্রি! দুজনেই দাবি করছে, সেই আসল, নন্দবাবু তাকেই কিনেছেন; অন্যজন ফ্রি। আসল ভূতের ক্ষমতা বেশি। তার রাইট আছে অন্যজনকে অর্ডার করার। তা দুজনেই দুজনকে হুকুম করছে, তুই বাবুর সেবা কর; আমি একটু রেস্ট নিই। মাঝখান থেকে নন্দবাবুর সেবা ব্যহত হচ্ছে।

 নন্দবাবু পড়লেন মহা খ্যাঁচাকলে। প্রচুর ভাবলেন। কিন্তু কূলকিনারা পেলেন না। বাকি রাতটা একপ্রকার নির্ঘুমেই কাটাতে হল তাঁকে।

পরদিন দেখা হল বিশুবাবুর সঙ্গে। শুনে বিশুবাবু বললেন, এ তো সত্যিই ঝামেলা। আপনি এক কাজ করুন, সেই ভূতওলার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বলুন তাকে সমস্যার কথা।

সেই মতো পরদিন আবার ভূতের দোকানে গেলেন নন্দবাবু। ঘড়ুইকাকার সঙ্গে দেখাও হল। একটু চিন্তিত মুখে ঘড়ুইকাকা বললেন, কিন্তু স্যার এমনটা তো হবার কথা নয়। এ লটের মালে এখনও পর্যন্ত কোনও কমপ্লেন নেই। বরং রিপোর্ট বেশ সন্তোষজনক।

নন্দবাবু চেঞ্জ করে দেবার কথা বললেন। কিন্তু সেটাও সম্ভব নয়; কারণ ডেট পেরিয়ে গেছে বেশ ক’দিন আগেই।

অগত্যা ব্যর্থ মনোরথে বাড়ি ফিরে এলেন নন্দবাবু। ফিরতে ফিরতেই মনস্থির করে ফেললেন। আরাম আহ্লাদ অনেক হয়েছে; আর না, দুটোকেই দূর করে দেবেন বাড়ি থেকে। একেবারে ঘাড় ধাক্কা।

# # #

 কিন্তু তাড়াতে গিয়ে আবার অন্য সমস্যা। দু’জনেই কান্নাকাটি করে। পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে বলে তাড়াবেন না বাবু; বাইরে অনেক ভূত-শিকারি জাল নিয়ে ঘাপটি মেরে আছে। বেরোলেই ধরবে। আবার কার না কার হাতে পড়ব।

 নন্দবাবু বললেন, ভাল মজা তো, দাম দিয়ে কিনলাম তোমাদের; কাজকর্ম করবে না; পয়সাটাই জলে গেল দেখছি.

 না, না জলে যাবে কেন! দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, সত্যি বলতে কি, শরীর ভাল যাচ্ছে না আমাদের, কটা দিন একটু শুয়ে বসে থাকি; তারপর সুদে আসলে পুষিয়ে দেব।

 নন্দবাবু ভাবলেন ঠিক আছে, দেখা যাক; বলছে যখন…

 মাস খানেক কেটে গেল। নন্দবাবু দেখেন, দিব্যি শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছে ব্যাটারা। শুধু কাজের নাম নেই।

 নন্দবাবু তাই আবার তাগাদা দিলেন একদিন, কী বাবারা এবার একটু গা ঝাড়া দাও, হাত লাগাও কাজে।

তাগাদা শুনে দুজনে আবার কাকুতি মিনতি করে- বাবু আর কটা দিন, তারপর দেখবেন শুধু…

এইভাবে চলতে লাগল ব্যাপারটা। কিছুদিন অন্তর নন্দবাবুর তাগাদা আর ওদের টাইম চেয়ে নেওয়া।

# # #

অনেক দিন কেটে গেছে তারপর। নন্দবাবু এখন আর তাগাদা দেন না; তাড়াবার কথাও বলেন না। আসলে নন্দবাবুর বেশ মায়া পড়ে গেছে। ভাবেন সংসার তো করা হল না; এখন যাই হোক এদের নিয়েই সংসার; এরাই নাতি পুতির মতো!

রাতে তিনজনে একই খাটে শুয়ে ঘুমোন। দু’দিকে দুই নাতি পুতি; মাঝখানে নন্দবাবু। তবে ঘুমবার আগে রোজ নন্দবাবুকে দেখা যায়, দুজনের গা হাত পা টিপে দিচ্ছেন। সেই সময় একটু খিটিমিটিও লাগে। দুজনেরই দাবি, সে-ই আসল; অন্যজন ফ্রি। তাই তারই পাওনা বেশি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *