বক্তা বলাই নিরুদ্দেশ
বলাইবাবু নিরুদ্দেশ। আমড়াহাটির বলাই চোঙদার। রাতারাতি হাপিশ বলাইবাবু। অথচ পরের দিনই বাল্যবন্ধু কানাইবাবুর স্মরণসভায় তাঁর বক্তৃতা দেবার কথা। জনগণ বলাবলি করছিল, জীবনের সেরা বক্তৃতাটা এখানেই দেবেন তিনি। বাল্যবন্ধু বলে কথা!
বলাইবাবু প্রফেশনাল বক্তা। এবং তুখোড় বক্তা। তবে বক্তৃতার ব্যাপারে বলাইবাবুর স্পেশালাইজেসন আছে। ডাক্তারদের যেমন থাকে। কিডনি, ফুসফুস, হাঁটু, কনুই, কব্জি বা কড়ে আঙুল স্পেশালিষ্ট। বলাইবাবু তেমনই স্মরণসভা স্পেশালিষ্ট। চেনা-অচেনা-আধচেনা যে কোনও মানুষের স্মরণসভা একাই জমিয়ে দিতে পারেন। একেবারে অচেনা ব্যক্তির বেলায় একটু হোম-ওয়ার্ক করে নিতে হয়। নাম, বাবার নাম, পেশা। মানে ঐ ব্যক্তি ফুটবলার ছিলেন, নাকি মাছের ভেড়ির মালিক। শিক্ষকতা করতেন, নাকি মুদির দোকান। ব্যস এতেই কাফি।
গোড়া থেকেই তাহলে বলা যাক। বক্তা হিসেবে বলাইবাবুর উত্থানের ইতিহাস। একেবারে ছা’পোষা বাঙালি বলতে যা বোঝায় তেমনটাই ছিলেন বলাইবাবু। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনবরত ‘ঠাকুর থাকবি কতক্ষণ’ বাদ্যি বেজে চলা একটা চাকরি। মাস মাইনে পুরনো লজঝরে সাইকেলের মতো। চালাতে গেলেই নানাবিধ ক্যাঁচ কোঁচ শব্দ। আর মাসের শেষে টায়ার পাংচার। তখন ধারধোর। তার ওপর বলাইবাবুর নিজের গ্যাস-অম্বল, কোষ্ঠ কাঠিন্য আর হাই সুগার, গিন্নি বনলতা দেবীর রক্তাল্পতা গেঁটে বাত আর লো-প্রেশার, চাকরি বাকরি না পেয়ে ফাসট্রেশনের বর্ডার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র সন্তান রামানুজ। মোদ্দা কথা বায়োডাটা তেমন মজবুত নয়।
কিন্তু আর পাঁচটা গড়পড়তা মানুষের মধ্যে যেটা ঘাপটি মেরে থাকে সেটা পুরোদস্তুর ছিল বলাইবাবুর। বিখ্যাত হবার বাসনা। মানুষের নজরে পড়ার জন্যে আকুলি বিকুলি।
কিন্তু বিখ্যাত হওয়া তো সহজ কথা নয়। বিখ্যাত হতে হলে পড়া শোনা, গান বাজনা, খেলাধুলো, ম্যাজিক, কুইজ কিছুতে একটা চৌকস হওয়া লাগে। এমনকি খুব খেতে পারলেও অনেক দূরে নাম ছড়ায়। ছোটবেলায় পাড়ায় রমাকান্ত জ্যাঠাকে মনে আছে তাঁর। খেতে পারতেন বটে জ্যাঠা! কাজের বাড়িতে গোটা কুড়ি-পঁচিশ লুচি, সেইমতো তরিতরকারি, কিলোটাক মাংস, পঞ্চাশ-ষাট পিস মিষ্টি। তারপরে কেউ যদি জিজ্ঞেস করতেন, ঠিক আছে তো রমাবাবু! জ্যাঠা মস্ত একটু ঢেকুর তুলে বলতেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই আছে, তবে কথা কী জান, এখন তো সে খাওয়া নেই আমার; বয়েস হচ্ছে, তাই বুঝেশুনে অল্প করে খাই।
অতি ভোজনের স্বীকৃতি-স্বরূপ নতুন নাম পেয়েছিলেন একটা। বকরাক্ষস। এলাকায় অনেকগুলো রমাকান্ত। কিন্তু বকরাক্ষস রমাকান্তকে সবাই একডাকে চিনত।
কিন্তু বলাইবাবুর তো এসব কিচ্ছু নেই। অনেক ভেবে একটা উপায় বের করেছিলেন বলাইবাবু। রাজনীতি। রাজনীতি করে বহু অর্ডিনারি মানুষ কেউকেটা হয়ে ওঠে। এই তো, তাঁর স্কুলের বন্ধু কানাইবাবু। কানাই কাষ্ঠ। কানাইবাবু ছিলেন তাঁরই মতো অ্যাভারেজ। খেলাধুলা পড়াশোনা সব ব্যাপারেই। সত্যি বলতে কী, পড়াশোনায় তো বলাইবাবুর চেয়েও খাজা। মাধ্যমিকে বলাইবাবু তো তবু সেকেন্ড ডিভিশন। কিন্তু কানাইবাবু থার্ড। তার মধ্যে আবার অঙ্ক আর ভূগোলে লাল কালির গা ঘেঁষে। সেটাও বলাইবাবুর বদান্যতায়। সময় দূরত্বের একটা অঙ্ক একটা ল্যাজামুড়ো ফ্যাক্টর, ভূগোলে জলঢাকা নদীর গতিপথ আর তরাই অঞ্চলের জলবায়ু একেবারে টো টো নামিয়ে দিয়েছিলেন বলাইবাবুর খাতা থেকে। সেই কানাই কাষ্ঠ রাজনীতি করে এখন জাঁদরেল নেতা। বলাইবাবুর মনে হল, কানাই যদি পারে আমিই বা পারব না কেন! তো একদিন সোজা চলে গেলেন কানাইবাবুর বাড়ি। বললেন, কানাই আমি রাজনীতি করতে চাই।
কানাইবাবু বললেন, গুড, তা কোন দলে?
বলাইবাবু বললেন, কেন, তুই যে দল করিস, আমি সেই দলেই ঢুকব।
ভেরি গুড। কানাইবাবু বললেন, তাহলে কাল সন্ধেবেলা নেতাজি সংঘের মাঠে আমাদের একটা জনসভা আছে, চলে আয়।
সেই মতো পরের দিন নেতাজি সংঘের মাঠে গিয়েছিলেন বলাইবাবু। ব্যাপক জনসমাগম। কানাইবাবু স্টেজের ওপরে ছিলেন। দর্শকদের মধ্যে বসে বলাইবাবু ভাবছিলেন, অচিরে তিনিও একদিন এমন স্টেজে উঠে বসবেন; বক্তৃতা দেবেন।
মিটিং শেষে বাড়ি ফিরছিলেন বলাইবাবু। হেলা-বকুলতলা জায়গাটা অন্ধকার। হঠাৎ চার পাঁচটা লোক কোথা থেকে যেন অন্ধকার ফুঁড়ে ঘিরে ধরল তাকে। তারপর উদোম মার। এলোপাথাড়ি চড় ঘুসি। রক্তাক্ত বলাইবাবু লুটিয়ে পড়লেন।
পাঁচদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল বলাইবাবুকে। নাকের হাড় ভেঙেছিল, দুটো দাঁত খলবল করছিল। হসপিটালে কানাইবাবু দেখতে গিয়েছিলেন। বলাইবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁকে, কারা মারল বল তো, বিরোধী পার্টির লোক?
ভুরু কুঁচকে আঘাতের জায়গাগুলো দেখলেন কানাইবাবু। তারপর বললেন, না না; অপনেন্ট নয়।
তাহলে ছিনতাইবাজ বা ডাকাত; কিন্তু কিছু তো খোয়া যায়নি আমার।
না না; এটা আমাদের পার্টির কাজ।
বলাইবাবু ভয়ানক ভেবলে গেলেন। বললেন, আমাদের পার্টি। আমাদের পার্টির লোক আমাকে মারবে কেন! অন্ধকারে কি লোক চিনতে ভুল করেছে ওরা?
উহুঁ, ঠিকই চিনেছে। কানাইবাবু বললেন, আসলে এই আমড়াহাটি অঞ্চলে আমাদের পার্টিতে এখন চারটে গোষ্ঠী।
চার-টে। বলাইবাবু হতবাক।
আরে চারটে তো কম। বহু জায়গা আছে, সেখানে সাত-আটটা এমনকি সতেরোটা গোষ্ঠী আছে। অনেকটা নকশাল মাওবাদীদের মতো। তোরটা হচ্ছে বদন দে গোষ্ঠীর কাজ। মারের স্টাইল দেখেই বুঝেছি। বদনের ছেলেরা সাধারণত মুখ টার্গেট করে। তোর যেমন করেছে। কাঁদন ঘোষ গোষ্ঠীর অপারেশন হকিস্টিক দিয়ে। এদের থেকেও খতরনাক মদনের গোষ্ঠী। ওরা স্ট্রেট পেটো চার্জে বিশ্বাসী। ওরা যাকে টার্গেট করে তাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েও লাভ হয় না। ওরা আসলে মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণাকে দীর্ঘায়িত করায় বিশ্বাসী নয়।
শুনে চোখ বড় বড় হয়ে গেল বলাইবাবুর।
কানাইবাবু বললেন,তুই চিন্তা করিস না। আমারও ছেলেপুলে আছে। তাদের নিজস্ব স্টাইল আছে। তোর মারের বদলা আমি ঠিক নিয়ে নেব।
বলাইবাবু বলেছিলেন, তোর স্টাইল কেমন?
কানাইবাবু ফিসফিস করে বলেছিলেন, শোন, আমার অপারেশন ভেরি সিম্পল। টিমে কজন আছে যারা অ্যানাটমিতে পোক্ত। কয়েক জনের শরীরে বেজায় শক্তি। এরা টার্গেটকে প্রথমে চেপে ধরে, তারপর অ্যানাটমি এক্সপার্টরা জায়গা বুঝে ছুরি খুর চালায়। গলা বুক আর পেটের ঠিক জায়গা মতো চালাতে পারলে দু’মিনিটেই খেল খতম। তোর বদলা আমি নেবই, চিন্তা করিস না।
না, চিন্তা করেননি বলাইবাবু। তবে রাজনীতি করে বিখ্যাত হবার বাসনা সেদিনই প্যাকেটে মুড়ে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন।
# # #
তাঁর এই পিটুনি খাওয়া অবশ্য আস্তাকুঁড়ে পড়েনি। বরং বলা যায়, বদন-ধোলাই তাঁর বরাত খুলে দিয়েছিল।
হসপিটালে তাঁর পাশের বেডে ভর্তি ছিলেন যতীন বিশ্বাস নামে এক রিটায়ার্ড স্কুল টিচার। পেট ব্যথা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। ডাক্তাররা রোগ ঠিক ধরতে পারছিলেন না। নানা রকম চেষ্টা করতেন আর মাঝে মাঝেই এসে পেট টিপতেন যতীনবাবুর। জিজ্ঞেস করতেন, লাগছে; কেমন লাগছে?
যতীনবাবু প্রতিবার একই উত্তর দিতেন, কেমন আর লাগবে ডাক্তারবাবু, খুবই খারাপ লাগছে।
যাই হোক, পাশাপাশি বেডে থাকার জন্যে দুজনের টুকটাক কথাবার্তা হত। বলাইবাবুর রিলিজের দিনও ডাক্তাররা যতীনবাবুর পেট ব্যথার খুট খুঁজে না পেয়ে আনতাবড়ি টিপেই চলেছেন। আসবার সময় যতীনবাবুকে ‘গেট ওয়েল সুন’ জানিয়ে এসেছিলেন বলাইবাবু।
কিন্তু ভাল হয়ে ওঠা আর হয়নি যতীনবাবুর। সেই খবর পেলেন যতীনবাবুর ছেলে ইন্দ্রজিতের কাছ থেকে। ভিজিটিং আওয়ারে ইন্দ্রজিৎ আসত রোজ। সেইসূত্রে পরিচয়। বাঁধের বাজারে বাজার করছিলেন বলাইবাবু। সেখানেই ইন্দ্রজিৎকে দেখলেন, একেবারে ন্যাড়া মুণ্ডি অবস্থায়। শুনলেন,বলাইবাবুর রিলিজের পরদিন পেট ব্যথা নিয়েই স্বর্গত হয়েছেন যতীনবাবু। ডাক্তাররা রোগ শেষ পর্যন্ত ধরতেই পারেননি।
ইন্দ্রজিৎ বাজারে দাঁড়িয়েই একটা অনুরোধ করল বলাইবাবুকে। পরের রবিবার যতীনবাবুর স্মরণসভা। বলাইবাবু গেলে খুব খুশি হবে সে।
ঠিকানা দিয়েছিল ইন্দ্রজিৎ। পরের রবিবার সাত-পাঁচ না ভেবেই চলে গিয়েছিলেন বলাইবাবু। গিয়ে দেখলেন, বেশ ভিড়। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, প্রাক্তন কিছু ছাত্রছাত্রী, এমনকি কলেজ ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া কিছু ছেলেমেয়ে। সব মিলিয়ে ভিড় মন্দ নয়।
আত্মীয় স্বজন, পাড়ার কয়েকজন, তিন চারজন প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী একে একে বললেন যতীনবাবু সম্পর্কে। সবই স্তুতি। তিনি কত উদার, কেমন বন্ধুবৎসল, কী ভীষণ ছাত্রদরদি-এই সংক্রান্ত ভাল ভাল কথা। তবে একটা জিনিস চোখে পড়ল বলাইবাবুর। ইয়ং ছেলেমেয়েগুলোর বেশিরভাগই,ফেসবুক-হোয়াটস্অ্যাপ করছিল বসে বসে। দু চারজন আবার ইয়ার প্লাগ লাগিয়ে চোখ বুজে গানও শুনছিল। এমনকি মাথাও নাড়ছিল গানের তালে।
কিন্তু পরের ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না বলাইবাবু। ইন্দ্রজিৎ সটান ঘোষণা করে দিল, এবার বাবার সম্পর্কে বলবেন এমন একজন, যিনি শেষের ক’টা দিন বাবাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
বিরাট ফেঁসে গেলেন বলাইবাবু। ঠিকই, শেষ কটা দিন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। মামুলি কথাবার্তাও হয়েছে। কিন্তু সেই রসদ নিয়ে সমরণসভায় বক্তৃতা দেওয়া যায় না। কিন্তু উপায়ও নেই। নাম ঘোষণা হয়ে গেছে।
অগত্যা বলাইবাবুকে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতেই হল। বুক ঢিপ ঢিপ করছে, হাত-পা কাঁপছে, গলা শুকনো। কিন্তু কিছুতো বলতেই হয়। ফেসবুক আর কানে ইয়ার প্লাগ গোঁজা চ্যাংড়াগুলো ছাড়া হল ভর্তি লোক তাঁর দিকে তাকিয়ে।
একটু গলা ঝেড়ে বুক ঠুকে শুরু করে দিলেন বলাইবাবু। ঠিক করে নিলেন, উদার মহৎ ইত্যাদি বাঁধা গতে হাঁটবেন না। নতুন কিছু বলবেন। তাই দু’একটা মামুলি কথার পরই চলে এলেন পেট ব্যথা প্রসঙ্গে। পেট ব্যথা কী করে সহ্য করতে হয় সেটা দেখিয়ে গেছেন যতীনবাবু। তাঁদের ওয়ার্ডে অন্য রুগীরা যখন সামান্য ইনজেকশন নিতে কিংবা একটু রক্ত দিতে এমন হাউমাউ চিৎকার করে উঠতেন যে মনে হত বাড়িতে বুঝি আগুন লেগেছে বা ডাকাত পড়েছে তখন প্রবল পেট ব্যথা হাসিমুখে সহ্য করতেন যতীনবাবু। নির্দয় ডাক্তাররা যখন ঐ ব্যথার জায়গাটা নিষ্ঠুরভাবে টিপতেন, তখন সামান্য ককিয়ে পর্যন্ত উঠতেন না। বরং রঙ্গরসিকতা করতেন তাঁদের সঙ্গে। আসলে পেট ব্যথা প্রতীক মাত্র; উনি পেরেছিলেন মনটাকে শরীরের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে। এটা খাঁটি মহাপুরুষের লক্ষ্মণ। বুদ্ধদেব মহাবীর এই কথাটাই বার বার বলে গেছেন আর যিশু খ্রিষ্ট হাতে কলমে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। প্রভু যিশুর হাত পায়ে যখন হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঠুকে পেরেক পোঁতা হচ্ছে, মাথায় কাঁটার টুপি, তখনও তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন, প্রভু এদের ক্ষমা করে দিও। সব কুঁড়ি যেমন ফুল হয়ে ফোটে না, সব মহাপুরুষও জীবদ্দশায় স্বীকৃতি পান না। যতীনবাবু আসলে কুড়ি হয়েই ঝরে যাওয়া এক মহাপুরুষ। আশা করি, ভাবী প্রজন্ম তাঁর মাহাত্ম্য ঠিক ঠাক বুঝতে পারবে।
বক্তৃতা ব্যাপক হিট। ইন্দ্রজিৎ বলাইবাবুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। কয়েকজন মহিলা আঁচলে চোখের জল মুছছিলেন। বেশ ক’জন ফোন নাম্বার নিয়ে রাখলেন। ইয়াং ছেলেমেয়েরা বলাইবাবুর গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সেলফি নিল।
ব্যাপার এখানেই শেষ নয়। বলাইবাবুর এই বক্তৃতার একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ল। কিছুদিন পরেই বলাইবাবু টের পেলেন সেটা।
# # #
সেদিন রবিবার। অফিস ছুটি। বলাইবাবু রান্নাঘরে সবজি কেটে দিয়ে সাহায্য করছিলেন গিন্নিকে। ডোরবেল বাজল। দরজা খুলে বলাইবাবু দেখলেন মধ্যবয়সী দুই ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। দুজনেই মুণ্ডিত মস্তক। তারা জানালেন, সেই যতীনবাবু সম্পর্কে এদের মেসোমশাই। এঁদের বাবা শীলভদ্র সাহা যতীনবাবুর ভায়রাভাই। সম্প্রতি এঁরাও পিতৃহারা হয়েছেন। সেটা বড় কথা নয়, যথেষ্ট পরিপক্ব বয়েসেই সজ্ঞানে পরলোকে গেছেন। আক্ষরিক অর্থেই সজ্ঞানে। কারণ মৃত্যুর ঠিক আগে বাড়ির সবাইকে ডেকে নিজের শেষ ইচ্ছে জানিয়েছিলেন। এক, তার দু’ছেলে, রাধাকান্ত আর কৃষ্ণকান্ত, যেন কোনও ঝুটঝামেলায় না গিয়ে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি সমান ভাগে ভাগ করে নেয়; দুই, বুড়ি মা-কে যেন ঠিক মতো দেখভাল করে; তিন, শ্রাদ্ধের মেনুতে যেন অবশ্যই ভেটকি মাছ আর এঁচোড় চিংড়ি থাকে, চার, প্রতিবেশী কালীপদবাবু, যে সবসময় বন্ধুর বেশে তাঁকে পিছনে শুধু বাঁশই দিয়ে গেছেন, তাঁকে যেন কোনোভাবেই শ্রাদ্ধে নেমন্তন্ন না করা হয়; অ্যান্ড লাস্ট, বাট নট দি লিস্ট, স্মরণ সভায় অতি অবশ্যই যেন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় বলাইবাবুকে।
কিন্তু সবাইকে ছেড়ে বলাইবাবুকে কেন!
রাধা-কৃষ্ণ জানাল, সেদিন নাকি তাঁদের বাবা উপস্থিত ছিলেন যতীনবাবুর স্মরণসভায়। সেখানে বলাইবাবুর ভাষণ শুনে একেবারে মোহিত হয়ে যান তিনি।
কারণটা পরিষ্কার হল বলাইবাবুর; কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যতীনবাবুর সঙ্গে কিছুটা হলেও আলাপ পরিচয় ছিল তাঁর, কিন্তু এই শীলভদ্র সাহা যে একেবারে আনকোরা। স্মরণসভায় অত মানুষের মধ্যে সাহাবাবু কোন জন সেটাই স্মরণ হচ্ছে না তাঁর।
এমন ভজকট একটা ব্যাপার যে হতে পারে সেটা মালুম করেই বুঝি ছেলেরা সঙ্গে করে ছবি এনেছিলেন বাবার। বলাইবাবুকে দেখালেন। দেখেই চিনতে পারলেন বলাইবাবু। এই বৃদ্ধ মানুষটা ঠিক তাঁর পাশেই বসেছিলেন। টুকটাক কথাও হয়েছিল। ভদ্রলোকের বোধহয় ভ্রমণের শখ। যৌবনে প্রচুর বেড়িয়েছেন। একবার নাকি এভারেস্টের লাস্ট বেস ক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন, কাঞ্চনজঙ্ঘারও অনেকটা ওপরে উঠে পড়েছিলেন একবার। গোটা অযোধ্যাপাহাড় চষে ফেলেছেন, ছ’বার উঠেছিলেন শুশুনিয়া পাহাড়ে। লাস্ট – বছর পাঁচেক আগে, বয়েস তখন সত্তর ছাড়িয়েছে।
বলাইবাবুর মনে হয়েছিল ভ্রমণ মানেই ওনার কাছে পাহাড়ে চড়া। সেখানে নদী সমুদ্র মরুভূমি তৃণভূমির কোনও গল্প নেই। তাই বুঝি, বলাইবাবুকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কখনও পাহাড়ে চড়েননি?
ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে একবার ঘাটশিলায় গিয়েছিলেন বলাইবাবু। সেখানে ফুলডুংরি পাহাড়ে উঠেছিলেন। সে কথা বলতে সাহাবাবু নাক কুঁচকে বললেন, ফুলডুংরি আবার পাহাড় নাকি! এমনিতে লোকে ওটাকে টিলা বলে; কিন্ত আমার তো একটা পাথরের ডিপি ছাড়া অন্যকিছু মনে হয় না।
যাই হোক, বলাইবাবুর মনে হল চ্যালেঞ্জটা নিয়েই দেখা যাক। হোক শোকসভা, একরকম স্বীকৃতি তো বটে! তাই গেলেন। এখানেও মোটামুটি ভালই ভিড়। প্রথম দিনের সেই নার্ভাসনেস আর নেই। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলাইবাবু শুরু করে দিলেন। এখানে উনি পাহাড়কে তুলে ধরলেন। বললেন, আমরা সবাই জানি, শীলভদ্রবাবু পাহাড়ে চড়তে ভালোবাসতেন। জীবনে ছোট বড় মাঝারি নানা উচ্চতার পাহাড়ে চড়েছেন। আসলে পাথর নুড়ি বরফের পাহাড়ে চড়লেও তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন জীবনের অন্য একটা দিক। সেটা হল জীবন যুদ্ধ। মানব জীবনের সমস্ত চড়াই উতরাই কেমন অনায়াসে ডিঙিয়ে যেতে হয় সেটাই বুঝিয়ে গেছেন সারা জীবন ধরে। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন আদর্শ জীবনযোদ্ধা।
শোকসভাতে সাধারণত হাততালি দেওয়ার রেওয়াজ নেই। কিন্তু সেদিন বক্তৃতা শেষে বেশ হাততালি পড়ল। সম্ভবত এতবার ‘জীবন-জীবন’ করেছেন যে মানুষ শোক ভুলে হাততালি দিয়ে বসল।
# # #
ব্যস, এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বলাইবাবুকে। কী ভাবে যেন এই দুটো বক্তৃতার কথা রাষ্ট্র হয়ে গেল। তারপর থেকেই গুচ্ছ গুচ্ছ আমন্ত্রণ। তবে সবই স্মরণসভার। সকাল থেকেই তাঁর বসার ঘরে মানুষের ভিড়। বেশিরভাগই ন্যাড়ামুণ্ডি। সদ্য বাপ-মা, দাদু-ঠাকুমা, দাদা-শ্যালক বা ভগ্নিপোত হারানো মানুষ সব। সবাই বলাইবাবুকে চায় তাঁদের প্রিয়জনের স্মরণসভায়। কাঁহা কাঁহা মুলুক থেকে ডাক আসে। বলাইবাবুকে নিয়ে কাড়াকাড়ি। বলাইবাবুকে বুক করার জন্যে শ্মশানঘাট থেকেই মানুষ সোজা চলে আসেন বলাইবাবুর বাড়িতে। কিছুদিনের মধ্যেই ডিম্যান্ড এমন জায়গায় চলে গেল যে, গুরুতর অসুস্থ কেউ হসপিটালে ভর্তি, ডাক্তারবাবু বলেছেন, বাহাত্তর ঘণ্টা না কাটলে কিছু বলা যাবে না, বাড়ির লোক রিস্ক না নিয়ে বলাইবাবুর সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা বলে রাখেন। ফিফটি পারসেন্ট অ্যাডভান্সও দিয়ে যান।
হ্যাঁ, বক্তৃতার জন্যে ফিস নেন বলাইবাবু। পেঁচোয় পাওয়া ওই চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু এতটুকু আর্থিক ক্ষতি হয়নি। এখন স্মরণসভায় বক্তৃতা দিয়ে অনেক বেশি কামাচ্ছেন। ছেলে রণজয়কে ব্যবসা করে দিয়েছেন। সদর হাসপাতালের উল্টো দিকে ডেড বডির খাটের দোকান। দিব্যি চলছে বিজনেস। গাড়ি কিনেছেন বলাইবাবু। সেক্রেটারিও রেখেছেন একটা। সে-ই টাকাপয়সা, অ্যাডভান্স, ডেট, টাইম ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যাপারগুলো সামলায়। আর বায়োডাটা নেয়। সংক্ষিপ্ত বায়োডাটা। নাম, পেশা, মৃত্যুকালীন বয়েস, বিশেষ শখ-আহ্লাদ অর্থাৎ হবি-এইরকম গুটিকয় তথ্য পেলেই কাফি। তারপর নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেনে দিতে পারেন। তবে কতক্ষণ টানবেন সেটা নির্ভর করে রেটের ওপর। যত বেশি টাকা, তত লম্বা বক্তৃতা।
সকাল থেকেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায় বলাইবাবুর। ফুলিয়া থেকে ফুলেশ্বর, বাসন্তী থেকে বসন্তপুর বা হেমন্তনগর গাড়ি ছোটে তাঁর। গাড়িতে বসেই ল্যাপটপে বায়োডাটাগুলোয় চোখ বুলিয়ে নেন। বক্তব্যের প্রথমে থাকে মামুলি দু’চার কথা, আর শেষে থাকে আত্মার শান্তিকামনা। কিন্তু এসব শোনার জন্যে তো মানুষ কড়ি খরচা করে তাঁকে নিয়ে আসে না। বক্তৃতার মাঝের অংশটা একেবারে এক্সক্লুসিভ। এই সময় কল্পনাশক্তি টঙে চড়ে যায় তাঁর।
দু’একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। হাওড়ার ঘুসুরিতে অগ্নিশেখর রায় নামে একজনের স্মরণসভায় বলছিলেন। বললেন, অগ্নি মানে আগুন। আগুন শুধু ওনার নামে নয়, মনেও ছিল। মনের সেই আগুন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তেন আগুন নেভানোর কাজে। ১৯৬৩ সালে কসবার এক বস্তিতে আগুন লাগে। দাউদাউ করে জ্বলছে গোটা বস্তি, ভেতর থেকে ভেসে আসছে মানুষের আর্তনাদ। দমকল পৌঁছাবার আগেই অগ্নিশেখর বাবু পৌঁছে গেলেন। নিজের জীবন তুচ্ছ করে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শতশত নরনারীকে উদ্ধার করে আনলেন। তারপর ১৯৭২ সালে খড়দার একটা স্কুলে আগুন লাগে। খড়দায় এক বন্ধু ছিলেন ওনার। তাঁর বাড়ি গিয়েছিলেন। উনি সোজা সেই স্কুলে চলে যান। দমকল তখন সবে পৌঁছেছে। দমকল কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উনি বিপন্ন শিশুদের উদ্ধার করেন। তারপর সম্প্রতি পার্কস্ট্রীটের স্টিফেন হাউজে আগুন লাগে যখন, উনি তখন একটা রেস্টুরেন্টে ওনার ফেবারিট চিকেন ফ্রায়েড রাইস খাচ্ছিলেন। কিন্তু খবর পাওয়ামাত্র, ফ্রায়েড রাইসের মায়া ত্যাগ করে উনি অকুস্থলে পৌঁছে যান। ওই বাড়ির দুর্গম সব জায়গায়, যেখানে দমকলও পৌঁছাতে পারছিল না, স্পাইডারম্যানের মতো দেওয়াল বেয়ে, ব্যাটম্যানের মতো উড়ে গিয়ে, পোলভল্টারের মতো ভল্ট খেয়ে সে সব জায়গায় পৌঁছে যান। বহু দুর্গত মানুষকে উদ্ধার করেন। তখন মিডিয়া খুব সক্রিয়, নানা সংবাদপত্র আর টিভি চ্যানেল ওনার ইন্টারভিউ নিতে যায়। কিন্তু উনি রাজি হননি। বলেছিলেন, যে তেতাল্লিশ জন মানুষ মারা গেলেন, যাঁদের আমি চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলাম না, সেটা আমার মস্ত ব্যর্থতা। এইক্ষেত্রে আমি একজন ব্যর্থ মানুষ। আমার মুখ দেখানো উচিত নয়। শেষে বলাইবাবু বললেন, আমার মনে হয়,পরাধীন ভারতবর্ষের অগ্নিযুগের কোনও বিপ্লবী এই অগ্নিশেখর হয়ে পুনর্জন্ম নিয়েছিলেন। উনি একজন আদ্যন্ত অগ্নিপুরুষ।
মৃত ব্যক্তির নাম বলাইবাবুর কল্পনার ফ্লাডগেট খুলে দেয়। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য সমস্যাও হয়। বাপি, ভুলু, ভোলা-এই জাতীয় সাদামাটা নাম হলে। সেক্ষেত্রে অন্য কোনও সূত্র ধরে এগোতে হয়।
এমন হল, বেগমপুরের খোকন হাতির বেলায়। গাড়িতে যেতে যেতে খোকন হাতির বায়োডাটায় চোখ বোলাচ্ছিলেন। বেশ বুঝতে পারছিলেন খোকন নাম নিয়ে বেশিক্ষণ টানা যাবে না। তাহলে? পেশায় ভদ্রলোক ছিলেন বিখ্যাত বটবৃক্ষ মার্কা দালদার দালাল। বড়বাজারে দালালি করে বেশ টাকাকড়ি কামিয়েছেন। পেশা যার দালদার দালালি সেই পেশা নিয়েও তেমন কিছু বলা যাবে না। কিন্তু টাইটেল হাতি। এটা নিয়ে কিছু করা যেতে পারে। হাতির মতো খেতে পারতেন। না না, কোনও মানুষের স্মরণসভায় এমন বলাটা মোটেই স্বাস্থ্যকর হবে না। হঠাৎ মাথায় বিদ্যুৎ চমক! খেতে নয়, খাওয়াতে ভালোবাসতেন।
ব্যস! শুরু করে দিলেন,খোকনবাবু,বন্ধুবান্ধবকে তো খাওয়াতেনই; তা ছাড়া দরিদ্র অভাবী মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতেন। তাঁর বাড়িতে রোজই দু’চার জন নিরন্ন মানুষের পাত পড়ত। হাটে বাজারে কোনও ভিক্ষাজীবীকে দেখলে কাছাকাছি কোনও হোটেলে নিয়ে গিয়ে পেট পুরে খাইয়ে দিতেন। তিনি ছিলেন মা অন্নপূর্ণার আর এক রূপ।
কখনও ছবিও সাহায্য করে বলাইবাবুকে। যাঁর স্মরণসভা তাঁর ছবি থাকে অনুষ্ঠানে। বেশিরভাগ ছবি আবক্ষ, স্টুডিওতে তোলা। সে সব ছবি বলাইবাবুর সৃজনশীলতাকে তেমন খুব একটা খুঁচিয়ে তুলতে পারে না। কিন্তু ঘরোয়া পরিবেশে অ্যামেচার ফটোগ্রাফারের তোলা ছবিতে মাল মেটেরিয়াল থাকে। যেমন ঝাড়্গ্রামের গোবিন্দ দে নামে এক ব্যক্তির ছবিতে দেখা যাচ্ছিল ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে আছেন। গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা হরেক ফুল চারপাশে। বলাইবাবু শুরু করে দিলেন – গোবিন্দবাবু ছিলেন পুষ্পপ্রেমী, আরও বৃহৎ অর্থে প্রকৃতিপ্রেমী। অনেকেই জানেন না, শুধু বাড়িতে নয়, তিনি রাস্তার ধারেও গাছ লাগাতেন। তাঁর মন ছিল, সবুজ এবং তিনি চাইতেন সবুজে ঢেকে যাক আমাদের এই পৃথিবী। আধুনিক সভ্যতার এই ভয়ঙ্কর দূষণের বিরুদ্ধে তিনি জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন, কিন্তু আমরা যাতে নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারি সেই ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছেন। তাই আমাদের যতদিন না শেষ নিঃশ্বাস পড়ছে, ততদিন তাঁর কাছে ঋণী থাকব। ব্যস, বক্তৃতা সুপার ডুপার হিট।
তবে মিসফায়ার কি হয় না! হয়! তবে সংখ্যায় নেহাতই নগণ্য। যেমন হয়েছিল ধরণীশ্বর মণ্ডলের বেলায়।
বলাইবাবু বলতে লাগলেন-ধরণীশ্বর এমন একজন মানুষ যিনি, ধরণী মানে পৃথিবী কেঁপে উঠলে নিজেও স্থির থাকতে পারতেন না। নেপালে, গুজরাটে, কাশ্মীরে যখন প্রবল সব ভূমিকম্প হয়, তিনি সব ছেড়ে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। দাঁড়িয়েছিলেন দুর্গত মানুষের পাশে। সরকার এন জিও দের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেইসব অসহায় মানুষগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
প্রাথমিকভাবে বলাইবাবুর মনে হয়েছিল বক্তৃতা হিট। কারণ বক্তৃতা শেষে ধরণীশ্বরবাবুর ছেলে পরমেশ্বর বলাইবাবুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। বলাইবাবু টের পেলেন, পরমেশ্বর থরথর করে কাঁপছেন। কিন্তু তখনই কানে এলো একটা মন্তব্য। পিছন থেকে কেউ একটা বলে উঠল, উহ, হরিব্ল; ধরণী দ্বিধা হও! শুনে বলাইবাবুও কেঁপে উঠলেন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত অবশ্য টাকা কড়ি ঠিকঠাক পেয়েছিলেন।
আর একবার হয়েছিল তারক গোলুইয়ের বেলায়। নাম এবং পদবী অতীব ভ্যাদভেদে। পেশার জায়গায় লেখা-এক্সপোর্ট-ইম্পোর্টের বিজনেস। কিন্তু বলাইবাবু জানতে পেরেছিলেন, উনি আসলে বাংলাদেশ বর্ডারে স্মাগলিং আর গরু পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এবং ওনার মৃত্যুও হয় বি এস এফের গুলিতে। তাই পেশা নিয়ে বলাও বেশ রিস্কি। অগত্যা ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, একটা নদীর সামনে সানগ্লাস পড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, ষণ্ডামার্কা চেহারার তারক।
নদী আর জল দেখে যেন হালে পানি পেলেন বলাইবাবু। শুরু করে দিলেন – মাত্র একষট্টি বছর বয়সে উনি চলে গেছেন। আজকালকার দিনে স্বল্পায়ুই বলা চলে। কিন্তু ওই স্বল্প আয়ুস্কালেই বহু জীবন বাঁচিয়েছেন। উনি যখন তেরো বছরের কিশোর তখন তিন বছরের এক শিশুকে পুকুর থেকে উদ্ধার করেছিলেন। ওনার যখন কুড়ি বছর বয়েস, তখন বাগনানের কাছে রূপনারায়ণে এক মর্মান্তিক নৌকাডুবি হয়। যুবক তারকবাবু উত্তাল নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পনেরোজন মানুষের সলিল সমাধি রুখে দেন। তারপর ওনার তেত্রিশ বছর বয়েসে ঘাটালে ভয়ানক বন্যা হয়। গোটা ঘাটাল জলের তলায়। সেই সময় নৌকা করে ঘাটালে গিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, সাঁতরে অগণিত বাণভাসি মানুষকে উদ্ধার করেন।
এইভাবে একটার পর একটা জলে ডোবা কেস। কখনও গঙ্গার ষাঁড়াষাঁড়ির বান, কখনও মুন্ডেশ্বরীর নদীবাঁধ ভাঙন-ঠিক সময়ে জলে ঝাঁপ দিতেন তারক গোলুই মহাশয় আর উদ্ধার করে আনতেন বিপন্ন মানুষকে। বলাইবাবু শেষ করলেন এই বলে যে, প্রকৃতপক্ষে উনি মানুষ নন,-দেবতা, আরও নিখুঁত করে বললে, জল দেবতা।
এই বক্তৃতার শেষে শুধু হাততালি নয়, বেশ কিছু শ্রোতা মুখে আঙুল ঢুকিয়ে সিটিও দিল। প্রথম থেকেই স্মরণসভায় এমন কিছু মানুষকে দেখেছিলেন, যাঁদের দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে। হাতে বালা, গলায় রুমাল, চোখে সানগ্লাস, উদ্ভট সব চুলের ছাঁট, সেই চুলে রঙবাহারি কারুকাজ। সম্ভবত তারকবাবুর স্মাগলিঙের স্যাঙাত। এদের মধ্যে থেকেই এসেছিল সিটিটা।
প্রথমে বলাইবাবুর মনে হয়েছিল, ঠিকই আছে; বক্তৃতা হিট। কিন্তু মাইক্রোফোন ছেড়ে একটু সামনের দিকে এগোতেই বলাইবাবুর কানে এলো, কেউ একজন তারক গোলুইয়ের ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তোমার বাবার এইসব মহান কীর্তি কাহিনী কতটা জানতে তুমি?
ছেলে বলল, দেখুন, আমি যতদূর জানি, বাবা সাঁতারই জানতেন না।
ছেলের গলায় যেন কিছুটা বিরক্তি।
আর রিস্ক নেননি বলাইবাবু। বাকি পেমেন্ট না নিয়েই দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে বসেছিলেন। ড্রাইভারকে বলেছিলেন, জোরে চালাও। কারণ তিনি শুনেছিলেন, তারকবাবুর ছেলেও নাকি বাবার লাইনে নেমেছে।
(২)
তো বেশ চলছিল। আরও বেশি বেশি করে ফাটছিল বলাইবাবুর নাম। কানাইবাবুর সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হয়। কানাইবাবু বাল্যবন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ওরে বলাই তুই আমাদের গর্ব; তোর জন্যে সত্যিই অহংকার হয়। কত নাম তোর!
বলাইবাবু বলেন, নাম তো তোরও।
দুর দুর। কানাইবাবু বলেন, আমাকে তো শুধু আশপাশের পাঁচ-সাতটা এলাকার মানুষ চেনে, আর তোর নাম বাংলার ঘরে ঘরে। এই তো তুই আমার বন্ধু জানতে পেরে, পার্টির ওপর মহল থেকে আমাকে ফোন করেছিল – আপনার বন্ধুকে দলে টানুন, আমাদের বুদ্ধিজীবী সেলে নিয়ে আসুন। আসবি ভাই? আসলে আমাদের বুদ্ধিজীবী সেলকে আরও স্ট্রং করার চেষ্টা চলছে। প্লাস, তুই এলে আমার কিছুটা সুবিধে হয়।
তোর সুবিধে মানে! বলাইবাবু বিস্মিত।
কানাইবাবু বলেন, তোকে বলেই বলছি, পার্টিতে আমি এখন কিছুটা কোণঠাসা। তোকে বুদ্ধিজীবী সেলে নিয়ে যেতে পারলে বেশ কিছুটা মাইলেজ পেয়ে যাব। সামনের ইলেকশনে টিকিটটা সিওর হয়ে যায়।
বলাইবাবু পড়ে গেলেন মহা দোটানায়। আবার পার্টি-পলিটিক্স! সেই মারের স্মৃতি এখনও দগদগে। এখনও নাকের হাড় বাঁকা। এদিকে খুব করুণ চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন কানাইবাবু।
তখনকার মতো রেহাই পেতে বলাইবাবু বললেন, আচ্ছা, কিছুদিন ভাবি, তারপর তোকে জানাব।
কিন্তু নিয়তির এমনই পরিহাস যে তার পরের দিনই খুন হয়ে গেলেন কানাইবাবু। পার্টি-অফিস থেকে রাত্রে বাড়ি ফিরছিলেন। সঙ্গে পার্টির ছেলে ছোটন। হঠাৎ সেই হেলাবটতলার মোড়েই একদল মানুষ ঘিরে ধরে দুজনকে। কানাইবাবুর কাছে মেশিন ছিল। লোডেড মেশিন ছাড়া উনি বেরোন না। কিন্তু মেশিন বের করার আগেই খুন হয়ে যান কানাইবাবু। ছোটন কোনওরকমে পালিয়ে আসে।
সেদিন বারাসাত থেকে বক্তৃতা দিয়ে ফিরছিলেন বলাইবাবু। রাত বারোটা নাগাদ খবরটা পেলেন। মনটা ভারি খারাপ। তাই গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা হসপিটালে চলে এলেন। মন বলছিল, নিজের দলেরই অন্য কোনও গোষ্ঠীর কাজ। কিন্তু ডেডবডি দেখে চমকে উঠলেন। খুর চালিয়ে গলার নলি কাটা, আর বুকে-পেটে স্ট্যাব।
আতঙ্কে চোখ বুজে ফেললেন বলাইবাবু। কানাই-ই তো বলেছিল না, তার গোষ্ঠী ছুরি খুরে বিশ্বাসী!
হসপিটালের বাইরে এলেন বলাইবাবু। পার্টির ছেলেরা স্লোগান দিচ্ছে কানাই কাষ্ঠ অমর রহে! কানাই কাষ্ঠ তোমায় আমরা ভুলছি না,ভুলব না। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ি চলে এলেন বলাইবাবু।
# # #
ঘটনা ঘটল দিন দশেক পর। অপঘাতে মৃত্যু; তাই তিন দিনে শ্রাদ্ধ শান্তি মিটে গেল। তারপর আমড়াহাটি অঞ্চল থেকে বড় করে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। এলাকার সব গোষ্ঠী নাকি মিলেমিশেই করছে। স্মরণসভা হবে সেই নেতাজি সংঘের মাঠে, যে মাঠে জীবনে প্রথম পার্টি মিটিং-এ গিয়ে ধোলাই খেয়েছিলেন বলাইবাবু।
পার্টির জেলাস্তরের রাজ্য স্তরের হেভিওয়েট সব নেতারা আসবেন। শোনা যাচ্ছে, দপ্তরহীন এক মন্ত্রীও আসতে পারেন। বলাইবাবুই একমাত্র অরাজনৈতিক মানুষ। কিন্তু পোস্টার ফ্লেক্সে নেতা মন্ত্রীদের পাশে খুব গুরুত্ব দিয়ে ছপা হয়েছে বলাইবাবুর ছবি আর নাম। মাইকে অ্যানাউন্স হচ্ছে – এদের সঙ্গে থাকছেন বক্তাশ্রী বলাই চোংদার মহাশয়, যিনি স্বর্গত কানাই কাষ্ঠের বাল্যবন্ধু, অনেক অজানা কথা…ইত্যাদি ইত্যাদি।
ওইদিন অন্য যে সব বুকিং ছিল, সব ক্যানসেল করে অ্যাডভান্স ফেরত দিয়ে দিয়েছেন বলাইবাবু।
# # #
স্মরণসভার আগের দিন রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বারান্দায় ইজিচেয়ারে চোখ বুজে বসেছিলেন বলাইবাবু। সেদিন চারটে বক্তৃতা ছিল, তাই একটু তাড়াতাড়িই ফিরেছেন। ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে পরের দিনের কথা চিন্তা করছিলেন। স্পষ্ট কানে বাজছিল কানাইবাবুর সেই কথাগুলো। একদিন মজা করে বলেছিলেন, ওরে বলাই ,আমি মরলে, তুই কিন্তু অবশ্যই বক্তৃতা দিস। যতবার মনে পড়ছে কথাগুলো ততবার চোখে কেবলই জল এসে যাচ্ছে তাঁর।
পরের দিন কী বলবেন সে কথাই ভাবছিলেন। স্মরণসভায় বক্তৃতা দেওয়া আর নকুল নাগের সন্দেশ মুখে ফেলা একই ব্যাপার তাঁর কাছে। কিন্তু কাল পেশাদারিত্বের কোনও প্রশ্ন নেই। যা বলবেন, অন্তর থেকে বলবেন। পরোপকারী সৎ মহৎ এসব তো বলবেনই। সবাই বলবেন। তিনি বরং এর পরেই চলে যাবেন শৈশব কৈশোরের দিনগুলোয়। খেলাধুলো, দুষ্টুমি, পুকুরে সাঁতার,আম জাম চুরি, ইশকুলে নিল ডাউন, হেডস্যারের হাতে পিটুনি – এইসব। এগুলো তাঁর থেকে ভাল কেউ জানে না।
ঠিক সেই সময়েই বারান্দার কোণ থেকে কে যেন বলে উঠল, বলাই।
বলাইবাবু একটু চমকে উঠলেন। বললেন, কে!
আমি রে বলাই।
আমি টা-কে!
বন্ধুর গলাটাও চিনতে পারছিস না। আমি কানাই রে।
বলাইবাবুর মনে হল তিনি জমে বরফ। বারান্দায় নয়, ইগলুর ভেতর বসে আছেন।
তু-ই ! কোনওরকমে বললেন বলাইবাবু। নিজের গলা নিজের কানেই বেখাপ্পা ঠেকল। এস্কিমোদের গলা কি এমনই হয়!
বলাই, তুই ভয় পাচ্ছিস?
বলাইবাবু কাঁপা গলায় বললেন, বলাই বাহুল্য।
আরে আমি তোর সেই ন্যাংটোবেলার বন্ধু; আমাকে ভয় পাচ্ছিস! আর শোন, ভূতেরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। তারা নিজেদের সমস্যায় নিজেরাই জেরবার। এই তো, দেখ না, ভূত হয়ে থেকে আমিই ধনে প্রাণে মারা পড়ছি।
বলিস কী রে! বলাইবাবু বললেন। এতক্ষণে ভয়টা কেটে গেছে তাঁর। গলার সেই এস্কিমো এফেক্ট আর নেই।
হ্যাঁ রে ভাই, একেবারে মরে যাচ্ছি।
বলাইবাবু বললেন, কিন্তু মানুষ মরেই তো ভূত হয়। ভূত মরে কি মানুষ হয়! তুই কি আবার মানুষ হচ্ছিস; মানে আবার জন্মাচ্ছিস? শোন না, আমার ছেলের তো বিয়ে হয়েছে; ওদের তো বাচ্চা কাচ্চা হবে। তুই তাহলে আমার নাতি হয়ে আয়। আবার দুজনের বন্ধুত্ব হবে। দাদু-নাতি তো বন্ধুই হয়।
বলার সঙ্গে সঙ্গেই একটু যেন ঠান্ডা হাওয়া লাগল গায়ে। বলাইবাবু অবাক। এই ভ্যাপসা গরমে ঠান্ডা হাওয়া, বৃষ্টি টিষ্টি হবে নাকি!
তখনই কোণের অন্ধকার থেকে ভেসে এল – নারে, বৃষ্টির কোনও আশা নেই। ওটা আমার দীর্ঘশ্বাস। আমাদের প্রশ্বাস-দীর্ঘশ্বাস একটু ঠান্ডাই হয়।
বলাইবাবু বলেন, কেন, দীর্ঘশ্বাস ফেললি কেন!
তোর কথা শুনে মনটা হায় হায় করে উঠল। আহা রে, সত্যিই যদি এমনটা হত! কিন্তু এ মরা সে মরা নয়; তাহলে তো বেঁচে যেতাম। এ হচ্ছে টর্চার, মানে রিগিং ধরনের বলতে পারিস।
কারা টর্চার করছে?
আগে যারা ভূত হয়েছে; আরও স্পষ্ট করে বললে, আমার কারণে হয়েছে।
বুঝলাম না। বললেন বলাইবাবু।
শোন, তোর কাছে সত্যিটা স্বীকার করতেই পারি এখন। আমার কীর্তি কেলেংকারি তো কম নয়। তবে দেখ, এগুলো রাজনীতি করতে গেলে হয়ে যায়। যেমন ধর, টোকাপুরে যে ঝুপড়িগুলোয় আগুন লাগল, দুটো বাচ্চা সমেত ছ’জন মারা গেল, সে তো আমারই কাজ। এক প্রমোটারের সঙ্গে সাঁট করে, আমার ছেলেদের দিয়ে আমিই করিয়েছিলাম। তারপর ওই যে, বাসন্তীনগরে দাঙ্গা, এগারো জনের প্রাণ গিয়েছিল, কলকাঠি তো আমিই নেড়েছিলাম। এমনকী ঘোষপাড়ার মেয়েটা যে মারা গেল, সেটাও তো…।
বলাইবাবু বললেন, কিন্তু ঘোষ পাড়ার মেয়েটা তো জলে ডুবে মারা গিয়েছিল, পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে নাকি তেমনই ছিল।
ধুস; আসলে আগের দিন মেয়েটা বন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরছিল। একটু রাত হয়ে গিয়েছিল। আমার ছেলেরা ওকে তুলে আনে। আমি মেয়েটাকে মানে, ওই আর কী-রেপ, মানে ধর্ষণ করি। মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে যায়। আমার ছেলেরা বডি তুলে পুকুরে ফেলে দেয়। পুলিশ ইনভিস্টিগেশন, পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট তো আমার কথামতো লেখা হয়েছিল।
শুনে, একটু চুপ করে থাকলেন বলাইবাবু।
কানাইবাবু ওরফে ভূত কানাই বলে, কী রে, খুব ঘেন্না হচ্ছে তো! ভাবছিস, বন্ধু কত নোংরা ছিল।
এবার বলাইবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, না, তা নয়; আমি জানি পলিটিক্স করলে অনেকেই কমবেশি এমন সব কাজ করে, কিন্তু তোর প্রবলেম হচ্ছে কেন?
হচ্ছে এই জন্যেই, সবকটা মরে এখানে ভূত পেত্নি হয়ে আগে থেকেই আছে। ওরা সব জোট বেঁধেছে। সবাই একজোট হয়ে টর্চার করছে আমার ওপর। যেমন ধর, আশেপাশের দু’একটা অঞ্চলের পার্টি-মিটিং-এ আমার জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরা আমাকে ওই সময়টা একপায়ে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে। রসিদপুর অঞ্চলে গতকাল ছোটখাট একটা স্মরণসভা হয়। ওহ্, সে কী অত্যাচার। কেউ খুলিতে গাঁট্টা মারছে, কেউ চোয়ালে ঘুষি মারছে; বাচ্চাগুলো আরও শয়তান। ওপরে হাত পাচ্ছে না বলে, হাঁটু টার্গেট করছে। খুলির একটা জায়গা চটে গেছে, হাঁটুর ব্যথায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনও রকমে হাঁটছি।
বলাইবাবু বললেন, ইশ্, আহা রে, একেই বোধহয় বলে, মরেও শান্তি নেই।
ঠিক তাই। শোন তোর কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে। কাল তো আমার স্মরণসভা; বড় করেই হচ্ছে দেখছি। নেতা মন্ত্রী যতই আসুক, তোর কথা শুনতেই বেশিরভাগ লোক আসবে। তুই সত্যি কথাগুলো বলে দিস।
মানে!
মানে আমার কীর্তিকলাপগুলো। খুন জখম ধর্ষণ-সব তোকে ধরে ধরে বলব, তুই একটা লিস্ট বানিয়ে নিস, তারপর মঞ্চে উঠে বলে দিস, তবে যদি এদের টর্চার থেকে কিছুটা রেহাই পাই।
অসম্ভব! বলাইবাবু বলে ওঠেন, তাহলে তো আমাকেও লাশ হয়ে যেতে হয়। আমার ভাই এক্ষুণি মরার কোনও ইচ্ছে নেই। কারই বা থাকে বল। তা তুই তোর দলের নেতা মন্ত্রীদের ধর না।
পাগল! ওরা সব এক একটা বিষ মাল। আমার অ্যান্টি। প্রথমে বলবে, পার্টির অপূরণীয় ক্ষতি হল। তারপর দু’একটা হাবিজাবি কথা বলেই চলে যাবে আরও বড় নেতাদের মহিমা কীর্তনে। এখন ওরা যদি জানতে পারে,আমার সম্পর্কে ভাল কথা বললে আমি এখানে বাঁশ খাব, তাহলে বাড়তি সময় নিয়ে হরির লুঠের মতো আমার প্রশংসা ছড়াবে। সুতরাং ও ভাবনায় গুলি মার। তুই-ই একমাত্র আমাকে বাঁচাতে পারিস। প্লিজ ভাই…!
# # #
না, বাল্যবন্ধুর অনুরোধ রাখা সম্ভব হয়নি বলাইবাবুর। সেদিন রাতেই গৃহত্যাগ করলেন তিনি। ফোন অফ। গিন্নিকে বলে গেলেন, যে-ই খোঁজ করুক না কেন; একটা কথাই বলবে, কী জানি, সকালে উঠে দেখি ঘর ফাঁকা।
বনলতা দেবী তেমনই বলেছিলেন সবাইকে। অনেকে বলল, থানায় একটা মিসিং ডাইরি করুন। বনলতা দেবী বললেন, করা হয়েছে। পুলিশ খোঁজ চালাচ্ছে; পেলেই জানাবে।
মাসছয়েক পরে বলাইবাবুকে মৃত ধরে নিয়ে পাড়ার ছেলেরা একটা স্মরণসভা করে। বনলতা দেবীকে যেতে অনেক অনুরোধ করা হলেও উনি যাননি। আর কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ি টারি বিক্রি করে ছেলে বউমাকে নিয়ে কোথায় যেন চলে যান।
না, তাঁদের জন্য থানায় কোনও মিসিং ডাইরি হয়নি।
