একদা এক নবকান্ত – উল্লাস মল্লিক

একদা এক নবকান্ত

জৈষ্ঠ্যমাসের মাঝামাঝি কোনও এক বুধবার সকালে চালতাবেড়ের নবকান্ত ঘোষণা করল সে সুইসাইড করবে। সুইসাইড মানে আত্মহত্যা। এবং সেটা করবে এখনই, এই মুহূর্তেই।

 ঝগড়াঝাঁটি মান অভিমানের সময় অনেকেই এমন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে দেয়। কিন্তু সে নেহাতই কথার কথা। স্বামীর তাস খেলাকে কেন্দ্র করে সকালে স্ত্রী হয়ত বলল এমন কথা। কিন্তু সেদিনই সন্ধ্যেবেলা যখন স্ত্রীর শপথ অনুযায়ী তার বডি মর্গে থাকার কথা, দেখা গেল, দুজনে সেজেগুজে হাসিমুখে ‘দেবদাস’ দেখতে যাচ্ছে। অথবা বাপ ছেলেকে বলল, ওই মেয়েকে যদি বিয়ে করিস, তাহলে তুই আমার মরা মুখ দেখবি। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সেই মেয়েকেই বিয়ে করেছে ছেলে। এবং বউমার রান্না ছাড়া শ্বশুরমশাইয়ের মুখে খাবার রোচে না।

কিন্তু এক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্যরকম। আত্মহত্যা করবে বলে নবকান্ত একেবারে গাছে চড়ে বসেছে। সঙ্গে আত্মহত্যার সরঞ্জাম। অর্থাৎ দড়ি একটা। এই দড়িই গাছের ডালে বেঁধে ঝুলে পড়বে সে। এমনই পরিকল্পনা তার।

চালতাবেড়িয়ার মন্ডল পাড়ায় শিবমন্দিরের সামনে ছোট্ট একফালি জমি। সেখানে কটা আম, জাম, নিম গাছ। এর মধ্যে একটা আমগাছে উঠেছে নবকান্ত। বেশ প্রাচীন গাছ। মোটা গুঁড়ি সোজা উঠে গেছে অনেকটা। তারপর শুরু হয়েছে ডালপালা। এ গাছে ওঠা সহজ নয়। কিন্তু নবকান্ত গাছে উঠতে ওস্তাদ। তাই সহজেই উঠে পড়েছে গাছের উপর দিকে। সঙ্গে করে দড়ি নিয়েই উঠেছে। এবং চিৎকার করে ঘোষণা করছে, আত্মহত্যা করবে।

নবকান্ত যখন এই গল্পের নায়ক তখন তার সম্পর্কে দু’চার কথা বলে নেওয়া দরকার। নবকান্তকে অবশ্য খলনায়কও বলা যায়। গল্পের আর পাঁচটা চরিত্রকে সে যেমন হেনস্থা করেছে তাতে তাকে নির্দ্ধিধায় খলনায়ক বলা চলে।

চালতাবেড়ের হারাধন দাসের দুই ছেলের মধ্যে নবকান্ত বড় । ছোটোর নাম শিশুকান্ত। বছর দুই আগে অল্প ব্যবধানে নবর বাবা-মা দেহ রেখেছে। দু’ভাই পৃথগন্ন অর্থাৎ আলাদা সংসার। নবর সংসারে নব আপাতত একা। বছর পাঁচেক আগে ফাল্গুনের এক গোধূলি লগ্নে পাথরডাঙা নিবাসী গৌরহরি দাসের ছোট মেয়ে শিবানীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বটে নবকান্তর। কিন্তু সে বিয়ে টেকেনি। টেকার কথাও নয়। নব এমনিতেই তার কাটা; অকারণে ভ্যাজর ভ্যাজর বকে। স্থায়ী কোনও কাজ কাম নেই তার। সারাদিন হাটে বাটে ঘুরে বেড়ায়। কেউ বলল, নব আমার বাগানটা পরিষ্কার করে দে তো, পয়সা দেব। তো নব করে দিল। কেউ নবকে দিয়ে পুকুরের পানা সাফ করিয়ে নিল। কোনও চায়ের দোকানে জল তুলে দিয়ে দু’পয়সা পেল নব। কেউ আবার বলল, নব গা-হাতটা ভাল করে ম্যাসাজ করে দে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এসব খুচরো রোজগার যেটুকু করে সবটুকুই চুল্লুর ঠেকে চলে যায় তার। তাই বউ পালানোর পক্ষে নব একেবারে উপযুক্ত লোক। তাই শিবানী পালিয়েছে, আর যাবার সময় জোর গলায় ঘোষণা করে গেছে, মিনসে মরলে তাকে যেন একটা খবর দেওয়া হয়; কারণ তখন শাঁখা সিঁদুর তোলার একটা দায়িত্ব বর্তায় তার ওপর।

তা এ হেন নব আত্মহত্যা করলে কারও কিছু যায় আসে না। এমন কত মানুষ রোজ উবে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। কিন্তু দেখা গেল ব্যাপার অত সহজ নয়। নবর এই ঘোষণা শুনে প্রথমেই বেরিয়ে এল তার ভাই-বউ পূর্ণিমা। আম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে প্রবল কাকুতি মিনতি করতে লাগল। দাদা অমন কাজটা করবেন না, নেমে আসুন।

এমন শুনে মনে হতেই পারে ভাসুর-ভাদ্দোরবউয়ে দারুণ সম্পর্ক। ভাসুরের ভালমন্দের প্রতি সজাগ দৃষ্টি পূর্ণিমার। কিন্তু অতীত তথ্য এমন কথা বলছে না। মাঝে মাঝেই খুঁটিনাটি নানা বিষয় নিয়ে দু’ভাইয়ে লাগে। স্বভাবতই তখন স্বামীর পক্ষ নেয় পূর্ণিমা। এই তো কদিন আগেই একটা যৌথ নারকোল গাছ থেকে নারকোল পাড়িয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল নব। শিশুকান্ত তখন বাড়ি ছিল না। কিন্তু শিশুকান্তর অভাব বুঝতে দেয়নি পূর্ণিমা। এক গলা ঘোমটা টেনে ভাসুরের প্রতি এমন খিস্তি বাণ নিক্ষেপ করেছিল যে নবর টাটকা নেশা ছানা কেটে গিয়েছিল। সেদিন পূর্ণিমা বিশেষ একটা খেদোক্তি করেছিল। ওপরওলা রোজদিন এত মানুষকে টেনে নিচ্ছে কিন্তু এই মরাখেকোটার দিকে একবারও নজর পড়ছে না কেন।

সেই পূর্ণিমাই আজ করুণ গলায় বলল, দোহাই দাদা, আপনি নেমে আসুন গাছ থেকে।

নব হুঙ্কার ছেড়ে বলল, কেন নামব, র্যা, নামব কেন! আমি আমার গলায় দড়ি দিচ্ছি তাতে তোর বাপের কী!

পূর্ণিমা বলল, তা বললে হয় না দাদা; আপনি নেমে আসুন।

নব বলে, যখন খিস্তি দাও তখন মনে থাকে না।

পূর্ণিমা বলে, সে দাদা, পাশাপাশি বাস করতে গেলে অমন হয়। তাও মানছি, ঘাট হয়েছে; এই আমি নাক কান মলছি দাদা; আপনি নেমে আসুন।

বলে, পূর্ণিমা সত্যিই নিজের নাক কান মলে নেয়।

নব বলে, ওসব জানি না; মরব একবার মন করেছি যখন, মরবই।

পূর্ণিমা বলে, ঠিক আছে দাদা, মরার অত ইচ্ছে যখন, মরুন; কিন্তু আজ বাদ দিয়ে কাল মরুন।

নবকান্ত বলে, কাল কেন, আজই মরব আমি। আজও যা, কালও তাই।

পূর্ণিমা বলে, আজ যে আমার ঘরে সত্যনারায়ণ পুজো, সব জোগাড় হয়ে আছে; আপনি মরলে আমাদের কালাওষুধ হয়ে যাবে যে দাদা।

নব বলে, ও সব সত্যনারান-ফারান জানি না; আজই মরব।

পূর্ণিমা হাত জোড় করে বলল, শুধু একটা দিন তো দাদা; এটুকু করতে পারছেন না! একদিন পরে মরলে কী এমন ক্ষতি! আর না হয়, আজই মরবেন; সন্ধেবেলা পুজোটা হয়ে গেলে সিন্নি খেয়ে মরবেন।

দেখতে দেখতে বেশ ভিড় জমে যায় গাছের নিচে। সেই ভিড়ের মধ্যে রায়বাড়ির ছোট ছেলে অংশুমানও আছে। সে-ই এবার চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, নব তুই মরবিই বা কেন?

নব বলে, সে অনেক ব্যাপার।

অংশুমান বলে, আরে সেটাই তো শুনতে চাইছি তোর থেকে। কী জন্য মরবি তুই?

নব বলে, তোমাকে বলব কেন! মরব বলেছি, মরব; ব্যস! কারও কথা শুনব না।

দৌড়াতে দৌড়াতে এলেন যদু মন্ডল। চানে যাবেন বলে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, সেই সময়ই পেলেন সংবাদটা। তাঁদের আমগাছে নব গলায় দড়ি দিচ্ছে। তাই গামছা পরেই চলে এসেছেন তিনি। যদিও গাছের মালিকানা তারই এমন কথা হলফ করে বলা যাবে না। কারণ ভাই মধু মন্ডলের সঙ্গে আজ টানা দশ বছর এই গাছ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার মীমাংসা হলে তবেই বলা যাবে গাছ কার – যদুর না মধুর। যাই হোক, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন যদু – অ্যাই শালা নব!

নব বলল, কী!

নেমে আয় হারামজাদা।

নব বলে, কেন?

তোর বাপের গাছ!

নব বলে, আমি বলেছি না কি!

তবে নেমে আয়।

আমি গলায় দড়ি দেব।

যদু বলেন, তোর যা ইচ্ছে কর গে যা, কিন্তু এ গাছে নয়; তুই অন্য গাছে দে।

নব বলে, আমি এই গাছেই দেব মন করেছি, তো এ গাছেই দেব।

খবরদার নয়! গর্জে ওঠেন যদু, নেমে আয় বলছি।

নব বলে, নামব বলে উঠেছি না কি। শালা গাছে তো কাঠপিঁপড়ের চাষ করে রেখেছ। ঝালিয়ে দিল একেবারে।

মধু মন্ডল বাজারে গিয়েছিলেন। সবে এক আঁটি লাউশাক কিনেছেন তখনই পেলেন সংবাদটা। লাউশাক হাতে নিয়ে দৌড়ে এলেন। আর এসে দাদা যদু মন্ডলের মতোই তড়পাতে লাগলেন।

মামলার জন্য দু’ভাইয়ের বাক্যালাপ নেই। কিন্তু এই সংকট মুহূর্তে সে নিয়ম ভেস্তে গেছে। দু’ভাই শলাপরামর্শ করছেন। পাগলটা সত্যিই যদি গলায় দড়ি দেয় তাহলে গাছটার বদনাম হয়ে যাবে। বছর বছর প্রচুর আম ফলে এই গাছে, সেই আম পাড়া নিয়ে দু’ভাইয়ের খিটিমিটিও লাগে। এ বছরেও প্রচুর ফলেছে। মামলায় যেই জিতুক পরে আম পাড়ানোর লোক পাওয়া যাবে না। গলায় দড়ি দেওয়া গাছে চট করে কেউ উঠতে চায় না। তাই যেমন করেই হোক, পাগলাটাকে নামাতে হবে। কিন্তু এ গাছে উঠবে কে? মধু মন্ডলের হঠাৎ চোখে পড়ল, একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে বাবলু। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছে। গাছ বাইয়ে হিসাবে বাবলুর নাম আছে। মধু এগিয়ে গিয়ে বাবলুকে বললেন, অ্যাই বাবলু, কিছু একটা ব্যবস্থা কর।

বাবলু বিড়িতে একটা টান দিয়ে বলল, কী করব?

গাছে ওঠ একবার, নামা পাগলাটাকে।

বাবলু বলে, এখন আবার কে গাছে উঠবে; আমাকে হালদার পাড়ায় যেতে হবে এখন।

এ গাছ তো তোর কাছে জলভাত, একবার উঠতে কতক্ষণ লাগবে।

শরীরটা আজ ভাল নেই গো।

যদু মন্ডলও পা পা করে এসে দাঁড়িয়েছেন পাশে। বুঝলেন, তাল বুঝে বাবলু কিছু খেঁচে নিতে চাইছে। তিনি তাই সরাসরি প্রসঙ্গে এলেন। বললেন, তোকে কিছু দেবখন, তুই উঠে পড়।

বিড়িয়ে একটা টান দিয়ে বাবলু বলে, কত?

সে বুঝে শুনেই দেব’খন। তুই ওঠ না আগে।

বাবলু বলে, আগে শুনি না, কত দেবে।

দরাদরি শুরু হয় দু’পক্ষের। বাবলু চাইছে একশ টাকা; যদু মধু কুড়ির ওপর উঠতে নারাজ। শেষে পঞ্চাশ টাকায় রফা হয়। দু’ভাই ঠিক করে নেয় হাফ হাফ শেয়ার করবেন। দরাদরি চলছে যখন চিন্টুর মায়ের কালো ছাগলটা মধুর হাতে ধরা লাউশাকের ডগা মসমসিয়ে খেয়ে নেয়।

কিন্তু তখনই সেখানে উগ্রচন্ডী মেজাজে হাজির হয় বাবলুর বউ সন্ধ্যা। সে খবর পেয়েছে পাগল নামাতে তার স্বামীকে গাছে তোলা হচ্ছে। এসেই তুলকালাম শুরু করে দেয় সন্ধ্যা। পাগল যদি গাছের ওপর থেকে ঠেলে ফেলে দেয় তার স্বামীকে তখন কী হবে? কে দায়িত্ব নেবে? চিৎকার করতে করতেই স্বামীর হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলে যায় সন্ধ্যা।

প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে আসেন পঞ্চায়েত প্রধান শিবতোষ পাল। তাঁর এলাকায় একটা লোক দিনে দুপুরে জনসমক্ষে গলায় দড়ি দিচ্ছে – এ তো ভাল কথা নয়। এলাকার বদনাম। শিবতোষ অকুস্থলে পৌঁছাতে একটু শোরগোল ওঠে। নেতা বলে কথা। ভাবটা এমন, প্রধান যখন এসে গেছে, কিছু একটা বিহিত হবে। শিবতোষকে ঘিরে ছোটখাট একটা ভিড় জমে যায়। নানা জনের নানা দাবি।

-শিবুদা ব্যবস্থা কিছু একটা করুন; একটা লোক এভাবে মরবে সেটা আবার হয় নাকি!

শিবতোষবাবু দেখুন একটু। আপনারা যদি না দেখেন তো কে দেখবে। সরকার থেকে একটা স্টেপ নিন।

শিবতোষ কান্ড দেখেছ। যত পাগল ছাগল জোটে এখানে। নামিয়ে এনে ঠাটিয়ে দুটো থাপ্পড় দাও তো। চ্যাংড়ামি!

শিবতোষ একটু এগিয়ে যান। তারপর চিৎকার করে বলেন, অ্যাই নবা, নেমে আয়।

নব একটু ভুরু কুঁচকে তাকায়। তারপর বলে, কেন!

শুধু শুধু মরবি কেন?

নব বলে, শুধু শুধু কে বলল!

কী জন্যে তাহলে?

ব্যাপার আছে।

ঠিক আছে। শিবতোষ বলেন, তোর যা বলার আমাকে বল; আগে নেমে আয়।

নব বলে, তোমাকে বলে কী হবে।

শিবতোষ বলেন, আমি তোর সমস্যা মিটিয়ে দেব।

একটু চুপ করে থাকে নব। তারপর বলে, তুমি শালা বহুত ঢপবাজ আছো।

শিবতোষ ধমকে ওঠেন, অ্যাই কী বাজে কথা বকছিস!

বাজে কথা নয়। নব বলে, গেল বার ভোটের আগে তুমি বললে, নব ভোটটা দে, তোর ঘরের চালটা সারিয়ে দেব, আর তোর বউকে ফিরিয়ে আনব। তা ভোট তো দিলুম, কিন্তু কিছুই তো হল না।

শিবতোষ বলেন, ঠিক আছে, কালই তোর চাল মেরামতের ব্যবস্থা করছি, আর তোর বউকেও…

শিবতোষের কথা শেষ হবার আগেই নব বলে ওঠে, ওসব আর শুনছি না; মরব বলেছি, মরব; আজই মরব।

ততক্ষণে হাজির হয়ে গেছেন রুইদাস ঘোষ। শিবতোষের বিরোধী নেতা। তিনি একপাশে দাঁড়িয়ে মজা দেখছেন। ভাবখানা এমন, তোমরা এখন ক্ষমতায়, সুতরাং ঠেলা তোমরা সামলাও।

খবরের গন্ধে হাজির চালতাবেড়িয়া বার্তার সম্পাদক শিশির সাহা। গ্রাজুয়েশনের পর চাকরি বাকরি না পেয়ে কিছুদিন টিউশন করে শিশির। তারপর মিউচুয়্যাল ফান্ড চিট ফান্ড এইসব চক্কর ঘুরে এখন সাংবাদিকতায় থিতু হয়েছে। শিশির এসে প্রথমে কূট চোখে চারদিক পর্যবেক্ষণ করে নেয়। গাছতলায় দাঁড়িয়ে খচাখচ করে ছবি তোলে মোবাইলে। কান্ড দেখে নবও কিছুটা অবাক। সে-ও তাকিয়ে আছে, শিশিরের দিকে। শিশির বলে, আচ্ছা নবকান্তবাবু, আপনি সুইসাইড করতে চাইছেন কেন!

এবার একটু ঘাবড়েই যায় নবকান্ত। এই লোকটা তার ছবি তুলল, তারপর আপনি আজ্ঞে করছে, কে লোকটা। তাই চুপ করে থাকে সে।

শিশির বলে, চুপ করে থাকবেন না নবকান্তবাবু। কেন সুইসাইড করছেন সেটা বলে যান। সবাইকে সেটা আমরা জানাব, সবার জানা উচিত।

নব এবার বলে ওঠে, ওসব জানি না; মরব ঠিক করেছি, মরব; কার তাতে কী!

শিশির বলে, সে তো মরবেনই; ওই ব্যাপারে আমি আপনাকে বাধা দেব না। আমি শুধু কারণটা জানতে চাইছি। জেনে, আমি আমার কাগজে লিখব; পাঁচজন জানবে। এটুকুই আমার ডিউটি।

নব হঠাৎ পট করে একটা কাঁচা আম ছেঁড়ে গাছ থেকে। তারপর সাঁই করে ছুঁড়ে মারে শিশিরকে। শেষ মুহূর্তে সরে গিয়ে আঘাত এড়ায় শিশির।

গাছ তলা থেকে একটু সরে আসে শিশির। সরে এসে আবার ছবি তুলতে থাকে মোবাইলে।

তপনের ঠাকুমার বয়েস আশি ছাড়িয়েছে। কানে কিছু শুনতে পান না। কোমরে আর হাঁটুতে বাত। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসেছেন। নবকান্তকে গাছে দেখে বললেন, ওরে নবা, আমাকে ভাল দেখে একটা আমপল্লব ভেঙে দে তো…সাত পাতার দিবি কিন্তু…

শুভশ্রীদের দোতলার ছাদ থেকে আমগাছটা সোজা দেখা যায়। ছাদে উঠে দেখছিল শুভশ্রী। মাতাল নব গাছের উঁচু ডালে উঠে সুইসাইড করতে যাচ্ছে। সেও মোবাইলে কটা ছবি তুলল। তারপর ঘরে এসে ফেসবুকে পোস্ট দিল। সঙ্গে সঙ্গে লাইকের বন্যা। প্রচুর কমেন্টও আসছে। কারণ জানতে চাইছে অনেকে। কেউ দেশের আর্থসামাজিক অবস্থাকে দায়ী করছে। কেউ করছে সরকারকে। সরকারকে দায়ী করছে যারা তাদের সমালোচনা করে অনেকে পোস্ট দিচ্ছে। তাদের বক্তব্য, সরকারকে ঠিক মতো কাজ করতে দিচ্ছে না বিরোধী পক্ষ। তারা উন্নয়নে বাধা দিচ্ছে। তার ফলেই ঘটছে এই ধরনের আত্মহত্যা। এর মধ্যে কয়েকজন অবশ্য আমেরিকাকেও দায়ী করছে। আমেরিকার আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী নীতিই নাকি…

চন্দন কখন চুপিচুপি এসেছে খেয়াল করেনি শুভশ্রী। এসে একেবারে জড়িয়ে ধরেছে শুভশ্রীকে। শুভশ্রী প্রথমে ছাড়াবার চেষ্টা করে নিজেকে। কিন্তু আরও প্রবলভাবে তাকে জড়িয়ে ধরে চন্দন। শুভশ্রী ফিসফিস করে বলে, কী হচ্ছে, ছাড়, কেউ এসে যাবে।

চন্দন বলে, কে দেখবে, কেউ নেই; সবাই সুইসাইড দেখতে গেছে।

চন্দন একটা চুমু খায় শুভশ্রীর ঠোঁটে। এবার শুভশ্রী আঁকড়ে ধরে চন্দনকে। তার এখন মরে যেতে ইচ্ছে করছে।

নানা দিক থেকে ছবি তুলে শিশির শিবতোষের পাশে এসে দাঁড়ায়। টেনশনে সিগারেট ধরিয়েছেন শিবতোষ। শিশির বলে, শিবতোষদা, ব্যাপার কিছু বুঝতে পারছেন?

শিবতোষ মাথা নাড়েন – না কিছুই বুঝতে পারছি না।

কিন্তু আমাকে তো কিছু একটা লিখতে হবে। শুনছি লোকটা নাকি খুব গরিব।

তা বটে।

তাহলে কি অভাবে আত্মহত্যা লিখে দেব; খেতে না পেয়ে আত্মহত্যা করেছে?

চমকে ওঠেন শিবতোষ। বলেন, তোমার মাথাটা কি গেছে শিশির। অনাহারে আত্মহত্যা; ব্যাপারটা কী পরিমাণে হইচই ফেলে দেবে বুঝতে পারছ। অপোনেন্ট ছেড়ে কথা বলবে! আর তা ছাড়া সুইসাইড তো করেনি এখনও; তোমাদের সবেতেই বাড়াবাড়ি!

শিশির বলে, কিন্তু শিবতোষদা, সুইসাইড করলেও নিউজ, না করলেও নিউজ। আজ যখন আমরা ডিজিটাল ইণ্ডিয়ার কথা বলছি, মহাকাশে উপগ্রহ পাঠাচ্ছি তখন দেশের একটা মানুষ খেতে না পেয়ে সুইসাইড করতে যাচ্ছে – এ নিউজ তো আমার ফ্রণ্ট পেজে যাবে।

শিবতোষ শিশিরের হাতটা চেপে ধরে। তারপর গলা নামিয়ে বলে, এটা চেপে যাও তুমি; তোমার ব্যাপারটা আমি দেখছি।

কোথায় আর দেখছেন! একটু ক্ষোভের গলায় শিশির বলে, পুজোর সময় একটা ফুলপেজ অ্যাড চেয়েছিলাম; দেওয়া হল কোয়াটার পেজ। তাও এখনও পেমেন্ট পাইনি।

শিবতোষ শিশিরের হাতে একটু চাপ দিয়ে বলেন, কাল একবার পঞ্চায়েত অফিসে এস, আমি থাকব; হয়ে যাবে।

বিরোধী নেতা রুইদাস এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি মুখ খোলেন। চিৎকার করে বলেন, নবা, মরবিই তাহলে?

নবা বলে, হ্যাঁ, বলছি তো।

রুইদাস বলেন, তুই কি কোনও সুইসাইডাল নোট লিখেছিস?

নব একটু অবাক হয়ে বলে, সেটা আবার কী!

মানে, তোর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে – এটা কি লিখে রেখেছিস কোথাও?

নবা একটি চুপ করে থাকে। তারপর বলে, তোমাকে শালা বলব কেন।

সুইসাইডাল নোট কথাটা যেন আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল গাছের নিচে দাঁড়ান মানুষগুলোর মধ্যে। এদের মধ্যে অনেকেই নবার পিছনে লাগে। অকারণে থাপ্পড় মারে, লাথি মারে পাছায়। অনেকে কাজ করিয়ে পয়সা দেয় না। এদের সবার মনে গিঁথে গেল কথাটা। থমথমে হয়ে উঠল পরিবেশ। গুজগুজ, ফিসফাস। এর মধ্যে একটা প্রশ্ন উঠল – নবা কি লিখতে পড়তে পারে। সঠিক উত্তর কেউই দিতে পারছে না। অগত্যা ঠিক হল, নবাকে গাছ থেকে নামাতেই হবে, কিছুতেই মরতে দেওয়া যাবে না ওকে। শিবতোষ তার পার্টির ছেলে পল্টুকে ডাকে। বলে, পল্টু তোদের একটা বড় মই আছে না?

পল্টু বলে, হ্যাঁ।

মইটা গাছে লাগিয়ে উঠে যা না; গিয়ে নামা ব্যাটাকে।

আগের দিনই পল্টু গা হাত পা টিপিয়ে নিয়েছে নবকে দিয়ে। শর্ত ছিল, চা পাউরুটি খাওয়াবে। কিন্তু কাজ মিটে যাবার পর পল্টু ভাগিয়ে দিয়েছে তাকে। তাই তার মনের মধ্যেও প্রবল টানাপোড়েন চলছিল এতক্ষণ। সে দৌড়ে গিয়ে মইটা নিয়ে এল বাড়ি থেকে। মইটা লাগাল গাছের গায়ে। দেখে চিৎকার করে উঠল নব। খবরদার বলছি, কোনও শালা গাছে উঠবে না কিন্তু।

কিন্তু তার কথা কে শোনে। মই বেয়ে একটু একটু করে উঠতে লাগল পল্টু। নব তখন আরও উঁচু একটা ডালে উঠতে যায়। আর তখনই অসাবধানেই বুঝি দড়িটা পড়ে যায় হাত থেকে। দৌড়ে গিয়ে দড়িটা কুড়িয়ে নেন শিবতোষ।

দড়ি পড়ে যেতে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় নব। তারপর চিৎকার করে, আমার দড়ি, আমার দড়ি দিয়ে দাও।

শিবতোষ বলেন, তুই এবার নাম হতভাগা।

নব বলে, নামব কেন; আমি তো গলায় দড়ি দেব।

দেওয়াচ্ছি তোকে গলায় দড়ি। নাম একবার, চাবকে পিঠের চামড়া তুলে দেব আজ। এতগুলো মানুষকে শুধু শুধু হ্যারাস করা! চিৎকার করে বলেন শিবতোষ।

নব বলে, খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু, আমার দড়ি আমাকে দিয়ে দাও।

শিবতোষ কড়া ধমক দিয়ে ওঠে – নাম বলছি আগে।

না, নামব না। আমি গলায় দড়ি দেব; দেবই দেব, কার তাতে কী! কোনও শালাকে ভয় খাই না আমি। তোরা সব শালা মরবি। সব শ্মশানে যাবি। – প্রবল চিৎকার করতে থাকে নবকান্ত। গলার শির ফুলে ওঠে, মুখ দিয়ে থুতু ছিটকে বেরোয়। যে ডালটা ধরে ছিল রাগের চোটে সেই ডাল ধরে ঝাঁকাতে থাকে। ঝাঁকুনি খেয়ে ডালের আমগুলো টুপটাপ ঝড়ে পড়তে থাকে নিচে। আম পড়ছে, আম পড়ছে! হইহই করে ওঠে সকলে। প্রবল হুড়োগুড়ি পড়ে যায়। সবাই আম কুড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। গাছের ওপর পাগলাটা কী বলছে এখন তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই কারও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *