রেলে
গাড়ির সেকেন্ড ক্লাসের কথা হইতেছে, থার্ডও নয়, ইন্টারও নয়।
ব্ল্যাক-আউট; আলোর কাচে কালো রং লেপা নয়, আলোর পার্টই নেই একেবারে। দু-একজনের হাতে টর্চ আছে, নিতান্ত সেরকম প্রয়োজন হইলে এক-একবার ধক করিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছে, ব্যাটারির বাজারও যে চড়া। তাও কি পাওয়া যায়? স্থানাভাবের চেয়েও আলোর অভাবটাই বড়—সেই একই গাড়ি, কিন্তু দিনের চেয়ে রাত্রে যেন চতুর্গুণ ভয়ঙ্কর হইয়া পড়ে। আলোর চর্চাই বেশি। কেহ বলিতেছে, ব্ল্যাক-আউটটা গভর্নমেন্টের হুকুমেই। কেহ বলিতেছে, বাল্ব চুরি যায় এক-আধটা, তাহার পর কোম্পানি সবগুলা খুলিয়া লইয়াছে, বলে—এবার তোরা কি চুরি করবি কর! নানারকমের মন্তব্য। এমনভাবে বলে যেন গাড়ির সংখ্যা কমাইয়া কোম্পানির এবার খদ্দেরের সঙ্গে একটু ঠাট্টা করিবার ফুরসত হইয়াছে।
ভিড়ের লেখাজোখা নাই; বেঞ্চ বাক্সগুলা তো ঠাসা, মাঝখানের খালি জায়গাটুকুতে বাক্স, ট্রাঙ্ক, সুটকেস, বিছানা, চাঙারি, বাসনপত্র প্রভৃতির একটা ছোটখাটো পাহাড়—জনহীন নয়, তাহার উপরও যে যেখানে পাইয়াছে আশ্রয় করিয়া লইয়াছে। মাঝে মাঝে এক-আধজন স্থানচ্যুতও যে না হইয়া পড়িতেছে এমন নয়। গাড়িতে বরাবরই যে একটা হট্টগোল রহিয়াছে, এক্ষেত্রে সেটা বাড়িয়া যাইতেছে। খানিকটা ঝগড়া, বচসা, অভিশাপ আবার খানিকক্ষণের জন্য হয় তো একটু ঠাণ্ডা ভাব। দার্শনিক গোছের যাত্রীরও অভাব নাই।—“কেন ব্রাদার, একটু সরেই যাও না, ক’দণ্ডই বা?” …”ঠিকই বলেছেন, আর আমাদের জীবনটাই কি এইরকম নয়? কোথা থেকে আসছি কোথায় চলেছি—একটুখানির জন্যে দেখা—“…”তাও দেখাই বা কোথায় মশাই? জীবনটাই কি ব্ল্যাকআউট নয়? সবাই কি অন্ধকারে হাতড়ে মরছি না? বলুন…”
অন্ধকার আর হট্টগোলের মধ্যে বোঝা যায় না কে বলিতেছে বা কোথা থেকে বলিতেছে, অভিমতের গুরুত্বে মনে হয় যেন দৈববাণী হইতেছে।
আসলে ইহাদের বোধ হয় টিকিটই নাই; চায় না যে একটা দাঙ্গা-ফ্যাসাদ হোক, কেহ চেন টানিয়া দিক, গার্ড বা চেকার আসুক। হয়তো ইচ্ছে করিয়াই যে টিকিট লয় নাই এমন নয়, পাওয়াও অনেক সময় অসম্ভব তো? কিন্তু সে কথা কি শুনিবে? হয়তো মাঝপথেই এই মাঠের ওপর নামাইয়া দিবে—যা অরাজকতার যুগ চলিয়াছে।….মানুষ সর্বদাই ত্রস্ত, সবাইকেই সন্দেহ; বাঁচা তো নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব বিপদকে ঠেকাইয়া রাখা—কোথাও ধর্মোপদেশ দিয়া, কোথাও হুমকি দিয়া, কোথাও পায়ে ধরিয়া— যেখানে যেমনটা খাটে।
গাড়ি প্ল্যাটফর্মে আসিয়া দাঁড়াইতেই কিন্তু দার্শনিক-আদার্শনিক শত্রু-মিত্র সবার কণ্ঠে এক রব উঠিল—“না, না, না, জায়গা নেই, অন্য গাড়ি…দোর চেপে ধরো, খবরদার, জানালা তুলে দাও!…”
প্ল্যাটফর্মেও ব্ল্যাক-আউট। বহু দূরে দূরে লম্বা চোঙার মধ্য দিয়া গুটিচারেক আলোর বৃত্ত এখানে ওখানে পড়িয়া আছে স্তম্ভগুলির তলা ঘেঁষিয়া। তাদেরও যেন আশ্রয় জড়াইয়া কোনোরকমে বাঁচিয়া থাকা,—গাড়ির সঙ্গে কোনো সম্বন্ধই নাই।
বাহিরের দলও যেন একটা চাপ বাঁধিয়া গাড়িটাকে আক্রমণ করিয়াছে, ঠিক যেন একটা দুর্গ অবরোধের ব্যাপার, দুয়ারে লাথি, জানলায় ঘুঁষি, হুমকি; এদিকে আবার যা মিনতি আছে তার কারুণ্যে পাষাণ গলিয়া যায়।
একজন লোক হন্তদন্ত হইয়া শেষদিকের জানালায় কয়েকটা টান দিল, কোনোরকম সাড়াশব্দ না হওয়ায় ঝিলিমলির মুখ দিয়া বলিল, “আমি ফার্স্ট ক্লাসের প্যাসেঞ্জার, শিগগির দিন খুলে দয়া করে, জানালা গলেই না হয় ঢুকে পড়ি, একটু সাহায্য করুন, দোহাই…”
জানালা দিয়া নির্লিপ্ত কণ্ঠের স্বর আসিল—“এটা সেকেন্ড ক্লাস।”
“জানি; ফার্স্ট ক্লাসে জায়গা নেই।”
“সে অপরাধ তো সেকেন্ড ক্লাসের নয়।
“খুলবেন না জানালাটা?”
আর উত্তর হইল না।
.
বড় স্টেশন, অবরোধের চাপটা ক্রমেই বাড়িতেছে। ভিতরের প্রতিরোধও আরো উগ্র হইয়া উঠিয়াছে। হঠাৎ একটা বড় টর্চের আলো দুয়ারের উপর আসিয়া পড়িল। ফার্স্ট ক্লাসের যাত্রীটি খুঁজিয়া-পাতিয়া একজন ক্রুম্যানকে ডাকিয়া আনিয়াছে। সে আসামাত্র বাহিরের ভিড় অনুরোধ উপরোধ অনুযোগ লইয়া তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিল। উগ্র প্রয়োজন ভিন্ন আজকাল আর কেহ আর রেলযাত্রা করে না, একটা যেন অবলম্বন পাইল।
ক্রুম্যান আর একবার ভিতরের দিকে টর্চটা ফেলিয়া ভালো করিয়া ঘুরাইয়া লইয়া বলিল- “দোরটা ছেড়ে সরে দাঁড়ান, ভেতরে আসব।”
কয়েকজন ভিতর থেকে রুখিয়াই উঠিল—“এর মধ্যে আর কি করে লোক ঢোকাবেন আপনি?”
কিন্তু আওয়াজে আর সে রকম জোর নাই, বোঝা যায় প্রথমেই যাহারা না-না করিয়া উঠিয়াছিল, তাহাদের অনেকেই নীরব।
ক্রুম্যান ভিতরে ঠেলিয়া উঠিয়া বলিল—“আপনাদের টিকিট!”
প্রথমেই একজন থার্ড ক্লাসের যাত্রী। বলিল-”এটা সেকেন্ড ক্লাস করে দিন।”
“আপাতত আপনাকে নিচে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। যাদের সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট তাদের জায়গা হয়ে বাঁচলে, আপনার ব্যবস্থা করতে পারি।”
নামিতে হইল। তাহার পিছনে পিছনে আরো অনেককে। গম্ভীর নিঃশব্দতার মধ্যে গাড়িটা খালি হইয়া আসিতে লাগিল।
যা অবস্থা; গাড়িতে ওঠায় সত্যই একটা দুর্গ জয়ের আনন্দ হয়। শুধু তাই নয়, একটু বিদ্রূপ, একটু বক্র হাসি দিয়া জয়ের আনন্দটাকে আরো তীব্র করিয়া লইতে ইচ্ছা করে। যুদ্ধের দানব তো শুধু অস্ত্র লইয়াই ব্যাপৃত নয়, তাহার গরলও যে মনে মনে ছড়াইয়া দিয়াছে!…যে লোকটি ক্রুম্যানকে ডাকিয়া আনিয়াছিল সে তখনো প্ল্যাটফর্মে; বিজয় হাতের মধ্যে, নামিবার হাঙ্গাম থামিলে উঠিয়া হাত-পা ছড়াইয়া বসিবে। সেই জানালাটি এখনো বন্ধ, মনে হইতেছে এঁরও এই অবস্থা–হয় থার্ড বা ইন্টার ক্লাস, নয় একেবারে মূলে হাবাত।
একটা অদ্ভুত ধরনের আনন্দ মনে হইতেছে। এই আনন্দও যুদ্ধেরই দান, কতকটা তাহাদের আনন্দের মতো যাহারা চোখের সামনে অনাহারে মানুষের মৃত্যুর পাশে পাশে নিজেদের ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স স্ফীত হইতে দেখিয়াছে। এত বড় যুদ্ধ মানুষের এত জিনিস লইতেছে, প্রতিদানে কিছু নূতন দিবে না?
জানালায় দুটি ঘা দিয়া বলিল—“এবার খুলুন না জানালা মশাই।”
কোনো উত্তর নাই—লোকটি কোণে ঘেঁষিয়া বসিয়া আছে, চিন্তান্বিত, পরাভূত। ওদিকে ক্রুম্যান বাছাই করিতে করিতে অগ্রসর হইয়া আসিতেছে।
হঠাৎ জানালাটা উঠিয়া গেল। ভিতরের লোকটা হাতটা বাহির করিয়া বাহিরের লোকটির হাতটা চাপিয়া ধরিল, বলিল –’বাঁচান, আমায় যেতেই হবে—মেয়েটার ভয়ানক অসুখ… টিকিট কিনতেই পারিনি…টেলিগ্রাম পেয়ে…!”
“ভ্যালা বিপদ! আমি কি করে বাঁচাতে পারি মশাই? আর বাধলও না তো অনুরোধ করতে। তখন যদি জানালাটা খুলে দিতেন তাহলে তো আমি ক্রু ডাকতে যাই না…”
“একটুও জায়গা ছিল না; তা ভিন্ন মনের অবস্থাও খারাপ। তার ওপর ভিড়ে অন্ধকারে আর প্রত্যেক স্টেশনেই লোক ঠেকাতে ঠেকাতে … “
“কিন্তু আমি কি করে বাঁচাব আপনাকে, রেলের লোক নয় যে…”
ভদ্রলোক হাতটা চাপিয়া ধরিয়াছে, অত্যন্ত ব্যাকুল কণ্ঠে শুধু বলিল, “দেখতে পাব না মেয়েটাকে—দোহাই আপনার…”
এমন সময় ক্রুম্যানের টর্চটা মুখের উপর আসিয়া পড়িল।
“আপনার টিকিট মশাই?”
‘দেখুন—ইয়ে—মানে—টিকিটটা কিনতে….”
.
লড়াইয়ের আবহাওয়ায় মানুষের মাথায় যেন খুন চাপিয়া যায় মাঝে মাঝে; স্বার্থের সংঘাতে যেন হঠাৎ নিজেকে ভুলিয়া যায়, মরীয়া হইয়া পশু হইয়া ওঠে। কিন্তু সে ক্ষণিক, আবার মানুষ নিজেকে লয় চিনিয়া, দুর্গ জয়ের চেয়েও বড় জয়ের কথা মনে পড়িয়া যায় তাহার। ক্ষণিক মৃত্যুর হাত এড়াইয়া সে আবার মানুষ হইয়া বাঁচিয়া ওঠে।
প্ল্যাটফর্মের অন্ধকারে একটা শব্দ উঠিল—“গদাধরবাবু! ও গদাধরবাবু!” যেন কে অন্বেষণ করিতেছে।
গাড়ির লোকটি একটু সচকিত হইয়া ক্রুম্যানের দিক থেকে এদিকে দৃষ্টি ফিরাইল। বাহিরের সেই ভদ্রলোকটি। যেন খোঁজাখুঁজিতে একটু ক্লান্ত এইভাবে অল্প অল্প হাঁপাইতেছে। হাতে একটি ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট; বাড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন—“এই নিন আপনার টিকিট।”
ক্রুম্যান টিকিট চেক করিয়া নামিয়াই গেল।
কুলি হোল্ড-অল আর সুটকেসটা তুলিয়া ফেলিয়াছিল, ভদ্রলোক নামাইতে হুকুম দিলেন। ভিতরের ভদ্রলোকটি বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করিলেন—“আর আপনি? নিজের টিকিটিই তো দিলেন দেখছি—”
সেকেন্ড বেল হইয়া গিয়াছিল পূর্বেই, গাড়িটা ছাড়িয়া দিল। ভদ্রলোক গলা উঁচাইয়া বলিলেন— “ঠিক আছে, ভাবতে হবে না; মেয়েটি কিরকম থাকে কিন্তু একটু খবর দেবেন— সেকেন্ড মুন্সেফ অবলাকান্ত মজুমদার।
