মুনাফা – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

মুনাফা

রাত প্রায় একটায় মোকামাঘাটে আসিয়া নামিলাম।

স্টেশনটা গঙ্গার ধারেই; টানা একটা বারান্দা, তাহার পরেই তীরভূমি ঢালু হইয়া নামিয়া গেছে। নুতন বর্ষার গঙ্গা অনেকখানি উঠিয়া আসিয়াছে, ওয়েটিংরুম হইতে কাকজ্যোৎস্নায় গৈরিকধারার বহুদুর পর্যন্ত দেখা যায়।

ছোট ঘরটি লোকে একরকম ঠাসা, কি উপায় করিব ভাবিতেছি এমন সময় আপ ট্রেনের ঘণ্টা পড়িল। সঙ্গে সঙ্গেই বরযাত্রীদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য পড়িয়া গেল এবং গাড়ি আসিয়া পৌঁছিবার আগেই ঘরটি একেবারে খালি হইয়া গেল। রহিল মাত্র এক মাড়োয়ারি শেঠজি। খুব চাপাচাপির মধ্যে ছিল, ভিড় হালকা হওয়ায় মনের স্ফূর্তিতে একটু অভ্যর্থনাই করিয়া লইল আমায়—“আসেন বাঙ্গালিবাবু, ই জগটা বেশ হাওয়াদার আছে।…উ সবাই বক্তিয়ারপুরের বোরযাত্রী ছিল; সব গঙ্গামাইকি কৃপা।”

দরজাটির মুখে বিছানা করিয়া শুইয়াছিল, আমিও পাশটিতে গিয়া আমার হোল্ড-অল খুলিয়া বিছানাটা পাতিয়া লইলাম। ভদ্রলোক একটু আলাপপ্রবণ, বিছানাটা আর একটু সরাইয়া আনিয়া কথাবার্তা জমাইয়া আনিয়াছে, এমন সময় এই আপ ট্রেনের একজন যাত্রী আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

বেশ অবস্থাপন্ন লোক বলিয়া মনে হইল : আয়েসপুষ্ট বিরাট বপু, ফিনফিনে একটি গলার পাশে-ঘুণ্টি-দেওয়া পাঞ্জাবি, তাহার ভিতরে একছড়া সরু সোনার চেন চিক চিক করিতেছে, হাতে রিস্ট-ব্যান্ড-দেওয়া শৌখিন ঘড়ি, রূপায় বাঁধানো একটি শৌখিন ছড়ি; এদিকে হোল্ড-অল ট্রাঙ্ক, সুটকেস, জলপানের জন্য একটি রূপার ঝারি,’ শরীরের অনুপাতে একটি মোরাদাবাদী ধাতুর টিফিন- কেরিয়ার,—মোট কথা চমৎকার একটি সচ্ছলতার আবহাওয়া লইয়া প্রবেশ করিলেন ভদ্রলোক। নিশ্চয় রিজার্ভ-করা প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীর বার্থে আরামে ঘুমাইতেছিলেন, চোখে ঘুমের জড়িমা লাগিয়া আছে।

সঙ্গে একটি চাকর। বেশ তৎপর। প্রথমেই আসিয়া ওয়েটিংরুমের আরাম কেদারাটা গঙ্গার দিকের বারান্দায় বাহির করিয়া দিল, ভদ্রলোক গিয়া তাহাতে গা এলাইয়া দিলেন, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নাসিকা গর্জন আরম্ভ হইয়া গেল। চাকরটা আসিয়া মোটঘাটগুলা অল্প সময়ের মধ্যেই গুছাইয়া হোল্ড অল খুলিয়া বিছানাটা পাতিয়া ফেলিল, দোরের আংটায়, জানালার গরাদে, দেয়ালে-গাঁথা আলনায় দড়ি বাঁধিয়া একটি পরিষ্কার নেটের মশারি খাটাইয়া দিল, তাহার পর বাহিরে গিয়া বার দুই-তিন গলাখাঁকারি দিয়া খবর দিল—“তৈয়ার বা!”

ভদ্রলোক উঠিয়া আসিয়া শয্যার মধ্যে প্রবেশ করিলেন, চাকরটা বেশ ভালো করিয়া মশারিটা চারিদিকে গুঁজিয়া দিল; প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আবার নাসিকাধ্বনি আরম্ভ হইয়া গেল।

সব লইয়া মিনিট পাঁচেকও লাগিল না; যেন আলাদিনের প্রদীপের একটু ক্ষুদ্র সংস্করণ হইয়া গেল।

এদিকে শেষ হইলে চাকরটা জিনিসপত্রগুলার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করিয়া লইয়া আমাদের দুইজনের দিকে মিনতির দৃষ্টিতে চাহিয়া সেগুলার উপর একটু নজর রাখিতে অনুরোধ করিল।

শেঠজি উৎসাহের সঙ্গে বলিল—“যাও, তুম বেফিকির শো রহো, কোই ডর নেহি।” আমি একটু বিস্মিত হইয়াই প্রশ্ন করিলাম-”কেন সে তো নিজেও শুইয়া থাকিতে পারে—এত দামী জিনিসপত্র রহিয়াছে ঘরের মধ্যে।”

“উত্তরটা শেঠজিই দিল, আমার অজ্ঞতায় জিভটা কাটিয়া চোখ দুইটা একটু বড় বড় করিয়া বলিল—“আরে রাম কহিয়ে বাবুজি, চাকর আর মনিব একটি ঘরে শোবে!—হাজার কল-যুগ হোক।”

চাকরটাকে বলিলেন—“যাও তুমি, কোই ডর নেহি।”

সে চলিয়া গেলে শেঠজি নিদ্রিতের পানে একদৃষ্টে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিল, তাহার পর আমার দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল—“আরাম বোলবেন তো একেই বলুন বাঙ্গালিবাবু, জিন্দগিকে কেমোন ভোগ করছে, ট্রেনে চলেছে, সঙ্গে সঙ্গে যত্তো আরামের ব্যবোস্থা। আর আমাদের কাঁহা দু পয়সা মুনাফা, ছোট্‌ লোটা কম্বল নিয়ে—না খাবার ঠিকানা, না শোবার ঠিকানা।”

আমি একটু হাসিয়া বলিলাম—“মুনাফার পেছনে ছোটাটাই তো আদৎ জিন্দগী শেঠজি, ঘুমিয়ে কাটানো—সে তো তার উল্টো বরং।”

কথাটা মনের মতন হওয়ায় শেঠজির মুখে হাসি ফুটিল, মনটা দ্রব হইল, এবং সেই তরলতার জন্যই বোধ হয় হঠাৎ ধর্মভাব আসিয়া পড়িল, একটু করুণ সুরে বলিল-”লেকিন, কী হোবে বাবু মুনাফা হাঁসিল করে? সঙ্গে লিয়ে যেতে পারব ওখানে?”

আকাশের পানে হাত বাড়াইয়া দেখাইল।

বলিলাম—“কি জানেন, শেঠজি, এইটে হচ্ছে শুরু, এই মুনাফার হিসাব করতে করতেই ওখানে নিয়ে যাবার যুগ্যি মুনাফার হিসেব আসে; ঠিক নয় কি?”

শেঠজি একেবারে বিগলিত হইয়া গেল, বলিল—“যা বোলছেন বাঙ্গালিবাবু তাতে কোন্ ভুল না আছে, লেকিন ওইখানের কথা আমাদের সব সময় অস্মরণ থাকে না, দুনিয়ার মুনাফা নিয়ে মশগুল হয়ে থাকি আমরা। তুলসীদাস কি বলছেন…

তুলসীদাসের পরে আসিলেন কবীর, কবীরের পর সুরদাস, শেঠজি দোহাচৌপাইয়ের অনর্গল স্রোত বহাইয়া চলিল।

.

এদিকে অসম্ভব রকম মশা, অতগুলা মানুষের জায়গায় কুল্যে দুইজন, হন্যে হইয়া আক্ৰমণ লাগাইয়াছে, শেঠজির দিকে কান রাখিয়া তাহাদের তাড়া দিতে দিতে কখন ক্লান্তিবশেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছি, একটা শান্টিং ইঞ্জিনের হুইস্লে হঠাৎ ঘুমটা ভাঙিয়া গেল। রাত্রি খুব গভীর, গাড়ি স্টিমার কিছু নাই, স্টেশনের এদিকটা একেবারে নিস্তব্ধ, শুধু সেই ভদ্রলোকের তৃপ্ত নাসিকাগর্জন; বাহিরের বারান্দা থেকে আর একটি ক্ষীণতর গর্জন দরজার পথে ভাসিয়া আসিতেছে, বোধ হয় তাঁহার চাকরের।

হাওয়াটা নরম হইয়া গিয়া মশার উপদ্রব আরো বাড়িয়াছে, আত্মরক্ষার জন্য একটা পাতলা ওড়ানি ঢাকা দিয়া শুইয়াছিলাম, আরো একটু জুৎ করিয়া টানিয়া লইব এমন সময় হঠাৎ পাশের দিকে দৃষ্টি পড়ায় একেবারে স্থাণুবৎ নিশ্চল হইয়া গেলাম।

আগেই বলিয়াছি আমার পাশেই শেঠজির বিছানা, দরজা পথে হাওয়াটুকুর জন্য চাকরটা তাহার মনিবের বিছানাটি শেঠজির পাশেই করিয়া দিয়াছে, অপেক্ষাকৃত একটু বেশি ব্যবধান ছাড়িয়া। শেঠজি কনুইয়ে ভর দিয়া আধশোওয়া হইয়া ওদিকে মুখ ফিরাইয়া রহিয়াছে, এবং সবচেয়ে যা বড় আশ্চর্য, ভদ্রলোকের মশারির খানিকটা তুলিয়া ধরিয়া গভীর অভিনিবেশের সহিত ভিতরে কি নিরীক্ষণ করিতেছে। ঘুমের ঘোরে এমন অদ্ভুত দৃশ্যে আমার তো মাথা গুলাইয়া গেল, ব্যাপারখানা কি? ছিঁচকে চোর নাকি? সন্দেহ যখন মনে প্রবেশ করিল, ওর কথাবার্তা চালচলন সবকিছুই সেটাকে পুষ্ট করিয়া তুলিল—আমার কাছে বিছানাটা টানিয়া আনা, চাকরটাকে অত ভরসা দিয়া বাহিরে পাঠাইয়া দেওয়া, তারপর এই ধর্ম লইয়া বিটলেমি। প্রথমটা মনে হইল হাতটা চাপিয়া ভদ্রলোককে ডাকিয়া তুলি। তাহার পর ঠিক করিলাম, না, আর একটু দেখাই যাক, যদি যাহা ভাবিয়াছি তাহাই হয় তো একেবারে বামালসুদ্ধ ধরা যাইবে। চাদরটা আস্তে আস্তে মাথা পর্যন্ত টানিয়া নিয়া চুপ করিয়া পড়িয়া রহিলাম।

অদ্ভুত কাণ্ড! শেঠজি মশারিটা নামাইয়া দিয়া খুব সন্তর্পণে উঠিয়া এদিকে প্ল্যাটফর্ম আর ওদিকে গঙ্গার ধারের বারান্দাটা একবার দেখিয়া আসিল, তাহাও কেমন যেন সন্দেহজনকভাবে, ঘরের মধ্যে থেকেই গলা বাড়াইয়া। আমার আগাগোড়া ঢাকা, তাহারই উপর হইতে বেশ ভালো করিয়া আমায় দেখিয়া তাহার পর আবার মশারিটা তুলিয়া ধরিল, এবার একটু বেশি উঁচু করিয়া। অনেকক্ষণ রহিলও একভাবে এবার, ঘুমন্ত লোকটির দিকে এমন ভাবে মাথা অল্প ঝুঁকাইয়া আছে, বেশ বোঝা যায় তীব্র উৎসুক দৃষ্টির একটুও নড়চড় নাই। আমার মাথা গুলাইয়া যাইতেছে; এদিকটা এমন নিস্তব্ধ, মনে একটা ভয় ঠেলিয়া উঠিতেছে—খুনটুন করিবে না তো—নাকে ক্লোরোফর্ম চাপিয়া ধরিতেও পারে— দলবদ্ধ নয় তো? হয়তো সঙ্গীরা বাইরে ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে অপেক্ষা করিতেছে…

.

আর একবার ওইভাবে উঠিয়া, দেখিয়া শুনিয়া, আমার সম্বন্ধেও নিশ্চিন্ত হইয়া মশারিটা তুলিয়া ধরিতেই, আমি আর এদিক ওদিক না ভাবিয়া পিছন হইতে দুইটা হাত চাপিয়া ধরিলাম, মুখটা ফিরাইতেই প্রশ্ন করিলাম—“ব্যাপারখানা কি! তুমি তখন থেকে ভদ্রলোকের মশারি তুলে কি মতলব হাসিল করবার…”

শেঠজি অতিমাত্র বিস্মিত হইয়া আমার পানে চাহিয়া রহিল, আমি যে ঘাপটি মারিয়া পড়িয়া সব লক্ষ করিয়া যাইতেছিলাম যেন বিশ্বাসই করিতে পারিতেছে না, তাহার পর জিভ কাটিয়া চাপা গলায় বলিল—“আরে ছিঃ, বাঙ্গালিবাবু, রাম বলো, কি বোলছেন আপনি! আমার মোতিহারীতে তিনটা গোলা, কোলকাত্তায়, কানপুরে মস্তো কারবার—আরে ছিঃ—হাত ছাড়িয়ে দিন বাবুজি…

হাত ছাড়িলাম না, বলিলাম— ‘কলকাতা – কানপুর-মোতিহারীর খবর জানবার উপায় নেই—কিন্তু চোখের সামনে তখন থেকে যা দেখছি…চাকরকে সরিয়ে দিলে—তারপর ভদ্রলোকের সোনার চেনের দিকে…”

শেঠজি ঘুরিয়া মুষ্টিবদ্ধ অবস্থাতেই ডান হাতটা আমার মুখের ওপর চাপিয়া ধরিল; মুখে নিতান্তই একটা ব্যাকুলতার ভাব, বলিল—“আরে ছিঃ বাবুজি, অমন কোথাটি বোলবেন না, গঙ্গাজীর কিনারা আছে। সরিয়ে আসেন, শুনেন, ভোদ্দোরলোক এখুনি জেগে পড়বে, প্রেমসে ঘুমোচ্চে।”

.

অস্বীকার করিব না, বলিবার ভাবে আমি আবার একটু ভ্যাবাচাকা খাইয়া গেছি, হাত দুইটা ছাড়িয়া দিলাম, দুইজনে আসিয়া আমার বিছানায় বসিলাম।

শেঠজি অসীম করুণার দৃষ্টিতে আমার মুখের পানে চাহিয়া বলিল—“গঙ্গামাইয়ের কিনারা আছে, একবারটি বাহিরের দিকে নজর দিয়া দেখেন আপনি…”

বলিলাম—“তাই যা কিছুই করুন না এখানে, কোনো দোষ লাগবে না?”

“আরে ছি ছি বাবুজি, ওমোন কথা বলবেন না, গঙ্গাজির কিনারা আছে, পুণ্যকা অস্থান, তাই কুছু পরলোকের জন্য হাঁসিল করে নিচ্ছিলো।”

এত বিমূঢ় হইয়া গেছি যে মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না।

শেঠজি বলিয়া চলিল, চোখে-মুখে সেইরূপ অপরিসীম কারুণ্য—“দেখুন বাবুজি মচ্ছরদের ওবোস্থা!—আপনারা বাঙ্গালিরা মোশা বোলেন—এক ঘর মানুষের লেহ খাচ্ছিলো গঙ্গামাইকি কৃপাসে—বড়কা ভোজ—তারপর হম্ দুজোনই রয়ে গেল—আহা-হা-হা! জরাসা ভাবুন!—তারপর আপনি ভি চদ্দর ঢাকা দিয়ে দিলেন—একলা আমি রোগা হাড্ডিসার মানুষ—ভাবুন বাবুজি বেচারিদের ওব্যোস্থাটা! রাজার হাল থেকে কাঙ্গালি বোনে গেল…গঙ্গাজির কিনারা, পুণ্যকা অস্থান, একটু পণ্‌ি হাঁসিল করে নিচ্ছিলো মশারিটি তুলে ধরে—উ জমিদারবাবুর ওতো বোড়ো লাস, দুছটাক লেহু এলেই বা কি, গেলেই বা কি-থোরা ঠিক হিসাবসে ভাবিয়ে দেখেন বাবুজি; আমি মশারিটি তুলে একটু পরলোকের মুনাফা হাঁসিল কোরে নিচ্ছিলো, ব্যস।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *