জামাইয়ের উপকারিতা – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

জামাইয়ের উপকারিতা

দীননাথ বেগুনী লুঙ্গিখানি পরিয়া বাহিরের রকে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়া তৃপ্তমনে গড়গড়া সেবন করিতেছিলেন, এমন সময় বাল্যবন্ধু আশুতোষ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পাশেই একখানি ডেক-চেয়ার, গড়গড়ার নল দিয়া সেইটা নির্দেশ করিয়া দীননাথ বলিলেন—“বোসো, তারপর? – অনেকদিন পরে দেখছি।”

আশুতোষ চেয়ারের পিছনে ঠেকনাটা ভালো করিয়া দেখিয়া লইয়া বসিতে বসিতে বলিলেন—“অনেকদিন পরে।…আরে দেখা হচ্ছে এই ঢের; চাল, নুন, কাপড়, তেলের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতেই দম ফুরিয়ে যায়।…তুমিও তো অনেকদিন যাওনি ও-পাড়ায়।”

দীননাথ হাসিয়া গড়গড়ার নলটা বাড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন—“আরে তোমার তো তবু ফুরুবার মতন দম আছে; আমার আবার ওসবের ওপর ডেলি প্যাসেঞ্জারি।…নাও ধরো।”

আশুতোষ নলটা গ্রহণ করিতে করিতে বলিলেন—“আবার ওটি গছিয়ে দিচ্ছ? একে কুঁড়ে বলে বাড়িতে বদনাম আছেই…আসবার সময়ই গিন্নি টুকে দিলেন—তোমায় পাঠাচ্ছি বটে, কিন্তু নিশ্চিন্দি হতে পাচ্ছি না, ঠিক তুমি কোথাও আড্ডা জমিয়ে….”

দীননাথ বাধা দিয়া বলিলেন—“তুমি চিরকালটা ওদিককার ভয় নিয়েই রইলে আশু, আমাদের বদনাম দেওয়ার ভয়টা আর…”

দুই বন্ধুতে হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। ভিতরকার কথাটা এই যে, আশুতোষের স্ত্রৈণ বলিয়া একটু বদনাম আছে; আসর-আড্ডা জমাইবেন কি, কোনোকালেই তাঁহাকে জোর করিয়াও বেশিক্ষণ ধরিয়া রাখা যায় নাই। আশুতোষ হাসিতে হাসিতেই একটু লজ্জিতভাবে বলিলেন- “তোমাদের ওই এক কথা। আমার হয়েছে এদিকে আস্তাকুঁড়, ওদিকে বড়ঠাকুর—বাড়িতে ওই বদনাম, তোমাদের কাছে এলে…

রবিবার, তাহার উপর অনেকদিন পরে দেখা, সেইসব পুরানো কথা লইয়া দুই বন্ধুতে কিছুক্ষণ হাস্য রহস্যালাপ চলিল, গড়গড়ার নলটা হাত-ফের হইতে লাগিল। শেষবার নলটা বাড়াইয়া ধরিয়া আশুতোষ বলিলেন—“হ্যাঁ, এই দেখো, যার জন্যে আসা সে-কথাটা একেবারেই ভুলে গেছলাম—তবু তোমরা বদনাম দিতে ছাড়বে না; ইয়ে—কাল সকালে ওইখানেই খাবে।”

বেশ একটু অন্ধকার হইয়া আসিয়াছে, তবুও দীননাথের মুখের ভাবটা বন্ধুর দৃষ্টি এড়াইল না, বিস্মিত হইয়াই প্রশ্ন করিলেন—“ও কি দীনো, খাবার নামে হঠাৎ ওরকম হয়ে গেলে যে?”

দীননাথ ততক্ষণে একটা ছুতা ঠিক করিয়া লইয়াছেন, হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলিলেন—“না, খেতে হবে সে তো তোফা খবর হে—তোমাদের দীনোর তেমনই ভোজনবিলাস আছে, বয়স হলে কি হয়; কিন্তু কথা হচ্ছে যাব কখন?—দশটা তেরোয় গাড়ি—তার মানে…”

আশুতোষ বাধা দিয়া বলিলেন—“তোমায় আমি ঠিক সময়েই খাইয়ে দোব, তারপর আমাদের স্টেশনেই উঠে পোড়ো, কাছেও হবে, পনেরো মিনিট বেশি সময়ও পাবে। না ভাই, যেতেই হবে; ছেলেটার অন্নপ্রাশন–বুড়ো বয়সের ছেলে—আর কত ভেঙে বলব তোমায়?…যাবে; না গেলে ভয়ানক দুঃখ হবে আমার ভাই…”

দীননাথ ততক্ষণে আরো সামলাইয়া লইয়াছেন, হাসিয়া বলিলেন- “যাব হে যাব, তুমি অত করে বলছ কেন? আমার নিজের টান নেই?—চেকরে মানুষ, তাই একটু ভাবিয়ে তুলেছিল; আর ছেলের ভাত, একথা বলোওনি তো আগে। মোদ্দা যত শিগগির ছেড়ে দিতে পারো আমায়।”

“আটটার সময় গেলেও তোয়ের পাবে, সাড়ে আটটায় আমাদের দুলুর গাড়ি যে। মোদ্দা দেখো—হ্যাঁ!”

.

আশুতোষ চলিয়া গেলে দীননাথ মনের আক্রোশ মিটাইয়া খুব একচোট বকিয়া গেলেন—কখনো বা মনে-মনেই, কখন একটু স্পষ্টভাবে; নাও, নেমন্তন্ন করে গেলেন!…তোমার আর কি বাবা,—বাপ নগদ টাকা রেখে গেছে, পায়ের ওপর পা দিয়ে খাচ্ছ, কত ধানে কত চাল একটু খতিয়ে দেখবার তো দরকার হয় না। শখের প্রাণ, বুড়ো বয়সে বিয়ে করলে, গিন্নিও বছর না ঘুরতে একটি করে সাপ্লাই করে যাচ্ছেন—স্ফূর্তি করে অন্নপ্রাশন দিয়ে যাচ্ছ।…তা দে না বাপু, টাকা আছে, আরো কষে বিয়ে কর, মাসে একটা করে অন্নপ্রাশন লেগে থাক বাড়িতে, কিন্তু আমাদের এর মধ্যে টেনে আতান্তরে ফেলিস কেন?…এখন কি করি বলো তো? বাবু তো লম্বা লম্বা পা ফেলে এসে ছেলের অন্নপ্রাশনের নেমন্তন্ন করে গেলেন। না বাবা, এ খেটে খেতে হচ্ছে, আছি ভালো, পরের সুবিধে-অসুবিধে যে কোথায়— দুনিয়া যে কি চালে কখন চলছে, অন্তত সে খোঁজটুকু রাখি। ওঁর আর কি? পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে খাচ্ছেন আর নেমন্তন্ন করে বেড়াচ্ছেন।

খানিকটা বকিয়া গিয়া মনটা একটু হালকা হইল, তাহার পর নীরবে খানিকক্ষণ একটানা গড়গড়া টানিয়া একটু নরমও হইল, শান্তভাবে একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন—করেই বা কি? আর অন্যায়টাই বা কি করেছে যে এত করে বলছি?…আহা বেচারা আশু!—কোনো কাজটিতে কখনো বাদ দেয় না! আর কেউ হোক না হোক, দীনোর আসা চাই-ই। ছেলেবেলার বন্ধু বলে কেই-বা এমন করে মনে করে রাখে বলো? আশুর মতন যাদের টাকা তাদের তো আরো মনে থাকে না। সব বুঝি কিন্তু তবুও বলি—ফ্যাসাদে ফেললে হে ভাই আশু…

আরো খানিকক্ষণ চুপ করিয়া গড়গড়া টানিতে লাগিলেন, তাহার পর আবার স্বগতোক্তি আরম্ভ হইল,—না হয় কাটিয়েই দোব? তাও তো হয়—শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল—কিংবা ধরো বড়বাবু হঠাৎ একটা লোক পাঠিয়েছিল, ভোরের ট্রেনেই বেরিয়ে যেতে হল—এমন হয়েছেও তো দু’একবার, আশু জানে; কিংবা গিন্নির বুক ধড়ফড়ানি ডাক্তার ডাকবার মতন অবস্থা—তাও আশুর জানা; কিংবা

একটু চেষ্টা করিতে একরাশ এইরকম অজুহাত হাতের কাছে আসিয়া পড়িল। — ম্যাকআর্থার ইন্ডিয়া লিমিটেডের একটি সেকশনের চার্জে দীননাথ—কুড়ি টাকায় আরম্ভ করিয়া আজ মাস গেলে দুশোটি টাকা ঘরে আনিতেছেন, মাথার অভাব নাই তো; কিন্তু অজুহাতগুলি সবই বড় হালকা ঠেকিল। এরকম হালকা একটা ছুতা করার আর একটা বিপদ এই যে বন্ধু মনে করিবে, ওই যে নিমন্ত্রণে গিয়া দুটো টাকা মুখ দেখানি দিতে হইবে, দীননাথ সেইটা ফাঁকি দিবার মতলব আঁটিয়াছে; বিপদ কি একরকম?…তাও যদি ছেলেপুলে কেহ একজন বাড়িতে থাকিত তাহাদের হাতে টাকা দুটো পাঠাইয়া স্বচ্ছন্দেই একটা ছুতা করিয়া বসিয়া থাকা যাইত—কপালদোষে ছোটটি মামার বাড়ি গিয়া বসিয়া আছে, বড়-হাবুলটি…

এইখানে আসিয়া দীননাথের চিন্তাস্রোত এক জায়গায় দাঁড়াইয়া ঘুরপাক খাইতে লাগিল। হাবুল কাল শ্বশুরবাড়ি গেল; সকাল থেকেই গোছগাছের ধুম পড়িয়া গিয়াছিল, অফিস যাওয়ার ব্যস্ততার মধ্যেই দীননাথ মাঝে মাঝে লক্ষ করিতেছিলেন—গ্লেজকিডের নিউকাট জুতাটি প্রাণের সব দরদ দিয়া দুলিয়া দুলিয়া পালিশ করিতেছে; একবার সাইকেলে বোঁ করিয়া ধোবার বাড়ি হইতে একটা হাতকাটা গেঞ্জি, গোটা দুই গিলা-করা পাঞ্জাবি আর তিনখানি ধুতি লইয়া আসিল, অফিসে বাহির হইয়া যাইবার সময় চোখে পড়িল—পড়িবার ঘরে চৌকির উপর বসিয়া বিপুল উৎসাহে নাকমুখ খিঁচাইয়া কোঁচার ভাঁজ পালিশ করিতেছে…। একটা দিনও যদি হতভাগা দেরি করিয়া যায় তো এতটা দুর্ভাবনায় আর পড়িতে হয় না।

হাবুলের জামাই-বেশ থেকে দীননাথের হঠাৎ নিজের জামাইয়ের কথা মনে পড়িয়া গেল। দেখিতে দেখিতে চোখ দুইটা উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটিল—এত ঘন ঘন তামাক টানিতে লাগিলেন যে, যেটুকু বা অবশিষ্ট ছিল পুড়িয়া ছাই হইয়া গেল; দীননাথ কন্যাকে ডাকিলেন—“চিনু-মা, শিগগির ছিলিমটা আর একবার সেজে নিয়ে আয় তো; শিগগির…”

কুড়ি টাকাকে দু’শ টাকার পরিণত করিতে এই মন্ত্রীই মাথায় বুদ্ধির কুণ্ডলী পাকাইয়া বহুৎ সাহায্য করিয়াছে, যতক্ষণ না আসিল দীননাথ ব্যস্তভাবে রকটাতে পায়চারি করিতে লাগিলেন। জামাই গোবিন্দের ছবিটি চোখের সামনে জ্বলজ্বল করিতেছে—জোড়ে গাড়ি হইতে নামিল, কি ফিটফাট। ঢিলা মালকোঁচা করিয়া কাপড় পরা, সেলুনে চুল ছাঁটা, গায়ে পাশ-বোতাম পাঞ্জাবি, হাতে একটা সুটকেস। ওঁদের যুগে জামাই হাতে একটা কুটা তুলিতেও লজ্জা পাইত, আজকাল জামাইয়ের একটা সুটকেস থাকিবেই—তাহাতে তাহার কাপড়চোপড় তোয়ালে, আরশি-চিরুনি, টুথব্রাশ। ইহারা যে আত্মসম্পূৰ্ণ, সদা-প্রস্তুত স্মার্ট, এ যুগটাই যে আলাদা। তামাক আসিয়া গড়গড়ার মাথায় নিজের জায়গাটিতে গুছাইয়া বসিলে, তিনিও নিজের আসন গ্রহণ করিলেন। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরিয়া গভীর মন্ত্রণা চলিল, দীননাথের চোখমুখ ক্রমেই অধিকতর উজ্জ্বল হইয়া উঠিতেছে। শেষে একসময় চেয়ারের হাতলে একটা চড় মারিয়া বলিলেন—“যাব, যায়েঙ্গা!…তোমার ছেলের অন্নপ্রাশন আশু, আর আমি যাব না—এ কি একটা কথা! ষষ্ঠীপুজো মাকালপুজো বাদ দিইনি, আর এ একেবারে ছেলের অন্নপ্রাশন—কী যে বলে সব!…

হাঁকিলেন—“চিনু, তোর মাকে একবার ডেকে দে তো মা!”

স্ত্রী আসিলে বলিলেন—“হ্যাঁগা, জামাই সেই জোড়ে একবার এসেছিল তারপর কতদিন আসেনি?”

স্ত্রী একটু বিস্মিতভাবেই বলিলেন—“কতদিন কি গো! বিয়েই তো হয়েছে সবে এই দিন কুড়ি হল, আট দিন পরে জোড়ে এসেছিল, তিন দিন ছিল। হিসেব করে দেখো না কতদিন আসেনি তাহলে। …তা হঠাৎ জামাই আসার কথা?”

“নতুন জামাই, কোশখানেকের মধ্যে বাড়ি, জোড়ের পর এতদিন আনা হয়নি, তোমার কম মনে হল? আর এই আসাই তো হবে আসল শ্বশুরবাড়ি আসা, জোড়ের আসা সে তো একটা পদ্ধতি—তা ধরতে গেলে তো বিয়ে করতে আসাও ধরে বলতে হয় জামাই দু’বার এসে গেছে।”

হঠাৎ এই অসময়ে জামাইয়ের প্রতি এত দরদে স্ত্রী আরো বিস্মিত হইয়া গেছেন, বলিলেন—“তা ডাকিয়ে আনাও না বাপু, আমি কি মানা করছি, না, আমার অসাধ? এতদিন বলোওনি তো!”

“নাও, উল্টো চাপ। তুমি বাড়ির গিন্নি, আমায় মনে করিয়ে দিতে হবে? আমি হলাম ডেলি প্যাসেঞ্জার; বলে হাজারটা রাস্তার কুকুর মরে একটা ডেলি প্যাসেঞ্জার হয়—আমার সঙ্গে বাড়ির কতটুকুই বা সম্বন্ধ? খোকাটার কথা ফুটলে তোমাকেই কোনো রবিবারে বলবে–বাগানের মুনিষ নাইবার জন্যে তেল চাইছে।”

“বেশ আমারই দোষ, তক্কে তো এঁটে উঠতে পারব না, মেনে নিচ্ছি; তা কি করতে হবে?”

“হঠাৎ তামাক খেতে খেতে মনে পড়ল কথাটা ডেকে বলে দিলাম, যা ঠিক হয় তাই করো।”

“এটা যেন রাগের কথা হল।…বেশ হাবুল আসুক ফিরে, বলে পাঠাচ্ছি।”

“এর সঙ্গে হাবুলের কি সম্বন্ধ আমার তো বুদ্ধিতে আসছে না; হাবুল তার নিজের শ্বশুরবাড়ি গেছে, তোমার জামাই তার নিজের শ্বশুরবাড়ি আসবে…

“হাবুলের মনে কষ্ট হবে না? জোড়ের পর ভগ্নীপতি প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি এল….”

“সেটা তার পক্ষে কষ্টের কথা?”

“কি জ্বালা–সে যে থাকছে না গো! কথা শেষ করতে দেবে না, তক্ক!”

“মেয়েদের কথা শেষ করতে দিলে কাজ আরম্ভ করবার সময়ই পাওয়া যেত না দুনিয়ায়- বাসর্বস্বই তো তোমরা?…হাবুল কাল গেছে; কাল, না হয় পরশু আসবেই; তোমার জামাই যদি কাল সকালে আসে অন্তত দিন তিনেক তো থাকবেই—হাবুলের সঙ্গে দেখা হয় কিনা হিসেব করে দেখো না—”

“কাল সকালেই?”

“হাবুলেরও পাঁচদিন ছুটি, গোবিন্দরও পাঁচদিন ছুটি; হিসেব না করে বলিনি; ওর কলেজ, এর না হয় কাছারি।”

“তাহলে তো দেখছি এক্ষুনি বলে পাঠাতে হয়। আর সত্যিই তো, কাল সকালে যদি আসেন জামাই, তাহলেও কোনোরকমে তিনটে দিন পুরো হয়। কি করি তাহলে?”

“কোন্ ন’শো পঞ্চাশ কোশ দূর? একটা চিঠি লিখে দাও বেহানকে, হারাধনকে দিয়ে পাঠিয়ে দাও।…একটু দিব্যিটিব্যি দিয়ে, কাকুতি-মিনতি করে লিখো যেমন লেখা উচিত, আর লিখবে, আমি সকাল আটটার সময় বেরিয়ে যাব, খুব ইচ্ছে বাবাজীকে একবার দেখে যাই, কাল নাও ফিরতে পারি। ওটুকু না জুড়ে দিলে খাইয়েদাইয়ে দুপুরের পর পাঠাবে। আর…”

একটি বিশেষ ধরনে স্ত্রীর পানে চাহিয়া খুব সূক্ষ্মভাবে একটু হাসিলেন। স্ত্রীও ততটুকুই হাসিয়া বলিলেন—“আর বলতে হবে না, বুঝেছি।”

—বুঝিবার কথাটা এই যে, কন্যাও যেন লুকাইয়া জামাইয়ের জন্য একখানা চিঠি হারাধনের হাতে দিবার সুযোগ পায়; তাহা হইলে ব্যবস্থাটা একটু পাকা হয় আর কি।

.

কাহার চিঠিতে বেশি কাজ হইল বলা যায় না, তবে পরদিন সকাল আটটার সময় জামাই গোবিন্দ আসিয়া উপস্থিত হইল। বেগুনে লুঙ্গিটি পরিয়া মুখে যথাসম্ভব নিশ্চিন্ত ভাব ফুটাইয়া খুব চিন্তিতভাবে দীননাথ রকে বসিয়া তামাক সেবন করিতেছিলেন এবং আড়চোখে ঘন ঘন ঘরের ভিতরকার ঘড়িটার দিকে দৃষ্টিপাত করিতেছিলেন; গোবিন্দ সুটকেস হাতে গাড়ি হইতে নামিয়া যখন প্রণাম করিল, তখন দেখিলেন ঠিক কাঁটায় কাঁটায় আটটা। আশীর্বাদ করিয়া ধীরে ধীরে একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস মোচন করিলেন।

গোবিন্দ ভিতরে চলিয়া গেলে দীননাথ হিসাবটা করিয়া লইলেন। এখন আটটা, গাড়ি দশটা তেরোয়, তাহা হইলে দু ঘণ্টা তেরো মিনিট সময়। ও তেরোটা মিনিট হাতে রাখিয়া দু ঘণ্টা ধরাই ভালো। আশুর বাড়ি যাইতে দশ মিনিট, আসিতে কুড়ি মিনিট—তাহার সম্বন্ধে এখনো দীননাথের একটু দুর্বলতা আছে, না-না করিয়াও একটু চাপ হইয়া যায়ই; এই গেল আধ ঘণ্টা। আহারে আধ ঘণ্টা, এই পুরো এক ঘণ্টা। তাহার মানে যদি ঠিক সাড়ে আটটায় সময় বাহির হইতে পারা যায় তো সাড়ে নটায় ফিরিয়া আসা চলে। ওদিকের স্টেশন দিয়া যাওয়া চলে না, তাহার মানে তো পেন্টুলুন পরিয়া নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাওয়া, তাহা হইলে কিই-বা দরকার ছিল এত কাঠখড় পোড়াইয়া গোবিন্দকে ডাকিয়া আনার? তাহা হইলে আসিয়া তাড়াতাড়ি অফিসের পোশাক পরিয়া একটু জিরাইয়া লইয়া স্টেশনে পৌঁছিতে আধ ঘণ্টা হাতে থাকিবে; যথেষ্ট, ওই তেরোটা মিনিট তো রহিল…।

মিনিট দশেক অপেক্ষা করিতে হইল। তাহার পর দীননাথ ভিতরে গেলেন। গোবিন্দ জামা-জুতা পরিয়াই ভিতরের রকে একটা আসনে বসিয়া শাশুড়ির সহিত গল্প করিতেছিল, দীননাথ ঢুকিয়াই একটু হাসিয়া ব্যস্তভাবে বলিলেন—“যা ভেবেছি; গল্প পরে হবে’খন, এখন ওকে ছেড়ে দাও, জামা-জুতো ছাড়ুক, যাও বাবাজী, ওঠো…নিয়ে যা ঘরে চিনু।”

ছোট শালী চিনু সঙ্গে করিয়া পাশের ঘরে লইয়া গেলে একটু চাপা গলায় অথচ যাহাতে গোবিন্দ শুনিতেও পায়, এইভাবে স্ত্রীকে যেন সতর্ক করিয়া দিবার ভঙ্গিতে বলিলেন—“ওদের একেবারে ঘড়ি ধরে কাজ করা অভ্যেস, ছেলেবুড়ো, মেয়েমদ্দ— সবার? কেন, তোমায় তো বলেছিলাম এর আগে!”

হঠাৎ এই তাড়াহুড়ার ভাবে স্ত্রী একটু বিমুঢ়ই হইয়া গিয়াছেন; কিছু না বলিয়া সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে মুখের পানে চাহিয়া রহিলেন।

দীননাথ বলিলেন—“ঠিক ঘড়ি ধরে সাড়ে আটটার সময় স্নান করতে যাবে, তারপর পুজো —সাড়ে নটা পর্যন্ত, তারপর…

গৃহিণী যেন চমকিয়া উঠিলে, বলিলেন— ‘পুজো কি গো!”

বেশ চাপা গলায় বলিবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও বিস্ময়ের আধিক্যে কথাটা গোবিন্দর কানে পৌঁছিয়া গেল। শ্বশুরের কথাগুলাও পৌঁছিয়াছে, সে একটু অন্যমনস্ক ভাবেই শালীর সঙ্গে গল্প করিতে করিতে জুতার ফিতা খুলিতেছিল, আরো সতর্ক হইয়া কান খাড়া করিল।

শ্বশুর বলিতেছেন—চাপা গলাতেই—“পুজো কি গো মানে?…বাইরে বাইরে অমন বলে? ভয়ানক সাত্ত্বিক বংশ, সন্ধ্যেআহ্নিক পুজো না করে জল খায় না। দেখতে পেলে না মুখটা শুকনো? গোবিন্দর আবার বেশি বেশি যে, প্রায় ঘণ্টাখানেকের কাছাকাছি …

গোবিন্দর মুখটা শুকাইয়া গেল, শালীটি ছোট, বছর আষ্টেকের, খুব উৎসাহের সঙ্গে নূতন জামাইবাবুর সঙ্গে গল্প করিতেছিল, গোবিন্দ হাত উঁচাইয়া তাহাকে থামিতে ইশারা করিল।

শাশুড়ি আরো চাপা গলায় প্রশ্ন করিলেন—“সত্যি?” বিশ্বাস করিতে পারিতেছেন না।

শ্বশুর ওঘরে কথাবার্তা বন্ধ হইয়া যাওয়ায় গলাটা আর একটু চাপিয়া দিলেন—“গরদ পরে সুতি কাপড় পরবে না…ভয়ানক সাত্ত্বিক বংশ যে…”

তাহার পর বাহিরে যাওয়ার শব্দ হইল।

গোবিন্দর মাথায় যেন বজ্রাঘাত হইল। যথাপদ্ধতি চা টোস্ট ডিম সাঁটাইয়া বাহির হইয়াছে, শাশুড়ি নিশ্চয় এইবার লক্ষ করিবেন, মুখ শুকনো না দেখিয়া কি মনে করিবেন ভাবিয়া মুখ শুকাইয়া গেল। তারপর পূজার যে ‘প’ পর্যন্ত জানে না সে, কোন্ মুখে বসিতে হয় তাহা পর্যন্ত নয়—গরদ পরিয়া এক ঘণ্টা বসিয়া বসিয়া কি করিবে? গতবার জোড়ে যখন আসিয়াছিল, এ বিপদের তো সম্মুখীন হইতে হয় নাই। আর শ্বশুর এসব তত্ত্ব কি করিয়া সংগ্রহ করিলেন? কে এইসব মিথ্যা সংবাদ দিয়া গোবিন্দর সঙ্গে শত্রুতা করিল? উপায় এখন?

শালী ঠাট্টা করিয়া বলিল—“জামাইবাবুর জুতোর ফিতে আজ খুলবে না?”

গোবিন্দর সম্বিৎ হইল—“অ্যাঁ?…এই যে”—বলিয়া তাড়াতাড়ি জুতো জোড়া খুলিয়া জামা খুলিল, তাহার পর হাতের ঘড়িটা দেখিয়া বলিল—“ওঃ, দেরি হয়ে গেল তো!”

শাশুড়ি আসিয়া উপস্থিত হইলেন, একটু অপ্রতিভ ভাব—এমন জামাইকে এতদিন অমন ভাবিয়াছিলেন! সামনে আসিতেই কুণ্ঠা বোধ হইতেছে। দোরের পর্দার পাশে দাঁড়াইয়া বলিলেন—“উনি এইমাত্র বলছিলেন—তোমাদের বাড়িতে সব ঘড়ি ধরে কাজ; আমি কি জানি বাবা…তা বাথরুমে সব তোয়ের আছে—জলও তোলা আছে, আর নেয়ে উঠে নাকি পূজা-আহ্নিক? …”

গোবিন্দ অত্যন্ত লজ্জিতভাবে মুখ নিচু করিয়া একটু হাসিল।

শাশুড়ি স্বামীর কথার প্রমাণ পাইয়া আরো কুণ্ঠিত হইয়া উঠিলেন,—দেখো বাবা! কেউ বলে তবে তো…উনি বলছিলেন সুতির কাপড় পর্যন্ত পুজোর সময় পরো না, আর জোড়ে এসে এসব কিছুই বন্দোবস্ত করা হয়নি গা!…বেয়ান শুনলে কি ভাববেন! … ‘

গোবিন্দ ঈষৎ হাসিয়া বলিল —“না, তার জন্যে কি হয়েছে? ভেবেছিলাম এখানে ব্যবস্থা নেই; বললেই আপনারা বিব্রত হয়ে পড়বেন, তাই বলিনি।”

“ওমা, ব্যবস্থা নেই কি বাবা! তোমার শ্বশুরেরই এ-পাট নেই, তা বলে হিদুর বাড়িতে পুজোর ব্যবস্থা থাকবে না? চিলেকোটার পাশে দস্তুরমতো পুজোর ঘর রয়েছে, সে কি কথা!…নাও আর দেরি কোরো না, সাড়ে আটটা বাজতে আর কত দেরি বাবা?”

পুজোর ঘরটা নিরিবিলিতে একবার চিলেকোটার পাশে শুনিয়া গোবিন্দর খানিকটা উৎসাহ আসিয়াছে, হাত উল্টাইয়া ঘড়ি দেখিয়া বলিল—“এখনো মিনিট দশেক সময় আছে। আর পাঁচ-দশ মিনিট এদিক ওদিক হলে আর ক্ষতি কি মা? ছুটির দিন—আপনি ব্যস্ত হবেন না।”

দীননাথ আসিয়া দাঁড়াইলেন, গৃহিণীকে বলিলেন—“কাপড়-গামছা বের করে….

গোবিন্দ বলিল—“আজ্ঞে, সব রয়েছে!” বলিয়া পাছে কাপড়-গামছা দেওয়া হয় সেজন্য তাড়াতাড়ি সুটকেস খুলিয়া ধুতি তোয়ালে বাহির করিয়া ফেলিল। আজকালকার ছেলে খুব স্মার্ট যে এসব বিষয়ে।

শ্বশুর গৃহিণীকে বলিলেন—“ওকে ততক্ষণ একটা গরদ বের করে দাও।”

হাসিয়া বলিলেন—“ভটচার্যির বেটার আমার আবার এক ঘণ্টা ধরে পুজোর হিড়িক আছে যে!… ওই যে এ সেদিন আমায় বললে—কি যে ভালো নামটি ভুলে যাচ্ছি।…এযুগে আর এসব কেন বাবা?

গৃহিণী ধমক দিয়া বলিলেন—“না, সবই তোমার মতন হবে: বুড়ো আঙুলে একবার পৈতে জড়াতেও কখনো দেখলাম না…”

স্বামী হাসিতে লাগিলেন, বলিলেন—“তুমি গরদটা বের করে দাও গে।…চিনু গোবিন্দর কাপড়টা ততক্ষণ কুঁচিয়ে রাখ…পারবিনি?—না হয় আয় বাইরের ঘরে কি রকম করে কাপড় কুঁচুতে হয় শিখিয়ে দিই…তুমি যাও গো, বাবাজী যাও…না, ভালো ভালো, ঠাট্টা করছি বলে কি আর সত্যিই বলছি?… বাচস্পতির বংশ তোমাদের…”

.

ম্যাকআর্থার কোম্পানির একটা সেকশনের ইনচার্জ—টাকা আছে, কড়ি আছে, বাড়ি আছে, বিষয় আছে, প্রতিপত্তি আছে; নিদারুণ; কন্ট্রোলের বাজারে নাই শুধু কাপড়, একটি যাহা ছিল, ছেলে লইয়া শ্বশুরবাড়ি গেছে, তাহাকেও সেখানে স্মার্ট হইতে হইবে তো? সে-ও তো জানে শ্বশুরের কাছে কাপড়ের ভরসা করিয়া শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার যুগ আর নাই। দীননাথ বাহিরের ঘরে গিয়া একটা ছুতা করিয়া চিনুকে সরাইয়া দিলেন; বড় মেয়ে আর স্ত্রী ওদিকে নবাগতের আয়োজনে ব্যস্ত।…জামাই যখন বাথরুমে ঢুকিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, শ্বশুর তখন তাহার কাপড়াটি তাড়াতাড়ি কোঁচাইয়া পরিধান করিতেছেন।

মোটে একটা ঘণ্টা সময়, তাহার মধ্যে ফিরিয়া আসিয়া খুব সন্তর্পণে লুঙ্গিটা পরিয়া কাপড়খানি কোঁচাইয়া আলনায় টাঙাইয়া বলিতে হইবে—“কইরে চিনু, গোবিন্দ এখনো নামেনি নাকি ওপর থেকে?”

চিনু বলিবে—’না তো বাবা।”

দীননাথ বলিবেন—“হু”, তাই তো দেখছি, কাপড়টা এখনো নিয়েও যাসনি!”

চিনু বলিবে—“তুমি যে দোরে তালা দিয়ে নেমন্তন্ন খেতে চলে গিয়েছিলে বাবা?”

দীননাথ বলিবেন— ‘হ্যাঁ, তাও তো বটে; যা তাড়াহুড়োর মধ্যে যাওয়া, খেয়ালই ছিল না। তা নিয়ে গিয়ে ওই ঘরেই রেখে দে, নয়তো আবার ওইরকম ভুল হলেই চিত্তির!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *