জাগ্ৰত
আবার রাতদুপুরে গুরুচরণ আসিয়া ডাকাডাকি আরম্ভ করিল। দরজা খুলিয়া দেখি সেইরকম আতঙ্কে চক্ষু দুইটা ঠেলিয়া আসিয়াছে, ঠোট দুইটা অল্প বিভক্ত, চুল উস্কখুস্ক, বলিলাম—“ফীট-অব-প্রিসেপটার যে! হঠাৎ কি মনে করে?”
গুরুচরণ ভিতরে আসিয়া নিজে হইতে দোরটা অর্গলিত করিয়া হুড়কাটা একবার নাড়িয়া দেখিল, তাহার পর ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল—“আবার এক ফ্যাসাদ বাধিয়েচে মশাই, দিনকতক ডুব না দিলে চলছে না; চলুন ভেতরে, সব বলছি।”
গুরুচরণ হিন্দিতে যাহাকে বলে “হরফন্দ” সেই জাতীয় লোক, ঘটকালি, হোমিওপ্যাথি, অর্ডার সাপ্লাই, কোষ্ঠী রচনা প্রভৃতি হরেকরকমের ফন্দি করিয়া দিন গুজরান করে। এদিকে কলিকাতায় মার্কিনী সৈন্যদের ছাউনি পড়া পর্যন্ত তাহাদের নানাভাবে চরাইয়াও বেশ দু’পয়সা করিতেছে, মাঝে মাঝে কাহারও বিরাগভাজনও হইয়া পড়ে, একটু গা-ঢাকা দিয়া খোঁজ লইতে থাকে, তাহার পর সে অন্যত্র বদলি হইয়া গেলে আবার গিয়া নূতন মানুষ পাকড়াও করে। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের সম্বন্ধ ধরিয়া ওরা এখানকার গুরুবাদে একটু শ্রদ্ধান্বিত, সেইজন্য গুরুচরণ ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া নিজের নাম রাখিয়াছে ফীট-অব-প্রিসেপটার।
ঘরের মধ্যে আসিয়া গুরুচরণ হাতের ক্যাম্বিস ব্যাগটা টেবিলের উপর রাখিয়া একটা চেয়ারে বসিল, বলিল—“বাধিয়েছে আবার এক ফ্যাসাদ মশাই!”
প্রশ্ন করিলাম—কি রকম?
গুরুচরণ মুখটা একটু নিচু করিয়া চুপ করিয়া রহিল, বেশ একটু বিরক্ত ভাব, তাহার পর হঠাৎ দৃষ্টি তুলিয়া বলিল—“অনেক দেশের অনেক রকম লোক দেখলাম মশাই এই লড়াইয়ের হিড়িকে, কারবারও করলাম অনেকের সঙ্গে, কিন্তু এই অ্যামেরিকানগুলোর মতন এমন ব্যাদড়া মানুষ চোখে পড়ল না, সবাইয়ের ওপর টেক্কা দিয়ে ওদের কিছু করা চাই। ফটো নিচ্ছিস—নে, কালীঘাট থেকে আরম্ভ করে একরাশ মন্দিরের ফটো তুলিয়ে দিলুম, কিছু কিছু বিগ্রহেরও। তাতে আশ মিটল না, আমায় তোমাদের কোনো জাগ্রত দেবতার ফটো নিতে একটু সাহায্য করো মিস্টার ফীট-অব- প্রিসেপটার।”
একটু বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করিলাম—“জাগ্রত! পেলে কোথায় কথাটা?”
“আমারই দুর্মতি মশাই, কোন্ একটা মেয়ের সঙ্গে ‘লভ’ করেছে, একটা কবচ চাইলে। লোভ বড় পাপ মশাই, ভাবলাম একটা মোকা এসেছে ভালো করে কিছু ভেঁড়েমুসে নিই, এসব দিন তো আর ফিরে আসবে না। বললাম—“সায়েব, কবচ দুরকম হয়—যদি কোনো হেঁজি-পেঁজি দেবতার কবচ নাও, তাতে চান্স শতকরা পঞ্চাশ থেকে পঁচাত্তর; না, যদি একেবারে পাকা ব্যবস্থা করতে চাও, শতকরার মধ্যে শতকরা, তো কোনো জাগ্রত দেবতার কবচ গড়তে হবে আমায়, কিন্তু খরচেও ওটা যদি পঞ্চাশে সারতে পারি তো জাগ্রত দেবতার কবচ একশ টাকার কমে হবে না।’ বেটার নাম ওয়েকফিল্ড, ঢ্যাঙা, ডিগডিগে চেহারা, বললে——না, মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, মিস রেনকে আমি আকণ্ঠ ভালোবেসে ফেলেছি, তুমি কোনো সেইরকম দেবতারই কবচ বানিয়ে দেও। পাঁচখানি দশ টাকার নোট টেবিলের ওপর বিছিয়ে দিয়ে বললে—’এই তোমার আগাম, কাজে লেগে যাও।’ কয়েকদিন গেল, একদিন এসে বাকি পঞ্চাশটি টাকা রেখে শেকহ্যান্ডের চোটে হাত আমার ছিঁড়ে ফেলে আর কি—’মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, আশ্চর্য তোমাদের এই জাগ্রাটা গডেস! মিস রেন রাজি, ছুটি পেলেই অ্যামেরিকায় গিয়ে আমরা বিয়ে করব।’…তারপর থেকেই ঝোঁক গিয়ে পড়ল ওই জাগ্রত দেবতার দিকে একটু দরকার পড়লেই—’তোমাদের কোনো জাগ্রাটা গডেসকে দিয়ে আমার এই কাজটুকু করিয়ে দাও মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার।’—আপনি সদ্ ব্রাহ্মণ, আপনার কাছে নুকোব না মশাই, দাঁও বুঝে আমিও দিলাম রেট ডবল করে, আর মা-কালীর কৃপায় কেমন একটা পড়তা পড়ে গেল, যাতেই হাত দিই ফলে যায়; বেশ দু’পয়সা হাতে আসতে লাগল।
এই করে তো চলুক, বেটার হঠাৎ ঝোঁক উঠল জাগ্রত দেবতাদের ফটো নিতে হবে। একদিন হঠাৎ এসে হাজির—“মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, তোমাদের ওয়ান্ডারফুল জাগ্রাটা ডিইটির যা সব ব্যাপার দেখলাম তাই নিয়ে আমি অ্যামেরিকান ম্যাগাজিনে একটা প্রবন্ধ লিখতে চাই—কতকটা লিখেওছি, এখন গোটাকতক ফটো পেলে প্রবন্ধটা দামী হয়, তুমি আমায় এ বিষয়ে সাহায্য করো।’
চক্ষু একেবারে চড়কগাছ মশাই! ফটোর ব্যবস্থা আমি কি করে করব? মন্দিরের ফটো নেওয়া চলে আড়ে আবডাল থেকে, কিন্তু বিগ্রহের ফটো কি কেউ টপ করে নিতে দেয় মশাই? টের পেলেই দরজা বন্ধ করে দেয়, ম্লেচ্ছ কাণ্ড তো! সবাই পছন্দ করবে কেন? তবুও আশেপাশের কতকগুলো শিবলিঙ্গের ফটো দিয়েছিলাম তুলিয়ে—অত গ্রাহ্য করে না লোকেরা; কিন্তু যারই একটু ঘটা করে আরতি পুজো হয় এমন সব মূর্তিওলা ঠাকুরই তো হয় কারুর বাড়ির দরদালানে, না হয় কড়া পাহারার মধ্যে,–সেখানে নাক গলাতে দেবে কেন মশাই?…অনেক করে বোঝালাম, ভালো কথায়, আবার ভয় দেখিয়েও বললাম—’ও-সব জাগ্রত দেবতা নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করা চলে না সায়েব, ওঁরা যেমন ভালো করতেও তেমনি আবার মন্দ করতেও, কি হতে কি হয়ে পড়বে শেষকালে! আর ফটোটা তোমাদের কেরেস্তানি কাণ্ড কিনা, ওঁদের ততটা পছন্দ নয়। দেখেছ তো অনাচারের ভয়ে তোমাদের দেশের দিকে পা দিতে চান না কেউ, শেষকালে ভাববেন দেখেছ বেটা স-শরীরে নিয়ে যেতে পারলে না তো শেষকালে ফটো নিয়ে যাবার ফন্দি বের করলে! শিবঠাকুর একটু অন্য ধরনের, আচার-অনাচারের অত বালাই নেই, কিন্তু কোন্ জাগ্রত ঠাকুর সে ব্যাপারটা কিভাবে নেবেন কিছুই বলা যায় না, এখন যা চাইছ দিয়ে যাচ্ছেন, শেষে চটেমটে একটা অনিষ্ট না ঘটিয়ে বসেন।’
অনেক করে বললাম মশাই, যতটুকু বুদ্ধি এল মাথায়, কিন্তু ওই যে আগেই বলেছি এমন ব্যাদড়া জাত তো হয় না, বিপদের কথা শুনে যেন আরো ক্ষেপে উঠল—’ফটো আমায় নিতেই হবে মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, অনিষ্টই যদি করেন তো সেটাও তো তোমাদের জাগ্রাটা ডিইটির ক্ষমতার আর একটা দিক, তাতে আমার প্রবন্ধ আরো জোরাল হয়ে উঠবে। না, তুমি করো ব্যবস্থা।’…বুঝুন তর্কের ধারাটা মশাই।…আরে তুই-ই যদি দাঁত ছিরকুটে পড়লি তো তোর জোরাল প্রবন্ধে কি কাজ দেবে তাই একবার ভেবে দেখ!
কোনোমতেই যখন রাজি হচ্ছি না তখন মোটা টাকা কবলালে। আগে ফটো পিছু পাঁচ টাকা, সাত টাকা, দশ টাকা পর্যন্ত দিত, একেবারে পঁচিশ টাকায় গিয়ে উঠল; মিথ্যে কথা বলব না একটু লোভে পড়ে গেলাম মশাই।
তা তো গেলাম, কিন্তু পাই কোথায় তেমনি মূর্তি বলুন? শেষে অনেক ভেবেচিন্তে, সাহাদের গোপীরমণজীউর কথা মনে পড়ল। বারবাড়িতে ঢুকেই চণ্ডীমণ্ডপে যেন জ্বলজ্বল করছেন রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি—যেমন রুপোর মসনদ, তেমনি কাপড়চোপড়, তেমনি গয়নাগাঁটি, হ্যাঁ, মনে হবে, জাগ্রত ঠাকুর বটে। সুবিধে আছে, সাহাদের বাড়িসদ্যু কোথায় চেঞ্জে গেছে, ভেতরবাড়িতে একেবারে তালাবন্ধ! এখন দারোয়ান আর পূজারি ঠাকুরকে একটু হাত করতে পারলেই কার্যসিদ্ধি হয়। হল রাজি, তবে কিছু খসবে, পূজারি পাঁচ টাকা, দারোয়ান বেটা দু-টাকা—এই সাত টাকা। ওয়েকফিল্ডের কাছে ওটা সোজাসুজি পনেরো টাকা করে দিলুম,—মনে করলাম এও গোপীরমণজীউর দয়া, মুতে আটটা টাকা ঘরে এসে তো গেল!
কই মশাই?—বেশ স্ট্যান্ড, ক্যামেরা, কালো কাপড় সব কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলে। তা দেখতে হবে বৈকি,—যেমন রাধার রূপ, তেমনি শ্রীকৃষ্ণের –ঢুলটুলে চোখ, মুখে হাসি, তেমনি সাজসজ্জে, গয়নাগাঁটি, চোখ ফেরায় কার সাদ্যি!…বেটার মন বসে গেছে দেখে আর এক প্যাঁচ দিয়ে কি করে আরো গোটাকতক টাকা খসাব মনে মনে ভাবছি, এমন সময় ওয়েকফিল্ড আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল, –’মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, এ তো তোমার জাগাটা গডেস নয়!’
‘বলো কি সাহেব! এমন জ্বলজ্বলে ঠাকুর, এ তল্লাটে এমন দুটি নেই, আর তুমি বলো কিনা এ জাগ্ৰত নয়?’
না মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, এ তো স্লীপিং ডিইটি, চোখ ঢুলে আসছে, যেন যে কোনো মুহূর্তেই ঘুমিয়ে পড়তে পারে। এ তো জাগ্রাটা অর্থাৎ ওয়েকফুল ডিইটি হতেই পারে না—দুজনের মধ্যে কেউই নয়, আমার প্রবন্ধের সঙ্গে খাপ খাবে কেন?’
একেবারে দিলে সব ভেস্তে মশাই। কত করে বোঝালাম, কার শুনতে বয়ে গেছে! ঢুলঢুলে চোখ দেখে কী যে মাথায় সেঁদিয়ে গেল—ঘুমন্ত ঠাকুর, এক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়তে পারে, কোনোমতেই তা আর বের করতে পারলাম না তার মাথা থেকে। যেমন গেছল তেমনি বেরিয়ে এল সাহাদের বাড়ি থেকে।
যাক, মনে করলাম ঝোঁকটা অন্তত কাটল বেটার, তাই লাভ। ও মশাই! দুদিন না যেতে যেতে মিস্টার আবার সেই উৎপাত! ‘করলে না ব্যবস্থা কোনো জাগ্রাটা গডেসের ফটো তোলবার, ফীট-অব-প্রিসেপটার? বললাম—’সায়েব, নিয়ে গেলাম তোমায় অমন জাগ্রত দেবতার কাছে, তুমি তুললে না ফটো, আমি কি করব? জাগ্রত ঠাকুর তো ফরমাশি জিনিস নয়, মাঠেঘাটেও পড়ে থাকে না! যখন নেহাত নাছোড়বান্দা, কোনো ওষুধই ধরে না, মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল মশাই, ভাবলাম গোপীরমণজীউ যখন দিলেন একটু সুবিধে করে তখন সেটা খাটিয়েই দেখি না—কিছু ট্যাকেও আসতে পারে, বেটা পেছিয়েও যেতে পারে হ্যাঙ্গাম দেখে। যখন খুব বাড়াবাড়ি লাগিয়েছে, দিনতিনেক বিছানায় পড়ে থাকবার ভান করে বললাম—’সায়েব তুমি তো জাগ্রত নয় বলেই খালাস, এখন যত আক্রোশ আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে ঠাকুরের, তিনদিন বিছানা থেকে উঠতে পারিনি—যাই যাই অবস্থা—ডাক্তার ডাকো, বদ্যি ডাকো, তিন দিনে পঁচিশটা টাকা লম্বা হয়ে গেল। কেরেস্তানদের ছোঁন না ওঁরা, তোমাদের কিছু হয় না, মারা পড়ি আমরা। না সায়েব, আর ওসব ফ্যাসাদের মধ্যে টেনো না গরিবকে।
বললে বিশ্বাস করবেন না মশাই, দুখানি দশ আর একখানি পাঁচ টাকার আনকোরা নোট সামনে বিছিয়ে দিলে—’এই তোমার চিকিৎসার খরচ ফীট-অব-প্রিসেপটার, জাগাটা ডিইটির ফটো কিন্তু আমার চাই। বোধ হয় যাঁদের দেখলাম তাঁরাও জাগ্রাটা, কেনই বা মিথ্যে কথা বলতে যাবে তুমি, তবে ওতে আমার প্রবন্ধ ঠিক জমবে না, আমাদের দেশের লোক বিশ্বাস করতে চাইবে না।’
বিটকেল জাত মশাই, যা একবার ধরবে তা থেকে নড়চড় নেই, শেষে টাকাটা পর্যন্ত ডবল করে দিলে, পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ…’জাগ্রাটা ডিইটির ফটো আমার চাই-ই মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, করো কোনোরকমে জোগাড়।
মনের পাপ গোপন করতে নেই মশাই, একটু লোভে পড়ে গেলাম। শুধু লোভেই নয়, মা-কালীর দয়ায় দু’পয়সা করে খাচ্ছি দেখে আরো দু’একজন ভড়ং করে ঢুঁ মারতে লাগল এদিকে, তার মধ্যে ঈশেন হাজরার ছেলে বৈকুণ্ঠকেও দেখলাম, অমন জালিয়াত জোচ্চোর কলকাতা শহরে দ্বিতীয়টি নেই।—পৈতের গোছা আর ফোঁটা চন্দনের ঘটা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম মশাই, ওয়েকফিল্ডটাকে শেষে গেঁথে না ফেলে! কিন্তু পাই বা কোথায় তেমন জাগ্রত দেবতা? লোভে দুর্ভাবনায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়লাম মশাই, শেষে গিয়ে আমার মনে পড়ে গেল, ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।
হরকালী মাসিকে আপনি দেখেননি, ভগবান করুন যেন না দেখতেও হয় কখনো। আমি সম্পর্কে বোনপো, সওয়া আছে, তবুও স্বপ্নে দেখেটেকে ফেললে আঁতকে উঠি এখনো। মাসি বিধবা, কদমফু করে মাথায় চুল ছাঁটা, এদিকে যেমনি আড়ে, তেমনি দৈর্ঘ্যে। হাঁটুর একটু নিচে পর্যন্ত একটা মটকার থান পরে থাকেন সর্বদা, মাথাটা ঠাণ্ডা রাখবার জন্যে মাথায় একটা ভিজে গামছা পাট করা। –তা সে কি দিন, কি রাত্রি!
সবচেয়ে তারিফ মাসির গলা, সেই যে রাত থাকতে উঠলেন, সেই থেকে রাত্তিরে একেবারে ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত ভাঙা কাঁসর সমানে বেজে চলেছে, পাড়ার লোকের প্রাণ ওষ্ঠাগত। সেই হরকালী মাসির এক ঠাকুর আছেন।”
আমি প্রশ্ন করিলাম—“কি ঠাকুর?”
“ওইটি জিগ্যেস করবেন না, ঠাকুর যে কি ঠাকুর তা পাড়ার লোকে এখনো পর্যন্ত কোনো হদিস পেলে না। মাসিও বলতে পারবে না, জিগ্যেস করলেই বলেন–পোড়াকপাল আমার, ঠাকুরকেই যদি চিনতুম তবে আর আমার এ দশা হবে কেন? কেউ বেশি খুঁটিয়ে জিগ্যেস করবার সাহসও পায় না। বছর দশেক আগে কোথায় তীর্থ করতে গিয়ে নিয়ে এসেছিলেন—একটা পা, আর চারটে হাতের মধ্যে দুটো হাত ভাঙা। অঙ্গহীন ঠাকুর যে পুজো করতে নেই এটা মাসিকে কারুর বলবারও হিম্মৎ হয়ে উঠল না কখনো, শরীরের যেটুকু বাকি আছে তাইতে আগাগোড়া মেটে সিঁদুর মাখিয়ে একটা টিনের চালার মধ্যে বসিয়ে রেখেছে, ঠাকুরও দিব্যি পুজো খেয়ে যাচ্ছেন। সেই ঠাকুরের কথা আমার মনে পড়ে গেল।”
বোধ হয় ঠাকুরের বর্ণনাতেই একটু অন্যমনস্ক হইয়া গিয়া থাকিব, সেই ঝোঁকেই প্রশ্ন করিলাম— “খুব জাগ্রত?”
গুরুচরণ বলিল—“ঘুমুবার ফুরসত পেলেন কখন মশাই যে জাগ্রত হবে না? ওই তো হরকালী ঠাকরুনের কথা শুনলেন; তারপর সকাল থেকে মাসি ওই ঠাকুরের তলায় পাড়ার যত লোক তাদের বেটা-পুত কাটছে, অবিশ্যি হাঁড়িকাঠে ফেলে না কাটুক, কথারও তো একটা ফল হয়ই; ঠাকুরের দিকে যেন চাইতে ভয় হয় মশাই। ভাবলাম, ওই ঠাকুরের ওপর দিয়ে ওয়েকফিল্ডের টাকাটা খসাই। ওখানে আর বাছাধনকে ঢুলঢুলে চোখ বলে আপত্তি করতে হবে না। তারপর সেবায়েত হিসেবে মাসিকেও দেখিয়ে দেব, গলার আওয়াজও শুনবে। ব্যাস, বাজিমাত।”
বেহালা থেকে কোশ তিনেক দূরে মাসির বাড়ি, ফলতার লাইন থেকে নেমে ক্রোশখানেক যেতে হয়। একদিন গেলাম মাসির কাছে। তা আদরযত্ন করে মশাই। একথা সেকথার পর একটু সুযোগ বুঝে আসল কথাটা পাড়লাম, বললাম——মাসি, ঠাকুরের তোমার একটু ভালোরকম পুজোর বন্দোবস্ত করো না, না হয় টিন সরিয়ে ঘরের ওপরের ছাতটাই পিটিয়ে নাও, বলো তো করি ব্যবস্থা! ‘
মাসি ঠায় আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল, ঝানু মেয়েছেলে তো? তারপর জিজ্ঞেস করলে—“তুই কি ব্যবস্থাটা করবি শুনি?’
ব্যাপারটা বললাম, অবিশ্যি আমায় যে টাকাটা দেবে তার কথা বাদ দিলাম, মনে মনে ঠিক করেই ছিলাম ওই থেকে পঁচিশটা টাকা নিয়ে পিসির হাতে দেব, একটা দায়ে খালাস হওয়া তো, নাহয় পুরো টাকাটা এলই না ভোগে।
মাসি একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে সবটা শুনে গেল, তারপর গালে চারটে আঙুল চেপে বললে——তুই যে আমায় অবাক করলি গুরু, সেই ফিরিঙ্গিগুনো? বনেবাদাড়ে, গেরস্তের আনাচে- কানাচে ঘুরে বেড়ায়?’…এরপরই মাসির গলা চড়াল। ওর পদ্ধতিই হচ্ছে—যে যাই বলুক, শেষ পর্যন্ত পাড়ার লোককে তার মধ্যে টেনে আনেই। পর্দা চড়াতে চড়াতে আরম্ভ করলে–’একদিন ছিলাম না, এসে শুনলাম পাড়ার অলপ্পেয়ারা একটাকে ডেকে এনে আমার ঠাকুরের ফটোক তুলিয়ে দিয়েছে। অমন জাগ্রত ঠাকুর আমার সেই থেকে যেন মরে আছেন, নইলে এক-একটা করে পাড়ার সব্বাইকে শেষ হোতে হোত না? ঠাকুর কি আমার তেমনি ঢেঁাড়া ছিলেন? আমি ছিলাম না, নইলে কত বড় গোরা সেপাই দেখে নিতাম না একবার? কোথায় ভাবছি মাসি কষ্টে পড়েছে শুনে বোনপো আমার দরদ দেখিয়ে একটু আহা বলতে এল, না পাড়ার হাবাতেদের মতন সে-ও কিনা আমার ঠাকুরের…
এই পর্যন্ত বলেই মাসি একেবারে স্টাইল বদলে ফেললে; রাগের ভাব ছেড়ে ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের পানে একটু চেয়ে রইল, তারপর কত যেন অনুতাপ হয়েছে এইভাবে গলা সহজ করে বললে—’হ্যাঁরে, আমার এ হল কি? আবাগে আবাগীদের সঙ্গে থেকে থেকে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি শেষকালে? না গুরু, আমি এ গ্রামে বাস উঠিয়ে দিয়ে কালীঘাটে গিয়ে থাকব, তুই আমার ব্যবস্থা করে দে।’
উল্টো উৎপত্তি দেখে ঘাবড়ে গেলাম মশাই, করতে এলাম এক, হয় আর–বুড়ি আমার স্কন্ধে চাপবার মতলব করলে নাকি? জিগ্যেস করলাম—“কি হয়েছে মাসি? বাস তুলে দেবার কথা কি হল?”
মাসি বললে—“কি হয়নি বাবা? এতদিন পরে তুই মাসি বলে এলি—আমারই ভালোর আমি জন্যে—কি করে আমারই ঠাকুরের চালাটুকু একটু পাকা করে দেওয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে, এদিকে পাড়ার শতেকখোয়ারদের সঙ্গে এক করে তোকে কিনা মুখঝামটা দিতে বসলাম। গুরু! কবে আমার মরণ হবে? আর থাকতে আছে এ পাপ জায়গায়?”
ধড়ে প্রাণ এল মশাই, মাসির যে এমন সুবুদ্ধি হবে, আর এত হঠাৎ, কল্পনাতেও আনতে পারিনি বললাম—“তাতে কি হয়েছে মাসি? গুরুজন, দুটো কথা না বুঝে বলেই থাকো তাতে হয়েছে কি? তুমি মন খারাপ কোরো না, ও আমার আশীর্বাদ। তাহলে নিয়ে আসব ধরে ব্যাটা ফিরিঙ্গিকে? ছোঁবেও না কিছু না, সাতহাত তফাত থেকে একটা ফটো তুলে নেবে, তাতে ঠাকুরের ঘরটা যদি একটু ভালো হয়ে যায়, উচিত নয় কি আমাদের রাজি হওয়া? কি জানো মাসি, ভগবান গীতায় দুর্যোধনকে বলেছেন—তিনি সব করেন কর্মান, আমরা নিমিত্ত মাত্র, টিনের ছাতের ওপর বৃষ্টি পড়লে আওয়াজে ঠাকুরের চোপোর রাত ঘুম হয় না, শিলেবৃষ্টি হল তো কথাই নেই, তোমার একটি পয়সা খরচ করালেন না, আমার একটি পয়সা খরচ করালেন না, সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার থেকে এক ব্যাটা ফিরিঙ্গিকে পাকড়ে নিয়ে এসে তার ঘাড় ধরে করিয়ে নিচ্ছেন ব্যবস্থাটা–বোঝো না, একটু তলিয়ে ভেবে দেখবার কথা নয়?”
মাসি একদৃষ্টে আমার মুখের পানে চেয়ে শুনে যাচ্ছিল, বললে—“আমি মেয়েছেলে, অত শাস্ত্রকথা তো বুঝি না বাবা, তাই করে ফেলছিলাম ভুলটা, তা কবে নে’সবি তাকে? আর আসছে তো আমাদেরই ভালোর জন্যে, তায় গীতায় নাকি বলছে ঠাকুরই পাঠিয়ে দিচ্ছেন, খাবারটাবারের ব্যবস্থা একটু করে রাখব? শোর গরুর তো জোগাড় হবে না, একটু মিষ্টিমুখ করিয়ে বিদায় করা আর কি…”
চোখ দেখে, বলবার ভঙ্গিমে লক্ষ করে ধরে ফেলা উচিত ছিল মশাই, তবে এ স্টাইলটা মাসির নাকি একেবারে নতুন, ভাঁওতায় পড়ে গেলাম। বললাম—“নিয়ে আসা তোমার যবে সুবিধে। আজ বেরস্পতিবার, শুক্কুর, শনি দুটো দিন বাদ দিয়ে না হয় রোববার আসি নিয়ে। আর খাবারের কথা বলছ… বাজারের খাবার ওরা খায় না, নিজের হাতে গড়ে যদি দিতে পারো কিছু তো মন্দ নয়, একটু তোয়াজ হয় তো।”
মাসি বললে—’নিজের হাতের বৈকি বাবা, বেশ যত্ন করে নিজের হাতের জিনিসই খাওয়াব আমি, একটা লোক সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এসে এতটা উপকার করছে, খেয়ে যদি কিছুদিন তারই না লেগে রইল মুখে তো কি হল! নিজের হাতেরই জিনিস হবে।’
গুরুচরণ একটু চুপ করিল, তাহার পর বলিল—“একটা সিগারেট দিন তো, বেদম করে দিয়েছে মশাই।
সিগারেটের অর্ধেকটা শেষ করিয়া আবার বলিতে লাগিল—“আজ বিকেলে গিয়েছিলাম মশাই, সোজা সেখান থেকে আসছি। ওয়েকফিল্ড তো যাবার সঙ্গে সঙ্গেই একেবারে ড্যাম গ্ল্যাড। সিঁদুরের ওপর তেল মাখিয়ে মাসি আবার ঠাকুরকে একেবারে ‘মারমার কাটকাট’ করে রেখেছে। তার ওপর নিজের চেহারা আর গলা। না, সায়েবের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় অবিশ্যি করতে এল না, তবে সায়েব এসেছে দেখে ছেলেমেয়ে ধাড়ি-বুড়ো যারা সব এসে জটলা পাকাচ্ছিল, মেরে ধরে হাত-পা নেড়ে বাজখেয়ে গলা ছেড়ে একলা তাদের মোহড়া নিয়ে যেভাবে জায়গাটা মিনিট কয়েকের মধ্যে সাফ করে ফেললে, সায়েবের তো একেবারে তাক লেগে গেল মশাই; ফিস ফিস করে জিগ্যেস করলে–’কে এ ম্যান মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার?’
বললাম—’ম্যান নয় সাহেব, উওম্যান, এই ঠাকুরের সেবায়েত—নার্স।’ একেবারে ড্যাম গ্ল্যাড, আমার হাতটা চেপে ধরে বললে—‘এই এতদিন পরে তুমি আমায় জাগ্রাটা গডেসের কাছে নিয়ে এসেছ মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, নার্সই যদি এরকম হয় তাহলে আমার সন্দেহ নেই গডেস সম্বন্ধে; চেহারা তার দেখছিই, মেজাজ সম্বন্ধেও আমার আর খুঁতখুঁতুনি রইল না।’
ভ্যাজাল হটিয়ে মাসি গনগন করে ভেতরের দিকে চলে গেল, বার দু’এক সাহেবের দিকে ফিরে দেখেও নিলে। যতক্ষণ দেখা গেল ওয়েকফিল্ড হাঁ করে চেয়ে রইল, যেন কি অপূর্ব জিনিস দেখছে! মাসি ভেতরে চলে গেলে বললে—’এইবার ফটোটা তুলে নিই মিস্টার ফীট-অব প্রিসেপটার; দাঁড়াও দেখি কোন্ অ্যাঙ্গল থেকে সুবিধে হবে! ওয়ান্ডারফুল জাগ্রাটা গডেস, আমার প্রবন্ধের দাম চারগুণ বেড়ে যাবে।
আখচার যেমন ছোট একটা ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় এ তা নয়, বেশ তোড়জোড় করে গেছল মশাই, জাগ্রত দেবতার কথা শুনে, একটা বেশ মাঝারি সাইজের ক্যামেরা, স্ট্যান্ড, মাথা ঢাকবার জন্যে একটা কালো বনাত,—অনুষ্ঠানের কিছু বাকি রাখেনি। কয়েক জায়গায় বসিয়ে বসিয়ে মাসির বাড়ির ঠিক দরজার মুখটিতে গিয়ে স্ট্যান্ডে ক্যামেরাটি ফিট করতে লাগল। এই সময় মাসি আমায় ভেতরে ডাক দিলে।
সাহেবকে জিগ্যেস করলাম—‘আমায় কোনো সাহায্য করতে হবে তোমাকে?’ সায়েব বললে—‘না মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, ধন্যবাদ; সূর্যটা ওই ডালটার আড়ালে গেলেই আমি তুলে নোব ফটোটা। মিনিট ছ-সাত লাগবে। ওয়ান্ডারফুল জাগাটা গডেস।’
ভেতরে গিয়ে দেখি মাসি আমার জন্যে থালা সাজিয়ে বসে আছে—মালপো, সন্দেশ, নারকেলের নাড়ু, কয়েকরকম ফল, একটি বড় থালায় ঠেসে সাজানো
বললাম—‘এ করেছ কি মাসি, এত কে খাবে, পেট-রোগা মানুষ একে; এই থেকেই সায়েবের জন্যে তুলে রাখো অদ্ধেকটা!’
খাওয়াবার সময় যেমন বলে মাসি, একটু কড়া করেই বললে—‘সায়েবের ব্যবস্থা আছে, তোকে ভাবতে হবে না, তুই একটি একটি করে খেয়ে ফেল্। হল তার ফটো নেওয়া?’
বললাম—‘রোদটা একটু সরে গেলে নেবে, মিনিট পাঁচ-সাত দেরি আছে।’
মাসি বসে আমায় খাওয়াতে লাগল। একটা ব্যাপারে একটু যেন খটকা লাগল মশাই, অন্য অন্য বারে যেরকম গল্পগুজব করে খাওয়ানো, এ সেরকম নয়, মাসি যেন ভেতরে ভেতরে ফুলছে। ঠিক বুঝতে পারছি না, ফটো নেওয়াচ্ছি বলে মাসি কি আমার ওপর চটল শেষ পর্যন্ত? টাকার লোভে রাজি হয়ে রাগটা কি শেষ পর্যন্ত আমার ওপর গিয়েই পড়ল? মনে মনে সাত-পাঁচ ভাবছি, এমন সময় মাসি উঠে পড়ল, বললে—‘বসে বসে খা গুরু, আমি সায়েবের ব্যবস্থাটা করিগে। খবরদার একটিও ফেলে উঠতে পাবিনি, ভয়ানক রাগ করব, আমার জাগ্রত ঠাকুরের পেসাদ।’
তখনো যদি একটু সন্দেহ করি মশাই!”
মিনিট পাঁচেক হবে। আস্তে আস্তে খেয়ে যাচ্ছি, এমন সময় বাইরে উৎকট আওয়াজ; ঠিক যেন সদর দোরগোড়াতেই। একটা মালপোয়া কামড় দিয়েছিলাম, সেইভাবেই হাঁ করে চেয়ে রইলাম। প্রথম একটা গ্যাঙানি—তারপর এ কি! সায়েবের গলা যে! যেন একটা গর্তের মধ্যে থেকে চেঁচাচ্ছে- ‘মিস্টার ফীট-অব-প্রিসেপটার, দৌড়োও।-হেল্প! হেল্প! দি জাগ্রাটা গডেস। নার্সকে ডাকো। দফা শেষ করলে আমার— হেল্প!…’
গিয়ে দেখি এক বিপর্যয় কাণ্ড মশাই। মাসি সায়েবের মুণ্ডুসদ্যু ক্যামেরাটা কালো কাপড়টার মধ্যে ভালো করে জড়িয়ে বাঁ হাতে কড়কড়িয়ে ধরে আছে, আর ডান হাতে পিঠে শপাশপ ঝাঁটা–দর্জির কলের ছুঁচও অত তাড়াতাড়ি পড়ে না মশাই। আর সেই সঙ্গে আপসানি–’আমার ঠাকুরের ফটোক তুলতে এসেছে! এই তোল, তোল ফটোক। এই এক ফটোক, দু ফটোক, তিন ফটোক—তোল না কত তুলবি! ঠাকুরের আমার হাত নেই বলে হেঁজিপেঁজি না? বেওয়ারিস? এইবার টের পা কত জাগ্রত আমার ঠাকুর। আর তুইও আয় এবার তোকেও দেখিয়ে দিই ঠাকুর আমার কত জাগ্রত! ব্যবসা ফেঁদেছিস, তার মুনাফা নে এসে। চামার! বামুনের ঘরের গোরু! আয় বেরিয়ে…’
পেছন ফিরে ছিল, দেখতে পায়নি তাই রক্ষে; সায়েবকে বাঁচাবে কে মশাই, যেমন গেছলাম তেমনি ফিরে এসে খিড়কির দরজা খুলে সোজা একেবারে এখানে
নাক-কান মলেছি আর ও পাপের পথে নয়—না খেতে পেয়ে মরি সেও ভি আচ্ছা। তা তো হল মশাই, কিন্তু সে ব্যাটা ফিরিঙ্গি যে সমস্ত কলকাতায় তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে আমায়!…
