ফুলেশ্বরী
বনেদী ঘরের মেয়ে হওয়া খুবই ভালো, কিন্তু তাহার আর একটা দিকও আছে। মনে হয় আমি আকাশের চাঁদ, আমাকে পাইবার জন্য চেষ্টা করা আর আকাশের চাঁদ ধরিবার জন্য হাত বাড়ানো একই কথা।
ফুলির কথা হইতেছে, পুরো নাম ফুলেশ্বরী দাসী। ফুলির বাপ অর্জুন বৈরাগী ডাকগাড়ির ইঞ্জিনে কয়লা জোগাইত। কতদিন যাবৎ বলা শক্ত, তবে জ্ঞান হওয়া থেকে বয়স যখন বারো-তেরো তখন পর্যন্ত ফুলি বরাবর দেখিয়া আসিয়াছে গায়ে নীল জামা, একটা প্রকাণ্ড হাতা করিয়া বাবা ইঞ্জিনের পেটের মধ্যে কয়লা ছুঁড়িয়া দিতেছে। এক মুহূর্তের দেখা; কিন্তু তাহারই জন্য, মজা পুকুরের তালগাছগুলার ঠিক মাথার উপর সূয্যি-ঠাকুর যখন নামিয়া আসিত সমবয়সী সব ছেলেমেয়েদের লইয়া ফুলি রেলের গুমতির লোহার ফটকটায় বুক চাপিয়া দাঁড়াইত। ডাকগাড়ি আসিবে, গুমতির চৌকিদার ‘ডিটি’র জন্য উর্দি চড়াইতেছে, নানারকম, স-সম্ভ্রম প্রশ্ন—“ওরা বলছিল—শিগগির একদিন লাট-সায়েব যাবার কথা আচে, কবে গা তারু চাচা?…তুমি হে আজ পগ্গোও বাঁধলে মাথায়; আজই এসবে নাকি, তারু চাচা?”
লাল পতাকাটা গুটাইয়া আর সবুজটা মেলিয়া বেশ ভালো করিয়া একবার ঝাড়িয়া লইয়া তারু শেখ সামনে আসিয়া দাঁড়াইত, বলিত—“লাটের অতশত খবর রাখবার ফুরসত নেই আমার, গাড়ির লাট ডাকগাড়ি এসেছে, তাইতেই মাথা গুলিয়ে দেছে। খবরদার তোরা ফটক টপকে এসবিনি, আমার মন থাকবে অন্যদিকে; যদি টেনে লেয় কাউকে তো সামলাতে লারব!”
“আজ কি গাড়ি নেট আছে তারু চাচা?—তাই মনে হচ্ছে যেন–” ফটকের মধ্য দিয়া সকলে দূরে চাহিয়া থাকিত। জবাবটা দিত ফুলি—“জানিস না শুনিস না, যা তা বকিসনি-লোকে মনে করবে জানে না শোনে না, যা তা বকচে–বাবার গাড়ি নাকি লেট থাকতে পারে…তাও আবার ‘নেট’!…ওই ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে।”
না দেখা গেলেও কেহ প্রতিবাদ করিতে সাহস করিত না, উত্তর হইত—“হিঁ উই লি-লি!…”
তাহার পর এক সময় সত্যিই যেন লি-লি করে একটি কৃষ্ণ রেখা সে-ই স্টেশনের ওদিকে, একেবারে বহুদুরে—তাহার পর স্পষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলী—তাহার পর ইঞ্জিনের মুখ, একটু কাঁপিয়া কাঁপিয়া আগাইয়া আসিতেছে, শব্দও একটু একটু করিয়া স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে—একটা হুইস্ল দিল, এইবার স্টেশনে ঢুকিবে, দূর থেকে দেখা যায়—প্লাটফর্মের ধারের দিকে যাহারা দাঁড়াইয়া, সরিয়া মাঝের দিকে চলিয়া আসিল; যাহার বসিয়াছিল উঠিয়া দাঁড়াইল-ডাকগাড়ি গাড়ির লাটই কিনা, এ-সব ছোটখাটো স্টেশনের দিকে ঘুরিয়াও চাহিবে না—দাঁড়ানো তো দূরের কথা।…গুমতির এরা গেটের লোহা আরো কষিয়া বুকে চাপিয়া ধরিল, তারু শেখ পতাকা মেলিয়া ঠিক মাঝখানটিতে দাঁড়াইয়া বলিল—“খবরদার! রাক্কুসে ইঞ্জিন, যদি টেনে লেয় কাউকে তো না হক্ হেড আপিসের সঙ্গে নেকা-নেকিতে পড়ে যাব।”
হুস, হুস, হুস, হুস–স্টেশন পার হইয়া গেল-ধূলির একটা ঘূর্ণি তুলিয়া দিয়া,—তাহার পর এই আরো কাছে, আরো কাছে—ইঞ্জিনটা কাঁপিতেছে যেন ছিটকাইয়া বাহির হইয়া আসিবে—ভয়ের কিছু না থাকিলেও ভয়ে সবাই গেট ছাড়িয়া দুই পা করিয়া পিছাইয়া আসিল-ফুলি উদ্বেগে আনন্দে দুইটা মুঠা গলার ঠিক নিচেটিতে চাপিয়া বলিয়া উঠিল—“উই বাবা!”
একটি মুহূর্ত—অর্জুন বৈরাগী — গায়ে নীল জামা, মুখে ইঞ্জিনের পেটের আলো আসিয়া পড়িয়াছে, প্রকাণ্ড একটা হাতা করিয়া দিল এক হাতা কয়লা ছুঁড়িয়া সেই পেটের মধ্যে—দেবার সঙ্গে সঙ্গেই সবটা : আবার অদৃশ্য হইয়া গেল।
প্রতিদিনের জীবনে এ একটা এত বড় ঘটনা যে সকলেই খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিত। … প্রথমে ফুলিই কথা কহিবে, সবটা কাণ্ড তাহার বাবারই তো? এক এক দিন, কি মনে হইলে তারু শেখও করিত গল্পসল্প; এক এক দিন গা-ঝাড়া দিত, দলটি ছাতিম তলায় সাঁকোর উপর গিয়া জড়ো হইত, মজা পুকুরের তালবনের পিছনে সূর্য রাঙা হইয়া আসিত, বাপের মুখে শোনা, ডাকগাড়ির ওই ইঞ্জিনের নুতন নূতন গল্প শোনাইয়া সবাইকে অবাক করিয়া তুলিত ফুলি!
.
২
এ গেল ফুলির ছেলেবেলাকার কথা। তাহার পর অনেক বৎসর কাটিয়া গেছে এবং অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। অর্জুন বৈরাগী মারা গেছে, ফুলির দাদা অভিরাম ডাকগাড়ির ইঞ্জিনের খোরাক জোগায়। অভিরাম যে শুধু বংশগৌরবই বজায় রাখিয়াছে তাহা নয়, তাহার ইঞ্জিনও তেমনি,—আঠারো খানা চাকার উপর থাবা পাতিয়া বসিয়া আছে, আর কী দৌড়—ইস্টিশান যখন পেরোয়, এখানে গুমতি পর্যন্ত যেন কাঁপিতে থাকে! দু’নম্বর, তারু শেখের জায়গায় গুমতি-ম্যান এখন বৃন্দাবন। তিন নম্বর, ফুলির এখন ভরা বয়স। চার নম্বরের পরিবর্তনও হওয়া উচিত ছিল একটা, অর্থাৎ ফুলির বিবাহ; কিন্তু সেটা এখনো হয় নাই। না হওয়ার একটা কারণ—তদ্বির করা চাই তো? কিন্তু করে কে? অভিরামের যা কাজ, একেবারেই ফুরসত নাই; সপ্তাহে কদিন তো বাড়ি আসিতেই পারে না, যে কটা দিন আসে বাড়িতেই নেশা করিয়া পড়িয়া থাকে। প্রতিবেশিনীরা অভিরামের বউকে বলে—“নিজের খোঁজাখুঁজি করবার অসোর নেই, তা পাড়ার পাঁচজন মাতব্বরের কাছে যাক্, ধরুক্; বয়েস, না বানের জল,—চোখ বুজে থাকাটা ভালো দেখায় আর? বুন কিনা, তাই; মেয়ে হলে পারতো?”
ফুলির কানে উঠিলে ফুলি রাগিয়া যায়, ঠোঁট দুইটা কুঁচকাইয়া পাঁচ বাড়ি পর্যন্ত আওয়াজ যায় এরূপ কণ্ঠে বলে,—“ফুলির কথা ভাবতে হবে না, সব নিজের চরকায় তেল দিক্। হেলো চাষার গাঁ, তার আবার মাতব্বর! দাদাকে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা কইতে হবে! গেচি আর কি!”
উত্তর যে না হয় এমন নয়—“চাকরির গুমর! অতচ চাকরি কি, না ইঞ্জিনে কয়লা ঠেলা—তা ডাকগাড়িই বা কি আর মালগাড়িই বা কি…বলে লোকে, চোখে নাগে বলে—গাঁয়ের মধ্যেই তো!… বে হচ্ছে না, তা না হয় একটু হায়া করেই থাক—বলে নোকে কি সাধ করে?”
সবই কিন্তু নেপথ্যে; গলা খুলিয়া ফুলির কথার জবাব দেয় এমন বুকের পাটা কাছে-পিঠে কাহারও নাই। ফলে কথা আর বাড়ে না; এইভাবে চলিতেছে।
এইভাবে উপরে উপরে চলিতেছে বলাই ঠিক, কেননা ভিতরে ভিতরে আর একটি ঘটনাস্রোত প্রবল হইয়া উঠিতেছে। খুব যে ভিতরে ভিতরে এমনও নয়; ছোট গ্রাম, কথাটা প্রায় জানাজানি হইয়া আসিতেছে।
গুমতি-ম্যান বৃন্দাবনের বাড়ি একটা গ্রাম বাদ দিয়াই, ক্রোশ-খানেকের পথ নয়। বেশ গাঁট্টাগোট্টা চেহারা, বছর পঁচিশ-ছাব্বিশ বয়স, মাথায় বাবরি,—ভালো করিয়া ছাঁটা, ভালো করিয়া আঁচড়ানো। চুপ করিয়া থাকে, কিন্তু বসিয়া থাকে না; আসিয়াই পাশের খানিকটা জায়গা কোপাইয়া একটু বাগান করিয়াছে, কঞ্চির বেড়া, ভিতরে দু’তিনরকম আনাজ; চার দিকে রাঙা-নটে ডাঁটা; গুমতির চারকোণে চারটি করবীর ঝাড় বসাইয়াছে, তিন কেয়ারি নয়নতারা দু’তিনরকম পাতা বাহার। বাঁশের আগালে দিয়া গুমতির ছাতে একটা মালতীর চারাও তুলিয়াছে।
এই এতগুলি ব্যাপার হঠাৎ একদিন ফুলির চোখে পড়িল। সে বড়-নদীর ওপারে মামার বাড়ি গিয়া অসুখে পড়িয়া গিয়াছিল। অসুখটা সারিতে এবং তাহার পর গায়ে একটু গত্তি হইতে প্রায় মাস চারেক লাগিয়া গেল। যেদিন ফিরিল, চিরকালের অভ্যাসমতো কাঁকালে ঘড়া লইয়া মজাপুকুর হইতে জল আনিতে যাইতেছিল—রেল পারাইয়া যাইতে হয়-গুমতির চেহারা দেখিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া কয়েকবার চাহিতে চাহিতে গেল। বেশ লাগিল; অসুখের পরে অত্যন্ত সাধারণ পুরনো জিনিসও সব বড় মিষ্ট লাগিতেছে, ফুল-ফসলের মধ্যে গুমতিঘরটি আরো ভালো লাগিল। ভালো লাগার সঙ্গে সঙ্গে একটা কৌতূহলও জাগিল ফুলির মনে। গুমতি-ম্যান যে বদল হইয়াছে এটা এমন কিছু প্রকাণ্ড খবর নয় যে ভাজ তাহাকে বাড়ি আসিতেই শোনাইবে,—মজাপুকুরের দিকে অগ্রসর হইতে ফুলির মুখে একটা হাসি ফুটিল,—এতদিন গিয়া বুড়া বয়সে হঠাৎ তারু চাচার এত শখ আসিল কোথা হইতে? বুড়িকে তালাক দিয়া নূতন চাচি কাড়িল নাকি? গল্প প্রসঙ্গে মাঝে মাঝে বলিত বটে, রেলের চাকরে বলিয়া — তাহার উপর অনেক বেওয়া বিবিদের নজর আছে, দু’একজন জোয়ানও আছে তাহাদের মধ্যে। পুরানো লোক, তায় বুড়া, গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ঠাট্টা প্রসঙ্গে গল্প চলিত; চাচা শেষ পর্যন্ত কথায় কাজে এক করিল নাকি। বড় কৌতুক বোধ হইল ফুলির, ঘাটের ভাঙা রাণায় বসিয়া আবোল-তাবোল কি সব ভাবিল—বোধ হয় বুড়ো তারু আর নূতন চাচির অভিনব জীবনযাত্রার কথা, অনেকবারেই মুখে মিটি মিটি হাসি ফুটিল ফুলির; তাহার পর এক সময় ঘড়া ভরিয়া বাড়িমুখো হইল; বেলা পড়িয়া আসিতেছে।
গুমতির কাছাকাছি আসিয়া ফুলির মাথায় এক ভূত চাপিল; বুড়া বয়সে জোয়ান বৌ করিয়াছে চাচা, প্রাণে নূতন শখের জোয়ার আসিয়াছে, ফলেফুলে গুমতিটাকে পর্যন্ত স্বগপুরী করিয়া তুলিয়াছে— ঠাট্টার এমন সুযোগটা ছাড়িয়া যাইবে ফুলি? –মরিলেও আপশোশ যাইবে না যে!
গুমতি থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাহির হইতেছে, চাচা এই সময় রান্নার পাট সারিয়া লয়। ফুলি ঘড়া-কাঁখে দুলিতে দুলিতে অগ্রসর হইল। গুমতির মুখের কাছাকাছি আসিয়া বেশ সরস করিয়া হাসিতে হাসিতে আরম্ভ করিল—“বলি হ্যাঁ চাচা, একটু চোখের আড়াল হয়েচি আর ফাঁকি দিয়ে…”
“কে?”—বলিয়া বৃন্দাবন হালকা ধোঁয়ার মধ্যে গুমতির মুখের কাছটিতে আসিয়া দাঁড়াইল।
দুজনে খানিকক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো সামনা-সামনি হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। সম্বিৎ ফিরিল প্রথমে ফুলিরই; বেশ সহজভাবেই বলিল—“আমি তারু চাচাকে খুঁজছিনু!”
“তিনি তো রিটার করেছে, আজ মাস তিন হল।”
বৃন্দাবন কি ভাবিয়া ইংরাজি কথাটা বলিল সে-ই জানে, তবে চাকরি লইয়া এ ধরনের কিছু কিছু কথা ফুলির জানা, ওর বাপও ‘রিটার’ করিয়া পেনশন লইয়াছিল—অর্থটা বুঝিল। বলিল—“ও। আমায় কেউ বলেনি, তাই….”
বৃন্দাবন বলিল—“ও। না, তিনি তো রিটার করেছে; আমি তাঁর জায়গায় বাহালি হোনু।”
“ও”—বলিয়া ঘুরিয়া আবার দুলিতে দুলিতে ফুলি বাড়িমুখো হইল। গতি উহারই মধ্যে যেন একটু ত্বরিত।
রেলের গুমতির মতো নীরস জায়গায় যে ফুলের স্বপ্ন দেখে তাহার মনের গঠন যে একটু অন্য ধরনের এ-কথা স্বীকার করিতেই হইবে এবং তাহার আস্তানার সামনে দিয়া একটি মেয়ে যদি নিত্য ঘড়া লইয়া জল আনিতে যায় তো তাহার ফুলের আদর যে আরো বাড়িবে তাহাতেও কিছু আশ্চর্য হইবার নাই। আদরে যত্নে নয়নতারার গাছগুলি গোলাপী ফুলে বোঝাই হইয়া চাপ বাঁধিয়া উঠিল, গোড়া থেকে নূতন নূতন অঙ্কুর বাহির হইয়া করবীর ঝাড় চারটি হইয়া উঠিল আরো পুষ্ট; কয়েক ঝাড় বেলা আসিয়া উপস্থিত হইল, স্থান পরিবর্তনের কয়েকদিন একটু নির্জীব হইয়া রহিল, তাহার পরই মরা পাতা ঝরিয়া গিয়া আদরে যত্নে হরিময় হইয়া উঠিল। মালতী চারাটিও তাড়াহুড়া করিয়া বাড়িয়া উঠিবার তাগিদে বাঁশের আগালেটার অনেকখানি ঢাকিয়া ফেলিল। তরকারির বাগানটা রহিল, তবে ঝিঙের লতার কোলে কোলে তরুলতার গাঢ় সবুজ ঝিরঝিরে পাতার গুচ্ছ দোল খাইতে লাগিল, জায়গায় জায়গায় এক আধটা রাঙা টকটকে ফুলও উঁকি মারিতে লাগিল। অবশ্য একদিনে হইল না, তবে প্রতিদিনই কিছু কিছু হইয়া চলিল।
ফুলি জল ভরিতে যায়। প্রায়ই সঙ্গে প্রতিবেশী অন্য কোনো মেয়ে থাকে, একজন হোক, দুজন হোক, আরো বেশি হোক; যেদিন থাকে না, ফুলি ভাইপেটিকে সঙ্গে লয়। ছেলেটির নাম কেষ্ট, বয়স বছর আষ্টেক; সে থাকিলেই ফুলির সুবিধা হয় বেশি। গুমতি পার হইয়াই আরম্ভ করে—“তারু চাচা দিব্যিটি ছেল, নারে কেষ্ট?”
কেষ্ট উত্তর দেয়—“হুঁ।”
“আর এ-বাবুর বাগানেরই কি বাহার….করো কি তুমি বাপু?…না, আমি গেট বন্ধ করে গাড়িতে ফেলাক দেখাই! ওরে বাস রে, কত দরের লোকটা তার একটা ফুলবাগান না হলে চলে?”
মাথা দুলাইয়া দুলাইয়া কথাটা বলিয়া খিল খিল করিয়া হাসিয়া ওঠে।
কেষ্টও হাসিয়া ঘাড় ফিরাইয়া গুমতির পানে চায়; ফুলি সামনের দিকে চাহিয়াই প্রশ্ন করে – “হাসিটে আমার দেখতে পেলে না কিরে কেষ্ট? চেয়ে আছে কি এদিক পানে?”
কেষ্ট একটু চাপা গলায় বলে—“দেখছেলো, আমি তাকাতে মুখ ফিইরে নিলে। ফেরবার সময় চটে গেট বন্ধ করে দেবে না তো রে পিসি?”
দারুণ অবজ্ঞার ফুলির ঠোঁট দুইটা কুঁচকাইয়া ওঠে, বলে—“সাদ্যি!…কার মেয়ে, কার বুন তা মনে রাখে যেন। তোর বাপ কার পাশে দেঁইড়ে কাজ করে একেবার দেখতে বলিস,–আনকোরা বিলিতি সাহেব, টকটকে হাঁড়িপানা মুখ, গুমতি-ম্যান হলে সেলাম ঠুকতে ঠুকতেই হাতে বাত ধরে যেত! … গেট বন্ধ করবে…”
ঠোঁট দুইটা খুব চাপিয়া মাথাটা দুলাইয়া দেয়।
বৃন্দাবনেরও দোষ নাই, কেষ্টারও একটা ছেলেমানুষি আশঙ্কা মাত্র, কিন্তু এমন জায়গায় ঘা পড়ে, অনেকক্ষণ পর্যন্তই ফুলির গরগরানি আর যায় না! দুই পুরুষ লইয়া যাহাদের বাড়িতে ডাকগাড়ি হাঁকাইতেছে তাহার সামনে এক ফেলাক-দেখানে গুমতি-ম্যান!
এক একদিন কি খেয়াল হয়, সাজের মধ্যে একটু অভিনবত্ব আমদানি করে ফুলি, রাঙা গামছাটা হাতে না লইয়া শাড়ির আঁচল ঢাকিয়া বুক-পিঠের উপর ফেলিয়া দেয়, শাড়িটাও বোধ হয় একটু ভালোই পরে, আর এলোচুলের আগায় একটা গেরো দিয়া সমস্ত চুল সুদ্ধ মাথার ঠিক মাঝখানটিতে বসাইয়া দেয়।
গুমতি পার হইয়া প্রশ্ন করে—“দেখছেলো নাকি রে কেষ্ট ড্যাবা ড্যাবা চোখ মেলে?”
কেষ্ট চকিতে একবার দেখিয়া লইয়া তখনই মুখটা ঘুরাইয়া লয়, বলে—“দেখছেলই তো, আমি তাকাতে ঝট করে মুখটা ফিইরে নিলে।”
ফুলি একটু চুপ করিয়া থাকে, তাহার পর প্রশ্ন করে—“আজ আমি কেষ্টচুড়োর মতন করে চুলটা মাথে তুলে দিচি কেনে বল তো রে কেষ্টা?”
“কেনে রে পিসি?”
“গুমতি-ম্যানের মাথায় বাবরির বাহার দেখিস নে?…তুমি লোকটা কে বাপু?—না, আমি চলন্ত গাড়িকে ফেলাক দেখাই!…তাই তো তোকে জিগোলাম—দেখচে কিনা। দেখুক—বাবরি আমার মাথেও আচে—আমিও এইরকম করে দুলিয়ে দুলিয়ে…”
মাথার অল্প একটু দোল দিয়া খিল খিল করিয়া হাসিয়া ওঠে।
.
৩
ছবির অপর দিকটাও একটু দেখা দরকার।
ডাকগাড়ি দেখার দলটা এখনো আছে। অবশ্য ফুলি থাকে না—আগের তাহারা কেহই আর নাই, এখন তাহাদের ছোট ভাই, বোন, ভাইপো, ভাইঝিরা আসিয়া ফটকে বুক চাপিয়া দাঁড়ায়। কেষ্ট তো নিয়মিত দর্শক—তাহার বাবা ডাকগাড়ি হাঁকাইতেছে, ফটকের মাঝখানের জায়গাটি তাহার বাঁধা। ফুলি থাকে না, তবে এক একদিন এমনও হয়, জল তুলিতে যাইতে দেরি হইয়া গেছে, ফিরিতে ফিরিতে দূর থেকেই নজরে পড়ে বৃন্দাবন ফ্ল্যাগটা হাতে গুটাইয়া ধীরে ধীরে ফটক বন্ধ করিতেছে। ডাকগাড়ি আসিতেছে। ফুলি পা চালাইয়া দেয়। আজকাল আর সেরকম সোজা হইয়া দাঁড়াইতে পারে না, নিজেরও কুণ্ঠা হয়, তা ভিন্ন গোড়ায় গোড়ায় দু’একবার ধমকও খাইয়াছে ভাইয়ের কাছে। কলসি লইয়া একটু তেরছা হইয়া ঘাড় নিচু করিয়া দাঁড়ায়, এবং সেইভাবেই অল্প একটু চোখ তুলিয়া দাদার ইঞ্জিন দেখিবার সাধ মিটাইয়া লয়। এমন সব দিনে বৃন্দাবন ফ্ল্যাগ দেখানো পর্বটা একটু সাড়ম্বরেই সমাধা করে, ফটক খোলাও যে খুব সোজা ব্যাপার নয় এটাও যথাসাধ্য জানাইয়া দিবার চেষ্টা করে।
ডাকগাড়ি চলিয়া গেলে দলটা হই হই করিতে করিতে মজাপুকুরের মাঠে খেলিতে চলিয়া যায়। সন্ধ্যার সময় যখন ফেরে, বৃন্দাবন গুমতির বাহিরটিতে থাকে দাঁড়াইয়া। তারু শেখ যেমন ছেলেমেয়েদের আদর দিত, লোকটা সে-ধরনের নয়, আশকারা দিলেই তো বাগানের উপর নজর পড়িবে। তবে কেষ্টর সঙ্গে এদানি একটু ভাব হইয়াছে। ডাকে—“কেষ্টবাবু নাকি হে? বাবার সাথে কি আলাপটা হল একটু কইবে না?”
ওদের পরিবারের খুঁটিনাটি কি করিয়া সব সংগ্রহ করিয়াছে।
সমস্ত দলটা খিল খিল করিয়া হাসিয়া ওঠে, একে এতবড় রসিকতা, তায় গুমতি-ম্যান বৃন্দাবনের মুখ দিয়া বাহির হইতেছে! ঠেলাঠেলি লাগিয়া যায়—“বল নারে কেষ্টা, বাবা ইঞ্জিন থে কানে কানে কি কইল!”
আবার হাসি ওঠে। কেষ্ট বলে—“কইলে সে অনেক কথা—অনেক, অনে—ক…”
ছোটদের হাসি সস্তা, এই ধরনের কথাবার্তাতেই জায়গাটা হাসিতে হাসিতে মধুর হইয়া ওঠে খানিকক্ষণ।
বৃন্দাবন বলে—“তা তুমি একটু বসবেনি? বসো না না-হয়, কি কইলে একটু শুনি। তোমরা যাও হে, আমাদের একটু কানে কানে কথা হবে। আমাদের লাইনের কথা সবাইকে শুনতে নেই…”
ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, অর্থাৎ সব পাতলা হও; তবুও সেইটাকেই আনন্দে পরিণত করিয়া লয় সকলে। “লাইনের কথা—শুনতে নেই—শুনতে নেই—শুনতে নেই” বলিতে বলিতে হুল্লোড়ের আর একটা জের তুলিয়া সবাই লাফাইতে লাফাইতে, হাততালি দিতে দিতে চলিয়া যায়।
গুমতির বাহিরেই একফালি পরিষ্কার ঘাসে ঢাকা জমি, কেষ্ট বসিতে যায়; বৃন্দাবন বলিয়া ওঠে—“দাঁড়াও হে,’দাঁড়াও; চ্যাটাইটা বের করি, তুমি হচ্চ আমাদের অভিরামদার ছাওয়াল, তিনি সায়েবের পাশে দেঁড়িয়ে ডাকগাড়ির ইঞ্জিন হাঁকায় আর তুমি মাটিতে বোসবে? বা, বিচারটা খাসা বটে!”
বসিয়া আরম্ভ করে—“তারপর, অভিরামদা এ ডিবটিতে কোথায় যায়, কোথায় গেছল, তা কিছু গল্প করলে? একদিন গিয়ে যে তানার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসব-তা যা গাড়ির হিড়িক, গেট ছেড়ে নড়বার জো আছে?…তা আমার কথা কিছু জিগ্যেস করছেল নাকি?”
অভিরামের ফুরসত আরো কম, অমন ডাগোর বোনটার একটা হিল্লে করিবে সেইটুকুই হইয়া ওঠে না তো বৃন্দাবনের খোঁজ লইবে। গোড়াতেই একবার কবে নেশার ঝোঁকে বাড়ি ঢুকিতে ঢুকিতে বলিয়াছিল—“আজ তারু চাচার জয়গায় গুমতিতে কোন্ এক লতুন সুমুন্দিকে দেখনু যেন রে?” গালাগালের অংশটা বাদ দিয়া কেষ্ট ওই কথাটাই একটু ভদ্র করিয়া চালাইয়া দেয়।
বৃন্দাবন বলে—“তা জিগোবে না? রেলের-রেলের নোক যে সব এক। যাব একদিন, এলেই এবার বলে যাবে।…দেখো, ভুলেই গেসনু আর কি! মুড়কির লাড়ু খেতে ভালোবাসো না? নারকেলকুর দেওয়া—আজ বুনগাঁ থেকে এসল কিনা, নিয়ে এল। তা মনে কর আমাদের কেষ্টবাবুর জন্যে গোটাকতক রেখে দিই না হয়।”
তোয়াজের সঙ্গে সঙ্গে আলাপ আরো অন্তরঙ্গ হইয়া আসে।
“মা কেমন আছে? কোলের বুনটি? আমাদের আবার লাইনের সব ভাই-ভাই কিনা, অভিদা নাই, একটু খোঁজ রাখতে হয়। নইলে অভিদা ভাববে—দেখো, বিন্দাবন রয়েচে পাশে, লাইনের লোক, অতচ একবার ঘুরেও তাকায় না…’
কেষ্ট নাড়ুতে কামড় দিয়া বলে—“ভালোই তো আছে।”
“তা বলে তুমি আবার বাড়িতে বোলো না যে বিন্দাবনদা এই সব জিগোচ্ছেল–বৌদি ভাববে- দেখো, লাইনের লোক, এসে একটু খোঁজ নিয়ে যাবে সে মুরোদ নেই, জিগেস করেই দায়ে খালাস!…না, এখানকার কথা উঠ্যে দরকার নাই।…কোথায় ছিলি রে এতক্ষণ, না অমুকের বাড়ি ছিলাম—একটা কারুর নাম করে দেবে…নাড়ুগুনো কেমন?”
কেষ্ট একটু মাথাটা নাড়িয়া বলে—“খাসা!”
আমাদের মুলুটির নাড়ু কিনা, লামী যে–নোকে বদ্দমানের সীতাভোগ ফেলে খাবে না?…
আর কি যেন বলতে গিয়ে ভুলে গেনু—হ্যাঁ, তোমার পিসি কেমন আছে? ওই যে ঘড়া করে জল লিয়ে যায় গো—এক আধ দিন দেখি—পিসিই তো তোমার? আমার আবার মনেও থাকে না। সবার কথা জিগোলুম, আর একজনকে বাদ দেওয়াটা অধম্ম হয় তো?—তাই…
কেষ্ট মাথা নাড়ে, তাহার পর বলে—“ভালোই তো আচে।”
এইবার একটু শক্ত হইয়া পড়ে, এইখানটিতে আসিয়া পড়িবার জন্যই তো এত তোড়জোড়! বৃন্দাবন বেশ খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকে। কেষ্টর নাড়ু ভক্ষণ শেষ হইলে বলে—“এইবার একটু জল খেতে হবে কেষ্টবাবুর, লয় কি?—এই দিই।”
ঘরের মধ্যে, চোখের আড়াল হইয়া, একটু সুবিধা হয়; বৃন্দাবন জল গড়াইতে গড়াইতে বলে— “ভালো কথা মনে পড়ে গেল—কেষ্টবাবুর পিসি আমায় নিয়ে কি যেন বলছেল সেদিন কোনো মন্দ কথা লাকি গো?”
কথাটা যে মন্দ, ছেলেমানুষ হলেও কেষ্ট বোঝে, বলে—“না!”
তাহার পর একটু বুদ্ধি খাটাইয়া বলে—“বলছেল কি খাসা বাগান আর কি খাসা ফুল!”
বৃন্দাবন গেলাস হাতে বাহিরে আসিতে আসিতে বলে—“তবে যে হাসলে দুজনে? দেখনু যে আমি?”
কেষ্ট একটু থতমত খাইয়া যায়, খানিকটা কথা ফাঁস করিয়া ফেলে, বলে—“বললে, আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখচে নাকিরে? আমি বন্নু—কই না তো।”
বৃন্দাবন একটু চুপ করিয়া কি যেন ভাবে, তাহার পর গেলাসটা ভিতরে রাখিয়া আসিয়া বলে— “এবার এক কাজ করবে—বলবে—দেখছেলই তো!”
কেষ্ট ঠিক বুঝিতে পারে না, মুখের দিকে খানিক চাহিয়া থাকে, তাহার পর বলে—“তাই তো বন্নু, —বলেছিনু উই কথা।”
বৃন্দাবন বিস্ময়ে একটু পিছনে হেলিয়া পড়ে, বলে- “কও কথা! তুমি বললে তাই?…আরে! আমি দেখতে যাব ক্যানে, কি বয়েটা গেছে? বলে গাড়িকে ফেলাক দেখিয়েই ফুরসত নেই…তা হ্যাঁ, বললে কি পিসি শুনি?”
“মানা করেচে কইতে।”
“তা করুক না মানা, আমি কি তাকে বলে দিতে যাচ্চি? দেখো দেখি! কেষ্টবাবু এত বুদ্ধিমান হয়েও বোকা হেন কথা কয়? বলব যে, আমার কি তোমার পিসির সাথে কথা আচে? আর কইব কখন কথা তাই কও? চারটে লাইনের গাড়ি সামলাতেই…”
মানা থাকায় বলিবার জন্যই জিভ চুলকায় কেষ্টর, একটু একটু করিয়া সব কথাই ফাঁস করিয়া দেয়, ফটক বন্ধ করিয়া দেওয়ার কথায় পিসির গরগরানি—মায় গুমতি-ম্যানের সেলাম ঠুকিতে ঠুকিতে হাতে বাত ধরিয়া যাওয়ার কথা পর্যন্ত।
ছেলেটা ওপরে দেখিতে যাই হোক, ভিতরে ভিতরে বেশ চালাক—নিজের দর বাড়াইতে জানে। মানা সত্ত্বেও যেমন ফুলির কথাগুলি বৃন্দাবনের কাছে প্রকাশ করিয়া দেয়, তেমনি আবার বৃন্দাবনের কথাগুলিও অবসর বুঝিয়া ফুলির কাছে পৌঁছাইয়া দেয়। শুধু এই প্রকাশ করার কথাটা দুজনের কাহাকেও জানিতে দেয় না, তাহা হইলে দর আবার পড়িয়া যাইবে তো!
এই করিয়া চলিল।
.
৪
রাসের সময়।
গ্রামটা বোষ্টমদের। প্রায় সবাই গরিব চাষি; তবু এই সময়টা একটু সাড়া পড়িয়া যায়।
পুকুরে গা ধুইয়া ঘড়া করিয়া জল লইয়া ফুলি বাড়ি ফিরিল; ভিতরে ভিতরে কি একটা কথা যেন ভাবিতেছে; মুখে অল্প একটু হাসি লাগিয়া আছে।
বড় ঘরের দাওয়া থেকে ভাজ একটু ঠোঁট চাপিয়া প্রশ্ন করিল—“পুকুরঘাট থেকে ঠাকুরঝি আজ হাসি ঠোঁটে করে ফিরল কেনে গো? শুনতে নেই গরিবদের?”
রান্নাঘরের দাওয়ার সিঁড়িতে এক ধাপ উঠিয়া ফুলি ঘড়া কাঁখেই ঘুরিয়া দাঁড়াইল, বলিল- “অবিশ্যি হাসির কথা নয়, কিন্তু কী ফুলের ছিষ্টি গো বৌদি যদি দেখো! যেমনি নয়নতারা, তেমনি কি করুবী আর মল্লিকে! গাছ যেন বলে আমি ভেঙে পড়ব! আর মালতীর নতাটা তো শাদা হয়ে রয়েচে। মুয়ে আগুন, সাধ করে কি বলি হাসির কথা নয়,—গোসাঁইয়ের রাস, ফুলগুনো তুলে দে গৌরাঙ্গতলায় পাঠিয়ে, একটা সাখোক হবে, না বাগান সাজিয়ে আমি বসে আছি—কিস্কিন্দের রাজা!…”
খালি হাতটা সঞ্চালিত করিয়া, সমস্ত শরীরটাতেও একটা দোলা দিয়া ফুলি নাক সিঁটকাইয়া আর এক ধাপে একটা পা তুলিয়া দিয়া তখনই সেটা নামাইয়া বলিল-”রাজার রাজপেসাদ কি? না ছটাক খানেকের একটা গুমতি! মনের এমন মতি-গতি না হলে রেল কোম্পানি আর ফেলাক-দেখানে গুমতি-ম্যান করে রেখেছে কেনে?…ভালো কাজ কি ছেল না?…কি ফুল গো বৌদি—ফুলের যেন মোচ্ছোব পড়ে গেছে! চোখ ফেরাতে কি পারা যায়?
“না হয় দুটি চেয়েই আনতে গো।”
গম্ভীর হইয়াই বলে ভাজ; তবু ঠোঁটের একটি কোণ যেন রহস্যে একটু কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। ঘড়া রাখিয়া নামিতে নামিতে ফুলি আবার সিঁড়িতে দাঁড়াইয়া পড়িল। দেমাকে ঘাড়টি যেমন গিয়াছে বাঁকিয়া, অবজ্ঞায় তেমনি নাক আর ঠোঁট দুইটি একত্রে জড়ো হইয়া উঠিয়াছে, কথায় একটু টান দিয়া বলিল-”রসো গো ধনি, ঢের হয়েছে, ক্ষ্যামা দাও! অর্জুন বোষ্টমের মেয়ে ফুলি যাবে ফুল চাইতে—একটা গুমতি-ম্যানের কাছে! হাত পেতে চাইতে! কার বেটি, কার বুন—একবার ভেবে কথা কয়ো! যে ইঞ্জিনটাকে হাঁকায় দাদা সেটা পজ্জন্ত ফিরে তাকায় না, রাঙা ফেলাক্ হাতে করে ধিনিকেষ্ট হয়ে দেঁইড়ে আচে—কি সবজে ফেলাক।…হাত পেতে যাবে ফুল চাইতে!”
একটু থামিয়া তর্জনী চালিত করিয়া বলিল—“এর সাজা কি জানো? আচে এক সাজা। ওর নাকের নিচে থেকে সমস্ত ফুল একটি একটি করে তুলে আনা যায়—নুটে-পুটে—ওকে গুমতির মধ্যি ছেকল দিয়ে রেখে…”
কেষ্ট দাওয়ার একপাশে বসিয়া একটা কাঁসিতে করিয়া নূতন গুড় মাখিয়া মুড়ি খাইতেছিল, হঠাৎ দুই-তিন মুঠা তাড়াতাড়ি মুখে পুরিয়া দাওয়া থেকে লাফাইয়া পড়িল এবং কিছু না বলিয়াই দুড়দুড় করিয়া ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। ওই রকম ওর; বেশ আছে, হঠাৎ মাথায় কি ঢোকে, এক কাজ ফেলিয়া আর এক কাজে ঝাঁপাইয়া পড়ে। মা গলা তুলিয়া বলিল-”শিগগির এসবি কেষ্ট, সন্দের পরেই গোসাঁইতলায় যাবো-খাওয়া-দাওয়া সেরে…”
ফুলি গরগর করিতে করিতে ভিজা কাপড়টা ছাড়িল, তাহার পর উঠানে টগর গাছ থেকে ফুল কটা তুলিয়া আনিয়া একটা মালা গাঁথিতে বসিয়া গেল। গাছটা এবারে ফুল দিতেছে অল্প, তাই লইয়াই ফুলির গরগরানি গেল বাড়িয়া—“এসব গাছে ফুল দেবে কেনে? এতে যে গোসাঁইয়ের পুজো হবে— যত ফুল গিয়ে ফুটবে গুমতি-ম্যানের বাগানে, না দেবায় না ধম্মায়…তা ভাগ্যি চাই তো আবার; গোসাঁইয়ের ছিচরণে নুটুবে, কি গলায় উঠবে, তার ভাগ্যি চাই না?…”
ভাজ পাশের দড়ির দোলনাটাতে একটা মাদুর পাতিয়া খুকিকে শোয়াইয়া দিয়া গেল, বলিল- “আমি এই খিড়কির পুকুর থেকেই গা ধুয়ে এনু বলে ঠাকুরঝি, ত্যাতক্ষণে আকাটাও ধরে উঠবে।… কাঁদে, একটু দোল দিয়ে দিয়ো। একটা আমার জন্যে মালা…কুলুবে না ফুলে? তা আমার হাতের মালা- গোসাঁইয়ের তেমন ভাগ্যি হবে তবে তো!”
একটু মাথা দুলাইয়া, চোখ ঘুরাইয়া হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল।
মালাটা প্রায় অর্ধেক গাঁথা হইয়াছে, কেষ্ট আসিয়া হাজির হইল। মুখটা উজ্জ্বল, “কোঁচড়ে কি আচে বল তো পিসি?”—বলিতে বলিতে আসিয়া সমস্ত কোঁচড়টা উজাড় করিয়া একরাশ ফুল দাওয়ার উপর ঢালিয়া দিল—করবী, নয়নতারা, বেলা, মালতী; টকটকে লাল,—মাঝখানে হলদের টিপ দেওয়া তরুলতার ফুল—একটি রাশ! দাওয়াটা যেন হঠাৎ আলো করিয়া দিল, গন্ধে হাওয়াটা বোঝাই হইয়া উঠিল।
ফুলি পুলকে, বিস্ময়ে ভাইপোর দিকে তাকাইয়া প্রশ্ন করিল—“কুথায় পেলি রে!”
“বল না।”
“দিলে তুলতে?”
“নিজে ও তুলে দিলে!”
ফুলি যেন অভিভূত হইয়া পড়িয়াছে। কি ভাবিয়া একটু চুপ করিয়া রহিল, তাহার পর দুই হাতে আলগাভাবে রাশিখানেক ফুল তুলিয়া লইয়া ধীরে ধীরে ছাড়িয়া দিতে দিতে বলিল—“কী চমৎকার রে কেষ্ট—আর কত! নিজে তুলে দিলে? লোকটা খুব যে মন্দ তা নয়, তবে…
হঠাৎ মিনতির স্বরে একটু ত্রস্তভাবে বলিল—“তুই এক কাজ কর কেষ্ট, শিগগির পেঁতে থেকে খানিকটা সুতো আর একটা ছুঁচ নিয়ে আয়—লক্ষ্মী ধন আমার, টপটপ করে গোটাকতক মালা গেঁথে ফেলি দুজনে—বৌদির দুটো, আমার দুটো, আজ তো দাদাও এসবে—তার দুটো, তোর…গোসাঁই কেমন পাইয়ে দিলেন দেখ না। নোকটা ভালো, তবে…তুই বুঝি গোসাঁইয়ের নাম করে বললি?”
“হুঁ।”
“কি বললে?”
“গুড়ুক খাচ্ছেল, বললে—গোসাঁইয়ের জন্যে তো কবাড়িথে’ নিয়ে গেল; তা নাও, হরেক গাছ থেকে দু’পাঁচটা করে তুলে! কটাই বা আচে ফুল আর? তুলচি, গুড়ুক খেতে খেতে জিগোলে— পাঠালে কে তোমারে? বন্নু—পিসি পাট্যেচে।… পিসি পাট্যেচে? তখনি হুঁকো রেখে নিজে এসে তুলতে লাগল, বললে—তুমি সরে দাঁড়াও তো, তোমার কম্ম নয়, কুঁড়ি তুলবে কি, কি তুলবে! পিসি পাট্যেচে, তা আগে বলতে হয়, তাহলে…”
পিসির মুখের উপর নজর পড়িতে, কেষ্ট হঠাৎ থামিয়া গেল, মুখটা অন্ধকার হইয়া গেছে, ফুল লইয়া আলগাভাবে নাড়াচাড়া করিতেছিল, হাতটা বন্ধ হইয়া গেছে। আড়চোখে দ্বিতীয়বার চাহিয়া লইয়া কেষ্ট বলিল—“দাঁড়াও, আমি ছুঁচসুতোটা লিয়ে এসি।”
দেরি করিতে লাগিল, সামনে আসিতে সাহস হইতেছে না। সবটা বোঝে না, তবে এটা আন্দাজ করিতে পারে যে দুজনের মধ্যে কিছু একটা ব্যাপার আছে যার জন্য পিসির মেজাজ সব সময় ঠিক থাকে না। তাগাদা খাইয়া যখন বাহির হইল, চৌকাঠের নিকট হইতেই দেখিল পিসির হাত দুটো আবার ফুল লইয়া মাখামাখি করিতেছে; মুখেরও সে ভাব আর নাই, সে কাছে আসিতে ভ্রূ তুলিয়া মাথাটা একটু ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া বলিল—“তবেই বোঝ কেষ্ট, তোরা মনে করিস পিসিটা কে তো কে — গেরাহ্যির মধ্যে আনিস না। ওই দেখ, যেই নামটা শুনেছে কি ছুটে গেছে ফুল দিতে—রানীর খাতিরটা একবার দেখে থোস—রানী ফুলেশ্বরী দাসী। …
মালা গাঁথার হাতটা বন্ধ রাখিয়া মাথা দুলাইয়া বলিতে বলিতে খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। খুকিটা কাঁদিবার উপক্রম করিতেছিল, দোলনায় একটা ঠেলা দিয়া বলিয়া উঠিল—“চুপ কর ছুঁড়ি, কান্না শুনলে এক্ষুনি মাথা ধরবে রানীর!”
আরো জোরে হাসিয়া উঠিল, কেষ্টও যোগ দিয়া বাঁচিল।
.
৫
কথাটা লইয়া গোসাঁইতলায় একটু ফিসফিসানি উঠিল। ফুলে অভিরামের বাড়িই সবকে টেক্কা দিল। তাও পাঁচ জায়গার ফুল নয়।…কেষ্ট আবার মাথা দুলাইয়া দুলাইয়া বলিল—“হি, বিন্দাবনদা নিজের হাতে তুলে! ভাবো কি?”
পিসির নামটা কি ভাবিয়া আর করিল না।
একটু বাঁকা হাসি উঠিল অনেকের ঠোটে।
অভিরামের বৌকে শুনিতেও হইল একটু, অবশ্য একটু আড়ে; রাসের আসরে বোষ্টমদের মুখ একটু যায়ই খুলিয়া, কটু বোধ হয় না।
“আমাদের খোকাকে পাট্যেছিনু, তা একমুঠোও দেয়নি ফুল
ইঙ্গিতটা বুঝিয়াও অভিরামের বৌ গায়ে মাখিল না, বরং ননদ লইয়া রসিকতা আর একটু স্পষ্ট করিয়া তুলিবার জন্য বলিল—“আমাদেরও তো খোকাই আনতে গেছল।”
“তা পাট্যেছেল কে সেটা আবার দেখতে হবে তো—ফুলেশ্বরীর দূত!…”
অভিরামের বৌ হাসিয়া বলিল—“তা একটু নজরের তফাত হবেনি ভাই মানুষটোর—অমন খাসা বাগানটা যে করতে পারে! তোমার আমার হুকুমে যা দেবে ঠাকুরঝির হুকুমেও তাই কখনো দিতে পারে? পছন্দ বলে জিনিস আছে তো মানুষটির?”
পাঁচজনের মধ্যে কথা; একচোট হাসি পড়ে। তাহার পর ভেতরের কথাটাই বলে অভিরামের বৌ।
“পালটা ঘর যে, খোঁজ নিয়েচি কিনা; হয়তো খুব খাসাই হয়। তাই একটু থাকি চোখ ফিরিয়ে। তা যা মেয়ে, তুলতে দেবে একটু কথাটা?…কিনা, ভাই আমার ডাকগাড়ির ইঞ্জিন হাঁকায়, আমার কাছে গুমতি-ম্যানের কথা! এদিকে ভাই যখন ঝুলকালি মেখে ঘরে সেঁদোয় দেখে তো অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে এসে…”
আবার বেশ হাসি ওঠে।
ফুলি আছে সাজানো লইয়া। গাঁয়ের মেয়ে, তার বয়স হইয়াছে, তায় একটু বেপরোয়া গোছেরও, -ও-ই সব ঝিউড়িদের পাণ্ডা, সাজানো-গোছানোর ব্যাপারে সব ঠায়েই অগ্রণী। আজ আবার যেন মাতিয়া গেছে।
মাতিয়া যাওয়াটা দরকার হইয়া পড়িয়াছে ফুলির। ওর ভিতরে ভিতরে যেন একটা ঝড় বহিতেছে, এক মুহূর্ত মনটাকে এদিক থেকে ছাড়িয়া দিলে সেটা যেন সেই ঝড়ের ঘূর্ণিতে পড়িয়া ওলটপালট খাইয়া যাইতেছে। ব্যাপারটা যে ঠিক কবে থেকে আরম্ভ হইয়াছে বুঝিতে পারিতেছে না, তবে স্পষ্ট হইয়াছে আজ কেষ্টর ফুল আনার পর থেকে। তাও এমন স্পষ্টই বা কি? এক একবার মনে হইতেছে একটা চাপা অপমানে ভিতরটা তছনছ করিয়া দিতেছে; কিন্তু আবার সব যেন যাইতেছে উলটাইয়া—ওই অপমানই যেন লাগিতেছে মিষ্ট,– কেবলই ভাবিতে ইচ্ছা করিতেছে—কেষ্ট এক কোঁচড় ফুল আনিয়া হাজির—আগে বৃন্দাবন গা করে নাই, তাহার পর যেই শুনিল ফুলি পাঠাইয়াছে—যেই নাম হল না ফুলির, নিজে হুঁকা ছাড়িয়া—ফুলে ফুলে কেষ্টর কোঁচড় ভরিয়া দিল। যায় না এ চিন্তাটা, রাগে অপমানে মনটা যখন উত্তপ্ত হইয়া থাকে তখনই যেন থাকে ভালো, তবু সব ঠেলিয়া এই চিন্তাটাই যেন ঘাড়ে আসিয়া পড়িতেছে। শুধু তো আর তাই নয়, এই চিন্তাকে কেন্দ্র করিয়া আরো সব কতরকম চিন্তা, মামার বাড়ি থেকে আসা পর্যন্ত ওই গুমতিটাকে কেন্দ্র করিয়া যত কিছু হইয়াছে—হঠাৎ সেই ভুল করিয়া গুমতির সামনে চলিয়া যাওয়া, মাথায় চূড়া তুলিয়া পুকুর ঘাটে যাওয়া—কেষ্ট বলিতেছে—’হাঁ দেখেছেই তো, আমি তাকাতে ঝট করে চোখটা ফিইরে নিলে’…আরো কতসব ব্যাপার, ছোটখাটো, কিন্তু আজ বড় হইয়া দেখা দিতেছে।
যষ্টি-মধুর মতো এ মিষ্টি অসহ্য বোধ হইতেছে ফুলির, সাজানোর মধ্যে মনটা ডুবাইয়া রাখিতেছে, যখন নেহাত পারিতেছে না, অপমানের অনুভূতিটাকে পুষ্ট করিয়া তুলিবার চেষ্টা করিতেছে।…একটা গুমতিম্যান–দাদার ইঞ্জিনটাও যার দিকে দৃকপাত করে না, তাহার স্পর্ধা!…
সঙ্গিনীদের মধ্যে আন্না একটু বেশি ঠোটকাটা, বাঁকা ইঙ্গিত করিল—দিলে এতগুনো ফুল লা ফুলি, একটি ফুলে যে নোকটা হাত দিতে দেয় না!”
দারুণ অবজ্ঞায় নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া ফুলি বলিতেছে—টানিয়া টানিয়া, মুখটা একটু দুলাইয়া দুলাইয়া—“দেবে না!—রেলের জমিতে ফুল, তার ওপর আবার দাদা রয়েছে এই গাঁয়েই, না দিয়ে যেন গতি আচে!”
আবার সাজাইতেছে—ফুলের মুকুট, ফুলের কুণ্ডল, ফুলের বাজুবন্ধ। ওদিকে বেটাছেলেরা যাত্রার আসর সাজাইতেছে—সমস্ত জায়গাটা ক্রমেই যেন গমগম করিয়া উঠিতেছে।
দুই দিককার সাজানোই শেষ হইল, এইবার যাত্রা বসিবে, ফুলি গিয়া ভাজকে বলিল-”আমি চননু গো বৌদি।”
“কেনে গো, যাত্রা দেখবেনি?”
আরো সবাই প্রশ্ন করিল—
“কেনে গো, এত সাজালি গোজালি আমোদ করে!…”
“ফুলের আজ হাট বসালে, আর নিজেই…”
ফুলির কান্না ঠেলিয়া আসিতেছে, আর যদি দুটো মুখে এইরকম দরদের কথা শোনে তো নিজেকে সামলাইতে পারিবে না! তাড়াতাড়ি বলিল—“না, মাথাটা কামড়ে উঠল যে, আচমকা।”
তাড়াতাড়ি চলিয়া গেল। ভাজ ঘাড় ফিরাইয়া বলিল—“দাদাকে ভালো করে জাগ্যে নিয়ো, মড়ার মতন পড়ে আচে।”
ফুলি ঘরে আর নিজেকে সামলাইতে পারিল না, বিছানায় উবুড় হইয়া পড়িয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিয়া উঠিল,—অপমান, লজ্জা, এসব তো তবু সওয়া যায়, এরও অতিরিক্ত আর একটা কি- স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না, যেন যষ্টি-মধুর মতন গলাটা দেয় মাতাইয়া–সেইটাই হইয়াছে অসহ্য।
কাঁদিয়া কাঁদিয়া কোন্ একসময় ঘুমাইয়া পড়িল।
পরদিন সমস্ত দিনটাই ফুলির মুখটা থমথমে হইয়া রহিল, দু’একটা সামান্য কথাতেই যে ভাবে উত্তর দিল, কেহ আর ঘাঁটাইতে সাহস করিল না। একরকম নিঃশব্দেই কাটিল।
সন্ধ্যার সময় ঘড়াটা লইয়া পুকুরের দিকে যাইবে, সামনে কেষ্টার সঙ্গে দেখা। কোঁচড়ে কালকের মতন এক কোঁচড় ফুল। উৎফুল্ল ভাবে বলিল—“বৃন্দাবনদা আজকেও দিলে। বললে— রাসের জন্যে…’
ফুলি অল্প একটু ঘাড় বাঁকাইয়া একবার শুধু দেখিয়া লইল, না কোনো মন্তব্য করিল, না কিছু জিজ্ঞাসা করিল। দু’পা অগ্রসর হইলে কেষ্টই প্রশ্ন করিল—“এসবো তোর সাথে পিসি, ফুলগুলো থুয়ে?”
ফুলি চৌকাঠের নিচে দাঁড়াইয়া ঘুরিয়া প্রশ্ন করিল—“কেনে? পাহারা দিতে?”
মূর্তি দেখিয়া আর কিছু না বলিয়া কেষ্ট ধীরে ধীরে গিয়া দাওয়ায় উঠিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পিসির গলার আওয়াজ কানে আসিল—“কেষ্টা!” তাড়াতাড়ি গিয়া দাঁড়াইতে ফুলি প্রশ্ন করিল— “গুমতি-ম্যানটা আছে ওখানে?”
কেষ্ট একটু থতমত খাইয়া চাহিয়া রহিল, তাহার পর বলিল —“হি, ছেল তো, আমি তারপর আবার আশেদের বাগানে গেনু কিনা।…ছেল তো।”
অবজ্ঞায় ঠোটে পিষিয়া ‘গুমতি-ম্যান’ কথাটুকু ব্যবহার করাই ছিল উদ্দেশ্য ফুলির; কেষ্টর সব কথা একরকম না শুনিয়াই হন হন করিয়া চলিয়া গেল।
পুকুরে যাইবার জন্য কাহাকেও ডাকিল না, শুধু তাহাই নয়, পথে আন্না তাহাকে একটু অপেক্ষা করিতে বলিলে উত্তর করিল, তাহার এক মুহূর্ত ফুরসৎ নাই। আরো পা চালাইয়া দিল; আগাইয়া গেলে আন্না ফিরিয়া দেখিয়া ঠোঁট দুইটা কুঞ্চিত করিয়া একটু মাথাটা দুলাইয়া দিল।
ফুলি আজ একেবারে চরম করিবে, মুখোমুখি হইয়া বৃন্দাবনের সঙ্গে বোঝাপড়া করিবে—ফুল দেওয়ার ঘটা কেন? কি ভাবটা তাহার? কি মনে করে ফুলিকে? গলার চোটে সমস্ত গ্রাম একত্র করিবে—ফিসফিসানির ধার ধারে না ফুলি। সে অর্জুন বৈরাগীর মেয়ে, অভিরাম বৈরাগীর বোন, গুমতি-ম্যানের আস্পর্ধাটা ভাঙিবে আজ লোক ডাকিয়া! চাপা হাসির ধার ধারে না।
গুমতির ঘুলঘুলি দিয়া ধোঁয়া বাহির হইতেছে। লেবেল ক্রসিংয়ের চড়াইয়ের উপর উঠিতে উঠিতে ফুলি দেখিতে পাইল বৃন্দাবন উনান ধরাইতেছে, আর অন্ধকারে তাহার পিঠের দিকটা দেখা যাইতেছে। ঝগড়ার মুখপাতের কথাটা বারুদের মতো মনে ঠাসিয়া লইয়া ফুলি রেল চারজোড়া পার হইয়া একেবারে গুমতির মুখে গিয়া দাঁড়াইল। মুখ খুলিবে, দেখে এক পাশটিতে নিজের হাঁটু দুইটি জড়াইয়া তাহার দাদা অভিরাম।
একটু নেশার ভাব যেমন সর্বদাই থাকে সেইরকম রহিয়াছে। প্রশ্ন করিল—“কিরে ফুলি,—তুই যে!”
বৃন্দাবন উনান থেকে ফিরিয়া একেবারে হকচকিয়ে গেল। অতিরিক্ত রাগের মাথায় একেবারেই অপ্রত্যাশিত ভাবে দাদাকে দেখিয়া ফুলি বেশ কিরকম হইয়া গেছে বটে, তবে তখনো তাহার বুকটা ওঠা-নামা করিতেছে। বৃন্দাবনের দিকে দৃকপাত করিল না, তবে দাদার কথায় আর একটু থতমত খাইয়া চুপ করিয়া রহিল বটে; তাহার পরেই শান্ত অথচ একটু চড়া গলায় বলিল—“হ্যাঁ, এনু তোমায় ডাকতে।”
“আমায়?…”
“হ্যাঁ, কেষ্ট বললে তুমি এখানে, তাই…”
মুখটা রাঙা হইয়া উঠিয়াছে, চোখ দুইটার ভিতর যেন আলো জ্বলিতেছে।
“তা হঠাৎ ডাকতে কেনো?”
ফুলি আবার একটু চুপ করিল, মুখটা আরো যেন রাঙা, তাহার পরই একেবারে ফাটিয়া পড়িল—“কেনে তা জিগোতে তোমার একটু লজ্জা করলনি? তুমি কার ছেলে তা মনে আচে তোমার?…অর্জুন বৈরাগীর ছেলে হয়ে নেশা করে একটা গুমতি-ম্যানের সঙ্গে তার ঘরে বসে থাকতে লজ্জা হোলনি তোমার? বাবার ছাড়ান দাও—তিনি পরিত্তাণ পেয়েছে—আপোদ গেচে—নিজের কথাটাই ভাবো একবারটি, তুমি লোকটা কে? আর কি নোকের সঙ্গে একাসনে বসে আচো—তোমায় ধিক, তোমার বংশে ধিক—আবার জিগোচ্চ—ফুলি কি করতে এলি! ফুলির গায়ে আগুন ধরে না গেলে পারতে আসতে এ হেন স্থানে? ফুলি অর্জন বৈরাগীর বেটি, তার বাবার ইঞ্জিনটা পজ্জন্ত যেদিকে একবার চোক উলটে তাকায়নি কখনো–পায়ের ধুলা ঝাড়তেও কখনো ফুলি এসতনি সেখানে—তা হাজার ফুল পাতা দিয়ে স্বভূমি করে রাখুক গে না কেনে…এনু গায়ের জ্বালায় আগুন ধরিয়ে দিয়েচে গায়ে—তাই এনু…
ঘড়াটা কখন নামাইয়া রাখিয়াছে, দুই কোমরে হাত দিয়া এক একটা ঝাঁকানি দিয়া ফুলি একদমে সমস্তটা বলিয়া গিয়া আবার ঘড়াটা হঠাৎ তুলিয়া লইল, যাইবার জন্য ঘুরিয়া আবার তখনই ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল—“বলি এসবে, না, গুমতির ধোঁয়া বড্ড মিষ্টি লাগছে? তা হলে এসো নি—ও মুখ আর দেখিওনি পাড়ায়…”
বলিয়া আবার ঘুরিয়া হন-হন করিয়া একেবারে বাড়িমুখো হইল। গা ধোওয়া রহিল পড়িয়া।
.
৬
অভিরামের গুমতিতে আসিয়া বসার একটু ইতিহাস আছে। একদিন বাড়িতে আসিয়া যে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল—“আজ তারু শেখের জায়গায় গুমতিতে লোতুন কোন্ সুমুন্দিকে দেখলাম”—সে কথা পূর্বেই বলা হইয়াছে। তাহার প্রায় মাস পাঁচেক পরে, অর্থাৎ ফুলির মামার বাড়ি থেকে ফিরবার পর একদিন সন্ধ্যার সময় ডিউটি থেকে ফিরিতেছে, গুমতির সামনে আসিতেই বৃন্দাবন যুক্তকর কপালে ঠেকাইয়া বলিল —“পাতঃপেন্নাম হই দাদা।”
স্টেশনে নামিয়াই একটু নেশা করিয়া লয় অভিরাম, দাঁড়াইয়া পড়িয়া জড়িত কণ্ঠে বলিল- “চেনলাম না তো।”
বৃন্দাবন বলিল—“গুমতির চাকরি নিয়ে এলাম, মাস পাঁচেক হল। তা কতবার ভাবি অভিরামদাকে একবার পেন্নাম করে আসি প্রায় তো দেখছি ডাকগাড়ি হাঁকতে হাঁকতে বেরিয়ে গেলেন—সহজ তো লয়—সায়েবের পাশে দেঁইড়ে ডাকগাড়ি হাঁকান …”
নেশায় ব্যাঘাত হইতেছিল। অভিরাম একটু বিরক্তভাবে বলিল—“বাদ দেও তোমার ডাকগাড়ি— কথাটা কি তাই কও।
“তাই ভাবনু, ফিরতেই না হয় ধরি দাদাকে। যাওয়ার তো উপায় নাই, তা বাড়ি যাওয়ার পথে যদি পায়ের ধুলো পড়ে একটু গুমতিতে….”
সেই হইল গোড়াপত্তন। অভিরাম লোকটা ঢিলাঢালা, তা ভিন্ন ডাকগাড়ি হাঁকায় বলিয়া যে বোনের মতো কোনো আভিজাত্যবোধ আছে এমনও নয়। প্রথমত কয়লা জোগানো আর হাঁকানোর প্রভেদটা হাড়ে হাড়েই বোঝে, দ্বিতীয়ত এই ডাকগাড়ি চড়িয়াই পাঁচটা দেশ ঘোরে, সুতরাং বোনের মতো ধরাটাকে নিতান্ত সরা বলিয়া মনে হওয়া সম্ভব নয় তাহার … প্রতিবারেই নয়, তবে মেজাজটা যদি অনুকূল রহিল, গুমতির মধ্যে বসিয়া বৃন্দাবনের সঙ্গে খানিকটা আলাপ করিয়া যায়। দুইজনেরই রেলে চাকরি—রেলের সুখ দুঃখ লইয়া কথাবার্তা জমে ভালো। এক ধরনের হৃদ্যতা জন্মিল।
কথাটা কিন্তু অপ্রকাশ ছিল। বৃন্দাবনের দুই দিক দিয়াই ভয় ছিল—ফুলি যেমন মেয়ে সে যদি টের পায় তো সে ভাইকে সাধ্যমতো নিরোধ করিবার চেষ্টা করিবে; তা ভিন্ন ভাইয়ের সংসর্গ পাইয়াছে জানিলে বৃন্দাবনও নেশাখোর বলিয়াই প্রতিপন্ন হইবে তাহার কাছে,—আভিজাত্য ডিঙাইবার যেটুকুও বা আশা আছে এখনো, আর থাকিবে না। বলিল—“একটু এসে পায়ের ধুলো দাও ন’মাসে ছ’মাসে—তা এটুকু আর কাউকে জানিয়ে কাজ নেই দাদা।”
অভিরাম বলিল—“দরকার কি ভাই? ভাববে ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে নেশার আড্ডা করেছে। পিরথিমিটা ভালো জায়গায় নয় তো।”
অভিরাম রাত করিয়াই আসে, গুমতিটাও গ্রাম থেকে একটু দূরেই, ফাঁকা জায়গায়, ব্যাপারটা কাহারও নজরে পড়ে নাই। বা যদি পড়িয়াও থাকে এক-আধজনের নজরে তো এটা এমন কিছু রটাইবার কথা মনে করে নাই।
যখন হৃদ্যতাটা বাড়িল আরো, বৃন্দাবন একদিন নানারকম দুঃখের কথা তুলিয়া ঘরের বায়ুমণ্ডলটা করুণ করিয়া তুলিয়া আসল কথাটা পাড়িল—আর এরকম হাত পোড়াইয়া রাঁধিয়া খাওয়া চলে না; কিছু টাকা জমিয়াছে, বিবাহ করিয়া এই গ্রামেই একটু জমি কিনিয়া স্থিতু হইতে চায়—হাতে কোনো ভালো পাত্রী আছে অভিরামদার? একটু ডাগোর-ডোগোর হলেই ভালো হয়…এটা বোষ্টমদের গ্রাম, সে নিজেও বোষ্টম, তাই জিজ্ঞাসা করা…আছে এমন কোনো মেয়ে?
অভিরাম অনেকক্ষণ মাথার চুল টানিয়াও মনে করিতে পারিল না এমন পাত্রী আছে কিনা। বলিল—কেষ্টর মাকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিবে, এসব খোঁজ মেয়েছেলেরাই রাখে কিনা…তাহা হইলে তো এখানে আসার কথাটাও তাহাকে বলিতে হয়…
যে সম্বন্ধটার ব্যবস্থা করিতেছে, সেই সম্বন্ধ ধরিয়াই অভিরামকে মনে মনে একটা গালাগাল দিয়া বৃন্দাবন বলিল—“তাহলে তানাকেই জিগুও। তা না হয় এখানে আসার কথা জানলেই তিনি, গুরুজন তো।”
পরদিন সাপ্তহিক ছুটি ছিল। সন্ধ্যার পর গুমতিতে আসিয়া অভিরাম বলিল —“পাওয়া গেছে, মাঝে পড়ে বৌয়ের কাছে বকুনি নেকা ছিল কপালে।…ফুলিকে চেনো?”
বৃন্দাবন হাতে হুঁকাটা তুলিয়া দিয়া প্রশ্ন করিল—“ফুলিটা কে?”
“আমার বুন। ভালো নামও আছে—ফুলেশ্বরী। পেরাই তো এখান দিয়ে জল আনতে যায়, দেখোনি?…তুমিও দেখচি তালকানা আমারই মতন!”
বৃন্দাবন ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া মনে করিবার চেষ্টা করিল, বলিল—“ঠাওর করিনি।”
“এবার দেখো—তবে ফুলিকে ঠাওর করে দেখতে হয় না—চুল আচে, রং আচে, গড়ন-পিটন— কপালে তিনটে উলকি—ঠাওর করে দেখতে হবে নি—আপন বুন বলেই বলচি না—আর বয়েস- যেমনটি খুঁজচ;—চলবে?
নেশাখোর বেকার লোক বলে একটা বদনাম আছে, তাহার উপর কাল বোনের কথা মনে না পড়ায় ধমকও খাইয়াছে বধূর নিকট, অভিরাম বোনকে যতদূর সম্ভব লোভনীয় করিয়া ঘটকালি শুরু করিয়া দিল।
বৃন্দাবন বলিল—“তা তুমি যেমন বলছ–মন্দ কি? আর ঘরে ঘরেই হয়ও…”
সেই সূত্রপাত, তাহার পর কথাবার্তা চলিতেছে, কেষ্টর মা-ও আছে। খোঁজখবর লওয়া ও চলিতেছে ভিতরে ভিতরে। কিন্তু মুশকিল হইতেছে ফুলিকে লইয়া। কেষ্টকে মাঝে রাখিয়া বৃন্দাবন যতটুকু খবর পাইতেছে তাহাতে তো উৎসাহের কিছু পাওয়া যায় না। ভাজ দু’একবার আড়ে-আবডালে তুলিয়াছে কথাটা ফুলির কাছে, কিন্তু সেই ডাকগাড়ি হাঁকানোর বড়াই। …
অভিরাম আসিয়া বৃন্দাবনকে প্রশ্ন করে—“কিছু পাচ্ছ সাড়াটাড়া?”
বৃন্দাবন ঠোঁট-নাক একত্র করিয়া মাথা নাড়ে।
অভিরাম বেশ একটু বেজায় হইয়া বলে—“তোমার কম্ম নয়, মেয়েছেলে হল—কি যে বলে— মেয়েছেলেই, তাকে বশ করা তোমার কম্ম লয়, গাড়িকে ফেলাক দেখাতে দেখাতেই গিয়ে চিতে উঠবে।”
নানারকম পরামর্শ দেয়—“এই তো রাস আসিতেছে, ফুল দিক, ফুলি ভালোবাসে ফুল। বাগান কি পরকালে কাজ দিবে। আর কত কেষ্টর ভরসায় না থাকিয়া নিজেই একটু সাক্ষাৎ কথা কহিবার চেষ্টা করুক না—নিজেরই স্ত্রী তো একরকম বলতে গেলে—বুকের পাটা চাই একটু, নইলে হয় এসব কাজ?” এই করিয়া চলিতেছিল, এমন সময় নিতান্ত অপ্রত্যাশিত ভাবেই গুমতির ওই ঘটনাটি ঘটিল; যত চক্রান্ত, যত মতলব ফুলি এক দাবড়ানিতে ভগ্ন করিয়া দিল।
ফুলি চলিয়া গেলে দুজনেই খানিকক্ষণ থ হইয়া বসিয়া রহিল, তাহার পর বৃন্দাবন বলিল- “শুনলে তো?”
অভিরাম একটু আড়ে চোখ তুলিয়া চাহিল, বলিল—“এক ছিলিম সাজো আরো, হাঁপ ধরিয়ে দিয়েচে। কি কুক্ষণে যে বাবা ডাকগাড়ির ইঞ্জিনের কয়লা দেওয়া হাতাটা নেছলো হাতে তুলে!”
অনেকক্ষণ দুইজনে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল, তাহার পর অনেক রাত্রি ধরিয়া পরামর্শ করিল। শেষকালে অভিরামই একটা মতলব বাহির করিল। এমন লাগানসই মতলব আর হয় না।
যাইবার সময় খুব হাসিল দুইজনে। অভিরাম কয়েক পা গিয়া রেলের মাঝখানে দাঁড়াইয়া একটু টলিতে টলিতে ঘুরিয়া বলিল—“ফুলি! সে আমার সাথে টেক্কা দেবে, হুঁঃ! আরে আমি যে ইদিকে অর্জুন বৈরাগীর পুত, ও বেটি হয়ে কি গুমর করে….লাও, এবার গেঁতে তোল দিকিন। যেমনটি বন্ধু হুবহু সেইরকম করে যাবে?”
.
৭
দিন পাঁচেক পরের কথা
একটা ব্যাপার চরমে উঠিয়া গেলে আবার নামিতে আরম্ভ করে—ফুলির মনের অবস্থাটা সেইরকম চলিয়াছে। অবশ্য গুমতি-ম্যান বৃন্দাবনের মর্যাদা বাড়ে নাই তাহার চোখে এতটুকুও, তবে মাঝে মাঝে মনটা কেমন একটু করিয়া উঠিতেছে। আহা, অমন করিয়া মুখের সামনে বলিয়া আসিল! না হয় দাদাকেই বলিল, কিন্তু লক্ষ্যটা তো বৃন্দাবনই। দোষটা কি তাহার? না, ফুল দিল অত করিয়া—তাওঁ গোসাঁইয়ের জন্য! নাঃ, ভালো হয় নাই। রাগ না চণ্ডাল!
ও-পথ দিয়া আর যাইতেই পারে নাই ফুলি এই কটা দিন। জল আনিতেছে গ্রামের অন্যদিকে আশেদের পুকুর থেকে। বিকাল হইয়া গেছে। পুকুরে যাইবার জন্যই গামছাটা কাঁধে ফেলিয়া ঘড়াটা লইতে যাইবে, হঠাৎ একটা হই-চই উঠিল—“ডাকগাড়ি থেমে গেছে!—গুমতির সামনে ডাকগাড়ি থেমে গেছে!”…একপাল ছেলেমেয়ে ছুটিয়াছে গুমতির পানে। ফুলি তাড়াতাড়ি সদর দরজার দিকে পা বাড়াইতেই সামনে কেষ্ট আসিয়া উপস্থিত। হাঁপাইতেছে।
“ডাকগাড়ি থেমে গেছে!!”
“কি করে রে?”
“বিন্দাবনদা রাঙা ফেলাক দেখালে আর…দেখগে না, আমি হাবলাদের ডেকে আনি…উঃ, বিন্দাবনদা—কী দাপট! —উঃ!…
আবার ছুটিয়া গ্রামের মধ্যে চলিয়া গেল।
দারুণ উদ্বেগ আর কৌতূহলে ফুলি যত দ্রুত পারিল গুমতির দিকে অগ্রসর হইল। সত্য! গাড়িটা একেবার নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। অসম্ভব দৃশ্য! নিজেই যেন নিশ্চল হইয়া যাইতে হয়। খানিকটা ভিড় হইয়া গেছে, গ্রাম থেকে আরো দলে দলে সবাই আসিতেছে—ছেলের দল, ছুটিয়া ছুটিয়া। গুমতি থেকে একটু দূরে ক্ষেতের একটা আলের ধারে দুইটা তালগাছ গায়ে গায়ে হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, ফুলি একটার আড়ালে গিয়া দাঁড়াইল।
বিশ্বাস করা কঠিন : আগে আগে বৃন্দাবন, বাঁ হাতের মুঠায় গোল গোল দুইটা কি; ডান হাতে দুইটা ফ্লাগ, রাঙাটা খোলা, তাহার পিছনে সায়েব ড্রাইভার, তাহার পিছনে সায়েব গার্ড, তাহার পিছনে রেলেরই কয়েকজন লোক, তাহার পর কয়েকজন যাত্রীর লাইন। ইঞ্জিনে একা অভিরাম; একটু মুখ বাড়াইয়া দলটার দিকে নির্বিকার ভাবে চাহিয়া দাঁড়াইয়া আছে। বৃন্দাবন মাঝে মাঝে ঘুরিয়া সাহেব ড্রাইভারের সঙ্গে কি কথা বলিতেছে, তাহার পর ইঞ্জিনটা যে দিকে যাইতেছিল সেই দিকে অগ্রসর হইতেছে।…এদিকে স্টেশন থেকে কতকগুলো লোকও ছুটিয়া আসিতেছে।
ফুলি স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। বিরাট ইঞ্জিনটার অসহায় আক্রোশের মতো সোঁ সোঁ একটানা শব্দ, লম্বা নিশ্চল গাড়ি, চঞ্চল ভিড়, ড্রাইভার আর গার্ড সাহেবের নিতান্তই সাধারণ মানুষের মতো মাটি মাড়াইয়া আগাইয়া যাওয়া—সব কিছু মিলিয়া দৃশ্যটা বড় আশ্চর্য—প্রায় অলৌকিক একটা কিছু বলিয়া মনে হইতেছে; আর সবচেয়ে তাহাকে অভিভূত করিয়াছে এই চিন্তাটা যে এই সবার মূলে গুমতি-ম্যান বৃন্দাবন! সবার আগে, দু-দুটা সাহেবকে পিছনে করিয়া চলিয়াছে, দীর্ঘ ঋজু দেহ, মাথায় বাবরি দুলিতেছে, হাতে আধখোলা রাঙা টকটকে পতাকাটা হাওয়ায় দুলিয়া দুলিয়া পড়ন্ত রোদে ঝকঝক করিতেছে—এত বিশিষ্ট—এত অদ্ভুত বোধ হইতেছে ফুলির! মনে হইতেছে যেন একটা ছাইচাপা আগুন, প্রকাশ হইল তো একেবারে দপ করিয়া জ্বলিয়াই প্রকাশ হইল।
প্রায় আধ মাইলটাক দূরে একটা ছোট পুল আছে, দলটা তাহার উপর জড়ো হইয়া কি যেন যাচাই করিতে লাগিল। মাঝখানে বৃন্দাবন, রাঙা পাকাসুদ্ধ হাতটা নাড়িয়া কি সব বলিতেছে মাঝে মাঝে তাহার দুই দিকে যে দুই সাহেব—তাহাদের।
ক্রমে এ-কান ও-কান করিয়া কথাটা টের পাওয়া গেল।—ডাকগাড়ির জন্য সিগন্যাল ডাউন হইয়াছে স্টেশনে, একবার এদিকে নজর পড়িতে বৃন্দাবনের যেন মনে হইল একটা লোক পুলের থামে মাথা ঝুঁকাইয়া বসিয়া কি করিতেছে। তখনই ছুট! লোকটা তো পলাইল, বৃন্দাবন গিয়া দেখে জোড়ের মুখের চারিটা বোল্টুর মধ্যে দুইটা খোলা। খোঁজ করিতে দেখে পুলের নিচে পড়িয়া। আবার তক্ষুনি ছুট, গাড়ি বুঝি এসেই পড়ে ওদিকে।
গুমতিতে পড়ি তো মরি করিয়া আসিয়া পৌঁছিয়াছে, দেখে গাড়ি ওদিকে স্টেশন ছাড়াইয়া বন বন বেগে ছুটিয়া আসিতেছে। বৃন্দাবন লাল পতাকা খুলিয়া দাঁড়াইয়া গেল। ব্যস, আর কি! …
গল্পটা যতই মুখে মুখে ঘুরিতে লাগিল ততই শাখা-প্রশাখায় পুষ্ট হইতে লাগিল। প্রথমটা নাকি ড্রাইভার গ্রাহ্য করে নাই, ডাকগাড়ির সাহেব ড্রাইভার তো? শেষে বৃন্দাবন খুব কড়াভাবেই পতাকায় ঝাঁকানি দিতেই বাপের সুপুত্তুর হইয়া ইঞ্জিন রুখিয়া নামিয়া আসে।
তদারক করিতে, বোল্টু দুইটা আঁটিতে, এদিক-ওদিক আরো কয়েকটা জোড় পরীক্ষা করিতে প্রায় আধ ঘণ্টাটাক লাগিল, তাহার পর সকলে ফিরিয়া আসিল; ফিরিতেও বৃন্দাবনই সবার আগে আগে।
যাত্রীরা গাড়িতে উঠিল, গার্ড সাহেব বৃন্দাবনকে কি গোটাকতক কথা জিজ্ঞাসা করিয়া বইয়ে লিখিয়া লইয়া নিজের গাড়িতে উঠিল। ড্রাইভার গিয়া ইঞ্জিনে উঠিয়া একটা কি চাপিয়া ধরিয়া বাঁশিটি বাজাইয়া দিয়া ফিরিয়া বৃন্দাবনের দিকে চাহিল। বৃন্দাবন রাস্তাটার মাঝখানে দাঁড়াইয়াছে, লাল পতাকাটা ভালো করিয়া গুটাইয়া ফেলিয়া সবুজটা তুলিয়া ধরিয়া ধীরে ধীরে দোলাইতে লাগিল, ওদিকে গার্ডও সবুজ দেখাইল, আর একটা হুইস্ল দিয়া ডাকগাড়ির ইঞ্জিন আস্তে আস্তে গুমতি পরিত্যাগ করিল।
ফুলির আর সেদিন পুকুরে যাওয়া হইল না।
.
একবারে দিন পনেরো পরের কথাটা বলা যাক।—
আজ আবার বৃন্দাবনের বোন রূপসী আসিয়াছিল এই লইয়া এই তিনবার। ফুলি সমস্ত দিন বাহিরে বাহিরে কাটাইয়া বাড়ি ফিরিতে ভাজ বলিল—“আজ দিয়ে দিনু কথা, তোমার সেই যে কি বলে—তাই হয়েছে, বড্ড নাকি দাদার আশকারা; তাই নয়তো মেয়ের মত নিয়ে বিয়ে একথা কোন্ শাস্ত্রে আচে জানি নে তো…”
ফুলি সেকেন্ড কয়েক একটু চুপ করিয়া দাঁড়াইল; তাহার পর মাথায় একটা ঝাঁকানি দিয়া বলিল—“তাহলে মজাপুকুর থেকে জল নেসবার অন্য ব্যবস্থা কোরো ঠাকরুন,—আমিও এই বলে দিনু।”
ও-পাটটা যে সেদিন থেকেই উঠাইয়া দিল সে এটা জানাইবার জন্য আবার ঘুরিয়া পাশের কাহার বাড়ি চলিয়া গেল।
