ভাড়া
১
কাজটা বোধ হয় অন্যায় হইয়া গিয়াছিল, কিন্তু কাঠ-রসিকতার জ্বালায় মনের অবস্থা তখন এমন দাঁড়াইয়াছিল যে, ও কথাটা ভাবিয়া দেখিবার অবসর হয় নাই। এখনো যে খুব অনুতপ্ত আমি এ কথাও ধর্মসাক্ষী করিয়া বলিতে পারি না।
বরযাত্রীর দল, কলিকাতা হইতে লুপ লাইনে সাহেবগঞ্জ যাইতেছে। একে বরযাত্রী, তায় কলিকাতার, তাহার উপর আবার যাইতেছে বেহারে—সকলেরই যথাসম্ভব স্মার্ট আর রসিক হইবার চেষ্টা কিন্তু সুবিধা হইতেছে না। শেষে লুপ এক্সপ্রেসটা যখন কোন্নগর পার হইল তখন একজন বলিল—“না, এ জমছে না, সেরামপুরে গড়ি থামলে বরদা খুড়োকে টেনে নিয়ে আসতে হবে বরের গাড়ি থেকে–বাঃ, ওঁরা বরও নেবেন আবার বরদাও নেবেন!
গাড়িটা প্রায় ওরাই বোঝাই করিয়া রাখিয়াছে, সমর্থনের একটা তুমুল কলরব উঠিল—“খুড়োকে চাই ….খুড়োকে চাই।…আমাদের খুড়োকে চাই!…বাঃ, বর বরদা দুই নেবে, মাংনা নাকি?…”
অযথাই কলরবের সঙ্গে একটা হাসি উঠিল, একজন দাঁড়াইয়া উঠিয়া “খুড়ো হে!–এসো হে আধ আঁচরে বোস হে!”…বলিয়া যাত্রার জুড়ির মতো হাত খেলাইয়া তান ধরিয়া দিল, একজন উঠিয়া তাহার টুটিটা ধরিয়া নাড়া দিয়া গানের গিটকিরি তৈয়ার করিয়া চলিল; হাসির আর একটা তোড় উঠিল।
এদের সঙ্গে আমায় বর্ধমান পর্যন্ত যাইতে হইবে, অস্থির হইয়া পড়িয়াছি যাই হোক, একটু আশান্বিত হইলাম, যাহার নাম উচ্চারণেই এতটা উল্লাস তাহাকে দেখিবার জন্য কৌতূহল লইয়া বসিয়া রহিলাম।
গাড়িটা সেরামপুরে থামিতে প্রায় অর্ধেক লোক হই-হই করিতে করিতে নামিয়া গেল, বরের গাড়িতে হাসি-হল্লার মধ্যেই একটা টানাটানি পড়িয়া গেল—ওরাও ছাড়িবে না, এরাও নিরস্ত হইবে না—তাহার পর “থ্রি চিয়ার্স ফর খুড়ো!…লং লিভ খুড়ো!…খুড়ো জিন্দাবাদ!”—বলিতে বলিতে সমস্ত প্লাটফর্ম কাঁপাইয়া একটি লোককে মাঝে করিয়া সবাই এ কামরায় আসিয়া উঠিল, গাড়িটা ছাড়িয়া দিল। লোকটা বেঁটেসেঁটে গোলগাল, মাথায় টাক, তাহার নিচে বাবরি; মোটা একজোড়া গোঁফ বাটারফ্লাই করিয়া ছাঁটা; সর্বসাকুল্যে চেহারাটায় একটু হাসির উদ্রেক করে, তাহার উপর মুখটা আর চোখ দুইটা এমনভাবে একটু কুঞ্চিত যে, মনে হয় যেন এখনই ভয়ানক একটা হাসির কথা বলিবে বা হাসির কিছু একটা করিবে। বয়স বছর পঁয়ত্রিশ হইবে।
গাড়ির মধ্যে আসিয়াই লোকটা হঠাৎ থমকিয়া দাঁড়াইল, চোখ-মুখ আরো কুঞ্চিত করিয়া চারিদিকে একবার চাহিয়া লইল; অত যে গোলমাল এক মুহূর্তেই ঠাণ্ডা হইয়া গিয়া সবাই মস্ত বড় কিছু একটা প্রত্যাশা করিয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল, দু’একটা চাপা হাসির খুকখুক শব্দ হইল, একটু থামিয়া একজন বলিল,—“কি খুড়ো?—তুমি যে একেবারে স্ট্যাচু মেরে আলোর দিকে চেয়ে রইলে!”
খুড়ো বিমুঢ়ভাবে আর একবার চারিদিকে চাহিয়া বলিল,—“এ কি! আমার গান পাচ্ছে কেন এত!”
চাপা হাসির সংখ্যা আরো বাড়িয়া গেল, একজন বলিল,—“তা গান পাচ্ছে তো গাও না বাবা, সেই জন্যেই তো তোমায় পাকড়াও করে আনা…”
খুড়ো বাঁ হাতে কানটা ঢাকিয়া ডান হাতটা লম্বা করিয়া বাড়াইয়া দিয়া একেবারে সপ্তমে তান ধরিল—“শ্মশানে কেন মা গিরিকুমারী, কেন বা তোমার এ-হেন বে-এ-এ-শ!”
প্রচণ্ড হাসির চোটে মনে হইল যেন ছাতটা ভাঙিয়া পড়িবে, সেই সঙ্গে নানারকম বুলি—“থ্রি চিয়ার্স ফর খুড়ো! এনকোর খুড়ো এনকোর….এনকোর।”
তোড়টা একটু থামিলে দু’একজন হাসিতে হাসিতেই বলিল—“আর গান খুঁজে পেলে না বাবা?… বাসরঘরে এই গানই গেয়েছিলে নাকি খুড়ো? এ যে বরযাত্রী গো…”
খুড়ো হাত দুটো চিতাইয়া নিরীহভাবে বলিল—“বরয়াত্রী কি শ্মশানযাত্রী কি করে বুঝব বাপধনেরা? একেবারে যে নিঝুমের পালা চলেছিল…
সবার হাসির মধ্যেই এদিকে চাহিয়া হঠাৎ আমায় সাক্ষী মানিল—“কি মশাই, একেবারে শ্মশান করে রাখেনি?”
আমার পিত্ত জ্বলিয়া যাইতেছিল, ভাবিয়াছিলাম যেরকম জুলুম করিয়া আনা, বোধ হয় একজন প্রকৃত হাস্যরসিকের সঙ্গ পাওয়া যাইবে, এ একেবারে চড়কতলার সং! উত্তর দিবার প্রবৃত্তি না থাকায় চুপ করিয়া ছিলাম, খুড়ো ভয় এবং দুঃখের অভিনয় করিয়া বলিল—“কি মশাই, একটু সমর্থন করুন, একা পড়ে যাচ্ছি যে,–করে রাখেনি শ্মশান?
একটু খুক খুক করিয়া শব্দ হইল, বোধ হয় একটি অপরিচিত ভদ্রলোককে এভাবে কোণঠাসা হইতে দেখিয়া। আমি বলিলাম—“আজ্ঞে, এতক্ষণ ততটা বুঝতে পারিনি, এখন শেয়াল ডাকার শব্দে আর সন্দেহ নেই বটে।”
খুক-খুক শব্দটা আরো কয়েক কণ্ঠে চারাইয়া পড়িল, খুড়ো একটু যেন অপ্রস্তুত হইয়া পড়িল; কিন্তু একেবারে দু’কান কাটা, তখনই সামলাইয়া লইল;—আমার দিক থেকে ফিরিয়া বলিল—“শুনলে তো? এইবার একটা বিড়ি কি সিগারেট ছাড়ো দিকিন, শেয়ালের গলা ভেঙে গেছে, একবার শানিয়ে নিতে হবে—”
—বলিয়া মুখটা উঁচু করিয়া হাত দুটো বাড়াইয়া ধরিল এবং গলাটা চাপিয়া ভাঙা গলার মতো করিয়া চেঁচাইয়া উঠিল—“হুয়া কাক্কা—বিড়ি! হুয়া কাক্কা—সিগারেট!”
আবার একটা প্রচণ্ড হাসির তোড় উঠিল এবং আমার পরাভবে কয়েকটা তির্যক দৃষ্টি আমার উপর আসিয়া পড়িল। এই সময় কোনো কারণে সিগন্যাল না পাওয়ায় গাড়িটা আসিয়া শেওড়াফুলিতে দাঁড়াইয়া পড়িল।
.
২
একজন চাষাভূষা গোছের লোক হঠাৎ ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া আমাদের গাড়ির হ্যান্ডেলটা ধরিল এবং ঘাড়টা প্লাটফর্মের দিকে ঘুরাইয়া হাঁকিল —“ইদিকে—ও ঘোষের পো! ও বদন! ও বেচারাম!…ইদিকে!”
গাড়ির পিছন দিক থেকে একসঙ্গে কয়েকটি কণ্ঠে উত্তর হইল—“এরা কইচে এ-গাড়ি লয়, উঠুনি তুমি…”
লোকটা পা-দানে একটা পা তুলিয়া দিয়াছিল, টানিয়া লইয়া একটু ভ্যাবাচাকা খাইয়া প্রশ্ন করিল, -”কারা—কারা কইচে গো?”
সিগন্যাল পাইয়া গাড়িটা হুইল দিল।
খুড়ো টপ করিয়া উঠিয়া পড়িল, দরজার দিকে ত্রস্তভাবে অগ্রসর হইতে হইতে বলিল—“না হে মোড়লের পো, এই গাড়ি, উঠে পড়ো, উঠে পড়ো, গাড়ি ছেড়ে দিলে বলে….”
ঝাঁ করিয়া দরজাটা খুলিয়া লোকটাকে একরকম টানিয়া তুলিয়াই দরজা দিয়া গলাটা বাড়াইয়া হাঁকিল—“এই গাড়িই গো ঘোষের পো, বোসের পো, বদনচন্দ্র, বেচারাম—উঠে পড়ো তোমরাও…”
গাড়িটা ছাড়িয়া দিল এবং যে হাসি বোধ হয় এইটুকুর জন্যই আটকানো ছিল সেটা একেবারে প্রবল বেগে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল। লোকটি কিম্ভুতকিমাকার হইয়া গেছে, গদি আটা গাড়ি, তাহার উপর যাত্রী সব একেবারে সেরা কাপড়চোপড় পরা ভদ্রলোক—গায়ে গন্ধ ভুরভুর করিতেছে— ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিল। খুড়ো একজনকে হাত ধরিয়া টানিয়া তুলিল, বলিল—“বাঃ, কী আমার মামার বাড়ির আবদার রে, মোড়লের পো দাঁড়িয়ে—আর উনি লবাব খাঞ্জাখার মতো গদিয়ান হয়ে বসে থাকবেন।…”
লহরে লহরে হাসি চলিতেছে। নিজের কোমরে বাঁধা সিল্কের চাদরটা তাড়াতাড়ি থিয়েটারি ঢঙে খুলিয়া জায়গাটা ঝাড়িয়া বলিল—“এই বোস কর্তা, কোথায় যাওয়া হবেন কর্তার?”
ঝুঁকিয়া দুই হাঁটুতে ভর দিয়া গভীর বিনয়ের অভিনয় করিতে হাসিটা আর একটা তোড়ে ভাঙিয়া পড়িল।
গাড়ি বেশ জোর দিয়াছে। আমি বিস্ময়ে একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গেছি। ভাঁড়ামি অনেক দেখিয়াছি, গা-জুরি ফূর্তি জমাইবার চেষ্টায় বরযাত্রীদের মধ্যে সেটা যে আরো কিরূপ বিকৃত রূপ ধারণ করে তাহারও অভিজ্ঞতাও কম নয় আমার, কিন্তু এ ধরনের ব্যাপার কখনো চাক্ষুষ করি নাই। একেবারে থ হইয়া গেছি। উচিত ছিল তখনই চেন টানিয়া দিয়া স্টেশনের লোক ডাকিয়া সদ্য সদ্য এর একটি বিহিত করা, কিন্তু যখন চৈতন্য হইল তখন গাড়ি অনেক দূর চলিয়া আসিয়াছে।
কোথায় যাইবে শুনিবার জন্য আমিও কৌতূহলী হইয়া সামনে ঝুঁকিয়া বসিলাম, খুড়োর প্রশ্নের উত্তরে লোকটা ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া বলিল—“আমি যাব বাবু সাঁইতেড়ে, মানকুণ্ডুর টিকিস আমার, সেখানে নেমে রেল পেইরে তারপর হাঁটা পথে চালদাডাঙা হয়ে বড় রাস্তায়…”
খুড়ো গভীর মনোযোগের সহিত শুনিতে শুনিতে মুখটা একটু কুঞ্চিত করিয়া খুব একটা হাসির কথা বলিবার সুযোগ খুঁজিতেছিল, বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল—“ও ব্বাবা মানকুণ্ডুতে নেমে, রেল পেইরে চালদাডাঙা হয়ে তারপর বড় রাস্তা। তারচেয়ে এক কাজ করো কত্তা—সাহেবগঞ্জে নেমে মোটরে করে একেবারে বিয়েবাড়িতে খ্যাটের আসনে—লুচি, পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, রাবড়ি মালাই!…”
ডান হাতটা ভূরিভোজনের ইঙ্গিতে মুখ এবং একটা কাল্পনিক পাত্রের মাঝে ওঠানামা করানোর সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত দলটার মধ্যে আবার হাসির একটা হা উঠিল, সেই সঙ্গে সঙ্গে নানারকম মন্তব্য : “হ্যাঁ, সাহেবগঞ্জেই চলো কত্তা…নিয়ে চলো খুড়ো…কত্তাকে ছাড়া হবে না…চলো হে কত্তা…রাবড়ি মালাইয়ের দেশ ঘুরে আসবে!…”
আমি আর সহ্য করিতে পারিলাম না, সামনে হেলিয়া বলিলাম—“মশাই, মাফ করবেন, এটা আপনাদের কি ধরনের রসিকতা হচ্ছে জিগ্যেস করতে পারি কি?”
হাসি-হল্লা সব একেবারে চুপ হইয়া গেল, খুড়োও একটু থতমত খাইয়া গেল। তাহার পর তাহার মুখটা খুব অল্প হাসির আভাসে একটু কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, হাতজোড় করিয়া আমার দিকে ঝুঁকিয়া আমারই মতো করিয়া বলিল,—মশাই, মাফ করবেন,—রসিকতার ধরনটা বললে আপনি বুঝতে পারবেন কি?”
খুক খুক করিয়া চারিদিকে আবার চাপা হাসির শব্দ উঠিল। আমি উত্তর করিলাম,—“বলুন না, চেষ্টা করে দেখি।”
“শৃগা-আ-আ-আল রসিকতা!”
উচ্চ উৎকট হাস্যে সবাই একেবারে ভাঙিয়া পড়িল; খুড়ো আমার দিক থেকে মুখটা ফিরাইয়া দলের দিকে ঘুরিয়া হুয়া কাক্কা-ক্কা-ক্কা করিয়া হাসির সঙ্গে শিয়ালের ডাক মিশাইয়া এমন একটা অদ্ভুত আর বিকট রব করিতে লাগিল যে হাসিটা আর থামার অবসর পাইল না অনেকক্ষণ ধরিয়া।
অবশেষে খানিকটা প্রশমিত হইলে আমি বলিলাম—“কিন্তু রসিকতার পরিণামটা কি ভেবে দেখেছেন?”
খুড়ো আমার দিকে ঘাড় বাঁকাইয়া গম্ভীরভাবে বলিল—“সাহেবগঞ্জে আসনে বসে লুচি, পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা…”
আবার হাসির তোড় নামিল, আমার রাগটা তখন বেশ বাড়িয়া গেল, হাসির উপরে গলাটা তুলিবার চেষ্টা করিয়া বলিলাম, “অতদূর পর্যন্ত এগুবার দরকার হবে না; চন্দননগরেই তার ব্যবস্থা করছি, একেবারে রাজ্য-অতিথি হয়ে লুচি পোলাও ওড়াবেন।—আপনারা একটা নিরীহ পাড়াগেঁয়ে লোককে জবরদস্তি ভুল গাড়িতে তুলে….
সবার হাসির মধ্যে খুড়ো গলাটা ওদের মধ্যে বাড়াইয়া ভয়ের অভিনয়ের সহিত চাপা গলায় বলিল, —“উকিল।”
আবার হাসিটা উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল। আমি আপাতত আর বাক্যব্যয় নিরর্থক দেখিয়া নিজের জায়গাটিতে ঠেস দিয়া বসিলাম। এটা পরোক্ষভাবে আমার হার স্বীকার করিয়া ধরিয়া লইয়া উহারা আরো ভালো করিয়া লোকটাকে লইয়া পড়িল। খুড়ো দুইটা সীটের পর বসিয়াছিল, লোকটার পাশে আসিয়া বসিতে বসিতে বলিল—“সরো দিকিন তোমরা, কত্তার সঙ্গে একটু আলাপ জমাই…তা তোমায় অত ভাবতে হবে না কত্তা, প্যাসেঞ্জারে সব মাটি মাড়াতে মাড়াতে আসতে, এ একেবারে শ্যাওড়াফুলি থেকে চন্দননগর, সঙ্গে-সঙ্গেই কত্তার জন্য ব্যান্ডেলের দিক থেকে ডাউন প্যাসেঞ্জার, তাইতে চড়ে টুপ করে এসে মানকুণ্ডু নেমে পড়া; সেই ভালো, না, সেই ধিকুতে ধিকুতে-ধিকুতে….”
লোকটা একেবারে অকুলে পড়িয়াছিল, একটা উপায় হওয়ায় খুড়োর শেষের দিকে খোঁড়ার চলনের নকল করিয়া বলিবার ভঙ্গিতে একটু হাসিয়াই ফেলিল, বলিল-”বাবুরা যখন রয়েছেন….
“কত্তা হেসেছে! কত্তা হেসেছে!” বলিয়া খুড়ো খানিকটা লাফাইয়া উঠিল; হাসির সঙ্গে ধুয়াটা সমস্ত গাড়িতে ছড়াইয়া পড়িল—“কত্তা হেসেছে! কত্তা হেসেছে!”
আমি মুখটা বাহিরের দিকে ফিরাইয়া লইলাম; শৃগাল-রসিকতার মধ্যে গাড়িটা মাঝের স্টেশনগুলো ছাড়াইয়া চন্দননগরে আসিয়া দাঁড়াইল।
.
৩
চন্দননগরে একজন ভদ্রলোক তাঁহার স্ত্রী আর তিন-চারটি ছেলেমেয়ে লইয়া দরজার সামনে আসিতে সকলে হই-চই করিয়া তাঁহাকে ভাগাইয়া দিল, অবশ্য খুড়োই অগ্রণী। ভদ্রলোক খানিকটা দূরে চলিয়া গেলে অস্ফুট স্বরে বোধ হয় কিছু একটা অভদ্র রসিকতা করিতে কাছাকাছির সবাই চাপা গলায় হাসিয়া উঠিল; যাহারা শুনিতে পাইল না কৌতূহলী হইয়া উঠিল, একটু কানাঘুষা হইল, তাহার পর সেই চাপা হাসিটা গাড়িময় চারাইয়া পড়িল। গা ঘিন-ঘিন করিতেছে, ইচ্ছা হইল নামিয়া যাই, কিন্তু সব গাড়িতেই অসহ্য ভিড়, জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব, গাড়ি থামিবেও অল্প, নিরুপায়ভাবে বসিয়া রহিলাম।
ইতিমধ্যে সেই লোকটা নামিয়া গেছে, বোধ হয় পুল পার হইয়া গিয়া থাকিবে। খুড়ো গলাটা বাড়াইয়া ডাকিল—“ও কত্তা! ও মোড়লের পো!”
তাহার পর হঠাৎ গলাটা নামাইয়া বলিল—“আরে উকিল করেছিলি, ফি নিয়ে আয় বেটা-লাউ ডাঁটা, কুমড়ো ডাঁটা যা হয়….”
আর একজন বলিল—“বেটা খুব ফাঁকি দিলে খুড়ো।”
আমি প্ল্যাটফর্মের উল্টাদিকে বসিয়া আছি, তবুও সব শুনিতে পাইতেছি, কেননা সেইভাবেই বলা। খুড়ো ঘাড়টা একটু বাঁকাইয়া–আড়চোখে তাহার পানে চাহিয়া খুব গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়া নাড়িয়া বলিল —“না, একেবারে ফাঁকি দেয়নি; তা কি পারে? বাপ রে, উকিল মানুষ।”
“কি দিয়েছে?—কি দিয়েছে খুড়ো?”—বলিয়া সকলে তাহার দিকে ঝুঁকিয়া পড়িতে আরো গম্ভীর হইয়া দুই হাতের বুড়ো আঙুল দুইটা নাড়িতে নাড়িতে বলিল—“কেন, অষ্টরম্ভা!”
সকলে খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল, তির্যকভাবে আবার অনেকগুলি চক্ষু আমার উপর আসিয়া পড়িল।
এমন সময় খুড়ো হই-হই করিয়া চেঁচাইয়া উঠিল—এসেছে! এসেছে! ওই দেখ! তোদের খুড়োর কথা মিথ্যে ভেবেছিস? বাবা এই মুখে শাপ দিলে আগে সঙ্গে সঙ্গে ভস্ম হয়ে যেত—বেশিদিনের কথা নয়, এইমাত্র কয়েক লাখ বছর আগে, দ্বাপরযুগে।…এইখানে! এইখানে! নিয়ে এসো হে।”
চন্দননগরের প্লাটফর্মে কলার কাঁদি বিক্রয় হয়—; খুড়োর “অষ্টরম্ভা”—বলার সঙ্গে সঙ্গে সত্যই কলা পৌঁছিতে দেখিয়া আবার একটা তুমুল হাসির ঢেউ উঠিল, সেই সঙ্গে একটা চিৎকার– “এসেছে অষ্টরম্ভা! অষ্টরম্ভা!”
ঠিক এই সময় একটা মোটাসোটা গোছের লোক, বোধ হয় ওদের অন্যমনস্কতার সুযোগেই গাড়িটাতে উঠিয়া পড়িল। ওদিকে স্টার্টার দিয়াছে, ইঞ্জিন বাঁশি বাজাইল।
কাঁদি লইয়া লোকটা সামনে আসিল।
“কত দাম?”
‘এজ্ঞে, তিন টাকা।”
“অত হবে না, দু’টাকায় রফা করো।”
গাড়ি ছাড়িয়া দিল।
“এজ্ঞে, আর চারগণ্ডা পয়সা দেন।”
“আচ্ছা দাও, দাও।”
খুড়ো কাঁদিটা লইয়া লইল। তাহার পর এক হাতে পকেট থেকে একটা ব্যাগ বাহির করিয়া বেশ ভালো করিয়া চাপিয়া ধরিয়া হাঁকিতে লাগিল—“ওরে আমার ব্যাগ থেকে দামটা বের করে দে না কেউ….দে না রে কেউ।” দু’একজন চেষ্টা করিল, কিন্তু বজ্র আঁটুনিতে উদ্দেশ্যটা বুঝিতে পারিয়া হাসিয়া ছাড়িয়া দিল, গাড়ি ততক্ষণে বেগ দিয়াছে; লোকটা কাতরাইতে কাতরাইতে অগ্রসর হইল, তাহার পর গোটাকতক বাছা বাছা গালাগালি ছাড়িতে ছাড়িতে পিছাইয়া গেল। খুব একটা হাসি পড়িয়া গেল।
একজন ছোকরা একটু সাধুতার ভান করিয়া রাগ-রাগ ভাবে বলিল—“না খুড়ো, এ ভারি অন্যায় হল, এরকম প্র্যাকটিক্যাল জোক….”
খুড়ো এক হাতে কাঁদিসুদ্ধ তাহার দিকে ত্বরিতে ঘুরিয়া অত্যন্ত বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করিল— “অন্যায়! অন্যায় কোন্খানটা? বুঝিয়ে দাও আমায়।” সবাই বড় কিছু একটা শুনিবার আশায় ঝুঁকিয়া পড়িল।
ছোকরা বলিল—’অন্যায় নয়? জিনিস নিয়ে দাম না দেওয়া…”
“দাম তো দিয়েছি! বাঃ!”
“দিয়েছ? কই?”
“অষ্টরম্ভার দাম অষ্টরম্ভা, তা আবার দেখতে পাবে নাকি?”
অনেকক্ষণের প্রত্যাশার পর হাসির রুদ্ধ বেগটা ছাড়া পাইয়া গাড়িটা যেন কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতে লাগিল। টিকা-টিপ্পনী-বচনে নরক যেন আবার গুলজার হইয়া উঠিল।
নিরর্থকই বলা, তবুও গায়ের জ্বালায় আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলাম না, আবার গলাটা বেশ উঁচাইয়া ওদের খুড়োকে লক্ষ করিয়াই বলিলাম—“মশাই, আপনারা মানুষ?”
সবার হাসি বন্ধ হইয়া গেল, শুধু গোটাকতক খুক-খুক শব্দ রহিল জাগিয়া। খুড়ো আবার খুব গম্ভীরভাবে আমার মুখের ওপর চোখ রাখিয়া বলিল—“আজ্ঞে না তো?”
“তা তো দেখছি, তবে কী আপনারা—তাই ঠিক করতে পারছি না।”
“আমরা?—আজ্ঞে, আমরা ছিলাম শেয়াল, এখন হয়েছি হনুমান।”
সঙ্গে সঙ্গেই মচ করিয়া একটা কলা ভাঙিয়া না ছাড়াইয়াই মুখে পুরিয়া দিয়া এবং গাল ফুলাইয়া কাঁদিটা কাঁধে করিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচ শুরু করিয়া দিল। এবার আর সবার হাসিতেও শেয়াল আর হনুমানের ডাক রহিল মেশানো,—সত্যই হার মানিয়া আমি আবার নিজের সীটে এলাইয়া পড়িলাম।
.
৪
কাঁদিটা বেশ প্রমাণ সাইজের, তার প্রায় আগাগোড়াই পাকা, হনুমান-পর্ব শেষ হইতে বেশ খানিকটা সময় লাগিল; হুল্লোড় যাহা হইল তাহাতে মনে হইতে লাগিল যে কিস্কিন্ধ্যার একেবারে মাঝখানটিতে বসিয়া আছি।
শেষ হইলে খুড়োর নবাগতের দিকে দৃষ্টি গেল, — ফাঁকতালে যেটি ঢুকিয়া পড়িয়াছে।
চাষাভুষো মানুষ, তবে মনে হয় যেন সচ্ছল অবস্থার। বেশ হৃষ্টপুষ্ট, সমস্ত শরীরে কোঁকড়ানো কোঁকড়ানো চুল, মুখে বড় বড় গোঁফ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কানেও লম্বা লম্বা চুল। গায়ে একটা ফতুয়া, তাহার আগাগোড়া খোলা, হাতে একটা দড়ি দিয়া বাঁধা ছাতা। নিশ্চয় থার্ডক্লাসের টিকেট, উঠিয়া নিজের ভুলটা বুঝিতে পারিয়া দোরের কাছটিতে গুটাইয়া সুটাইয়া বসিয়া আছে কতকটা অপ্রস্তুত এবং যেন একটু ভীতও।
কলা খাওয়া শেষ হইলে খুড়োর নজর পড়িল, কিম্বা বোধ হয় আগেই পড়িয়াছিল এবং ইতিকর্তব্য তখনই শেষ করিয়া ফেলিয়াছে। যেন হঠাৎ দেখিতে পাইয়াছে এইভাবে একটু থমকিয়া দাঁড়াইল, তাহার পর ভ্রূ দুইটা কুঁচকাইয়া গভীর অভিনিবেশের সহিত খানিকক্ষণ দেখিয়া বলিয়া উঠিল —“আরে, তুমি?”
আবার হাসি আরম্ভ হইয়া গেল, কয়েকজন জিজ্ঞাসা করিল—“চেনা নাকি খুড়ো?”
খুড়ো এক পা আগাইয়া গিয়া বলিল—“চেনা নয়!—কী বলছিস তোরা!—সখা জাম্ববান যে।”
শরীরে কেশের বাহুল্যের জন্য বলা, সকলে হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল।
লোকটিও একটু অপ্রতিভ হইয়াছে এবং বোধ হয় ভুলটা ভাঙিবার জন্যই কতটা খোশামোদের ঢঙে একটু হাসিয়া মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—“আজ্ঞে আমার নাম রিদয় মালাকার, বাড়ি বাসুলি, বংশবাটির সন্নিকটে।”
খুড়ো আস্তে আস্তে যাত্রার ঢঙে আগাইয়া গিয়া দুই হাত দিয়া লোকটির দুই বাহু ধরিয়া তুলিবার চেষ্টা করিতে করিতে বলিল—“ওঠো সখা, এ প্রবঞ্চনা কেন—বহুদিন পরে দেখা হলেও কি ভুল করতি পারি, আমি? বলো বলো আমাদের প্রভুর কি সংবাদ, ওঠো তুমি, এরকম করে বসে কেন সখা?”
তারপর ঘাড় ফিরাইয়া কয়েকজন সঙ্গীকে লক্ষ্য করিয়া বলিল—“সখা নল, সখা নীল, সখা গয়, সখা গবাক্ষ, তোমরা উঠে দাঁড়াও আমি জাম্ববান সখাকে উপবিষ্ট করাই।”
“এই যে আসুন, আসুন”—বলিয়া হাসির মধ্যে চারজন উঠিয়া দাঁড়াইল।
লোকটি খুব অপ্রতিভ হইয়া গিয়া কাতরভাবে বলিতে লাগিল—“আমায় কেন? আমায় ছাড়ান দেন, আমি গরিব চাষাভুষো মানুষ, আপনাদের সঙ্গে বসবার যুগ্যি নয়-
কিন্তু কোনো ফল হইল না, যত আপত্তি ততই বেশি হই-চই-এর মধ্যে তাহাকে তুলিয়া উপরে বসাইয়া দিল খুড়ো, নিজেও পাশে বসিল। নানারকম ভাঁড়ামি লাগাইয়া দিল। লোকটির বয়স হইয়াছে, তাহার উপর একেবারে হেলো চাষা নয়, সম্ভ্রম-জ্ঞান আছে, প্রথমটা হাসিয়া কাটাইবার চেষ্টা করিল, তাহার পর রাগিয়া গেল। তাহাতে ভাঁড়ামি, আর সেই সঙ্গে হাসির মাত্রা আরো গেল বাড়িয়া, খুড়ো একটু তফাতে ছিল একেবারে গায়ে এলাইয়া পড়িয়া বলিল-”এ কি সখা, এত বিরূপ কেন? আহ! সখার গা কি মোলায়েম, যেন তুলোর বস্তায় শুয়ে আছি, সখা আবার ইন্টার ক্লাসকে ফার্স্ট ক্লাস করে দিয়েছেন। এমন না হলে আর সখা! আহ্!”
লোকটা রাগিয়া একটু সরিয়া বসিতে খুড়ো সরিয়া গিয়া আরো চাপিয়া বসিল। ফল নাই জানিয়াও আমি নিতান্ত অসহ্য হওয়ায় আবার বলিলাম—’মশাই আপনাদের কি একটা সীমা জ্ঞানও নেই? দূরে দূরে যা হচ্ছিল, হচ্ছিল—একেবারে গায়ে পড়ে…একটা বয়স্থ লোক…”
খুড়ো আমার দিকে চাহিলও না,—ঘাড়টা ঘুরাইয়া লোকটির একেবারে মুখের কাছে মুখ লইয়া গিয়া যাত্রার ঢং-এ বলিল—“সখা কি দেহরক্ষীকেও সঙ্গে করে এনেছ?”
প্রবল তোড়ে আবার একটা হাসি উঠিল। অনেকে এবারে সোজাসুজিই আমার পানে ফিরিয়া চাহিল।
একজনকে স্বপক্ষে পাইয়াই বোধ হয় লোকটি আরো চটিয়া দাঁড়াইয়া উঠিতে যাইতেছিল, খুড়ো দুইটা হাত চাপিয়া ধরিল, বলিল—“এ কি সখা। তা কি হয়?” তাহার পর হাত দুইটা ধরিয়াই একটু ঘুরিয়া পিঠ দিয়া চাপিয়া বলিল—“অমন উলট গাও কেন বাবা? গাড়ির জন্য ভাড়া দিচ্ছি, না হয় তোমাকেও ভাড়া দেব—এমন নরম ঠেস দেওয়ার গদি ছাড়ব না…আহ্ তোমরা একটু ধরে থেকো গো সখাকে, কেউ একটা সিগারেট ছাড়ো দিকিন।”
ব্যান্ডেল স্টেশন আসিয়া গেছে। লোকটি নিরুপায় হইয়া বসিয়াছিল, বলিল,—“এবার আমায় ছেড়ে দিন, নামব।”
“মাইরি প্রাণ!”—বলিয়া খুড়ো সোজা হইয়া বসিল, নূতন হাসির হররার মধ্যে বলিল- “আমি গুছিয়ে ঠেস দিয়ে বসে সিগারেটটি ধরাব ভাবছি, আর তুমি বেরসিকের মতন নেমে যাবে? মাইরি!”
প্লাটফর্মে ঢুকিয়াছে গাড়ি। লোকটা ফতুয়ার পকেট থেকে একটা থার্ড ক্লাসের টিকিট বাহির করিয়া বলিল—“এই দেখুন না মশাই, মিথ্যা কইব কেন?”
খুড়ো হাতে টিকিট লইয়া পড়িতে পড়িতে যেন অজ্ঞান হইয়া যাইবার মতো হইয়া পড়িল, অতি ক্ষীণ অভিনয়ের স্বরে বলিল, “অ্যাঁ! সত্যই সখা জাম্ববান চললেন আমার! অ্যাঁ—”
লোকটা প্লাটফর্মে নামিয়া একরাশ অশ্রাব্য গালাগালি দিতে দিতে চলিয়া গেল। তাহাতে আরো একটা প্রবলতর হাসি উঠিল মাত্র। থামিলে খুড়ো বলিল—“একটু চটে না গেলে জমে না। তা হঠাৎ নেমে গেল যে বেটা ঠিক জমে ওঠবার মুখটিতে—”
আমার পানে একটা আড়ে কটাক্ষ করিল, তাহার পর উঠিতে উঠিতে বলিল—“আমি এবার যাই ও-গাড়িতে—তোরা থাক লক্ষ্মীটি হয়ে। বখামি না করে বরং কিছু তত্ত্বকথা শোন, পরকালে কাজ দেবে।”
আর একবার আমার দিকে কটাক্ষ হানিল। একটা তুমুল কলরব উঠিল, কয়েকজন ধরিয়া ও ফেলিল—“না খুড়ো, তুমি গেলে চলবে না, তুমি গেলে আমরা অনাথা হব খুড়ো!…এ কি বাবা, নিজেও শেষকালে উল্টো গাওনা ধরলে!—দর বাড়াচ্ছ কেন খুড়ো?…”
খুড়ো হাসিয়া বলিল—“না রে, আমার কাছে সব—টাকাকড়ি, টিকিট বিলকুল বুড়ো আমার কাছে রেখে দিয়েছে, এমনকি ওদের সেকেন্ড ক্লাসের পাঁচখানা পর্যন্ত।
পকেটে ব্যাগটা বাজাইয়া দিল।
সবাই আবার চিৎকার করিয়া উঠিল—“ব্যাগ কি তোমার আমরা কেড়ে নিচ্ছি?…সে হবে না খুড়ো…এই তো পাশের গাড়িতে রয়েছে বাপ।”
খুড়ো যেন জ্বালাতন হইয়া পড়িবার ভান করিয়া হাসিয়া বলিল-”তোরা বুঝছিস না, বুড়ো ওদিকে হেদুচ্ছে; ও-গাড়িতেও এক মেড়োকে নিয়ে দিব্যি জমিয়ে আনছিলাম, তোরা মাঝখানেই গিয়ে…?”
কলরবটা বাড়িয়া উঠিল— তুমি ঠিক দর বাড়াচ্ছ খুড়ো… আমরা সত্যাগ্রহ করব।….”
আমি ভাবিয়াছিলাম বরকর্তাকে গিয়া বলিব; সে-ও এই দলের দেখিয়া কি করিব ভাবিতেছি, এমন সময় নিতান্ত হন্তদন্ত হইয়া একটি লোক দোরের হ্যান্ডেলটা ধরিয়া ব্যস্ত মিনতির স্বরে বলিল- “বাবুরা একটু জায়গা দিন, আমি, দাঁড়িয়েই থাকব।”
আমি অপরিসীম বিস্ময়ে তাহার মুখের পানে চাহিয়া রহিলাম।… লোকটার কপালে তিলক, নাকে একটি রসকলি, গলায় তুলসীর কণ্ঠী; নিচে বোধ হয় একটা পিরান আছে, তাহার উপর একটা মোটা মটকার চাদর ছড়ানো, পায়ে কট্কী চটি।…
দরজার কাছে যে দাঁড়াইয়া ছিল, ফিরিয়া প্রশ্ন করিল—“কি খুড়ো?” …
খুড়ো ভিতরের দিকে ছিল, চোখ টিপিয়া ঘাড়ে একটা ঝাঁকানি দিল, তাহার পর চাপা গলায় বলিল—“আরে আসতে দে বেটা,–বোষ্টম বাবাজি না হলে চটিয়ে সুখ!…”
“আসুন বাবাজি! আসুন, আসুন! কি সৌভাগ্য আমাদের আজ! আসুন-আসুন!”—বলিতে বলিতে অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে দুই হাত প্রসারিত করিয়া আগাইয়া গেল।
আমি একটি নিঃশ্বাস মোচন করিলাম এবং কতক্ষণ পরে আমার মুখেও একটু হাসি দেখা দিল। হুইস্ল দিয়া গাড়ি ছাড়িয়া দিল।
লোকটি উঠিয়া একবার অবোধ দৃষ্টিতে চারিদিকে চাহিয়া লইল, তাহার পর অপ্রতিভভাবে একটু হাসিয়া গাড়ির দেয়ালে ঠেস দিয়া দাঁড়াইতে যাইতেছিল, খুড়ো তাহার হাত দুইটা ধরিয়া গভীর মিনতির স্বরে বলিল—“ওকি প্রভু, আপনি দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা কি করে বসব?–আসুন, আধ আঁচরে বসুন…”
লোকটি আরো অপ্রতিভভাবে হাসিয়া বলিল—“না বাবুরা, আপনাদের সাথে কি আমি বসতে পারি? আমার টিকিসও থাট্ কেলাসের…”
খুড়ো সবার দিকে চাহিয়া লইয়া বলিল—“ওগো, তোমরা সবাই শোনো, প্রভুর আমার থাট কেলাসের টিকিস্! থাট্ কেলাস! থাট্ কেলাস!…
কলরবের মধ্যে একজন গলা উঁচাইয়া বলিল—“আমাদের সব টিকিট প্রভুকে সমর্পণ করলাম, উনি আসুন।”
একটা নারকীয় কলরব উঠিল— “হ্যাঁ, আসুন!… প্রভুর ভাবনা কি? — পাঁচখানা সেকেন্ড ক্লাস, কুড়িখানা ইন্টার ক্লাস টিকিট প্রভুর শ্রীচরণে নিবেদন করছি!…আমরা বেঁচে থাকতে প্রভুকে কে কি বলবে?…”
খুড়োও জোর দিল, আরো দু’একজন সাহায্য করিল, টানিয়া ঠেলিয়া লোকটিকে একটা কোণে, সবচেয়ে ভালো জায়গাটিতে আনিয়া বসাইল। খুড়ো একেবারে পাশটিতে বসিল।
আবার সেই ব্যাপার চলিল। আগেকার লোকটির মতো না হোক, তবুও বেশ গোলগাল চেহারা লোকটির; খুড়ো বাহু কাঁধ টিপিয়া টিপিয়া বলিল—“আহ্, কি নরম!-মালপো সাঁটিয়ে সাঁটিয়ে প্রভুর আমার সমস্ত শরীরখানি মালপো হয়ে উঠেছে! কোথায় আশ্রমটি প্রভুর? গিয়ে দিনকতক থাকতে হবে।”
“আমাদেরও সঙ্গে নিয়ে খুড়ো…মালপো আর মালসাভোগ!”
লোকটা কিন্তু চটার ধার দিয়াও যাইতেছে না, অমন করিয়া ঠেলিয়া আনার মধ্যেও নয়, টীকাটিপ্পনীর মধ্যেও নয়। সেই মৃদু হাসি আর অপ্রতিভ দৃষ্টি লইয়া সত্যই বৈষ্ণবোচিত বিনয়ের সঙ্গে বসিয়া আছে। বলিল—“মালপো মালসাভোগ কোথায় পাব বাবুরা? গরিব গেরস্ত মানুষ—আমি আশ্রমই বা কোথায় পাব—মালপোই বা কোথায় পাব?…”
খুড়ো হঠাৎ সরিয়া বসিল, বেঞ্চের উপর পা দুইটা তুলিয়া লোকটির গায়ে পিঠ দিয়া কীর্তনের ঢঙে গাহিয়া উঠিল—“ওগো এই সেই আশ্রম পেয়েছি! এই সে আমার শ্যামের কুঞ্জ–এই সে আশ্রম পেয়েছি…আমি নড়ব না গো… আমায় একটু তোরা গুড়ুক দে গো—আমি নড়ব না গো!”
নারকীয় উল্লাসের মতো তিন-চারজন সিগারেট আর দেশলাই বাড়াইয়া ধরিল। খুড়ো একটা ধরাইয়া ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে আঁকর জুড়িয়া জুড়িয়া গাইতে লাগিল—“হও যদি নিষ্ঠুর প্রিয় তোমার কুঞ্জের ভাড়া নিয়ো; আমি নড়ব না গো…তুমি কড়ায় গণ্ডায় চুকিয়ে নিয়ো….আমি না ছোড়ব এ মিলন কুঞ্জো-ও-ও-ও!…”
লোকটি কোণঠাসা হইয়াই ছিল, যতটা পারিল আরো গুটাইয়া-সুটাইয়া বসিল। খুড়ো পিঠ দিয়া আরো চাপিয়া ধরিয়া বিনাইয়া বিনাইয়া কীর্তন গাহিতে লাগিল। কোনোরকমে চটাইবার চেষ্টা; বুঝিতে পারিতেছে ভাঁড়ামিতে একঘেঁয়েমি আসিয়া পড়িতেছে, না চটাইলে হাসির খোরাক জোগানো দুষ্কর হইয়া উঠিবে। দু’একবার আমার পানেও চাহিল, বেশ বুঝিতেছি অভাবে যদি আমিই চটি তো এবার আমায় লইয়া পড়িতে ওর বাধিবে না। আমার আর সে সুযোগ দিবার প্রয়োজন নাই, চুপটি করিয়া নিজের জায়গায় বসিয়া দেখিতে লাগিলাম।
গাড়ির দৌড়টা এবার বড়, ব্যান্ডেল ছাড়িয়া একেবারে বর্ধমানে থামিবে। মিলন হইল, মাথুর হইল, খুড়ো কখনো সাজিল রাধা, কখনো সাজিল বৃন্দা, শ্রীকৃষ্ণের নাক টিপিয়া, দাড়ি ধরিয়া অত্যাচারের চূড়ান্ত করিল। শেষে “তোর পীত ধড়া কেড়ে লব…!” বলিয়া তান ধরিয়া মটকার চাদরের খানিকটা পর্যন্ত টানিয়া লইয়া নিজের গায়ে জড়াইয়া লইল। স্টেশনের পর স্টেশন ছাড়াইয়া গাড়ি ছুটিয়া চলিয়াছে। এদিকে হুল্লোড়ের এতটুকু বিরতি নাই। লোকটা কিন্তু চটিল না, সেইভাবে অসীম ধৈর্যে গুটাইয়া বসিয়া রহিল, মাঝে মাঝে শুধু একটা মিনতি, একটা বিনয়—“আমাকে নিয়ে কেন?— আমি আপনাদের পায়ের ধুলোর যুগ্যিও নয়, গরিব বোষ্টম….”
আমি দৃষ্টি যতটা সম্ভব সূক্ষ্ম করিয়া লইয়া নিজের কোণটিতে বসিয়া দেখিয়া যাইতেছি। হ্যাঁ, ধৈর্য বলিতে হয় তো এই একেই!
সেরামপুর থেকে বর্ধমান—হাসি ক্লান্ত হইয়া আসিয়াছে, এর পরে বোধ হয় চাদরটা একেবারে টানিয়া বাহিরে ফেলিয়া দেওয়া ভিন্ন অন্য রসিকতা খুড়োর হাতে ছিল না; কিন্তু সেটুকু বাকি রহিয়া গেল। বর্ধমান আসিয়া গেল, এবং বাবাজি অনুনয়-বিনয়ের সঙ্গে চাদরটা ছাড়াইয়া লইয়া নিজের গায়ে জড়াইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, এখানে নামিয়া তাহাকে কাটোয়ার গাড়িতে চড়িতে হইবে। একটা খুব হই-হই হইল আবার—খুড়ো চিৎকার করিয়া ঘন ঘন মুর্ছা যাইতে লাগিল, অন্য সবাই মিনতি করিয়া, জোর করিয়া বাবাজিকে ধরিয়া রাখিবার অভিনয় করিল, তাহারই ভিতর একই ধরনের হাসি লইয়া বিনয়বচন আওড়াইতে আওড়াইতে লোকটা নামিয়া প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের মধ্যে মিশিয়া গেল।
আমি আমার সুটকেসটা লইয়া সঙ্গে সঙ্গেই উঠিয়াছিলাম, ধরিলাম গিয়া একেবারে বাহিরে, যেখানে ঘোড়ার গাড়িগুলা দাঁড়ায়। বলিলাম—“তোমার সঙ্গে একটা দরকারি কথা আছে, একটু আমার সঙ্গে আসতে হবে।”
লোকটা এরই মধ্যে বেশভূষা অনেকটা বদলাইয়া ফেলিয়াছে, থতমত খাইয়া একটু মুখের পানে চাহিয়া রহিল, তাহার পর প্রশ্ন করিল, “আমায় বলছেন? কেন?”
বলিলাম, “সেটা এখানে বললে ভালো হবে কি?”
একটু বিস্মিতভাবে চাহিল, বলিল—“বাঃ, কেন মশাই আপনাকে তো চিনি না।” কিন্তু আমার পিছনে পিছনে আসিল। আমি সদর রাস্তায় একটা অপেক্ষাকৃত নির্জন আধ-অন্ধকার জায়গায় গিয়া দাঁড়াইলাম; নির্জন, অথচ লোক ডাকিলেই লোক জোটানো যায়।
বলিলাম—“তুমি আমায় চেনো না, কিন্তু আমি চিনি, এর আগে তোমায় দেখি ধানবাদে, একটি সোনার ঘড়িসুদ্দু রেলওয়ে পুলিশ তোমায় প্লাটফর্ম দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল; তিন বছর আগেকার কথা…” লোকটা আবার উল্টা চাপ দিবার চেষ্টা করিল— “বাঃ, তুমি ভদ্দরলোক সেজে রাহাজানি করবার মতলবে আছ—ভয় দেখিয়ে?–বাঃ, এক্ষুনি আমি লোক জড়ো করব…
বলিলাম—“তা করবে না, ভয় নিজেরই আছে তোমার। তোমার পকেটে কুড়িখানা ইন্টারক্লাস পাঁচখানা সেকেন্ড ক্লাস আর বাহাত্তরটি নগদ টাকাসুদ্দু একটা ব্যাগ আছে; যাদের ব্যাগ, তাদের গাড়ি এখনো ছাড়েনি—ডাকবে লোক? তাহলে আর আমায় কষ্ট করে চেঁচাতে হয় না।”
লোকটা হাঁ করিয়া আমার মুখের পানে চাহিয়া রহিল।
বলিলাম—“ভয় নেই; আর কিছু বলছি না, তবে ব্যাগটি বের করো। আজ হজমটা আর করতে পারবে না, বাজে মেহনত হল। নাও চটপট; আমায় সত্যিই কাটোয়া লাইনে যেতে হবে।”
ব্যাগটা বাহির করিল। তাহার পর মুখের পানে একটু আমতা আমতা করিয়া বলিল—“আধা-আধি…আসুন…যখন ভাই বেরাদারির মধ্যেই….”
ব্যাগটা লইয়া দশ টাকার একটি নোট হাতে দিয়া বলিলাম—“এটা তোমার ভাড়া, বাকিটা আর একজনকে পাঠাতে হবে। পিঠে ঠেস দেওয়ার জন্যে বলছিল না ভাড়া দেবে? তা এই তোমার ভাড়া…যাও এবার লক্ষ্মী ছেলেটির মতন…”
.
বাহাত্তর টাকার কথাটা ভাঁওতা আমার, গুনিয়া দেখিলাম বোধ হয় রাহাখরচ ইত্যাদি বাবদ তেত্রিশ টাকা তেরো আনা পয়সা রহিয়াছে। পরদিন মনিঅর্ডার করিয়া বাকি টাকাটা হৃদয়নাথ মালাকারের কাছে পাঠাইয়া দিলাম—গ্রাম বাসুলী, পোস্টআফিস বংশবাটী, জেলা হুগলি।
তবু এখনো গায়ের জ্বালা মেটে নাই; অনুতাপ হওয়া তো পরের কথা
