ছোট বৌমা – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

ছোট বৌমা

একটা দরকারী কাজে দোতলায় শ্বশুরের ঘরে প্রবেশ করিতে গিয়া কনক দেখিল পর্দার পিছনে দুয়ারটা ভেজানো। তবুও করিত প্রবেশ, কাজটা বিশেষ দরকারী, কিন্তু কানে গেল শ্বশুর-শাশুড়িতে কি কথাবার্তা হইতেছে, আওয়াজ শুনিয়া মনে হইল যেন গোপনীয়। একবার ভাবিল নামিয়া যাই—তাহাই তো উচিত, শ্বশুর-শাশুড়ি গুরুজন; তাহার পর দেখিল সে ধরনের কথাবার্তা কিছু নয়, শ্বশুর খুব জোর দিয়া বলিতেছেন—“ওগো না, সে হতে পারে না, তার সামনে পরীক্ষা, সামান্য একটা অন্নপ্রাশনের ব্যাপারে তাকে আসতে বলা চলে না। সে তো আসবার জন্যে পা বাড়িয়ে আছেই।”

শাশুড়ির গলাটা আর একটু চাপা, বলিলেন—“তবে ছোট বৌমাকেও না আনালে চলত।”

“ছোট বৌমার তো পরীক্ষা নেই।

“যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বোলো না, খালি বই মুখস্থ করেছ আর পরীক্ষা দিয়েছ, কিসে কি যে হয় তা তো জানো না।”

“খুব জানি, খুব জানি। তুমি যাও এখন, প্রতুলের আসা হবে না।…পরীক্ষার কথা বলছ, যারা দেয় তারা ওর দাম বোঝে; অত কথা কি, বৌমাকেই জিগ্যেস করো, একটা হোক আধখানা হোক পাস দিয়েছেন, পরীক্ষার মর্যাদা…”

“তাঁকে জিগ্যেস করতে যাব—ও বৌমা, ডেকে আনাব নাকি প্রতুলকে?…পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে তো এই বুদ্ধি হয়েছে তোমার!”

“জিগ্যেস করবার আবার রকমফের আছে, তারও শিক্ষা চাই—শিখেছ তো শুধু যমপুকুর ব্রত আর আড়িপাতা…”

কনক জিভ কামড়াইল, এমন কিছু হাতিঘোড়া না হোক, তবুও তো মিডল ইংলিশ পাস সে, –ভালো হইতেছে কি আড়িপাতাটা?”

পা কিন্তু উঠিল না, যেন কামড়াইয়া বসিয়া গেছে।

শাশুড়ি বলিলেন—“কি করে জিগ্যেস করতে হয় না হয় বাতলেই দাও, পাস করা বুদ্ধির দৌড়টা দেখি একবার।…মরিঃ!”

“কেন, যখন পাঁচজনে বসে আছ, খোকার অন্নপ্রাশনের কথাটা তুললে, তারপর প্রতুলের পরীক্ষা, তাকে আসতে লিখতে পারা গেল না, এ কথাটাও একটু দুঃখ করে বললে, তারপর কোনোদিকে চাইবার ভান করে একবার ছোট বৌমার মুখের ভাবটা দেখে নিলে—এই তো জিগ্যেস করা হয়ে গেল; কথা কয়েই যে জিগ্যেস করতে হবে তার মানেটা কি?”

“জ্বালিয়ো না বাপু, মুখের ভাব বোঝবার জন্যে অত কাণ্ড করবার তোমাদেরই দরকার হয়, খুব সূক্ষ্ম বুদ্ধি কি না। মুখের ভাবটা যেন এমনই দেখতে পাচ্ছে না লোকে!…বেশ, ধরো তোমার বুদ্ধি খাটাবার পর যদি দেখা গেল, শুনেই মুখটি এতটুকু হয়ে গেল, তখন?…দেবে তো লিখে আসতে?”

সুন্দর চালটি চালিয়াছেন শাশুড়ি, যখন মনে মনে পাশের চেয়ে যমপুকুর-ব্রত-করা বুদ্ধিরই প্রশংসা করিল, কি উত্তরটা হয় এবার শুনিবার জন্য উৎকণ্ঠিত হইয়া রহিল। শ্বশুর বেশ একটু চুপ করিয়া রহিলেন, তাহার পর বলিলেন—“আমার তো বিশ্বাস—মুখটি এতটুকু হয়ে যাবে বলে যা ভয় করছ তা হবে না, সেরকম অবুঝ মেয়েই নয়; নিজেরই পুত্রবধূ, চিনি না আর?”

“ধরো যদি হয়?”

শ্বশুর আবার চুপ করিয়া গেলেন। শাশুড়ির বুদ্ধিতে কনকের এত আনন্দ হইতেছে! ও যেন দেখিতে পাইতেছে শ্বশুর বোকা বনিয়া শাশুড়ির মুখের পানে হাঁ করিয়া চাহিয়া আছেন।… তাহার পর শ্বশুর বলিলেন—“যদি হয়?—যদি হয়?…যদি হয় মনে করো তো তারও উপায় আছে; ও-রকমভাবে না জিগ্যেস করে বরং বলো—খুব দুঃখ করেই বলো—প্রতুলকে লিখলাম আসতে — আজ চিঠি এসেছে— সামনে পরীক্ষা, কোনোমতেই আসতে পারবে না…”

শাশুড়ি চুপ করিয়া গেছেন, কনকও একেবারে স্তম্ভিত—মানুষটির পেটে এই রকম জিলিপির প্যাঁচ!

একটু থামিয়া শ্বশুর আবার বলিয়া চলিলেন—“বরং একটু বুদ্ধি খাটিয়ে বিনিয়ে বিনিয়ে আরো দুঃখ করতে পারো—আজকালকার ছেলের শুধু ‘পাস-পাস’ বাই হয়েছে—প্রথম নাতির অন্নপ্রাশন, তুই আসতে না পারায় আমাদের যে কী কষ্ট হল সেটা একবার ভেবে দেখবিনি?—আর তুইও তো কাকা—প্রথম ভাইপো তোর?…বৌমার সামনে এইরকম করে বিনিয়ে বিনিয়ে বললেই তিনি মনে করবেন’খন প্রতুলই আসতে চাইলে না।”

শাশুড়ি চুপ করিয়া গেছেন; কনক যেন স্পষ্ট দেখিতেছে শাশুড়ি বোকা বনিয়া শ্বশুরের মুখের পানে হাঁ করিয়া চাহিয়া আছেন।

কিন্তু এর উত্তরটা তো খুব সোজা, চিঠিতে কিংবা যখনই প্রতুলের সঙ্গে দেখা হইবে ওঁদের বৌমার তখনই যে কথাটা ফাঁস হইয়া যাইবে। ছেলে-বৌয়ের সামনে মিথ্যাবাদী হওয়াটা কি এতই গৌরবের কথা? এই সোজা প্রশ্নটুকু আর মাথায় আসিতেছে না শাশুড়ির? অথচ এত বড় একটা সংসারের গিন্নি! এর ভেতরে শ্বশুরের যে কী মস্ত বড় চাল রহিয়াছে সেটাও বুঝিবার ক্ষমতা নাই? ছেলে-বৌয়ের কাছে মিথ্যাবাদী হইতে শাশুড়িই হইলেন, শ্বশুর অনেক পাস দেওয়া চালাক লোক, দিব্যি আড়ালেই রহিয়া গেলেন—কেহ তো তাঁহার কাছে কথাটা ভজাইতে যাইবে না? পুরুষরা যে কত চালাক, এতদিন একসঙ্গে ঘর করিয়াও সে হদিস পাইলেন না শাশুড়ি। কী গো…! সত্যিই নেহাত যম-পুকুর করা বুদ্ধি!

শাশুড়ি যতই হাঁদার মতো চুপ করিয়া আছেন, উত্তরগুলা ততই যেন কনকের পেটে গজগজ করিতেছে, কনকের যেন ছটফটানি ধরাইয়া দিতেছে। কথাবার্তা নাই, সেইজন্য আড়িপাতিতেও ভয় হইতেছে,—যদি হঠাৎ দোর খুলিয়া বাহির হইয়া আসেন শাশুড়ি!

শ্বশুরই প্রশ্ন করিলেন—“কি, উত্তর দিচ্ছ না যে?”

শাশুড়ি চুপ করিয়াই আছেন। কনক আবার দম বন্ধ করিয়া উৎকণ্ঠিতভাবে দাঁড়াইয়া রহিল, —যাক, রাগ করিয়াছেন শাশুড়ি, এও মন্দ নয়, বরং আরো ভালো, অবুঝ মানুষদের কাছে রাগই ঠিক অস্ত্র।

শ্বশুর আবার প্রশ্ন করিলেন—“বলি মুখ ঘুরিয়ে রইলে যে—কথাগুলো মনে ধরল না?”

কোনো উত্তর নাই। তীব্র উৎকণ্ঠায় কনক দাঁতে ডান হাতের একটা নখ প্রাণপণে চাপিয়া ধরিয়াছে, যেন তাহার শক্তিতে শাশুড়ির মনে শক্তিসঞ্চার হইবে।

শ্বশুর আর একবার তাগাদা দিলেন—“বলি, ধরল না মনে কথাগুলো?”

“বড় মনে ধরবার কথা, তাই ধরবে মনে!”

উত্তর না দিলেও ছিল ভালো আরো খানিকক্ষণ, তা যাক ঝাঁজ আছে কথাগুলায়; কনক সেইভাবেই কান পাতিয়া রহিল।

শ্বশুর বলিলেন—“তার মানে?”

“তার যা মানে তা বোঝবার ক্ষ্যামতা নেই তোমাদের। আমাদের লেখাতে আসতে চাইলে না শুনলে কি ফল হবে জানো? একটু তলিয়ে দেখবার মতন বুদ্ধি আছে?”

শ্বশুর একটু চুপ করিয়া যেন তলাইয়া দেখিবার চেষ্টা করিলেন, তাহার পর হার মানিয়া বলিলেন—“না পারলাম না; আমাদের একটু মোটা বুদ্ধি।”

“তা সত্যিই মোটা বুদ্ধি, গুমোরটাই সম্বল,—ওই কথা যদি শোনেন তো ছোট বৌমা নিজে তাকে লিখবেন না ভেবেছ? এই জন্যেই বলছিলাম…”

শ্বশুর একেবারে শিহরিয়া উঠিলেন, বলিলেন—“নিজে লিখবেন! জানাজানি হয়ে যাবার ভয় নেই?”

শাশুড়ি বিরক্তভাবে উঠিতে উঠিতে বলিলেন—“কি গেরো গা! এমন মনিষ্যির পাল্লায়ও পড়ে মানুষে! ছেলে এসে কি তোমার কানে কানে বলতে যাবে চিঠির কথা যে জানাজানি হবার….

পা টিপিয়া টিপিয়া তাড়াতাড়ি নামিতে নামিতে সিঁড়ির মোড় পর্যন্ত কনক এইটুকুই শুনিল, তাহার পর দুয়ার খোলার শব্দ হইল।

.

সমস্ত দিন মুখটা এত শুকাইয়া রহিল কনকের যে লুকাইয়া লুকাইয়া কাটাইতে হইল; বিশেষ করিয়া আড়ি পাতিতে গিয়া শাশুড়ির মুখের ভাব বুঝিবার যেরকম ক্ষমতার কথা শুনিল। তবু কয়েকবার নজরে পড়িয়া যাইতে যে না হইল এমন নয়, মাথার ব্যথা বলিয়া কাটাইয়া দিল, শাশুড়ি এখন যাহাই বুঝুন না কেন, উপায় কি?

পরের দিন সত্যই মাথাটা একটু ধরিল, একটা মস্ত বড় আশাভঙ্গ তো? বাপের বাড়ি থাকিতে প্রতুল অনেকদিন যায় নাই, এই একটা উপলক্ষে শ্বশুরবাড়ি যদি এতদিন পরে আসিল, শ্বশুর অমনি তাঁহার ছেলের পরীক্ষার জন্য দুশ্চিন্তায় পড়িয়া গেলেন। জগতে তাঁহার ছেলেই এক পরীক্ষা দেয়, আর তো কেহ দেয় না! এমন জানিলে কনক বাপের বাড়িই মাথাব্যথার নাম করিয়া পড়িয়া থাকিত।

মাথাটা ছাড়িল সন্ধ্যার পর। মনটা প্রফুল্ল হইয়াছে একটু, কনক খানিকটা এ-ঘর সে-ঘর করিয়া কাটাইল। কাজের বাড়ি, একটু-আধটু আয়োজন আরম্ভ হইয়াছে, হাসিয়া গল্প করিয়া কিছু কিছু কাজও করিল। তাহার পর মনে স্ফূর্তির হঠাৎ একটা স্রোত নামিলে যেমন হয়, যে-শ্বশুরের উপর রাগ আর অভিমান তাঁহারই জন্য মনটা হঠাৎ কেমন করিয়া উঠিল। এদিকে যাহাই হোক, বড় স্নেহশীল মানুষ- বিশেষ করিয়া কনককে বড় ভালোবাসেন। কনকেরও এখানে থাকিলে ওঁর পরিচর্যাতেই কাটে বেশিক্ষণ—ঘরটি পরিষ্কার করা, জামা-কাপড় গোছানো, জল গড়াইয়া দেওয়া, তামাকটি সাজিয়া দেওয়া—এইসব।

কাল দুপুরে ওঁর ঘরে প্রবেশ করিতে গিয়া ওই যে ব্যাপারটুকু হইল তারপর হইতেই সব ওলট-পালট হইয়া গেছে—প্রথমটা মাথা-ধরার ভানই করিতে হইল, তাহার পর আজ সমস্ত দিন তো সত্যই গেল মাথা লইয়া।

শ্বশুরের জন্য মনটা হঠাৎ চঞ্চল হইয়া উঠিল কনকের। কিন্তু শ্বশুর বাড়িতে নাই; এই কিছুক্ষণ হইল চাকরটাকে লইয়া বাজারে গেলেন, যাইবার সময় জিজ্ঞাসা করিয়া গেলেন কনকের মাথাটা কিরকম আছে; কনক একটু মিথ্যা করিয়াই বলিল—আছে ভালো।

মনে হইল ততক্ষণ না হয় ঘরটা গুছাইয়া রাখি, কাল সকালে আসা হইয়াছে, এখন পর্যন্ত হাত দেওয়া হয় নাই। উপরে শোবার ঘরটায় গিয়া দেখিল, গোছানোই আছে। তবু আর একবার পরিষ্কার করিয়া বিছানাটা ঝাড়িয়া, আলনার জামা-কাপড়গুলা ঝাড়িয়া সমস্ত ঘরটা আরো একটু ভালো করিয়া ঝকঝকে তকতকে করিয়া দিল। বেশ তৃপ্তি পাওয়া গেল না, কেননা মনে সেবার যতটা স্পৃহা সে- অনুযায়ী সুযোগ তো পাওয়া গেল না। তখন অফিসঘরের কথা মনে পড়িল। ওটা একটু বাহিরের দিকে, তাহা ভিন্ন শ্বশুরের সঙ্গে যাহারা দেখা করিতে আসে, ওই ঘরেই বসে বলিয়া ওটা চাকরের হেপাজতেই থাকে। তবে থাকে একটু নোংরা, বিশেষ করিয়া টেবিলটা; চাকরেরই হাত তো? সুযোগ পাইলে কনকও মাঝে মাঝে একটু গোছগাছ করিয়া দিয়া আসে।

এখন শ্বশুর নাই, ঘরটা খালি থাকিবে, কনক নামিয়া গেল।

আজ প্রায় দু-মাস পরে ঘরটায় প্রবেশ করিতেছে। দেখিলে কান্না পায়। শ্বশুর সদাশিব মানুষ, তাহা ভিন্ন চাকরে কি করিল না করিল দেখিবার ফুরসতও থাকে না, ঘরটার কি দুর্দশা হইয়া আছে! কয়েক জায়গায় ঝুল, পাশের দু’একটা জানালায় মাকড়সারও জাল পড়িয়াছে, কোণের দিকের চেয়ার আর কৌচগুলা যেন কতদিন ঝাড়নের সংস্রবে আসে নাই। ওদিকে টেবিল এক ডাঁই হইয়া রহিয়াছে, মেঝের ম্যাটিংটার দিকে চাওয়া যায় না। কোথায় যে আরম্ভ করিবে যেন ভাবিয়াই পাইল না কনক, এ আবর্জনা তো এক কথায় যাইবার নয়। তাহার পর স্থির করিল, এখন টেবিলটা গুছাইয়া ফেলা যাক, সকালে আসিয়া ঘরটার গতি করিবে, অন্তত ঘণ্টা দুয়েক সময় না দিলে চলিবে না, তা ভিন্ন একজনের কর্মও নয়।

বাহিরের দিকের দরজা জানালাগুলো বন্ধ করিয়া দিল, কেহ যদি শ্বশুরের খোঁজে আসে; তাহার পর বই কাগজের গাদাগুলো ঝাড়িয়া-ঝুড়িয়া একদিকে জড়ো করিতেছে, হঠাৎ কতকগুলো আলগা কাগজের মধ্যে হইতে একটা চিঠি চোখে পড়িল। পরের চিঠি পড়িতে নাই, সচরাচর পড়েও না কনক, তবে শ্বশুরের হাতের লেখা দেখিয়া কেমন একটা কৌতূহল হইল; মুড়িয়া রাখিয়াছিল, মিনিটখানেক হ্যাঁ-না, হ্যাঁ-না, করিয়া আবার ভাঁজটা খুলিয়া পড়িতে লাগিল। লেখা আছে—

কল্যাণবরেষু-

বাবাজীবন, আগামী ২৫শে শ্রাবণ, বুধবার দাদুর অন্নপ্রাশনের দিন ধার্য করিয়াছি। আর এই প্রথম কাজ, সাধ্যমতো তোমরা সকলে উপস্থিত থাক আমার এইরূপ ইচ্ছা; অবশ্য যেখানে উপায় নাই সেখানে আর কি হইবে? নৈহাটি থেকে তটিনী আসিয়াছে, এই সঙ্গে বিমলকেও বৌমাকে লইয়া আসিতে লিখিলাম; আর সবাইকে পত্র দিলাম। ছোট বৌমা পরশু আসিবেন, বেহাইয়ের পত্র এইমাত্র পাইলাম। বেশি ছুটি লওয়া ক্ষতি মনে করো তো অন্তত দিন দুয়েকের জন্য অতি অবশ্যই আসিবে। আসিবার সময় কিছু আনারস লইয়া আসিও চাটনির জন্য, এখানে পাওয়া যাইতেছে না।

অত্রস্থ সব কুশল জানিবে। আমার শুভাশিস গ্রহণ করিবে। ইতি

অমরেশ দেবশর্মণঃ
১৮ই শ্রাবণ, ১৩৫৩

চিঠিটা পড়িয়া একটু অভিমানই হইল কনকের;—দাদুর প্রথম কাজ, সবাই আসুক, সবাই আমোদ-আহ্লাদ করুক, শুধু একজনের আসিয়া কাজ নাই, সে পরীক্ষা লইয়া মাথা কুটুক! বাপ হইয়া যে মানুষে কি করিয়া এতটা আক্কেল খোওয়াইতে পারে, কনকের মাথায় আসিতেছে না। অন্যমনস্কভাবে রাখিয়া দিতে যাইতেছিল চিঠিটা, তাহার পর নীচের তারিখটার পানে আর একবার নজর পড়িয়া গেল। ১৮ই শ্রাবণ; আজ হইল ২১শে, তাহা হইলে ১৮, ১৯, ২০, ২১–চারদিন আগেকার চিঠি।

কনকের ভ্রূ দুইটি কুঞ্চিত হইয়া উঠিল,—এ কি রকম হইল? চারদিন আগেকার চিঠি এখনো পড়িয়া আছে, তাহা হইলে মেজ বড়ঠাকুরকে চিঠি পাঠানোই হয় নি—না কি। মনটা খুশি হইল কি দুঃখিত হইল ঠিকমতো বুঝিতে পারিল না-একটা অমন আহ্লাদের কাজে এক জনকে না আসিতে দিবার দিকেই যাঁদের সমস্ত মনটা ঝুঁকিয়া আছে তাঁদের এ ভুল হওয়াই ভালো। তাহার পর কিন্তু দুঃখই হইল মনে, আহা মেজ বড়ঠাকুর আসিতে পারিবেন না! তাঁহার দোষটা বা কি? হয়তো সময়ে আসিলে এই যে একটা অন্যায় হইতেছে তাহারও প্রতিবাদ করিতে পারিতেন, অন্তত একটা দিনের জন্যও প্রতুলের আসা হইত। আর আনারসও আসিল না… আনারসের চাটনি…মুখটি সজল হইয়া আসিয়াছে, একটি ঢোঁক গিলিয়া আবার ভাবিতে লাগিল কনক।

ভুলের কথাটা শ্বশুরকে একবার বলা দরকার নয় কি…কিন্তু তাহা হইলে চিঠি খুলিয়া পড়ার কথাটাও যে আপনি-আপনিই প্রকাশ হইয়া পড়ে—সে যে একটা আমার্জনীয় অপরাধ—বিশেষ করিয়া শ্বশুরের চক্ষে; কি করা যায়? চিন্তাটা যেন অগ্রসর হইতে পারিতেছে না।

তাহার পর ওদিকে বাধা পাইয়া চিন্তাটা হঠাৎ অন্য এক পথ ধরিল। কনকের বুকটা সজোরে ধক ধক করিতে লাগিল, দাঁতে নখ খুঁটিতে খুঁটিতে ঘাড়টা ঈষৎ বাঁকাইয়া স্থিরদৃষ্টিতে চিঠিটার পানে চাহিয়া রহিল।…যদি তাহাই করা যায় কেমন হয়?

চিঠিটা কনক ধীর মনে আরো বারদুয়েক পড়িয়া গেল; না, কোনোখানেই এমন কিছু নাই যাহাতে মনে হয় মেজ বড়ঠাকুরকেই লেখা হইতেছে এ চিঠি—এমন সাধারণভাবে লেখা যে শ্বশুরের যে কোনো বাবাজীবনের নিকটেই পাঠানো চলে। যদি মেজর নিকট না গিয়া ছোটর নিকটেই যায় তো ক্ষতিটা কি?

কনকের বুকটা ধড়াস ধড়াস করিতেছে, ভ্রূ দুটি হইয়া উঠিয়াছে আরো কুঞ্চিত।

দোষটাই বা কি এমন? মেজ বড়ঠাকুরের কাছে চিঠিটা পৌঁছিল না—এই তো? তা…

চিন্তা আবার অনুকূল হইয়া উঠিল, একটা আলোক-রেখা পাওয়া গেছে : মেজ বড়ঠাকুরের কাছে চিঠি যে যায় নাই তাহার মানে কি? এ চিঠিটা পড়িয়া আছে বলিয়া অন্য চিঠি যে যায় নাই এমন তো প্রমাণ হয় না…বেশ, না হয় যায় নাই-ই, মেজদিদি আছেন, হপ্তায় দু’খানা করিয়া চিঠিই লেখা চাই তাঁহার মেজ বড়ঠাকুরকে—অন্নপ্রাশনের কথা লিখিতে ছাড়িয়াছেন নাকি?…না হয় খুব খারাপের দিকটাই ধরা যাক—ধরো বাবার চিঠি না পাওয়ায় মেজ বড়ঠাকুরের অভিমান হইল; আসিতে চাহিলেন না, কিন্তু সেটাও তো মেজদিদি ওঁর চিঠিতে জানিতে পারিবেন—এই আজকালের মধ্যেই সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুরের কানে পৌঁছিবে কথাটা, সঙ্গে সঙ্গে চিঠি যাইবে–বেশি দেরি হয়, টেলিগ্রাম—তার চেয়েও বেশি দেরি হয়, জরুরি টেলিগ্রাম…

নাঃ ক্ষতিও নাই, দোষও নাই।

কনক টেবিল দেরাজের মধ্য হইতে একটা খাম বাহির করিল। প্রতুলের নাম লিখিল, তাহার মুখটি চুন হইয়া গেল; কনকের হাতের লেখা যে চেনা প্রতুলের।—প্রতুল বলে, পৃথিবীতে এত চেনা আর কিছুই নাই তাহার।

আবার চিন্তা, তাহার পর ও-খামটা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া কনক আর একটা খাম বাহির করিয়া তাহার লেখার ছাঁদ থেকে যতটা সম্ভব দূর এবং শ্বশুরের ছাঁদের যতটা সম্ভব নিকট করিয়া নামঠিকানা আবার লিখিল।…এই বেশ হইল, অত ভাবিলে চলেও না; তাহা ভিন্ন প্রতুলের এখন পরীক্ষার ভাবনাতেই মাথা ঘুরিতেছে—খামে কাহার হাতের ছাদ তাই দেখিবার যেন কত ফুরসত! আসল চিঠিটা যে বাবার ওইটুকু জানিতে পারিলেই যথেষ্ট।

তাহা হইলে এঘরে আর নয়। কনক যে এ-ঘরে আসিয়াছে কেহ জানিতে পর্যন্ত পারে নাই এখনো পর্যন্ত, উপর হইতে নামিয়া বাহিরে বাহিরেই চলিয়া আসিয়াছে, দেখিয়াছে এক মেজ জায়ের ছোট ছেলে–সে ধর্তব্যের মধ্যেই নয়।

কনক যেটুকু গোছগাছ করিয়াছিল আবার আগেকার মতো বিশৃঙ্খল করিয়া রাখিল, তাহার পর দোরের শিকলটা চড়াইয়া দিয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। বুকটা সেইরকম ধড়াস ধড়াস করিতেছে, পা দুইটা একটু একটু কাঁপিতেছে। এখন বাকি রইল শুধু চিঠিটা পোস্ট করা। টিকিট জুটিল না, তা সে এমন কিছু একটা বাধা নয়, বরং শুনিয়াছে বেয়ারিং চিঠি যায়ও ভালো, হারায়ও না।

এ-বাড়িতে চিঠি ফেলবার সুবিধা খুব, নিজেদের যে নারিকেল গাছটা ঠিক গেটের বাহিরে রাস্তার দিকে হেলিয়া উঠিয়া গেছে তাহারই গায়ে তার দিয়া চিঠির বাক্সটা টাঙানো। লোভ হয় টুপ করিয়া ফেলিয়া দিয়া আসি; গলিতে লোকজন নাই এখন, এদিকটা অন্ধকারও হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু যাওয়ার চিন্তাতেই পা দুইটা আরো কাঁপিতে লাগিল—বৌ-মানুষ, দু’পা-ও তো রাস্তায় নামিতে হইবে; ওরে বাবা!—সে হয় না; মরিয়া গেলেও নয়! এভাবে দাঁড়াইয়া থাকাও যায় না, কাল যা হয় একটা ব্যবস্থা হইবে।

যেমন আসিয়াছিল, বাহিরে-বাহিরেই দোতলায় উঠিয়া অপর দিক দিয়া নামিয়া যাইবে, পা বাড়াইয়াছে, একটু ওদিকে সদর দরজার সামনে যে দেওয়াল তাহার ভিতর হইতে সইয়ের বাড়ির ঝি বাহির হইয়া আসিল। কনক ডাকিল—“কে গো, সৌরভী নাকি?”

সৌরভী কাছে আসিল, প্রশ্ন করিল—“তুমি এখানে ছোট বৌদি?”

“এই বাবার ঘরটা এক ডাঁই হয়েছিল, একটু গোছাচ্ছিলাম….তুই একটা কাজ করতে পারবি?”

“কি?”

“এই চিঠিটা সৌরভী – ফেলে দিয়ে যা।”

একটু লজ্জিতভাবে হাসিয়াই ফেলিল; চিঠিটা দিতে গিয়ে হাতটা একটু টানিয়া লইয়া বলিল— “কিন্তু কাকেও বলতে পারবি নি—তা যদি বলিস তো থাক বাপু…সইকেও বলতে পারবিনি, আমার দিব্যি রইল।”

সৌরভী হাসিতে হসিতে হাতটা বাড়াইয়া বলিল—“দেও, দেও, অত যদি হালকা হোত সৌরভী তো কোনো গিন্নির চিঠিই কোনো কত্তার কাছে পৌঁছুত না।…এই ঠাকুরের ঘর পরিষ্কার করা! তাই তো বলি ছোট বৌদি এমন সময় এখানে দাঁড়িয়ে কেন!…দেও।”

চিঠিটা লইয়া হাসিতে হাসিতেই বলিল—“জবাব এলে কিন্তু আমার বকশিশ চাই, তাতে ফাঁকি দিউনি যেন।”

“তুই কালই নিয়ে যাস তোর বকশিশ, ধার রাখি না”— হাসিতে হাসিতে কথাটা বলিয়া কনক একটু অগ্রসর হইয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইল, সৌরভী চিঠিটা ছাড়িয়া দিলে আস্তে আস্তে উপরে উঠিয়া গেল।

.

অর্ধেক সিঁড়িও ওঠে নাই, একটা কথা মনে পড়িয়া কনকের সমস্ত শরীরটা যেন হিম হইয়া গেল, —প্রতুল আসিবার সঙ্গে সঙ্গেই যে সব কথা প্রকাশ হইয়া পড়িবে, তাহার কি ব্যবস্থা হইল? শ্বশুর-শাশুড়ি যাহার সঙ্গেই আগে দেখা হোক আশ্চর্য হইয়াই জিজ্ঞাসা করিবেন। শ্বশুর যা মানুষ, হয়তো রাগিয়াই যাইবেন, তখন যে চিঠির কথা আপনিই বাহির হইয়া পড়িবে, কাছে থাকিলে চিঠিটা বাহির করিয়াই সামনে ধরিবে যে প্রতুল। এ কি হইল? উপায় এখন?

ছাতে খোলা হাওয়ায় একটু পায়চারি করিতে করিতে প্রথম আতঙ্কের ভাবটা কাটিয়া গিয়া একটু সাহসও ফিরিয়া আসিল, মাথাটা পরিষ্কার হইয়া একটু বুদ্ধিও খুলিল,—অত ভাবিবার কি আছে? গেছে তো শ্বশুরেরই চিঠি-কি করিয়া গেছে লোকে কেমন করিয়া টের পাইবে! মিছে ভাবা, মিছে ভয় কনকের যেন একটা বাতিক দাঁড়াইয়াছে!

সব দুশ্চিন্তা কাটিয়া গিয়া প্রতুল যে আসিবে এই আনন্দটুকু কনকের সমস্ত মনটিতে বেশ চারাইয়া পড়িয়াছে। আরো একটু পায়চারি করিল, ঝিরঝিরে দক্ষিণে হাওয়াটা আরো মিষ্টি লাগিতেছে যেন। ওদিকে নিচের বাড়িতে কে প্রশ্ন করিল—“ছোট বৌমাকে দেখছি না যে?”

বৌ মানুষ, এত দূর থেকে উত্তর দেওয়া যায় না, কনক ওদিক দিয়া নামিতে যাইবে, শ্বশুর উঠিয়া আসিলেন। বলিলেন—“এই যে বৌমা, ছোট বৌমা এখানে! কি করছিলে মা একা একা?”

কনক বলিল—“আপনার শোবার ঘরটা একটু পরিষ্কার করছিলাম বাবা।”

“এসো, মায়ে বেটায় একটু গল্প করিগে; তোমার বাপের বাড়ির কথাও জিগ্যেস করা হয়নি। মাথাটা ছেড়েছে তোমার!”

দুজনে ঘরে আসিয়া প্রবেশ করিলেন।

কনক একটু অন্যমনস্ক হইয়া একটা কথা ভাবিতেছিল, প্রবেশ করিয়া বলিল—“আছেন ভালো বাবা সবাই; হ্যাঁ, মাথাটা ছেড়েছে। হ্যাঁ, ভালো কথা মনে পড়ে গেল, অন্নপ্রাশনে আসবার জন্যে মেজ বড়ঠাকুর আর সেজ বড়ঠাকুরকে আসতে লিখেছেন বাবা?”

“হ্যাঁ মা লিখেছি, কেন বলো তো?”

“না, তাই জিজ্ঞেস করছি, কেউ এলেন না এখনো, কাজের বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে। ভাবছিলাম—ভুলে যাননি তো লিখতে বাবা…”

“না ভুলিনি, তবে একটু ভুল হয়েছিল বটে বিকাশের চিঠি নিয়ে।”

কনক প্রবল কৌতূহলটা চাপিবার চেষ্টা করিয়া মুখের পানে চাহিয়া প্রশ্ন করিল—“কি বাবা?”

“বিকাশকে একখানা চিঠি লিখে কোথায় যে ফেললাম—চিঠিগুলো পোস্ট করতে গিয়ে দেখি তার খানা নেই, তখন আর একখানা লিখে পোস্ট করে দিলাম—আর একটু হলে ছেড়ে গিয়েছিল আর কি—অনেকগুলো চিঠি একসঙ্গে—মাথার ঠিক থাকে না আর…বাবা তো তোমার বুড়োও তো হতে চল্লো মা…”

তাহার পর হঠাৎ তাঁহার চৈতন্য হইল—এত প্রশ্নের অর্থটা কি? মুখটা একটু কেমন হইয়া গেল যেন, কথাটা বলিতে বাধিল, তবুও স্খলিত কণ্ঠে বলিলেন—“ইয়ে—তোমার গে—সবাইকেই আসতে বলা হয়েছে, শুধু বলা হয়নি প্রতুলকে—তোমার গিয়ে ভাবলাম…”

বউটি বড় আদরের, অনেক কথা নিঃসঙ্কোচেই বলে। কনক শ্বশুরের মুখের কথা একরকম কাড়িয়া লইয়াই বলিল—“তা সে ভালোই করেছেন বাবা। সামনে পরীক্ষা, হুট করে চলে আসা…আর অন্নপ্রাশন এমন কি ব্যাপার বলুন না—খোকা বেঁচে থাক, আসবার ঢের সময় আছে…আমার তো এই মত…”

একটি প্রসন্ন হাসিতে শ্বশুরের মুখখানি উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। জামা-জুতা ছাড়িতে ছাড়িতে অনেক কথা হইল এরপর—বেশির ভাগই পড়াশুনা, পাস করা উন্নতি করা—তাহার জন্য সংযম, তপস্যা এইসব লইয়া অনেকক্ষণ পর্যন্ত। কনক নিচে আসিবার সময় শ্বশুর বলিলেন—“তোমার শাশুড়িকে একবার ডেকে দেবে বৌমা।…”

.

সিঁড়ি দিয়া নামিতে নামিতে কনকের মনটা একটি আনন্দের আবেগে ছলছল করিয়া উঠিতে লাগিল,—শাশুড়িকে ডাকিতে বলা কেন সে জানে,–এইবার বধুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়া উঠিবেন— “তুমি ওই বললে তো?—আর বৌমার কথা শোনো—’বেশ করেছেন বাবা, আসতে বলেননি, পাসের পড়া সহজ নয় তো—খোকা বেঁচে থাক, আসবার ঢের সময় হবে’…সে কথার কি বাঁধুনি মায়ের আমার…আমি নিজে পছন্দ করে বৌ করেছি, এমন নাকি!…”

আজ সব কথাই থাকিবে বন্ধ, চলিবে শুধু ছোট বৌমার গুণগান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *