মিন্দানাওয়ের বন্দী – ৮

কাগায়ান শহর। কাগায়ান উপসাগর থেকে ৫০ মাইল দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত উত্তর মিন্দানাওয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর কাগায়ান।

ফিলিপাইন পরিষদের প্রাক্তন সিনেটর আববাস এ্যালেনটো কাগায়ান শহরের মানচিত্র বুঝিয়ে দিচ্ছিল আহমদ মুসাকে।

মুল কাগায়ান শহরের লোক সংখ্যা ৮ থেকে ১০ হাজারের মত। শহরতলী সমেত এর লোক সংখ্যা এখন প্রায় বিশ হাজার। কাগায়ান থেকে দক্ষিণ দিকে মাইলের পর মাইল চলে গেছে নয়নাভিরাম ধানের ক্ষেত।

কাগায়ান ছিল সুখ ও সমৃদ্ধির নগর। বিশ বছর আগেও এখানে ছিল শতকরা নববই জন মুসলমান। আমেরকিান ও পর্তুগিজ মিশনারীদের প্রলোভন ও নিপীড়নের পরও এখানে খৃস্টানদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগের বেশী হয়নি। এখানে অভাব বস্তুটা ছিল মানুষের অজানা, তাই মিশনারীদের কৌশল এখানে বড় বেশী কাজে আসেনি।

কিন্তু কাগায়ানবাসীদের এই প্রতিরোধ ক্ষমতা তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিল। মিশনারীদের সব কলাকৌশল ব্যর্থ হলে ঘরবাড়ী ও সহায়-সম্পত্তি থেকে তাদের উৎখাত করা হলো শক্তির জোরে। শুধু কাগায়ান নয়, দিভাও, জাম্বুয়াঙ্গো, কোটাবাটো, প্রভৃতি শহরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। এই উৎখাত অভিযানে ৩০০০ হাজার হতভাগ্য মুর মুসলমান নিহত হলো এবং ১০ হাজার হলো আহত। আর ৫০ হাজার মুসলমান তাদের বাড়ী ঘর, সহায়-সম্পত্তি সব কিছু হারিয়ে পথে গিয়ে দাড়াঁল। তাদের জায়গায় এনে বসানো হলো উত্তর ফিলিপাইন থেকে শ্বেতাংগ ও নেটিভ খৃস্টানদের।

-কিন্তু এসব সংবাদ তো প্রকাশ পায়নি?

-প্রকাশ পাবে কি করে, সংবাদ সরবরাহ সংস্থাগুলোর কাছে এ কোন সংবাদই নয়। মিন্দানাওবাসীদের বিদ্রোহের খবরই শুধু প্রকাশ পায়, তাদের উপর জুলুম-নির্যাতনের যে স্টিমরোলার চলছে তা প্রকাশ পায় না।

আহমদ মুসা সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল শুধু। আববাস এলেনটো আবার বলতে শুরু করল কাগায়ানের শহরতলীতে মুসলমানদের কিছু ছিটেফোটা বসতি আজও রয়েছে।

কাগায়ান শহরের মূল আবাসিক এলাকা শহরের দক্ষিণাংশে। উত্তরাংশে কয়েকটি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এই উত্তরাংশেই সম্প্রতি একটি বিমান ক্ষেত্র নির্মিত হয়েছে। বিমান ক্ষেত্রের পশ্চিম, উত্তর ও পূর্বাংশে অসমতল বনভূমি। বিমান ক্ষেত্রটি সূদৃঢ় কাটাতার দিয়ে ঘেরা। কাটাতারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ চলছে সর্বক্ষন। এই বিমান ক্ষেত্রের দক্ষিণাংশে টারমিনাল ভবনের সামনে রানওয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে চারটি মাউন্টেন-জেট।

থামল আববাস এ্যালেনটো। আহমদ মুসা শহরের রাস্তা ঘাটের অবস্থান নিয়ে তন্ময় হয়ে পড়ল। শহরের প্রধান রাস্তাটি শহরের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তরাংশের টারমিনাল ভবন পর্যন্ত বিসত্মৃত। এই রাস্তার ধারেই সকল সরকারী অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ বিল্ডিং। রাস্তাটির পূর্বনাম ছিল ‘আলনিকাদ’ রোড। কাগায়ানে যারা প্রথমে বসতি স্থাপন করেছিল, তারা এসেছিল জুলু দ্বীপের ‘বুদ আজাদ’ অঞ্চল থেকে। জুলু দ্বীপে যিনি ইসলামের আলো ছড়িয়ে ছিলেন, তিনি ‘মুহাম্মদ আমানুলল্লাহ আল-নিফাদ’ নামে অভিহিত। তাঁর নাম অনুসারেই এ রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু রাস্তাটির নাম এখন ‘মার্কোস এভিনিউ’। কাগায়ানের মুসলিম উচ্ছেদের পরিকল্পনাকারী সেন্টজন মার্কোসের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে।

আহমদ মুসা আববাস এ্যালেনটোকে জিজ্ঞেস করলেন, কাগায়ানের পাওয়ার ষ্টেশনটি কোথায়?

আববাস এ্যালেনটো দক্ষিণ কাগায়ানের একটি স্থান দেখিয়ে দিল। বলল সে, কার্কোস এভেনিউ থেকে পার্ক ষ্ট্রিট সোজা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। এ রাস্তা দিয়ে সিকি মাইল যাবার পর আর একটি রাস্তা পাওয়া যাবে-হোয়াইট স্ট্রিট। এ স্ট্রিটের শেষ প্রান্তে পাওয়ার স্টেশন।

-পাওয়ার ষ্টেশন থেকে মার্কোস এভেনিউতে পৌছার সোজা পথ নেই?

-আছে। আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে। বড় পেচানো রাস্তা। পাওয়ার স্টেশনের পিছন থেকে বেরিয়ে এ রাস্তা আবাসিক এলাকার মধ্যদিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে গেছে।

আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। বাইরে থেকে দরজায় কয়েকটি টোকা পড়ল এ সময়। আহমদ মুসা ও আববাস এ্যালেনটো উৎকর্ণ হয়ে উঠল। আবার পড়ল টোকা সেই নির্দিষ্ট নিয়মে। পরিচিত সংকেত।

আববাস এ্যলেনটো গিয়ে দরজা খুলে দিল। প্রবেশ করল শ্রমিক গোছের একজন লোক। পরণে মালয়ী ধরনের লুংগী। গায়ে শার্ট ঝুলের কামিজ। ছোট করে ছাঁটা চুল। চোখ দু’টির চাউনিতে কেমন বোকা বোকা ভাব।

আববাস এ্যলেনটো পরিচয় করিয়ে দিল- নাম আবিদ। কিন্তু কাগায়ানে জন নামে পরিচিত। সবাই জানে সে একজন নিষ্ঠাবান নেটিভ খৃস্টান। পিসিডার একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মী আবিদ। টার্মিনাল ভবনের বহিরাঙ্গনের একটি ভ্যারাইটি স্টোরের মালিক সে। মাউন্টেন জেট সম্পর্কিত তথ্য সেই সরবরাহ করেছে।

আহমদ মুসাকে দেখিয়ে সে আবিদকে বলল, ইনি আহমদ মুসা- তোমাদের নেতা।

বিস্ময় ও আনন্দে চিক চিক করে উঠল আবিদের চোখ। সসম্ভ্রম ছালাম জানাল। আহমদ মুসা হাত বাড়িয়ে দিল। আবিদও বাড়িয়ে দিল হাত। হ্যান্ডসেক করল দু’জনে।

আববাস এ্যালেনটো বলল, এবার খবর বলো আবিদ।

আবিদ বলল, আজ সকালে মাইকেল এ্যঞ্জেলো এসেছেন দিভাও থেকে। তার সাথে কে আর একজন এসেছেন। দীর্ঘাঙ্গ, লাল চেহারা চুলহীন মাথা, নাম- ডেভিড এমরান।

-কি বললে নাম? ব্যগ্র কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো আহমদ মুসা।

-ডেভিড এমরান?

আহমদ মুসা বিস্মিত হলো। ধাড়ি ইহুদি ডেভিড এমরান কাগায়ানে এসেছে। ‘ইরগুন জাই লিউমি’র অপারেশন বিভাগের প্রধান ডেভিড এমরান তাহলে আহমদ মুসাকে হাতে পাবার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। হাসল আহমদ মুসা। বলল সে, তারপর আবিদ?

-টার্মিনাল ভবনের পাশে ওরা একটা হাসপাতাল সাজিয়েছে। ডাক্তার আছে, নার্স আছে। বেলা একটার দিকে ৪টি মাউন্টেন জেটই পরপর সারিবদ্ধভাবে রানওয়েতে গিয়ে দাঁড়াল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কিম্ভুত-কিমাকার পোশাকে আবৃত লোকগুলো গিয়ে বিমানে উঠল।

আহমদ মুসা দ্রুত জিজ্ঞেস করল, মুখও আবৃত ছিল ওদের?

-জি, হাঁ। বলল আবিদ।

আবিদ আবার বলতে শুরু করল বেলা ১টার সময় জেটগুলোর টেক-অফের কথা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে বিমানগুলো আকাশে উড়ল না। আরোহীরা সবাই নেমে এলো বিমান থেকে। আমি জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, কি যেন খবর এসেছে, তাই যাত্রা বন্ধ।

ভ্রু কুঁচকে গেল আহমদ মুসার। কিন্তু কিছু বলল না।

আবিদ আবার শুরু করল, যাত্রা বন্ধ হয়ে যাবার পর সকলের মধ্যে কেমন যেন ত্রস্ত ভাব লক্ষ্য করা গেছে। পুলিশ কর্তাদের নিয়ে দু’বার মিটিং হয়েছে বড় কর্তাদের।

আহমদ মুসা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। সে যেন আনমনা হয়ে পড়েছে। আবিদ, মাইকেল এ্যাঞ্জেলা, ডেভিড এমরান, আর সেই কমান্ডোরা থাকছে কোথায়?

-টারমিনাল রেস্ট হাউজে।

-রেস্ট হাউজ অর্থাৎ বিমান ক্ষেত্র থেকে শহরে আসবার কয়টি পথ আছে?

-একটি মার্কোস এভেনিউ। বিমান ক্ষেত্রটি শহর থেকে একটি খাল দ্বারা বিচ্ছিন্ন। খালের উপর মার্কোস এভেনিঊ-এর ব্রিজ একমাত্র সংযোগ পথ।

-ব্রিজে প্রহরী থাকে?

-না, কিন্তু আজ পুলিশ মোতায়েন দেখেছি ব্রিজে।

আহমদ মুসা ঠোঁট কামড়ে ধরল দাঁত দিয়ে। মুহূর্তখানেক চিন্তা করল সে। বলল, তারপর তুমি থাক কোথায়?

-স্টোরেই থাকি।

-বেশ তোমাকে টারমিনালের রেস্ট হাউজে ওদের দিকে নজর রাখতে হবে। আমি যথাসময়ে পৌছব। মনে রেখ, তোমার ঘরে আলো জ্বলে থাকার অর্থ তুমি নেই, কিছু ঘটেছে। আর আলো নিভানো থাকলে তার অর্থ হবে সবকিছু ঠিক আছে। আচ্ছা তুমি যাও।

আবিদ সালাম জানিয়ে চলে গেল। আহমদ মুসা গিয়ে ঘর বন্ধ করে দিল। তারপর তার ব্যাগ খুলে একটি ক্ষুদ্র বাক্স বের করলো। বাকো্রর পাশে একটি বোতামে চাপ দিতেই উপরের ঢাকনি সরে গেল। ক্ষুদ্র অয়্যারলেস যন্ত্র।

শর্ট ওয়েভ কাটা ঘুরিয়ে যোগাযোগ করলো আপো পর্বতের হেড কোয়ার্টারে।

ওপার থেকে মুর হামসারের গলা পেয়ে খুশী হলো আহমদ মুসা। বলল, মুর হামসার, তুমি কখন ফিরলে?

-ঘন্টা দু’য়েক আগে ফিরেছি।

-শিরী কেমন?

-জ্বরের কোন কমতি নেই।

-দেখ, ওর প্রতি নজর রেখ।

মুহূর্তখানেক থামল মুসা। তারপর বলল, রুনার মা কোথায়?

-কেন? এখন শিরীর কাছে।

-আমি ফেরার পূর্বে দরজার বাইরে বেরুতে দিবে না তাকে। বাইরের সকলের সাথে সব রকমের দেখা সাক্ষাত বন্ধ। দরকার হলে তাকে ঘরে বন্ধ করে রাখবে। আর এখনি ওর কাছ থেকে জেনে নাও, আমি কাগায়ানে এসেছি, এ কথা সে কাকে বলেছে। এ কথা তার কাছ থেকে বের করে নিতেই হবে।

-কিছু ঘটেছে ভাইয়া? উৎকন্ঠিত স্বর মুর হামসারের।

-আমি আপো পর্বতে নেই, আমি কাগায়ানে চলে এসেছি, এ খবর কাগায়েনে পৌছেছে বলে স্থির নিশ্চিত আমি? কিন্তু পৌছল কি করে? নিশ্চয় আপো পর্বত থেকে এ খবর এখানে জানানো হয়েছে।

-সাংঘাতিক ব্যাপার, ঘরে শত্রু……….

মুর হামসারের কথার মাঝখানেই বলে উঠল আহমদ মুসা, রুনার মা’র কাছ থেকে জেনে নিয়ে যে কোন মূল্যে আটক করবে সেই ঘরের শত্রুকে।

-আপনার নির্দেশ পালিত হবে জনাব। আর…..

কথা শেষ করলো না মুর হামসার।

-কিছু বলবে? জিজ্ঞেস করলো আহমদ মুসা।

-শিরী কিছুই খাচ্ছে না, ওষুধও নাকি বমন করে ফেলেছে আজ।

আহমদ মুসা একটু চিন্তা করলো। তারপর বলল, পুরুষ ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা তেমন ভালো হচ্ছে না, একটা কাজ করতে পার?

-কি কাজ?

-স্মার্থা ডাক্তার। স্পাই ডাক্তার হিসেবে ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানে সে যোগ দিতে আসছিল মিন্দানাওয়ে। বন্দীখানা থেকে তাকে এনে শিরীকে দেখাতে পার।

-নিরাপদ হবে তাকে আনা?

-তোমাকে অতি সাবধানে এ কাজ করতে হবে এবং এ ব্যাপারে তোমার কারো উপর নির্ভর করা চলবে না। তুমি তাকে আনবে, তুমিই রেখে আসবে তাকে বন্দীখানায়।

-রাজী হবে সে চিকিৎসা করতে?

-তাকে বলো আমি অনুরোধ করেছি। আমার বিশ্বাস, এ অনুরোধ সে রাখবে।

কথা শেষ করে আহমদ মুসা লাইন কেটে দিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল আবদুল্লাহ জাবের ও শরীফ আহমদ সুরী।

কথা শেষ হতেই আববাস এ্যালেনটো গিয়ে দরজা খুলে দিল ঘরের। প্রবেশ করলো তারা দু’জনে।

-কি খবর জাবের? ব্যগ্র কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো আহমদ মুসা।

ভিতরে একদম রণ প্রস্তুতি।

-কেমন?

-বিমান ক্ষেত্রের চারিদিকে মেশিনগানের ব্যারিকেড। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসানো হচ্ছে মেশিনগান। সাদা পোশাকে শহরের বিভিন্ন স্থানে কমান্ডো ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। সশস্ত্র পুলিশ তো রয়েছেই।

নীরবে কথাগুলো শুনছিল আহম মুসা। কথা শেষ হলো, কিন্তু কোন মন্তব্য করলো না সে। দু’টি হাত তার পিছনে মুষ্টিবদ্ধ। চোখে মুখে ভাবনার এক ভারি পর্দা।

জাবের, শরীফ সুরী, আববাস এ্যালেনটো নতমুখে দন্ডায়মান।

আহমদ মুসা এক সময় টেবিলের কাগায়ান শহরের মানচিত্রের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। চোখ দু’টি তার মানচিত্রে নিবদ্ধ-পলক নেই তাতে। নিঃশব্দে বয়ে চলল কালের স্রোত।

স্বপ্নোত্থিতের মত মুখ তুলল আহমদ মুসা মানচিত্র থেকে। জাবেরকে লক্ষ্য করে বলল সে, মৃত্যু মুখে ঝাপিয়ে পড়বে, এমন কতজন লোক আছে তোমার?

-আপনার নির্দেশ পেলে সকলেই হাসতে হাসতে মৃত্যুর মুখে ঝাপিয়ে পড়বে।

-সবাই নয়, আমি ৫০ জন চাই।

-প্রস্তুত জনাব।

তারপর আহমদ মুসা দীর্ঘক্ষণ ধরে আবদুল্লাহ জাবের, শরীফ সুরী ও আববাস এ্যালেনটোর সাথে পরামর্শ করলো তারপর বিদায় দিল সবাইকে।

ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল, সবে সন্ধ্যে ৮টা। ৯টায় বেরুবে সে। এখনও এক ঘন্টা সময় আছে।

পরম প্রশান্তিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে।

রাত নটা। দক্ষিণে কাগায়ানের পার্ললেন ধরে দ্রুত এগোচ্ছিল একজন লোক। লম্বা চওড়া। কাল স্যুট, কাল জুতা। টাইটিও একদম নিরেট কালো। লেনের আবছা অন্ধকারে লোকটিকে মনে হচ্ছে ছায়ার মতো। মাথা নীচু করে ছায়া মূর্তিটি দ্রুত এগিয়ে চলছিল মার্কোস রোডের দিকে।

আমেরিকান কাট চুল। লাল মুখ। টিপ-টপ ভদ্রলোক। ইস্ত্রির ভাঁজে কোন খুঁত নেই। এক দৃষ্টিতেই মনে হয়, একজন সম্ভ্রান্ত বিদেশী। কোন দিকে না তাকিয়ে একমনে এগিয়ে যাচ্ছে সে!

ভদ্রলোকের হাতে একটি বড় ধরনের এটাচি। পার্ললেন পার হয়ে সে গিয়ে পড়ল মার্কোস রোডে। মার্কোস রোড ধরে সে হন হন করে এগিয়ে চলল উত্তর দিকে।

উত্তর দিকে থেকে দু’টি রক্তচক্ষু তীব্র বেগে এগিয়ে আসছে। সমগ্র রাস্তা আলোকিত হয়ে উঠেছে ছুটে আসা গাড়ির হেডলাইটের উজ্জ্বল আলোতে।

ভদ্রলোকের ভ্রূদ্বয় কুঞ্চিত হলো। কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে সমান তালে সে এগিয়ে চলল সামনে।

ছুটে আসা গাড়িটি পুলিশের। গাড়িটির রিয়ার লাইটের নীচে জ্বল জ্বল করছে- মিন্দানাও পুলিশ।

পুলিশের জীপটি এসে ভদ্রলোকের পাশে থেমে গেল। ক্যাঁচ করে বিশ্রি এক শব্দ উঠল।

জীপে দুজন আরোহী। একজন ড্রাইভার আর অন্যজন পুলিশ অফিসার।

পাশে জীপ থেমেছে, কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই ভদ্রলোকের। চলা তার থামেনি। জীপ থেকে পুলিশ অফিসারটি নেমে পড়ল।

-এই যে। ভদ্রলোককে সম্বোধন করে ডাকল পুলিশ অফিসারটি।

ভদ্রলোক থামল। পিছনে ফিরে চাইলোও। কিন্তু দাঁড়িয়ে রইলো, এলো না।

পুলিশ তার কাছে এগিয়ে গেল। বলল, কে আপনি? তার মুখে বিরক্তির স্বর।

পরিস্কার ইংরেজীতে ভদ্রলোকটি জবাব দিল, ফিলিপাইন কনটিনেটাল ট্রেডিং এজেন্সির বিজিনেস রিপ্রেজেনটেটিভ -জেমস কার্টার।

ম্যনিলার কনটিনেনটাল ট্রেডিং এজেন্সি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আমেরিকান প্রতিষ্ঠান। পুলিশ অফিসারটি স্বর কিঞ্চিত নরম করে বলল, কোথায় চলেছেন?

ইয়ারপোর্ট সুপার মার্কেটের বিজিনেস ইন্টারন্যাশনাল অফিসে।

-ডোন্ট মাইন্ড, যেহেতু দায়িত্ব, তাই আপনার ব্যাগটা আমার একবার দেখতে হবে।

ব্যগটি এগিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বলল, বেশ, দেখুন, দেখুন।

ব্যাগ খুলে দেখল, ইলেকট্রনিকস গুডসের লিটারেচার আর ছ্যাম্পুলে ব্যাগ ভর্তি। এটা-ওটা একটু নেড়ে-চেড়ে ব্যাগটি পুলিশ অফিসার ভদ্রলোকের হাতে দিয়ে দিল।

এমন সময় আর একটি জীপ এসে দাঁড়াল। বিশাল বপু একজন অফিসার উকি দিল জীপ থেকে। জিজ্ঞেসা করল, কি ব্যাপার জেম?

জেম নামক পুলিশ অফিসারটি বুটের গোড়ালি ঠুকে কড়া একটি স্যালুট দিয়ে বলল, কনটিনেনটাল ট্রেডিং এর প্রতিনিধি যাচ্ছে সুপার মার্কেটের বিজিনেস ইন্টারন্যাশনাল অফিসে।

একটু থামল। আবার বলল, চেক করেছি, ছেড়ে দিব?

-মাথা খারাপ হয়েছে, চাকুরি খোয়াবে? কনট্রোল রুমে পৌছে দাও, ছাড়া-না ছাড়া তারাই বিচার করবে।

জীপটি চলে গেল। জিমি ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে বললো, চলুন মশায়, আপনাকে কনট্রোল রুমে দিয়ে আসি।

জীপে উঠতে উঠতে ভদ্রলোকটি বলল, কিছু ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে? কি ব্যাপার মিঃ জিম?

জিম বিরক্তির স্বরে বলল, ঐ কি যেন আহমদ মুসা শহরে ঢুকেছে তাই এই সতর্কতা। দেখুন মিঃ কার্টার বড় সুখে আছেন আপনারা বিজিনেস নিয়ে. আর………..

ভদ্রলোক মিঃ কার্টার কথার মাঝখান থেকে বলে উঠল, বিজিনেস ভালো লাগে আপনার?

-লাগতেই হবে। চাকুরীর নিকুচি করি। ইম্পোর্ট লাইসেন্স করেছি কয়েকটা, কিন্তু ওর ভালো-মন্দ প্যাঁচ-পুঁচ তেমন বুঝি না।

-আসুননা একদিন বিজিনেস ইন্টারন্যাশনালে, আপনাদের জন্যই তো আমরা রয়েছি।

-ঠিক বলেছেন। যেতেই হবে একদিন। কাগজ-পত্র সব নিয়ে যাব।

মিঃ কার্টার একটু চিন্তা করে বলল, দেখুন মিঃ জিম কি বিপদে পড়লাম, আমাকে আবার ফিরতে হবে সেই হোয়াইট রোডে।

-হোয়াইট রোডে কেন?

-পাওয়ার হাউজের পিছনেই আমার বাসা। রাত দশটার মধ্যে না হলে ভীষণ অসুবিধা হবে বাসায়।

-মশায়, কনট্রোল রুমে গেলে তো ছাড়বেই না আজ রাতে আর। ভীষণ কাড়াকড়ি। কি যেন খবর এসেছে তারপর থেকে কর্তারা আহার-নিদ্রা করেননি। কে কে যেন এসেছে আরও। ইয়ারপোর্টের রেস্ট রুমে বসে শুধু শলা পরামর্শ করে যাচ্ছেন।

-তাহলে?

জিম একটু চিন্তা কের বলল, উপায় একটি করা যায়। সামনের মোড়ে আপনাকে নামিয়ে দিচ্ছি, ওখান থেকে গলি পথ ধরে লেক সার্কাসের ভিতর দিয়ে পাওয়ার হাউজের পিছনে গিয়ে উঠতে পারবেন।

-ও? মিঃ জিম। চিরকৃতজ্ঞ থাকব এর জন্য আমি।

মোড়ের উপর গাড়ী এসে পড়ল। থামল গাড়ি।

মিঃ কার্টার নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। গাড়ি থেকে মিঃ জিম বলল, আবার দেখা হবে মিঃ কার্টার। বলে সে গাড়ি ছেড়ে দিল।

মোড়ে মার্কোস রোড থেকে দু’টি রাস্তা দু’দিকে বেরিয়ে গেছে। একটি পূর্বদিকে, অন্যটি পশ্চিম দিকে। পশ্চিমের রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলল মিঃ কার্টার। মিনিট সাতেক চলার পর একটি রাস্তা পেল সে । রাস্তাটি লেক সার্কাস রোড থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ দিকে লেক সার্কাসের অভ্যন্তরে চলে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে লেক সার্কাসে প্রবেশ করবে কি না ভাবছিল মিঃ কার্টার। এমন সময় একজন লোককে পেয়ে গেল সে। লোকটি লেক সার্কাসের দিক থেকে আসছিল। মিঃ কার্টার তাকে জিজ্ঞেস করলো, এই রাস্তা দিয়ে কি হোয়াইট রোডে পৌছতে পারি?

লোকটি হাঁ সূচক জবাব দিয়ে চলে গেল। মিস্টার কার্টার ঐ রাস্তা দিয়ে লেক সার্কাসে প্রবেশ করলো । রাস্তাটির আবার অনেক শাখা-প্রশাখা। প্রায় মিনিট পনর চলার পর ঠিক চলেছে কি না সন্দেহ হলো মিঃ কার্টারের। সামনে আবার রাস্তাটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে চলে গেছে দু’দিকে।

থমকে দাড়াল মিঃ কার্টার। জন-মানবহীন পথ। পাশেই একটি বিরাট অট্রালিকা।

গানের মিষ্টি সুর ভেসে আসছে। মিঃ কার্টার উপরের দিকে চাইল। দোতালার উন্মুক্ত জানালা দিয়ে শোনা যাচ্ছে গান। পরিচিত সুর। উৎকর্ণ হলো মিঃ কার্টার, সুর স্পষ্ট হল। আলাবী বালপকীর গান।

অভিজাত খৃষ্টান এলাকার এই বাড়ী থেকে আলাবী বালপকীর আরবী গান শুনে স্তম্ভীত হলো মিঃ কার্টার। আলাবী বালপকীর গান সোলো দ্বীপপূঞ্জের মুসলমানদের প্রিয় গান। পলস্নী সংগীতের এই আলাবী বালপকীকে সেখানে আরবী সৈয়দ আল্ ফকীহ বলে মনে করা হয়। ইনি মিন্দানাও ও সোলো দ্বীপপুঞ্জের বিখ্যাত সপ্ত ভ্রাতাদের একজন। সোলোর করিম আল-মখদুমের কিছু পরে সৈয়দ আল ফকিহ সোলো দ্বীপপুঞ্জে এসেছিলেন। এই সপ্ত ভ্রাতা অর্থাৎ এই সাতজন অলি আল্লাহই আরব ভূমি থেকে ইসলামের আলো সোলো ও মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জে ছড়িয়ে ছিলেন । প্রায় সহস্র বছর ধরে আলাবী বালপকীর গান সোলোর গ্রাম-গ্রামান্তরে গীতে হয়ে আসছে।

কাছে কোথাও থেকে পেটা ঘড়ির আওয়াজ এলো ঢং ঢং……………।

রাত দশটা বেজে গেল। মিঃ কার্টার একবার নিজের ঘড়ির দিকে চাইল। তারপর সক্রিয় হয়ে উঠল সে।

সে গিয়ে বাড়িটির দরজায় নক করলো। একবার, দুইবার তিনবার সিঁড়ি দিয়ে কারো নেমে আসার শব্দ পাওয়া গেল। ‘কট’ করে সুইচ টেপার শব্দ হলো ভিতরে।

দরজা খুলে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে এক যুবতী। দেশীয় মেয়ে। দীর্ঘ কাল চুল-গলার দু’পাশ দিয়ে বুক বেয়ে কটিদেশ পর্যন্ত নেমে এসেছে।

চোখ মুখ দিয়ে বুদ্ধি যেন ঠিকরে পড়ছে। তার সাথে মিশেছে লাবন্য। এক কথায় অপরূপ মেয়েটি। তার সিণগ্ধ সৌন্দর্য চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না, কিন্তু আপনার করে কাছে টেনে নেয়।

মেয়েটি স্পষ্ট কুন্ঠাহীন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, কে আপনি?

-আমি একজন বিদেশী। পথ হারিয়েছি।

-কোথা থেকে আসছেন?

-ম্যানিলা থেকে।

-যাবেন কোথায়?

-হোয়াইট রোডে?

-হোয়াইট রোডে? তাহলে এ পথে এসেছেন কেন? পার্ক রোড ধরে যাওয়া উচিত ছিল আপনার।

মিঃ কার্টার কিছু বলল না।

মেয়েটিই আবার বলল, অনেক গলি-কুচো ঘুরে আপনাকে যেতে হবে হোয়াইট রোডে। থামল একটু। বলল আবার, আপনি ভিতরে একটু বসুন। আমি সংক্ষিপ্ত স্কেচ করে দিচ্ছি।

বলে মেয়েটি ভিতরে সরে দাঁড়াল। আহমদ মিঃ কার্টার গিয়ে বসল সোফাটায়। মেয়েটি সিঁড়ি ভেঙে উপরে চলে গেল।

কক্ষটি বসার ঘর। সারিবদ্ধ সোফাসেটে সাজানো। কক্ষের দেয়ালে মিন্দানাওয়ের কয়েকটি ল্যান্ডস্কেপ। মাঝখানে বড় একটি যীশুর মূর্তি। রৌপ্যের ফ্রেমে বাঁধানো। যীশুর কয়েকটি বাণীও আছে টাঙ্গানো।

মেয়েটি ফিরে এলো। স্কেচ করা একটি কাগজ তুলে দিল মিঃ কার্টারের হাতে।

মিঃ কার্টার একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিল। তারপর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে মেয়েটিকে বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি আপনাকে?

-নিশ্চয় করতে পারেন!

-আমার ধারণা সত্য হলে, আপনি খৃষ্টান। কিন্তু আলাবী বালপকীর গান আপনি জানলেন কি করে এবং অমন ক্ষমতা দিয়ে সে গান আপনি গাইতে পারলেন কি করে?

প্রশ্ন শুনে মেয়েটির চোখ মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। পরে চোখ খুলে ধীরে ধীরে মেয়েটি বলল, কেন জানবে না, কেন গাইতে পারব না, আমি কি এ মাটির মেয়ে নই?

-আমার জিজ্ঞাসা হলো, আলাবী বালপকীর মরমী সংগীত সোলোর মুসলমানদের নিজস্ব সম্পদ, কোন খৃষ্টান এটা গাইবে এটা অবিশ্বাস্য।

বেদনার একছায়া খেলে গেল মেয়েটির মুখের উপর দিয়ে। তার ফুলের পাঁপড়ির মত পাতলা ঠোট দু’টি যেন কুঞ্চিত হয়ে পড়ল কিছুটা। নতমুখী সে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল, বিদেশী আপনি, আলাবী বালপকীকে চিনলেন কি করে? আর এখানকার মুসলামানদের একান্ত ঘরের এ কথা আপনি জানলেন কি করে?

-বিদেশীদের পক্ষে এসব জানাকি একান্তই অসম্ভব?

-তাহলে কি আপনি মুসলমান।

-স্বীকার করছি।

-অপরাধ স্বীকারের মত হলো কথাটা। মেয়েটির পাতলা ঠোঁটের উপর দিয়ে এক টুকরো হাসি খেলে গেল।

-মিন্দানাওয়ে মুসলমান হওয়া অপরাধ নয়, তাহলে বলবেন?

মেযেটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে এক দৃষ্টিতে মিঃ কার্টারের দিকে চেয়ে আছে। খুঁটে খুঁটে দেখছে তাকে। তারপর সে বাইরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে মিঃ কার্টারের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে বলল, আপনার সত্যিকার পরিচয় কি।

-আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?

-হাঁ

-কারণ, ম্যানিলা থেকে কোন মুসলমান এইভাবে কাগায়ান আসতে পারে না। আপনার মত বুদ্ধিমান লোক ম্যানিলা থেকে এসে কাগায়ান পথ ভুল করতে পারে না।

মিঃ কার্টার বিস্মিত দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে চেয়ে রইল। অদ্ভুত বিশ্লেষণ শক্তি মেয়েটির। সাধারণের তালিকায় এ মেয়ে পড়ে না।

আমার পরিচয় পরে হবে, আপনার পরিচয়টা কি জানতে পারি?

-নিশ্চয়। ফিলিপাইন সিক্রেট সার্ভিসের একজন অপারেটর।

-আর আমি আহমদ মুসা।

মেয়েটি সামনে দাঁড়িয়েছিল। ভূত দেখার মত অষ্ফুট আর্তনাদ করে সে গিয়ে সামনের সোফায় বসল। দুহাতে মুখ ঢেকে বসে রইল বহুক্ষণ।

ঘড়ির দিকে চেয়ে আহমদ মুসা আঁতকে উঠল। রাত এগারটা। দ্রুত বলল সে, আমি এখন কি যেতে পারি?

-আপনার প্রশ্নে জবাব নিলেন না । মুখ তুলে বলল মেয়েটি। বিধ্বস্ত মুখ তার।

-আমি জবাব পেয়ে গেছি।

-কি জবাব পেয়েছেন?

-আলাবী বালপকীর এক ভক্ত তাঁর সমাজ থেকে দূরে সরে গিয়েও তাকে ভুলতে পারেনি।

আহমদ মুসার এই কথা মেয়েটির উপর যেন ভৌতিক ক্রিয়া করলো। সে অস্থির কন্ঠে বলে উঠল, না, না, না, বালপকীকে নয়, আমার মাকে ভুলতে পারিনি, মায়ের মুখ ভুলতে পারিনি, মায়ের গান, মায়ের কাহিনী ভুলতে পারিনি আমি। বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল মেয়েটি।

রাজ্যের মমতা নেমে এসেছে আহম মুসার চোখে। অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত এই মেয়েটির দিকে সে চেয়ে আছে অনিমেষ চোখে। প্রকাশহীন এই বেদনায় যে মেয়েটি কতদিন থেকে নিষ্পিষ্ট হচ্ছে কে জানে? আজ প্রকাশের পথ পেয়ে প্রতিরোধের কৃত্রিম দুর্গ ভেঙ্গে পড়েছে খান খান হয়ে। প্রলোভনে পড়ে, অবস্থার চাপে কিংবা বাধ্য হয়ে সত্যের আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে কত তরুণ-তরুণী এমনিভাবে অন্তর্বেদনায় জর্জরিত হচ্ছে, কে তার খোঁজ রাখে। ভাবতে গিয়ে আহমদ মুসার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল।

সে উঠে গিয়ে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, বোন, তোমাদের এ অবস্থার জন্য দায়ী আমাদের অধঃপতিত সমাজ, পথভ্রষ্ট ধর্মনেতা আর আহাম্মক রাষ্ট্র নেতারা। থামল আহমদ মুসা।

আবার বলল, আজ যে কত আনন্দিত আমি আমাদের এক হারানো বোনকে আমরা ফিরে পেলাম।

মেয়েটি তাড়াতাড়ি উঠে আহমদ মুসার পায়ে সালাম করে উঠে দাঁড়াল। চোখ মুছে বলল, আমার আগের নাম, সাবেরা। আমি এখন থেকে সাবেরা। বলতে বলতে কান্নায় তার কথা জড়িয়ে গেল আবার।

আহমদ মুসা বলল, সাবেরা বোন আমাকে উঠতে হয়। আর দেরী করতে পারি না।

-আপনি হোয়াইট রোডে কেন যাবেন আমি জানি, কিন্তু আমি আপনাকে যেতে দেব না। ঐ পাওয়ার হাউজ আমিই উড়িয়ে দিতে পারব।

-না, বোন। তা হয় না। তুমি আজ অশান্ত, কোন এ্যাসাইনমেন্ট আমি তোমাকে দিতে পারি না আজ।

-কাগায়ান শহরের সমস্ত শক্তি আজ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। সমগ্র ফিলিপাইন, শ্বেতাঙ্গ আর ইহুদীরা আজ কাগায়ান শহরের দিকে চেয়ে আছে। সমগ্র কাগায়ানে জাল পেতে রাখা হয়েছে আপনাকে ধরার জন্য। আমি আপনাকে কিছুতেই যেতে দেব না এখান থেকে।

আহমদ মুসা গম্ভীর কন্ঠে বলল, আমি কে জান?

-জানি, আমাদের নেতা।

-অতএব নেতার নির্দেশ অমান্য করো না।

বলে আহমদ মুসা দরজা খুলে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। সাবেরা হাত দু’টি উপরে তুলে বলল প্রভু হে, আজ দীর্ঘ ১৪ বছর পর তোমাকে ডাকছি প্রভূ, তুমি হতভাগা এ জাতির মহান নায়ককে হেফাজত করো প্রভু।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *