৬৬
আকাশের রং কালচে নীল। গাছপালার সবুজের গায়েও কালচে ছোপ ধরেছে। চরাচর কালো হয়ে আসছে দ্রুত। সন্ধে নামছে। ঘরে ঘরে জ্বলে উঠছে দীপবর্তিকা। দূর থেকে ভেসে আসছে মঙ্গল-শঙ্খের ধ্বনি। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের সুর। সহসা দ্রুতগামী ঘোড়ার খুরের শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে মনসুরগঞ্জের মান্ডির বুক চিরে চলে যাওয়া শাহি সড়ক। ঘনায়মান অন্ধকার ভেদ করে পাঁচজন ঘোড়সওয়ার বিদ্যুৎবেগে মোরাদবাগ প্যালেসের দিকে ছুটে যায়।
আবছা আলোয় পথচারীরা দেখল, ঘোড়সওয়ারদের সকলের গায়েই যুদ্ধের পোশাক। মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। কারা এরা? নানারকম গুঞ্জনে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল মনসুরগঞ্জের মান্ডিতে।
মোরাদবাগ প্যালেসে একের পর এক আলো জ্বলে উঠছে। সন্ধের অন্ধকারে প্রায় মুছে যাওয়া প্যালেসের অবয়বকে স্পষ্ট করে তুলছে শয়ে শয়ে আলোকবিন্দু। লম্বা লম্বা জ্বলন্ত দণ্ড হাতে বাতিকরেরা যন্ত্রের মতো আলো জ্বেলে চলেছে। কোথাও টুঁ শব্দটি নেই। থমথম করছে গোটা প্যালেস।
এই প্যালেসের সকলেই জানে আজ সকালে যুদ্ধ বেধেছে পলাশির ময়দানে। দুপুরের দিকে খবর বয়ে এনেছিল একজন কাসিদ—লড়াই চলছে জোরদার। দিনান্তে কী হল, সে খবর অবশ্য এখনও এসে পৌঁছয়নি। গোলাম-বাঁদি-দাখিলা-মুনশি-মুৎসুদ্দি সকলেরই চোখেমুখে উদ্বেগের চিহ্ন স্পষ্ট।
অলিন্দে দাঁড়িয়ে গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে বাহির দেউড়ির দিকে চেয়ে রয়েছে হিরা। চোখের পলক পড়ছে না প্রায়। কখন এসে পৌঁছবে কাসিদ। হিরার মনটা অস্থির হয়ে পড়েছে। খুশির কোনও একটা খবর শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছে সে।
পলাশির যুদ্ধের উন্মাদনা পাঁচবছরের শ্রীমন্তলালকেও স্পর্শ করেছে। হাতে খেলনা তরোয়াল নিয়ে ছুটোছুটি করে কয়েকজন গোলামের সঙ্গে সে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলছে। হঠাৎ শ্রীমন্তলালের কচি গলার খিলখিলে হাসির শব্দ শুনে মুখ ফেরায় হিরা।
এক গোলাম শুয়ে আছে মাটিতে। তার বুকের উপর চেপে বসেছে শ্রীমন্তলাল।
হিরা ব্যস্ত হয়ে বলে, ‘কী করছ বেটা? ছেড়ে দাও ওকে।’
‘দ্যাখো হিরাবুয়া আমি ক্লাইভকে খতম করে দিয়েছি। আমি নবাব সিরাজদ্দৌলা।’
হিরার চোখদুটো সহসা জলে ভরে ওঠে। ওড়না দিয়ে আঁশু মুছে মুখে হাসি এনে হিরা ফের বলে, ‘ক্লাইভ তো হেরেই গিয়েছে। এবার ওকে ছেড়ে দাও।’
লাফিয়ে উঠে ‘হু-র-র-রে! জঙ্গ ফতে।’ এই বলে এক ছুটে ঘরের অন্দরে অদৃশ্য হয়ে যায় শ্রীমন্তলাল। তার আনন্দ প্রকাশের ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলে হিরা। চিন্তাগ্রস্ত মনটা একটু হালকা হয়।
মোরাদবাগ প্যালেসের সদর দেউড়িতে এসে থামে পাঁচজন ঘোড়সওয়ার। দরওয়াজা বন্ধ। বাধা পেয়ে পা তুলে চিঁ-হি-হি-হি করে চেঁচিয়ে ওঠে একটা ঘোড়া। এই ঘোড়সওয়ারের দলকে চিনতে পেরে পাহারায় মজুত সেপাই-পেয়াদারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মস্ত বড় লোহার দরওয়াজা খোলার যান্ত্রিক কর্কশ শব্দ কানে আসতে হিরা সচকিত হয়ে ওঠে। কোনও কাসিদ কি পলাশি থেকে খবর নিয়ে এল?
ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে আসে হিরার কানে। শব্দটা এগিয়ে আসছে অন্দরমহলের দিকে। হিরা এক ছুটে দোতলা থেকে একতলায় নেমে আসে।
দোতলা থেকে সিঁড়ি নেমে এসে থেমেছে নরম গালিচায় মোড়া নীচের মস্ত হলঘরে। মস্ত বেলোয়ারি ঝাড়বাতির নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে হিরা চমকে ওঠে। লোকটার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা।
‘কে?’
‘ঘাবড়াও মাত বহেন। আমি।’ এই বলে মুখের কাপড় সরান মোহনলাল।
‘বড়ে ভাইয়া!’ ছুটে এসে মোহনলালের সামনে এসে দাঁড়ায় হিরা। মোহনলালের বিধ্বস্ত চেহারা ও হতাশায় ভরা চোখদুটো দেখে সে আন্দাজ করতে পারছে পলাশির যুদ্ধের ফলাফল। বুক কেঁপে ওঠে তার।
‘পলাশিতে ইংরেজদের জিত হয়েছে বহেন।’
নিমেষে যেন আঁধার নামে হিরার চোখের পর্দায়। সব অন্ধকার। শুধু ভেসে ওঠে সিরাজের সুদর্শন মুখটা। কোথায় সে? কেমন আছে সে? কী হল তার পরিণতি?
‘সিরাজ?’ প্রশ্নটা উদ্বেগের ঢেউয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসে হিরার মুখ থেকে। এ উদ্বেগ একান্ত আপনজনের।
‘জানি না বহেন। হয়তো সে এতক্ষণে পালিয়ে গিয়েছে কোথাও না হলে গ্রেপ্তার হয়েছে ইংরেজদের হাতে।’
‘তাকে ফেলে তুমি পালিয়ে এলে যে?’ হিরার গলায় অনুযোগের সুর।
‘উপায় ছিল না বহেন। লড়াইয়ের ময়দান থেকে সময়মতো ভেগে না আসতে পারলে মওত হত আমার। সবচেয়ে আফশোসের বাত কি জান, যে লড়াইয়ে নিশ্চিত জিত হওয়ার কথা সে লড়াই হেরে গেলাম শুধু একটা চালের ভুলে।’ দুহাত দিয়ে হতাশায় মুখ ঢাকেন মোহনলাল।
হঠাৎ চমকে উঠে হিরা বলে, ‘বড়ে ভাইয়া খুন ঝরছে যে তোমার কাঁধ থেকে।’
‘অল্পের জন্য জান বেঁচেছে বহেন। একটা গোলি কাঁধ ছুঁয়ে গিয়েছে।’
‘হেকিমসাহেবকে ডাকি?’ ব্যাকুল হয়ে ওঠে হিরা।
‘জরুরত নেই। আমি যে এসেছি, সে কথা কাউকে জানিও না বহেন। পলাশির সমাচার এখনও এসে পৌঁছয়নি। খবরটা জানাজানি হওয়ার আগেই পালাতে হবে আমাকে। ক্ষতের ইলাজের জন্য একটু একটু গরম পানি দাও। তুমি নিজে নিয়ে এসো। কোনও বাঁদি বা গোলামকে ডেকো না।’
দ্রুত পায়ে চলে যায় হিরা।
চামড়ায় মোড়া, নরম গদি আটা আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দেন মোহনলাল। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে শরীর। মন অবসন্ন। আফশোস কুরে কুরে খাচ্ছে মোহনলালকে। কেন সিরাজের হুকুমতকে ইনকার করে লড়াই চালিয়ে গেলেন না তিনি। এই ভুলের জন্য সব শেষ হয়ে গেল।
খানিকবাদে গরম জলের পাত্র নিয়ে ছুটে আসে হিরা। মোহনলালের ক্ষতস্থান গরম জলে ধুয়ে মধু ও হলুদ লাগিয়ে ক্ষতস্থান নরম কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়।
উঠে দাঁড়ান মোহনলাল, ‘ওয়াক্ত যেয়াদা আমার হাতে নেই বহেন। এবারে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালাতে হবে আমাকে।’
‘কোথায় যাবে ভাইয়া?’ হিরার গলা ধরে আসে।
‘জানি না। বনে-জঙ্গলে, দুর্গম জায়গায় এখন বাগির মতো পালিয়ে বেড়াতে হবে। নসিবের চাকা ঘোরানোর কোশিশ করে যেতে হবে। শ্রীমন্তলালকে আমার হাতে তুমি তুলে দাও বহেন। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমার সঙ্গে তাকে নিয়ে যাব।’
আঁতকে উঠে হিরা বলে, ‘কী বলছ ভাইয়া?’
মন শক্ত কর বহেন। ভুলে যেও না যেন শ্রীমন্তলাল মসনদের হকদার। সিরাজদ্দৌলার খুন বইছে তার শরীরে। নবাবের খানদানের অনেকেই জানে তোমার ও সিরাজের সন্তান হল শ্রীমন্তলাল। এতদিন আলিবর্দি খাঁ ও সিরাজের ভয়ে কেউ পাঁচকান করেনি কথাটা। এবারে এ নিয়ে কথা উঠবে। সিরাজের উত্তরাধিকারী বলে শ্রীমন্তকে খতম করতে চাইবে অনেকে।’
‘তুমি নিয়ে যাবে শ্রীমন্তকে?’ করুণ গলায় প্রশ্ন করে হিরা।
‘এছাড়া তাকে বাঁচানোর কোনও উপায় নেই বহেন। শক্ত হও।’
‘আমার যে আর কিছুই নেই বড়ে ভাইয়া। শ্রীমন্তকে ছেড়ে আমি বাঁচব কেমন করে?’
‘শ্রীমন্তর কথা ভাবো হিরা। তুমি মা। ছেলের মওত কি তুমি সহ্য করতে পারবে?’
‘বড়ে ভাইয়া!’
‘আমার উপর ভরসা রাখো বহেন। শ্রীমন্তকে বুকে আঁকড়ে রাখব আমি। সে বেঁচে থাকবে। বড় হবে। নসিবের চাকা যদি ঘোরে, একদিন শ্রীমন্ত মসনদের হকদার হয়ে ফিরে আসবে। তাগদের জোরে সেদিন হয়তো সে দখল করে নেবে মসনদ। নসিব-তকদির বড় আজিব চিজ বহেন। ভাবীকালে কী হবে তা কে আগাম বলতে পারে?’
হিরার গোটা দুনিয়া সহসা বেবাক বেরং হয়ে যায়। এই জীবন অর্থহীন বলে বোধ হয় তার কাছে। শ্রীমন্তলাল তার চোখের আড়াল হবে—একথা সে ভাবতেই পারে না। জীবনে সব কিছু হারানোর পর শ্রীমন্তলালকে বুকে আঁকড়ে ধরে শান্তি পেয়েছিল হিরা। তাকে এই শান্তিটুকু দিয়ে গিয়েছিলেন আলিবর্দি খাঁ। আজ সেটাও হারাতে বসেছে সে। সারা দেহ যেন অবসাদে অসাড় হয়ে আসছে। ফরাসের উপর হাঁটু মুড়ে বসে আরামকেদারার হাতলে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে হিরা। বুকটা তার চুরমার হয়ে যাচ্ছে। মনে পড়ছে পুরোনো সব কথা।
হিরা। মোহনলালের পরমাসুন্দরী বোন। তার সঙ্গে আশনাই গড়ে উঠেছিল সিরাজদ্দৌলার। আলিবর্দি খাঁ তখনও বেঁচে। সিরাজদ্দৌলা হবু নবাব। নিন্দুকেরা বলত, সুন্দরী বোনকে হবু নবাবের হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে বশ করেছে মোহনলাল। কিন্তু কথাটা সত্যি নয়।
হিরাকে দেখে বহেরা হয়ে গিয়েছিলেন সিরাজ। তাঁর কাছে হিরা তখন বেহেস্তের গুলাব। আসমানের ফেরেস্তা। কন্দর্পকান্তি সিরাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল হিরাও। দুজনের মন দেওয়া নেওয়া ঘটে যায় মোহনলালের অজ্ঞাতে। বোনের এই সম্পর্কের কথা মোহনলাল যখন জানতে পারলেন, তখন দুজনের অন্তরঙ্গতা অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। গর্ভসঞ্চার হয়েছে হিরার।
এ কথা শুনে শিউরে উঠেছিলেন মোহনলাল—নবাব আলিবর্দি খাঁ জানতে পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। হয়তো ভাই-বোন দুজনেরই গর্দান যাবে। সিরাজ তাঁর জিগরি দোস্ত মোহনলালকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘ঘাবড়াও মাত ইয়ার। আমি নানাজিকে বলে সব সামলে নেব।’
যথাকালে পুত্রসন্তানের জন্ম দেয় হিরা। সব কিছু নানাজিকে খুলে বলার সাহস হয়নি সিরাজের। কী ভবিষ্যৎ হবে এই শিশুটির? ত্রস্ত হয়ে পড়ে হিরা। নিজামতের হুকুম কি তার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে ছেলেকে? কার কাছে ইনসাফ চাইবে হিরা? সিরাজ যে পুত্রের জন্মের পর থেকে ক্রমশ তার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কি নিষ্পাপ শিশুটির ঠাঁই হবে কোনও এতিমখানায়? পথের ধুলোয় পড়ে থাকবে সে। এ সমাজে কোনও পরিচয় থাকবে না তার? হিরা অস্থির হয়ে ওঠে।
নানাজির কাছে সব কিছু খুলে বলতে না পেরে দিশেহারা সিরাজ একদিন এক চরম কাণ্ড করে বসেন—কয়েকমাসের শিশুপুত্রকে একটা ঘোড়ার পিঠের সঙ্গে বেঁধে সেই ঘোড়াকে তিরবিদ্ধ করে ছুটিয়ে দেন। তাঁর আশা ছিল—কেউ হয়তো আহত ঘোড়াকে থামিয়ে তার পিঠে বাঁধা শিশুপুত্রটিকে উদ্ধার করবে, সযত্নে লালন করবে।
হিরা ছুটে গিয়ে মোহনলালকে জানায় সব কথা। ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মোহনলাল। এ তো তাঁর বোনের, তাঁর খানদানের চরম অপমান। মোহনলাল ঘোড়া ছুটিয়ে ছুটে গিয়ে তিরবিদ্ধ ঘোড়াটিকে থামিয়ে শিশুপুত্রটিকে উদ্ধার করে আনেন। হিরার কোলে ফিরিয়ে দেন তার ছেলেকে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে হিরা।
ক্ষুব্ধ হন মোহনলাল। সিরাজকে বলেন পরিবারসহ তিনি মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে যাবেন।
মোহনলালকে বিশেষ স্নেহ করতেন আলিবর্দি খাঁ। অভিজ্ঞ নবাব বুঝেছিলেন এই কাশ্মিরী যুবকটি সিরাজের সাচ্চা দোস্ত। ভবিষ্যতের বড় ভরসা। সিরাজের সঙ্গে মোহনলালের বিবাদের কথা আলিবর্দির কানে আসায় বিচলিত হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু বিবাদের কারণ কী? এর যাচ-ইমতেহানিতে নেমে আলিবর্দি সব কিছু জানতে পারেন। সমাধান বাতলে দেন তিনিই।
হুকুম হয়, সিরাজের সঙ্গে সম্পর্কটা শেষ করতে হবে হিরাকে। তবে ছেলের অধিকার থেকে সে বঞ্চিত হবে না। ছেলেকে নিয়ে দাদা মোহনলালের কাছে থাকবে হিরা। আম-আদমি জানবে শিশুপুত্রটি মোহনলালের। এর নাম হবে শ্রীমন্তলাল। সে বড় হলে জানবে হিরা তার বুয়া।
এই নিদান শুনে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল হিরা। আল্লা বহুত মেহেরবান। নাই বা তাকে মা বলে ডাকল ছেলে, তবুও তো ছেলে তার কাছেই থাকবে। হিরা এতেই খুশি। মোহনলাল ও হিরা দুজনেই আলিবর্দির কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, শ্রীমন্তলালের জন্মকাহিনি তাঁরা গোপন রাখবেন।
এরপর শ্রীমন্তলালকে আঁকড়ে ধরে সিরাজকে মন থেকে মুছে ফেলার সংকল্প করে হিরা। এতদিন সিরাজের প্রতি তীব্র নফরতি সে প্রকাশ করে এসেছে। ছেলেকে দেখার জন্য ব্যস্ত হয়েছে সিরাজ। শ্রীমন্তলালকে মাঝে মাঝে হিরাঝিলে নিয়ে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছে মোহনলালকে। নবাবের এ অনুরোধ রাখতে পারেনি মোহনলাল। সিরাজের ছায়া যেন শ্রীমন্তলালের উপর না পড়ে এই সংকল্পে অটল থেকেছে হিরা। শ্রীমন্তলালকে সে কোনওদিনও হিরাঝিল প্রাসাদে যেতে দেয়নি।
কিন্তু সত্যিই কি সিরাজকে মন থেকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে পেরেছে হিরা? ষোড়শী হিরার অন্তরে মহব্বতের যে গভীর দাগ ফেলেছিলেন সিরাজ, পাঁচ সাল বাদেও সে দাগ যে অমলিন রয়ে গিয়েছে, সেটা হিরা যেন আজ খুব বেশি করে টের পাচ্ছে। না হলে যাঁর সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছে বছর পাঁচেক আগে, আজ কেন তাঁর কথা ভেবে এত বিচলিত হয়ে পড়ছে সে? পলাশির যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়ে এখন কোথায় আছে সিরাজ? কেমন আছে? কেন এসব কথা তার মনে আসছে বারবার?
হিরার মাথায় হাত রেখে মোহনলাল বলেন, ‘মন শক্ত কর বহেন। ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় তোমার চোখে আঁশু দেখলে আমি যে শান্তি পাব না। ওয়াক্ত জেয়াদা নেই। ইজাজত দাও বহেন। শ্রীমন্তকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাই।’
চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ায় হিরা।
‘তোমার জন্য কিছু করে যেতে পারলাম না বহেন। নিজের ধেয়ান রেখো।’
‘আমার জন্য ভেবো না বড়ে ভাইয়া। আমি জানি তুমি থাকতে শ্রীমন্তর কোনও বিপদ হবে না। দূরে যেখানেই থাক, শ্রীমন্ত ভালো আছে, এই আশা নিয়ে আমি না হয় বেঁচে থাকব।’
নিজেকে আর সামলাতে পারে না হিরা। মোহনলালের বুকে মাথা রেখে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। বোনের মাথায় হাত বোলাতে থাকেন মোহনলাল। তাঁর গাল বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা।
কিছুক্ষণ পর মুর্শিদাবাদ শহর ছাড়িয়ে অন্ধকার পথ ধরে ছুটে চলে পাঁচজন ঘোড়সওয়ার। মোহনলাল ও তাঁর চারজন বিশ্বস্ত দেহরক্ষী। মোহনলালের ঘোড়ার পিঠে চেপেই চলেছে শ্রীমন্তলাল। তার মনে প্রবল উৎসাহ। মোহনলাল তাকে বলেছেন লড়াইয়ের ময়দানে নিয়ে যাচ্ছেন। নিজের চোখে লড়াই দেখার খোয়াবে বুঁদ হয়ে রয়েছে শ্রীমন্তলাল।
মোহনলাল একহাতে ধরে রেখেছেন ঘোড়ার রাশ। আরেক হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছেন তার সামনে বসা শ্রীমন্তলালকে। এই শিশুটির দেহে রয়েছে হিরা ও সিরাজদ্দৌলার রক্ত। আলিবর্দির খানদানের সঙ্গে মোহনলালের খানদানের রিস্তেদারির বড় সাবুদ শ্রীমন্তলাল। যেভাবেই হোক, আগলে রেখে বড় করে তুলতে হবে তাকে। মোহনলাল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আকাশ মেঘে ভরা। নিকষ কালো অন্ধকার ফুঁড়ে তিরবেগে এগিয়ে চলে মোহনলালের ঘোড়া।
