৫৬
যুদ্ধের উত্তেজনা, আশঙ্কা, ত্রাসে কাঁপছে মুর্শিদাবাদ। রোজই নানারকম গুজব উড়ছে মুর্শিদাবাদের চকবাজারে। হঠাৎ হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ে—চন্দননগর থেকে ফৌজ ও জাহাজ নিয়ে রওনা দিয়েছেন কর্নেল ক্লাইভ। মুর্শিদাবাদে এসে পড়লেন বলে। পরমুহূর্তেই আবার শোনা যায়—ইয়ে দো দিন কা পুরানি বাত। ফৌজ নিয়ে পলাশির কাছাকাছি কর্নেল ছাউনি ফেলেছেন। রায়দুর্লভের বাহিনীর সঙ্গে টোপিওয়ালাদের লড়াই বাধতে চলেছে।
এসব খবর শুনে বিচলিত হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। হুড়োহুড়ি দৌড়োদৌড়ি পড়ে যায়। খানিকবাদেই আবার উলটো খবর আসে—ইয়ে ঝুটা সমাচার। চন্দননগর থেকে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে এখনও রওনা দেয়নি কোম্পানির ফৌজ। কাসিদরা এই মাত্র খবর নিয়ে এসেছে। লোকে তখন শান্ত হয়।
লড়াই বাধলে নিজামতের কী হবে, সিরাজদ্দৌলার কী হবে, নবাব কী পারবেন মসনদ রক্ষা করতে—এসব নিয়ে আমআদমির শিরদর্দ নেই। মুর্শিদাবাদে নবাব বদল তারা আগেও দেখেছে। গিরিয়ার প্রান্তরে মওত হল মুর্শিদকুলির নাতির। নওজওয়ান নবাব সরফরাজ খাঁ বরবাদ হয়ে গেলেন, মসনদে বসলেন আলিবর্দি খাঁ। এক জমানা গেল, আরেক জমানা এল। এভাবেই তামাম দুনিয়ায় শাহি বদলায়, শাসক বদলায়। তাতে অবশ্য আমআদমির রোজনামচায় কোনও ফারাক পড়ে না। বহুত তকলিফের মধ্যে দিয়ে যাদের দিন গুজরান করতে হয়, তাদের কাছে মসনদ-নবাব-বেগম সবই এক খোয়াবে মোড়া দুনিয়ার আজিব চিজ।
দেশে লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা দিলেই সাধারণ মানুষ নিজের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। লড়াই মানেই ফৌজিদের তানাশাহি, জুলুম, লুঠতরাজ। নিজে বাঁচতে, নিজের ঘর বাঁচাতে, নিজের সামান্য সম্বলটুকু বাঁচিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষ নিরাপদ ডেরা খোঁজে। ইংরেজদের ফৌজ আসতে পারে মুর্শিদাবাদে। তাই অনেকের মধ্যেই কী হয়—কী হয় ভাব। যারা অতি সাবধানী তারা গাঁটরি বেঁধে এরই মধ্যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে পথে। কেউ কেউ নৌকোয় চেপে নিশ্চিন্ত আস্তানার তালাশে ভেসে পড়ছে নদীতে।
এরই মধ্যে একদিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রাজধানীর আময়াতরফ মানুষের কানে ভেসে এল কাড়ানাকাড়ার জবরদস্ত আওয়াজ। গোল্লা গোল্লা চোখ করে তারা দেখল সিপাহসালার মিরজাফর বিরাট এক ফৌজ নিয়ে কুচ করে চলেছেন পলাশির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল কানাকানি, ফিসফাস। রায়দুর্লভ আগেই ছাউনি ফেলেছেন পলাশিতে। এবারে জনাব মিরজাফর খাঁ তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে চললেন। সত্যিই গোরা পল্টন এসে পড়ল নাকি?
হাতির পিঠে চেপে নিশ্চিন্ত মনেই পলাশির পথে এগোচ্ছেন মিরজাফর। গতকাল রাতেই পেত্রস আরাটুন মারফত বার্তা দিয়েছেন ওয়াটস। খুব শিগগিরই কর্নেল ক্লাইভের এদিকে এসে পড়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। মিরজাফরকে মসনদে বসানোর বিনিময়ে ইংরেজদের পাওনাগণ্ডা কী হবে, তা নিয়ে চুক্তিপত্র চূড়ান্ত হলে তবেই কর্নেল ক্লাইভ ফৌজ নিয়ে এগিয়ে আসবেন। হাওদায় বসে মিরজাফর ভাবছিলেন, পলাশি যাওয়ার হুকুমত জারি করে একদিক থেকে তাঁর উপকারই করেছেন নবাব। ইংরেজদের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে পলাশিতে বসে রায়দুর্লভের সঙ্গে আলোচনা সেরে নেওয়া যাবে।
রণডঙ্কা বাজিয়ে এগোতে থাকে মিরজাফরের ফৌজ। হাতি-ঘোড়া-লোক-লস্কর-পদাতিক-বন্দুকচি-ধানুকি নিয়ে বিরাট এক কাফেলা। আড়েবহরে এ ফৌজ ভয় জাগানোর মতোই।
ভাগীরথীর চরে পাখি শিকারে গিয়েছিলেন উইলিয়াম ওয়াটস। পাখি মারা বন্দুক কাঁধে, গোটা চারেক জখম বেলেহাঁস হাতে ঝুলিয়ে ক্লান্ত দেহে ওয়াটস যখন কুঠিতে এসে ঢুকলেন তখন সন্ধে নামছে। কুঠিতে পৌঁছেই ওয়াটস সাহেব শুনলেন উমিচাঁদ এসে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন।
ওয়াটসের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। হঠাৎ এই সন্ধেবেলা উমিচাঁদের আগমনের কারণ? মিরজাফর মসনদে বসতে রাজি হওয়ার পর থেকে উমিচাঁদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছে ইংরেজরা। কেননা উমিচাঁদকে পছন্দ করেন না মিরজাফর। তাই ইংরেজদের কাছে উমিচাঁদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। পেত্রস আরাটুন এখন ক্লাইভের হাতে জবরদস্ত বাজি। তার মারফতই ষড়যন্ত্রের রূপরেখা চূড়ান্ত করার জন্য ইংরেজদের সঙ্গে মিরজাফরের বাতচিত চলছে।
যাই হোক, ফ্রেশ হয়ে নিজের অফিসঘরে উমিচাঁদকে তলব করলেন ওয়াটস।
‘গুড ইভনিং উমিচাঁদজি।’
‘সেলাম সাহেব। গুড ইভনিং।’
বিয়ারের পাত্রে চুমুক দিয়ে ওয়াটস বললেন, ‘খাস বাত কী আছে বলুন।’
‘বাত তো বহুত জমে আছে ওয়াটস সাহেব। অনেকদিন পর আপনার সঙ্গে মোলাকাত হল।’
উমিচাঁদের কুরসির পাশে আগেই ফরসি রেখে গিয়েছিল একজন দাখিলা। গুড়গুড় করে খানিকটা তামাক টেনে উমিচাঁদ বললেন, ‘চমৎকার তামাক।’
‘বার্মা থেকে আনা।’ বললেন ওয়াটস।
যে কাজের জন্য এসেছেন, সে কাজের গৌরচন্দ্রিকা শুরু করলেন উমিচাঁদ। ‘সাহেব আপনাদের সঙ্গে আমার দোস্তি বহুত দিনের। নবাব বদল হওয়ার পর আশা করি আপনারা আমাকে ইয়াদ রাখবেন।’
হেসে উঠে ওয়াটস বললেন, ‘এই বাত বলতে আপনি মুর্শিদাবাদ থেকে কাশিমবাজার এলেন?’
‘না সাহেব। বাত আরও আছে। আমার কথা শোনার মতো ফুরসত হবে কি আপনার? উমিচাঁদের গলায় যেন ক্ষোভের সুর।
ওয়াটস সহজ গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ। বলুন না?’
‘হবু নবাব মিরজাফর খাঁ সাহেবের সঙ্গে আপনাদের দৌলত বাঁটোয়ারার আহদনামা কি চূড়ান্ত হয়ে গেছে?’
শিঁরদাড়া টানটান করে বসলেন ওয়াটস। হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? মতলব কী উমিচাঁদের? ওয়াটস অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, ‘দৌলত বাঁটোয়ারা কীসের?’
‘আপনি জানেন না?’
‘না। জানি না।’ সহজ গলায় উত্তর দিলেন ওয়াটস।
‘বেশ। ইনকিলাবের পর নবাব সিরাজদ্দৌলার দৌলত মিরজাফর খাঁর দখলে আসবে। মসনদে বসে খাঁ সাহেব আপনাদের খুশ রাখবে না? দৌলত তো আপনাদের মাথায় বারিষ হয়ে ঝরবে। আমি এসব বুঝি ওয়াটস সাহেব। হে-হে।’
ঘোড়েল লোক উমিচাঁদ। গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে ওয়াটস বললেন, ‘এসব নিয়ে কিছু ভাবছি না আমরা। তাছাড়া নবাবের খাজানাখানায় যে কত দৌলত মজুত আছে, তা নিয়ে আমাদের কোনও আন্দাজ নেই।’
মুখে হাসির রেশ ধরে রেখে উমিচাঁদ বললেন, ‘আমার আছে। করিব চল্লিশ কোটি।’ উমিচাঁদের চোখদুটো লোভে চকচক করে উঠল।
ওয়াটস বললেন, ‘নবাবের দৌলত চল্লিশ কোটিই থাক বা চার কোটিই থাক এ নিয়ে আমাদের কোনও শিরদর্দ নেই উমিচাঁদজি। আমরা সওদা করতে এসেছি। বেঙ্গলে লুঠ করতে আসিনি।’
আহা কী কথা! বিড়াল বলছে মছলিতে অরুচি—মনে মনে ভাবলেন উমিচাঁদ। মুখে বললেন, ‘আরে আরে, কী বাত বলছেন আপনি? লুঠ বলছেন কেন? ইনাম বলুন। ইনকিলাবে কামেয়াবির ইনাম।’
মুখটাকে আরও গম্ভীর করে তুলে ওয়াটস বললেন, ‘নবাব কি ইনাম দেবেন তা আমরা আগাম বলব কেমন করে?’
‘আপনাদের যা মরজি হবে উনি তাই দেবেন।’
‘এ আপনি কেমন কথা বলছেন? নতুন নবাব কি আমাদের মরজির গোলাম হবেন?’
‘জরুর, তাই হবেন। এক বেওকুফ গিদ্ধড়কে মসনদে বসাবেন আপনারা। কর্নেল ক্লাইভ যা চাইবেন তাই হবে। হে-হে। তাই বলছিলাম আমার কথাটা ইয়াদ রাখবেন। দুর্দিনে আপনাদের কম মদত দিইনি আমি। গেল সাল কলকাতার লড়াইয়ের পর নবাবের গুসসা থেকে আপনাদের জিন্দা বাঁচিয়েছিলাম। ফলতায় ভুখা মরছিলেন আপনারা। মানিকচাঁদকে বলে আমি মান্ডি চালু করার পরোয়ানা আদায় করে দিয়েছিলাম। গুলাব কি ফুল তাজা হ্যায়—বলে ধোঁকা দিয়েছি নন্দকুমারকে। তাই চন্দননগরের লড়াই ফতে করা আসান হয়েছে আপনাদের পক্ষে।’
ওয়াটস বললেন, ‘এসবই আমাদের ইয়াদ আছে উমিচাঁদজি।’
এবারে উমিচাঁদ আসল কথায় এলেন। ‘ইনকিলাবের পর নবাবের দৌলতখানা থেকে যা পাওয়া যাবে তার পাঁচ পারসেন্ট আমার চাই।’ হাতের পাঁচ আঙুল প্রসারিত করে সংখ্যাটাও দেখিয়ে দিলেন উমিচাঁদ।
বিয়ারের পাত্রে চুমুক দিতে গিয়ে থমকে গেলেন ওয়াটস। সত্যিই যদি নবাবের দৌলতখানায় চল্লিশ কোটি টাকা থাকে, তবে তার পাঁচ পারসেন্ট ধরে উমিচাঁদের প্রাপ্য হিসেব করে ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হল ওয়াটসের। ভাবলেন, বলছেন কী উমিচাঁদ? দিমাগ ঠিক আছে তো?
ওয়াটসের স্তম্ভিত মুখের দিকে চেয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘হে-হে—খুব বেশি মোটেই চাইছি না। আপনাদের ভাগে অনেক থাকবে। আপনি ক্লাইভ সাহেবকে জানাবেন। আর ইয়াদ রাখবেন নবাব সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে সাজিশের ব্যাপারে অনেক কিছু আমি জানি। হররোজ দরবারে আমার যাতায়াত আছে। নবাব সিরাজদ্দৌলা আমাকে বিশেষ খাতির করেন।’
শেষ কথাগুলো যে হুমকি, সেটা বুঝতে কোনও অসুবিধা হল না ওয়াটসের।
উমিচাঁদ বিদায় নেওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ চিন্তিত মুখে ঘরের মধ্যে পায়চারি করলেন ওয়াটস। তারপর কলম ও কাগজ নিয়ে চিঠি লিখতে বসে পড়লেন। গোটা ঘটনাটা কর্নেল ক্লাইভকে অবিলম্বে জানানো দরকার। কাল সকালে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেবে স্ক্র্যাফটন। ওয়াটস ঠিক করলেন, তাঁর হাত দিয়েই চিঠিটা পাঠিয়ে দেবেন।
কাজের বেলায় কাজি, কাজ ফুরোলে পাজি। উমিচাঁদের এখন হয়েছে সেই দশা। তাঁর মনোনীত প্রার্থী ইয়ার লতিফ খানকে মসনদে বসানোর প্রস্তাব কর্নেল ক্লাইভ খারিজ করে দেওয়ার পর থেকে বাংলার রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে উমিচাঁদ ক্রমশ যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছেন। ইংরেজরা বুঝছে, নবাব বদলানোর খেলা এখন অনেকটাই তাদের হাতে। এ খেলার বাকি অংশে উমিচাঁদের তেমন কোনও ভূমিকা নেই। তাঁকে আর গুরুত্ব না দিলেও চলে।
কিন্তু এত সহজে হার মানার মানুষ নন উমিচাঁদ। তিনি বিলক্ষণ টের পারছেন, বাংলায় ইনকিলাব আসন্ন। হাতবদল হবে নবাবের দৌলত। উমিচাঁদের মতে যার আর্থিক মূল্য করিব চল্লিশ কোটি। নবাব বদলের পর এ টাকার বড় একটা অংশ কোম্পানির অনেক সাহেবের পকেটে ঢুকবে। দিশি ওমরাহরাও প্রসাদ পাবেন। এ বিষয়ে উমিচাঁদ নিশ্চিত। শুধু তিনি কেন ফাঁকিতে পড়বেন? তাই আগেভাগেই ওয়াটসের সঙ্গে দেখা করে নিজের পাওনার বিষয়ে গাওনা গেয়ে রাখলেন।
রাত হয়েছে। নির্জন পথ ধরে কাশিমবাজার থেকে মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে চলেছে উমিচাঁদের পালকি। সামনে পিছনে মশালচি ও পাহারাদারেরা। পালকিতে আধশোয়া অবস্থায় উমিচাঁদ গভীর চিন্তায় মগ্ন। চোখ দুটো বোজা। তাঁর ভাবনাটা কর্নেল ক্লাইভকে নিয়ে।
বর্তমানে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে কর্নেল ক্লাইভের ইচ্ছাই কোম্পানির ইচ্ছা। কিছুদিন আগে কর্নেলের সঙ্গে একবার দেখা করার অনুমতি চেয়েছিলেন উমিচাঁদ। ভেবেছিলেন নিজের দাবিটা সরাসরি তাঁকেই জানাবেন। কিন্তু উমিচাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাননি ক্লাইভ। কাজে ব্যস্ত আছেন এই অজুহাত দিয়ে উমিচাঁদকে এড়িয়ে গিয়েছেন।
তবে হাল ছাড়েননি উমিচাঁদ। বড় খেলায় সাফল্য পেতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়। এক পথে বাধা পড়লে অন্য পথ ধরতে হয়। কৌশল খাটাতে হয়। এসব উমিচাঁদ জানেন। সোজা কথায় কাজ হয়তো হবে না, তাই নিজের দাবি জানানোর পাশাপাশি উইলিয়াম ওয়াটসকে প্রচ্ছন্ন একটা হুমকিও দিয়ে গেলেন ঘোড়েল এই বেনিয়া—চুক্তিতে তাঁর প্রাপ্যের কথা না থাকলে তিনি ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেবেন নবাবের কাছে। তখন নবাবের ভয়ে পিছু হটতে বাধ্য হবেন মিরজাফর-রায়দুর্লভ-জগৎশেঠ। ইংরেজদের সব জারিজুরি খতম হয়ে যাবে।
উমিচাঁদ বেওকুফ নন। তিনি ঠিকই বোঝেন যে দরবারের বিক্ষুব্ধ ওমরাহরা গদ্দারি না করলে ইংরেজদের পক্ষে মসনদ থেকে সিরাজদ্দৌলাকে টেনে নামানো কঠিন। কাজেই যে হুমকি তিনি ওয়াটসকে দিয়ে এলেন সে কথা জানার পর ক্লাইভ কি তাঁকে গুরুত্ব না দিয়ে পারবেন?
পালকির অন্দরে বসে আপনমনে মুচকি হাসলেন উমিচাঁদ। মনে মনে ক্লাইভের উদ্দেশে উমিচাঁদ বললেন, কর্নেল সাহেব, বাঁকা বুদ্ধি উমিচাঁদের মগজেও বড় একটা কম নেই। এ দিশি মূর্খ বেনিয়া বলে যেন তাচ্ছিল্য করবেন না আমায়!
কয়েকদিন পর নবাবের সঙ্গে দেখা করলেন উমিচাঁদ।
কুশল বিনিময়ের পর উমিচাঁদ বললেন, ‘হুজুর আমি আপনার গোলাম। আপনি আমার মা-বাপ। বেতমিজ ইংরেজরা আমাকে বহুত তকলিফ দিয়েছে। আমার কারবারে বহুত লোকসান পৌঁছেছে। এই শয়তান টোপিওয়ালাদের জুতা মেরে বারদরিয়া পার করিয়ে দেওয়া উচিত।’
সিরাজদ্দৌলা খুশি হয়ে বললেন, ‘ইয়ে বিলকুল সচ বাত বলেছেন উমিচাঁদজি।
‘আপনার দরবারের অনেকের ঝোঁক ইংরেজদের দিকে।’
‘মালুম হ্যায়। ইবলিশের বাচ্চা ওই গদ্দারদের আমি খতম করব।’ আস্ফালন করে বললেন নবাব।
‘আমি কারবারি আদমি হুজুর। কারবারি লোককে অনেক ঘাটে জল খেতে হয়। অনেক কথা ভি কানে আসে। হুজুর আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন, ইমান দেন, আমি আপনার সঙ্গে বেইমানি করতে পারি না।’
সিরাজদ্দৌলা খুশি হয়ে বললেন, ‘আমি জানি আপনি আমার সাচ্চা দোস্ত। খাস বাত কী আছে বলুন।’
ভূমিকাতেই নবাবের মন জিতে নিলেন ঝানু কারবারি উমিচাঁদ। নবাবের কথার প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘বাত বহুত গম্ভীর। আমার মনে হল অবশ্যই আপনাকে জানানো উচিত। হুজুরকে হুঁশিয়ার করা গোলামের কাজ। লেকিন আমার জবানে আপনি এসব শুনেছেন, একথা আর পাঁচজনে জানলে আমার জান খতরা হবে।’
উমিচাঁদের কথার রহস্যময় ভঙ্গি সিরাজদ্দৌলাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করল। প্রবল কৌতূহলের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘আপনি আমার উপর ভরসা রাখতে পারেন উমিচাঁদজি।’
উমিচাঁদ এবার চাপা গলায় বললেন, ‘আলিনগরের সুলেনামা ইংরেজদের এক চালবাজি।’
সিরাজদ্দৌলা হেসে বললেন, ‘ইয়ে তো পুরানা বাত।’
উমিচাঁদ এবারে চোখ গোল্লা করে বললেন, ‘ইংরেজদের সঙ্গে ফরাসি জেনারেল বুসির দোস্তি হয়েছে। খুদ ওয়াটস সাহেবের জবানে আমি শুনেছি।’
এ একেবারে উমিচাঁদের মনগড়া কথা। নির্জলা মিথ্যে কথাটায় সত্যতার জবরদস্ত মোড়ক দেওয়ার জন্য ওয়াটসের নামটাও নিজের কল্পনার সঙ্গে জুড়ে দিলেন তিনি।
সিরাজদ্দৌলা চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘আপনি সচ বলছেন?’
‘বিলকুল। বান্দা কি হুজুরকে ঝুট বলতে পারে? বুসি তার দলবল নিয়ে ইংরেজদের মদত দিতে আসছেন।’
দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ল সিরাজদ্দৌলার মুখে।
উমিচাঁদ বললেন, ‘আপনাকে হুঁশিয়ার করার জন্যই কথাটা বললাম হুজুর। আমার অন্য কোনও ধান্দা নেই। আমি আপনার সাচ্ছা বান্দা।’
উমিচাঁদের আনুগত্যের দেখনদারিতে গলে গিয়ে সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘বহুত আচ্ছা।’
‘হুজুর মেহেরবান।’
নবাব শুধোলেন, ‘গেল সাল কলকাতা হামলার সময় আপনার যে লোকসান হয়েছিল, তার খেসারত পেয়েছেন?’
সিরাজদ্দৌলার খেয়াল নেই। আগে এ নিয়ে দুবার তাগাদা দিয়েছিলেন উমিচাঁদ। তেমন আমল দেননি নবাব। নবাবের প্রশ্নে বড় একটা আগ্রহ না দেখিয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘ও নিয়ে ভাবনা কী? খেসারতের টাকা তো হুজুরের ঘরে মজুত আছে। আজ না হয় কাল ঠিকই মিলবে।’
‘আমি দেওয়ানখানায় বলে দিচ্ছি। কালই নিয়ে নেবেন।’
নবাবকে তসলিম জানিয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘হুজুর বহুত মেহেরবান।’
‘বাত অউর কুছ হ্যায়?’
‘এক ছোটি সি বাত। বর্ধমানের মহারাজা ত্রিলোকচাঁদ বাহাদুর আমার কাছ থেকে চার লাখ টাকা কর্জ করেছিলেন। টাকাটা যদি আদায় উশুলের বন্দোবস্ত করে দেন’
‘আমি পরোয়ানা লিখে দিচ্ছি। রাজাবাহাদুরের সঙ্গে দেখা করবেন।’ বললেন সিরাজদ্দৌলা।
‘বহুত বহুত সুক্রিয়া। সহি সলামত থাকুন হুজুর। শ’বরস জিন্দা থাকুন।’
আলোচনা সেরে হিরাঝিল প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন উমিচাঁদ। যে উদ্দেশে নবাবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তা সফল হল। সামনের সময়টা বড় গোলমেলে। এ সময়ে তদ্বির করে বকেয়া টাকা ঘরে ঢোকানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
কিন্তু ইংরেজদের থেকে নিজের দাবি আদায় করে নেওয়া খুব সহজ হবে কি? ভাবতে থাকেন উমিচাঁদ।
