ফলতা থেকে পলাশি – ৬৭

৬৭

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন।

সন্ধের মুখে উটের পিঠে চেপে হিরাঝিল প্রাসাদে ফিরে এলেন সিরাজদ্দৌলা। পথে কেউ যাতে উটটিকে নবাবের রিসালার উট বলে চিনতে না পারে, সে জন্য উটের গা থেকে খুলে নেওয়া হয়েছিল যাবতীয় অলঙ্কারসজ্জা।

মাথা কালো চাদরে মুড়ে সামান্য এক বানজারার ছদ্মবেশে পলাশি থেকে মুর্শিদাবাদ এতটা রাস্তা পেরিয়ে এলেন নবাব। পথে কোনও গোলমাল হয়নি। শুধু উটের গতি দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল আমআদমি। রাজপথ দিয়ে কোনওদিনও কোনও উটকে এমন ভয়ংকর গতিতে ছুটতে কেউ দেখেনি। পলাশির যুদ্ধের আবহে এমনিতেই পথঘাট ছিল ফাঁকা। যে কয়েকজন সামান্য মানুষজন ছিল, তারা উটের গতি দেখে প্রাণ ভয়ে ছিটকে সরে গিয়েছিল। সারবানের পিছনে বানজারার পোশাকে, মাথা ঢেকে বসে থাকা মানুষটা যে নবাব সিরাজদ্দৌলা সেটা বুঝতে পারেনি কেউ।

উটের পিঠ থেকে নেমেই সিরাজদ্দৌলা দ্রুত প্রবেশ করলেন অন্দরমহলে। নবাবকে এভাবে একা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসতে দেখে হিরাঝিল প্রাসাদের পাহারায় নিযুক্ত সেপাই-পেয়াদারা সকলে বুঝে গেল কী হয়েছে যুদ্ধের ফলাফল। প্রতিপক্ষের হামলার আশঙ্কায় দ্রুত হিরাঝিল প্রাসাদের ফটক বন্ধ করে দিল তারা।

অন্দরমহলে এসে উদ্ভ্রান্তের মতো খাসদরবারে ঢুকলেন সিরাজদ্দৌলা। বেলোয়ারি ঝাড়বাতির, দেওয়ালগিরি ও বাতিস্তম্ভের আলোয় ঝলমল করছে গোটা কক্ষ। ঠিকরে পড়ছে তার জলুস। শূন্য দৃষ্টিতে এদিকে-ওদিকে তাকাতে লাগলেন সিরাজ। এই শাহি জলুস, দেওয়ালের গায়ে বিচিত্র নকশায় গাঁথা আরশির টুকরো থেকে বিচ্ছুরিত আলো, সবই এখন অর্থহীন তাঁর কাছে। বহু শখ করে তৈরি করা হিরাঝিলকেও কেমন যেন অচেনা ঠেকছে তাঁর। সব থেকেও আজ আর তাঁর কিচ্ছু নেই। সিরাজদ্দৌলা আজ এক বেদৌলত, বেনসিব, বেসাহারা নবাব। উষ্ণীষ খুইয়ে এসেছেন পলাশির ময়দানে।

খিলানের বাহারি নকশা, দেওয়ালের গায়ে পঙ্খের কাজ, মাথার উপরে মস্ত বেলোয়ারি ঝাড়বাতি, মেঝেতে বিছানো বসরা থেকে আনা রক্ত রঙের গালিচা সবই যেন আজ তাঁকে বিদ্রুপ করছে বলে মনে হল সিরাজের। যেন বলছে, কে হে তুমি আজনবি এক মুসাফির, হঠাৎ হিরাঝিল প্রাসাদে এসে উপস্থিত হয়েছ?

সিরাজদ্দৌলার জমানা শেষ হয়ে নতুন জমানার শুরুয়াত হয়েছে। নয়া জমানার চোখে পুরোনো নবাব পলাতক এক বাগি আসামি। সিরাজদ্দৌলা ভাবতে থাকেন, ইংরেজরা তাঁর খোঁজে এতক্ষণে নিশ্চয়ই কাসিদ পাঠিয়ে দিয়েছে দিকে দিকে। ধরা পড়লে এই মুর্শিদাবাদেরই কোনও এক প্রাসাদের অন্ধকূপে হয়তো কয়েদ হবেন তিনি, তারপর হয়তো তাঁর গর্দান যাবে। নতুন জমানার, নয়া নবাব কোনওমতেই রহেম করবেন না তাঁকে। এটাই দস্তুর। বাস্তব সত্যি। শাহি রিয়াসতে বেতাজ, বেদৌলত নবাবকে কেউ জিন্দা ছাড়ে না।

বাঁচতে হবে তাঁকে। কে বলতে পারে নসিবের চাকা একদিন ফের ঘুরবে না? একদিন তাঁর জীবন ফের রওশন হবে না? সিরাজদ্দৌলা মনস্থির করলেন, মুর্শিদাবাদ থেকে পালিয়ে যাবেন পাটনার দিকে। পাটনার নায়েব রামনারায়ণ তাঁর একান্ত অনুগত। তাছাড়া পাটনায় রয়েছেন জাঁ ল। রাজমহল পেরিয়ে যেতে পারলে আর ভাবনা নেই। পাটনা দুর্গে রামনারায়ণের কাছে আশ্রয় নেবেন তিনি। ফের ফৌজ গড়ে তুলবেন। দোস্তি করবেন ফরাসিদের সঙ্গে। যেভাবেই হোক জেনারেল বুসিকে ডেকে আনবেন বাংলায়। তারপর ফরাসিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে হামলা করবেন মুর্শিদাবাদে। ইংরেজদের তাড়াবেন দেশ থেকে। ফের দখল করবেন মসনদ।

‘কে ওখানে?’

শ্বশুর ইরাজ খাঁর গলা শুনে ঘুরে তাকালেন সিরাজদ্দৌলা।

‘এ কী? বেটা তুমি? সিরাজদ্দৌলার বেশবাস ও বিধ্বস্ত চেহারা দেখে চমকে উঠলেন ইরাজ খাঁ।’

ছুটে এসে ইরাজ খাঁর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে সিরাজদ্দৌলা বললেন, পলাশির লড়াইয়ে জিৎ হয়েছে ইংরেজদের। হেরে গেছি আমি। হেরেছি আমার বেওকুফির জন্য। আমি কবুল করছি, সব দোষ আমার। মোহনলালের বাত শুনিনি। মিরজাফরের উপর ভরসা করে বরবাদ হয়ে গেলাম।’ অস্থির চিত্তে একদমে কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগলেন সিরাজদ্দৌলা।

‘শান্ত হও বেটা।’

‘আপনি ভরসা রাখুন আমার উপর। এই শেষ নয়। ফির ফৌজ গড়ে তুলব আমি। আবার লড়াই করব। আপনি আমাকে মদত দিন।’

চুপ করে রইলেন ইরাজ খাঁ।

সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘চলুন আমরা পাটনার দিকে পালিয়ে যাই। ফির ফৌজ গড়ে তুলি। আপনি মদত দিন আমাকে।’

‘না বেটা। আমার যা উমর তাতে বাগিপনাহের ধকল নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি আজই আগ্রার উদ্দেশে রওনা হয়ে যাব। ফির লড়াই করে মসনদ ফিরে পাওয়া তোমার পক্ষে বোধহয় আর সম্ভব নয়।’

সিরাজদ্দৌলা হতাশ হয়ে ইরাজ খাঁর মুখপানে চেয়ে রইলেন। ক্ষণিকের স্তব্ধতা কাটিয়ে তিনি শুধোলেন, ‘আর বেগম উমাদাত উন্নেসা?’

‘সে যদি আমার সঙ্গে যেতে চায়, তাহলে তাকে সঙ্গে নিয়ে যাব।’

চোখে অন্ধকার দেখলেন সিরাজদ্দৌলা। বেগম উমাদাত উন্নেসা যদি তাঁর বাবার সঙ্গে আগ্রা চলে যায়, তাহলে হয়তো সে কোলের শিশু উম্মেসায়েরাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। সেটাই তো স্বাভাবিক। আম্মিজান ছাড়া কেমন করে থাকবে উম্মেসায়েরা? কিন্তু প্রাণের চেয়ে প্রিয় মেয়েকে না দেখে কী করে থাকবেন সিরাজ?

টলতে টলতে উমাদাত উন্নেসার কক্ষে এলেন সিরাজদ্দৌলা।

সুখদোলায় ঘুমিয়ে আছে উম্মেসায়েরা। মসলিনের ডোরি ধরে আলতো টান দিয়ে তাকে দোল দিচ্ছে উমাদাত উন্নেসা, সিরাজের একমাত্র সাদি করা বেগম।

‘বেগম!’

ঘুরে তাকায় উমাদাত উন্নেসা। সিরাজদ্দৌলাকে দেখে চমকে ওঠে সে।

বিকারগ্রস্ত চেহারা। মলিন বেশবাস। দরদর করে ঘামছেন সিরাজদ্দৌলা।

‘নবাব!’

সুখদোলার ডোরি ফেলে দ্রুত পায়ে ছুটে আসে উমাদাত উন্নেসা।

‘কী হয়েছে আপনার?’

‘পলাশির লড়াইয়ে হেরে গেছি আমি।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে সিরাজদ্দৌলার বুক যেন চৌচির হয়ে যায়।

উমাদাত উন্নেসা কোমল গলায় বলে, ‘বসুন নবাব। বিশ্রাম করুন। লড়াই মানেই তো হয় জিৎ না হলে হার।’

‘আমার উপর ভরসা রাখো বেগম। কিছুদিন হয়তো আমাদের পালিয়ে বেড়াতে হবে। তকলিফ হবে অনেক। তবে দেখো, ফের ফৌজ গড়ে তুলব আমি। মসনদ ফির দখল করে নেব।’

‘বেটি!’ হঠাৎ এসে হাজির হন ইরাজ খাঁ।

‘আব্বাহুজুর!’ আপনি এসময়ে হঠাৎ…’

‘সবই নিশ্চয় শুনেছ বেটি। এখানে থাকলে আমার জান খতরা হবে। আমি আজই আগ্রার উদ্দেশে রওনা হয়ে যেতে চাই। তুমি কী করবে ভেবে দেখো।’ এই বলে কক্ষ থেকে বিদায় নেন ইরাজ খাঁ।

ঘুম ভেঙে যায় উম্মেসায়েরার। জেগে গিয়ে কেঁদে ওঠে মেয়ে। ছুটে এসে সুখদোলা থেকে মেয়েকে কোলে তুলে নেন সিরাজ। ড্যাবড্যাবে চোখে মেয়ে চেয়ে থাকে বাবার দিকে। বোধ হয় কেমন যেন অচেনা ঠেকে তার বাবাকে। এইরকম বিপর্যস্ত চেহারায় কখনও সে তার বাবাকে আগে দেখেনি। মেয়ে কি চিনতে পারছে না তাঁকে? চোখে জল এসে যায় সিরাজের।

হঠাৎ কলকল করে হেসে ওঠে মেয়ে। তারপর বলে ‘আ-ব-বা।’

চরম দুঃসময়েও মুহূর্তের জন্য যেন খুশির তুফানে ভেসে যান সিরাজ। পরক্ষণেই ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে তাঁর মন। মেয়েকে ছেড়ে এই মুর্শিদাবাদ থেকে তাঁকে চলে যেতে হবে। পলাতক, বাগি জীবনের দুঃখ কষ্ট না হয় সামলে নেবেন তিনি। কিন্তু মেয়েকে না দেখে বাঁচবেন কেমন করে?

নরম হাতদুটো দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে মেয়ে। সেও যেন তার বাবাকে ছাড়তে চায় না। মেয়ের নরম তুলতুলে দুই গালে চুমু খান সিরাজদ্দৌলা। তারপর কোল থেকে সুখদোলায় নামিয়ে দিতে যান মেয়েকে। মেয়ে নামতে চাইছে না তার বাবার কোল থেকে। বাবাকে সে তুলতুলে দুই হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে।

সিরাজ বলেন, তৈরি হয়ে নাও বেগম। এই প্রাসাদ ছেড়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে হবে আমাদের।’

উমাদাত উন্নেসা বলে, ‘আমাকে রহেম করুন নবাব। আব্বাহুজুর আগ্রা যাচ্ছেন। আমি তাঁর সঙ্গে যেতে চাই।’

সিরাজদ্দৌলার পায়ের তলায় মাটি যেন দুলে উঠল।

‘আমি বড় নাজুক আওরত। বাগি জীবনের তকলিফ আমি সইতে পারব না। সে মনের জোর আমার নেই। আমাকে সঙ্গে নিলে পথে অযথা পরেশান হবেন আপনি। আমাকে ভুল বুঝবেন না নবাব।’ খুবই শান্ত গলায় কথাগুলো বললেন উমাদাত উন্নেসা।

বুকটা মুচড়ে যাচ্ছে সিরাজদ্দৌলার। শুকনো গলায় তিনি বললেন, ‘এই বোধ হয় ভালো। আগ্রায় নানাজির কাছে নিরাপদে থাকবে উম্মেসায়েরা।’

‘সায়েরাকে আপনি আপনার সঙ্গে নিয়ে যান।’

চমকে ওঠেন সিরাজদ্দৌলা, ‘কী বলছ তুমি বেগম?’

‘আমি আপনাকে বুঝি নবাব। উম্মেসায়েরা আপনার কাছ থেকে দূরে চলে গেলে আপনি বাঁচবেন না। এই জিন্দেগিতে আপনার সঙ্গে আমার হয়তো আর মোলাকাত হবে না। বাকি জিন্দেগি আপনার ও সায়েরার তসবির বুকের মধ্যে নিয়ে আমি বাঁচব। সায়েরা আপনার মেয়ে। আপনার সঙ্গেই জড়িয়ে থাক ওর নসিব। আপনার নসিব যদি ফেরে ওর জিন্দেগিও রওশন হবে।’

সিরাজের অন্তরটা হঠাৎ যেন হু-হু করে কেঁদে উঠল। তিনি বললেন, তুমি দেখো বেগম, একদিন আমি লড়াই করে মসনদ ফির দখল করে নেব। সেদিন তোমাকে ওয়াপস নিয়ে আসব আগ্রা থেকে।

ফের দরজায় এসে দাঁড়ালেন ইরাজ খাঁ।

‘আমার রওনা হওয়ার সময় হয়েছে। তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে বেটি?’

‘জি আব্বাহুজুর।’

চোখের জল মুছতে মুছতে দ্রুত কক্ষ ছেড়ে চলে যায় উমাদাত উন্নেসা।

সিরাজ চিত্রার্পিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কোলে উম্মেসায়েরা। কচি হাতদুটো দিয়ে এখনও বাবাকে সে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।

নবাব ফিরে এসেছেন চুপিসারে। পলাশির প্রান্তরে কী ঘটেছে গোলাম-বাঁদিদের কাছ থেকে তা জেনেছে লুৎফুন্নেসা। বেনসিব সিরাজদ্দৌলার করুণ মুখটা কল্পনা করে লুৎফাও ভিতরে ভিতরে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তবুও সে নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখেছে। সেও যদি হতাশায় ভেঙে পড়ে তবে আজ সিরাজকে আগলে রাখবে কে?

এতকাল শাহি খানদানে জীবন কাটিয়ে লুৎফা বুঝেছে একজন বেতাজ নবাব কতটা অসহায়। এতক্ষণে নিশ্চয় নবাবকে খুঁজে বেড়াচ্ছে ইংরেজদের গুপ্তচর, মুর্শিদবাদের নিমকহারামের দল। ধরা পড়লে সিরাজদ্দৌলাকে এরা রেয়াত করবে না। কোতল করে ছাড়বে।

বাঁচতে হলে এখনই সিরাজকে পালিয়ে যেতে হবে মুর্শিদাবাদ থেকে। নিজের ভবিতব্য লুৎফা ঠিক করে ফেলেছে। নবাবের সঙ্গে সেও পাড়ি দেবে অজানা পথে। নবাব তাঁকে সঙ্গে না নিতে চাইলেও সে শুনবে না কোনও কথা। নিজের জান দিয়ে সে আগলে রাখবে তার ভালোবাসার মানুষটাকে। নসিবের খেলায় আলিবর্দির খানদানে জারিয়া হিসেবে ঠাঁই হয়েছিল লুৎফার। তারপর যে খাতে এতকাল তাঁর জীবন বয়েছে তা অনেকটা কহানির মতো। বাস্তবে এমন কমই হয়। জারিয়া লুৎফাকে সিরাজ সব কিছু দিয়েছেন জীবনে—দৌলত, রওশন, ইজ্জত, খুশনসিবি আর সাচ্ছা পেয়ার। সিরাজ ছাড়া লুৎফার যে কোনও অস্তিত্ব নেই। কী করে সে আজ অজানা পথে একলা ছেড়ে দেবে তাঁর প্রাণের মানুষটাকে?

নিজের খাস বাঁদি আলিয়ার সঙ্গে হাত লাগিয়ে পলাতক জীবনের জন্য টুকিটাকি রসদ বেতের টুকরিতে গুছিয়ে নিচ্ছিল লুৎফা। অবসাদ গ্রস্তের মতো তাঁর কক্ষে এসে প্রবেশ করলেন সিরাজদ্দৌলা। কোলে উম্মেসায়েরা। বাবার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে মেয়ে।

‘লুৎফা!’

নবাবের উপস্থিতি টের পেয়ে ছুটে পালায় আলিয়া।

নবাবের দিকে তাকিয়ে শিউরে ওঠে লুৎফুন্নেসা। মাত্র কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে একি চেহারা হয়েছে মানুষটার? মাথায় উষ্ণীষ নেই। এলোমেলো ঝাকড়া ঘন চুল। গৌরবর্ণ মুখে কেউ যেন কালি লেপে দিয়েছে। চোখদুটো অসহায়। মলিন বেশবাস। ঠিক যেন দুনিয়া থেকে খারিজ হয়ে যাওয়া একটা মানুষ। কেউ কি বিশ্বাস করবে, আজ সকালেও এই মানুষটাই ছিলেন বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব? তাঁর ইচ্ছাই ছিল হুকুমত? সামান্য কয়েকঘণ্টার লড়াইয়ে, কিছু লোকের বেইমানিতে যিনি সব খুইয়ে এসেছেন পলাশির প্রান্তরে।

লুৎফার ঘরের সুখদোলায় ঘুমন্ত উম্মেসায়েরাকে শুইয়ে দিয়ে সিরাজ বললেন, ‘এখন থেকে সায়েরার সব ভার তোমার। তোমার কাছে রেখে গেলাম ওকে।’ সুখদোলার ডোরি টেনে আলতো করে মেয়েকে দোলাতে থাকেন সিরাজদ্দৌলা।

লুৎফা নির্বাক। কী বলে নবাবকে সান্ত্বনা দেবে ঠিক করে উঠতে পারছে না।

সিরাজ বললেন, ‘ওর জন্য খোদাতালার কাছে একটু দোয়া মেঙ্গো লুৎফা। সায়েরা বড় বদ-কিসমতি লেড়কি। জীবনের শুরুয়াতেই ওর দুনিয়াটা বেরং হয়ে গেল।’

‘বেগম সাহেবা?’ প্রশ্ন করে লুৎফা।

‘সে তার আব্বাহুজুরের সঙ্গে আগ্রার পথে রওনা হয়ে গিয়েছে।’

লুৎফার দিকে এবারে মুখ তুলে তাকিয়ে সিরাজদ্দৌলা বলেন, ‘এবারে আমাকে যেতে হবে লুৎফা। আর দেরি করা উচিত হবে না। পালিয়ে যেতে হবে। ধরা পড়ে কয়েদ হতে চাই না আমি।’

‘কোথায় যাবেন?’ শুধোয় লুৎফা।

‘পাটনায় যাব ভাবছি। নায়েব রামনারায়ণের কাছে।’

‘আমিও যাব আপনার সঙ্গে।’

মুহূর্তের জন্য যেন খুশি ঝিলিক দিয়ে ওঠে সিরাজের চোখে। ‘তুমি যাবে?’

‘লুৎফার উপর ভরসা নেই আপনার?’

‘বেতাজ নবাবের জীবনে যে অনেক তকলিফ। পারবে তুমি?’

‘আপনার খানদানে আমি যখন জারিয়া হয়ে আসি, তখন আমার উমর আট সাল। নানি বেগমের পেয়ার পেয়ে প্রথম বুঝলাম সুখ কাকে বলে। আমার জীবনের শুরুয়াতটা ছিল বড় কষ্টের। বেনসিবি, তকলিফ—এসবের মানে আমি বুঝি মেহের।’

এতক্ষণ নিজের আবেগকে সংযত রেখেছিল লুৎফা, এবারে ভেঙে পড়ে। সিরাজের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে। নবাব নিশ্চুপ। তাঁর চোখদুটোও ছলছল করছে।

কান্না থামিয়ে মুখ তুলে লুৎফা বলে, ‘আমার উপর ভরসা নেই আপনার? যে জারিয়া লুৎফাকে আপনি সব কিছু দিয়েছেন, সে আপনাকে এই বিপদের দিনে একলা যেতে দিতে পারে? আর এই যে বেহেস্তের গুলাব উম্মেসায়েরা—একে ফেলেই বা আপনি যাবেন কেমন করে? পারবেন আপনি মেয়েকে ছেড়ে থাকতে? এখানে থাকলে সায়েরাও কি নিরাপদে থাকবে? আমি আছি। পথে সায়েরার কোনও তকলিফ হবে না।’

মুগ্ধ হয়ে লুৎফার দিকে তাকিয়ে থাকেন সিরাজদ্দৌলা। কে এই জেনানা? নির্ঘাত বেহেস্তের কোনও ফেরেস্তা। চলমান তসবির হয়ে অতীতের স্মৃতি ভেসে ওঠে সিরাজদ্দৌলার চোখের পর্দায়। পলাশির সেই শিকার বাড়ি। পাশে বিস্তৃত আমবাগান। সেখানে লুৎফাকে প্রথম চুমু খাওয়া, শরমে লাল হয়ে লুৎফার ছুটে পালানো। আজ সেই আমবাগানে মসনদ খুইয়ে এসেছেন তিনি। ইজ্জত, উষ্ণীষ, রওশন, শাহি শান-সওকত সব হারিয়ে গিয়েছে। হারায়নি শুধু লুৎফা। হারিয়ে যায়নি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। সিরাজদ্দৌলা যেন নতুন করে আবিষ্কার করলেন, মসনদ, উষ্ণীষ, দৌলত—এসব কিছুর চেয়েও অনেক কিমতি লুৎফা, আরও কিমতি তাঁর পেয়ার।

দেউড়িতে প্রস্তুত হয়ে আছে গো-গাড়ি। দরিদ্র মুসাফিরের জালসাজিসে হিরাঝিল প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন নবাব। একবার পিছন ফিরে তাকালেন। আর কি ফেরা হবে কোনওদিন?

 সিরাজদ্দৌলার মনটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার আগে দেখা হল না নানি বেগমের সঙ্গে, দেখা হল না আম্মিজানের সঙ্গে। বেইমানরা অন্তত যেন তাদের রেহাই দেয়। আল্লার কাছে এই দোয়া মাঙলেন সিরাজদ্দৌলা।

হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল আকাশ জুড়ে আতশবাজির নকশা। খুশি মানাচ্ছে জাফরাগঞ্জ। ভাগীরথীর ওপারে হাজার হাজার চিরাগ বাতির আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মিরজাফরের জাফরাগঞ্জ প্যালেসের অবয়ব। পলাশির সংবাদ নির্ঘাত পৌঁছে গিয়েছে রাজধানী শহরে। আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। দুশমনেরা যে কোনও সময় তার খোঁজে ধেয়ে আসতে পারে হিরাঝিল প্রাসাদে। গো-গাড়িতে উঠে বসলেন সিরাজদ্দৌলা।

উম্মেসায়েরাকে কোলে নিয়ে গো-গাড়িতে উঠে বসল লুৎফুন্নেসাও। সঙ্গে লুৎফার খাস বাঁদি আলিয়া ও সিরাজের অতি বিশ্বস্ত একজন দেহরক্ষী।

অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের উদ্দেশে যাত্রা করলেন সিরাজদ্দৌলা। রাতের অন্ধকার ভেদ করে দুই আলিশান বলদে টানা গো-গাড়ি তিরবেগে ছুটে চলল ভগবানগোলার দিকে।

শূন্য দৃষ্টিতে সিরাজদ্দৌলা সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ক্রমশ তাঁর কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে মুর্শিদাবাদ। দূরে সরে যাচ্ছে চেহেল সেতুন, হিরাঝিল, মোরাদবাগ, চকবাজার। চোখের জল মুছলেন সিরাজ। তাঁর কানে তখন ভেসে আসে কোনও মসজিদ থেকে ভেসে আসা ইমাম, মুয়াজ্জিনদের কণ্ঠ নিঃসৃত ইশার আজান ধ্বনি—

আশহাদু-আল্লা-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
আশহাদু-আল্লা-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
হাইয়া আলাস সালাহ।
হাইয়া আলাস সালাহ।
হাইয়া আলাল ফালাহ।
হাইয়া আলাল ফালাহ।

***

সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *