৫৩
সিরাজদ্দৌলাকে সরিয়ে পছন্দের কাউকে বাংলার মসনদে বসাতে না পারলে সুবে বাংলার কারবারে ইংরেজদের নসিব ফিরবে না, নিজেদের শর্তে কারবার চালাতে না পারলে চাহিদামতো মুনাফাও ঘরে তুলতে পারবে না কোম্পানি। তাই ইংরেজদের সওদার খাতিরে মুর্শিদাবাদ দরবারের বাগি ওমরাহদের মদত দিয়ে সিরাজদ্দৌলাকে হটিয়ে এমন কাউকে বসাতে হবে বাংলার মসনদে, যে হবে কোম্পানির হাতের পুতুল। এই লক্ষ্যে নবাব বদলের খেলায় মেতেছেন রবার্ট ক্লাইভ।
বাহুবল ও কৌশলে চন্দননগর ও কাশিমবাজার থেকে ফরাসিদের বিতাড়িত করা ছিল এই খেলারই প্রথম ধাপ। কিন্তু তারপর? আপাতত থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছেন কর্নেল। কেননা সামনের পথ এখনও মসৃণ নয়। নবাবের বিরুদ্ধে দরবারি ষড়যন্ত্রটা এখনও তেমন ভাবে দানা বেঁধে ওঠেনি।
ষড়যন্ত্রের রূপরেখা দ্রুত চূড়ান্ত করার ভার উইলিয়াম ওয়াটসকে দিয়েছিলেন ক্লাইভ। ওয়াটস তেমন জুত করে উঠতে পারছেন না দেখে স্ক্র্যাফটনকে পাঠানো হল মুর্শিদাবাদে। কিন্তু কাজটা এগোচ্ছে কোথায়?
নিজেদের মধ্যে ইগোর লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে ওয়াটস ও স্ক্র্যাফটন। ষড়যন্ত্র কবে চূড়ান্ত হবে তার ঠিক নেই, ওদিকে এর কৃতিত্ব কে নেবে, তাই নিয়ে রেষারেষি চলছে দুজনের। ওয়াটস ও স্ক্র্যাফটনের চিঠির ভাষায় সেসব স্পষ্ট হয়ে পড়ছে। একে অপরের নামে কেবল শিকায়ত করে চলেছে। আসল কাজ কদ্দুর এগোল, তার কোনও আন্দাজ পাচ্ছেন না কর্নেল। তিনি রীতিমতো বিরক্ত।
এদিকে এপ্রিল শেষ হতে চলল। বর্ষা আসতে খুব দেরি নেই। বারিষের মরসুমে বাংলার নরম মাটিতে ফৌজ, ঘোড়া, কামান এসব নিয়ে নড়াচড়া করা যায় না। কাজেই লড়াইয়ের ময়দানে সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে চূড়ান্ত বোঝাপড়াটা সেরে ফেলতে হবে খুব দ্রুত।
শুধু বাহুবলের জোরে যে নবাবের বিরাট বাহিনীর সঙ্গে লড়ে জিৎ হাসিল করা যাবে না, সেটা ক্লাইভ জানেন। তাই সিরাজদ্দৌলাকে হটাতে গেলে চাই কৌশল। সেই কৌশল চূড়ান্ত করতে বড্ড বেশি সময় নিয়ে ফেলছে ওয়াটস ও স্ক্র্যাফটন। এ নিয়ে ক্লাইভের মনে অশান্তির শেষ নেই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক উৎপাত।
চন্দননগরে ছাউনি ফেলে অপেক্ষা করছেন ক্লাইভ। এ তল্লাটে দিশি মদ যে এত সস্তা, ক্লাইভের ধারণাই ছিল না। জলের দরে মদ পেয়ে গোরা পল্টনদের অনেকেই দিনরাত নেশায় চুর হয়ে থাকছে। ফৌজের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। এর সঙ্গে রয়েছে রঙ্গিনীদের হাতছানি। আড়কাঠিরা ঘুর ঘুর করছে সেনাছাউনির আশপাশ দিয়ে। মদ আর মেয়েছেলে—এই দুই রিপুর প্রকোপে কর্নেলের সেনাবাহিনী প্রায় উচ্ছন্নে যাওয়ার জোগাড়।
নানা দুশ্চিন্তায় ঘুম আসছে না কর্নেলের। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছেন। গরমটাও পড়েছে বেয়াড়া রকমের। ঘরের বাইরে বসে ঢুলতে ঢুলতে পাঙ্খাপুলার যন্ত্রের মতো টানাপাখার দড়ি টেনে চলেছে অনবরত। কিন্তু এই মাঝরাতেও বাতাস একেবারে আগুন। এতটুকু স্বস্তি হচ্ছে না পাখার বাতাসে। বিছানা যেন ছ্যাঁকা মারছে পিঠে। কর্নেল দরদর করে ঘামছেন।
হঠাৎ তাঁর কানে ভেসে এল একটা গোলমালের আওয়াজ। কয়েকজন অশ্রাব্য ভাষায় নিজেদের মধ্যে গালিগালাজ করছে। মাতাল হয়ে কাজিয়া বাঁধিয়েছে কয়েকজন গোরা পল্টন। ক্লাইভের মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। বুলস আই লণ্ঠন হাতে ক্লাইভ বেরিয়ে এলেন তাঁবু থেকে।
কাজিয়ার আওয়াজ আসছে ছাউনির শেষ প্রান্তে আস্তাবলের দিক থেকে। শব্দ অনুসরণ করে এগিয়ে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন কর্নেল। একটি দিশি রঙ্গিনীর দখল নিয়ে দুদল সৈন্যের মধ্যে গোলাগুলি চলার উপক্রম।
উন্মত্ত দুই দল বন্দুক উঁচিয়ে একে অপরের দিকে তেড়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে মেয়েটি। মাঝে মাঝে খিলখিল করে হেসে উঠছে। স্তনযুগল অনাবৃত। বুকের আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছে। সে নিয়ে হুঁশ নেই।
চেঁচিয়ে উঠলেন ক্লাইভ, ‘হোয়াটস গোয়িং অন ইন মাই ক্যাম্প?’
কর্নেল ক্লাইভকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে কয়েকজন দ্রুত সরে পড়ল।
বেহেড এক গোরা পল্টন টলতে টলতে ক্লাইভের সামনে এগিয়ে এসে হাত পা নেড়ে জড়ানো গলায় বলল, ‘ইউ কর্নেল ক্লাইভ অ্যা ব্রেভ ওয়ারিওরআই ডিম্যান্ড জাস্টিস দে আর স্ন্যাচিং মাই গার্ল আই পেইড দো আনা ফর হারশি ইজ চিপ বাট বিউটিফুল।’
এই বেলেল্লাপনা আর সহ্য হল না ক্লাইভের। ঠাস করে এক থাপ্পড় কষিয়ে বসলেন মাতাল সৈনিকটিকে। সে ছিটকে পড়ল পাশে। মেয়েটিকে আর দেখতে পেলেন না ক্লাইভ। বিপদ আঁচ করে নির্ঘাত পালিয়েছে।
নিজের তাঁবুতে ফিরেই চারজনকে সাসপেন্ড করার আদেশ জারি করলেন ক্লাইভ। মেজর কিলপ্যাট্রিককে দায়িত্ব দিলেন, কাল ভোরেই নৌকোয় তুলে এদের যেন পাঠিয়ে দেওয়া হয় কলকাতায়। কিছুদিন কয়েদ হয়ে থাকুক। বিচার পরে হবে।
এই সব ঝামেলা মেটাতে মেটাতে ভোর হয়ে গেল। স্নান সেরে সবে নিজের কাজের ঘরে এসে বসেছেন ক্লাইভ, এমন সময় এসে হাজির হলেন ওয়ালস ও নবকৃষ্ণ। ওয়ালসের হাতে একটা কাগজ।
ওয়ালস বললেন, ‘স্ক্র্যাফটন চিঠি পাঠিয়েছে।’
বিরক্তির সঙ্গে ক্লাইভ বললেন, ‘রিড ইট।’
ওয়ালস পড়তে শুরু করলেন, ‘…নানা চিন্তা ও পরিকল্পনা আমার মাথায় ঘুরছে। ওয়াটস সাহেব চিন্তাভাবনা ছেড়ে বেশ নিশ্চিন্তে আছেন। তিনি কাওয়ার্ড। আমি কিন্তু ওরকম নই।’
‘রাবিশ। নেক্সট?’
‘আমি তাঁকে সঙ্গে নিয়েই পরিকল্পনার কাজে এগোচ্ছি। উলটে তিনি আমার উপর দোষারোপ করছেন যে, আই অ্যাম এমব্রয়লিং হোল অ্যাফেয়ারস। জগৎশেঠের সাহায্য নিয়ে ইয়ার লতিফ খানকে নবাব করা যেতে পারে। এটা আমার আর উমিচাঁদের পরিকল্পনা। ওয়াটস সাহেবও জানেন। তিনি যে কেন ভয় পাচ্ছেন বুঝতে পারছি না। তবে উমিচাঁদ আমার মতো একজন সাহসী লোককে পেয়ে খুশি।’
ক্লাইভ বলে উঠলেন, ‘স্টপ।’
থেমে গেলেন ওয়ালস।
নবকৃষ্ণর দিকে চেয়ে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘হু ইজ ইয়ার লতিফ খান?’
‘এ নাম তো বড় একটা শুনিনি হুজুর।’ বললেন নবকৃষ্ণ।
‘তুমি যখন জানো না মতলব ইয়ার লতিফ তেমন পাওয়ারফুল আদমি নয়। তাই তো?’
হাত কচলে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘তা কী করে বলি হুজুর? দরবারের সব ওমরাহের ঠিকুজি-কুলজি কি আমার পক্ষে জানা সম্ভব?’
ক্লাইভ বললেন, ‘স্ক্র্যাফটন লিখেছে জগৎশেঠ এনডোরসড দিস প্রোপোসাল। দেন আই মে এগ্রি।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘হড়বড় করে কোনও কিছু মুস্তাকিল না করাই উচিত হবে হুজুর। ইয়ার লতিফের ব্যাপারে আর একটু পুছতাছ করে নিলে ভালো হয়।’
‘আমার হাতে ওয়াক্ত বড় কম মুনশি। আই হ্যাভ টু টেক অ্যা কুইক ডিসিশন। সিরাজদ্দৌলার জায়গায় নবাব কে হবে ফাইনাল করতে না পারলে কনসপিরেসিটা ম্যচিওর করানো যাবে না। বেশি দেরি হলে টের পেয়ে যাবেন নবাব। অল এফরটস উইল বি স্পয়েলড।’
‘এ হক কথা হুজুর। কিন্তু হিসেব কষে না এগোলে আসল কাজ যদি ভন্ডুল হয়ে যায়?’
চিন্তিত মুখে ক্লাইভ বললেন, ‘দ্যাটস অলসো ট্রু। তাহলে কী করা যায়?’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আরাটুনকে ডেকে পাঠান সাহেব। সে হুঁশিয়ার আদমি। তার মুখ থেকেই মুর্শিদাবাদের হালহকিকত বুঝে নিন। তারপরে না হয় এগোবেন।’
ক্লাইভ প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে নবকৃষ্ণের দিকে চেয়ে বললেন, ‘গুড আইডিয়া। আরাটুন ক্যান হেল্প মি। জলদি একবার এখানে আসার জন্য তাকে চিঠি লিখে দাও তো।’
আলিনগরের সন্ধির শর্ত অনুযায়ী ওয়াটস যখন নবাবের ইচ্ছায় ইংরেজদের প্রতিনিধি হয়ে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে যান, তখন তাকে সাহায্য করার জন্য তার সঙ্গে পেত্রস আরাটুনকে পাঠিয়ে ছিলেন ক্লাইভ। সেই থেকে মুর্শিদাবাদেই রয়েছেন আরাটুন।
ক্লাইভের তলব পেয়েই চন্দননগরে ছুটে এলেন পেত্রস আরাটুন।
ক্লাইভ শুধোলেন, ‘মুর্শিদাবাদের হালচাল কেমন বুঝছেন?’
‘অনেকেই ইনকিলাবের ইন্তেজার করছে।’
ক্লাইভ শুধোলেন, ‘স্ক্র্যাফটন লিখেছে—ইয়ার লতিফ খানকে মসনদে বসানো যায়। তিনি কে?’
‘দোহাজারি মনসবদার।’
‘তাঁকে মসনদে বসালে আমাদের ফায়দা হবে?’
ক্লাইভের মুখের দিকে একবার তাকালেন আরাটুন। তারপর চোখ নামিয়ে বললেন, ‘আপনাকে ঝুট বলব না হুজুর। ইয়ার লতিফ খান মসনদের জন্য জবরদস্ত বাজি নন। তাঁর খানদান মামুলি। সুবে বাংলার মসনদ তাঁর পক্ষে ভারী হয়ে পড়বে।’
চকমকি ঠুকে পাইপ ধরালেন ক্লাইভ। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে বললেন, ‘লেকিন জগৎশেঠ ও উমিচাঁদ তো ওনাকে মসনদে বসাতে রাজি আছেন।’
মৃদু হেসে আরাটুন বললেন, ‘জগৎশেঠের কুঠি পাহারা দেয় ইয়ারলতিফের দুহাজার ঘোড়সওয়ার। এর তনখা মেটান শেঠজি। ইয়ার লতিফ তাঁর তাঁবের লোক। শেঠজি তো রাজি হবেনই।’
‘আর উমিচাঁদের কী ফায়দা হবে?’
‘উমিচাঁদ ইয়ার লতিফের নামটা ভাসিয়েছেন। এটা তাঁর আমানত। পরে নবাবকে হাতে রেখে নিজের কারবারে মুনাফা লুটবেন। এসব না হয় হল, কিন্তু অনেকেই যে ইয়ারলতিফকে মেনে নেবে না। ইনকিলাবের পর ফের একটা না কাজিয়া বাধে? এতে আপনাদের কারবার চালাতে মুশকিল হবে।’
ক্লাইভ বললেন, ‘এখন কী করা উচিত? শ্যাল আই রিজেক্ট দিস প্রোপোসাল?’
‘সেটা আপনি ভেবে দেখুন হুজুর।’
পাইপের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আকাশের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন ক্লাইভ। তারপর শুধোলেন, ‘মসনদে বসার জন্য সবচেয়ে জবরদস্ত আদমি কে হতে পারেন বলে মনে হয় আপনার?’
‘যিনি হতে পারেন তিনি ইনকিলাবে অবশ্যই মদত দেবেন। কিন্তু মসনদে বসতে রাজি নন বলে শুনেছি।’
‘হু ইজ হি?’ প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।
আরাটুন বললেন, ‘মিরজাফর খাঁ সাহেব। উনি আলিবর্দির রিশতাদার। তিনি মসনদে বসলে সবাই মেনে নেবে।’
‘ভেরি গুড। আপনি মুর্শিদাবাদে ফিরে গিয়ে আমার হয়ে মিরজাফর খাঁর সঙ্গে বাত করুন। বলবেন আমি তাঁকে নবাব হিসেবে চাই। আপনার উপর আমার ভরসা আছে মিঃ আরাটুন। আপনি মিরজাফরকে রাজি করান।’
‘কোশিস জরুর করব হুজুর।’
‘আমার উমিদ, আপনি পারবেন।’ এই বলে উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করার জন্য আরাটুনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন ক্লাইভ।
সেদিন দরবার থেকে ফেরার পর থেকে ঘুম উড়ে গিয়েছে মিরজাফরের। নবাব প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেছেন, সাজিশের কারবারিদের কোতল করে ছাড়বেন। কথাটা যে জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ ও তাঁর উদ্দেশে বলা, তা বুঝতে কোনও অসুবিধা হয়নি মিরজাফরের। সিরাজের হিংস্র চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে সেদিন ভয়ে তাঁর বুক শুকিয়ে গিয়েছিল।
নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রটা পাকিয়ে তোলার জন্য তলায় তলায় ওয়াটস ও স্ক্র্যাফটন সাহেবের সঙ্গে জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ ও তিনি যে শলাপরামর্শ চালাচ্ছেন সেটা কি জেনে ফেলেছেন নবাব?
ক্ষিপ্ত হলে সিরাজদ্দৌলা যে কতটা নৃশংস হতে পারেন তা তামাম মুর্শিদাবাদের লোক জানে। প্রকাশ্য দিবালোকে শাহি সড়কের উপর কী ভাবে হোসেন কুলি খাঁকে কোতল করা হয়েছিল তা আরও অনেকের মতো মিরজাফরও নিজের চোখে দেখেছেন। বীভৎস সে দৃশ্য। শাহি সড়ক ভেসে যাচ্ছে রক্তে, পথের উপরে পড়ে রয়েছে হোসেন কুলির খণ্ডিত দেহ, মাথা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন। চোখ দুটো খোলা। সে চোখ থেকে তখনও যেন ঝরে পড়ছে আতঙ্ক। এই তসবির চোখের সামনে ভেসে উঠতেই দরবারে বসে সেদিন শিউরে উঠেছিলেন মিরজাফর।
গুপ্তঘাতককে কাজে লাগিয়ে তাঁকে খুন করাতে পারেন নবাব—এই ভয়ে মিরজাফর বেশ কিছুদিন ধরেই জনা কুড়ি দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে চলেন। দরবারে গেলে রিসালার দায়িত্বে পুত্র মিরনকে রেখে নির্দেশ দিয়ে যান, তাঁর কোনও বিপদ ঘটলে রিসালার পনেরো হাজার সেপাই-পেয়াদাকে সঙ্গে নিয়ে মিরন যেন শোর মাচিয়ে তোলে।
সেদিন দরবার থেকে ফেরার পর থেকে খুন হওয়ার ভয়টা বড় বেশি জাঁকিয়ে বসেছে মিরজাফরের মনে। এরই মধ্যে নবাব হুকুম করেছেন ফৌজ নিয়ে তাঁকে পলাশিতে যেতে হবে। যোগ দিতে হবে রায়দুর্লভের সঙ্গে। মুর্শিদাবাদে ধেয়ে আসতে পারেন ক্লাইভ।
ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ইচ্ছে বা সাহস কোনওটাই নেই মিরজাফরের। হালসিবাগানের সেই ভোর তাঁর কাছে এখনও এক দুঃসহ স্মৃতি। গোলার আঘাতে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছিল তাঁবুটা। বাতিদান উলটে আগুন ধরে গিয়েছিল তাঁবুতে। কোনওরকমে ছুটে বাইরে বেরিয়ে আসেন মিরজাফর। সেদিন কর্নেল ক্লাইভের দুঃসাহসিক অভিযান দেখে হাড়ে তাঁর কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল। ফৌজ নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। পাল্টা হামলা করার সাহস হয়নি।
ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসছেন ক্লাইভ। মনে মনে এবারে নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেলেছেন মিরজাফর—রায়দুর্লভকে সঙ্গে নিয়ে ফৌজসহ ভিড়ে যাবেন ইংরেজদের দলে। ক্লাইভের চরণে দাখিল করবেন নিজেকে। তারপর ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে মসনদ থেকে সিরাজকে টেনে নামাবেন। সিরাজের পরিবর্তে মসনদে বসার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন জগৎশেঠ, কিন্তু এই ঝক্কিতে মিরজাফর যেতে চান না। মসনদে ফুলের চেয়ে কাঁটা অনেক বেশি। ইয়ার লতিফই বসুক মসনদে। ইনকিলাব সফল হলে সুরক্ষিত হবে মিরজাফরের জীবন। ইয়ার লতিফকে হাতের পুতুল বানিয়ে দরবারে উঁচু একটা পদ দখল করে ভোগবিলাসে তিনি গা ভাসাবেন।
এসব ভেবে মনের মধ্যে বেশ জোশ অনুভব করলেন মিরজাফর। শিরায় শিরায় খুন ছুটতে শুরু করল। হারেমের বিলাসকক্ষের নরম বিছানায় এক আজনবি খুবসুরতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রতিক্রিয়ায় লিপ্ত হলেন তিনি।
হঠাৎ মিরজাফরের মনে উঁকি দেয় এক ভয়। মোহনলাল, মিরমদন, হাদি আলি খান প্রমুখ যারা নবাবের পক্ষে তাঁদের রিসালা খুব একটা ছোট নয়। ঘামাসান লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যদি এরা যদি জঙ্গ ফতে করে, যদি পিছু হটতে বাধ্য হন কর্নেল ক্লাইভ, তখন? হোসেনকুলির কাটা মুন্ডুটা ভেসে ওঠে মিরজাফরের চোখের সামনে। চোখদুটো খোলা। মাথার ঝাঁকড়া চুল ধুলো আর খুনে মাখামাখি। আসমান জুড়ে ডানা মেলে উড়ছে কয়েকটা শকুন।
মিরজাফরের শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে ওঠে। কেঁপে ওঠে নিবিড় বাহুবন্ধনে আবদ্ধ যুবতীও। রতি সম্ভোগের তাল কেটে যায়। খর্বকায় হয় মিরজাফরের পৌরুষ। সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে যুবতী। হঠাৎ এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলেন কেন সিপাহসলার। কোনও কসুর হল তার?
যুবতী ভয় জড়ানো গলায় বলে, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন জনাব।’
একথা কানে যায় না মিরজাফরের। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসে হারেমের বিলাসকক্ষ। জেনানার সুরতি ও সৌগন্ধ। হোসেনকুলির খণ্ডিত দেহ ছাড়া কিছুই যেন চোখে দেখতে পাচ্ছেন না মিরজাফর। শাহি সড়কের উপর পড়ে আছে মাথাটা। রক্ত, রক্ত, আর রক্ত।
শয্যা থেকে নেমে আসেন মিরজাফর।
হারেম থেকে মিরজাফর বেরিয়ে আসতেই বাইরে অপেক্ষারত দাখিলা জানায়, পেত্রস আরাটুন দেখা করতে এসেছেন।
মিরজাফর জানতেন ক্লাইভের তলব পেয়ে দিনকয়েক আগে আরাটুন গিয়েছিলেন চন্দননগরে। তাহলে কি কর্নেল ক্লাইভের কাছ থেকে জরুরি কোনও চিঠি নিয়ে এল আরাটুন? ব্যস্ত হয়ে জাফরাগঞ্জ প্যালেসের খাসদরবারে প্রবেশ করলেন মিরজাফর।
কুরসিতে বসেছিলেন আরাটুন। মিরজাফরকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে সেলাম জানালেন।
‘আপনি হঠাৎ এই সময়ে?’ প্রশ্ন করলেন মিরজাফর।
‘বাত বহুত জরুরি হুজুর। ইয়ার লতিফকে মসনদে বসাতে রাজি নন কর্নেল। তিনি চান আপনাকে।’
নবাব হওয়া ঝকমারির ব্যাপার। বয়স হয়েছে। এতে আর আগ্রহ নেই মিরজাফরের। শুধু দরবারে উঁচু একটা পদ দখল করে আলস্যে ও বিলাসে ডুবে থেকে বাকি জিন্দেগি গুজরান করতে চান তিনি। আরাটুনের কথার প্রত্যুত্তরে দ্বিধা জড়ানো গলায় বললেন, লেকিন আমি তো…
মিরজাফরকে বাঁধা দিয়ে আরাটুন বললেন, ‘কর্নেলের হাতে ওয়াক্ত বহুত কম। তাঁকে মাদ্রাজে ওয়াপস যেতে হবে। আপনি রাজি হলে ইনকিলাব জলদি হাসিল হতে পারে। না হলে…’
‘না হলে?’
‘এসব ঝুটঝামেলায় নিজেকে আর জড়াবেন না কর্নেল।’
এবারে কেঁপে উঠলেন মিরজাফর। বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন ক্লাইভ ও ওয়াটসন ফিরে গেলে আর মসনদ ছাড়া করা যাবে না নবাবকে। ইংরেজদের ভয় কেটে গেলে হাতে মাথা কাটবেন সিরাজদ্দৌলা। জগৎশেঠ-রায়দুর্লভ-তিনি—কেউই বাঁচবেন না। ইংরেজদের সাহায্য ছাড়া বাগি হওয়ার সাহস করবে না কেউ।
আরাটুন বললেন, ‘আপনি যদি নবাব হতে না চান, তাহলে চন্দননগর থেকে কলকাতায় ফিরে যাবেন কর্নেল। এতকাল ধরে যে ইনকিলাবের খোয়াব আপনারা দেখেছেন, তা আর সফল হবে না। আপনারা শেষ পর্যন্ত কী চান, সেটা জলদি জানাবেন। কর্নেল অধৈর্য হয়ে পড়েছেন।’
এই বলে উঠে দাঁড়িয়ে দরওয়াজার দিকে এগিয়ে গেলেন আরাটুন।
পিছন থেকে মিরজাফর বলে উঠলেন, ‘দাঁড়ান জনাব।’
ঘুরে তাকিয়ে পেত্রস আরাটুন দেখলেন মিরজাফর মিটি মিটি হাসছেন। উৎসাহিত হয়ে আরাটুন ফের ফিরে এলেন মিরজাফরের কাছে।
মিরজাফর বললেন, ‘আমি নবাব হতে রাজি। ক্লাইভ সাহেবকে তুরন্ত জানিয়ে দেবেন।’
খুশিতে আরাটুনের মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। খুশির কারণ ক্লাইভ সাহেবের কাছে মান থাকল তাঁর। তুখোড় কারবারি আরাটুন দিব্যি বুঝতে পারছেন কর্নেল ক্লাইভই সুবে বাংলার ভবিতব্য। ইনকিলাব আসন্ন।
