৫৮
ডান হাতে সাদা কাগজ ও বা হাতে লাল কাগজটা নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ক্লাইভ। মুখে মিটিমিটি হাসি। ভাবভঙ্গি এমন যেন কোনও রোমহর্ষক ম্যাজিক দেখাতে চলেছেন।
ক্লাইভ বললেন, ‘দুটোই ড্রাফট এগ্রিমেন্ট। একটা সাদা কাগজে লেখা হয়েছে। আরেকটা লাল কাগজে লেখা হয়েছে।’
সকলেই অবাক চোখমুখ করে ক্লাইভের দিকে চেয়ে আছেন। এই দুই কাগজের সঙ্গে উমিচাঁদকে জব্দ করার কৌশল যে ঠিক কী, তা কারও বোধগম্য হচ্ছে না।
ক্লাইভ এবারে বললেন, ‘সাদা কাগজটা আসল। এই দলিলে উমিচাঁদের শেয়ারের কোনও উল্লেখ নেই। আর এই লাল কাগজটা হল জাল দলিল। এতে লেখা থাকবে উমিচাঁদ পাবে কুড়ি লাখ টাকা। দুটো কাগজই মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাবে স্ক্র্যাফটন। যাওয়ার পথে আসল দলিলটা নিয়ে আলোচনা সারবে মিরজাফরের সঙ্গে। আর জাল দলিলটা দেখিয়ে পাওনা নিয়ে উমিচাঁদকে গুড হিউমারে রাখবে। আসলে উমিচাঁদ কিছুই পাবে না। লেকিন, এ কথাটা এখন উমিচাঁদ জানতে পারলে, কনসপির্যাসি ফাঁস করে দিয়ে বেঙ্গলে রেভলিউশন ঘটানোর সব প্ল্যান সে ভেস্তে দিতে পারে। তাই উমিচাঁদকে হাতে রাখতে এই স্ট্রাটেজি।’
হলওয়েল বলে উঠলেন, ‘ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া।’ বাকিরাও ক্লাইভের এই পরিকল্পনার সঙ্গে সহমত হল।
‘কিন্তু একটা কথা, দুটো দলিলের নীচেই সই করতে হবে আমাদের। আশা করি উমিচাঁদের মতো একজন ধূর্ত সাপকে শায়েস্তা করার জন্য জাল দলিলে সই করতে আপনারা কেউ আপত্তি করবেন না।’
ড্রেক বললেন, ‘আমার আপত্তি নেই।’
হলওয়েল বললেন, ‘আমারও আপত্তি নেই। উমিচাঁদ একটা আস্ত শয়তান। তাঁকে চিট করাটা কোনও ইমমরাল কাজ বলে আমি মনে করি না।’
ওয়াটসন এবারে বলে উঠলেন, ‘আমার আপত্তি আছে। জেনেশুনে কোনও জাল কাগজে সাইন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
সকলের মুখ গম্ভীর। অদ্ভুত এক নীরবতা ছড়িয়ে পড়ল মিটিং রুম জুড়ে।
ক্লাইভ নরম গলায় বললেন, ‘উমিচাঁদ ইজ অ্যা ভেরি ক্লেভার পারসন। আমার ও আপনার দুজনের সই না থাকলে তাঁকে কনভিনস করানো যাবে না।’
‘আই অ্যাম সরি কর্নেল। বিইং অ্যা রিপ্রেসেন্টেটিভ অফ দ্য কিং এই ইমমরাল কাজে আমি যুক্ত হতে পারি না। তাছাড়া এটা কোম্পানির অ্যাফেয়ার। আমাকে এসবের মধ্যে জড়াবেন না।’
ক্লাইভ কতকটা মরিয়া হয়ে বললেন, ‘উমিচাঁদকে হাতে রাখতে হলে এটাই কিন্তু একমাত্র পথ।’
কোনও জবাব দিলেন না ওয়াটসন। হাতদুটোকে বুকের কাছে ভাঁজ করে গম্ভীর মুখে বসে রইলেন।
ক্লাইভ বললেন, ‘বেশ আপনার কথা না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু অন্য কেউ যদি আপনার সিগনেচার কপি করে, তাতে নিশ্চয়ই আপনি আপত্তি করবেন না।’
সকলের দৃষ্টি ওয়াটসনের উপরে নিবদ্ধ।
খানিকটা ইতস্তত করে ওয়াটসন বললেন, ‘আমার সিগনেচারের কপি তো হতেই পারে। যে কেউ করতে পারে। ধরুন আমি কিছু জানি না। এতে আমার কী দায় আছে?’
ক্লাইভ বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ কর্নেল। কাজটা অনৈতিক সন্দেহ নেই। তবে আমি মনে করি, ডিপ্লোম্যাসিতে ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু হয় না। তবে আপনাকে না জানিয়ে কাজটা করলে পরে আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই কথাটা জানিয়ে রাখলাম আপনাকে। আর একটা কথা—বেঙ্গলে রেভলিউশন ঘটানোর পর আমাদের সবাইকে তোফা দিতে চান। আজই আলোচনায় ঠিক হয়েছে এ নিয়ে আমরা মোট বাহান্ন লাখ টাকার ডিম্যান্ড আনঅফিসিয়ালি নতুন নবাবের কাছে রাখব। কিন্তু আপনি কিছু নিতে চান না, এটা আমি ঠিক মেনে নিতে পারছি না। বেঙ্গলের অ্যাফেয়ার্সে আপনার কনট্রিবিউশনের কথা আমরা কেউ ভুলতে পারি না। আমার প্রোপোসাল হল, আমরা সবাই যদি আমাদের পারসোনাল শেয়ার থেকে ফাইভ পারসেন্ট স্যাক্রিফাইস করি, তাহলে একটা হ্যান্ডসাম অ্যামাউন্ট আপনার হাতে তুলে দেওয়া যায়।’
ড্রেক বললেন, ‘ভেরি গুড প্রোপোসাল।’
হলওয়েল বললেন, ‘আপনাকে বাদ দিয়ে টাকা নিতে আমাদের খারাপ লাগবে। কর্নেলের এই প্রস্তাবে আপনি না করবেন না।’
মনে মনে বেশ খুশি হলেন ওয়াটসন। প্রথমে টাকা নিতে অস্বীকার করেছিলেন নিজের সততা দেখানোর জন্য। প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি কোম্পানির কর্মচারীদের তুলনায় অনেক মহৎ চরিত্রের লোক। কিন্তু বাকি সকলের পারসোনাল শেয়ারের দাবি শুনে চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল তাঁর। বড্ড আফশোস হচ্ছিল তখন। সকলেই দেদার পকেট ভরিয়ে নেওয়ার মতলব করছে। সততা দেখাতে গিয়ে তিনিই শুধু বাদ পড়ে গেলেন। মনটা খুঁতখুঁত করছিল। কিন্তু একবার যখন না বলেছেন, তখন লজ্জার মাথা খেয়ে নিজের দাবি নতুন করে পেশ করেন কী করে? যাই হোক, কর্নেল ক্লাইভ এগিয়ে এসে সমস্যাটার সহজ সমাধান করে দিলেন। এই জন্য মনে মনে কর্নেলকে অজস্র ধন্যবাদ জানালেন ওয়াটসন। তবে প্রকাশ্যে নিমরাজি হওয়ার ভান করে খানিকটা নিরাশক্ত ভাবে বললেন, ‘বেশ আপনারা সবাই যখন চাইছেন তখন—’
‘হাততালি দিয়ে উঠল সকলে।’
দুপাশে হাত প্রসারিত করে ক্লাইভ বললেন, ‘অল প্রবলেমস আর সলভড।’
এবারে লাল কাগজ ও সাদা কাগজে সই করলেন ক্লাইভ। তাঁর নির্দেশে জাল দলিলে ওয়াটসনের সই নকল করে দিলেন লাশিংটন নামে কোম্পানির নীচুতলার একজন কর্মী।
দুটো কাগজ এবারে স্ক্র্যাফটনের হাতে তুলে দিয়ে কর্নেল বললেন, ‘মনে রেখো লিউক খুব ইমপরট্যান্ট কিছু কাজের জন্য মুর্শিদাবাদে তোমাকে পাঠানো হচ্ছে। জাল দলিলটা দেখিয়ে গুড হিউমারে রাখতে হবে উমিচাঁদকে। তবে এই ধূর্ত লোকটাকে বিশ্বাস নেই। ওকে মুর্শিদাবাদ থেকে সরাতে পারলে কনসপির্যাসি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়টা আর থাকবে না। উমিচাঁদকে বুঝিয়ে, তাঁকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় ফিরতে হবে তোমায়।’
চিন্তায় পড়ে গেলেন স্ক্র্যাফটন। কোনও সন্দেহ নেই, কাজটা বেশ দুরূহ।
সেদিনই রাতে নবাবের উদ্দেশে একটা চিঠি লিখলেন ক্লাইভ।
‘…এই চিঠি আপনার হাতে পৌঁছে দেবেন মিঃ স্ক্র্যাফটন। তার মুখ থেকেই শুনবেন, মারাঠাদের কাছ থেকে কী প্রস্তাব এসেছিল আমার কাছে। পেশোয়া বালাজি বাজি রাওয়ের চিঠিটাও আমি পাঠিয়ে দিলাম আপনাকে। এর পরেও আশাকরি ইংরেজদের আপনি ভুল বুঝবেন না।
‘আমাদের স্বার্থেই আপনাকে আপনার সব দুশমনের হাত থেকে রক্ষা করতে আমরা মজবুর। বাংলা ফের অশান্ত হোক আমরা চাই না। অশান্তি বাধলে আমাদের কারবারের সমূহ ক্ষতি।
‘কাজেই অহেতুক সন্দেহের বসে পলাশিতে আপনার ফৌজকে বসিয়ে রাখবেন না। আপনার সেপাই-লস্করেরা প্রতিটি নৌকোতেই জোরদার খানাতল্লাশি জারি রেখেছে। হয়রানির কথা ভেবে বিভিন্ন আড়তে আমরা মাল পাঠাতে পারছি না। মাঝিমাল্লারা নৌকো নিয়ে যেতে ইনকার করছে।
‘মুর্শিদাবাদের বড় বড় বেনিয়ারাও মুশকিলে পড়েছেন। তারাও জলপথে কলকাতায় মাল পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। আমাদের উপর ভরসা রাখতে পারছেন না। রপ্তানি বাণিজ্যে বিনিয়োগ করা থেকে পিছিয়ে আসছেন। কাজেই পলাশিতে আপনার সেনা মোতায়েনের ফলে দুতরফেরই জবরদস্ত লোকসান হচ্ছে।
গঙ্গায় মালবাহী নৌকো চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই সমস্যা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আপনি পুছতাছ করে দেখবেন আমার ফৌজের বেশিরভাগ সেপাইকে আমি কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছি। কাজেই আপনার সঙ্গে লড়াই বাধানোর কোনও মতলব আমাদের নেই।
আশা করি আপনিও পলাশি থেকে আপনার ফৌজ তুলে নেবেন। আপনার সঙ্গে আমাদের ভুল বোঝাবুঝির অন্ত হোক। আমাদের রিশতা মুবারক হোক।…’
ক্লাইভের বার্তা ও বালাজি বাজি রাওয়ের চিঠি নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে যাত্রা করলেন স্ক্র্যাফটন। বৈশাখের তীব্র গরমে পালকির ভিতরে হাঁসফাঁস অবস্থা। দিনের বেলায় পালকির ভিতরে বসে থাকা দায়। স্ক্র্যাফটন তাই দিনে বিশ্রাম নিয়ে সারা রাত ধরে পথ চলতে লাগলেন।
অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিয়ে স্ক্র্যাফটনকে মুর্শিদাবাদে যেতে হচ্ছে। কী করে কাজগুলো সুচারুভাবে হাসিল করবেন, তা নিয়ে স্ক্র্যাফটনের ভাবনার অন্ত নেই। কাজগুলো ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন করতে পারলে চাকরি ক্ষেত্রে সুনাম বাড়বে।
স্ক্র্যাফটন মনে মনে সাজাতে থাকেন তাঁর কাজগুলো। পলাশিতে গিয়ে ইংরেজদের চার্টার অফ ডিম্যান্ড নিয়ে মিরজাফরের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। মিরজাফরকে দিয়ে দস্তখত করিয়ে চুক্তিপত্র চূড়ান্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। ইংরেজরা যে নবাবের বন্ধু সেকথা প্রমাণ করার জন্য নবাবের হাতে তুলে দিতে হবে কর্নেল ক্লাইভ ও বালাজি বাজি রাওয়ের চিঠি। জাল দলিল দেখিয়ে ধোঁকা দিতে হবে উমিচাঁদকে। তারপর তাঁকে বগলদাবা করে নিয়ে ফিরতে হবে কলকাতায়।
প্রথম কাজেই বাধা পড়ল।
পলাশির কাছাকাছি পৌঁছে স্ক্র্যাফটন দেখলেন, মূল সড়ক থেকে যে পথ পলাশির দিকে চলে গিয়েছে সেপথের মুখে মজুত রয়েছে নবাবের সেপাই-পেয়াদা। এ অবস্থায় পলাশিতে যাওয়ার জন্য বেশি আগ্রহ দেখানো উচিত হবে না। স্ক্র্যাফটন কোম্পানির কুঠিয়াল। অনেকেই চেনে তাঁকে। নবাবের দরবারে কাজের জন্য তিনি যেতেই পারেন। কিন্তু পলাশিতে তাঁর কী প্রয়োজন—এটা এই সেপাই-পেয়াদাদের বোঝানো মুশকিল। কাজেই মিরজাফরের সঙ্গে দেখা করা এখনই সম্ভব হচ্ছে না।
যাচ্ছিলেন মুর্শিদাবাদে, পথে হঠাৎ সেপাই লস্করের জমায়েত দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছেন—এমন একটা ভাব করে স্ক্র্যাফটন শুধোলেন, ‘ব্যাপার কী?’
রাস্তার পাহারায় মজুত এক জমাদার বলল, ‘নিজামতের পরোয়ানা ছাড়া কারও পলাশিতে যাওয়ার হুকুম নেই।’
‘ও মাই গড! পলাশিতে কী হয়েছে?’
‘ফৌজ মজুত হয়েছে। লড়াই বাধতে পারে।’
আর কথা বাড়ালেন না স্ক্র্যাফটন। পালকিবাহকেরা এগোতে লাগল।
মুর্শিদাবাদে পৌঁছে নবাবের মবারকে নিজেকে দাখিল করলেন স্ক্র্যাফটন। তসলিম জানিয়ে বললেন, ‘হজুর সহি সলামত।’
স্ক্র্যাফটনকে দেখেই ভুরু কুঁচকে সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘ফের আপনি মুর্শিদাবাদে এসেছেন?’
‘মাফ করবেন হুজুর। আসতে হল ক্লাইভ সাহেবের হুকুমে।’ এই বলে স্ক্র্যাফটন চিঠি দুটো সিরাজদ্দৌলার হাতে তুলে দিলেন।
বালাজি বাজি রাওয়ের চিঠি পড়ে নবাবের বিরক্তি উড়ে গেল। উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ‘ইয়ে তো সাচ্ছা দোস্ত কা মাফিক কাম। বর্গিদের চাল ভেস্তে দিলেন কর্নেল। ওকে আমার তরফ থেকে বহুত সুক্রিয়া জানাবেন।’
নবাবের মেজাজ খুশ দেখে সাহস পেয়ে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘কাজেই বুঝতে পারছেন হুজুর, আর যাই হোক আমরা বেইমান নই। বেতমিজও নই। বর্গিরা যদি বাংলায় হানা দেয় তবে আমরা আপনার হয়ে ওদের বিরুদ্ধে লড়ব।’
‘বহুত আচ্ছা।’
ক্লাইভের চিঠিতে চোখ বুলিয়ে বেশ তৃপ্তি পেলেন নবাব। তাঁর মনে হল, পলাশিতে সেনা মোতায়েনের চালে ঘায়েল হয়েছে ইংরেজরা। কর্নেল ক্লাইভ তাই মোলায়েম ভাষায় চিঠি লিখতে বাধ্য হচ্ছেন। চন্দননগর থেকে বেশিরভাগ পল্টনকে পাঠিয়ে দিয়েছেন কলকাতায়। নন্দকুমারও চিঠি লিখে এই একই কথা জানিয়েছেন। কাজেই, এই মুহূর্তে গোরা পল্টনদের মুর্শিদাবাদে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই। নবাবের কাছে আরও একটা খুশির বিষয় হল, এই চিঠিতে পাটনায় চলে যাওয়া ফরাসিদের গ্রেপ্তারের দাবি নিয়ে একটা শব্দও খরচ করেননি কর্নেল ক্লাইভ।
চিঠিটা পড়া শেষ করে স্ক্র্যাফটনের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, ‘নিজামতের সঙ্গে আপনাদের রিশতা মুবারক হোক। কর্নেল সহি বাত বলেছেন, পলাশিতে সেনা মোতায়েনের ফলে দিশি সওদাগরদেরও বহুত তকলিফ হচ্ছে। আমি পলাশি থেকে সেনা সরিয়ে নিচ্ছি।’
মাথা ঝুকিয়ে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘হুজুর বহুত মেহেরবান।’
সেদিনই ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসার হুকুম হল মিরজাফরের উপর। রায়দুর্লভ আপাতত পলাশিতে থাকবেন। তবে নৌকোয় নৌকোয় আর খানাতল্লাশি নয়— এই হুকুম জারি করে দিলেন নবাব।
মিরজাফর আর দিন কয়েকের মধ্যে ফিরছেন মুর্শিদাবাদে—মুর্শিদাবাদ দরবার থেকে কাশিমবাজারে ফিরে এই খুশির খবরটা পেলেন স্ক্র্যাফটন। নিশ্চিন্ত হলেন তিনি। মিরজাফরের সঙ্গে গোপনে আলোচনা সেরে নিতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না। এবারে উমিচাঁদকে নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
নিজের পাঁচ শতাংশ দাবি নিয়ে বেশ উৎকণ্ঠায় ছিলেন উমিচাঁদ। ওয়াটস যে তাঁর দাবির বিষয়ে ক্লাইভকে লিখে পাঠিয়েছেন, তিনি একথা জানতেন। শেষ পর্যন্ত ক্লাইভ এই দাবি মানবেন তো? তাঁর বিষয়ে ক্লাইভ কী ভাবছেন, তা জানার জন্য ছটফট করছিলেন উমিচাঁদ।
স্ক্র্যাফটনের সঙ্গে এখনও তাঁর মোলাকাত হয়নি। শুনেছেন, ক্লাইভের জরুরি বার্তা নিয়ে মুর্শিদাবাদে এসেছেন স্ক্র্যাফটন। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই পলাশি থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিলেন নবাব। ওদিকে চন্দননগর থেকেও গোরা পল্টনদের একটা বড় অংশকে ক্লাইভ পাঠিয়ে দিয়েছেন কলকাতায়। তাহলে কি নবাবের সঙ্গে মিটমাট হয়ে গেল ইংরেজদের?
রাজনীতির চাকা কোনদিকে ঘুরছে তার সঠিক আঁচ পাওয়ার জন্য পালকি হাঁকিয়ে হঠাৎই কাশিমবাজারে এসে হাজির হলেন উমিচাঁদ।
ওয়াটস ও স্ক্র্যাফটন দুজনেই সাদর অভ্যর্থনা জানালেন তাঁকে।
উমিচাঁদ শুধোলেন, ‘কী ব্যাপার বলুন তো? আপনারা কি ইনকিলাবের পথ থেকে সরে এলেন?’
ওয়াটস বললেন, ‘ইনকিলাব হবে। জরুর হবে।’
‘তাহলে যে কর্নেল পল্টন পাঠিয়ে দিলেন কলকাতায়?’
‘ওসব কর্নেলের কৌশল।’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘কর্নেল আপনাকে সেলাম জানাতে বলেছেন।’
‘ওনাকেও আমার সেলাম জানাবেন।’ ভিতরে ভিতরে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন উমিচাঁদ। তাঁর মনের মধ্যে লাট্টুর মতো পাক খাচ্ছে পাঁচ পারসেন্টের ভাবনা।
মুচকি হেসে ওয়াটস বললেন, ‘উমিচাঁদজি আপনি আমাদের অনেকদিনের দোস্ত। অ্যা গুড ফ্রেন্ড। বিপদের দিনে আপনি আমাদের অনেক মদত দিয়েছেন। ইংরেজরা দোস্তকে কখনও ভোলে না। আপনার ফাইভ পারসেন্ট মঞ্জুর করেছেন কর্নেল ক্লাইভ।’
স্বস্তির নিঃশবাস ফেললেন উমিচাঁদ। খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর মুখটা।
ওয়াটস মজা করে বললেন, ‘কম নয় উমিচাঁদজি, বিশ লাখ!’
খুশিতে প্রায় উড়ছেন উমিচাঁদ। তবুও মুখটাকে বিরস করে বললেন, ‘ফাইভ পারসেন্ট তো বিশ লাখের চেয়ে জেয়াদা হওয়ার কথা।’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘নবাবের দৌলত সম্বন্ধে আপনি যা ভাবছেন তা সত্যি নয়। আমরা অনেক পুছতাছ করে দেখেছি। নবাবের দৌলত চল্লিশ কোটি টাকার অনেক কম। যা আছে তার ফাইভ পারসেন্ট ধরলে করিব বিশ লাখের আশপাশই হবে।’
উমিচাঁদ ভালো করেই জানেন, স্ক্র্যাফটন যা বলছেন তা মিথ্যে নয়। নিজের দাবিটা অনেক বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যেই নবাবের দৌলত সম্বন্ধে বাজার প্রচলিত গুজবের উপর পাঁচ শতাংশ দাবি করেছিলেন উমিচাঁদ। এই ঘোড়েল কারবারি ভালো করেই জানতেন এসব ক্ষেত্রে দরাদরির পর দাবি থেকে অনেক কম টাকাই পাওয়া যায়। তবে ইংরেজরা যে তাকে বিশ লাখ টাকা দিতে রাজি হবে, একথা উমিচাঁদ কল্পনাও করতে পারেননি।
উমিচাঁদ মুখে বললেন, ‘হে-হে আমি জানি আপনারা ইমানদার আদমি। দোস্তকে কখনও ফাঁকি দেন না। আমি এও ভি জানি যে নবাবের দৌলতের অনেক উমেদার আছেন। তাই আমার ভাগ কুছ কম হলেও চলবে। হে হে বড়া কাম করতে নেমে শুধু নিজের কথা ভাবলে কি চলে? কর্নেলকে জানাবেন আমার জন্য বিশ লাখই কাফি। আমি এতে নারাজ নই।’
স্ক্র্যাফটন মনে খুশির ভাব এনে বললেন, ‘আমরা জানি আপনি হলেন আমাদের রিয়েল ফ্রেন্ড। আপনার পাওনার বিষয়ে এগ্রিমেন্টে কী লেখা রয়েছে সেটা একবার নিজের চোখে দেখে নিন।’
এই বলে লাল কাগজে লেখা জাল দলিলটা বের করলেন স্ক্র্যাফটন।
উমিচাঁদ পড়ে দেখলেন। তাঁর পাওনা বাবদ বিশ লাখ টাকার কথা লেখা রয়েছে। নীচে ক্লাইভ, ওয়াটসন, ড্রেক, হলওয়েল, বিচার, কিলপ্যাট্রিক সকলেরই দস্তখত রয়েছে। এখন মিরজাফর সই করে দিলেই চুক্তি চূড়ান্ত। তারপরে ইনকিলাব। আর তারপর বিশ লাখ টাকা। খুশি উপচে পরছে উমিচাঁদের মনে। সামান্য একটা খটকাও অবশ্য আছে। কাগজের রং লাল কেন?
উমিচাঁদ করেই ফেললেন প্রশ্নটা, ‘লেকিন সাহেব কাগজের রং লাল কেন?’
হেসে উঠলেন ওয়াটস ও স্ক্র্যাফটন দুজনেই। ওয়াটস বললেন, ‘বুঝলেন না? রেড মিনস রেভলিউশন। ইনকিলাব।’
‘জরুর। জরুর।’ এই বলে হো হো করে বেওকুফের মতো হেসে উঠলেন উমিচাঁদ।
চকিতে দৃষ্টি বিনিময় হল ওয়াটস ও স্ক্র্যাফটনের মধ্যে।
স্ক্র্যাফটন মনে মনে বললেন, ‘অপারেশন উমিচাঁদ ইজ ওভার।’
