ফলতা থেকে পলাশি – ৫৭

৫৭

ঝকঝকে সকাল। সূর্য সবে উঠেছে। চন্দননগরের মাঠে নিত্যদিনের রুটিন মহড়া দিচ্ছিল ক্লাইভের ফৌজের দিশি সেপাই ও গোরা পল্টনের দল। হঠাৎ কোথা থেকে এক সাধুবাবা এসে হাজির। মাথায় জটা। কপালে রক্ত রঙের ত্রিপুণ্ড্রক। গলায় ও বাজুতে রুদ্রাক্ষের মালা, পরনে গেরুয়া আলখাল্লা। হাতে মস্ত এক ত্রিশূল। মুখে গোঁফদাড়ির জঙ্গল। কাঁধে মস্ত একটা ঝোলা।

‘জয় শিবোশম্ভু! হরহর মহাদেব! হরহর মহাদেব!’

সাতসকালে রীতিমতো এক নাটক। দিশি সেপাইরা মহড়া ছেড়ে সাধুবাবার পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ঢিবঢিব করে প্রণাম করছে। হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে তাদের মধ্যে।

গোরা পল্টনরা থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছে, ‘হোলি ম্যান! হোলি ম্যান! হি ইজ অ্যা হোলি ম্যান!’

আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুলে সাধুবাবা প্রণামরত সেপাইদের উদ্দেশে সমানে বলে যাচ্ছেন, ‘জিতে রহো বেটা! জিতে রহো! জয় শিবোশম্ভু! হরহর মহাদেব!’

গঙ্গা স্নান সেরে ফিরছিলেন নবকৃষ্ণ। নাটকীয় দৃশ্যটা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মনে কেমন যেন একটা খটকা লাগল। ইংরেজদের সেনাছাউনিতে হঠাৎ কোত্থেকে এসে হাজির হলেন এই সাধুবাবা? ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে।

ক্লাইভ সাহেবের খাস লোক নবকৃষ্ণকে দেখে ফের মহড়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সেপাই-পল্টনের দল। কর্নেল ক্লাইভ মহড়ায় ফাঁকি দেওয়া একদম পছন্দ করেন না। নবমুনশি এই কথা কর্নেলের কানে তুললে আর রক্ষা নেই।

নবকৃষ্ণ এসে সাধুবাবার মুখোমুখি দাঁড়ালেন।

সাধুবাবা বলে উঠলেন, ‘জয় শিবোশম্ভু!’

‘জয় গোবিন্দ।’

সাধুবাবাকে ভালো করে জরিপ করতে গিয়ে ত্রিশূলের গায়ে খোদাই করা বিশেষ একটা চিহ্নের উপর নবকৃষ্ণর চোখ আটকে গেল। জোরদার একটা সন্দেহ উঁকি দিল তাঁর মনে। যা ভাবছেন, তা যদি সত্যি হয়, তবে বিষয়টা ভাবনার বটে। মনের ভাব গোপন করে সহজ গলায় নবকৃষ্ণ প্রশ্ন করলেন, ‘কোত্থেকে আসছেন আপনি?’

‘তীর্থভ্রমণে গিয়েছিলাম। গঙ্গাসাগর থেকে ফিরছি। আখড়া কাশীতে।’

‘এখন যাবেন কোথায়?’

‘ত্রিবেণী।’

‘সে তো নিকটেই।’

‘যাওয়ার পথে তো সেনাছাউনি দেখিনি এখানে।’

‘কোম্পানির ফৌজ থানা গেড়েছে। মাসখানেক হল।’

‘তুমি কে?’ শুধোলেন সাধুবাবা।

‘আমি নবকৃষ্ণ। কর্নেল ক্লাইভের মুনশি।’

‘কর্নেল ক্লাইভ? সাবিৎ জঙ্গ?’

বিস্মিত হলেন নবকৃষ্ণ। ‘আপনি কর্নেলের কথা জানেন?’

‘সাগর থেকে ফেরার পথে মাঝিমাল্লাদের মুখে শুনেছি। নদীর ঘাটে নেমে সাধারণ মানুষের মুখেও শুনেছি। কর্নেল ক্লাইভ ফের কলকাতায় ফিরিয়ে এনেছেন ইংরেজ কোম্পানিকে। ফরাসডাঙা থেকে ফরাসিদের হটিয়ে দিয়েছেন। সত্যিই বাহাদুর আদমি। এও শুনেছি নবাবের সঙ্গে তাঁর নাকি ফের লড়াই বাধতে চলেছে। তবে মহাদেবের ইচ্ছায় ক্লাইভ সাহেবই জিৎ হাসিল করবেন। ব্যোম শঙ্কর।’

বিনীত হয়ে করজোড়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনি ত্রিকালদর্শী পুরুষ। ভাবীকাল দেখতে পান। সেনাছাউনিতে এসেই যখন পড়েছেন, তখন কর্নেলকে একবার আশীর্বাদ করে যান।’

‘চলো।’

সাধুবাবাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের তাঁবুতে ঢুকলেন নবকৃষ্ণ।

সাধুবাবা শুধোলেন, ‘কোথায় আছেন কর্নেল ক্লাইভ?’

‘একটু অপেক্ষা করতে হবে। উনি নাস্তা সারছেন।’

‘একটু জল দিতে পারো? বড় তেষ্টা পেয়েছে।’

‘জরুর।’ এই বলে তাঁবুর বাইরে বেরোলেন নবকৃষ্ণ।

খানিকবাদে চকচকে একটা পিতলের ঘটি হাতে ফিরে এলেন।

ঢকঢক করে জল খেয়ে ঘটিটা মাটিতে নামিয়ে রাখলেন সাধুবাবা।

সহসা তাবুর পর্দা সরিয়ে চুপিসারে ঘরে ঢুকল স্ট্রন। উলটো দিকে মুখ করে বসে থাকায় টের পেলেন না সাধুবাবা। চকিতে নবকৃষ্ণর সঙ্গে স্ট্রনের ইশারা বিনিময় হল। স্ট্রন আচমকা পিছন থেকে সাধুবাবার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎ করে তাঁকে মাটিতে ফেলে লোহার সাড়াশির মতো শক্ত দুই হাত দিয়ে তাঁর গলা টিপে ধরল। ভীষণ ঘাবড়ে গেছেন সাধুবাবা। হতচকিত চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আচমকা এই আক্রমণ মোটেই প্রত্যাশা করেননি।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এবারে ছেড়ে দিন সাহেব। এই হামলার ধকল সাধুবাবা আর বেশিক্ষণ নিতে পারবেন না।’

হাতদুটোকে শিথিল করল স্ট্রন। সাধুবাবার চোখমুখে এখনও আতঙ্ক। উঠে বসে হাঁপাতে লাগলেন।

কড়া গলায় নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘এবারে সত্যি করে বলুন তো, কে আপনি?’

সাধুবাবা অবাক বিস্ময়ে নবকৃষ্ণর মুখপানে চেয়ে রইলেন।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনার হাতে ত্রিশূলের ফলায় খোদাই করা আছে বৈরাগী চিহ্ন। এ চিহ্ন ব্যবহার করে মারাঠারা। আপনি কি বাজি রাওয়ের গুপ্তচর?’

স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সাধুবাবা। হাঁ হয়ে নবকৃষ্ণর দিকে চেয়ে রইলেন।

মুচকি হেসে নবকৃষ্ণ বললেন, মনে হচ্ছে আমার অনুমান সঠিক।

সাধুবাবা বিস্মিত গলায় বললেন, ‘আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। আমি পেশোয়া বালাজি বাজি রাওয়ের দূত। আমার নাম নিমচাঁদ গোস্বামী।’

চমকে উঠলেন নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এখানে কী মতলবে এসেছেন?’

‘সে কথা কর্নেল ক্লাইভ ছাড়া আর কাউকে বলার হুকুম নেই।’

‘বেশ। আসুন আমার সঙ্গে।’

কর্নেল ক্লাইভের কাছে নিমচাঁদকে নিয়ে গেলেন নবকৃষ্ণ।

চোখ গোল্লা করে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘হু ইজ হি?’

‘পেশোয়া বালাজি বাজি রাওয়ের গুপ্তচর। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’

‘সেলাম হুজুর।’ এই বলে নিমচাঁদ একটা চিঠি তুলে দিল কর্নেল ক্লাইভে হাতে।

চিঠিটা পড়ে চমকে উঠলেন ক্লাইভ। পেশোয়া বালাজি বাজিরাও লিখেছেন, ‘… আপনি নবাবের বিরুদ্ধে লড়াই বাধানোর মতলব করছেন জানি। আপনি সহমত হলে নবাবকে মসনদচ্যুত করার জন্য আমরা সত্তর হাজার সৈন্য নিয়ে আপনার সঙ্গে যোগ দিতে রাজি আছি।…’

চিঠিটা ভাঁজ করে আচকানের পকেটে রাখলেন ক্লাইভ। মুখ গম্ভীর।

নিমচাঁদ বলল, ‘বাজিরাওজি বহুত জলদি আপনার মতামত জানতে চান।’

‘এখনই কোনও মতামত দেওয়া সম্ভব নয়। সকলের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে আমাকে। এখানে আপনার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। বাজিরাও সাহেবকে আমার সেলাম জানিয়ে বলবেন, কয়েকদিনের মধ্যে আমার মতামত জানিয়ে কাসিদের হাত দিয়ে আমি চিঠি পাঠিয়ে দেব।’

‘জি হুজুর।’

নিমচাঁদ বিদায় নেওয়ার পর চিঠিখানা হাতে নিয়ে চিন্তিত মুখে পায়চারি করতে লাগলেন ক্লাইভ। হাঁটছেন আর থেকে থেকে চোখ বোলাচ্ছেন চিঠিতে।

নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘বর্গিদের ফের বাংলায় টেনে আনা কি ঠিক হবে হুজুর?’

‘আমি অন্য কথা ভাবছি মুনশি। চিঠিটা যদি পেশোয়া বালাজি বাজি রাওয়ের না হয়?’

চমকে উঠলেন নবকৃষ্ণ। এদিকটা তিনি তলিয়ে ভাবেননি। বালাজি বাজি রাওয়ের গুপ্তচর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য ত্রিশূলের গায়ে বৈরাগী চিহ্ন খোদাই করা খুব একটা শক্ত কাজ নয়। কর্নেলের সন্দেহ যদি সত্যি হয় তাহলে নিমচাঁদের আসল পরিচয় কী? কে পাঠিয়েছিল তাকে ইংরেজদের সেনাছাউনিতে?

নবকৃষ্ণ চোখ বিস্ফারিত করে বললেন, ‘বলছেন কী সাহেব?’

‘বালাজি বাজি রাওয়ের সিলমোহর আমি চিনি না। তুমি চেন কি?’

‘আজ্ঞে না হুজুর। কিন্তু চিঠিটা কার? কী মনে হয় আপনার?’

‘এই নিমচাঁদ লোকটা নবাবের কাসিদ নয় তো?

‘নবাবের কাসিদ?’ স্বগতোক্তির মতো কথাটা ছিটকে বেরোয় নবকৃষ্ণর গলা থেকে।

‘হুঁ। হয়তো আমার মনের ইরাদা কী তার ইয়াদদস্ত করতে এসেছিল।’

নবকৃষ্ণ ক্ষণেক চিন্তা করে বললেন, ‘এ সম্ভাবনা অবশ্য একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

ক্লাইভ বললেন, ‘মুর্শিদাবাদে ইনকিলাবের জমিন প্রস্তুত থাকলেও নবাবের বিরুদ্ধে সাজিশি এখনও পাকা হয়নি। নবাব হয়তো এর আন্দাজ পেয়েছেন, তাই হি ইজ ভেরি অ্যাংরি উইথ আস। আমাদের উকিলকে দরবার থেকে বের করে দিয়েছেন। পলাশিতে ফৌজ মজুত রেখেছেন। কাশিমবাজার কুঠিতে খানাতল্লাসি করিয়েছেন। নবাবের মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না। যদি হঠাৎ কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেন, তাহলে খুব মুশকিলে পড়ে যাব আমরা। বরবাদ হয়ে যাবে আমাদের এতদিনের মেহনত।’

অস্থির ভাবে পায়চারি করতে থাকেন ক্লাইভ। নবাবের গরম মেজাজ সত্যিই তাঁকে বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। কেবলই তাঁর মনে হচ্ছে, চালে ভুল করে ফেলেছেন। জাঁ ল-কে গ্রেপ্তার করার নামে ওরকম একটা কড়া চিঠি না লিখলেই ভালো হত। নবাবের মেজাজ বিগড়ে যাওয়ায় ঢিলে পড়েছে ষড়যন্ত্রের রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজে। মিরজাফর নবাব হতে রাজি হয়েছেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে চার্টার অফ ডিম্যান্ড নিয়ে আলোচনা করা যাচ্ছে না। তিনি পলাশিতে চলে যাওয়ায় এ কাজে ছেদ পড়েছে।

নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘কিন্তু হুজুর লোকটা সত্যিই যদি বাজি রাওয়ের কাসিদ হয়?’

ক্লাইভ যেন ঘোরের মধ্যে রয়েছেন। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে খানিকটা আপনমনেই বললেন, ‘সেভেন্টি থাউস্যান্ড ক্যাভালোরি। ফরমিডেবল ফোর্স।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘বর্গিদের ঠেকাতে আলিবর্দির মতো কাবিল-ই-ইনসানই বহুত পরেসানির মধ্যে পড়েছিলেন। নবাবের বাহিনীর এখন যা অবস্থা, তাতে বর্গিদের মুখোমুখি হতেই তারা ভয় পাবে।’

‘সেক্ষেত্রে নবাবকে হটাতে মুর্শিদাবাদের জেন্টুদের মদতের প্রয়োজনই হবে না।’

নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘কিন্তু হুজুর তারপর? বাংলার মসনদ তো বর্গিদের দখলে চলে যাবে।’

‘বাজিরাওয়ের সাহায্য নিলে এমনটা হওয়ার পসিবিলিটিই বেশি মুনশি।’

‘কিন্তু হুজুর সেক্ষেত্রে নবাব তো কোম্পানির হাতের পুতুল হবেন না?’

‘সেটাই ভাবনার বিষয়।’

‘নবাব কোম্পানির খায়েশে না চললে তো আপনাদের লোকসান।’

নবকৃষ্ণর কথাটা উড়িয়ে দিতে পারছেন না ক্লাইভ। বাজিরাওয়ের চিঠিটা যদি সত্যি হয়, সেক্ষেত্রে মারাঠাদের সাহায্য নিয়ে নবাবকে কোম্পানির হাতের পুতুল বানাতে গিয়ে কোম্পানি না মারাঠাদের হাতের পুতুল হয়ে পড়ে। মারাঠারা এখন এক জবরদস্ত শক্তি। বাংলায় তাদের ডেকে আনাটা ঠিক হবে না। আবার অন্যদিক থেকে ভাবলে, দুম করে নবাব যদি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেন, তাহলে মারাঠাদের সাহায্যে কোম্পানির জয় মোটামুটি সুনিশ্চিত। ভবিষ্যতের ভাবনা পরেও ভাবা যেতে পারে। কিন্তু কী করা যায় এখন?

দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ফের পায়চারি করতে থাকেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘এক কাজ করতে পারেন হুজুর।’

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রবল ঔৎসুক্যের সঙ্গে নবকৃষ্ণর দিকে চেয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘বলো মুনশি।’

কর্নেল আগেও একাধিকবার প্রমাণ পেয়েছেন সংকটের সময়ে উপযুক্ত একটা বুদ্ধি বাতলে দিতে মুনশি নবকিসেনের জুড়ি নেই।

‘পেশোয়া বালাজি বাজিরাওয়ের চিঠিটা আপনি নবাবকে পাঠিয়ে দিন। এতে নবাব বুঝবেন কোম্পানির কোনও বদ মতলব নেই। তাঁর গুসসা দূর হবে। সেই সঙ্গে আপনি নরম ভাষায় একটা চিঠিও ঠুকে দিন নবাবকে। স্ক্র্যাফটন সাহেবের হাত দিয়ে দুটো চিঠিই না হয় মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেবেন। এই সুযোগে পলাশিতে গিয়ে মিরজাফর খাঁর সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা সেরে নিতে পারবেন স্ক্র্যাফটন সাহেব। আর যাই হোক, বর্গিদের বাংলায় ডেকে আনাটা মোটেই ভালো কাজ হবে না হুজুর।

ক্লাইভ উল্লসিত হয়ে বললেন, ‘ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া। ইউ আর জিনিয়াস মুনশি।’

নবকৃষ্ণ মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘আপনার প্রশস্তি আমার কাছে পরম সৌভাগ্যের বিষয়। তবে আমি সামান্য মানুষ হুজুর। আমাকে অযথা বড় করবেন না। আমি আপনার দাসানুদাস।’

১৭৫৭ সালের ১৭ মে। সিলেক্ট কমিটির মিটিং বসল ফোর্ট উইলিয়ামে। পেশোয়া বালাজি বাজি রাওয়ের চিঠির কথা সবাইকে জানালেন ক্লাইভ। সকলে এক বাক্যে মেনে নিল বর্গিদের ফের বাংলায় ডেকে আনাটা মোটেই যুক্তিযুক্ত কাজ হবে না। তার চেয়ে কনসপির্যাসি ম্যাচিওর না হওয়া পর্যন্ত নবাবকে ভুলিয়ে রাখতে ও ইংরেজরা যে নবাবের কত বড় শুভানুধ্যায়ী তা প্রমাণ করার জন্য পেশোয়ার চিঠিটা নবাবকে পাঠিয়ে দেওয়ার ভাবনা সত্যিই তারিফের যোগ্য।

গুণী মানুষের কদর করতে জানেন ক্লাইভ। তিনি জানাতে ভুললেন না যে এ ভাবনা তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। কৃতিত্বটা পাওয়া উচিত তাঁর মুনশি নবকিসেনের।

মিরজাফরকে মসনদে বসানোর শর্ত হিসেবে ইংরেজদের দাবি কী কী হবে, তাই নিয়ে একটা খসড়া চুক্তিপত্র তৈরি করেছেন ক্লাইভ। সেটা এবারে পড়ে শোনালেন। কোম্পানির ঘরে ঢুকবে এক কোটি টাকা। কলকাতা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইংরেজরা পাবে পঞ্চাশ লাখ, হিন্দুরা বিশ লাখ ও আরমানিরা সাত লাখ। সব মিলিয়ে এক কোটি সাতাত্তর লাখ টাকার দাবি রাখা হবে মিরজাফরের কাছে।

এই অবধি বলে ক্লাইভ যখন থামলেন তখন সিলেক্ট কমিটির সদস্যদের মুখচোখ গম্ভীর ও থমথমে।

ক্লাইভ বুঝলেন, এরা সেই পাওনার কথা জানতে চাইছেন যা, সরকারি চুক্তিপত্রে লেখা যায় না। অর্থাৎ এত বড় একটা কাণ্ড ঘটানোর কিম্মত হিসেবে ব্যক্তিগত ভাবে কে কত পাবে?

প্রসঙ্গটা তুললেন সিলেক্ট কমিটির অন্যতম সদস্য রিচার্ড বিচার। তিনি বললেন, ‘উইলিয়াম ওয়াটস লিখেছেন, রেভলিউশনের পর গ্রাউন্ড ফোর্স ও নেভির অফিসারদের অনেক টাকা তোফা দেবেন নবাব। আমার মনে হয় তিনি নিজেও এই তালিকা থেকে বাদ যাবেন না। সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে লড়াইয়ের দায় নিচ্ছে সিলেক্ট কমিটি। তাহলে সিলেক্ট কমিটির সদস্যরা ডিপ্রাইভড হবে কেন?’

অকাট্য যুক্তি। বিচারের প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন হলওয়েল ও ড্রেক। সিরাজদ্দৌলার সম্পত্তি নিয়ে অনেক মিথ ছড়িয়ে আছে ইংরেজদের মধ্যে। লোভে সকলেরই চোখ চকচক করছে।

ক্লাইভ বললেন, ‘পারসোনাল ডিম্যান্ডের কথা কি অফিসিয়াল চুক্তিতে লেখা যায়?’

ড্রেক বললেন, ‘এ কথা ঠিক। তবে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করা দরকার।’

হলওয়েল বললেন, ‘নতুন নবাব খুশি হয়ে আমাদের কী দেবেন, সেটা তাঁর মরজির উপর ছেড়ে না দিয়ে আমরা আমাদের আনফিসিয়াল ডিম্যান্ড জানাতে পারি ফর এভরি ইমপরট্যান্ট ইনডিভিজুয়াল।’

ওয়াটসন বলে বসলেন, ‘আমি এসবের মধ্যে নেই।’

ক্লাইভ বললেন, ‘তা কী করে হয়?’

অনেক চেষ্টা করেও ওয়াটসনকে রাজি করাতে পারলেন না ক্লাইভ। অদ্ভুত মানুষ এই অ্যাডমিরাল। হঠাৎ হঠাৎ তাঁর মধ্যে নীতিবোধ জেগে ওঠে। দক্ষিণে লুঠের বখরার ভাগ নিয়ে রীতিমতো ঝগড়া করেছেন। এখন বলছেন এভাবে টাকা নেওয়াটা অনৈতিক।

বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করার পর ওয়াটসন বাদে বাকি সকলের জন্য মাথাপিছু মোটা অঙ্কের টাকা ধরে মোট টাকার পরিমাণ দাঁড়াল বাহান্ন লক্ষ। অর্থাৎ নবাব হয়েই মিরজাফরকে কোষাগার থেকে মেটাতে হবে মোট দু-কোটি সাতাশ লাখ টাকা। এই অবধি আলোচনার পর সকলেই সন্তুষ্ট।

কোম্পানির চার্টার অফ ডিম্যান্ডের অন্যান্য শর্তগুলো গড়গড় করে পড়ে গেলেন ক্লাইভ। এসব নিয়ে কেউ আর বড় একটা মাথা ঘামালেন না। বাকিরা তখন যার যার বখরা নিয়ে হিসেব কষছেন। একজনের তুলনায় অন্যজনের ভাগ কম হয়ে যাচ্ছে কিনা মনে মনে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চলেছেন।

ক্লাইভের পড়া শেষ হলে ড্রেক বেশ গদগদ ভঙ্গিতে বললেন, ‘আর বেশি দেরি করাটা ঠিক হবে না। আপনি যেমন ভেবেছেন, চার্টার অফ ডিম্যান্ড অবিলম্বে স্ক্র্যাফটনের হাত দিয়ে মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দিন। আমাদের শেয়ারের ব্যাপারটাও মিরজাফর খাঁর কাছে আনঅফিসিয়ালি প্লেস করা হোক। এসব নিয়ে খাঁ সাহেব কনভিনসড হলেই উই ক্যান ডিক্লেয়ার ওয়ার এগেইনস্ট নবাব। তাহলে আজ এখানেই মিটিংটা শেষ করা যেতে পারে।’

ক্লাইভ বললেন, ‘একটা ইমপরট্যান্ট আলোচনা এখনও বাকি আছে।’

অনেকেই অবাক চোখে ক্লাইভের দিকে তাকালেন।

ড্রেক বললেন, ‘বাকি আবার কী? সবই তো আলোচনা হয়ে গেল।’

ওয়াটসের একটা চিঠি টেবিলের উপর ফেলে ক্লাইভ বললেন, ‘উমিচাঁদ ডিম্যান্ডেড ফাইভ পারসেন্ট অফ নবাব’স ট্রেজার।’

অনেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘হোয়াট? ফাইভ পারসেন্ট?’

মাথা নেড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ইয়েস ফাইভ পারসেন্ট অফ নবাব’স ট্রেজার।’

ড্রেক বললেন, ‘হি ইজ অ্যা স্কাউন্ড্রেল!’

হলওয়েল যোগ করলেন, ‘অ্যা ক্লেভার জ্যাকেল।’

ড্রেক ফের ফুঁসতে উঠে বললেন, ‘হি ইটিগেটেড নবাব টু অ্যাটাক আস লাস্ট ইয়ার!’

বীচার বললেন, ‘উই মাস্ট নট গিভ হিম অ্যা সিঙ্গল পেনি।’

ড্রেক বললেন, ‘ওয়েল সেইড। একথা উমিচাঁদকে জানিয়ে দিলেই তো হয়।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘সলিউশন ইজ নট সো ইজি। আমাদের মনে রাখতে হবে, উমিচাঁদ ইজ অ্যা ডেঞ্জারাস পার্সন। হি মে ডিসক্লোস আওয়ার প্ল্যান টু নবাব। সেক্ষেত্রে সব পরিকল্পনা বরবাদ হয়ে যাবে।’

অস্থির হয়ে ড্রেক বলে উঠলেন, ‘আপনি কী বলতে চাইছেন? উমিচাঁদের ডিম্যান্ড মেনে নিতে হবে আমাদের?’

ক্লাইভ জোর দিয়ে বললেন, ‘না। উমিচাঁদ ইজ অ্যা গ্রিডি পার্সন। সারা জীবনের মতো তাঁকে আমি একটা শিক্ষা দিতে চাই।’

ওয়াটসন প্রশ্ন করলেন, ‘কী ভাবে?’

ক্লাইভ বললেন, ‘আই হ্যাভ অ্যা স্পেশাল প্ল্যান ফর উমিচাঁদ। আপাতত ফাইভ পারসেন্টের কথা বলে ভুলিয়ে রাখতে হবে তাঁকে। ফরটি ক্রোর ইজ অ্যা গসিপ। আমি ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সব মিলিয়ে নবাবের দৌলতের মানি ভ্যালু চার কোটি টাকার বেশি হবে না। উমিচাঁদ পাবে এর ফাইভ পারসেন্ট—দ্যাট মিনস কুড়ি লাখ টাকা। কিন্তু সত্যিই সে কী তাই পাবে?’

ক্লাইভের এই রহস্যময় কথার ভঙ্গিতে সকলে হাঁ হয়ে গেল।

হলওয়েল বললেন, ‘আপনি কী বলছেন, আমরা কিচ্ছু বুঝতে পারছি না কর্নেল।’

মুচকি হেসে কর্নেল ক্লাইভ তাঁর সেক্রেটারি ওয়ালসের দিকে তাকালেন।

কর্নেলের দিকে দুটো কাগজ এগিয়ে দিলেন ওয়ালস। একটা লাল। আরেকটা সাদা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *