ফলতা থেকে পলাশি – ৬৪

৬৪

ঢাক ও শিঙার আওয়াজ থেমেছে বেশ কিছুক্ষণ হল। ক্লান্ত বাজনদারেরা বিশ্রাম নিতে গিয়েছে। নবাবের সেনাশিবির এখন নিঝুম। ঘুমিয়ে কাদা। পলাশির প্রান্তরে নদীর ধার বরাবর বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সারিসারি তাঁবুগুলো নিঃসাড় হয়ে পড়ে রয়েছে। জায়গায় জায়গায় অস্থায়ী বাতিস্তম্ভের উপর জ্বলছে রেড়ির তেলের আলো। বল্লম হাতে যন্ত্রের মতো পদচারণা করে বেড়াচ্ছে রাতপাহারার নিযুক্ত বরকন্দাজেরা।

খানিক আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। তবুও বাতাসে গুমোট ভাব একটুও কমেনি। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। শোনা যাচ্ছে ব্যাঙের একটানা গোঙানি, ঝিঁঝির ডাকের বিরামহীন আওয়াজ। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছেন সিরাজদ্দৌলা। ঘুম আসছে না। নানারকম দুশ্চিন্তা নবাবকে অস্থির করে তুলেছে।

খুব গরম বোধ হওয়ায় বিছানায় উঠে বসলেন সিরাজদ্দৌলা। মাথার উপর স্থির হয়ে রয়েছে টানাপাখা। অবাক হলেন নবাব। এমন তো হওয়ার কথা নয়। গোলাম-দাখিলারা সারা রাত পালা করে পাখা টানে। নবাবকে আরাম দেওয়ার জন্যই এদের নোকরি। এরা সব গেল কোথায়?

বিরক্ত হয়ে ডোরিতে টান দিলেন নবাব। রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে ঘণ্টির শব্দ নবাবের নিজের কানে খুব জোরাল বলে বোধ হল। গোলাম-দাখিলারা কেউ ছুটে এল না। বিছানা থেকে নেমে এলেন সিরাজদ্দৌলা। চিলমন সরিয়ে বাইরে এসে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। গোলাম-দাখিলারা দরবারঘরের গালিচার উপর শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমন্ত একজনের শিথিল হাতে ধরা রয়েছে টানাপাখার দড়িটা।

নবাবকে দেখভালের জিম্মেদারি যাদের উপরে তাদের এই আচরণ শাহি রিয়াসতে ঘোর বেতমিজি। বিলকুল ইবলিশের কারবার। অন্যসময় হলে হয়তো পদাঘাতে এদের ঘুম ছুটিয়ে দিতেন নবাব। হয়তো গর্দান নেওয়ার হুকুম দিতেন, না হলে কোড়ার ঘায়ে রক্তাক্ত করে দিতেন দেহ। আজ আর তেমন কিছু করলেন না নবাব। তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়ালেন।

এবারে লড়াইয়ের ময়দানে অনেক কিছুই সিরাজদ্দৌলার কাছে কেমন যেন বেসুরো ঠেকছে। সর্বত্র কেমন যেন একটা ঢিলেঢালা ভাব। গতবছর কলকাতা অভিযানের সময় বাহিনীর যে জোশ ছিল এবারে সে জোশ উধাও। ঘোড়সওয়ার, পদাতিকদের দেহভঙ্গি দেখে নবাবের মনে হয়েছে এরা যেন সব দায়ে পড়ে যুদ্ধে চলেছে। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলার নানারকম চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর বাহিনীতে।

বাড়তি টাকার দাবি তুলে যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে বেঁকে বসেছিল একদল সৈন্য। ওই টাকা আগাম হাতে না পেলে তারা লড়াই করতে যাবে না। লড়াইয়ের পর মিটিয়ে দেওয়া হবে তাদের দাবি—নবাবের এই জবানের পরেও তারা তাদের জিদ বজায় রেখেছিল। অবাক হয়েছিলেন সিরাজদ্দৌলা। তাঁর মনে হয়েছিল, এ তো একপ্রকারের বাগিপনাহ। নবাব বেকায়দায় পড়েছেন বুঝে চাপ দিয়ে টাকা আদায়ের তরিকা। অনেক মসবদারেরও মদত রয়েছে এতে। একথা বুঝতে পেরে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন নবাব। শেষে প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসা কোষাগার থেকে সৈন্যদের বাড়তি টাকা মিটিয়ে এই বাগিপনাহ তিনি সামাল দেন।

নবাব অনুভব করছেন, তাঁর কর্তৃত্ব কেমন যেন শিথিল হয়ে পড়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে যে মানুষগুলো ঘুরে বেড়ায় তাদের আচার-আচরণও খুব দ্রুত কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। তসলিম-কুর্নিশ-সিজদা-কদমবোসি সবেতেই দায়সারা ভাব। সবই নিয়মের ছাঁচে ফেলা। অন্তরের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য তাতে নেই।

আজ সন্ধেয় যে ঘটনা ঘটে গিয়েছে, তা নিয়ে ভয়ানক মুষড়ে পড়েছেন নবাব। ঘটনাটা নিয়ে তেমন হইচই করতে চাননি তিনি। কেননা বিষয়টা নবাবের পক্ষে ঘোর বেইজ্জতির।

সন্ধেবেলা সিরাজদ্দৌলা আবিষ্কার করেন, তাঁর সোনার আলবোলাটা তাঁবুর ভিতর থেকে চুরি হয়ে গিয়েছে। নবাবের সেবায় নিযুক্ত কোনও গোলাম, হাজিরা বা দাখিলা ছাড়া এ কাজ করা আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু এতটা দুঃসাহস হয় কী করে? এরা কি ধরে নিয়েছে যে সিরাজদ্দৌলার জমানা শেষ হতে চলেছে? পলাশির এই লড়াইয়ের পর মসনদে বসবে অন্য কেউ। বরবাদ হয়ে কহানিতে আশ্রয় নেবেন সিরাজদ্দৌলা। তাঁর প্রতি অনুগত, বিশ্বস্ত থেকে আর ফায়দা কী হবে? তাই কি নবাবের সাধের আলবোলা চুরি করার সাহস করে একজন সামান্য দাখিলা, রাতের খিদমতগারিতে নিযুক্ত গোলামের দল কাজে ঢিল দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে?

একটা দমবন্ধ করা কষ্ট আটকে রয়েছে নবাবের গলার কাছে। তাঁর নিজের লোকেরা এক এক করে কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তাঁর দিক থেকে? কেন এরা খারিজ করে দিচ্ছে তাঁকে? যে অসংখ্য দীপবর্তিকা নবাবের দুনিয়াটাকে রওশন করে রাখত, সিরাজদ্দৌলার মনে হল, সেই দীপগুলো একে একে নিভছে। কেন এমন হচ্ছে? এজন্য তিনি নিজেও কি যথেষ্ট দায়ী নন?

এলোমেলো নানাকথা ভাবতে ভাবতে অনেকটা দূরে চলে এসেছেন সিরাজদ্দৌলা। হুঁশ ফিরতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পিছন ঘুরে দেখলেন, তাঁর শাহি তাঁবুটা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। সামনে আর কিছু দূর এগোলে শুরু হয়ে যাবে পলাশির বিস্তৃত আমবাগান। সিরাজের চোখে পড়ল, দূরে পলাশির আমবাগানের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অনেক চলমান আলোকবিন্দু। আলো জ্বলছে শিকারবাড়ির ভিতরেও।

‘হুজুর!’

এই বিজন প্রান্তরে হঠাৎই মানুষের গলা শুনে চমকে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা। ‘কে?’

‘আমি নারান সিং। সেলাম হুজুর।’ মাথা ঝুকিয়ে নারান সিং কুর্নিশ জানায় নবাবকে। তার আনুগত্যে কোনও খাদ নেই। নারান সিং-এর হাতে লণ্ঠন। সামান্য আলোকশিখার উপস্থিতিতে গাঢ় অন্ধকার সহসা যেন তফাতে চলে যায়।

‘তুমি এখানে?’

‘দেখলাম আপনি তাঁবু থেকে বেরিয়ে একা একা হেঁটে চলেছেন। তাই-‘

নারনা সিং-কে বাধা দিয়ে সিরাজদ্দৌলা বলেন, ‘আচ্ছা নারান সিং অনেকেই তো এই পলাশির প্রান্তরে সিরাজদ্দৌলার বরবাদি চায়। তুমি চাও না?’

সামান্য এক অধস্তন কর্মচারির উদ্দেশে এই প্রশ্ন করা নবাবকে মানায় না। তবুও আবেগের বশে প্রশ্নটা করে ফেললেন সিরাজদ্দৌলা।

অবাক হয় নারান সিং। জবাবে বলে, ‘আপনি সুবে বাংলার নবাব। এতকাল নিজামতের নুন খেয়েছি। আলিবর্দি খাঁর জামানায় নোকরিতে ঢোকার মুখে ওয়াদা করেছিলাম, জানকবুল করে নবাব ও নিজামতকে সালামত রাখব। আপনি আমার মনিব। আমি কি আপনার বরবাদি চাইতে পারি হুজুর?’

নারান সিং-এর কথা শুনে খুশি হলেন সিরাজদ্দৌলা।

নারান সিং বলে, ‘দূরে ওই যে আলো দেখছেন হুজুর, ওখানে ইংরেজদের ফৌজ ছাউনি ফেলেছে।’

‘কর্নেল ক্লাইভ পৌঁছে গিয়েছেন এখানে?’ আতঙ্কের ছাপ পড়ে নবাবের মুখে।

‘জি হুজুর। আপনার শিকারবাড়ি দখল করে নিয়েছে গোরা পল্টন।’

সিরাজের অন্তরটা যেন হঠাৎ হুহু করে কেঁদে উঠল। সেই পলাশির শিকারবাড়ি। কৈশোরের কত সুখের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে সে বাড়ির আশেপাশে। সেই বাড়িতেই প্রথম লুৎফার সঙ্গে ভালোবাসা গড়ে ওঠা। বাড়ি সংলগ্ন আমবাগানে লুৎফাকে প্রথম চুম্বন করা। লজ্জায় রাঙা হয়ে লুৎফার ছুটে পালানো সব তসবিরই মুহূর্তের মধ্যে ভেসে ওঠে সিরাজের চোখের সামনে। সেই বাড়ি, সেই আমবাগান জুড়ে আজ ইংরেজদের শিবির! সিরাজদ্দৌলার গা-হাত-পা সহসা রাগে চিড়বিড় করে ওঠে।

‘দুশমন ধারে কাছেই রয়েছে। এখানে একা একা আপনার পক্ষে থাকা ঠিক নয়। তাঁবুতে ফিরে চলুন হুজুর।’ বলল নারান সিং।

গম্ভীর গলায় সিরাজ বললেন, ‘চলো।’

ফেরার পথে কিছুদূর এগোনোর পরেই সিরাজদ্দৌলা দেখেন কতগুলো ছায়ামূর্তি।

নারান সিং বলে, ‘হুজুর এরা আপনার দেহরক্ষীর দল। তাঁবু থেকে আপনাকে বেরিয়ে আসতে দেখেই পিছু নিয়েছে। আপনি একান্তে কিছু সময় গুজরান করতে চান ভেবে কাছে না এসে দূর থেকে এরা নজরে রেখেছিল আপনাকে।

‘সেলাম হুজুর। সাহি সালামত।’ দেহরক্ষীর দল তসলিম জানায়।

সিরাজদ্দৌলা খেয়াল করে দেখলেন, এদের সেলাম বাজানোর ভঙ্গিতে কোনও কৃত্রিমতা নেই। খুশি হলেন নবাব। সকলের হৃদয় থেকে তিনি মুছে যাচ্ছেন—এ ভাবনা ভাবপ্রবণ মনের বিলাসিতা। সত্যি নয়। ভাবতে থাকেন নবাব।

দেহরক্ষীরা এবারে সচকিত হয়ে উঠল। নবাবের শিবিরের দিক থেকে দ্রুত এগিয়ে আসছে একজোড়া ঘোড়ার খুরের আওয়াজ।

ঘোড়া থেকে নামলেন মিরমদন ও মোহনলাল।

‘আপনি কোথায় গিয়েছিলেন হুজুর?’ মোহনলালের গলায় ঝরে পড়ল উৎকণ্ঠা।

‘তাজা বাতাসে সিনা ভরে শ্বাস নিচ্ছিলাম মোহনলাল।’ মুচকি হেসে জবাব দেন সিরাজদ্দৌলা।

‘উঃ! কী দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম! বেতমিজ গোলামের দল ঘুমিয়ে পড়েছিল। তারা ঘুম ভেঙে জেগে উঠে দেখে আপনি তাঁবুতে নেই। তারাই গিয়ে ডেকে তোলে আমাকে। কামচোর গোলামগুলোকে আমি কয়েদ করতে বলেছি।

‘ছোড় দো উন লোগোকো।’ এই বলে কোমরের খাপ থেকে তরবারি উন্মোচিত করলেন সিরাজদ্দৌলা। নবাবের ইশারায় তরবারি হাতে নিলেন মোহনলাল ও মিরমদন। তিনটে তরোয়াল স্পর্শ করল পরস্পরকে। চোয়াল শক্ত করে সিরাজদ্দৌলা, মিরমদন ও মোহনলাল—এই তিনজনে বাংলামুলুক থেকে ইংরেজদের চিরকালের মতো দূর করে দেওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলেন।

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন। কাকভোরে ঘুম ভাঙল ক্লাইভের। আলো সবে ফুটেছে। দূর থেকে ভসে আসছে কাড়ানাকাড়ার শব্দ। বিছানা ছেড়ে নেমেই শিকার বাড়ির ছাতে উঠে একটা বুরুজের উপর এসে দাঁড়ালেন ক্লাইভ। চোখ রাখলেন দূরবিনে।

রুপোলি ফিতের মতো ভাগীরথী অদূরে ঘোড়ার খুরের আকারে বাঁক নিয়েছে। তার ধার ঘেঁষে রয়েছে নবাবের সেনাছাউনি। দেখা যাচ্ছে সারি সারি তাঁবু। কালো মেঘে ঢাকা আকাশের পশ্চাৎপটে বড় স্পষ্ট তাঁবুগুলোর রংবেরঙের কানাত। সে রঙ হারিয়ে গিয়েছে দিগন্তরেখায়। কতদূর যে এই ছাউনির বিস্তৃতি তা দূর থেকে দেখে বোঝা মুশকিল।

ক্লাইভের চোখে পড়ল, ছাউনি থেকে পিঁপড়ের মতো পিলপিল করে বেরিয়ে আসছে নবাবের সৈন্যরা। আসছে তো আসছেই। একেবারে জনসমুদ্র। সৈন্যদের হাতে হাতিয়ার। কামানের গাড়িগুলোকে টেনে নিয়ে আসছে মুটে মজুরের দল। আকারে বেশ বড় বড় অনেকগুলো কামান। লড়াই শুরু করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে নবাবের বাহিনী।

ফৌজসহ মিরজাফর ও রায়দুর্লভের যোগ দেওয়ার কথা ছিল ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে। কিন্তু কোথায় তারা? এখন সত্যিই যদি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তাহলে এই বিরাট বাহিনীর আক্রমণের ঝাঁঝ মাত্র ন’শো পঞ্চাশজন গোরা পল্টন আর একুশশো দেশি সেপাই নিয়ে কী করে সামলাবেন?

যাই হোক, প্রতিরোধের চেষ্টা একটা করতেই হবে। অগত্যা তড়িঘড়ি নীচে নেমে এসে বাগানের পাঁচিলকে সামনে রেখে সেনা সমাবেশ করলেন ক্লাইভ। মাঝে গোরা পল্টন। তাদের একপাশে তেলেঙ্গানার সেপাইরা। আরেক পাশে বরানগরের ছাউনিতে গড়ে তোলা লাল পল্টন। তারপরে দুপাশে মোতায়েন তিনটে তিনটে করে মোট ছ’টা কামান। সেনা পরিচালনার দায়িত্ব মেজর কিলপ্যাট্রিক ও মেজর আয়ারকুটের হাতে। ক্লাইভ রইলেন একটু পিছনে আমবাগানের মধ্যে। সেখানে মজুত রয়েছে ইংরেজদের রসদ। তাঁর পাহারায় শত খানেক গোরা পল্টন।

ক্লাইভের বাহিনীর সামনের সারি থেকে দুশো গজ দূরে পুকুরের ধারে একটা ঢিবির উপরে চারটে কামান বসিয়ে জনা পঁতাল্লিশ ফরাসি গোলন্দাজকে সঙ্গে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছেন মসিয়ে সিনফ্রে। ঠিক তার পিছনে মাইল দেড়েকের মধ্যে রয়েছে নবাবের শাহি তাঁবু। তার অলিন্দে বসে দূরবিন চোখে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন উদ্বিগ্ন সিরাজদ্দৌলা।

সিনফ্রের থেকে কয়েকশো গজ পিছনে একদল সৈন্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মিরমদন। তাঁর পাশে মোহনলাল। তাঁর সঙ্গে রয়েছে পাঁচ হাজার ঘোড়সওয়ার ও সাত হাজার পদাতিক সেনা। মোহনলালের বাদিকে একটা পরিত্যক্ত ইটখোলার উঁচু ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে অর্ধচন্দ্রাকারে ইংরেজদের ঘিরে ধরেছে মিরজাফর, ইয়ার লতিফ খান ও রায়দুর্লভের বাহিনী। পদাতিক ও ঘোড়সওয়ার মিলিয়ে নবাবের মোট সেনা সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার। এছাড়া সঙ্গে রয়েছে তিপ্পান্নটা বড় বড় কামান।

এই সেনা সমাবেশ দেখে ভয়ে দরদর করে ঘামছেন ক্লাইভ। মিরজাফর ও রায়দুর্লভের মতিগতির আন্দাজ পাচ্ছেন না তিনি। কথা ছিল মিরজাফর ও রায়দুর্লভের ফৌজ নবাবের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে। কিন্তু এরা যে ইংরেজদের ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ল। দূরবিন চোখে মিরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফের বাহিনীকে ইয়াদদস্ত করতে লাগলেন ক্লাইভ ভাবতে লাগলেন, এরা নিষ্ক্রিয় থাকলে তবুও একরকম। সিনফ্রে, মিরমদন ও মোহনলালের বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু নবাবের গোটা বাহিনী যদি একসঙ্গে ইংরেজদের আক্রমণ করে বসে তাহলে ভয়ংকর বিপদ।

গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম!

সহসা কামানের গর্জনে কেপে উঠল পলাশির গোটা প্রান্তর। পলাশির সুবিশাল আমবাগানের শয়ে শয়ে পাখি ভয় পেয়ে কিচিরমিচির শব্দে ডানা ঝাপটে উড়তে শুরু করল আকাশে। সকাল আটটা। ইংরেজদের দিকে কামান দাগতে শুরু করলেন সিনফ্রে। শুরু হয়ে গেল পলাশির যুদ্ধ।

জবাব দিতে শুরু করল ইংরেজদের ফিল্ড পিস কামান। আগুন ঝলকালো গোরা পল্টন ও দিশি সেপাইদের হাতে ধরা ফ্লিন্টলক রাইফেলের মুখ থেকে। ঘন ঘন তোপের আওয়াজে কাঁপতে লাগল মাটি। ইটখোলার উপর চুপচাপ দাঁড়িয়ে যুদ্ধটা উপভোগ করছিলেন মিরজাফর, ইয়ার লতিফ ও রায়দুর্লভ। এরা শেষ পর্যন্ত কী করবেন তার ঠিক নেই এই ভেবে তাদের দিকে কামানের নল ঘুরিয়ে কয়েক রাউন্ড গোলা দেগে বসলেন আয়ারকুট।

মিরজাফর, ইয়ার লতিফ খান ও রায়দুর্লভ চমকে উঠলেন। ভয়ে বাহিনী নিয়ে বেশ কিছুটা পিছিয়ে গেলেন। এদের দিকে পালটা গোলাগুলি ছুটে না আসায় খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেন ক্লাইভ। আর যাই হোক না কেন, এরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়বেন না বলে প্রত্যয় হল ক্লাইভের।

অবশ্য ততক্ষণে মিরমদন, মোহনলাল ও সিনফ্রের আক্রমণের ঝাঁঝে ত্রাহিত্রাহি রব পড়ে গিয়েছে ইংরেজ শিবিরে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ঘায়েল হয়ে পড়েছে ইংরেজবাহিনীর জনা তিরিশেক সেপাই ও পল্টন। নবাবের দিকেও হতাহতের সংখ্যা প্রায় একই।

নবাবের বাহিনীর তুলনায় ইংরেজরা সংখ্যায় অনেক কম। ক্লাইভ দেখলেন, এই হারে তাঁর সৈন্যরা যদি ঘায়েল হতে থাকে তাহলে বেশিক্ষণ আর যুদ্ধ চালানো যাবে না। পিছিয়ে এসে গোটা বাহিনীকে আমবাগানে ঢুকে পড়ার নির্দেশ দিলেন ক্লাইভ।

ইংরেজরা পিছু হটছে দেখে সাহস করে সামনে কিছুটা এগিয়ে এল নবাবের বাহিনী। আক্রমণ নয়, তখন আত্মরক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ইংরেজরা। আমগাছের গুঁড়ির আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রেখে গুলি ছুড়ছে সেপাই ও পল্টনরা।

গোলন্দাজ বাহিনী কামান নিয়ে পিছু হটে এসে আমবাগানের মাটির দেওয়ালে ছিদ্র করে তার মধ্যে কামানের নল ঢুকিয়ে গোলা ছুড়তে শুরু করল। এই কৌশলে ইংরেজ পক্ষে হতাহতের সংখ্যা কমল।

হঠাৎ ইংরেজদের একটা গোলা গিয়ে পড়ল নবাবপক্ষের একটা বারুদের গাড়ির উপরে। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। কান ফাটানো শব্দে কেঁপে উঠলেন, সিনফ্রে, মোহনলাল ও মিরমদন। এই বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল নবাবের বেশ কয়েকজন সেপাই। এই ঝটকা সামলে আক্রমণের ঝাঁঝ আরও বাড়িয়ে সামনে এগোতে লাগলেন মোহনলাল ও মিরমদন। দুজনেই উজ্জীবিত। তাঁদের যুগপৎ আক্রমণে ভেঙে পড়ছে ইংরেজদের প্রতিরোধ।

ক্লাইভ বুঝলেন ভয়ানক সংকট। ইংরেজদের গোলাগুলির রসদ খুব বেশি নেই। এভাবে সমানে লড়াই চলতে থাকলে যুদ্ধের রসদ ফুরিয়ে যাবে। দুঘণ্টার উপর একটানা লড়াই চালিয়ে কাহিল হয়ে পড়েছে তাঁর সৈন্যরা। সাময়িক বিরতি মিললে খুব সুবিধে হয়।

সংকটের সময়ে ক্লাইভকে অতীতে বহুবার বাঁচিয়েছেন ভাগ্যদেবী। এবারও বাঁচিয়ে দিলেন। সহসা আকাশ ছেয়ে গেল ঘন কালো মেঘে। বেলা এগারোটা নাগাদ মুষলধারায় বৃষ্টি নামল। ঝাপসা হয়ে গেল চারিদিক। দুপক্ষই যুদ্ধ থামিয়ে দিতে বাধ্য হল।

বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ বৃষ্টি থামল। আষাঢ়ের মেঘ সরে গিয়ে রোদ উঠল ঝলমলিয়ে। তবে আধঘণ্টার প্রবল বর্ষণে গোটা এলাকা জলকাদায় মাখামাখি। বৃষ্টিতে নবাব-পক্ষের বড়সড় ক্ষতি হয়ে গেল। ছাউনি দেওয়া না থাকায় জলে ভিজে বরবাদ হয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকগাড়ি বারুদ।

এর উপরে আরেক সমস্যা হল ভিজে মাটিতে গেঁথে যাচ্ছে কামানের গাড়ির চাকা। দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কামান সরিয়ে শত্রুকে জুত করে তাক করা যাচ্ছে না। এই পরেশানি ইংরেজদের হয়নি। কারণ ক্লাইভের ফিল্ড পিস কামানগুলো ছিল অনেক হালকা ও ছোট, আর ভালো করে আচ্ছাদিত ছিল বারুদের গাড়ি।

যাই হোক, রোদ ওঠার পর দু-পক্ষই আবার প্রস্তুত হল লড়াইয়ের জন্য। ইংরেজদের দিক থেকে কামানের গর্জন নেই। মিরমদন ভাবলেন, প্রবল বৃষ্টিতে ইংরেজদের কামানের রসদও নিশ্চয়ই ভিজে গিয়েছে। এই মওকায় ঝটিকা আক্রমণ করে ইংরেজদের ঘাবড়ে দেওয়া যায়। হাজার খানেক সৈন্য নিয়ে অনেকটা সামনে এগিয়ে গেলেন মিরমদন। চালে মস্ত ভুল হয়ে গেল।

আমবাগানের মাটির দেওয়ালের আড়ালে প্রস্তুত হয়েই ছিল ইংরেজদের গোলন্দাজ বাহিনী ও গোরা পল্টনের দল। মিরমদন এগিয়ে আসছেন দেখেই গর্জে উঠল তিনটে কামান। একই সঙ্গে গুলি ছুড়তে শুরু করল গোরা পল্টনেরা।

গোলার আঘাতে নিমেষে মাটি নিল মিরমদনের বেশ কয়েকজন সেনা। রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল তেজি উজবেক ঘোড়াগুলো। ঘোড়া ও মানুষের ক্রমাগত আর্তনাদে কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়লেন মিরমদন। বেকায়দায় পড়ে গিয়ে দ্রুত বাহিনীসমেত পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। সহসা একটা বুলেট এসে বিঁধল মিরমদনের পেটে। সামনে ঝুঁকে পড়ে ঘোড়ার পিঠের সঙ্গে প্রায় মিশে গেলেন মিরমদন। রাশ টেনে ধরে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে গায়ের সব শক্তি দিয়ে ঘোড়ের পেটে জোরদার লাথি কষালেন। ইশারা বুঝল মিরমদনের উজবেগ ঘোড়া। তিরবেগে ছুটে চলল উলটো দিকে।

মিরমদনের দেহের সবশক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে। পেট থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে। শুকিয়ে আসছে গলা। অসাড় হয়ে আসছে দেহ। তবুও মনের জোরে শক্ত মুঠিতে ঘোড়ার রাশ ধরে রেখেছেন মিরমদন। পলাশির যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে মিরমদনের ঘোড়া তিরবেগে ছুটে চলেছে নবাবের তাঁবুর দিকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *