৬৫
তিরবেগে ছুটে আসছে একটা ঘোড়া।
দৃশ্যটা চোখে পড়ল সিরাজদ্দৌলার। শশব্যস্ত হয়ে তিনি তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালেন। কোনও কাসিদ কী ভালো খবর নিয়ে ছুটে আসছে? খুশি ঝিলিক দিয়ে ওঠে সিরাজের দুই চোখে।
কয়েক পল পরেই আশা ভঙ্গ হয়। শাহি তাঁবুর সামনে এসে থামে ঘোড়া। মিরমদনকে দেখে শিউরে ওঠেন সিরাজদ্দৌলা। পেট থেকে দেহের নীচের অংশটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সাদা ঘোড়ার পিঠটাও মিরমদনের রক্তে রাঙা। তাছাড়া ঘোড়ার দাবনায় বিঁধে আছে একটা বুলেট। রক্ত ঝরছে সেখান থেকেও। মনিবকে নবাবের কাছে পৌঁছে দিয়ে হাঁপাচ্ছে তাগড়াই উজবেক ঘোড়াটা। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে।
প্রায় নিঃসাড় হয়ে পড়া মিরমদনকে ঘোড়ার পিঠ থেকে দ্রুত নামিয়ে নেয় কয়েকজন সেপাই। থরথর করে কেঁপে ওঠে ঘোড়া। মাটিতে টলে পড়ে নিমেষে নিথর হয়ে যায়।
মিরমদনের মাথাটা কোলের মধ্যে নিয়ে মাটিতেই বসে পড়েন সিরাজদ্দৌলা। নবাবের চোখদুটো জলে ভরে ওঠে। মিরমদনের কপালে, বুকে অসহায়ভাবে হাত বোলাতে থাকেন তিনি।
ছুটে এলেন শাহি হেকিম। ছুটে এলেন একজন কবিরাজও। মিরমদনের দেহের ক্ষতের ইলাজ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তাঁরা। ঘোলাটে দৃষ্টিতে নবাবের দিকে তাকালেন মিরমদন। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। কিছু বলতে চাইছেন। তাঁর মুখের উপরে ঝুঁকে পড়লেন নবাব।
মিরমদন অনেক কষ্ট করে বললেন, ‘আমার সময় হয়েছে। আপনি লড়াই জারি রাখুন হুজুর। জিৎ আমাদের হবে।’
মিরমদনের মুখে জল দিলেন সিরাজদ্দৌলা। সে জল ভিতরে গেল না। ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল। নবাবের কোলে মাথা রেখেই দেহ রাখলেন মিরমদন। বিশ্বস্ত এই সেনাপতিকে হারিয়ে সিরাজদ্দৌলার বুকটা মুচড়ে উঠল।
উঠে দাঁড়ালেন নবাব। সামনে পড়ে থাকা মিরমদনের নিথর দেহকে শির ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ জানালেন। তারপর দ্রুত ফিরে গেলেন নিজের তাঁবুতে।
কাসিদ খবর এনেছে জোরদার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মসিয়ে সিনফ্রে ও মোহনলাল। তবুও ভয়ংকর একটা ভয় গ্রাস করল নবাবকে। মিরমদন নেই। এখন যদি মোহনলালের কিছু একটা হয়ে যায়, তাহলে কী হবে? কাসিদ এ খবরও এনেছে যে, মোটেই লড়াই করছে না মিরজাফর, রায়দুর্লভ ও ইয়ার লতিফের বাহিনী। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁরা তামাশা দেখছে। কী হবে এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ? ভয়ানক অস্থির হয়ে পড়লেন সিরাজদ্দৌলা।
মিরজাফর ও রায়দুর্লভ তাঁদের বাহিনী নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মোহনলালের সঙ্গে যোগ দিলেই জয় সুনিশ্চিত, কিন্তু মিরজাফর ও রায়দুর্লভের যে লড়াই করার কোনও তাগিদ নেই। এঁরা গদ্দারি করছেন নবাবের সঙ্গে। কোরান ছুঁয়ে মিরজাফর যে ওয়াদা করেছিলেন, তা তিনি রাখছেন না। নবাব ভাবলেন, এই ওয়াক্তে হাঁটু মুড়ে বসে তিনি যদি মিরজাফরের মদত ভিক্ষে করেন, তাহলেও কি তিনি তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবেন?
নানি বেগমের কথা মনে পড়ল সিরাজের। নানাজিও তো এমন অবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন বর্গি হাঙ্গামার সময়। ভাস্কর পণ্ডিতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মদত পাচ্ছিলেন না সেনাপতি মোস্তাফা খাঁর কাছ থেকে। শেষে নানাজির আবেগভরা আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘামাসান লড়াইয়ে কামেয়াবি হাসিল করেছিলেন মোস্তাফা খাঁ। সেদিন মোস্তাফা খাঁ যা করেছিলেন, আজ মিরজাফর কি সেই ভূমিকা নিভাতে পারেন না? নবাবের অহমিকা ছুড়ে ফেলে আজ যদি তিনি মিরজাফরের দিকে তাঁর হাতদুটো বাড়িয়ে দেন, তাহলেও কি নিশ্চুপ হয়ে থাকতে পারবেন মিরজাফর?
মিরজাফরের উদ্দেশে একটা চিরকুট পাঠালেন নবাব।
খানিকবাদে পুত্র মিরন ও একদল সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে নবাবের তাঁবুতে এসে হাজির হলেন মিরজাফর। তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন সিরাজদ্দৌলা।
নবাবকে তসলিম জানিয়ে মিরজাফর বললেন, ‘শুনলাম মওত হয়েছে মিরমদনের। ইয়ে গহেরা ঝটকা।’
খুশিতে ঝলমল করতে থাকা মিরনের মুখের দিকে আড়চোখে একবার তাকালেন সিরাজদ্দৌলা। নবাবের মনটা একটু দমে গেল। কাদের সাহায্য চেয়ে হাত বাড়াতে যাচ্ছেন তিনি? তবুও আশায় বুক বাঁধলেন নবাব।
মিরজাফর শুধোলেন, ‘বলুন হুজুর! ইতনা জরুরি তলব কেন?’
মিরজাফরের হাতদুটো চেপে ধরলেন সিরাজদ্দৌলা। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন মাটিতে।
মনের ফূর্তি লুকোতে না পেরে মুখ ঘুরিয়ে নিল মিরন। মিরজাফর গম্ভীর। নিজের মাথার উষ্ণীষ খুলে মিরজাফরের পায়ের কাছে রাখলেন নবাব।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন মিরজাফর।
সিরাজদ্দৌলা কাতর গলায় বললেন, ‘মসনদের ইজ্জত রক্ষা করুন আপনি। আমাকে মদত দিন জনাব। দয়া করুন আমাকে।’
মিরজাফর বিস্মিত। কে এই যুবক? দরবারে যার কাছ থেকে দিনের পর দিন মিরজাফর পেয়েছেন রূঢ় ব্যবহার, অবহেলা, তাচ্ছিল্য—এ কি নবাব আলিবর্দি খাঁর আদরে লালিত সেই সিরাজদ্দৌলা? না অন্য কেউ?
মুহূর্তের জন্য যেন দুর্বল হয়ে পড়লেন মিরজাফর। সুবে বাংলার নবাব আজ হাঁটু মুড়ে ভিক্ষে চাইছেন তাঁর কাছে, এ তো তাঁর আহত অহংবোধের ইলাজের জন্য কাফি। কী করবেন মিরজাফর? ইমানদার আদমির মতো মদত দেবেন সিরাজদ্দৌলাকে? নবাবের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে? কিন্তু তারপর? যদি এই যুদ্ধে নবাব বিজয়ী হয়ে ফেরেন তারপর তিনি কী ইয়াদ রাখবেন তাঁকে? না কি চূড়ান্ত বরবাদির দিকে ঠেলে দেবেন? যে সিরাজদ্দৌলা মসনদে বসার পর থেকে মিরজাফর-রায়দুর্লভ-জগৎশেঠের বরবাদি চেয়ে এসেছেন তাঁকে কি বিশ্বাস করা যায়?
মাটিতে পড়ে থাকা নবাবের উষ্ণীষের দিকে চোখ গেল মিরজাফরের। তিনি ভাবলেন, এই মুহূর্তে লড়াইয়ের যা হকিকত তাতে এই উষ্ণীষ হয়তো উঠবে তাঁর মাথায়, মসনদে আসীন হবেন তিনি। শুধু কয়েক পল সময়ের অপেক্ষা। মসনদ মানেই তো তাগদ, জোশ, হুকুম, ক্ষমতা, ফরমান, শান, সওকত, রওশন। এই সুযোগ হেলায় হারাবেন মিরজাফর?
না! মিরজাফর মন শক্ত করলেন।
সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘আমি ভিখ মাঙছি আপনার কাছে। আমাকে মদত দিন।’
গম্ভীর গলায় মিরজাফর বললেন, ‘আমি কী করব হুজুর? সেনা চালনার জিম্মেদারি তো আমার হাতে আপনি দেননি।’
‘এই ওয়াক্তে সব কিছু আমি আপনার হাতে সঁপে দিলাম আমি।’
‘বেশ। ওয়াদা করলাম, মসনদের ইজ্জত রাখতে আমি ঘামাসান লড়াই করব।’
খুশিতে সিরাজদ্দৌলার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
মিরজাফর বললেন, ‘লড়াইয়ের কৌশলে গলত আছে। নতুন করে সবকিছু আবার সাজাতে হবে। বেলা ফুরিয়ে আসছে। আজ আর জেয়াদা ওয়াক্ত হাতে নেই। আজকের মতো লড়াই মুলতুবি রাখার হুকুম দিন আপনি, যাতে ফির কোয়ি গহেরা ঝটকা না আসে।’
বিস্মিত হন সিরাজদ্দৌলা। ‘এখন লড়াই থামিয়ে দেব?’
‘জি হুজুর। নয়া কৌশলে কাল লড়ব আমি। ইংরেজলোগদের বারদরিয়া পার করিয়ে দেব।’
হালসিবাগানে ভোর রাতের সেই ছবিটা ভেসে ওঠে সিরাজের চোখের সামনে। আতঙ্কিত গলায় ছেলেমানুষের ভঙ্গিতে নবাব শুধোন, ‘বেসহবত ইংরেজরা যদি ফির রাতে হামলা করে?’
‘এবার আর তেমন কিছু হবে না। তার জিম্মেদার থাকলাম আমি।’
মিরমদন আঘাত পেয়ে লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে চলে যাওয়ায় উল্লসিত হয়ে পড়েছিল ইংরেজবাহিনী। কিন্তু তাদের সাফল্যের এই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। মোহনলাল তাঁর বাহিনী নিয়ে ইংরেজদের উপর প্রবল আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দু-পাশ থেকে তাঁর সঙ্গে সমানে লড়ছেন মানিকচাঁদ, আবদুল হাদি খান ও বাহাদুর আলি খান।
একের পর এক গোরা পল্টন ও দেশি সেপাইরা মাটি নিচ্ছে। মিরমদন মারা যাওয়ার পর আমবাগানের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল ইংরেজসেনারা কিন্তু মোহনলালের আক্রমণের ঝাঁঝে ফের তারা পিছু হটে আমবাগানে ঢুকে পড়ে। তবুও নিস্তার নেই। সৈন্য নিয়ে আমবাগানের দিকে ধেয়ে আসছেন মোহনলাল। ওদিকে সমানে ফের তোপ দাগতে শুরু করেছেন সিনফ্রে। তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে পলাশির আমবাগান। মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ছে গাছের ডালপালা। মোহনলালের বাহিনীর বন্দুকের নিশানা আমগাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইংরেজ সেপাই-পল্টনদের খুঁজে নিচ্ছে।
ত্রস্ত হয়ে পরলেন ক্লাইভ, কিলপ্যাট্রিক ও আয়ারকুট। যে ঝাঁঝের সঙ্গে আক্রমণ শানাচ্ছেন মোহনলাল, তা আর ঘণ্টাখানেক জারি থাকলে পলাশি ছেড়ে পালাতে হবে ইংরেজদের।
অসহায় বোধ করলেন ক্লাইভ। আকাশের দিকে তাকালেন। বিকেলের আকাশে তখন নানা রঙের খেলা। এই মুহূর্তে বৃষ্টি নামার কোনও আশা নেই। বেলা শেষ হয়ে অন্ধকার নামতে এখনও ঢের দেরি। কী হবে তাহলে? পলাশিতে পরাজয় হবে ইংরেজদের? সুবে বাংলায় ব্যবসার আশা চিরকালের মতো শেষ হয়ে যাবে? আমবাগানের মধ্যে ক্রমাগত পিছু হটছে ক্লাইভের বাহিনী। ক্লাইভ অলৌকিক কিছুর প্রত্যাশা করছেন, যাতে লড়াইয়ে আজকের মতো ছেদ পড়ে।
যুদ্ধের ময়দানকে চিরকাল ভয় পেয়ে এসেছেন মানিকচাঁদ। কিন্তু আজ মোহনলালের পাশে দাঁড়িয়ে লড়ছেন বাহাদুরের মতো। প্রতিহিংসার আগুনে মানিচাঁদের চোখদুটো ধকধক করে জ্বলছে। বজবজের বেইজ্জতি ভুলতে চান মানিকচাঁদ। গলার শির ফুলিয়ে প্রবল আবেগে মানিকচাঁদ থেকে থেকে চিৎকার করে উঠছেন, ‘খতম কর, খতম কর বেতমিজ টোপিওয়ালাদের।’
সহসা এক ঘোড়সওয়ার হরকরা ছুটে এল মোহনলালের কাছে।
নবাবের হাতে লেখা চিরকুটটা দেখলেন মোহনলাল। নবাব লিখেছেন, ‘আজকের মতো লড়াই থামিয়ে ফৌজ নিয়ে ফিরে এসো।’ প্রবল বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে গেল মোহনলালের।
হরকরার উদ্দেশে বললেন, ‘এখন লড়াই থামানো যাবে না। নবাবকে জানাও আর কিছুক্ষণ লড়াই চালালেই জিৎ হাসিল হবে আমাদের। ইংরেজরা পিছু হটছে।’
ঘোড়া ছুটিয়ে দ্রুত ফিরে চলল হরকরা।
হরকরার মুখ থেকে মোহনলালের বার্তা শুনে মিরজাফরের দিকে তাকালেন সিরাজদ্দৌলা।
বুক ধুকপুক করতে লাগল মিরজাফরের। হরকরা যা বলছে, তা ভয়ংকর। এখনই লড়াই থামাতে না পারলে হেরে যাবে ইংরেজরা। তারপরে কী হবে? লড়াই থামানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি, পরে মোহনলাল ও সিরাজদ্দৌলা যে তাঁকে কোতল করে ছাড়বেন। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল মিরজাফরের।
সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘মোহনলাল লড়াই চালিয়ে যেতে চাইছেন, এ সময় লড়াই থামানোর কোশিস করা কি ঠিক হবে জনাব?’
‘এই মুহূর্তে যা করা উচিত বলে মনে হয়েছে, তাই বলেছি আপনাকে। লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা অনেকের থেকে আমার বেশি। তবে আপনি নবাব। হুকুমের মালিক। আপনার যা ভালো মনে হয়, তাই করুন।’ নাখোশ মেজাজে কথাগুলো বলে মিরনকে সঙ্গে নিয়ে নবাবের শিবির ছেড়ে চলে গেলেন মিরজাফর।
দিশেহারা হয়ে পড়লেন সিরাজদ্দৌলা। বিচার-বুদ্ধি গুলিয়ে গেল। সেই মুহূর্তে দীর্ঘদিনের শুভানুধ্যায়ী মোহনলালের বার্তার চেয়ে মিরজাফরের পরামর্শই গ্রহণযোগ্য বলে তাঁর মনে হল।
‘যুদ্ধ থামাও ফিরে এসো। মনে রেখো এটা নবাবের হুকুম’—এই বার্তা নিয়ে ফের হরকরা ছুটল মোহনলালের কাছে।
মিরজাফর ফিরে আসতেই, রায়দুর্লভ তাঁর কাছে ছুটে গিয়ে বললেন, ‘মোহনলাল একাই তো যুদ্ধটা জিতে নেবে বলে মালুম হচ্ছে। যে ভাবেই হোক এখনই লড়াইটা থামানো দরকার।’
মিরজাফর হতাশ গলায় বললেন, ‘সেই সলাই তো দিয়েছিলাম নবাবকে। নবাব সেই মতো বার্তাও পাঠালেন মোহনলালকে। লেকিন ইবলিশের বাচ্চা কাশ্মিরীটা শুনছে না।’
‘সর্বনাশ! ইংরেজদের বরবাদি এখন যে শুধু সময়ের অপেক্ষা।’
‘এখন কী করা উচিত? উপায় বাতলাল জনাব।’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘আমার মনে হয়, আর একটু দেখি। একেবারে জিত হাসিল হওয়ার মুখে ফৌজ নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ব আমরা। ইংরেজ লোগদের মেরেকেটে সাফ করে দেব। বোঝাতে হবে আমরা নবাবের অনুগত ছিলাম ও আছি।’
ফের মোহনলালের কাছে গিয়ে হাজির হল হরকরা। এবার চিরকুটটা না দেখেই ছুড়ে ফেলে দিলেন মোহনলাল। তখন লড়াই ফতে করার খুশবু ভেসে আসছে তাঁর নাকে। খানিকবাদে এসে হাজির হল আরেকজন হরকরা। এবারে লড়াই থামানোর জন্য আরো কড়া বার্তা দিয়েছেন নবাব। চরম বিরক্ত হয়ে ফৌজ ফিরিয়ে নিলেন মোহনলাল। রাগে তাঁর সারা শরীর কাঁপছে। ঠিক করলেন আজ শিবিরে ফিরে গিয়ে চরম বোঝাপড়া করবেন নবাবের সঙ্গে। কৈফিয়ত চাইবেন—আর আধঘণ্টা লড়াই চালালে যেখানে জিৎ হাসিল হয়, সেই অবস্থায় লড়াই থামিয়ে দিয়ে কেন ফিরে আসতে হল তাঁকে? জঙ্গ ফতে করা কৃতিত্ব মোহনলাল পাক, এটা কি নবাব চান না?
ওদিকে চোখ কচলে ক্লাইভ দেখলেন হঠাৎ পতাকা নাড়াচ্ছে নবাবের ফৌজ। যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার সংকেত। ক্লাইভ উল্লসিত। কী করে ঘটে গেল এই অলৌকিক কাণ্ড? মোহনলালের বাহিনীর দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে আসছিল তা বন্ধ হয়েছে। স্বস্তি-নিদারুণ স্বস্তি।
‘স্টপ ফায়ারিং।’ চেঁচিয়ে উঠলেন ক্লাইভ।
নিশ্চিত বিপর্যয়ের মুখে এসেও আপাতত বেঁচে যাওয়ায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ইংরেজ সৈন্যরা। ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়ল আমবাগানের ভিতরে।
আয়ারকুট ও কিলপ্যাট্রিককে ডেকে ক্লাইভ বললেন, ‘আপাতত সোলজারদের রেস্ট দরকার। ডেড অ্যাট নাইট উই উইল স্টর্ম নবাবস ক্যাম্প।’
সকালে জোর এক পশলা বৃষ্টিতে ভিজেছেন। তারপরে আষাঢ়ের ভ্যাবসা গরম। ঘেমেনেয়ে ক্লাইভের সারা দেহ থেকে দরদর করে জল ঝরছে। গায়ের পোশাক ভিজে সপসপে। আয়ারকুট ও কিলপ্যাট্রিকের হাতে বাহিনীর দায়িত্ব দিয়ে পোশাক বদলানোর জন্য শিকার বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন ক্লাইভ। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে শরীরটা। ঘরে ঢুকেই বিছানায় দেহ এলিয়ে দিলেন কর্নেল। কী হবে এই লড়াইয়ের ভবিতব্য, ভাবতে ভাবতে তাঁর চোখদুটো প্রায় বুজে এসেছিল, সহসা চমকে উঠলেন কামানের গর্জন শুনে। যুদ্ধ আজকের মতো থেমে গিয়েছে। তাহলে আবার কামানের গর্জন কেন?
ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন ক্লাইভ। বাইরে এসে দৃশ্যটা দেখে তার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। করছেন কী কিলপ্যাট্রিক? ঈশ্বরের দয়ায় যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি পেয়েছে ইংরেজ বাহিনী, প্রাণে বেঁচেছে ইংরেজরা, আর কিলপ্যাট্রিক কিনা এই শেষ বিকেলে যুদ্ধটাকে আবার খুঁচিয়ে তুলছে?
দূর থেকেই প্রবল রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন ক্লাইভ, ‘হে মিঃ কিলপ্যাট্রিক? হোয়াট আর ইউ ডুইং? ডু ইউ থিংক ওয়ারফিল্ড ইজ অ্যা প্লেস টু মেক ফান?’
ক্লাইভের চিৎকার কিলপ্যাট্রিকের কানে পৌঁছল না। কিলপ্যাট্রিক তখন ফরাসি গোলন্দাজ সিনফ্রের ছেড়ে যাওয়া ঢিবির মতো জায়গাটা দখল করে কয়েকজন গোরা পল্টনকে সঙ্গে নিয়ে নবাবের বাহিনীর দিকে কামান দাগতে ব্যস্ত।
‘করছ কী তুমি? থামো।’ এই বলতে বলতে কিলপ্যাট্রিকের কাছে ছুটে গেলেন ক্লাইভ। ঢিবির উপর উঠে ক্লাইভের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। যুদ্ধ থামিয়ে ক্লান্ত নবাবের সৈন্যরা ধীরে সুস্থে ফিরে যাচ্ছিল তাদের শিবিরের উদ্দেশে। হঠাৎ পিছন থেকে আক্রমণ করে সেই বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছেন কিলপ্যাট্রিক। দুর্ধর্ষ উপস্থিত বুদ্ধি।
ছত্রভঙ্গ হয়ে প্রাণভয়ে ছুটছে নবাবের সেনারা। নাটকীয়ভাবে প্রায় হারতে বসা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন কিলপ্যাট্রিক। মুহূর্তের মধ্যে নিজের গোটা বাহিনীকে আমবাগান থেকে টেনে বের করে পিছন থেকে নবাবের বাহিনীর উপর জোরাল আক্রমণ শানালেন ক্লাইভ। কিলপ্যাট্রিকের নেতৃত্বে গোলন্দাজ বাহিনী গোলা ছুড়তে ছুড়তে নবাবের ক্যাম্পের দিকে এগোতে লাগল।
যা আশঙ্কা করেছিলেন মোহনলাল সেটাই সত্যি হল। পিছন দিক থেকে ছুটে আসা বুলেট বিদ্ধ হয়ে মাটি নিলেন বাহাদুর আলি খান। হাহাকার পড়ে গেল গোটা বাহিনীর মধ্যে। যে যেদিকে পারে ছুটছে। এই ত্রস্ত বাহিনীকে ফের সংহত করে প্রতি আক্রমণ করা অসম্ভব। সর্বনাশ হয়ে গেল নবাবের নির্বুদ্ধিতায়। আর কিছু করার নেই।
ঘোড়ার গতিবেগ বাড়ালেন মোহনলাল। একটা বুলেট মোহনলালের কাঁধ ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। কোনওরকমে প্রাণে বাঁচলেন মোহনলাল। কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে অঝোরে। সেদিকে তাকানোর সময় নেই। পিছন থেকে ধেয়ে আসছে ইংরেজবাহিনী। শোনা যাচ্ছে তাদের চিৎকার, ‘ফায়ার! ফায়ার! কিল দ্য এনিমি।’ মোহনলালের তেজি উজবেক ঘোড়া আরও গতি বাড়াল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেন মোহনলাল।
একটা কোলাহলের আওয়াজ কানে আসতে তাঁবুর ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন সিরাজদ্দৌলা। এ কী কাণ্ড! শিউরে উঠলেন তিনি। ছত্রভঙ্গ তার বাহিনী। সেপাই-পেয়াদারা আতঙ্কে চিৎকার করছে, ‘ভাগো! ভাগো!’
পিছন থেকে ধেয়ে আসছে ইংরেজ সেনা। একের পর এক অসহায় সেনা বুলেট বিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। সিরাজদ্দৌলা বুঝলেন মিরজাফরের কথা শুনে যুদ্ধ বন্ধ করার হুকুমত দিয়ে নিজের কী সর্বনাশ তিনি ডেকে এনেছেন। ত্রাসের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে শাহি তাঁবুতেও। গোলাম, দাখিলা, হাজিরা বাঁদি সবাই ছুটে পালাচ্ছে। সিরাজদ্দৌলা বুঝলেন আর একমুহূর্তও এখানে থাকা নিরাপদ নয়। উটের পিঠে চেপে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা।
নবাবের গোটা সেনা ছাউনি সুনসান। পড়ে রইল শুধু যুদ্ধের রসদ।
আনন্দে লাফাচ্ছে গোরা পল্টনরা। জিৎ হাসিল হয়েছে। পালিয়ে গিয়েছেন নবাব। বিরাট একটা ইউনিয়ন জ্যাক হাতে নিয়ে পাগলের মতো পলাশির প্রান্তরে দৌড়ে বেড়াচ্ছে স্ট্রন। গলায় ঝোলানো জেসাসের লকেটটাকে বারবার চুম্বন করছে আয়ারকুট ও কিলপ্যাট্রিক।
আর কর্নেল ক্লাইভ? হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছেন মাটিতে। আকাশের দিকে মুখ তুলে মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত শূন্যে ছুড়ে দিয়ে সুক্রিয়া জানাচ্ছেন ভাগ্যদেবীকে।
কিলপ্যাট্রিক ও আয়ারকুট হতবাক। কর্নেলের আবেগের বহিঃপ্রকাশ তাঁরা আগে কখনও দেখেননি। সামনে ঝুঁকে পড়ে রক্তস্নাত পলাশির মাটিকে চুম্বন করলেন কর্নেল ক্লাইভ। এখন আর রবার্ট ক্লাইভ শুধু কর্নেল নন, ব্যারন অফ প্ল্যাসি।
