ফলতা থেকে পলাশি – ৬৩

৬৩

মিটিঙের শুরুতেই ক্লাইভ বললেন, ‘নাউ উই হ্যাভ টু টেক অ্যা ফার্ম ডিসিশন। এক সপ্তাহের উপর হয়ে গেল মিরজাফরের দিক থেকে কোনও কমিউনিকেশন নেই। নবাবের সঙ্গে গদ্দারির পথ থেকে তিনি সরে গেলেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না।’

 ‘চিঠি না পাওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। এমন তো হতে পারে, নবাব তাঁকে ক্লোজ ওয়াচে রেখেছেন। তিনি চিঠি পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছেন না।’

আয়ারকুটের কথা শুনে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘এই আন্দাজ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

মেজর কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘সামনে পথ এখন দুটো। হয় মিরজাফরের উপর ভরসা রেখে ঝুঁকি নিয়ে আমাদের এগোতে হবে, আদারওয়াইজ উই হ্যাভ টু ওয়েট হিয়ার ফর দ্য হোল রেইনি সিজন।’

আবাক হওয়া মুখ করে আয়ারকুট শুধোলেন, ‘এই কাটোয়া দুর্গে ওয়েট করতে হবে আমাদের?’

‘ইয়েস।’

‘এতে কী ফায়দা হবে?’

‘প্রেসার ট্যাকটিকস। নবাবের উপর চাপ সৃষ্টি।’

কিলপ্যাট্রিকের কথাটা আয়ারকুটের ঠিক মনঃপুত হল না। গুম হয়ে বসে রইলেন তিনি।

ক্লাইভ প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার কী ওপিনিয়ন জেমস?’

জবাবে কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘আমার মনে হয় কাটোয়া দুর্গে বসে থেকে নবাবের উপর প্রেসার ক্রিয়েট করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে উপযুক্ত স্ট্র্যাটেজি হবে।’

‘তার মানে তুমি বলতে চাইছ মিরজাফর মাইন্ড চেঞ্জ করল কি না সে বিষয়ে সিওর হয়েই আমরা এগোব। তাই তো?’

‘এগজ্যাক্টলি। এতে রিস্ক ফ্যাক্টর কম।’

ওয়াটস, কালেট ও সাইকসও এই তত্ত্বে সায় দিলেন।

মেজর আয়ারকুটের দিকে তাকালেন ক্লাইভ।

আয়ারকুট বললেন, ‘মিরজাফরের চিঠি আমরা অনেকদিন পাইনি একথা ঠিক। তার মানে এই নয় যে তিনি মাইন্ড চেঞ্জ করেছেন।’

‘দ্যাট ইজ অলসো ট্রু।’ মাথা নেড়ে বললেন ক্লাইভ।

‘আমার মনে হয় এখনই আমাদের সামনে এগোনো উচিত। পরপর সব যুদ্ধে আমরা জিতেছি। মোর্যাল অফ দ্য ট্রুপ ইজ অ্যাট ইটস পিক নাউ। মিরজাফর খাঁর হেল্প না পেলেও আমরা জিতে যাব।’

আয়ারকুটের কথা শুনে ওয়াটস প্রবল বেগে মাথা নেড়ে বললেন, ‘ইট ইজ অ্যান আবসার্ড আইডিয়া। নবাবস আর্মি ইজ হিউজ।’

ওয়াটসের বিরোধিতা করে ক্যাপ্টেন গ্র্যান্ট বললেন, ‘উই মাস্ট হ্যাভ ফেইথ ইন আওয়ার ওন স্ট্রেনথ।’

আয়ারকুট বললেন, ‘লড়াই যদি নাই হয়, তাহলে এখানে বসে থাকব কেন? কলকাতায় ফিরে গিয়েও তো চিঠি লিখে নবাবের উপর চাপ তৈরি করা যায়।’

ওয়ালস বলে উঠলেন, ‘বলছেন কী? কাটোয়া পর্যন্ত এসে আমরা যদি কলকাতা ফিরে যাই, তাহলে তো আমাদের মুখ পুড়বে। ইট উইল বি অ্যা গ্রেট শেম ফর আস।’

‘মুর্শিদাবাদে যাওয়ার সাহস না করে এখানে বসে থাকাটা উইল বি মোর শেমফুল ফর আস।’

দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ল ইংরেজ শিবির। দুপক্ষেরই বাদানুবাদে তপ্ত হয়ে উঠল মিটিঙের আবহ। কোনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছনো গেল না। তবে একটা বিষয়ে একমত হল সবাই। কর্নেল ক্লাইভ যা ডিসিশন নেবেন সকলেই তা মেনে নেবে।

মিটিং হল থেকে বেরিয়ে এসে কেল্লার ভিতরে খোলা চত্বরে গম্ভীর মুখে পায়চারি করতে লাগলেন ক্লাইভ। মনের ভিতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। আগে অনেকবার কঠিন সময়ে বুক চিতিয়ে দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবারে পারছেন না। এবারের প্রেক্ষিত যে ভয়ানক কঠিন। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুবে বাংলায় ইংরেজদের কারবারের ভবিষ্যৎ। হয় চূড়ান্ত সাফল্য, না হলে চিরকালের মতো বরবাদি। অতএব পা ফেলতে হবে খুব সাবধানে।

ঠোঁটে জ্বলন্ত পাইপ। হাতদুটো কোমরে। ধীর পদক্ষেপে এদিক-ওদিক করছেন ক্লাইভ। গভীর চিন্তায় মগ্ন। হঠাৎ হাঁক ছাড়লেন কর্নেল, ‘মুনশি!’

‘হুজুর!’ ছুটে এলেন নবকৃষ্ণ।

‘নবকিসেন, আমি মনে করি, ইউ আর অ্যা ভেরি ওয়াইজ পার্সন। অ্যা গুড ডিপ্লোম্যাট। বলো তো কী করা উচিত আমার? এগোব? না গোটা মনসুন ওয়েট করব এখানে?’

নবকৃষ্ণ বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘আমি আর কী করব হুজুর? তবে লোকে বলে, লোহা গরম থাকতে থাকতেই ঘা মারা উচিত।’

নবকৃষ্ণের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘জুড়নো লোহা ঘা মারলে কী ইচ্ছেমতো বেঁকানো যায় সাহেব? তাই বলছিলাম, এখনই হামলা করলে ক্ষতি কি?’

‘যদি মিরজাফর পিছিয়ে যান? আমার সঙ্গে মাত্র হাজার তিনেক সৈন্য আছে। নবাবের বাহিনী বিরাট।’

‘নবাবের ফৌজ তো ঢোঁড়া সাপ। আকারেই খালি বড়। বিষ নেই।’

‘হুম।’ গম্ভীর হয়ে গেলেন ক্লাইভ। ফের পায়চারি করতে লাগলেন।

পরপর সাফল্য পেয়ে উত্তেজনায় ফুটছে সৈন্যরা। যুদ্ধ না করে এখানে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লে তাদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে। কথাটা ঠিকই। তারা মনে করবে তাদের উপরে কর্নেলের ভরসা নেই। এতে টাল খাবে আর্মির কনফিডেন্স। এটা কি ভালো? ভাবতে থাকেন ক্লাইভ।

গোটা বর্ষাকাল চুপ করে বসে থাকলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে না তো? ততদিনে নবাব হয়তো অন্য মিত্র পেয়ে যাবেন। পাটনা থেকে ফিরে এসে কুশলী জাঁ ল যোগ দিতে পারেন নবাবের সঙ্গে। ফরাসিদের যুদ্ধ জাহাজ এসে পড়তে পারে বাংলায়।

হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ঠোঁট থেকে পাইপটা হাতে নিয়ে মেজর ও ক্যাপ্টেনদের ডেকে পাঠালেন ক্লাইভ। ছুটে এসে তাঁরা কর্নেলের সামনে অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়াল।

মুচকি হেসে ক্লাইভ বললেন, ‘আই হ্যাভ মেড মাই মাইন্ড ক্লিয়ার।’

সকলের মধ্যে উৎকণ্ঠা।

ক্লাইভ বললেন, ‘চলো সামনে এগোব। এখনই।’

‘ইয়েস স্যার!’ উল্লাসে প্রায় ফেটে পড়লেন আয়ারকুট।

নিমেষে বার্তাটা ছড়িয়ে পড়ল, ফৌজের সেপাই-পল্টনদের মধ্যে। সামনে এগোতে হবে। এখনই লড়াই হবে। যুদ্ধাভিযানের উত্তেজনায় মেতে উঠল গোটা বাহিনী। যারা বলেছিলেন কাটোয়ায় বসে বর্ষাকালটা কাটানো হোক, তারাও আবেগে ফুটতে লাগলেন। আসলে ক্লাইভকে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তে দেখে অনেকে ভেবেছিলেন, কর্নেল বোধ হয় এখনই যুদ্ধ চাইছেন না, তাই তার মন জুগিয়ে কথা বলার জন্য কাটোয়ায় অপেক্ষার তত্ত্বে তারা সায় দিয়েছিলেন, কিন্তু অবচেতনে প্রায় সকলেই চাইছিলেন যুদ্ধ।

গোটাবাহিনীর উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখে ক্লাইভ নিশ্চিত হলেন যে, অপেক্ষার চেয়ে সামনে এগোনোই এই মুহূর্তে সঠিক ডিসিশন। কোনও ভুল তিনি করছেন না। ভাগ্যদেবী তাঁকে দ্রুত যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছেন। চিরকাল যুদ্ধক্ষেত্রে ভাগ্যদেবীর মদত পেয়ে এসেছেন কর্নেল ক্লাইভ। তাঁর মনে দৃঢ় বিশ্বাস দানা বাঁধল— এবারেও জিত হাসিল হবে।

নবাবের তাঁবু পড়েছে রাজধানী শহরের বাইরে। সকলে বুঝল, সত্যিই এবার যুদ্ধে চলেছেন নবাব।

উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে চকবাজার। জায়গায় জায়গায় গুঞ্জন আলোচনা। এবার আর গুজব নয়, সত্যি। ফৌজ নিয়ে কর্নেল ক্লাইভ এগিয়ে আসছেন মুর্শিদাবাদের দিকে। ইংরেজদের মোকাবিলা করার জন্য নবাবের কাফেলা ছাউনি ফেলতে চলেছে পলাশিতে।

গো-গাড়ির চাকার ঘড়ঘড় শব্দে সচকিত হয়ে উঠল চকবাজারের পাথরে মোড়া পথ। একটার পর একটা রসদের গাড়ি, কামানের গাড়ি, ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে ত্রিপলিয়া তোরণদ্বারের দিকে। পিছনে শুঁড় দোলাতে দোলাতে এগোচ্ছে বেহেদর, রাজতুম জাতের পাহাড়ের মতো বিশাল বিশাল হাতিগুলো। হাতির পিঠে ও মাথায় লোহার বর্ম। দাঁতে বাঁধা রয়েছে দুদিকে ধারযুক্ত সমসের। যুদ্ধক্ষেত্রে মত্ত অবস্থায় হাতির দল বেকায়দা ছন্দে মাথা নাড়ালে সামনে এসে পড়া আদমি ফালাফালা হয়ে যাবে। হাতিগুলোর কানও বর্মে ঢাকা। যাতে লড়াইয়ের ময়দানে গোলা ফাটার তীব্র আওয়াজে ঘাবড়ে গিয়ে হাতিগুলো এলোমেলো দৌড় না লাগায়।

পর পর সারিবদ্ধ ভাবে হাতিগুলো চলেছে। তার পিছনে ঘোড়সওয়ার আহেদির দল। রাস্তার পাশে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে মেহেন্দি রাঙানো দাড়িতে হাত বোলাচ্ছিল নিজামুদ্দিন। প্রতিশোধ স্পৃহায় চোখদুটো তার ধকধক করে জ্বলছে। নিজামুদ্দিনের মন বলছে এবারে ঢিট হবে নিজামত। ঘায়েল হবে তাঁর ঔদ্ধত্য।

ওই যে মোহনলাল, সুবে বাংলার দেওয়ান। হাতির পিঠে চেপে পলাশির পথে চলেছে। সেই মোহনলাল। আলিবর্দির পেয়ারের নাতি ও তাঁর জিগরি দোস্ত মোহনলাল, মির্জা মেহেদির খামখেয়ালিপনায় নৌকোডুবি হয়েছিল ভাগীরথীতে। নিজামুদ্দিন সাঁতরে বেঁচে উঠলেও তলিয়ে যায় তার বিবি, যার অন্দরে বেড়ে উঠছিল একটা প্রাণ, নিজামুদ্দিনের রক্তের উত্তরাধিকার।

আজ হাওদায় আসীন দেওয়ান মোহনলালকে দেখে হঠাৎ যেন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল নিজামুদ্দিনের মাথায়। স্থান, কাল, বাস্তব চেতনা হারিয়ে ফেলে রাস্তার পাশ থেকে একটা পাথরের ঢেলা কুড়িয়ে নিয়ে নিজামুদ্দিন সজোরে ছুড়ে মারল মোহনলালের মাথা লক্ষ্য করে। মুহূর্তে সচকিত হয়ে মাথা সরিয়ে নিলেন মোহনলাল। পাথর লক্ষ্যভ্রষ্ট হল।

আচমকা ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় হইহই করে ওঠে লোকজন। ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকা নিজামতের গুপ্তচরদের হাতে ধরা পড়ে গেল নিজামুদ্দিন। ছুটে এল কোতোয়ালের বাহিনী। ধরপাকড়ের ভয়ে রাস্তার পাশে জমাট বাধা ভিড় এক নিমেষে হালকা। সকলের সমুখে রাজপথ দিয়ে নিজামুদ্দিনকে টেনে হিঁচড়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় কোতয়ালির সেপাইরা। খাঁচায় বন্দি বাঘের মতো গজরাতে থাকে বাগি নিজামুদ্দিন—’বরবাদ হয়ে যাবে এই নিজামত। জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাবে!’

খুচরো ঝামেলার জন্য থমকে গিয়েছিল কাফেলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। কাফেলা ফের পথচলা শুরু করে।

হিরাঝিল প্রাসাদে তুমুল ব্যস্ততা। পলাশির উদ্দেশে যাত্রা করবেন সিরাজদ্দৌলা। দেউড়িতে প্রস্তুত হয়ে আছে হাতি। নবাবের সব সরঞ্জাম গুছিয়ে নেওয়া হল কিনা তা খুঁটিয়ে দেখার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে গোলাম-দাখিলা-বাঁদিদের মধ্যে।

দেওয়ালজোড়া বেলজিয়াম কাচের মস্ত আরশির সামনে এসে দাঁড়ালেন সিরাজদ্দৌলা। মাথায় তরন্দাম মসলিনের উষ্ণীষ। তার গায়ে রুপোর সুতো দিয়ে বোনা রয়েছে কয়েক ছড়া মুক্তো। উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়াচ্ছে উষ্ণীষে গাঁথা হিরকখণ্ড। গলায় হিরে ও মুক্তোর মালা। বুক ও দুই বাহু ইস্পাতের বর্মে আবৃত। কোমর থেকে প্রায় পা পর্যন্ত ঝুলছে লম্বা তরবারি।

আরশি জুড়ে ঝলমল করছেন নবাব। নিজের প্রতিবিম্বের দিকেই স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন সিরাজদ্দৌলা। নিজের ছায়াকে ইয়াদদস্ত করে মনে মনে বললেন, তুমি সিরাজদ্দৌলা। সুবে বাংলার নবাব। আলিবর্দি খাঁর খুন বইছে তোমার শরীরে। লেকিন ভয়ের দাস হয়ে পড়ছ কেন তুমি? কীসের ভয়? মনে রেখো, মসনদ শুধু কাবিল-ই-ইনসানকে চায়। সব দুর্বলতা-উৎকণ্ঠা ঝেড়ে ফেল এই ওয়াক্তে। নিজের অতীতের দিকে ফিরে তাকাও। সাহসের সঙ্গে ঘসেটি বেগমকে তুমি দমন করেছ, কলকাতার প্রথম যুদ্ধে ইংরেজদের ঘায়েল করেছ, পূর্ণিয়ার লড়াই ফতে করেছ। হালসিবাগান থেকে ফিরেছিলে শূন্য হাতে। সে তো তোমার নিজের বেওকুফিতে। তারপর থেকে হারিয়ে গিয়েছে তোমার আত্মবিশ্বাস, জোশ, ঘমন্ড। এবারে মন শক্ত করে এবারে রুখে দাঁড়াও। এই লড়াইটা তোমায় জিততেই হবে।

‘মির্জা!’ উদ্ভ্রান্তের মতো ঘরে প্রবেশ করেন আমিনা বেগম।

‘আম্মিজান!’ হুঁশ ফেরে সিরাজদ্দৌলার।

‘মির্জা! বেটা আমার!’ আমিনা বেগম ছুটে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ছেলের কপালে, গালে ঘনঘন চুমু খেতে থাকেন। তারপর হঠাৎই ছেলের বুকে মাথা রেখে ভেঙে পড়েন কান্নায়।

সিরাজ মৃদু গলায় বলে, ‘ডরোমাত আম্মিজান। আমি লড়াইয়ে কামেয়াব হয়ে ফিরব।’

‘মির্জাকে দুর্বল করে দিস না আমিনা।’ ঘরে প্রবেশ করে সহসা কথাটা বলে ওঠেন শরফ উন্নেসা।

মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে সিরাজ ফের বলেন, ‘ভেবো না আম্মিজান। আমি ঠিক জিৎ হাসিল করে ফিরব।’

শরফ উন্নেসা বললেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি জঙ্গ ফতে করবে মির্জা। আমার সে উম্মিদ আছে। ইয়াদ রেখো, টানা বারো সাল বর্গি হামলার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল তোমার নানাজিকে। কখনও উনি হাল ছাড়েননি, সাহস হারাননি। মনের জোরে বারবার তিনি কামেয়াবি হাসিল করেছিলেন।’

‘এসব কথা আমার মনে থাকবে নানি বেগম। তোমরা ভেব না। ইংরেজদের সবক শিখিয়ে আমি ফিরে আসব। বেতমিজ টোপিওয়ালাদের এবারে বার দরিয়া পার করিয়ে দেব। আম্মিজান শুধু শুধু ভয় পাচ্ছে। তুমি একটু বোঝাও নানি বেগম।’ এই বলে হাঁটু মুড়ে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে মা ও দিদিমার পদচুম্বন করলেন সিরাজদ্দৌলা।

সকাল থেকে লুৎফার মুখ ভার। তাঁর তীব্র অভিমান হয়েছে। নবাবের সঙ্গে সে পূর্ণিয়ায় গিয়েছে, কলকাতায় গিয়েছে কিন্তু এবারে তাঁকে কেন সঙ্গে নিচ্ছেন না নবাব। জানলার পাশে বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়েছিল লুৎফা। নকশাদার জাফরি গলে একফালি আলো এসে পড়েছে তাঁর মুখে।

ঘরে ঢুকে মুগ্ধ হয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা। বিষণ্ণতার রূপও বুঝি এত সুন্দর হয়?

ধীর পায়ে হেঁটে এসে লুৎফার পিঠে হাত রাখলেন নবাব। সহসা চমকে গিয়ে মুখ ফেরায় লুৎফা।

‘কে? ও! মেহের আপনি?’

সিরাজদ্দৌলা দেখলেন লুৎফার চোখে টলটল করছে জল।

‘আমি যাচ্ছি লুৎফা। এবারে যাত্রা শুরু করতে হবে।’

‘কেন সঙ্গে নিলেন না আমাকে?’ চোখ থেকে ঝরে পড়ল এক বিন্দু মুক্তো।

‘আমি তো খুব দূরে কোথাও যাচ্ছি না। এবার তো ঘরেই লড়াই।’

‘আপনার জন্য আমি যে ভেবে ভেবে মরব।’

‘পলাশি কত আর দূর? কাসিদের মুখে তুমি রোজই আমার খবর পাবে।’

‘আমার ভয় করছে মেহের। অনেকে বলছে এবারের লড়াই নাকি বহুত খতরনক।’

মুচকি হেসে সিরাজ বলেন, ‘তুমি আর আম্মিজান একই রকম। বড্ড নাজুক।’

‘আমি তো থাকব না, নিজের উপর খেয়াল রাখবেন আপনি। জঙ্গ ফতে করে জলদি ফিরে আসবেন।’

কথা বলতে বলতে গলা বুজে আসে লুৎফার। দেওয়ালের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে সে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে।

‘আব-বা-! আব-বা!’ বলতে বলতে টলমলে পায়ে হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে আসে উম্মেসায়েরা।

লুৎফা চোখের জল মোছে।

সিরাজ ছুটে গিয়ে মেয়েকে কলে তুলে নিলেন। খিলখিল করে হেসে উঠল উম্মেসায়েরা। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে মেয়ে। সে তার দুধে দাঁত দিয়ে নবাবের কণ্ঠহারের ঝকমকে মুক্তোর দানা কামড়াতে যায়। মেয়েকে বুকের মধ্যে চেপে ধরেন সিরাজদ্দৌলা। নবাবের দুই চোখ থেকে জলের ধারা নেমে আসে।

এবারে যেতে হবে। কয়েকদিন দেখা হবে না মেয়ের সঙ্গে। এটাই সেই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি করে বাজছিল সিরাজের মনে। কপালে চুমু খেয়ে মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে দিলেন সিরাজদ্দৌলা।

লুৎফা ডাকে, ‘আয় আয়! আমার কাছে।’

ঘাঘরা পরা ঠিক যেন ছোট্ট একটা কলের পুতুল। টলমল পায়ে লুৎফার দিকে ছুটে যায় উম্মেসায়েরা। তাকে কোলে তুলে নিয়ে আদরে আদরে ভরিয়ে তোলে লুৎফা।

সহসা কাড়া-নাকাড়ার-দিগর-শিঙার শব্দে কেঁপে উঠল হিরাঝিল প্রাসাদ। অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে এসে হাতির পিঠে চেপে বসলেন নবাব। মাহুত অঙ্কুশের আঘাত করতেই চলতে শুরু করল হাতি। হিরাঝিলের দেউড়ি পেরিয়ে রাজপথে এসে পড়লেন নবাব। লুৎফার কোলে অলিন্দ থেকে হাত নাড়ছিল উম্মেসায়েরা। নবাব দেখতে পেলেন না।

১৭৫৭ সালের ২২ জুন।

সকাল থেকে মালপত্র বোঝাই করা হচ্ছে নৌকোয়। কাটোয়ার ঘাটে বড্ড ব্যস্ততা। নদী পার হয়ে ওপারে যাবে ইংরেজ বাহিনী। বিকেলের দিকে নদীর ঘাটে এসে উপস্থিত হলেন কর্নেল ক্লাইভ। নৌকোয় উঠতে যাবেন, এমন সময় প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হলেন নবকৃষ্ণ।

অবাক হলেন ক্লাইভ শুধোলেন, ‘কী ব্যাপার মুনশি?’

উত্তেজনায় হাঁপাতে হাঁপাতে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘মিরজাফরের চিঠি এসেছে হুজুর। এইমাত্র হরকরা এসে পৌঁছেছে। আপনার অনুমতি ছাড়াই চিঠিটা খুলে আমি পড়েছি। মাফ করবেন।’

‘কী লিখেছেন মিরজাফর?’

‘দুশ্চিন্তার কিছু নেই।’ একগাল হেসে বললেন নবকৃষ্ণ।

নবকৃষ্ণর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে দ্রুত চোখ বোলালেন ক্লাইভ। মিরজাফর লিখেছেন, ‘…আপনি কাটোয়া দুর্গ দখল করেছেন জেনে খুশি হলাম। নবাব পলাশির দিকে এগোচ্ছেন। হয়তো মানকরায় তাঁবু ফেলবেন। আপনি দ্রুত এগিয়ে আসুন। আপনি এগিয়ে এলেই আমি ফৌজ নিয়ে আপনার সঙ্গে যোগ দেব।…’

মিরজাফরের মতিগতি সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হলেন ক্লাইভ।

গোটা ফৌজ ও লটবহর নিয়ে নদী পেরোতে রাত গভীর হয়ে গেল। মাথার উপর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। নদীর ঘাট থেকে বেশ কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে ক্লাইভ তাঁর বাহিনী নিয়ে পলাশিতে পৌঁছলেন। ইংরেজদের চোখে পড়ল চার-পাচ ফুট উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে এক আমবাগান।

বাগানের পাশে রয়েছে পাঁচিল ঘেরা একটা পাকা বাড়ি। এ হল আলিবর্দির আমলে নির্মিত পলাশির সেই শিকার বাড়ি। যে বাড়ির সঙ্গে সিরাজের শৈশব ও কৈশোরের অনেক মেদুর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। ক্লাইভ আশ্রয় নিলেন ওই বাগানবাড়িতে। ঠিক হল, আপাতত এই বাড়িটাই হবে তাঁর ক্যাম্প অফিস।

রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে দূর থেকে ভেসে আসছে ঢাক আর শিঙার শব্দ। সচকিত হয়ে উঠলেন ক্লাইভ। খানিকবাদে গুপ্তচর এসে জানাল, ‘হুজুর, নবাবের ফৌজ পলাশিতে পৌঁছে গিয়েছে। মাইল দুয়েক দূরে ছাউনি ফেলে অপেক্ষা করছে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *