ফলতা থেকে পলাশি – ৬২

৬২

গভীর রাতে অগ্রদ্বীপে পৌঁছলেন ওয়াটস ও তাঁর দুই সঙ্গী সাইকস ও কালেট। ঘাটে বাঁধা রয়েছে কয়েকটা নৌকো। হাঁকডাক করে ঘুমন্ত মাঝিমাল্লাদের ডেকে তুললেন তাঁরা। এত রাতে মাঝিমাল্লারা নৌকো বাইতে নারাজ। মোটা টাকার প্রলোভন দেখিয়ে অনেক কষ্টে কয়েকজনকে রাজি করালেন ওয়াটস।

পূর্ণিমার রাত। ঝকঝকে আকাশ। চরাচর ভেসে যাচ্ছে হলুদ জ্যোৎস্নায়। বন্দুক হাতে সতর্ক হয়ে বসে আছেন ওয়াটস, সাইকস ও কালেট। ছলাৎ ছলাৎ করে জল কেটে এগোচ্ছে নৌকো। সারাদিন দৌড়ঝাঁপের ধকলে ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে শরীর। নদীর বুক ছুঁয়ে আসা শীতল বাতাসে আরামের আমেজ। কিছুক্ষণ পর তিন সাহেবেরই হাতের বন্দুক শিথিল হয়ে গেল। ঘুমে ঢলে পড়লেন তাঁরা।

১৭৫৭ সালের ১৪ জুন।

পাখির ডাকের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙল ওয়াটসের। ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখলেন, ভোরের আলো সবে ফুটেছে। বন্দুক পাশে রেখে অঘোরে তখনও ঘুমোচ্ছেন সাইকস ও কালেট। অগ্রদ্বীপ থেকে কত দূরে চলে এসেছেন ঠাহর করতে পারলেন না ওয়াটস। সুবে বাংলায় সব নদীরই দুই কুল মাঝ নদী থেকে একই রকম দেখায়। শুধু সবুজ আর সবুজ।

কাশিমবাজার থেকে দ্রুত পালিয়ে আসতে বলেছিলেন কর্নেল। লিখেছিলেন, পথেই দেখা হয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় কর্নেল? ওয়াটসের মনে হল, ঘুমিয়ে পড়ায় পথে ক্লাইভের শিবির পার হয়ে চলে আসেননি তো? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? নদীর তীরে যেখানেই ছাউনি পড়ুক না কেন, নদীতে ফৌজিদের রাতপাহারার নৌকো থাকার কথা। এত রাতে মুর্শিদাবাদের দিক থেকে ভেসে আসা কোনও নৌকো দেখলে তারা কি পথ আটকাত না?

তবুও ওয়াটস শুধোলেন মাঝিকে, ‘পথে কোনও সেনাছাউনি দেখেছ?’

‘আজ্ঞে না হুজুর।’

‘কোথায় এলাম বলো তো?’

‘খানিক দূরে কালনা।’

গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে ওয়াটস সামনের দিকে চেয়ে রইলেন। আরও ঘণ্টাখানেক এগোনোর পর তাঁর চোখে পড়ল নদীর চরে সারি সারি তাঁবু। কাছেই নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে জিনিসপত্রে বোঝাই কুড়ি-পঁচিশটা নৌকো। নৌকোগুলোর প্রত্যেকটারই মাথায় উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক।

হাসি ফুটল ওয়াটসের মুখে। মাঝির উদ্দেশে বললেন, ‘ওই তাঁবুগুলোর কাছে নৌকো ভেড়াও।’

এতটা নিরাপদে যে কর্নেলের ক্যাম্পে পৌঁছে যাওয়া যাবে, ওয়াটস আশাই করেননি। ঠেলা দিয়ে কালেট ও সাইকসকে ঘুম থেকে তুললেন তিনি।

ধড়ফড় করে উঠে বসে সাইকস ও কালেট উল্লাসে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ওই তো! ওই তো কর্নেলের ক্যাম্প!’

রোজকার নিয়ম মতো ফৌজি ব্যান্ডে বাজছে রুল ব্রিটানিয়া। তিনজনেই নৌকোর উপর দাঁড়িয়ে চরম আবেগে রুল ব্রিটানিয়ার সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হেড়ে গলায় গান ধরলেন।

‘রুল ব্রিটানিয়া! ব্রিটানিয়া! রুল দ্য ওয়েভস।

ব্রাইটনস নেভার, নেভার, নেভার শ্যাল বি স্লেভস।…’

মুর্শিদাবাদের দিক থেকে ভেসে আসা নৌকোটাকে আটকানোর জন্য বন্দুক হাতে প্রস্তুত হচ্ছিল পাহারায় নিযুক্ত ফৌজিরা। হঠাৎ রুল ব্রিটানিয়ার কোরাস শুনে থমকে গেল তারা। সেনাছাউনির কাছেই রয়েছে ভাঙাচোরা একটা ঘাট। নৌকো সেই ঘাটের দিকে ভেসে চলল। গলুইয়ের উপর দাঁড়িয়ে ইউনিয়ন জ্যাক ওড়াতে লাগলেন উইলিয়াম ওয়াটস।

‘ইয়ে সচ বাত?’ নারান সিং-এর মুখ থেকে খবরটা শুনে চমকে উঠে প্রশ্ন করলেন সিরাজদ্দৌলা।

‘জি হুজুর! বিলকুল সহি সমাচার। মাদিপুরে শিকারে যাওয়ার নাম করে দুই শাগরেদকে নিয়ে ভেগেছেন ওয়াটস সাহেব।’

‘কোথায় গিয়েছেন?’

‘আমার আন্দাজ গিয়েছেন কালনায়।’

‘কালনা?’ খানিকটা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন নবাব। ওয়াটস কেন যে কালনায় পালিয়ে যাবেন তার আন্দাজ তিনি পাচ্ছেন না। নবাবের সমুখে বসে থাকা মোহনলালও বিস্মিত।

নারান সিং বলল, ‘গতকাল কালনায় ছাউনি ফেলেছেন কর্নেল ক্লাইভ। ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে আসছেন।’

চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল সিরাজদ্দৌলার। বুঝলেন সত্যিই এবারে ঝড় আসছে।

নারান সিং বিদায় নেওয়ার পর অস্থির গলায় নবাব শুধোলেন, ‘এখন কী করা যায় মোহনলাল?’

‘অবিলম্বে পলাশিতে ছাউনি ফেলতে হবে আমাদের। আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না হুজুর।’

স্বস্তি নেই সিরাজদ্দৌলার। ইংরেজদের সঙ্গে লড়াইটা এড়াতে পারলেন না। ইংরেজ-বণিকের দল যে কতটা খতরনক তা এখন হাড়ে হাড়ে তিনি বুঝতে পারছেন। ভয়ানক ধূর্ত লোক কর্নেল ক্লাইভ। তিনি যে ধোঁকা দেওয়ার জন্যই চন্দননগর থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার চালটা চেলেছিলেন, একথাও স্পষ্ট হয়ে গেল নবাবের কাছে।

ভয়ানক আফশোস হতে লাগল সিরাজদ্দৌলার। কেন গ্রেপ্তার করলেন না, ওয়াটস, কালেট ও সাইকসকে? তিনজনকে কয়েদ করে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিলে হয়তো ইংরেজ ফৌজকে মুর্শিদাবাদের দিকে আসা থেকে নিরস্ত করা যেত। এখন লড়াইয়ের ময়দানে গিয়ে ইংরেজদের মোকাবিলা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

ইংরেজবাহিনীর সামরিক শক্তির ভয়ে ততটা ভীত নন নবাব। তাঁর ভয় ক্লাইভের কূটবুদ্ধিকে, তার চেয়েও বেশি ভয় নিজের শিবিরে অন্তর্ঘাতের সম্ভাবনাকে। সিরাজদ্দৌলা ভালোই জানেন তাঁর গোটা রিসালা জানকবুলের কসম খেয়ে লড়াই করলে জিৎ হাসিল একেবারে সুনিশ্চিত। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে গিয়ে মিরজাফর-রায়দুর্লভ-জগতশেঠ-ইয়ারলতিফ খাঁ-এরা যে কী করবেন, সেটাই ভাবনার বিষয়।

তবে একথাও ঠিক যে মোহনলাল ও মিরমদনের বাহিনীর এবং নবাবের নিজস্ব রিসালার সওয়ারি ও পদাতিকের মোট সংখ্যা সব মিলিয়ে নেহাত কম নয়। এই বাহিনী নিয়েই যুদ্ধটা জিতে নেওয়া যায়, দুষ্টচক্রীর দল যদি নিরপেক্ষ থাকে। পরমুহূর্তেই সিরাজদ্দৌলা ভাবলেন, কোরান ছুঁয়ে শপথ করেছেন মিরজাফর। আশা করা যায়, তিনি বেইমানি করবেন না।

বিচলিত নবাব আশা ও আশঙ্কায় দোদুল্যমান। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল জাঁ ল-র কথা। ইংরেজদের দাবি মেনে কাশিমবাজার থেকে ফরাসিদের বিতাড়িত করার সময় মসিয়ে ল-কে তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজন হলেই ডেকে পাঠাবেন। মসিয়ে ল-এর সঙ্গে বেশ কিছু দক্ষ ইউরোপীয় সৈন্য আছে। এসময় এদের মদত পেলে নবাবের খুবই সুবিধে হবে।

তৎক্ষণাত ল-এর উদ্দেশে একটা চিরকুট লিখে হরকরার হাতে ধরিয়ে দিলেন নবাব। হরকরা ছুটল পাটনার পথে।

মোহনলাল জোর দিয়ে বললেন, ‘হুজুর এখনই মিরজাফরকে গ্রেপ্তার করুন। ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর যোগসাজশ আছে। তিনি গ্রেপ্তার হলে ক্লাইভ আর এগোনোর সাহস করবেন না।’

এই প্রস্তাব খারিজ করে দিয়ে নবাব বললেন, ‘না মোহনলাল। অন্দরের কলহ-বিবাদ আমি বাড়াতে চাই না। অন্দরে আগুন জ্বললে বাইরের আগুন বহুত জোরদার হয়ে উঠতে পারে।’

হতাশ হয়ে মোহনলাল চুপ করে গেলেন। নবাবের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কথা বলা যায় না।

একজন আরজবেগি এসে নবাবের হাতে তুলে দিল একটা চিঠি। কর্নেল ক্লাইভ পাঠিয়েছেন।

চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরলেন নবাব। ক্লাইভ লিখেছেন, ‘…শুনলাম ফরাসি জেনারেল বুসির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন আপনি। ফির একবার আমি জানতে চাই আমাদের দুশমন ফরাসিদের সঙ্গে কীসের রিশতাদারি আপনার? আলিনগরের সুলেনামার বেইজ্জতি করেই চলেছেন আপনি। ইনসাফ চাইতে আমি ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসছি।… ‘

নবাবের মনে হল, মুর্শিদাবাদে হামলার জন্য যা খুশি একটা বাহানা খাড়া করেছেন ক্লাইভ। ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি চিঠিটা ছিড়ে ফেলে দিলেন।

‘হুজুর সহি সালামত।’

সহসা দরবারে এক আগন্তুকের নাটকীয় প্রবেশে চমকে গেলেন সিরাজদ্দৌলা ও মোহনলাল।

‘মসিয়ে সিনফ্রে আপনি?’ ক্ষণিকের বিহ্বলতা কাটিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা। ছুটে এসে সিনফ্রেকে বুকে জড়িয়ে ধরে নবাব শুধোলেন, ‘মসিয়ে ল কোথায়? তিনিও কি এসেছেন?’

‘না। মসিয়ে ল এখন পাটনায়। মাঝপথ থেকে আমার গোলন্দাজ বাহিনীর চল্লিশজন তোপচিকে সঙ্গে নিয়ে আমি ফিরে এলাম। নিজের ইচ্ছেয় ফিরলাম বললে গলত বলা হবে। আমাকে ওয়াপস পাঠালেন ল সাহেব। বললেন, বারিষের মরশুমের আগেই ইংরেজরা হামলা করতে পারে মুর্শিদাবাদে, আপনি ফিরে গিয়ে নবাবকে মদত দিন। তেমন পাকা খবর মিললে আমিও ছুটে আসব।’

‘কী আশ্চর্য! আমি আজই চিরকুট পাঠিয়েছি ল-সাহেবের কাছে। মুর্শিদাবাদে ওয়াপসির জন্য লিখেছি।’

‘মুর্শিদাবাদে এসেই শুনলাম কালনায় পৌঁছে গিয়েছেন ক্লাইভ। ইয়ে সচ বাত?’ শুধোলেন সিনফ্রে।

‘মাথা নেড়ে নবাব বললেন, সচ বাত। লড়াই বাধতে চলেছে।’

‘জানকবুলের কসম খেয়ে আপনার হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করব হুজুর।’

ফরাসিদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় সিরাজদ্দৌলার চোখদুটো জলে ভরে উঠল। যাদের তিনি বিতাড়িত করেছিলেন কাশিমবাজার থেকে, তারাই আজ অভিমান ভুলে বিপদের দিনে স্বেচ্ছায় তাঁর পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। সিরাজদ্দৌলা ভাবলেন, কে দুশমন আর কেই বা সাচ্চা দোস্ত তা সঠিকভাবে ভাবে চিনে নেওয়ায়ই বোধ হয় একজন ইনসানের জীবনে সবচেয়ে কঠিন কাজ।

১৭ জুন, ১৭৫৭।

কালনা থেকে পাটুলিতে পৌঁছে মেজর আয়ারকুটকে কাটোয়ার দুর্গ আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন ক্লাইভ। দিনকয়েক আগে আয়ারকুটের পদোন্নতি হয়েছে। আগে ছিলেন ক্যাপ্টেন। এখন হয়েছেন মেজর।

পরের দিন সকালে দুশো গোরা সৈন্য, ছশো দেশি সেপাই আর দুটো ফিল্ড পিস কামান নিয়ে পাটুলি থেকে কাটোয়া দুর্গের দিকে রওনা দিলেন আয়ারকুট। দেশি সেপাইদের মধ্যে জনা পঞ্চাশেক এমন ছোকরা রয়েছে যাদের বরানগর ক্যাম্পে নিজের হাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে ফৌজের উপযোগী করে গড়েছেন আয়ারকুট। ক্লাইভ এই বাহিনীর নাম দিয়েছিলেন লাল পল্টন। এই দলে রয়েছে নীলকণ্ঠ।

চোদ্দ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সন্ধের মুখে কাটোয়া দুর্গের অদূরে এসে উপস্থিত হল ইংরেজ বাহিনী। কেল্লার পরিধি প্রায় আধমাইল। আটকোনা দুর্গ। প্রতি কোণে রয়েছে একটা করে বুরুজ।

আলো কমে এসেছে। আজ আর দুর্গ আক্রমণ করা সম্ভব নয়। এদিকে আকাশ ছেয়েছে কালো মেঘে। চিন্তিত মুখে আয়ারকুট আকাশের দিকে চাইলেন। মুটে মজুররা তাঁবু খাটানোর তোড়জোড় করছে।

সহসা ঝড় উঠল। একেবারে প্রলয়ংকর ঝড়। বাতাসের তীব্র শোঁ-শোঁ শব্দ শুনে আয়ারকুটের মনে হতে লাগল কোনও দৈত্য যেন প্রবল আক্রোশে ফুঁসছে। খানিকবাদে শুরু হল বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি। আকাশের বুক চিরে দিচ্ছে ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলকানি। সেই সঙ্গে কড়াত কড়াত বাজ পড়ার বীভৎস শব্দ।

দিশেহারা হয়ে খোলা মাঠের মধ্যে প্রবল ত্রাসে ছুটোছুটি করছে ইংরেজ বাহিনী। যে কয়েকটি তাঁবু খাটানো হয়েছিল তার বেশির ভাগেরই কানাত উড়ে চলে গিয়েছে কোথায়। কোনও কোনওটার কানাত ছিড়েখুঁড়ে একাকার। খোলা মাঠের এক প্রান্তে অনেক দূরে রয়েছে জনবসতি। ফৌজিরা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সেই বসতির দিকে ছুটতে লাগল।

বর্ষার কথা ভেবে আগে থেকেই গো-গাড়ির মাথায় চাপানো বারুদের পিপেগুলো ত্রিপলে আচ্ছাদিত করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা ছিল। ঝড়ের দাপটে বাঁধন ছিড়ে ত্রিপল উড়ে যাওয়ার উপক্রম। বারুদের পিপেগুলো ভিজে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে ত্রিপলের বাঁধন আরও শক্তপোক্ত করার চেষ্টা করছিল নীলকণ্ঠ ও দুজন গোরা সৈন্য। সহসা আকাশের বুক চিরে ছুটে গেল দামিনী। চারিদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল উজ্জ্বল আলোয়। তারপরেই কান ফাটানো শব্দে আকাশ যেন ভেঙে পড়ল ধরণীর বুকের উপরে।

ঝড়বৃষ্টির অবসান ঘটে প্রকৃতি শান্ত হল ঘণ্টাখানেক পর। চারিদিকে মিশমিশে কালো অন্ধকার। শোনা যাচ্ছে একটানা ব্যাঙের ডাক। গাছের পাতা থেকে জল ঝরে মাটিতে পড়ার টুপটাপ শব্দ। কয়েকজন সৈন্যকে সঙ্গে নিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া বাহিনীকে ফের সুসংহত করার কাজে লেগে পড়লেন মেজর আয়ারকুট। সকলের হাতেই বুলস আই লণ্ঠন।

এদিক-ওদিক ছিটকে গিয়ে কোনও বড় গাছের তলায় বা লোকবসতিতে আশ্রয় নেওয়া সৈন্যেরা লণ্ঠনের আলো দেখে ফিরে আসছে একে একে। বারুদের গাড়ির কাছে গিয়ে চমকে উঠলেন আয়ারকুট। বারুদের পিপেগুলো সুন্দরভাবে আচ্ছাদিত রয়েছে। একেবারে সুরক্ষিত। কিন্তু মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে নীলকণ্ঠ ও দুই গোরা পল্টন। কাদায় মাখামাখি। বজ্রাঘাতে ঝলসে গিয়েছে তাদের দেহ। বিহ্বল দৃষ্টিতে মৃতদেহ তিনটির দিকে চেয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন আয়ারকুট। বুঝলেন, এই তিন সৈনিক নিজেদের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়ে দিয়ে গিয়েছে কামানের রসদ। যুদ্ধক্ষেত্রে বহু মৃত্যুর সাক্ষী কঠিন হৃদয় মেজর আয়ারকুটের চোখদুটো সহসা জলে ভিজে উঠল।

গতকাল রাতের ভয়ানক অভিজ্ঞতার রেশ কাটিয়ে উঠে সকালে চোখ মেলে আয়ারকুট দেখলেন, চারিদিক আলোয় একেবারে ঝলমল করছে। আকাশ ঘন নীল। মেঘের ছিটেফোঁটা কোথাও নেই। দ্রুত প্রস্তুত হয়ে নিল ইংরেজ বাহিনী। কাটোয়া দুর্গ আক্রমণ করলেন আয়ারকুট।

দুটো ফিল্ড পিস কামান ঘন ঘন গোলা বর্ষণ করতে শুরু করল দুর্গের উপর। ওদিক থেকে তেমন কোনও প্রতিরোধ এল না। গোলার আওয়াজ শুনেই সেপাই-পেয়াদাদের নিয়ে পালিয়ে গেল কেল্লাদার। কার্যত বিনা বাধায় কাটোয়ার কেল্লা দখল করে নিলেন আয়ারকুট। ইংরেজদের হাতে আসল চোদ্দোটা কামান আর প্রচুর খাদ্যশস্য। কেল্লার ভিতরের শস্যগোলাগুলো ধান ও দানা শস্যে একেবারে বোঝাই হয়ে রয়েছে।

১৭৫৭ সালের ১৯ জুন, পাটুলিতে অপেক্ষারত বাকি সৈন্যদের নিয়ে কাটোয়ায় এসে পৌঁছলেন ক্লাইভ।

অভিবাদন জানালেন আয়ারকুট। জানালেন গতরাতের দুর্ঘটনার কথা।

মাটির দিকে চেয়ে চুপ করে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন কর্নেল।

নীলকণ্ঠর মৃত্যু সংবাদ শুনে নবকৃষ্ণর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। যুদ্ধক্ষেত্রে এসে চোখের জল ফেলা যায় না। সুতানুটির ঘাটে আলাপ, বর্গির আক্রমণে সব হারিয়ে কলকাতায় এসে আশ্রয় নেওয়া দীনদরিদ্র নীলকণ্ঠকে দেখে বড় মায়া পড়ে গিয়েছিল নবকৃষ্ণর। কাজ জুটিয়ে দিয়ে কলকাতা শহরের বুকে তার বেঁচে থাকার একটা উপায় নবকৃষ্ণই করে দিয়েছিলেন। গেল বছর কলকাতার যুদ্ধে আবার সব হারিয়ে নিঃস্ব হল নীলকণ্ঠ। ফের তার পাশে দাঁড়ালেন নবকৃষ্ণ। কর্নেল ক্লাইভেরও খুব পছন্দ হয়েছিল ছেলেটিকে। উদ্যমী, চটপটে ছেলে। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নবকৃষ্ণ।

নীরবতা ভেঙে ক্লাইভ বললেন, ‘মে দেয়ার সোলস হ্যাভ পিস।’ তারপর আয়ারকুটকে সঙ্গে নিয়ে গটগট করে হেঁটে কেল্লা পরিদর্শনে চলে গেলেন। শত বিপর্যয়ের মধ্যেও সামনে তাকানোটাই হল নিয়ম।

কাটোয়া দুর্গে দিন দুই চুপচাপ সময় কাটালেন কর্নেল। মনের মধ্যে একরাশ উৎকণ্ঠা। প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল মিরজাফরের কাছ থেকে কোনও চিঠি তিনি পাননি। কথা ছিল গোপন হরকরা মারফত মুর্শিদাবাদের হালহকিকত কর্নেলকে নিয়মিত জানাবেন মিরজাফর। কিন্তু তিনি চুপ কেন? তিনি কি তার ওয়াদা থেকে সরে এলেন? নবাবের সঙ্গে সমঝোতা করে নিলেন?

মিরজাফর-রায়দুর্লভের স্বাক্ষরিত চুক্তির কপি হাতে থাকলেও মুর্শিদাবাদের এই মহারথীরা এই মুহূর্তে কী ভাবছেন, ভালো করে তার যাচ-ইমতেহানি না করে কাটোয়া থেকে গঙ্গা পেরোনোর সাহস হচ্ছে না ক্লাইভের। দরবারের দুষ্টচক্রীরা সঙ্গে না থাকলে এ লড়াইয়ে জিৎ হাসিল করা ইংরেজদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এ কথা ক্লাইভ ভালো করেই জানেন।

এখন কী করা উচিত? গঙ্গা পার হয়ে এখনই মুর্শিদাবাদের দিকে সাহস করে এগোবেন না কাটোয়াতে অপেক্ষা করে মিরজাফর-রায়দুর্লভের মনোভাব যাচাই করে, তারপর পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন—এই নিয়ে দোটানায় পড়ে গেলেন ক্লাইভ। স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না। এদিকে প্রতিদিনই নিয়ম করে দু-এক পশলা বৃষ্টি হচ্ছে। আর পক্ষকালের মধ্যেই পথঘাট ফৌজের চলাচলের পক্ষে একেবারে অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এখনই মিরজাফরের কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেলে গোটা বর্ষাকালটাই হয়তো কাটোয়ার দুর্গে কাটাতে হবে ক্লাইভের বাহিনীকে। জলকাদা ভেঙে কলকাতায় ফেরা হবে না।

খানিকটা দিশেহারা হয়ে সিলেক্ট কমিটিকে চিঠি লিখলেন ক্লাইভ। ‘…আমি কাটোয়ায় এসে পৌঁছেছি। সাত দিন হয়ে গেল, মিরজাফরের দিক থেকে কোনও কমিউনিকেশন নেই। আই অ্যাম ভেরি মাচ কনসার্নড অ্যাবাউট দিস। আমাদের সাবধানে এগোনো উচিত যাতে ফৌজের কোনও ক্ষতি না হয়। ফৌজ ইনট্যাকট থাকলে ফেভারেবল টাইমে তখত উলটে দেওয়া যাবে।

‘কাটোয়া দুর্গ থেকে যা রসদ পাওয়া গেছে তাতে আমার বাহিনীর গোটা বর্ষাকাল চলে যাবে। আমি মনে করি, কাটোয়ায় ক্যাম্প করে ওয়েট করলে নবাবকে মেন্টালি উইক করে দেওয়া যাবে। তখন যুদ্ধ এড়িয়ে আমাদের টার্মে নবাবকে বেঁধে ফেলতে সুবিধে হবে আমাদের।

‘অবশ্য অন্য কয়েকটা উপায়ের কথাও আমি ভেবেছি। নবাবের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বীরভূমের রাজার সাহায্য চাওয়া যায়। আবার দিল্লি থেকে উজির ঘাজিউদ্দিনকেও ডেকে আনা যেতে পারে। পুরো বিষয়টা আপনাদের জানালাম। এখন আপনারাই বলুন মিরজাফর যদি শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যান, তাহলে আমাদের কী করা উচিত?…’

নানা পরস্পর বিরোধী চিন্তার ঢেউয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে ক্লাইভের মন। সিলেক্ট কমিটির উত্তরের অপেক্ষা না করে বিহারের রাজা মহম্মদ আসাদুজ্জামানকেও একটা চিঠি লিখে বসলেন ক্লাইভ।

‘…আপনি আমাকে শ-তিনেক ঘোড়সওয়ার ধার দিতে পারেন? এদের সব খরচ আমি মিটিয়ে দেব। সওয়ারিরা দিনরাত কুচ করে তুরন্ত যেন কাটোয়ায় পৌঁছে যায়…।’

ক্লাইভ জানেন কলকাতা থেকে সিলেক্ট কমিটির উত্তর আসতে সময় লাগবে। রাজা আসাদুজ্জামানও যে কী করবেন তার ঠিক নেই। সারাক্ষণ ছটফট করছেন ক্লাইভ, স্থির হয়ে দুদণ্ড বসতে পারছেন না। যুদ্ধবাজ কর্নেল ভালোই জানেন, কোনও যুদ্ধ জিততে গেলে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। গোটা বর্ষাকাল যদি তিনি কাটোয়ায় বসে থাকেন তাহলে কি বড্ড দেরি হয়ে যাবে না? অনেকটা সময় পেয়ে যাবেন সিরাজদ্দৌলা। এই সময়ের মধ্যে তিনি হয়তো নতুন মিত্র জোগাড় করে ফেলবেন। বুসিও এসে পড়তে পারেন বাংলায়। অন্যদিকে গঙ্গা পেরিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে এখনই কুচ করার পর যদি শোনেন, মিরজাফর-রায়দুর্লভ পিছিয়ে গিয়েছেন, তাহলেও সমূহ বিপদ।

অপেক্ষা করবেন, না এখনই এগোবেন? কী হবে ইংরেজদের পদক্ষেপ? জরুরি মিটিং ডাকলেন ক্লাইভ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *