ফলতা থেকে পলাশি – ৬১

৬১

১৭৫৭ সালের ১১ জুন।

ভোরবেলা একটা নৌকো এসে থামল চন্দননগরের ঘাটে। নৌকো থেকে নেমে ঘোড়া দাবড়ে কর্নেল ক্লাইভের ক্যাম্পে এসে হাজির হলেন পেত্রস আরাটুন ও ওমর বেগ।

চুক্তির কাগজটা ক্লাইভের হাতে তুলে দিয়ে একগাল হেসে আরাটুন বললেন, ‘কাজ হাসিল।’

ছেলেমানুষের মতো প্রায় ছো মেরে কাগজটা আরাটুনের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দ্রুত চোখ বোলালেন ক্লাইভ। তারপর উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠলেন, ‘থ্যাঙ্কস অ্যা লট মিঃ আরাটুন।’

‘কাজ হাসিল করার পিছনে জনাব ওমর বেগের অবদানও কম নয়।’

ওমর বেগের নামটার সঙ্গে ক্লাইভের বিশেষ পরিচয় নেই। পরিচয় করিয়ে দিলেন আরাটুন।

আরাটুন বললেন, ‘ ইনি মুর্শিদাবাদ দরবারের একজন মানী মনসবদার। মিরজাফর খাঁর জিগরি দোস্ত।’

ক্লাইভ মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘বহুত বহুত সুক্রিয়া জনাব। মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে আমি খুব দ্রুত রওনা হতে চাই।’

‘মুর্শিদাবাদও আপনার অপেক্ষায় দিন গুনছে। সকলেই চায় ইনকিলাব।’ বললেন ওমর বেগ।

আরাটুন বললেন, ওয়াটস সাহেব একটা চিঠি দিয়েছেন আপনাকে।

আরাটুনের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়তে লাগলেন ক্লাইভ। ওয়াটস লিখেছেন, ‘…তুরন্ত ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসতে হবে আপনাকে। সিপাহ সালারের পদ থেকে বরখাস্ত হয়েছেন মিরজাফর। মিরজাফর-জগৎশেঠ-রায়দুর্লভ—সাজিসের এই তিন মূল কারবারিকে সন্দেহ করছেন নবাব। যে কোনও সময় এরা গ্রেপ্তার হতে পারেন। তা যদি হয়, তাহলে পরিস্থিতি ভীষণ ঘোরাল হয়ে উঠবে।…’

চিঠিটা পড়ে খুব চঞ্চল হয়ে পড়লেন ক্লাইভ। আরাটুনের উদ্দেশে বললেন, আমার হয়ে একটা কাজ আপনাকে করে দিতে হবে। কলকাতায় যেতে হবে একবার।

 ‘সার্টেনলি। ওমর বেগ ভি আমার সঙ্গে যাবেন।’

‘তাহলে তো খুব ভালো হয়। এই এগ্রিমেন্টের কপিটা ওয়াটসন সাহেবকে একবার দেখিয়ে গভর্নর ড্রেকের হাতে তুলে দিতে হবে। আসলে কলকাতা থেকে গোটা ফোর্সকে তুরন্ত মোবিলাইজ করানোর জন্য এই এগ্রিমেন্টের বিষয়ে সিলেক্ট কমিটিকে অবিলম্বে ইনফর্ম করা প্রয়োজন।’

‘ওয়াটস সাহেব সরাসরি কাগজটা আপনাকে পাঠিয়েছেন জানলে ড্রেকসাহেবদের গুসসা হবে এই তো?’ এই বলে মুচকি হাসলেন আরাটুন।

ক্লাইভও মুচকি হেসে বললেন, ‘কোম্পানির ইটারনাল পলিটিক্স আপনি তো ভালোই বোঝেন।’ আর একটা কাজ—একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি আমি। চিঠিটা অ্যাডমিরালের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

ওমর বেগ বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না কর্নেল। আজ বিকেলের মধ্যেই আমরা কলকাতা পৌঁছে যাব।

সো কাইন্ড অফ ইউ। আপনারা একটু বিশ্রাম করুন। টেক ইওর ব্রেক ফাস্ট। আমি চিঠিটা লিখে নিয়ে আসি।’

নিজের কাজের ঘরে এসে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের উদ্দেশে চিঠি লিখতে বসলেন ক্লাইভ।

‘…ইভরিথিং ইজ কনক্লুডেড। পেত্রস আরাটুন ও ওমর বেগের হাত দিয়ে ফাইনাল এগ্রিমেন্টের কপি আমি পাঠিয়ে দিলাম আপনার কাছে। আপনি একবার চোখ বুলিয়ে কাগজটা গভর্নর ড্রেককে দিয়ে দেবেন। আমি খুব দ্রুত মুর্শিদাবাদের দিকে মার্চ করতে চাই। চন্দননগর পাহারা দেওয়ার জন্য শ-খানেক জাহাজি সৈন্য আপনি যদি খুব দ্রুত পাঠিয়ে দিলে খুব ভালো হয়। সেই সঙ্গে ব্রিজওয়াটার জাহাজটাকেও পাঠাবেন। আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনিশনস আমি নৌকোয় করে নিয়ে যাব। হুগলির ফৌজদার যাতে আমাদের নৌকোগুলোকে আটকানোর সাহস না করে সেই জন্য জাহাজটার প্রয়োজন। মেজর কিলপ্যাট্রিক গ্রাউন্ড ফোর্সের সব সৈন্যদের নিয়ে ব্রিজওয়াটার জাহাজে চড়েই কলকাতা থেকে এখানে চলে আসতে পারবেন। …’

সেই দিনই দুপুরে ক্লাইভের চিঠি নিয়ে রওনা দিয়ে সন্ধের মুখে কলকাতা পৌঁছে গেলেন পেত্রস আরাটুন ও ওমর বেগ। পরেরদিন বিকেলে ব্রিজওয়াটার পৌঁছে গেল চন্দননগরে। ফৌজিদের নিয়ে পৌঁছে গেলেন মেজর কিলপ্যাট্রিকও।

ওয়াটসের উদ্দেশে ছোট্ট একটা বার্তা লিখে দ্রুতগামী এক ঘোড়সওয়ারের হাত দিয়ে কাশিমবাজারে পাঠিয়ে দিলেন ক্লাইভ—’আগামীকাল আমি মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা হচ্ছি। অবিলম্বে আপনি, সাইকস ও কালেট কাশিমবাজার থেকে পালিয়ে চলে আসুন, না হলে আপনারা বিপদে পড়তে পারেন। আশা করি, পথে আমাদের দেখা হয়ে যাবে।’

চন্দননগরের জাহাজঘাটায় জড়ো হয়েছে খান কুড়ি-পঁচিশ বড় বড় নৌকো। শেষ বিকেলের আলোয় জাহাজঘাটায় দাঁড়িয়ে সরেজমিনে নৌকোগুলো কামান ও অস্ত্রশস্ত্রে বোঝাই করার কাজ তদারক করছেন ক্লাইভ।

কোনও অস্ত্রশস্ত্র যাতে নিতে ভুল না হয় সেদিকে প্রখর দৃষ্টি কর্নেলের। তাঁর হাতে রয়েছে মাত্র ছশো গোরা পল্টন ও একুশশো দেশি সেপাই। এই সীমিত শক্তির পূর্ণ ও সঠিক ব্যবহার চান কর্নেল।

 সৈন্যদের ফ্লিন্টলক রাইফেলগুলো বস্তাবন্দি করে চাপানো হচ্ছে নৌকোয়। বস্তাগুলোকে শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধা হচ্ছে কিনা নৌকোয় উঠে পরীক্ষা করছেন ক্লাইভ। একটা বস্তাও যদি যাওয়ার পথে টুপ করে জলে পড়ে যায় তাহলে প্রভূত ক্ষতি হয়ে যাবে। রসদ সীমিত।

জাহাজ ঘাটের আরেকদিকে দারুন হইচই। কাঠের পাটাতনের উপর দিয়ে কামানগুলোকে ঠেলে নিয়ে নৌকোয় চাপানো হচ্ছে। ক্লাইভ এগিয়ে গেলেন ওদিকে। ইংরেজরা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে দশটা ফিল্ড পিস কামান। এর মধ্যে আটটা সিক্স পাউন্ডার, দুটো হাউইটজার। কিছুক্ষণের মধ্যেই কামানগুলো সব নিরাপদে চাপানো হয়ে গেল নৌকোয়।

অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে প্রায়। কালচে ছোপ ধরেছে হুগলি নদীর জলে। একদৃষ্টে জলের দিকে তাকিয়ে আছেন ক্লাইভ। নানা চিন্তায় তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে কর্নেলের মনটা। বুঝতে পারছেন, একটা সাংঘাতিক ঝুঁকি নিতে চলেছেন তিনি। এই লড়াই খুব সম্ভবত তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজি। বিশ্বাসঘাতকতা করবেন রায়দুর্লভ-জগৎশেঠ-মিরজাফর—এই ভরসায় তিনি এগোচ্ছেন মুর্শিদাবাদের দিকে। কিন্তু যদি শেষ মুহূর্তে দরবারের এই বিরুদ্ধগোষ্ঠী যদি পিছিয়ে যান, তাহলে?

পাইপে টান দিতে গিয়ে ক্লাইভ অনুভব করলেন আগুনটা নিভে গিয়েছে। পাইপটা হাতে নিলেন কর্নেল। নিজের অন্তরকে বললেন, তুমি কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ। এতটা কাল তো জীবনের সঙ্গে বাজি লড়ে এসেছ। একবারও তোমার পরাজয় হয়নি। এদেশের লোকেরা তোমাকে বলে সাবিৎ জঙ্গ—যুদ্ধে অপরাজেয়। দুঃসাহসিক অ্যাডভেঞ্চার উপভোগ করাতেই তো তোমার আনন্দ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আর পাঁচজন কলমপেষা রাইটার বা ফ্যাক্টরের মতো নিরবিলি জীবন কাটানো কি তোমার পক্ষে সম্ভব? তুমি যে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। তাহলে কী হবে এত ভেবে? ভাবছই বা কেন?

‘চলুন স্যার ফেরা যাক।’ পাশ থেকে কথাটা বললেন নবকৃষ্ণ।

‘কী হবে বলো তো মুনশি?’

‘কী আবার? আপনি কামেয়াব হবেন।’

ক্লাইভ হেসে বললেন, ‘তোমার গোবিন্দ বুঝি তাই বলছে?’ মৃদু হেসে নবকৃষ্ণর পিঠে চাপড় মেরে ক্লাইভ বললেন, ‘চলো। ক্যাম্পে ফেরা যাক।’

চন্দননগর থেকে হুগলিতে ফৌজদারের সেরেস্তা মোটেই দূর নয়। ফৌজদার আমারুল্লার কানে পৌঁছে গেল সব খবর। গোলা-গুলি, কামান-বন্দুক দিয়ে নৌকো বোঝাই করছে ইংরেজরা। শোনা যাচ্ছে ক্লাইভ নাকি ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দেবেন। হঠাৎই চন্দননগররে এসেছে ভয়ংকর যুদ্ধজাহাজ ব্রিজওয়াটার। কলকাতায় যে সৈন্যসামন্তরা ফিরে গিয়েছিল তারা আবার ফিরে এসেছে।

ইংরেজদের নৌকোগুলো আটক করার কথা ভেবেছিলেন আমারুল্লা, কিন্তু কিছুই করতে পারলেন না। কারণ চন্দননগর ছেড়ে এগিয়ে এসে ব্রিজওয়াটার হুগলির কেল্লার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। অতিকায় এক দৈত্যের হাতের ধারালো নখের মতো জেগে আছে দশটা কামানের নল। একসঙ্গে গর্জন করে উঠলে ফোর্ট অঁরলিওর মতো নিজামতের কেল্লাকেও কয়েকঘণ্টার মধ্যে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে।

ইংরেজদের অস্ত্রবোঝাই নৌকাগুলো নির্বিগ্নে হুগলি পেরিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে চলল। ব্রিজওয়াটারের ভয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল আমারুল্লার সেনারা।

তবে একটা কাজ করলেন আমারুল্লা। সব খবরাখবর সিরাজদ্দৌলার কানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক কাসিদকে মুর্শিদাবাদে পাঠালেন। ফৌজদারের চিঠি নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে চলল দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার।

শুঁড় দোলাচ্ছে বেহেদর হাতিগুলো। গায়ে ও মাথায় ইস্পাতের বর্ম। তার উপর পড়ে ঠিকরে যাচ্ছে সূর্যের আলো। রেকাবে পা রেখে ঘোড়ার জিন ধরে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে সওয়াররা। নড়াচড়া করতে শুরু করেছে কামানের গাড়িগুলো। গোটা বাহিনী যুদ্ধযাত্রার জন্য একেবারে প্রস্তুত। এই সেনা সমাবেশের ঠিক পিছনে রয়েছে জাফরাগঞ্জের প্রাসাদ। তার উঁচু উঁচু মিনারগুলোতে বন্দুক হাতে সদা সতর্ক হয়ে রয়েছে বন্দুকচির দল।

 জাফরাগঞ্জ প্রাসাদের দিকে ভেসে চলেছে নবাবের বজরা। বজরার মাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। তাঁর পাশে মোহনলাল। নবাবের বজরার পিছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি সুলুপ। সেগুলো নবাবের রিসালার বাছাই করা সেনায় ভরতি। নবাবের বজরার সমুখে রয়েছে একটা পানসি। তার গলুইয়ের উপর দাঁড়িয়ে সাদা পতাকা দোলাচ্ছে একজন আহেদি।

দূরবিন চোখে দৃশ্যটা দেখছিলেন মিরন। চমকে উঠল সে। নবাব আসছেন।

ছুটতে ছুটতে মিরজাফরের কাছে গেল মিরন। সেনাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছিলেন ওমর বেগ। মিরনের মুখে নবাবের আগমন সংবাদ শুনে ক্ষণেকের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি। মিরনকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে এলেন নদীর ঘাটে।

জাফরাগঞ্জ প্যালেসের ঘাটের প্রায় কাছে চলে এসেছে নবাবের বজরা। দূরবিন ছাড়াই এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নবাবকে। সামনের পানসি থেকে উড়তে থাকা সাদা পতাকাটাও খুব স্পষ্ট। সমঝোতার বার্তা দিচ্ছেন নবাব।

নবাবের বজরাকে জাফরাগঞ্জ প্যালেসের ঘাটে ভিড়তে দেখে নিমেষে শান্ত হয়ে গেল হইহল্লায় মেতে থাকা পদাতিক, বন্দুকচি ধানুকি, ঘোড়সওয়ারেরা। বিস্মিত মিরজাফর।

জাফরাগঞ্জ প্যালেসের ঘাটে ভিড়ল বজরা। কাঠের পাটাতন বেয়ে হেঁটে এসে ঘাটে পা রাখলেন সিরাজদ্দৌলা। নিজামতের সহবত মোতাবেক এমনটা হয় না। আগাম আগমন সংবাদ না দিয়ে নবাব কোথাও যান না।

‘হুজুর সহি সালামত।’ নবাবের সামনে এসে তসলিম জানালেন মিরজাফর।

‘অন্দরে চলুন।’ সংক্ষেপে বললেন, নবাব।

‘জি হুজুর।’

জাফরাগঞ্জ প্যালেসের অন্দরে প্রবেশ করলেন সিরাজদ্দৌলা। সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দল ও দেওয়ান মোহনলাল। পথ দেখিয়ে নবাবকে অন্দরে নিয়ে যাচ্ছেন মিরজাফর ও মিরন। বাইরে জড়ো হওয়া সেপাইরা সব হতবাক। হঠাৎ কেন জাফরাগঞ্জ প্যালেসে ছুটে এলেন নবাব। মিরজাফর খাঁর সঙ্গে ঝামেলাটা কি তাহলে মিটতে চলেছে?

জাফরাগঞ্জ প্রাসাদের অন্দরে এক বন্ধ কক্ষের মধ্যে মিরজাফরের মুখোমুখি হলেন সিরাজদ্দৌলা।

‘আপনি আমার সঙ্গে বেইমানি করছেন কেন?’ নবাবের গলায় কৈফিয়ত চাওয়ার ঝাঁঝ নেই। নেই ঔদ্ধত্য, নেই দম্ভ। বড্ড ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে নবাবকে।

নবাবের কথার ভঙ্গিতে খুবই আশ্চর্য হলেন মিরজাফর। ভাবলেন তিনি দিবাস্বপ্ন দেখছেন। তাঁর সামনে নবাবের বেশধারী যে রাজপুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি অন্য কেউ, নবাব সিরাজদ্দৌলা নন।

একটু ধাতস্থ হয়ে মিরজাফর বললেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। কয়েকটা কথা আমার বলার আছে। আপনি আমাকে ইমান দেননি। একটা মানুষকে দিনের পর দিন দরবারে বেইজ্জত করেছেন, ইনসানিয়াতকে জখম করেছেন। আমার জখম দিলকে বাগি হয়ে উঠতে মদত তো আপনি দিয়েছেন। যে আদমি বদকিসমতির শিকার, সে যদি নসিব বদলের ইরাদায় বাগি হয়ে ওঠে, তাঁর উপর কী ফরিয়াদ আনবেন আপনি?’

কথাগুলো বলতে বলতে চোখে জল এসে যায় মিরজাফরের। ক্ষণিকের দমবন্ধকর নিস্তব্ধতা ভেঙে সিরাজদ্দৌলা বলেন, ‘আপনি যে ইলজাম আমার উপর আনলেন, তা গলত নয়। আজ আমি মাফ চাইতে এসেছি আপনার কাছে।’

মিরজাফর বাক্যহারা, হতভম্ব। এ কোন সিরাজদ্দৌলা? যার চরিত্রের অলংকার তীব্র অহংবোধ আর ঔদ্ধত্য, বিনয়, নম্রতা কাকে বলে যে জানে না, সে কিনা নাজুক আওয়াজে মাফ চাইছে! ক্ষণিকের ঘোর কাটিয়ে ব্যস্ত হয়ে মিরজাফর বললেন, ‘আপনি বাংলার নবাব। আপনি মাফি মাঙবেন কেন?’

‘যদি ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই বাঁধে, বলুন আপনি আমার হয়ে লড়াই করবেন।’ সিরাজের জবানে মরিয়া আকুতি।

মিরজাফর বললেন, ‘আপনি নবাব হয়ে মাফ চাইতে এসেছেন আমার কাছে! এ তো আমার খুশনসিবি। আপনি যা চাইছেন, তাই হবে।’

‘তাহলে কোরান ছুঁয়ে ওয়াদা করুন।’ এই বলে পবিত্র কোরান মিরজাফরের হাতে তুলে দিলেন সিরাজদ্দৌলা।

মিরজাফর কোরান ছুঁয়ে বললেন, ‘ইংরেজদের সঙ্গে যদি আপনার লড়াই বাধে তবে আপনার হয়েই আমি লড়াই করব। ওয়াদা করলাম।’

নিশ্চিন্ত হলেন সিরাজদ্দৌলা।

মিরজাফর বললেন, ‘তবে আমার কয়েকটা শর্ত মানতে হবে আপনাকে।’

‘কী শর্ত?’

‘ইংরেজদের সঙ্গে যদি আপনার লড়াই বাঁধে তবে সে লড়াই হবে আপনার হয়ে আমার অন্তিম লড়াই। এরপরে আমি আর নিজামতের নোকরি করব না। আমি কভি দরবারে যাব না। কারও কাছে হাজিরা দেব না।’

সিরাজদ্দৌলা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘মঞ্জুর।’

তুষ্ট হয়ে নবাব ফিরে চললেন হিরাঝিল প্রাসাদে।

পলাশিতে গিয়ে ছাউনি ফেলে ক্লাইভের জন্য অপেক্ষা করবেন বলে সংকল্প করেছিলেন মিরজাফর। আপাতত তিনি এই পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে নিলেন। ভাগীরথীর দুই পারে দুই প্রাসাদকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিল তা তখনকার মতো থিতিয়ে গেল। তবে মিরজাফরকে কড়া নজরে রাখার জন্য গুপ্তচরদের নির্দেশ দিলেন সিরাজদ্দৌলা।

‘আপনি, সাইকস ও কালেট অবিলম্বে কাশিমবাজার থেকে পালিয়ে আসুন’— ক্লাইভের কাছ থেকে এই বার্তা পেয়ে দারুণ ভয় পেয়ে গেলেন ওয়াটস। ক্লাইভ সেনা নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে আসছেন শুনলেই কাশিমবাজার কুঠি আক্রান্ত হতে পারে। ওয়াটস, সাইকস ও কালেট গ্রেপ্তার হতে পারেন।

কী করা যায়? নবাবের গুপ্তচরদের নজর এড়িয়ে কী করে পালানো যায়? উত্তর খুঁজতে কালেট ও সাইকসের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন উইলিয়াম ওয়াটস। ঠিক তখনই নিজামতের চিঠি নিয়ে এল একজন হরকরা। নবাব সিরাজদ্দৌলা জরুরি তলব করেছেন। চমকে উঠলেন ওয়াটস। তাঁর বুক কাঁপতে লাগল। এ কি গ্রেপ্তারির পূর্বাভাস?

নবাবের তলবে সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। একা যাওয়ার সাহস হল না ওয়াটসের। সাইকস ও কালেটকেও সঙ্গে নিলেন। দরবারে হাজির হয়েই ওয়াটস টের পেলেন নবাবের মেজাজটা বেশ রুক্ষ হয়ে আছে।

‘কর্নেল ক্লাইভ কী ফের ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসার মতলব করছেন?’ বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে শুধোলেন নবাব।

ওয়াটস মুখচোখের এমন ভঙ্গি করলেন যেন তিনি কোনও একটা অসম্ভব কথা শুনছেন।

‘আপনি জানেন না?’ নবাবের তীক্ষ্ন দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ওয়াটসের মুখের উপর।

নিরীহ ভঙ্গিমায় দুদিকে মাথা নেড়ে ওয়াটস বললেন, ‘না হুজুর। এমন তো কিছু শুনিনি।’

সিরাজদ্দৌলা অবাক হয়ে মোহনলালের মুখের দিকে তাকালেন।

‘আমার মনে হয় কেউ আপনাকে ঝুটা সমাচার দিয়েছে। বললেন ওয়াটস।’

‘আপনি যে সচ বলছেন তা বুঝব কী করে?’

নবাবের প্রশ্নটা যেন ছুরির ফলার মতো এসে বিঁধল ওয়াটসের বুকে। ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন তিনি। জেরার মুখে সত্যি কথা বেরিয়ে পড়লে সর্বনাশ হয়ে যাবে। ওয়াটস স্নায়ু টানটান করে বললেন, ‘এতদিন তো কর্নেলকে আপনি দেখছেন হুজুর। তিনি লুকিয়ে কোনও কাজ করেন না। মুর্শিদাবাদে আসবেন মনে করলে তিনি সরাসরি আপনাকে চিঠি লিখে জানাতেন।’

ধন্দে পড়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা। ওয়াটস যা বলছেন তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

নবাবকে জানিয়েই চন্দননগরে হামলা করেছিলেন ক্লাইভ। জাঁ ল ও ফরাসিদের পাটনা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি যে ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসতে চান, সে কথা চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন। আবার সেই দাবি থেকে সরে এসে বাংলায় শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশে আলিনগরের সমঝোতাকে মান্যতা দেওয়ার জন্য তিনি ফৌজ সরিয়ে নিচ্ছেন কলকাতায়। সে কথাও চিঠিতে লিখেছেন ক’দিন আগে। সত্যিই তো কর্নেলের কাজের মধ্যে তো কোনও লুকোছোপা নেই।

সিরাজদ্দৌলার মনে অন্য একটা খটকা লাগল। সন্দেহ পড়ল ফৌজদার আমারুল্লার উপর। আমারুল্লা ষড়যন্ত্রীদের সঙ্গে হাত মেলায়নি তো? হয়তো তিনি ঝুটা সমাচার পাঠিয়ে নবাবের মেজাজটাকে গরম করে তুলতে চাইছেন। যাতে ধোঁকা খেয়ে ওয়াটসকে গ্রেপ্তার করেন নবাব। তাহলেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে কুচক্রীদের। রুষ্ট হয়ে ফৌজ-নওয়ারা নিয়ে মুর্শিদাবাদে ধেয়ে আসবেন ক্লাইভ ও ওয়াটসন।

ওয়াটস বললেন, ‘হুজুর একটা কথা।’

‘বলুন।’

‘তেমন কোনও কাজ এখন আমাদের হাতে নেই। আপনি যদি অনুমতি দেন তো দিনকয়েকের জন্য মাদিপুরে আমরা শিকারে যেতে চাই।’

ওয়াটসের উপর আর কোনও সন্দেহ রইল না নবাবের। তিনি জানেন কাশিমবাজার কুঠির মাইল দুয়েক দক্ষিণে মাদিপুরে ইংরেজদের একটা খামারবাড়ি আছে। সেখানে ইংরেজ সাহেবরা মাঝে মধ্যেই আমোদফূর্তির জন্য জড়ো হয়। শিকার খেলে। সত্যিই যদি ক্লাইভ ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসার মতলব করে থাকেন, সে কথা ওয়াটস জানেন না, এমনটা হতেই পারে না। সেক্ষেত্রে তিনি ও তাঁর দুই সঙ্গী কি কাশিমবাজার ছেড়ে নিরিবিলিতে আমোদপ্রমোদের জন্য মাদিপুরে যাওয়ার আবদার করতে পারতেন?

ওয়াটস মাথা ঝুঁকিয়ে ফের বললেন, ‘মাদিপুর তো খুব দূরে নয়। হুজুর আমরা আপনার নাগালের মধ্যেই থাকব।’

সিরাজদ্দৌলা হাসি মুখে বললেন, ‘মঞ্জুর।’

মনের মধ্যে মুক্তির তীব্র আনন্দ উপভোগ করলেন ওয়াটস।

পরেরদিন খুব ভোরে মাদিপুরের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন তিন ইংরেজ— ওয়াটস, সাইকস ও কালেট। সঙ্গে কুলি, মজুর, বাবুর্চি, খানসামা, আবদার, তাঁম্বুবরদার, রসদ-আনাজসহ বিরাট এক লটবহর। রয়েছে বাজনদারের দলও, যারা জঙ্গলে বাজনা বাজিয়ে জন্তু-জানোয়ারকে শিকারির নাগালের মধ্যে নিয়ে আসে। কাসিদের মুখে ওয়াটসের মাদিপুর যাত্রার বিস্তারিত খবর পেলেন সিরাজদ্দৌলা। ওয়াটসের উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর মনে আর একটুও সন্দেহ রইল না।

মাদিপুরের বাগানবাড়িতে পৌঁছেই খানসামাদের উদ্দেশে ওয়াটস বললেন, ‘আজ রাতে কয়েকজন ডাচ মেহমান এখানে খানাপিনা করবেন। ওরা এই বাগানবাড়ির পথ চিনে উঠতে পারবে না। আমরা একটু এগিয়ে যাচ্ছি। পথ দেখিয়ে ওদের নিয়ে আসতে হবে। দেখো খানা যেন জবরদস্ত হয়।’

বুড়ো বাবুর্চি শির ঝুঁকিয়ে বলে, ‘জি হুজুর।’

কাঁধে বন্দুক। ঘোড়ার পিঠে চেপে বেরিয়ে পড়লেন ওয়াটস, সাইকস ও কালেট। মাদিপুরের জঙ্গল এলাকা ছাড়িয়ে এসে উন্মুক্ত প্রান্তরের উপর দিয়ে ধুলো উড়িয়ে তিরবেগে পাশাপাশি ছুটে চলল তিনটে ঘোড়া। পিছনে পড়ে রইল মাদিপুরের খামারবাড়ি, শিকার খেলার বিরাট আয়োজন।

ওয়াটস, কালেট ও সাইকস তিনজনেই তখন আনন্দে উড়ছেন। এই গোলমালের আবহে নবাবকে ফাঁকি দিয়ে এত সহজে যে কাশিমবাজার থেকে পালানো যাবে, তা তাঁরা কল্পনাও করেননি। তাঁরা ছুটে চললেন অগ্রদ্বীপ অভিমুখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *