৬০
গভীর রাত। মেঘে ছাওয়া আকাশ থেকে থেকে গুমরে উঠছে। ঝলকাচ্ছে বিদ্যুত। গোটা রাজধানী শহর নিঝুম। ঘুমিয়ে কাদা।
জগৎশেঠের মহিমাপুর কুঠির এক কক্ষে এখনও জ্বলছে বেলজিয়ান কাচের ঝাড়বাতি। গঙ্গার দিকের খোলা জানলা দিয়ে প্রবেশ করা ঝোড়ো দুলছে ঝাড়বাতি, কাঁপছে দেওয়ালগিরির আলো। দেওয়ালের গায়ে থিরথির করে কাঁপছে কয়েকটি মানুষের অস্পষ্ট ছায়া। ইটালিয়ান মার্বেলের মেঝের উপর পাতা ফরাসে বসে গভীর আলোচনায় মত্ত জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ, রায়দুর্লভ, মিরজাফর ও উইলিয়াম ওয়াটস।
ওয়াটস বললেন, ‘আপনারা ভেবে দেখুন, আমাদের দাবি কিন্তু খুব বেশি নয়।’
রায়দুর্লভ চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘বলছেন কী? বেশি নয়? আপনারা চাইছেন প্রায় আড়াই কোটি টাকা।’
ওয়াটস বললেন, ‘গত বছরে কলকাতা যুদ্ধের খেসারত তো দিতে হবে আপনাদের। কোম্পানি মিরজাফর খাঁকে মসনদে বসাবে। সুবে বাংলার দেওয়ানি আপনাদের হাতে আসবে। বিনিময়ে কোম্পানির জন্য এক কোটি টাকা চাওয়াটা কি অন্যায়?’
ফরসির নল ঠোঁটের ফাঁকে। চোখ বুজে মন দিয়ে ওয়াটসের কথাগুলো শুনছেন রায়দুর্লভ। আর থেকে থেকে ভুড়ুক ভুড়ুক করে ধোঁয়া ছাড়ছেন। গোটা ঘর অম্বুরি তামাকের গন্ধে আমোদিত।
আফিমের নেশায় বেশ ঝিমুনি আসছে মিরজাফরের। চোখ বুজেই তিনি ওয়াটসের কথা শুনে সমানে সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে চলেছেন। তার মনের ভাব কতকটা এরকম— আরে বাপু, অত আলাপ-আলোচনার কী আছে? ওয়াটস সাহেব যা বলছেন, তা মেনে নিলেই তো হয়। ব্যাস তারপরেই ইনকিলাব। মসনদে বসবেন তিনি। মিরজাফর ইদানীং অনুভব করতে পারছেন, মসনদ এক রঙ্গিলা খোয়াব। মসনদের জন্য তাঁর মনটা বড্ড অস্থির হয়ে উঠেছে।
জগৎশেঠের চোখদুটো স্থির হয়ে আছে ওয়াটসের মুখের উপরে।
ওয়াটস বলে চললেন, ‘এই এক কোটি টাকা আমাদের কারও জেবের ভিতরে ঢুকবে না। থাকবে কোম্পানির হিসেবের খাতায়। সিরাজদ্দৌলাকে মসনদ থেকে হটানোর জন্য আমাদের খুন-পসিনাও তো কিছু কম ঝরছে না। এর কিম্মত হিসেবে খুব বেশি নয়, মাত্র বাহান্ন লাখ টাকা আমরা চেয়েছি। পেশকাশ হিসেবে এ কি খুব বেশি? ফৌজ আর কোম্পানির এত অফিসারদের মধ্যে এ টাকা বাঁটোয়ারা করলে মাথা পিছু ক’টাকা করেই বা পড়বে?’
রায়দুর্লভ চোখ খুলে বললেন, ‘সবই তো বুঝলাম সাহেব, কিন্তু অত টাকা কোথায়?’
ওয়াটস বললেন, ‘আমরা তো জানি নবাবের দৌলত করিব চল্লিশ ক্রোর।’
হেসে উঠে রায়দুর্লভ বললেন, ‘ভুল জানেন।’
গম্ভীর হয়ে গেলেন ওয়াটস। বললেন, ‘এই টাকার কমে কর্নেল ক্লাইভ কিন্তু লড়াইয়ের ধকল নিতে রাজি হবেন না।’
এই কথা শুনে রায়দুর্লভ, মিরজাফর ও জগৎশেঠ তিন জনেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এরা সকলেই জানেন ক্লাইভ নারাজ হলে ইনকিলাবের আশা খতম। তখন তিনজনেই হবেন বদকিসমতির শিকার। হয় গর্দান যাবে। না হলে কয়েদ হয়ে দিন গুজরান করতে হবে।
রায়দুর্লভ বললেন, ‘আপনি ভুল বুঝবেন না ওয়াটস সাহেব। তোষাখানায় সত্যিই খুব বেশি টাকা নেই।’
জগৎশেঠ বললেন, ‘আমারও তাই আন্দাজ। রায়দুর্লভজি ঝুট বলছেন না।’
ওয়াটস বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কী করা যায় তাহলে?’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘এমন হতে পারে যে ইনকিলাবের পর তোষাখানা থেকে যা টাকা পাওয়া যাবে তার অর্ধেক আপনারা পাবেন। বখরা আধাআধি।’
কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনা না করে এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না।
জগৎশেঠ বললেন, ‘বেশ। আমরা নিজেদের মধ্যে আর একটু আলোচনা করে দেখি।’
সেদিনের গোপন সভা এখানেই শেষ হয়ে গেল। বোরখার আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে পর্দা ঘেরা ডুলিতে চেপে মহিমাপুর কুঠির খিড়কি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন রায়দুর্লভ, মিরজাফর ও ওয়াটস। গুপ্তচরের ভয়ে এরা সকলেই সন্ত্রস্ত।
গভীর রাতে শেঠেদের কুঠি থেকে বেরোনো তিনটে ডুলির গন্তব্য কোথায়, তা জানার জন্য মিশকিন মুসাফিরের জালসাজিশে ডুলি তিনটের পিছু নিল গোয়েন্দা নারান সিং ও তার দুই শাগরেদ।
গত রাতে মহিমাপুরের কুঠিতে আলোচনায় বসেছিলেন জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, মিরজাফর ও উইলিয়াম ওয়াটস—পরেরদিন খবরটা সিরাজদ্দৌলার কানে পৌঁছে দিল নারান সিং। পলাশিতে রায়দুর্লভের ছাউনি থেকে উদ্ধার করে যে চিঠিটা নবাবের হাতে নারান সিং আগেই তুলে দিয়েছিল, সে চিঠির বয়ানে খুবই স্পষ্ট ছিল যে, মিরজাফর, রায়দুর্লভ ও জগৎশেঠ—এই তিন প্রবীণ ওমরাহ নবাব সিরাজদ্দৌলাকে মসনদচ্যুত করার জন্য ষড়যন্ত্রে মেতেছেন। হাত মিলিয়েছেন ইংরেজদের সঙ্গে।
প্রবীণ তিন ওমরাহের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রোশ বহুদিন ধরে মনের মধ্যে পুষে রেখেছেন নবাব। চিঠির ভাষায় লিখিত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এঁদের বিরুদ্ধে সিরাজ তখন কোনও কড়া কদম ওঠাননি, কারণ সে সময় ফৌজ নিয়ে ক্লাইভের আসার সম্ভাবনা ছিল মুর্শিদাবাদে। নবাব চাননি ওই ওয়াক্তে অন্তর্কলহ বাড়ুক।
এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ক্লাইভের ফৌজ চন্দননগর থেকে ফিরে যাচ্ছে কলকাতায়। আপাতত ইংরেজ বাহিনীর মুর্শিদাবাদে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করেন নবাব।
নারান সিং-এর কথা শুনে রাগে কাঁপতে কাঁপতে সিরাজদ্দৌলা হুংকার ছেড়ে বললেন, ‘বেতমিজ তিন বুড্ডাকে এবারে সবক শিখিয়ে ছাড়ব।’
প্রথমেই নবাবের রোষ পড়ল মিরজাফরের উপর। গত কয়েকদিন ধরে দরবারে আসছেন না মিরজাফর। তলব করা সত্ত্বেও আসেননি।
মোহনলাল বললেন, ‘সিপাহসালারের পদ থেকে মিরজাফরকে এখনই বরখাস্ত করা উচিত। যত সওয়ারি দেখিয়ে জাফর আলি খাঁ সাহেব হর মাহিনা নিজামতের টাকা ধ্বংস করছেন, তত সওয়ারি নেই তাঁর রিসালায়।’
এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন সিরাজদ্দৌলা। সেই মোতাবেক পরোয়ানা জারি হল।
খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল রাজধানীতে। সিপাহসালারের পদ থেকে বরখাস্ত হয়েছেন মিরজাফর। এই পদে নিযুক্ত হয়েছেন আবদুল হাদি খান।
জাফরাগঞ্জ প্যালেসে বসে খবরটা পেয়ে ভয়ে কেঁপে উঠলেন মিরজাফর। নবাবের রোষ আগুন হয়ে ঝরে পড়তে শুরু করেছে।
ওমর বেগ বললেন, ‘এখন আর নবাবের কাছে শির ঝুঁকিয়ে পার পাওয়া যাবে না। সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে। জনাব মিরজাফর খাঁর বেইজ্জতির বদলা নিতে হবে লড়াইয়ের ময়দানে।’
মিরজাফরের পুত্র মিরনও এই মতে সায় দিল। ‘ইনকিলাবই বাঁচার একমাত্র রাস্তা।’
নিজের সঞ্চিত দৌলতের একটা বড় অংশ ওমর বেগ ও মিরনের হাতে তুলে দিলেন মিরজাফর। টাকা ছড়াতেই অনেক ঘোড়সওয়ার ও পদাতিক সেপাই সিরাজদ্দৌলার পক্ষ ছেড়ে মিরজাফরের সঙ্গে যোগ দিতে লাগল। এরা সব এসে ভিড় জমাতে লাগল জাফরাগঞ্জ প্যালেসের চৌহদ্দিতে। রাতারাতি প্রবল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল রাজধানীর সর্বত্র।
হতচকিত হয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা। তিনি ভেবেছিলেন সিপাহসালারের পদ থেকে বরখাস্ত হয়ে মিরজাফর হয়তো ‘হুজুর মাফ করুন’ বলে তাঁর পায়ে এসে পড়বেন। কিন্তু ফল হল উলটো। বাগি হয়ে উঠলেন মিরজাফর। এই বাগিপনাহ অনেক বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিচলিত নবাব লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন। শহরের সর্বত্র সেনা মোতায়েন করলেন মোহনলাল। নবাবের হিরাঝিল প্রাসাদকে কড়া নিরাপত্তা বলয়ে মুড়ে ফেলা হল।
এদিকে রায়দুর্লভের সঙ্গে ফের আলোচনায় বসলেন মিরজাফর। তিনি চাইছেন, আর গড়িমসি না করে দ্রুত ইংরেজদের সব দাবি মেনে নিয়ে চুক্তিতে দস্তখত করে দিতে। চুক্তি সইয়ের টালবাহানায় ইংরেজরা যদি পিছিয়ে যায় তাহলে গভীর সমস্যায় পড়তে হবে।
শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের প্রস্তাবেই রাজি হলেন মিরজাফর ও রায়দুর্লভ। আলোচনাক্রমে স্থির হল, তোষাখানা থেকে যদি কম টাকা পাওয়া যায়, তাহলে ইংরেজদের পাওনা কয়েকটি কিস্তিতে মিটিয়ে দেওয়া যাবে। মিরজাফরের কাছ থেকে এই বার্তা নিয়ে কাশিমবাজারে ছুটলেন পেত্রস আরাটুন।
মুর্শিদাবাদের হাওয়া ক্রমশ গরম হচ্ছে। দুর্যোগ আসন্ন। সিরাজদ্দৌলা বুঝতে পারছেন, মসনদের উপর তাঁর অধিকার একেবারে নিষ্কণ্টক করতে আরেকটা লড়াই তাঁকে লড়তেই হবে। কোনও রেহাই নেই।
এপারে জাফরাগঞ্জ। ওপারে হিরাঝিল। প্রায় মুখোমুখি দুই প্রাসাদ। মাঝখানে ভাগীরথী। নদীর দুই তীরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শক্তি প্রদর্শন শুরু করল দুপক্ষের সৈন্যরা। শোনা যাচ্ছে অস্ত্রের ঝনঝনানি, যুদ্ধের গন্ধ পাওয়া তাগড়াই উজবেগ ঘোড়ার চিঁ-হি-হি ডাক, হাতির হুংকার। মাঝে ভাগীরথী বাধা হয়ে না দাঁড়ালে এখনই হয়তো তুলকালাম বেধে যেত।
মোহনলাল বললেন, ‘কাসিদ পাকা খবর এনেছে। উইলিয়াম ওয়াটস সব অনিষ্টের মূলে। ঘোঁট পাকাচ্ছে মুর্শিদাবাদে। এখনই ওকে গ্রেপ্তার করা দরকার। আপনি অনুমতি দিন।’
নবাব বললেন, ‘না। চন্দননগর থেকে কলকাতায় ফৌজ সরিয়ে নিচ্ছেন কর্নেল ক্লাইভ। মালুম হচ্ছে ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসার কোনও মতলব ইংরেজদের নেই। এই ওয়াক্তে ওয়াটসকে গ্রেপ্তার করলে নতুন করে কাজিয়া বাধবে ইংরেজদের সঙ্গে।’
মোহনলাল ভেবে দেখলেন, নবাবের কথাটা অযৌক্তিক নয়।
কথাটা পৌঁছে গেল উইলিয়াম ওয়াটসের কানে। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে চান মোহনলাল। তবে এ নিয়ে দোটানায় আছেন নবাব। এখনও হুকুমত দেননি। শেষ পর্যন্ত কী হবে? ভয়ে বুক দুরুদুরু করতে লাগল ওয়াটসের।
এদিকে জাফরাগঞ্জ প্যালেসে যাওয়ার জন্য তলব করেছেন মিরজাফর। ওয়াটসকে সাক্ষী রেখেই তিনি চুক্তিপত্রে দস্তখত করতে চান। নবাবের গুপ্তচরেরা চারিদিকে ঘুরছে। এই পরিস্থিতিতে মিরজাফরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে ধরা পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কী করা যায়?
অবশেষে কালো বোরখায় নিজেকে আবৃত করে পর্দা ঢাকা পালকিতে চেপে বসলেন ওয়াটস। থমথমে রাজপথ দিয়ে এগিয়ে চলল ওয়াটসের পালকি।
পালকিতে বসে ঠকঠক করে কাঁপছেন ওয়াটস সাহেব। ধরা পড়লে গ্রেপ্তারির আশঙ্কা। পালকির পিছনে পায়ে হেঁটে আসছেন পেত্রস আরাটুন।
রাজপথে জায়গায় জায়গায় জোর খানাতল্লাশি হচ্ছে। পালকির পথ আটকাল একদল সেপাই।
পিছন থেকে ছুটে এলেন আরাটুন।
সেপাইদের দলপতি শুধোয়, ‘পালকিতে কে?’
‘জেনানা। মোহনলালের পিয়ারি।’ উত্তর দেন আরাটুন।
সামান্য মাইনে পাওয়া সেপাই থমকে যায়। কথাটা সত্যি হতেও পারে। অনেকেই জানে দেওয়ানজি বেশ রসেবশে থাকেন। মোরাদবাগ প্যালেসে পর্দা ঢাকা পালকির আনাগোনা লেগেই আছে।
পালকি এগিয়ে চলল।
ভয় বড় প্রবল। জাফরাগঞ্জ প্যালেসের দেউড়িতেও পালকি থেকে নামলেন না উইলিয়াম ওয়াটস। পালকি বাহকরা পালকি নিয়ে প্রবেশ করল মিরজাফরের অন্তঃপুরে।
জাফরাগঞ্জের অন্দরমহলে এসেও যেন স্বস্তি নেই ওয়াটসের। মোটাসোটা চেহারার মানুষটার পালকি থেকে বেরোনোর অতি সাবধানী ভঙ্গি দেখে প্রবল দুশ্চিন্তার মধ্যেও হেসে ফেললেন মিরজাফর। হাত বাড়িয়ে ওয়াটসের সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, আপনার ইন্তেজার করছিলাম সাহেব।
‘আহাদনামার কাগজটা?’
‘এই যে সব তৈয়ার করেই রাখা আছে।’
ওয়াটস দেখলেন ঘরের মধ্যে বড় একটা চৌপাইয়ের উপর রাখা আছে স্ক্র্যাফটনের পৌঁছে দেওয়া সাদা কাগজে লেখা সেই ড্রাফট এগ্রিমেন্ট। এছাড়াও চৌপাইয়ের উপর যত্ন করে রাখা আছে কালি, পাখির পালকের কলম ও পবিত্র কোরান।
টেবিলের কাছে এসে কাগজটায় চোখ বোলালেন ওয়াটস। রায়দুর্লভ দস্তখত করেছেন। শুধু মিরজাফরের সইটা বাকি।
মিরজাফর হেসে বললেন, ‘আপনার সমুখেই দস্তখত করব—এই ইরাদা ছিল বলে এত রাতে আপনাকে তকলিফ দিলাম।’ এই বলে কলমটা কালিতে চুবিয়ে দ্রুত আহাদনামায় দস্তখত করে দিলেন মিরজাফর। তালিয়া বাজালেন ওমর বেগ, আরাটুন ও মিরন।
বিশ্বাসঘাতকদের কেউই সহজে বিশ্বাস করতে চায় না।
ওয়াটস শুধোলেন, ‘আহাদনামায় যা লেখা আছে সব কথা ইমানদারির সঙ্গে মানবেন তো আপনি? লড়াইয়ের ময়দানে আমাদের মদত দেবেন তো?’
মৃদু হেসে মিরজাফর বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভের সঙ্গে বেইমানি করে আমি কি নিজের জান খতরার মধ্যে ফেলতে পারি?’ এই বলে পবিত্র কোরান মাথার উপরে রাখলেন মিরজাফর। এক হাতে পবিত্র পুস্তকখানা ধরে আরেক হাত রাখলেন পুত্র মিরনের মাথায়। তারপর বললেন, ‘খোদার নামে, আমার বেটার নামে কসম খেয়ে বলছি আহাদনামার সব শর্ত আমি ইমানদারির সঙ্গে মেনে চলব। লড়াইয়ের ময়দানে জান বাজি রেখে কোম্পানিকে মদত দেব আমি।’
মিরজাফরের আনুগত্য নিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন ওয়াটস।
পরের দিনই মিরজাফরের সই করা কাগজটা নিয়ে ক্লাইভের শিবিরের উদ্দেশ্য রওনা হয়ে গেলেন পেত্রস আরাটুন ও ওমর বেগ।
মিরজাফর ঠিক করলেন এখনই তিনি সেনা নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন। পলাশির প্রান্তরে গিয়ে অপেক্ষা করবেন কর্নেল ক্লাইভের জন্য।
চূড়ান্ত ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল জাফরাগঞ্জ প্রাসাদে। প্রাসাদকে ঘিরে জড়ো হয়েছে শয়ে শয়ে আহেদি, ঘোড়সওয়ার, পদাতিক, ধানুকি, মুটে, মজুর, বেলদার, হাতি, ঘোড়া, উট।
জাফরাগঞ্জের কোলাহল ভাগীরথী পেরিয়ে হিরাঝিল প্রাসাদেও পৌঁছে গেল।
হিরাঝিল প্যালেসের বুরুজে দাঁড়িয়ে দূরবিনে দৃশ্যটা দেখছিলেন সিরাজদ্দৌলা।
হাতি, ঘোড়া, উট, কামান বসানো গো-গাড়ি, পদাতিক, বন্দুকচি, ধানুকি সবই মজুত করেছেন মিরজাফর। রিসালা বেশ বড়। যুদ্ধের প্রস্তুতি জাঁকাল। সেনা-সমাবেশ ভয় জাগানোর মতোই।
তবে নবাবপক্ষও পিছিয়ে নেই। হিরাঝিল প্যালেসের নীচ থেকে ভেসে আসছে কোলাহল। বুরুজে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে ঝুঁকে নবাব দেখছেন অগণিত মাথা। জাফরাগঞ্জের দিকে তাক করে ভাগীরথীর পাড় বরাবর বসানো হচ্ছে কামান। মিরজাফরকে ভয় দেখাতে প্রচুর সেনা মজুত করেছেন মোহনলাল। এছাড়া হিরাঝিল প্রাসাদের প্রত্যেক বুরুজে প্রস্তুত হয়ে আছে তোপদার, তোপচির দল। জাফরাগঞ্জের দিক থেকে কেউ নদী পার হয়ে কেউ এদিকে আসার কোশিস করলেই গর্জন করবে কামান।
‘মির্জা!’
নানি বেগমের গলা শুনে ঘুরে তাকালেন সিরাজ। বুরুজ থেকে নেমে এলেন। থেকে নেমে ছুটে এলেন।
‘নানি বেগম তুমি?’
দুশ্চিন্তা কালি লেপেছে সিরাজের মুখে। প্রিয় নাতির মলিন মুখপানে চেয়ে জল এসে গেল নানি বেগমের চোখে। গলার উড়নি দিয়ে আঁসু মুছে নানি বেগম শুধোলেন, ‘তুমি কি জাফর আলি খাঁ সাহেবের সঙ্গে লড়াই করার মতলব করছ?’
‘মতলব তো উনি করছেন নানি বেগম। দূরবিনে চোখ রেখে একবার দেখো— আমার সঙ্গে লড়াই করার জন্য কত সেনা মজুত করেছেন উনি? বেতমিজ বুড্ডাটাকে এবার সবক শিখিয়ে ছাড়ব আমি। মিরজাফর খাঁ কি মনে করেছেন? নবাব সিরাজদ্দৌলা না-লায়েক, ডরপোক?’
সিরাজের আস্ফালনকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রখর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে শরফ উন্নেসা বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ এখনও ফরাসডাঙায় রয়েছেন বলে শুনেছি। কলকাতায় রয়েছে ইংরেজদের নওয়ারা, রয়েছেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। এ সময়ে ঘরে বিবাদ বাঁধিও না।’
হতচকিত হয়ে গিয়ে সিরাজ শুধোলেন, ‘কী বলছ নানি বেগম? মেনে নেব এই বাগিপনাহ?’
‘এই কাজিয়া তুমি মিটিয়ে নাও।’
‘এ হয় না নানি বেগম। অনেকদিন থেকে মিরজাফর খাঁ বেইমানি করে চলেছেন আমার সঙ্গে। আমি তার গর্দান নিইনি। তাঁকে গ্রেপ্তারও করিনি। সিপাহ সালারের পদ থেকে শুধু বরখাস্ত করেছি। প্রকাশ্যে বাগিপনাহ করে উনি বেইজ্জত করেছেন আমাকে। আমি চুপ করে থাকব? তাছাড়া লড়াই করার জন্যে উনিই তো প্রথমে সেনা মজুত করেছেন।’
শরফ উন্নেসা বললেন, ‘এটা একটা ফাঁদ। এই ফাঁদে তুমি পা দিও না।’
‘ফাঁদ?’
‘ভুলে যেও না গিরিয়ার কাহিনি। দরবারের ষড়যন্ত্রের আন্দাজ না পেয়ে সেবার বরবাদ হয়ে গিয়েছিলেন নবাব সরফরাজ খাঁ। প্রায় তোমার মতোই উমর ছিল তাঁর।’ কথাটা বলতে গিয়ে নানি বেগমের গলা কেঁপে গেল।
‘ডরো মাত নানি বেগম। সাজিশের কারবারিদের আমি কোতল করে ছাড়ব। প্রথমে মিরজাফর। তারপরে রায়দুর্লভ-জগৎশেঠ। সব বুড্ডাকে ঢিট করে ছাড়ব।’
শান্ত কঠিন গলায় শরফ উন্নেসা বললেন,’নিজের ঘরের লোকেদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার ওঠানোর ওয়াক্ত এটা নয় মির্জা।’
‘কী বলছ নানি বেগম? তাহলে কি আমি মসনদ মিরজাফর খাঁর হাতে তুলে দেব?’
‘না। মসনদকে নিরাপদ রাখতেই মিরজাফর খাঁর সঙ্গে বিবাদ তুমি মিটিয়ে নাও। নিজে যাও জাফরাগঞ্জ প্যালেসে। মিরজাফর খাঁর মান ভাঙানোর কোশিস করো।’
সিরাজদ্দৌলা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলেন নানি বেগমের দিকে।
শরফ উন্নেসা বললেন, ‘নিজের অহংবোধকে এই ওয়াক্তে বড় করে দেখো না মির্জা। তোমার অহংবোধের চেয়ে মসনদ অনেক বড়। মসনদের জন্য অনেক কৌশল করতে হয়। প্রয়োজনে দরবারি কেতা ভুলে খাটো করতে হয় নিজেকে। তোমার নানাজির কথা ভেবে দেখো। তুমি তখন খুবই ছোট। ভাস্কর পণ্ডিতের বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই করছেন তোমার নানাজি। সেভাবে মদত দিচ্ছেন না মুস্তাফা খাঁ ও তার সেনারা। তারা চাইছেন ভাস্করের হাতে নবাবের মওত। এক রাতে তোমার হাত ধরে মোস্তাফা খাঁর তাঁবুতে গিয়ে হাজির হলেন নবাব।’
‘তারপর?’ কৌতূহলের সঙ্গে প্রশ্ন করেন সিরাজদ্দৌলা।
‘মোস্তাফা খাঁকে তিনি বললেন, কেন তোমরা আমার সঙ্গে ছলচাতুরি করছ? বেইমানি করছ? এই তো আমি আর আমার নাতি তোমার নাগালের মধ্যে রয়েছি। হীন তরিকার কী প্রয়োজন? তরবারির আঘাতে আমাদের দুজনকেই শেষ করে দাও এই ওয়াক্তে। লজ্জিত হয়েছিলেন মোস্তাফা খাঁ। এরপর তিনি কোরান ছুঁয়ে কঠিন লড়াইয়ের ওয়াদা করেছিলেন। সেই ওয়াদা তিনি রেখেছিলেন। ফৌজ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বর্গিদের বিরুদ্ধে। বর্গিরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। তাই বলছিলাম কৌশলে অনেক কিছুই সম্ভব মির্জা। ভেবে দেখো।’
এই বলে অন্তঃপুরে চলে গেলেন নানি বেগম।
হিরাঝিল প্রাসাদের প্রশস্ত ছাতের উপর এসে দাঁড়ালেন সিরাজদ্দৌলা। একেবারে একা। নিঃসঙ্গ। বিকেল পেরিয়ে আঁধার নামছে। মাথার উপর কালচে নীল আসমানে তখন একটা দুটো করে তারা ফুটে উঠছে। ভাগীরথীর বুকেও নেমে এসেছে আঁধার। নদীর দুপাশ থেকে তখনও ভেসে আসছে দুপক্ষের সৈন্যদের তুমুল তর্জনগর্জন।
