৫৯
১৭৫৭ সালের ৩০ মে। সন্ধের মুখে ঢাক-ঢোল, কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে পলাশি থেকে মুর্শিদাবাদে ফিরলেন মিরজাফর।
আকাশ মেঘলা, থমথমে। টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। চকবাজারের পথ ধরে জাফরাগঞ্জ প্যালেসের দিকে এগিয়ে চলেছে মিরজাফরের বিরাট কাফেলা।
পথের দুপাশে কৌতূহলী মানুষের ভিড়। হালকা রিমঝিম বৃষ্টিতে ভিজছে সকলে। দুঃসহ গরমের পর স্বস্তির ধারাপাত। স্বস্তি, যুদ্ধের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকা মানুষের মনেও। ফৌজ নিয়ে পলাশি থেকে মিরজাফর ফিরে এলেন। রায়দুর্লভও নাকি দিনকয়েকের মধ্যে ফিরবেন। অর্থাৎ এখনই যুদ্ধ বাঁধছে না। চকবাজারে তাই খুশির হাওয়া।
আরও খুশি বয়ে এনেছে প্রাক-বর্ষার এই বৃষ্টি। বর্ষার মরসুম এসে পড়তে আর দেরি নেই। সুবে বাংলায় বর্ষাকালে যুদ্ধ করা যায় না। সবাই জানে। তাই আমজনতা খুশি যুদ্ধ কেউই চায় না। শোনা যাচ্ছে, কর্নেল ক্লাইভ নাকি চন্দননগর থেকে ফৌজ তুলে নিয়ে কলকাতায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এও এক খুশির খবর। তাই অনেকেরই ধারণা এখন তো নয়ই, এমনকি আগামী কয়েক মাসের মধ্যেও ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের লড়াই বাঁধার কোনও সম্ভাবনা নেই।
যুদ্ধের আশঙ্কায় ঝিমিয়ে পড়েছিল চকবাজার। লুঠতরাজের ভয়ে কমে গিয়েছিল মালপত্রের জোগান। ব্যবসায় লোকসান ও প্রাণের ভয়ে সওদার পসরা নিয়ে সরে পড়েছিল ভিন দেশি ব্যাপারিরা। চকবাজারকে কেন্দ্র করে যাদের নিত্যদিনের রুজি রোজগার, তারা পড়েছিল গভীর সমস্যায়। পলাশি থেকে সেনা প্রত্যাহারের খবরটা দুঃসহ গরমের পর বৃষ্টির মতোই স্বস্তি দিয়েছে সবাইকে।
বৃষ্টি মাথায় নিয়েই সন্ধের মুখে মানুষের ঢল নেমেছে চকবাজারের অলিগলিতে। রেড়ির তেলের আলোয় ঝলমল করছে দোকানপাট। ফুলচক এলাকায় ম-ম করছে গুলাব, বেল, জুঁইয়ের সুবাস। ফলমান্ডির দোকানে দোকানে জড়ো হয়েছে বেগমপসন্দ, রানিপসন্দ, আলফানসো ও আরো হরেক কিসিমের আমের পসরা। আমের সুবাসে ফলপট্টি জুড়ে ভনভন করছে নীল ডুমো মাছি। আতরপট্টি থেকে নাকে ভেসে আসছে হরেকরকম খুশবুদার আতরের ঘ্রাণ। পথের দুপাশে সরাইখানার রসুইঘর থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে মসল্লাদার দমপোক্ত, দুনিয়াজা, কাবাবের স্বাদু গন্ধ। এই সব নানারকম গন্ধ এবং খদ্দের ধরতে ব্যস্ত কারবারিদের হাঁকডাক দিয়েই চকবাজারের শাহি মেজাজটা চেনা যায়। যুদ্ধের আতঙ্ক ভুলে চকবাজার ছন্দে ফিরছে।
গলঘন্টের ঠুংঠাং শব্দ তুলে পাথরে মোড়া পথের উপর দিয়ে ধীর লয়ে এগিয়ে চলেছে মিরজাফরের হাতি। বয়স হয়েছে, পথের ধকল মিরজাফরের আর সহ্য হয় না। হাওদায় বসে তিনি ক্লান্তিতে ঢুলছিলেন। পথের দুপাশে জড়ো হওয়া মানুষের কোলাহলে ঘুমের চটকা ভেঙে গেল। আমআদমির চোখের সামনে সিপাহসালারের ঘুমে ঢলে পড়াটা ভালো দেখায় না। সোজা হয়ে বসলেন মিরজাফর। আড়চোখে পথের দুপাশটা জরিপ করতে লাগলেন।
কালো মেঘে ছাওয়া আকাশের মতোই থমথমে মিরজাফরের মুখ। কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। খোজা পেত্রসের মারফত ইংরেজ শিবিরে মিরজাফর বার্তা পাঠিয়েছিলেন, মুর্শিদাবাদে ইনকিলাব ঘটলে সিরাজদ্দৌলার পরিবর্তে তিনি মসনদে বসতে রাজি। এই পরিকল্পনায় সিলমোহর দিয়েছে কোম্পানির সিলেক্ট কমিটি। সেই থেকে আতঙ্কে ভুগছেন মিরজাফর। এসব কথা ফাঁস হয়ে গেলে তাঁর প্রাণসংশয়ে হতে পারে।
পলাশি যাওয়ার পথে মিরজাফর ভেবেছিলেন ইনকিলাব জলদি ঘটে যাবে। দুঃসহ মানসিক চাপ থেকে মুক্তি মিলবে। কর্নেল ক্লাইভ এসে পড়লেই তাঁর সঙ্গে ফৌজ নিয়ে যোগ দিতে প্রস্তুতও হয়ে ছিলেন মিরজাফর, কিন্তু ক্লাইভ এলেন না।
রাজধানী থেকে দূরে থাকলে রাজনীতির হালহকিকত অনেক কিছুই জানা যায় না। এক কাসিদের মুখে মিরজাফর শুনেছেন ক্লাইভের বার্তা নিয়ে মুর্শিদাবাদে এসেছেন লিউক স্ক্র্যাফটন। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে নবাবের। দুজনের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে কেউ জানে না, তবে স্ক্র্যাফটন বিদায় নেওয়ার পরেই পলাশি থেকে সেনা প্রত্যাহারের হুকুম জারি করেছেন নবাব। মালবাহী নৌকোয় খানাতল্লাশি বন্ধের পরোয়ানাও জারি হয়েছে। এই দুটো ঘটনা দুশ্চিন্তায় ফেলেছে মিরজাফরকে। তাহলে নবাবের সঙ্গে গোলমাল মিটিয়ে নিয়ে ইনকিলাবের ওয়াদা থেকে পিছিয়ে গেল ইংরেজরা?
কর্নেল ক্লাইভ বাংলা ছেড়ে চলে গেলে সিরাজদ্দৌলাকে মসনদচ্যুত করার আশা একেবারে বিলীন হয়ে যাবে। নবাবের রোষে চুরমার হয়ে যাবেন মিরজাফর-রায়দুর্লভ-জগৎশেঠ। হোসেনকুলির খণ্ডিত দেহের ছবিটা ফের ভেসে ওঠে মিরজাফরের চোখের পর্দায়। বুক ধরফড় করতে লাগল। অস্থির হয়ে পড়লেন মিরজাফর। ইংরেজরা কী ভাবছে অবিলম্বে জানা দরকার। কিন্তু কী ভাবে জানবেন তিনি? নবাবের কাসিদরা বেশ কিছুদিন ধরে তাঁকে কড়া নজরে রেখেছে। এদের উপেক্ষা করে স্ক্র্যাফটন বা ওয়াটসের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করার হিম্মত তাঁর নেই।
গভীর অবসাদে ডুবে যাচ্ছেন মিরজাফর। সিরাজদ্দৌলার অধীনে একটা দিন অতিবাহিত করাও তাঁর কাছে দোজখ যন্ত্রণার সমান। রাজধানী থেকে দূরে ছিলেন, তা একরকম ভালোই ছিল। রাজধানীতে থাকা মানেই হাজিরা দিতে হবে দরবারে। আর দরবারে হাজিরা মানেই নবাবের রক্তচক্ষু দর্শন ও ছোকরা মোহনলালকে কুর্নিশ জানানো। হররোজ বেইহজ্জতি। মুক্তির একমাত্র পথ ইনকিলাব। সত্যিই কি তা হবে?
জাফরাগঞ্জের দেউড়ি পেরিয়ে অন্দরে ঢুকল মিরজাফরের হাতি। নহবতখানা থেকে সানাইয়ে বেজে উঠল খুশির সুর। গোটা জাফরাগঞ্জ প্রাসাদ ঝলমল করছে আলোয়। অনেকদিন পর গৃহকর্তা ঘরে ফিরলেন তাই এত খুশি। হাওদা থেকে নেমে এলেন মিরজাফর। সামনে এগিয়ে এসে কুর্নিশ জানাল মিরন। মিরজাফর ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন। দুপাশে দাঁড়িয়ে সমানে তসলিম জানাচ্ছে অমাত্য ও মোসাহেবের দল। যাই হোক, নিজের পরিচিত বৃত্তের ভিতরে এসে বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করলেন মিরজাফর। শরিফ হল মেজাজ। মিরনের কাঁধে হাত রেখে প্রবেশ করলেন অন্দরমহলে।
সেদিনই গভীর রাতে জাফরাগঞ্জ প্যালেসের দেউড়িতে এসে থামল দুটো পালকি। একটা পালকি থেকে নামলেন পেত্রস আরাটুন। আরেকটা পালকির ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন ফকির। গলায় রংবেরঙের ঝুটা মুক্তোর মালা। মুখে লম্বা দাড়ি। কাঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া চুল। কাঁধে মস্ত একটা ঝোলা। পরনে কালো আলখাল্লা। তার উপরে বরফির মতো নানা রঙের কাপড়ের তাপ্পি মারা।
এগিয়ে এসে পথ আটকায় পাহারায় থাকা এক আহেদি। জাফরাগঞ্জ প্যালেসে ঢোকার মুখে আজকাল ভয়ানক কড়াকড়ি। গুপ্তঘাতকের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকেন মিরজাফর। অজ্ঞাত কেউ এলে অনেক যাচইমতেহানির পর ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মেলে।
মশালের আলোয় পেত্রস আরাটুনকে দেখে আহেদি নিশ্চিন্ত হয়। আরাটুনকে তারা চেনে। সিপাহ-সালারের সঙ্গে এই বেনিয়ার যে দারুণ দহরম-মহরম, সেকথাও তারা জানে। কিন্তু আরাটুনের সঙ্গে ফকিরকে দেখে কেমন যেন একটা সন্দেহ হয় আহেদির। ফকিরের পরিচয় জানতে চায় সে।
আরাটুন বলেন, ‘এই ফকিরসাহেব ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন। মস্ত এক তওহীদ। ইস্পাহান থেকে এসেছেন। আমার সঙ্গে মোলাকাত ক’দিন আগে। খাঁ সাহেবের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।’
নিঃসংশয়ে হল আহেদি। গত মাসছয়েক ধরে জাফরাগঞ্জ প্রাসাদে পির, ফকির, দরবেশ, সুফি, জ্যোতিষ, সাধু, সন্ন্যাসী অনেকের আনাগোনা চলছে। ইদানীং নিজের তকদির নিয়ে বড় উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন মিরজাফর।
পেত্রস আরাটুনের সঙ্গে জাফরাগঞ্জ প্রাসাদের অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন ফকির।
আরাটুন এসেছেন, সঙ্গে এক নামী তওহীদ—একথা শুনে ব্যস্ত হয়ে ছুটে এলেন মিরজাফর। ফকির ও আরাটুনকে নিয়ে গেলেন গোপন এক কক্ষে। দু-একজন ফকির, জ্যোতিষী আগে বলেছেন মিরজাফরের নসিবে নবাব হওয়ার যোগ রয়েছে। একথা শুনে আঁতকে উঠেছিলেন মিরজাফর। অনেকে বলে মুর্শিদাবাদের প্রাসাদগুলোর পাথরের দেওয়ালেরও প্রাণ আছে। তারা ফিসফাস করে অন্দরের সব কথা বাইরে ছড়িয়ে দেয়। নবাব হতে পারেন মিরজাফর—একথা প্রকাশ পেলে আর রক্ষে নেই। গর্দান যাবে। তাই ফকির, দরবেশের সঙ্গে মিরজাফর আজকাল আলোচনা সারেন অতি গোপনে।
‘সেলাম হুজুর! সহি সালামত! আমি লিউক স্ক্র্যাফটন।’ মিরজাফরকে কুর্নিশ জানালেন ফকিরের জালসাজিশে আসা স্ক্র্যাফটন।
চমকে উঠলেন মিরজাফর।
পেত্রস আরাটুন বললেন, ‘এছাড়া স্ক্র্যাফটন সাহেবকে আপনার কাছে নিয়ে আসার অন্য কোনও উপায় ছিল না। নবাবের কাসিদরা চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’
মিরজাফর খুশি হয়ে বললেন, ‘বহুত আচ্ছা। আমি স্ক্র্যাফটন সাহেবের সঙ্গে মোলাকাত করার জন্য খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কাসিদের ভয়েই ওনাকে সরাসরি জাফরাগঞ্জে তলব করার হিম্মত হয়নি। এবারে গভীর আগ্রহের সঙ্গে স্ক্র্যাফটনের মুখপানে চেয়ে মিরজাফর শুধোলেন, ‘আপনারা কি ইনকিলাবের ওয়াদা থেকে পিছু হটলেন?’
‘মোটেই না। ইয়ে আন্দাজ গলত।’
‘তাহলে কর্নেল যে ফৌজ ওয়াপস পাঠালেন কলকাতায়?’
স্ক্র্যাফটন মুচকি হেসে বললেন, ‘ও তো নবাবকে ধোঁকা দেওয়ার তরিকা।’
স্ক্র্যাফটনের এই কথায় যেন খুব একটা সন্তুষ্ট হলেন না মিরজাফর। একটু অসহিষু� গলায় বলে উঠলেন, ‘আমরা ইনকিলাবের ইন্তজারে রয়েছি। ফৌজ নিয়ে কবে আসবেন কর্নেল?’
‘আপনার সঙ্গে বোঝাপড়া চূড়ান্ত হলেই উনি ফৌজ নিয়ে এগিয়ে আসবেন।’ এই বলে ঝোলা থেকে সাদা কাগজে লেখা ইংরেজদের চার্টার অফ ডিম্যান্ডের ড্রাফট কপি বের করে মিরজাফরের হাতে ধরিয়ে দিলেন স্ক্র্যাফটন।
মিরজাফর সন্দিহান গলায় প্রস্ন করলেন, ‘কী এটা?’
‘চুক্তির খসড়া। এখন আপনি এতে দস্তখত করে দিলেই খেল খতম।’ বললেন আরাটুন।
সাদা কাগজটায় চোখ বোলাতে গিয়ে ইংরেজদের টাকার দাবি দেখে ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হল মিরজাফরের। সত্যি কথা বলতে কী—নবাবের দৌলত যে ঠিক কত, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা তাঁর নেই। নিজামত কেল্লার দেওয়ান রায়দুর্লভ হয়তো এ ব্যাপারে কিছুটা আন্দাজ দিতে পারবেন।
মিরজাফরের গম্ভীর মুখটা জরিপ করে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘আমাদের ডিম্যান্ড কিন্তু মোটেই জেয়াদা নয়।’
দেখুন সাহেব, ‘এই আহাদনামায় এখনই দস্তখত করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
ধাক্কা খেলেন স্ক্র্যাফটন। ভেবেছিলেন, কাজটা অনায়াসে হাসিল হয়ে যাবে। তিনি শুধোলেন, ‘কেন?’
‘নবাবের দৌলত সম্বন্ধে আমার আচ্ছা আন্দাজ নেই। নিজামতের দেওয়ান রায়দুর্লভ এসব জানেন। আমাকে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
স্ক্র্যাফটন চিন্তিত মুখে বললেন, ‘ইয়ে তো মুশকিল কি বাত।’
‘আপনি দিন কয়েক ইন্তেজার করুন। পলাশি থেকে রায়দুর্লভ দিনকয়েক পরেই ওয়াপস আসবেন।’
‘কিন্তু কর্নেল যে বড্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।’
মিরজাফর একটু ভেবে বললেন, ‘ইনকিলাব জলদি ঘটুক আমরা চাই। লেকিন টাকাকড়ির ব্যাপারে কোনও জবান দেওয়া আমার একার পক্ষে মুশকিল। আপনি কি দিন সাতেক মুর্শিদাবাদে অপেক্ষা করতে পারবেন না?’
স্ক্র্যাফটন দুদিকে মাথা নেড়ে বললেন, ‘না। আমাকে কালই রওনা হতে হবে। আমার উপর হুকুম—উমিচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে তুরন্ত ফিরতে হবে কলকাতায়।’
উমিচাঁদকে মোটেই পছন্দ করেন না মিরজাফর। স্ক্র্যাফটনের কথা শুনে ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, কেন? এই মামলায় কী ভূমিকা আছে উমিচাঁদের?
স্ক্র্যাফটন বললেন, উমিচাঁদ সব কিছু ফাঁস করে দিতে পারেন নবাবের কাছে। তাই ইনকিলাবের আগে মুর্শিদাবাদ থেকে তাঁকে দূরে রাখতে চান কর্নেল।
‘ইয়ে আচ্ছা তরিকা। উমিচাঁদ বহুত খতরনক আদমি।’
‘বিলকুল। উমিচাঁদকে সমঝিয়ে কলকাতা যাওয়ার জন্য রাজি করিয়েছি আমি। দেরি করলে তিনি যদি বিগড়ে যান?’
‘বেশ তো আহাদনামার খসড়া আমার কাছে রেখে যান। আমি দস্তখত করে পাঠিয়ে দেব।’
এবার বেশ মুশকিলে পড়ে গেলেন স্ক্র্যাফটন। তিনি চাইছিলেন মিরজাফরকে দিয়ে সই করিয়ে এগ্রিমেন্ট চূড়ান্ত করে কলকাতায় ফিরবেন। মিরজাফরের কাছে কাগজটা রেখে যাওয়ার কোনও ইচ্ছে তাঁর নেই। কার যে কখন কী মতিগতি হয়, তা তো আগে থেকে বলা যায় না। মিরজাফর যদি হঠাৎ ভালোমানুষ সাজার জন্য কাগজটা নবাবের হাতে তুলে দেন, তখন? ফাঁপরে পড়বে ইংরেজরা। নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ঘটানোর সব দায় গিয়ে বর্তাবে কোম্পানির উপরে।
দ্রুত একবার পেত্রস আরাটুনের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে নিলেন স্ক্র্যাফটন। চোখের ভাষায় সম্মতি জানালেন আরাটুন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ক্র্যাফটন খসড়া চুক্তির কাগজটা মিরজাফরের কাছে রেখে আসতে বাধ্য হলেন।
পরের দিন সন্ধের মুখে উমিচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিলেন স্ক্র্যাফটন। শহরের ঘিঞ্জি এলাকা পেরিয়ে এসে দ্রুত এগোতে লাগল পালকিবাহকরা। ঘন অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে চলেছে দুখানা পালকি। সামনের পালকিতে স্ক্র্যাফটন। পিছনের পালকিতে উমিচাঁদ। দু-দলে ভাগ হয়ে পালকি দুখানার সামনে ও পিছনে হনহনিয়ে চলেছে বেশ কয়েকজন বন্দুকধারী গোরা পল্টন। একেবারে সামনে বুলস আই লণ্ঠন হাতে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে দুই দেশি সেপাই।
রাত গভীর। শাহি সড়কের উপর এক সরাইখানায় এসে থামল পালকি। রাতে এখানে বিশ্রাম নিয়ে কাল ভোরে আবার যাত্রা শুরু হবে। পথে আগেই সারা হয়েছে আহার। সরাইখানায় ঢুকেই ঘুমোতে চলে গেলেন স্ক্র্যাফটন ও উমিচাঁদ।
পাশাপাশি দুখানা ঘর আকারে বেশ ছোট। তেমন আরামদায়ক নয়। ঘরের মধ্যে তক্তপোষের উপর ফরাস পেতে বিছানা। তক্তপোষই প্রায় গোটা ঘরটা দখল করে নিয়েছে। ঘরের ভিতরে নড়াচড়ার জায়গা কম। দক্ষিণমুখো জানালা রয়েছে একটা। জানলাটা খুলে দিতেই ঘরের গুমোট ভাবটা উড়ে গেল নিমেষে। কাছেই কোথাও বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। বাতাসে ঠান্ডা ভাব। বেশ ক্লান্ত বোধ করছিলেন স্ক্র্যাফটন। বাতিস্তম্ভের উপর জ্বলতে থাকা প্রদীপটা নিভিয়ে দিয়ে বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন।
জানলা দিয়ে চড়া আলো চোখের উপর এসে পড়েছে। চোখ মেলে স্ক্র্যাফটন বুঝলেন অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে। বাইরে চড়া রোদ। তড়িঘড়ি বিছানা থেকে নেমে বাইরে এসে উমিচাঁদের ঘরের দরজায় টোকা দিলেন তিনি। ভিতর থেকে সাড়া না পেয়ে জোরে ধাক্কা দিলেন দরজায়। হাট করে খুলে গেল ভেজানো দরজাটা। উমিচাঁদের ঘরের বিছানাটা পরিপাটি করে সাজানো। তিনি ঘরে নেই। অবাক হলেন স্ক্র্যাফটন।
গোটা সরাইখানা তন্নতন্ন করে খুজেও উমিচাঁদকে পাওয়া গেল না। উমিচাঁদের পালকি ও বাহকরাও নেই। স্ক্র্যাফটনের পালকির বাহকেরা ও সেপাই-পল্টনরা যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। উমিচাঁদের সন্ধান এরাও কেউ দিতে পারল না। তারা জানাল, ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে উমিচাঁদের পালকি তারা দেখেনি।
গভীর ভাবনায় পড়ে গেলেন স্ক্র্যাফটন। উমিচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় ফেরার কথা তাঁর। ফিরে গিয়ে কর্নেল ক্লাইভকে কী জবাব দেবেন তিনি?
আশেপাশে কোথাও বেড়াতে গিয়ে থাকতে পারেন উমিচাঁদ। এই আশায় সরাইখানাতেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একরাশ বিরক্তি নিয়ে স্ক্র্যাফটন বেরিয়ে পড়লেন পথে।
শাহি সড়ক থেকে যেখানে পলাশি যাওয়ার রাস্তা ভাগ হয়ে গিয়েছে সরাইখানাটা তার কাছাকাছি। হঠাৎ স্ক্র্যাফটনের মনে একটা খটকা লাগল। দ্রুত পথচলার হুকুম দিলেন তিনি।
পলাশির মোড়ের কাছে এসে থামল পালকি। চারিদিকে ঝাঁঝাঁ করছে রোদ্দুর। অদূরেই সারিসারি তালগাছে ঘেরা একটা ছায়ানিবিড় এলাকা চোখে পড়ল স্ক্র্যাফটনের। সেখানে গিয়ে একটা গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে প্রবল বিরক্তির সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগলেন স্ক্র্যাফটন।
উমিচাঁদের খোঁজ মিলল বিকেল তিনটে নাগাদ। স্ক্র্যাফটন যা আন্দাজ করেছিলেন, ঠিক তাই। পলাশির দিক থেকে হনহনিয়ে এগিয়ে আসছে উমিচাঁদের পালকি।
পালকি থামতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে একগাল হেসে উমিচাঁদ বললেন, ‘আপনাকে বোধহয় খুব পরেশান করলাম।’
‘আরে মশায় গিয়েছিলেন কোথায়? স্ক্র্যাফটনের গলায় বিরক্তির সুর।’
‘পলাশিতে।’
‘হঠাৎ পলাশিতে?’
‘রায়দুর্লভের সঙ্গে একবার দেখা করার ছিল।’
‘কিন্তু পরোয়ানা ছাড়া তো এখন পলাশিতে যাওয়া মানা!’
‘হে-হে। মুর্শিদাবাদ থেকে সে ব্যবস্থা করেই এসেছিলাম।’
‘আশ্চর্য লোক বটে আপনি!’
উমিচাঁদ হঠাৎ গলা খাটো করে শুধোলেন, ‘আচ্ছা সাহেব রায়দুর্লভের সঙ্গে কি আপনাদের কোনও কথা হয়নি?’
‘কথা মানে? কী কথা?’
পানসে মুখ করে উমিচাঁদ বললেন, ‘লাল কাগজ। রায়দুর্লভ দেখলাম আমার ফাইভ পারসেন্টের বিষয়ে কিছুই জানেন না?’
সত্যিই ঘুঘু লোক বটে এই বেনিয়া। নবাবের দৌলতের পরিমাণ ঠিক কত, সে বিষয়ে খবর রাখেন দেওয়ান রায়দুর্লভ। সেই দৌলতের পাঁচ পারসেন্ট কত টাকা হতে পারে, সে বিষয়ে আন্দাজ পাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই রায়দুর্লভকে বাজিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন উমিচাঁদ।
লাল কাগজ নিয়ে উমিচাঁদের মনে খটকা একটা লেগেছে। মুর্শিদাবাদে পড়ে থেকে এর যাচ-ইমতেহানি করার জন্য এখন কোনও একটা অজুহাত তুলে বেঁকে বসে, কলকাতা যেতে ইনকার করে? তখন? বিষয়টা সহজ করার জন্য হেসে উঠলেন স্ক্র্যাফটন।
‘হাসছেন যে?’
‘আমার ধারণা ছিল আপনি বহুত মগজদার আদমি।’
‘মতলব?’
‘আরে মশায়, রায়দুর্লভ আহাদনামার বিষয়ে জানবেন কোথা থেকে? উনি তো পলাশিতে। আহাদনামার খসড়া তো তো কলকাতা থেকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। আমি পলাশিতে গিয়ে কথা বলতে পারলাম কোথায়, যে রায়দুর্লভ খসড়া চুক্তির বিষয়ে জানবেন? মিরজাফরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি সব জানেন। রায়দুর্লভ মুর্শিদাবাদে ফিরলেই মিরজাফরের কাছ থেকে সব জানতে পারবেন।’
উমিচাঁদ হেসে উঠে বললেন, ‘দেখুন দেখি কী কাণ্ড! রায়দুর্লভের সঙ্গে যে আপনার দেখা হয়নি সে তো আমিও জানতাম। ফির বেওকুফের মতো দৌড়ঝাঁপ করলাম। হে-হে!’
নিশ্চিন্ত হলেন স্ক্র্যাফটন। যাক, খসড়া নিয়ে উমিচাঁদের মনের খটকা দূর করা গিয়েছে। পলাশি থেকে গোমড়া মুখ করে ফিরেছিলেন, এখন হাসি ফুটেছে।
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘চলুন এবারে যাওয়া যাক।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ জরুর। ফালতু খানিকটা টাইম বরবাদ হল।’
ফের চলতে শুরু করল উমিচাঁদ ও স্ক্র্যাফটনের পালকি। পথে আর কোনও গোলমাল হয়নি।
১৭৫৭ সালের ৮ জুন, উমিচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় পৌঁছে গেলেন স্ক্র্যাফটন। এই খবরটা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ক্লাইভ।
