৫৪
দেওদারপাতা ও রকমারি ফুলে সেজে উঠেছে গোটা মোরাদবাগ প্যালেস। সানাই বাজছে সকাল থেকে। সানাইয়ের সুরে খুশির আমেজ। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন সুবে বাংলার দেওয়ান মোহনলাল। পারিবারিক কবিরাজ ও হেকিম হাদি খান দুজনেই তাঁকে দরবারে গিয়ে কাজে যোগ দেওয়ার ইজাজত দিয়েছেন।
দেউড়িতে পালকি নিয়ে অপেক্ষা করছে বাহকেরা। প্রস্তুত হয়ে রয়েছে দেওয়ান সাহেবের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা। কুলজ্যোতিষীর বিধান মেনে শুভক্ষণে অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে এলেন মোহনলাল। অন্তঃপুর থেকে বেজে উঠল সমবেত শঙ্খধ্বনি।
প্রাসাদের খোলা চত্বরে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়েছিল বাদ্যকরেরা। দেওয়ান সাহেব পালকিতে উঠে বসতেই বেজে উঠল কাড়া-নাকাড়া, ঢোল, দিগর, শিঙা। বাজনা বাজাতে বাজাতে এগিয়ে চলল বাদ্যকরেরা। পিছনে তিরিশ জন সশস্ত্র আহেদির দুর্ভেদ্য বলয়ের মাঝে দেওয়ান সাহেবের পালকি। রীতিমতো সাড়া জাগিয়ে শোভাযাত্রা করে নবাবের দরবারে চললেন মোহনলাল।
হিরাঝিলের অলিন্দে দাঁড়িয়ে যত দূর দেখা যায়, এই শোভাযাত্রার দিকে অপলক চোখে চেয়ে রইল হিরা। তাঁর কোলে শ্রীমন্তলাল। টা-টা করার ভঙ্গিতে সে তার কচি হাতদুটো নেড়েই চলেছে। হিরার চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। এ আঁসু খুশির।
সুস্থ শরীর নিয়ে মোহনলালের কাজে ফেরাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল নবাবের পক্ষে। সিরাজদ্দৌলা আজ তাই খুব খুশি। ঘরেবাইরে রাজনীতির প্যাঁচে জেরবার হয়ে যাচ্ছেন নবাব। একদিকে চোখ রাঙাচ্ছে ইংরেজ বণিকেরা। অন্যদিকে রাজধানীতে বইছে ষড়যন্ত্রের চোরাস্রোত।
প্রবীণ ওমরাহদের অনেকে ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে সিরাজকে মসনদচ্যুত করতে চায়। এ কথা হিরাঝিল প্রাসাদের দিবার টপকে আজকাল চকবাজার, মনসুরগঞ্জের বাতাসে উড়ছে। অনেকের ধারণা সাজিসের কারবারিরাই মোহনলালকে বিষপ্রয়োগে খুনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ঠিক কার বা কাদের হাত রয়েছে এই দুঃসাহসিক কাজের পিছনে, তা এখনও রহস্য ঢাকা। নিজামতের গোয়েন্দারা অনেক কোশিস করেও হদিশ করতে পারেনি।
তবে মোহনলালের দৃঢ় ধারণা তাঁকে হত্যার চক্রান্তের পিছনে রয়েছে জগৎশেঠ-রায়দুর্লভ-মিরজাফরের মাথা। এরা কড়ি দিয়ে বশ করেছিল রসুইখানা বা আবদারখানার কোনও এক গোলাম বা দাখিলাকে। সেই বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল পানীয়তে।
রসুইখানা ও আবদারখানার সব গোলাম ও দাখিলাকে গ্রেপ্তার করে জেরা করা হয়েছিল, কোড়ার আঘাতে তাদের পিঠ ক্ষতবিক্ষত হলেও কোনও উত্তর মেলেনি। পরে প্রমাণের অভাবে তাদের বেকসুর খালাস করে দেওয়া হয়েছে। খুশবু বাইয়ের উপর সন্দেহ হয়েছিল হিরার। কিন্তু এতে কোনও আমল দেননি মোহনলাল। বরং খুশবু বাইয়ের অন্তর্ধান মোহনলালের মনে দাগা দিয়েছে। কেন চলে গেল খুশবু, কোথায় গেল—অনেককেই জিগ্যেস করেছিলেন দেওয়ান সাহেব, উত্তর পাননি। খুশবু সত্যিই বাহার এনেছিল মোহনলালের জীবনে।
‘দূর বাশ! দূর বাশ!’
কোড়া হাঁকিয়ে এগিয়ে চলে ঘোড়সওয়ার রক্ষী।
মোহনলালের মনে দুশ্চিন্তার মেঘ। দরবারে তাঁর অনুপস্থিতিতে ঘটে গিয়েছে অনেক ঘটনা। বেসাহারা হয়েছে চন্দননগরের ফরাসি বণিকেরা। ইংরেজদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে কাশিমবাজার থেকে ল-সাহেবকে বিতাড়িত করেছেন নবাব। ল-সাহেব তাঁর দলবল নিয়ে পাটনায় চলে গিয়েছেন। মসিয়ে ল-কে গ্রেপ্তার করার জন্য ইংরেজরা ফৌজ পাঠাতে পারে মুর্শিদাবাদে।
নবাব যে বেশ বিপাকে পড়েছেন, সেটা বুঝতে পারছেন মোহনলাল। অনেকে মসনদ থেকে নবাবকে টেনে নামাতে চায়, এ তো আর নতুন কথা নয়। নবাব যদি মসনদ হারান, মোহনলালও বরবাদ হয়ে যাবে, বরবাদ হবে তাঁর খানদান। চোয়াল শক্ত হয় মোহনলালের। মনে মনে সংকল্প করেন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। বেতমিজ, উদ্ধত ইংরেজদের প্রথমে শায়েস্তা করবেন, তারপর একে একে শেষ করবেন সাজিশের কারবারিদের।
দ্রুত এগিয়ে চলে মোহনলালের পালকি।
‘এ একেবারে পাকা খবর হুজুর।’ বললেন গোয়েন্দা মথুরামল।
নন্দকুমার চিন্তিত মুখে বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ বলেছিলেন আলিনগরের আহদনামা মোতাবেক খেসারত আদায়ের জন্য এগারোটা নৌকো তিনি মুর্শিদাবাদে পাঠাচ্ছেন। আপনি বলছেন, সব নৌকো গোলাবারুদে বোঝাই?’
‘ইয়ে বিলকুল সচ বাত দেওয়ানজি। খেসারত আদায়ের আছিলায় কাশিমবাজারে গোলাবারুদ মজুত করতে চাইছে ইংরেজরা। যে করেই হোক নৌকোগুলোকে আটকাতে হবে।’
‘নবাবের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য ইংরেজ সওদাগর বেশ আটঘাট বেঁধেই এগোচ্ছে বলছেন?’
‘জি হুজুর। ফৌজ নিয়ে পলাশিতে আছেন রায়দুর্লভ। পলাশিতে নৌকোগুলোকে আটকানো যায়। আপনি এখনই লিখে দিন নবাবকে। তিনি যেন নৌকোগুলো বমালসমেত বাজেয়াপ্ত করার হুকুম জারি করেন।’
ইংরেজ বণিকদের স্পর্ধা দেখে রাগে ফুঁসতে লাগলেন নন্দকুমার। মুর্শিদাবাদে নৌকো পাঠানোর পরোয়ানা তিনি দিয়েছেন, একথা ঠিকই। এতে ভুল কিছু ছিল না। আলিনগরের আহদনামায় বলা আছে ইংরেজ কুঠির বাজেয়াপ্ত মাল ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। সেই কারণ দেখিয়েই নৌকো পাঠানোর পরোয়ানা চেয়েছিলেন ক্লাইভ। কিন্তু সেই নৌকোগুলো করে গোলাবারুদ নিয়ে যাওয়া হবে কাশিমবাজারে, এমন তো কোনও কথা ছিল না।
আগুন ঝরতে লাগল নন্দকুমারের দুচোখ দিয়ে। ফের তাঁকে বেওকুফ বানাল ইংরেজরা?
ফরাসডাঙার যুদ্ধের সময় পনেরো হাজার টাকা ও ফৌজদার পদের লোভ দেখিয়ে ইংরেজরা ফাঁদে ফেলেছিল নন্দকুমারকে। তিনি মদত দেননি ফরাসিদের। এ নিয়ে এখন তাঁর আক্ষেপের শেষ নেই। নবাবের পাঠানো দু-হাজার উজবেক ঘোড়সওয়ারকে হুগলিতে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন নন্দকুমার। যার ফলে ক্লাইভ অনায়াসে গুঁড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন ফরাসিদের আলিশান কেল্লা।
‘গুলাব কি ফুল তাজা হ্যায়’ বলে নন্দকুমারকে ধোঁকা দিয়েছে ইংরেজরা। প্রাপ্য পনেরো হাজার টাকা পাননি নন্দকুমার। টাকার জন্য তাঁর অবশ্য তেমন আফশোস নেই। তিনি মনে করেন যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। ভুল পথে চালিত হয়েছিলেন নন্দকুমার। তাঁর সংবিত ফিরিয়েছেন কুলদেবতা নারায়ণ। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চান নন্দকুমার।
মথুরামল ফের বললেন, ‘কিছুতেই নৌকোগুলোকে কাশিমবাজারে পৌঁছতে দেওয়া যাবে না। পথে আটকাতেই হবে। আপনি লিখে দিন। আজ রাতেই আমি হরকরার হাত দিয়ে মুর্শিদাবাদে চিঠি পাঠিয়ে দেব।’
নিজের সেরেস্তায় গিয়ে চিঠি লিখতে বসলেন নন্দকুমার। ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিষ উগরে দিলেন ভাষার চমৎকার বাঁধুনি দিয়ে। চিঠিটা শেষ করে তৃপ্তি পেলেন নন্দকুমার। অন্তরে পাপবোধের গুরুভার যেন লাঘব হল অনেকটা।
চিঠি নিয়ে মথুরামল যখন বিদায় নিল, তখন রাত অনেক হয়েছে। কুলদেবতাকে প্রণাম করে শোওয়ার তোড়জোড় করতে লাগলেন নন্দকুমার। হঠাৎ এক দাখিলা এসে জানাল ক্লাইভ সাহেবের মুনশি নবকৃষ্ণ এসেছেন দেখা করতে।
একরাশ বিরক্তি নিয়ে দরবারঘরে এলেন নন্দকুমার।
ব্যস্ত ভঙ্গিতে সেলাম জানিয়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। এই অনক্তে বিরক্ত করতে এলাম।’
জলদগম্ভীর গলায় নন্দকুমার শুধোলেন, ‘কী ব্যাপার মুনশি?’
‘আজ্ঞে ক্লাইভ সাহেব আপনাকে তলব করেছেন। এখনই।’
নন্দকুমারের বিরক্তি সপ্তমে চড়ে গেল। ঝাঁঝের সঙ্গে শুধোলেন, ‘মানে?’
‘আজ্ঞে এখনই একবার যেতে হবে।’
‘এই রাতে?’
‘আজ্ঞে, সাহেবের তেমনই ইচ্ছে।’
‘আমি তোমার সাহেবের কেনা গোলাম নই। এই অসময়ে যেতে পারব না।’ গম্ভীর গলায় বললেন নন্দকুমার।
‘সে আপনার ইচ্ছে। আমি তো আর আপনাকে হুকুম করার মালিক নই। সাহেবের বার্তাটা বয়ে এনেছিলাম। তবে বলছিলাম, দূরত্ব তো খুব বেশি নয়, গেলে বোধ হয় আপনার ভালোই হত।’
দপ করে জ্বলে উঠে নন্দকুমার বললেন, ‘তোমার সাহস তো কম নয়। কিসে ভালো আর কিসে মন্দ তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে? তুমি কোম্পানির সামান্য এক নোকর, এতদূর স্পর্ধা তোমার?’
নবকৃষ্ণ জোড় হাত হয়ে বলেন, ‘গোলামের গোস্তাকি হয়ে থাকলে মাফ করবেন হুজুর।’
‘কর্নেলকে বোলো, আজ আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। কাল ভেবে দেখব।’
আর দাঁড়ালেন না নন্দকুমার। নবকৃষ্ণকে উপেক্ষা করে খড়মের শব্দ তুলে অন্দরমহলে চলে গেলেন।
মুচকি হেসে নবকৃষ্ণ মনে মনে বললেন, ‘মূর্খ ব্রাহ্মণ। আজ না হয় সামান্য নোকর বলে তুমি তাচ্ছিল্য করলে আমায়। কালের পরিবর্তন কি ঠাহর করতে পারছ না? তুমি তো কোন ছার, একদিন মুর্শিদাবাদের তামাম ওমরাহকে এই নবকেষ্টর পায়ে পড়ে করুণা ভিক্ষে করতে হবে। সেদিন আর খুব দূরে নয়।’
নন্দকুমারের হাভেলি থেকে বেরিয়ে এসে পালকিতে চড়ে বসলেন নবকৃষ্ণ।
পরের দিন নন্দকুমারের ঘুম ভাঙল কুচকাওয়াজের শব্দে। অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে দোতলার অলিন্দে এসে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল নবকৃষ্ণর। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে এলেন মথুরামল।
‘ব্যাপার কী দেওয়ানজি? এরা কেল্লায় হামলা করবে নাকি?’
শশব্যস্ত হয়ে নীচে নেমে এলেন নন্দকুমার। কেল্লার বাইরে পরিস্থিতি ভয় পাওয়ার মতোই। কুচ করছে গোরা পল্টনরা। তাদের হাতে রাইফেল। মজুত রয়েছে কামানের গাড়ি। গোলন্দাজরাও প্রস্তুত। কিলপ্যাট্রিক, আয়ারকুট ও সেনাবাহিনীর অন্যান্য ক্যাপ্টেনরা কর্নেল ক্লাইভের নেতৃত্বে হাজির হয়েছেন কেল্লার সদর দরজার বাইরে।
স্নায়ু শক্ত করে কেল্লার বাইরে বেরিয়ে এলেন নন্দকুমার। সামনে কিছুদূর এগিয়ে আসতেই তাঁর পথ আটকাল কয়েকজন গোরা পল্টন। এগিয়ে এলেন আয়ারকুট।
নন্দকুমার শুধোলেন, ‘কী মতলব আপনাদের?’
‘তা তো জানি না।’
আয়ারকুটের অবজ্ঞাসূচক কথার ভঙ্গিতে বিরক্ত বোধ করলেন নন্দকুমার। ইংরেজরা গায়ে পড়ে তাঁকে অপমান করতে চাইছে। নন্দকুমার ভুরু কুঁচকে শুধোলেন, ‘জানেন না মানে?’
‘আমরা শুধু কর্নেলের হুকুম তামিল করছি।’
‘এটা নিজামতের এলাকা। এখানে আপনারা বিনা হুকুমতে যা খুশি করতে পারেন না।’
তাচ্ছিল্যের হাসি ছুড়ে দিয়ে আয়ারকুট বললেন, ‘এ কথাটা না হয় কর্নেল ক্লাইভকেই আপনি বলবেন।’
বেশ মেজাজের সঙ্গে নন্দকুমার বললেন, ‘কোথায় কর্নেল? আমি এখনই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
‘কর্নেল ব্যস্ত আছেন। আপনি অপেক্ষা করুন।’ নন্দকুমারকে দাঁড় করিয়ে রেখে সেনাবাহিনীর ভিড়ের মধ্যে উদ্ধত ভঙ্গিতে মিলিয়ে গেলেন আয়ারকুট।
খানিকবাদে নন্দকুমারকে ভয়ানক চমকে দিয়ে কানফাটানো শব্দে গর্জন করে উঠল তিনটে ফিল্ড পিস কামান। গোলাগুলো গিয়ে পড়ল ভাগীরথীর জলে। নিজামতের কেল্লার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কামান দেগে ইংরেজ বণিকেরা প্রকাশ করল তাদের ঔদ্ধত্য।
‘ঘাবড়াবেন না হুজুর।’
চমকে ঘুরে তাকিয়ে নন্দকুমার দেখলেন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছেন নবকৃষ্ণ।
নবকৃষ্ণকে দেখে ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে নন্দকুমার বললেন, ‘এই তো! তোমাকেই খুঁজছিলাম, তোমার ক্লাইভ সাহেবের মতলব কী বলো তো?’
‘কামানের পাল্লা ইয়াদদস্ত করছেন সাহেব।’
‘এই জন্য ফরাসডাঙা থেকে উজিয়ে এখানে হঠাৎ আসতে হল কেন?’
‘তা কী করে বলি? আমি সামান্য নোকর। ধরে নিন সাহেবের মর্জি।’
‘কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে তোমার সাহেবের জন্য?’
‘এ বড় কঠিন সওয়াল। কাজে একবার ডুবে গেলে সাহেবের হুঁশ থাকে না। তবে আপনি হুগলির দেওয়ান বলে কথা! আপনাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখাটা কি ন্যায্য কাজ হচ্ছে? দেখি সাহেবকে একবার বলি।’
ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন নবকৃষ্ণ। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন নন্দকুমার। তিনি বুঝতে পারছেন কাল রাতে ক্লাইভের তলবে হাজিরা না দেওয়ায় ইচ্ছে করে তাঁকে অপমান করছেন ক্লাইভ। সেই সঙ্গে ভয় দেখাতে চাইছেন। জেদ চেপে গিয়েছে নন্দকুমারের। যা হয় হবে, কর্নেল ক্লাইভকে কড়া কথা না শুনিয়ে তিনি ঘরে ফিরবেন না। নবাবের এলাকায় এ ধরনের বেতমিজি ইংরেজরা করতে পারে না।
ঘণ্টাদুয়েক অপেক্ষা করার পর ক্লাইভের সঙ্গে সাক্ষাৎ মিলল।
ক্লাইভ প্রথমেই ব্যঙ্গের সুরে বললেন, ‘আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এখানে? আমাকে তলব করলেই তো পারতেন।’
‘কী চান আপনারা?’ তিরিক্ষি মেজাজে প্রশ্ন করলেন নন্দকুমার।
‘আপনার মেজাজটা মনে হচ্ছে শরিফ নেই।’
‘না থাকারই কথা। আজকে গরমটা বেয়াড়া রকমের। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছি। যাই হোক, মতলব কী আপনাদের?’
নবাবকে জানাবেন, ‘আমি কালই কুচ করে মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দেব। আজ এখানেই ক্যাম্প করছি।’
‘আপনার মুর্শিদাবাদ যাওয়ার কারণ?’
‘কারণ আপনাদের নবাব। শুরু থেকেই আলিনগরের সুলেনামার বেইজ্জতি করে চলেছেন উনি। আমাদের ধৈর্যেরও একটা সীমা আছে। আপনি জানেন, আমাদের উকিলকে দরবার থেকে অপমান করে বের করে দিয়েছেন নবাব?’
‘না জানি না।’ গম্ভীর ভাবে জবাব দিলেন নন্দকুমার।
‘আমার কিছু করার নেই দেওয়ানজি। আপনাদের নবাব, আমার সঙ্গে দোস্তির কিম্মত বুঝলেন না।’
‘মুর্শিদাবাদে এগারোটা নৌকো পাঠানোর পরোয়ানা আমি খারিজ করে দিলাম।’ এই বলে ক্লাইভের হাতে একটা পরোয়ানা ধরিয়ে দিলেন নন্দকুমার।
কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে, দলা পাকিয়ে পাশে ছুড়ে ফেলে দিলেন ক্লাইভ। এই অপমানে নন্দকুমারের সারা গা জ্বালা করে উঠল।
ক্লাইভ শান্ত গলায় বললেন, ‘এই পরোয়ানাটা লিখতে আপনার দেরি হয়ে গিয়েছে দেওয়ানজি। নৌকোগুলো রওনা হয়ে গিয়েছে।’
‘রওনা হয়ে গিয়েছে?’
‘কোনও কাজ ফেলে রাখা আমার ধাতে নেই।’
‘নৌকোগুলোয় গোলা-বারুদ বোঝাই করে কাশিমবাজারের উদ্দেশে পাঠিয়েছেন আপনি?’
‘ঠিকই শুনেছেন। আপনার জাসুসদের নজরদারি জবরদস্ত।’
‘গোলা-বারুদ নিয়ে যাওয়ার পরোয়ানা তো আমি দিইনি।’
‘ইয়ে সচ বাত। আপনি নৌকো পাঠানোর হুকুমত দিয়েছেন। সেটা আপনার কাজ। আর নৌকোয় কী যাবে, কী আসবে সেটা আমাদের ব্যাপার। আপনার ভাববার বিষয় নয়।’
‘আপনাদের নৌকো আটক হবে পথে।’
‘সেটা আমি বুঝে নেব। তবে নবাবকে একটা কথা জানাতে ভুলবেন না যেন, যা হচ্ছে তার জন্য দায়ী নবাব। আলিনগরের সুলেনামার বেইজ্জতি আমরা মেনে নেব না। এর খেসারত নবাবকে দিতেই হবে।’
এই বলে জুতোর শব্দ তুলে গটগট করে উদ্ধত ভঙ্গিতে হেঁটে নিজের ক্যাম্পের দিকে চলে গেলেন কর্নেল ক্লাইভ। রাগে কাঁপতে কাঁপতে নন্দকুমার ফিরে এলেন কেল্লায়।
আজ সকালে হুগলি থেকে চিঠি নিয়ে এসেছে হরকরা। চিঠি পাঠিয়েছেন নন্দকুমার। তিনি লিখেছেন, ‘…ইংরেজদের এগারোখানা নৌকো কাশিমবাজারে আসছে। সেগুলোতে গোলা-বারুদ বোঝাই করে কাশিমবাজারে নিয়ে আসছে ইংরেজরা। এদের হাবভাব সুবিধের নয়। নৌকোগুলোকে যেন অবশ্যই পলাশিতে আটকানো হয়…।’
চন্দননগরের যুদ্ধের পর নবাবের ধারণা হয়েছিল, নন্দকুমার বুঝি ইংরেজদের পক্ষে। নবাবের সেই ভুল ভাঙল। নন্দকুমার চিঠির শেষে লিখেছেন, ‘…এতকাল আপনার নানাজির ও আপনার নিমক খেয়েছি হুজুর। আর যাই হোক আমি নিমকহারামি করতে পারি না। মতিভ্রমে যদি কোনও গলত কাজ করে থাকি আমায় রহেম করবেন হুজুর।…’
এই চিঠি পেয়ে নন্দকুমারের উপর সিরাজের রাগ অনেকটাই গলে জল হয়ে গেল।
এই চিঠির বিষয় নিয়েই মোহনলালের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন সিরাজদ্দৌলা। মোহনলালের অনুপস্থিতিতে বড় নিঃসঙ্গ ও অসহায় বোধ করছিলেন নবাব। মোহনলাল কাজে যোগ দেওয়ায় ফের নতুন জোশ এসেছে নবাবের মনে।
নবাব বললেন, ‘ইংরেজদের সাহস কতটা বেড়েছে বুঝতে পারছ মোহনলাল?’
‘জি হুজুর। নৌকোগুলো বাজেয়াপ্ত করে কড়া বার্তা দিতে হবে ইংরেজদের। আপনি পরোয়ানা লিখে দিন। আপনার হুকুমত আমি রায়দুর্লভের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।’
মোহনলাল আলোচনা সেরে ওঠার উদ্যোগ করছেন, এমন সময় খাস দরবারে হাজির হল নারান সিং। নিজামতের গোয়েন্দা কাঠামোর একেবারে নীচের দিকে অবস্থিত এই ছোকরা জাসুসকে খুব পছন্দ করেন নবাব। হিরাঝিল প্রাসাদে তার অবাধ গতায়াত।
‘কী সমাচার নারান সিং?’ শুধোলেন সিরাজদ্দৌলা।
নারান সিং গম্ভীর মুখে জবাব দেয়, ‘বাত বহুত গহেরা জাঁহাপনা।’
কপালে ভাঁজ পড়ল নবাবের। প্রশ্ন করলেন, ‘নদী বাঁধার হুকুম তামিল করছে না রায়দুর্লভ?’
ও কাম উনি জান লাগিয়ে করছেন, ‘লেকিন—’
‘লেকিন?’
‘এটা পড়ে দেখুন হুজুর। রায়দুর্লভজির তাঁবু থেকে জোগাড় করেছি।’ এই বলে কেশবলালের কাছ থেকে পাওয়া কাগজটা নবাবের হাতে তুলে দিল নারান সিং।
কাগজের উপর লেখা রয়েছে কয়েকছত্র। অবশ্যই একটা চিঠির বয়ান। কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা বোঝা যাচ্ছে না। নীচে লেখকের দস্তখতও নেই। তবে হাতের লেখা যে রায়দুর্লভের, তা বুঝতে পারছেন নবাব। লেখাটা পড়ে রাগে কাঁপতে লাগলেন সিরাজদ্দৌলা।
রায়দুর্লভ লিখেছেন, ‘…আপনি ভালো করে একবার ভেবে দেখুন। ইয়ার লতিফ খাঁকে মসনদে বসানো উচিত হবে কি না। কর্নেল কি রাজি হবেন এতে? যাঁর কথা আমরা ভাবছি তিনি রাজি নন জানি। তবে ফির একবার তাঁকে রাজি করানোর কোশিস করতে হবে। ইয়ার লতিফকে সামনে রেখে ইনকিলাবে কামেয়াব হওয়া মুশকিল হতে পারে…’
কাগজটা মোহনলালের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নবাব বললেন, ‘সাবাশ নারান সিং। জবরদস্ত সাবুদ। এবারে বুড্ডা শয়তানটার গর্দান নেব।’
লেখাটা পড়ে আঁতকে উঠলেন মোহনলাল। দরবারে তাঁর মাসখানেকের অনুপস্থিতিতে ষড়যন্ত্র যে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে! এখন মাথা গরম করার সময় নয়।
মোহনলাল বললেন, ‘হুজুর আপাতত ইয়ে সাবুদ আপনার হাতে থাক। এই ওয়াক্তে কোনও কড়া কদম ওঠাবেন না। সাজিশি যাঁদের ইরাদা তাঁদের হাতে সেপাই-লস্কর কম নয়। এদিকে ইংরেজ ফৌজ আসছে মুর্শিদাবাদে। ইংরেজদের সামলে নিয়ে তারপর এই বুড্ডা শয়তানদের দলকে খতম করা যাবে। এই মুহূর্তে ইংরেজদের নৌকোগুলোকে বাজেয়াপ্ত করা বহুত জরুরি।’
মোহনলালের যুক্তি মেনে নিলেন সিরাজদ্দৌলা।
ইংরেজদের নৌকোগুলো বাজেয়াপ্ত করার পরোয়ানা জারি করে নবাব তুলে দিলেন নারান সিংয়ের হাতে। দ্রুতগামী নৌকোয় চেপে পলাশির উদ্দেশে ভেসে চলল নারান সিং। হাতে সময় কম, ভীষণ কম।
