ফলতা থেকে পলাশি – ৫২

৫২

‘…অনেকগুলো চিঠি আপনাকে লিখেছি কিন্তু আপনি কোনও উত্তর দেননি। আপনার এই আচরণ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। মনে রাখবেন আমি এদেশে এসেছি আমাদের রাজার হুকুমে। এদেশে ইংল্যান্ডের প্রজাদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই আমার আসা।

আবার আমি লিখতে বাধ্য হচ্ছি যে, আলিনগরের সমঝোতায় আমাদের যে সমস্ত দাবি মেটানোর উমিদ আপনি করেছিলেন, তা এখনও তামিল করেননি। তাহলে কী করে বুঝব যে আপনি আমাদের সঙ্গে দোস্তি অটুট রাখতে চান? আমি জানতে চাই, মসিয়ে ল ও তাঁর বাহিনীকে আপনি পাটনার দিকে যেতে দিলেন কেন? কেন আপনি তাঁদের কলকাতায় পাঠালেন না?

যাঁদের নামে ফরিয়াদ রয়েছে, যাঁরা আমাদের দুশমন তাঁদের আপনি এখনও মদত দিয়ে যাচ্ছেন। শুনতে পাচ্ছি, মসিয়ে ল ও তাঁর বাহিনীকে আপনি রসদ জুগিয়ে সাহায্যও করছেন। এই কি আমাদের সঙ্গে আপনার দোস্তির মজবুরি? একজন মানুষ মুখে যা বলেন, কাজে যদি তা না করেন, তবে তাঁর সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা হবে?

যাই হোক আমি দুহাজার সৈন্য মুর্শিদাবাদে পাঠাচ্ছি। তাদের পাটনায় যাওয়ার পরোয়ানা আপনি দিয়ে দেবেন। ভয় পাবেন না। আমার সৈন্যরা আপনার দেশের সাধারণ প্রজাদের কোনও ক্ষতি করবে না। তারা পাটনা থেকে ফরাসিদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসে আপনার দেশে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।…’

কাশিমবাজারের ফরাসিদের কলকাতায় না পাঠিয়ে পাটনার দিকে যেতে দিয়েছেন নবাব খবরটা শুনেই ক্ষিপ্ত হয়ে লম্বা একখানা চিঠি ঠুকে দিলেন ওয়াটসন। সেই চিঠি নিয়ে ডাকহরকরা ছুটল মুর্শিদাবাদে।

চিঠিটা পড়ে রাগে ফুঁসতে লাগলেন সিরাজদ্দৌলা। গায়ের জোরে চন্দননগর কেড়ে নিয়েছে ইংরেজরা। গুঁড়িয়ে দিয়েছে ফোর্ট অঁরলিও। ইচ্ছে থাকলেও ফরাসিদের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াই ঠেকাতে পারেননি নবাব। এই অক্ষমতা এখনও গভীর ক্ষত হয়ে আছে নবাবের অন্তরে। তার উপরে নুনের ছিটে দেওয়ার মতো এই চিঠি?

 ইংরেজদের স্পর্ধা দেখে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছেন সিরাজদ্দৌলা। ফরাসিদের কেন তিনি পাটনায় যেতে দিলেন, সেই নিয়ে ইলজাম ওঠাচ্ছে? ফরাসিদের গ্রেপ্তার করে আনবে বলে পাটনায় ফৌজ পাঠাতে চাইছে? কী করে একদল বেনিয়ার সাহস হয় একজন স্বাধীন নবাবকে এমন চিঠি লেখার? কী মনে করেছে ইংরেজরা? নবাব তাদের হাতের পুতুল? বারবার তারা বেইজ্জত করবে নবাবকে আর নবাব সব মুখ বুজে মেনে নেবেন?

গভীর রাতে শয্যা ছেড়ে উঠে হিরাঝিলের প্রাসাদের খোলা ছাতের উপরে প্রেতাত্মার মতো পায়চারি করতে থাকেন নবাব। চরাচর নিঝুম। আকাশে জেগে আছে ক্ষয়াটে চাঁদ। রাতজাগা পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে যায়। হঠাৎ আকাশের দিকে মুখ তুলে চেঁচিয়ে ওঠেন সিরাজদ্দৌলা, ‘কে আমি?’

পিছন থেকে কেউ একজন বলে ওঠে, ‘তুমি সিরাজদ্দৌলা। সুবে বাংলার স্বাধীন নবাব।’

ঘুরে তাকান সিরাজদ্দৌলা। অদূরে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ রাজপুরুষ। মাথায় উষ্ণীষ। তাঁতে ঝকমক করছে হিরকখণ্ড।

সিরাজদ্দৌলা শুধোন, ‘কে আপনি?’

‘আমি আলিবর্দি খাঁ। তোমার নানাজি। ক’দিন আগেও নবাব ছিলাম বাংলার।’

কেঁপে ওঠে সিরাজদ্দৌলার বুকের অন্তঃস্থল। অস্ফুট কণ্ঠে বলেন, ‘আপনি নবাব আলিবর্দি খাঁ? আপনি এখানে…এ কী করে সম্ভব?’

‘তোমার তকলিফ দেখে আর স্থির থাকতে না পেরে বেহেস্ত থেকে নেমে এসেছি বেটা।’

নানাজির সামনে হাঁটু মুড়ে বসেন সিরাজদ্দৌলা, ‘আমায় মাফ করুন নানাজি। আপনার মসনদের মর্যাদা আমি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি।’

‘এখনও সময় আছে মির্জা। কাবিল ইনসানের মতো ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। আজ যেখানে এসে তুমি দাঁড়িয়েছ, তার জন্য দায়ী তুমি। তোমার দহসত-ভয়। তোমার সবচেয়ে বড় দুশমন ইংরেজরা নয়, মনের মধ্যে ইমারত হয়ে বসা ইংরেজদের ভয়। এই ভয় তোমাকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। কেন পালিয়ে এলে হালসিবাগান থেকে? কেন ইংরেজদের শর্তে দস্তখত করলে আলিনগরের সুলেনামায়? কেন অবরোধ করলে না ফোর্ট উইলিয়াম? ফৌজ নিয়ে খুদ নিজে কেন ছুটে গেলে না চন্দননগরে? দহসতের দাস হয়ে একের পর এক ভুল করেছ তুমি। এবার রুখে দাঁড়াও। ডরো মাত। কাবিল-ই-ইনসান হয়ে ওঠো বেটা।’

‘আপনি আমার মনে সাহস দিন নানাজি।’

মুচকি হেসে আলিবর্দি বললেন, ‘সাহস কেউ কাউকে দিতে পারে না বেটা। নিজেকে অর্জন করতে হয়।’ আবছা হয়ে আসে আলিবর্দির অবয়ব। শূন্যে উঠে যেতে থাকেন আলিবর্দি খাঁ।

‘আমাকে একলা ফেলে আপনি চলে যাচ্ছেন নানাজি?’ চিৎকার করে ওঠেন সিরাজদ্দৌলা।

ঘুম ভেঙে যায়। ধড়ফড় করে উঠে বসেন সিরাজ। পাশে শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে লুৎফুন্নেসা। নবাবের চিৎকার শুনে একজন বাঁদি ছুটে আসে অন্দরে। নবাব হাতের ইশারায় তাকে চলে যেতে বললেন।

দরদর করে ঘামছেন নবাব। কী আশ্চর্য স্বপ্ন! নানাজি কথা বলে গেলেন তাঁর সঙ্গে! নবাবের কানে অনুরণনিত হতে লাগল নানাজির জবান—’এবারে রুখে দাঁড়াও। ডরো মাত। কাবিল-ই-ইনসান হয়ে ওঠো বেটা।’

সন্তর্পণে বিস্তরখানা ছেড়ে নেমে ঘরের দেওয়ালে টাঙানো বেলজিয়াম গ্লাসের মস্ত আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালেন সিরাজ। পাশে বাতিস্তম্ভের উপরে জ্বলছে মৃৎপ্রদীপ। আচকানের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে সিরাজদ্দৌলা বের করে ওয়াটসনের চিঠিটা আগুনের শিখায় ধরলেন নবাব। আগুনে পুড়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে কাগজ। সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন সিরাজদ্দৌলা।

পলাশিতে ফৌজ নিয়ে বসে আছেন রায়দুর্লভ। নবাবের হুকুমতে চন্দননগর যাওয়ার পথে ক্লাইভের হুমকি চিঠিতে ভীত হয়ে পলাশিতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। তারপরে অতিবাহিত হয়েছে বেশ কয়েক সপ্তাহ। ইংরেজরা চন্দননগরের যুদ্ধ জিতে নিয়েছে। ফরাসিরা চলে গিয়েছে কাশিমবাজার ছেড়ে। মোহনলাল সুস্থ হয়ে উঠলেও শরীর দুর্বল। এখনও দরবারে এসে কাজে যোগ দেননি—পলাশিতে বসে হরকরার মুখে এসব খবরই শুনেছেন রায়দুর্লভ।

গতকাল এক কাসিদের হাত দিয়ে একখানা চিঠি পাঠিয়েছেন জগৎশেঠ। তাতে শুরুতেই আছে হুঁশিয়ারি। শেঠজি লিখেছেন, ‘…এ চিঠি পড়েই পুড়িয়ে ফেলবেন। গোয়েন্দা প্রধান মথুরামলের চরেরা সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাই হোক, আপনি মুর্শিদাবাদে না থাকায় বড় তকলিফের মধ্যে পড়েছি। ইংরেজরা চাইছে ইনকিলাব জলদি ঘটুক। কিন্তু পরবর্তী নবাব কে হবেন? ইয়ার লতিফ খানের নাম প্রস্তাব করেছেন উমিচাঁদ। তেমন আর কাউকেই যখন হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন এই প্রস্তাব নামঞ্জুর করে ইনকিলাবের ওয়াক্ত পিছিয়ে দেওয়ার কোনও মানে হয় না বলে আমি মনে করি। এ বিষয়ে আপনার মতামত দ্রুত জানাবেন। চিঠি পাঠাবেন খুব সাবধানে।…’

উত্তেজনায় অস্থির হয়ে পড়েছেন রায়দুর্লভ। বুঝতে পারছেন, নবাব বদলানোর জন্য জোর তৎপরতা শুরু হয়ে গিয়েছে মুর্শিদাবাদে। কিন্তু তিনি এই প্রক্রিয়ার মধ্যে যুক্ত থাকতে পারছেন না। এ সময় পরিস্থিতির রাশ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে পরে বড় লোকসান হতে পারে।

মসনদে বসবেন দুহাজারি মনসবদার ইয়ার লতিফ খান, এই প্রস্তাবে রায়দুর্লভের বড় একটা সায় নেই। বর্তমানে জগৎশেঠের গদি পাহারার কাজে নিযুক্ত ইয়ার লতিফ। তিনি নবাব হলে তার উপরে জগৎশেঠের প্রভাব থাকবে খুব বেশি। এতে রায়দুর্লভের কোনও ফায়দা হবে না।

তাছাড়া ইয়ারলতিফের খানদান তেমন জবরদস্ত নয়। অনেক ওমরাহই হয়তো ইয়ার লতিফকে নবাব বলে মানতে চাইবে না। সুবে বাংলার মসনদে কি যেকোনও কাউকে বসানো যায়? এখনই মুর্শিদাবাদে গিয়ে একবার জগৎশেঠ ও মিরজাফর খাঁর সঙ্গে কথা বলা দরকার। কিন্তু সে উপায় নেই।

পিঁজরায় বন্দি চিড়িয়ার মতো ছটফট করতে লাগলেন রায়দুর্লভ। সত্যিই মন্দ নসিব তাঁর। ফৌজ নিয়ে তাঁকে আপাতত পলাশিতেই থাকতে হবে। চন্দননগরের যুদ্ধ মিটে গেলেও এখনও তাঁকে মুর্শিদাবাদে ফেরার ইজাজত দেননি নবাব। এ নিয়ে দু-দুবার চিঠি লিখেছিলেন রায়দুর্লভ। দুবারই নবাব নামঞ্জুর করেছেন।

সকালের নাস্তা সেরে তাঁবুর বাইরে বড় একটা বটগাছের নীচে ফরাসের উপরে বসে গড়গড়া টানতে টানতে নিজের বদনসিবের কথা ভাবছিলেন রায়দুর্লভ। হঠাৎ দূরে দেখা গেল ধুলোর মেঘ। শোনা গেল ঘোড়ার খুরের শব্দ। সচকিত হয়ে উঠলেন রায়দুর্লভ। দ্রুত তাঁর সেনাছাউনির দিকে এগিয়ে আসছে একজন ঘোড়সওয়ার। আর একটু সামনে আসার পর সওয়ারিকে চিনতে পারলেন রায়দুর্লভ। নারান সিং। নবাবের অন্যতম খাস লোক। গোয়েন্দা মথুরামলের ডান হাত।

ঘোড়া থেকে নেমে রায়দুর্লভের সামনে এসে তসলিম জানাল নারান সিং।

রায়দুর্লভ শুধোলেন, ‘কী সমাচার বয়ে এনেছ?’

‘নবাব বাহাদুরের পরোয়ানা।’ এই বলে একটা পাকানো কাগজ রায়দুর্লভের হাতে তুলে দিল নারান সিং।

পলাশি থেকে মুর্শিদাবাদে ফেরার বার্তা নাকি? প্রবল কৌতূহলের সঙ্গে পাকানো কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরলেন রায়দুর্লভ। অচিরেই তার মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেল।

নবাব লিখেছেন, ‘…নওয়ারা নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসতে পারেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। তাই পলাশির আমবাগানের বেশ কিছু বড় বড় গাছপালা কেটে নদীতে ফেলে জলদি নদী বাঁধতে হবে। ইংরেজদের নওয়ারা যাতে পলাশির উত্তরে না এগোতে পারে। নারান সিং দিন কয়েক থাকবে পলাশিতে। কাজ কেমন এগোচ্ছে তা দেখে এসে আমাকে জানাবে।…’

রায়দুর্লভের উপর বিশ্বাস নেই নবাবের। পরোয়ানা পাঠিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। হুকুম কার্যকর হচ্ছে কিনা সেটা দেখার জন্য দিনকয়েক নারান সিংকে পলাশিতে বসিয়ে রাখতে চান। নিজামতের দেওয়ান রায়দুর্লভের উপর নজরদারি করবে নবাবের কাসিদ— এটা ভাবতেই রায়দুর্লভের গা রাগে চিড়বিড় করে উঠল।

কাগজটা গুটিয়ে নিয়ে শ্লেষের সুরে রায়দুর্লভ বললেন, ‘তুমি তো দিনকতক থাকবে এখানে। হুকুম তামিল হচ্ছে কি না দেখভাল করবে। নবাব দেখছি সেরকমই লিখেছেন।’

হাসি মুখে নারান সিং বলল, ‘আপনি নিজামতের দেওয়ান। আমি কি আপনার উপর নজরদারি করতে পারি? আমি কালই ফিরব।’

রায়দুর্লভ মনে মনে বললেন, ‘ইবলিশের বাচ্চা! তোমার নবাব আর কতদিন? ইনকিলাবের পর তোমার কী হাল করি, তুমি দেখো।’

সেদিনই হাঁকডাক ছেড়ে শয়ে শয়ে মজুর-বেলদার জড়ো করে নবাবের হুকুম তামিল করতে লেগে পড়লেন রায়দুর্লভ।

দরবার বসেছে হিরাঝিলের প্রাসাদে। মসনদে আসীন সিরাজদ্দৌলা। হাজির আছেন সব আমির ওমরাহরা। জগৎশেঠ, মিরজাফর, মিরমদন, হাদি আলি খান, ইয়ার লতিফ খান ও আরও অনেকে। দরবারের কার্যক্রমের শুরুতেই মোহনলালের তবিয়ত-সমাচার গুজারেশ করছেন হেকিম হাদি খান।

হেকিম সাহেব বললেন, ‘দেওয়ান মোহনলাল এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আজ সকালে মোরাদবাগ প্যালেসের মধ্যে কিছুক্ষণ ঘোড়া দাবড়েছেন। আমি মনে করি আগামী দিন দুয়েকের মধ্যে তিনি দরবারে এসে কাজে যোগ দিতে পারবেন।’

খুশি হয়ে হেকিম হাদি খানকে খেলাত উপহার দিলেন নবাব। তাঁর হাতে পরিয়ে দিলেন হিরের বড় একটা আংটি। হাতে তুলে দিলেন পাঁচশো আশরফি ভর্তি একটা চামড়ার বটুয়া। নবাবকে সুক্রিয়া ও তসলিম জানিয়ে বিদায় নিলেন হাদি খান।

এবারে পেশকার পড়তে শুরু করলেন জরুরি চিঠিপত্র। প্রথম চিঠিটাই কর্নেল ক্লাইভের। কর্নেল লিখেছেন, ‘…জাঁ ল-কে পাটনার দিকে যেতে দিলেন কেন আপনি? আফগানরা যদি আপনার দেশ আক্রমণ করেন তাহলে প্রথমেই তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে মসিয়ে ল আপনাকে ও আমাদের বিপদে ফেলবে। আমরা আমাদের দুশমনকে তার খেয়াল মাফিক চলতে দিতে পারি না। হয় আপনি পাটনায় ফৌজ পাঠিয়ে মসিয়ে ল-কে ধরে এনে আমাদের হাতে তুলে দেবেন, না হলে আমি পাটনায় ফৌজ পাঠিয়ে জাঁ ল আর ফরাসিদের বন্দি করে আনব।…’

‘খামোশ!’ চিৎকার করে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা।

এই আকস্মিক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল পেশকার। হাত থেকে পড়ে গেল কাগজপত্র। নবাবের আগুনে মেজাজের বহিঃপ্রকাশে ত্রস্ত হয়ে উঠল দরবারের সকলে।

সিরাজদ্দৌলা দরবার কাঁপিয়ে হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘আমি সিরাজদ্দৌলা। সুবে বাংলার স্বাধীন নবাব। কী মনে করেছে এই ইংরেজ বণিকের দল? আমার দেশে যা ইচ্ছে তাই করবে? আমার উপর যা খুশি হুকুম করবে আর সেই হুকুম আমি তামিল করব? কী অন্যায় করেছে ফরাসিরা যে তাদের গ্রেপ্তার করে ইংরেজদের হাতে জিম্মা করে দিতে হবে?’

নবাবের দুই চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছে। যার দিকেই নবাব তাকাচ্ছেন, সে শিউরে উঠছে।

নবাব ফের গর্জন করে উঠলেন, ‘আমি জানি, অনেকে আমাকে মসনদ থেকে হঠাতে চায়। গোপনে ইংরেজদের সঙ্গে আঁতাত করছেন তাঁরা। আমার শরাফতি দেখে ভাববেন না যে নবাব নাজুক, নালায়েক। ইয়ে হ্যায় আখেরি হুঁশিয়ারি। ইয়াদ রাখবেন। এর পরেও সাজিশির কোশিস যাঁরা করবেন, তাদের আমি জ্যান্ত গোরে পাঠাব, কোতল করে ছাড়ব।’

ইষ্ট নাম জপ করতে লাগলেন জগৎশেঠ। মিরজাফরের চোখের পাতা কেঁপে উঠল। দুজনেই বুঝতে পারছেন, কথাগুলো তাদের শুনিয়েই বলা।

এমন সময় দরবারে ঢুকল ইংরেজদের উকিল। ক্লাইভের চিঠি পেয়ে কী সিদ্ধান্ত নিলেন নবাব, সেটা জানতেই তার আসা। ইংরেজদের উকিলকে দেখেই দপ করে ফের একবার আগুন জ্বলে উঠল সিরাজের মাথায়। তিনি গর্জন করে উঠলেন, ‘ইস বেতমিজ আদমিকো ঘর সে নিকালো।’

থরথর করে সারা গা কাঁপছে নবাবের। তাঁর রাগের এমন বহিঃপ্রকাশ অনেকদিন দেখেনি দরবারি জনতা। ভয় পেয়ে দরবার ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল ইংরেজদের উকিল। বাইরে থেকে শুনতে পেল সে নবাবের হুংকার, ‘এই বেতমিজ ইংরেজ জাতটাকে আমি শেষ করে দেব।’

এবারে মিরজাফরের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় নবাব বললেন, ‘জনাব মিরজাফর খাঁ। ফৌজ নিয়ে আপনি তৈয়ার হোন। কালই কুচ করতে হবে কলকাতার দিকে। আমি নিজেও যাব।’

এই বলে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত দরবার ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন নবাব।

হুলুস্থূল লেগে গিয়েছে পলাশিতে। বেলদার-মজুরদের হইহট্টগোলে মুখর হয়ে উঠেছে পলাশির নীরব প্রান্তর। শয়ে শয়ে কুঠারের আঘাতে মাটি নিচ্ছে সদ্য ফলবতী বিরাট বিরাট আমগাছগুলো। ঝাপুস-ঝুপুস-ঝপাস শব্দে ধরাশায়ী হয়ে পড়ছে। বাসা তছনছ হয়ে যাওয়ায় চিড়িয়া উড়ছে আতঙ্কে।

দলে দলে মজুরেরা মাটিতে শুয়ে পড়া ডালপালা সমেত ঝাঁকড়া গাছগুলোকে দড়ি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নদীতে নিয়ে ফেলছে। পলাশির কাছে নদী বাঁধার হুকুম দিয়েছেন নবাব। ইংরেজদের নওয়ারা যাতে গঙ্গা বেয়ে মুর্শিদাবাদে না আসতে পারে, সেই জন্য এই উদ্যোগ। ব্যস্ত হয়ে কাজের তদারকি করছেন রায়দুর্লভ। মজুরেরা যাতে কাজে ফাঁকি না দেয়, সে জন্য কোড়া হাতে অনবরত পায়চারি করে বেড়াচ্ছে একদল পেয়াদা।

দুপুরে আহারের পর তাঁবুর ভিতরে পালঙ্কের উপরে কাত হয়ে শুয়ে আয়েস করছিল নারান সিং। ওঠানো রয়েছে জানলার চিলমন। দূরে দেখা যাচ্ছে নদী। মজুর-বেলদারদের হইচইয়ের আওয়াজ ভেসে আসছে নারান সিংয়ের কানে। মনে মনে মুচকি হাসে নারান সিং। ভালো ফ্যাসাদে পড়েছে নিজামতের দেওয়ান সাহেব।

রায়দুর্লভ-জগৎশেঠ-মিরজাফর এই তিন গদ্দার যে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নবাবের বিরুদ্ধে সাজিশে মেতেছে, এ কথাটা গোয়েন্দাগিরিতে নিযুক্ত নারান সিংয়ের কানে এসেছে। কিন্তু কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনও জোগাড় করা যায়নি। তবে সন্দেহটা নবাবের মনে ভালো করেই গেঁথে দিতে পেরেছে নারান সিং। নদী বাঁধার কাজের তদারকিটা আছিলা। আসলে নবাবের নির্দেশে রায়দুর্লভের উপর জাসুসগিরির কাজে নারান সিংয়ের পলাশিতে আসা।

‘হুজুর তামাক এনেছি।’ ঘরের পর্দা সরিয়ে গড়গড়া হাতে ঘরে ঢুকল কেশবলাল— রায়দুর্লভের খাস দাখিলা। নারান সিং নবাবের পেয়ারের লোক বলে কথা। তার যাতে সেনাছাউনিতে কোনও অসুবিধা না হয় সেদিকে ভালো করে নজর রাখার জন্য কেশবলালকে বিশেষ নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন রায়দুর্লভ।

গড়গড়া হাতে নিয়ে ভুড়ুক ভুড়ুক করে তামাক টানতে লাগল নারান সিং। কেশবলালকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুধোল, ‘কিছু বলবে?’

চাপা গলায় কেশবলাল বলল, ‘কী ইনাম দেবেন হুজুর?’

‘ইনাম? কথাটা বলে চমকে উঠে কেশবলালের মুখের দিকে তাকাল নারান সিং।’

অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ছুটে গিয়ে দরোয়াজায় ঝুলতে থাকা পর্দাটাকে ভালো করে টেনে দিল কেশবলাল। গড়গড়া পাশে সরিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসল নারান সিং।

পিরানের জেবের ভিতর থেকে একখানা কাগজ বের করে এনে কেশবলাল বলল, ‘আমার মনিব জাজিমের নীচে রেখেছিলেন কাগজটা। কাসিদের হাত দিয়ে বোধ হয় পাচার হওয়ার কথা ছিল। একবার চোখ বুলিয়ে দেখুন। আপনার কাজে লাগবে। সাবধান হুজুর। মনিব জানতে পারলে কিন্তু আমার গর্দান যাবে।’

প্রবল উত্তেজনায় কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরল নারান সিং। খুশি ঝিলিক দিয়ে উঠল তার মুখে। কাগজটা দ্রুত পিরানের ভিতরে গোপন খাপে চালান করে দিল নারান সিং।

‘আমার ইনাম?’ নারান সিং-এর সামনে হাত প্রসারিত করল কেশবলাল।

‘জরুর মিলবে ইনাম।’ এক গাল হেসে গেঁজের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে পাঁচটা আশরফি বের করে কেশবলালের হাতে গুঁজে দিল নারান সিং।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *