1 of 2

প্রহসন

প্রহসন

বয়স যত বাড়ে মেজাজ তত তিরিক্ষি হয়ে যাবার কথা। কিন্তু প্রিয়নাথ সারাদিন মেজাজ ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেন। কিছুতেই তিনি নিজেকে আর রিপুর তাড়নার মধ্যে ফেলে দিতে চান না।

সকাল থেকেই শুরু।

লোডশেডিং। জল তোলা যাচ্ছে না। বাড়িতে এতগুলি লোকের বাথরুমের জল, এছাড়া কাচাকাচি আছে অফিস, কলেজ, স্কুল যাবার তাড়া, ট্যাঙ্কের জল না থাকলে দোতলা, তিনতলা সম্পূর্ণ কানা। একতলায় তবু চলে যায়। টিউবওয়েলের জল টেনে স্নানটানও সারা যায়—কিন্তু তখন কাজের লোকদের কী মুখ!

কে টানবে এত জল!

কে টানবে এত জল!

তা ঠিক, যেন সবটাই প্রিয়নাথের দায়। ডিপটিউবওয়েল না করার খেসারত। সবার যেন এক কথা, তাঁকে তাক করে, তুমি বোঝে। কে টানবে এত জল।

এই তো দু-বালতি জল উপরে তুলে দিলাম। হাত জোড়া, যাই কী করে! ছোড়দা বের হবে, সবে ভাত নেমেছে। কোনদিকে সামলাব!

রান্নার মেয়েটা আজ দেরি করে আসায় সকাল থেকেই বেদানার চোপা শুরু হয়ে গেছে। সবার আগে বের হয় তার ছোড়দা, হাসপাতাল বলে কথা। সে নিজেই ছোটো ডিকচিতে ভাত বসিয়ে দিয়েছে—গাড়ি এলেই ছোড়দা বের হয়ে যাবে। তারপরই তর তর করে নেমে আসবে মেজদা মেজবউদি। ওরা একসঙ্গে অফিস পাড়ায় যায়। গাড়িতে গেলেও এক ঘণ্টার কমে হয় না। বাড়িটা অফিস পাড়া কিংবা হাসপাতাল থেকে দূরে হয়ে যাওয়ায় সকাল থেকেই তাড়া—এই ঝমকি, টেবিলে ভাত দিয়ে দাও–মেজদা, মেজবউদি নামছে, এই ঝমকি মাসিমা আজ পোস্তর বড়া খাবে, তাঁর জন্য আলাদা পোস্তর বড়া করে রেখো। এই ঝুমকি, মান্তু নান্টুকে ডিমের ঝোল করে দেবে, মাগুর মাছ খেতে চায় না—প্রিয়নাথ নিজের বসার ঘরে বসে সবই শুনতে পান। বাড়িটা শহরের বাইরে হওয়ায়, স্কুল কলেজ হাসপাতাল অফিস সবই প্রায় এক দেড়ঘণ্টা দূরে হয়ে যায়। উলটোডাঙা কিংবা কাঁকুরগাছিতে বাড়িটা কেন যে করলেন না, সেই নিয়েও কম উম্মা নেই বউমাদের–ইস সকাল হতে না হতেই নাকে মুখে গুঁজে ছোটো-পারা যায়।

প্রিয়নাথ বোঝেন বউমাদের কথায় খোঁচা থাকে—এক সময় এতে তিনি ক্ষুব্ধ হতেন, আজকাল তাঁর সব সয়ে গেছে।

এমনিতেই জলের টানাটানি, জলের সাপ্লাই কমে গেছে—বিড়ালের পেচ্ছাবের মতো সরু হয়ে নীচের ট্যাঙ্কে জল পড়ে, সারাদিনে ট্যাঙ্ক ভর্তি হয় না, জল খরচের নানা বিধিনিষেধও তিনি সব কাজের লোকদের ওপর জারি করে দেন। এই যেমন,

শোনো ঝুমকি, খুচরো বাসনকোসন টিপকলের জলে ধুয়ে নেবে। লাইনের জলে হাত দেবে না। ঠিকা ঝি সুমিত্রা এলেও সতর্ক করে দেন, লাইনের জলে একদম হাত দেবে না। ট্যাঙ্ক ভরেনি। কাচাকাচি সব টিপকলের জলে সারবে। নীচের ট্যাঙ্ক ফাঁকা, উপরে জল উঠবে কী করে।

মুসকিল কুচিকে নিয়ে।

মাস তিনেক হল, বাড়িতে আমদানি।

অবশ্য রমলার দোষও দেওয়া যায় না। তার টুকিটাকি ফুট ফরমাস খাটার লোক নেই, প্রাতঃ ভ্রমণে বের হয়ে এক সকালে মেয়েটাকে নিয়ে হাজির।

প্রিয়নাথ সেদিন বাজারে বের হচ্ছেন, তখনই রমলা ঢুকে বলেছিল, নিয়ে এলাম মেয়েটাকে। দুশো টাকা দিলেই হবে। আমাদের তো দেখার কেউ নেই, এক গ্লাস জল চাইলে পাওয়া যায় না। দোতলা থেকে ডাকলে কেউ সাড়াই দিতে চায় না।

প্রিয়নাথ বললেন, ভালো করেছ।

সেদিন তিনি বাজারে বের হচ্ছেন, দেরি হলে পছন্দমতো মাছ পাওয়া যাবে না। স্ত্রীর নিবুদ্ধিতার প্রতি কোনো কটাক্ষ না করে বের হয়ে যাওয়াই আত্মরক্ষার প্রকৃষ্ট উপায়—কুচিকে নিয়ে তিনজন কাজের লোক, থাকা-খাওয়া, এবং তাদের শোওয়ার ব্যবস্থা, এছাড়া বাড়িটায় আলাদা বাথরুম নেই। কাজের লোকদের জন্য বাইরে কলতলায় ব্যবস্থা করে দিলেও, তারা কলতলায় খোলামেলা জায়গায় চান করতে রাজি না, সেই জন্য যদি থাকতে না চায় মুসকিল

থাকবে কেন। কাজের লোক বলে কি তারা মানুষ না! সিঁড়ি ধরে নামতে নামতে বড়ো বউমার মন্তব্য।

ঠিক কথা। খুবই যথার্থ কথা।

তিনিও জানেন, থাকবে না। পালাবে। তোষামোদ করে কাজের লোক না রাখতে পারলে, এখন যে খুবই বিড়ম্বনা, তাছাড়া এত বড়ো সংসারে, কর্তা গিন্নি মিলে দু-জন, তিন পুত্র, তিনি বউমা মিলে ছ-জন, আর চার নাতি-নাতনী, এই মিলে সংসার বড়োই বলা যায়, তার ওপর আরও তিনজন, এতসব লোকের খাওয়া-থাকা, শোওয়া, তাদের জলখরচ থেকে শুরু করে হাত খরচের বহর যে। কত বেড়ে যায়, প্রিয়নাথের মাথায় যে বোঝা কত ভারী হয়ে যায়, কেউ বুঝতেই চায় না। বউমারা ছেলেরা তো কেউ মাগনা খায় না, টাকা দিয়েই খায়। সুতরাং, খরচ কী বাড়ল বা কী কমল তাদের দেখার কথা না—তোমাকে বাপু গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতেই হবে।

সকালে উঠেই তিনি বাথরুম সেরে, মোটর চালিয়ে লিখতে বসেন। আধ এক পাতা লেখা হতে না হতেই বেদানা দরজায় হাজির। হাতে তিন চার রকমের বাজারের থলে।

আমি এগচ্ছি।

এগও।

লেখার কাগজ সরিয়ে তিনি উঠে পড়েন। তারপর ফর্দ মতো বাজার। সব মাছ সবাই খায় না। একমাত্র কাটা পোনা ইলিশ পার্সে এবং চিংড়ি মাছ সর্বজনগ্রাহ্য। তবে রমলা হাঁপের রুগি বলে, একমাত্র সে-ই চিংড়ি আর ইলিশ পাতে নেয় না। অন্য মাছ, যেমন প্রিয়নাথ পছন্দ করেন মৌরলা মাছ। নাতনীরা বউমারা মৌরলা মাছ কেউই খেতেই চায় না। প্রিয়নাথ পছন্দ করেন পাবদা মাছ, ছোটো বউমা পাবদা মাছ দেখলেই অক অক করে কলতলায় ছুটে যায়। কফের দলার মতো দেখতে—তিনি অবাকই হয়ে যান, লৌটটা মাছ হলেও কথা ছিল, পাবদা মাছ কফের দলা হয়ে গেলে তিনি যে নিরুপায়। মাগুর মাছ ছেলেরা এবং তিনি নিজে খুবই পছন্দ করেন, কিন্তু বড়ো নাতি খায় না।

কেন খায় না?

রমলা বলেছিল, তুমি ডেকে জিজ্ঞেস কর না।

হ্যারে পার্থ, মাগুর মাছ খাস না কেন?

সে কোনো জবাব না দিয়ে সিঁড়ি ধরে তিনতলায় ছুটে গিয়েছিল।

তার হয়ে বড় বউমা হাজির।

আর বলবেন না বাবা, বারান্দায় সেদিন একটা মুচি জুতো সেলাই করছিল। মাগুর মাছের চামড়া মুচিটার গায়ের চামড়ার মতো। ওর খেতে নাকি ঘেন্না করে।

এই গ্রীষ্মের দাবদাহে বাজারে পছন্দ মতো মাছ কেনা যে কত কঠিন তিনি ভালোই বোঝেন। মাছের বাজারে ঢুকলেই—চেঁচামেচি। বাবু, কেউ মেসো, কেউ কাকা যে যার মতো তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে নিয়েছে। তিনি যে সরেস মাছের খদ্দের তারা ভালোই জানে।

বাবু, সাড়ে চারশো!

না, চারশো। দ্যাখ চারশো-তে যদি দাও, এক কেজি দিতে পার।

বাবু পোষাবে না। তা পোষাতে নাই পারে—বাগদা চিংড়ি বলে কথা।

এইভাবেই একসময় রক্ষাও হয়। কে কী মাছ খায় সেই মতো কেনেন। রমলা চিংড়ি মাছ খান না। তাঁর জন্য আলাদা দু-আড়াইশো কাটা পোনা নিতেই হয়।

দু-দিনের বাজার তাঁকে এভাবে সারতে হয়—মাগুর মাছ একবেলা, ইলিশ না হয়, কাটাপোনা একবেলা, এই মাছের কেনাকাটা করতে তার ঘণ্টাখানেক কাবার হয়ে যায়। বেদানা তরকারির বাজার সেরে ফেলে—কে কী খাবে যেমন রমলার পাতে শাক না পড়লে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। যেমন তিনি নিজে নিমবেগুন, অথবা উচ্ছে ভাজা প্রথম পাতে খেতে পছন্দ করেন। নতুন আম ওঠায় চাটনির জন্য আর টমেটো কেনা হয় না। ঝোলে, তরকারিতে টমেটো না হলেও আবার চলে না, সবার সব পছন্দ বুঝে রমলার ফুল বেলপাতা, নিজের জন্য মর্তমান কলাও কেনেন তিনি। কলা, দু-পিস পাউরুটি আর একটি সন্দেশ হলে তাঁর সকালের জলখাবার হয়ে যায়।

বাড়িতে সবারই দু-বেলা ভাত, চামরমণি চালের ভাত দু-বেলা—সোজা কথা! রাত্তিরে রুটি কিছুতেই আর চালু করা গেল না। দু-বেলাই মাছ, মাছ ছাড়া কেউ মুখে ভাত তোলে না। কাজের লোকদের জন্য রাতে মাছ না নিলেও হয়, এই ভেবে তিনি নিজে কিছুদিন রাতে মাছ পাতে নেন। তিনি না খেলে, কেউ কেউ যদি রাতে মাছের বাড়তি খরচ ভেবে না খায়, এবং তাঁর দেখাদেখি সংসারের অতিমাত্রায় খরচের প্রতি যদি সজাগ হয়, হলে কী হবে, তিনিই খান না, সবাই খায়। রমলা বিরক্ত হয়ে বলবে, তুমি না খেলে কারও কিছু আসে যায় না বোঝ না। রান্নাঘরটা কাজের লোকদেরই জিম্মায়। যে যার মতো ঘড়ি ধরে নামে, খায়, তারপর অফিস, হাসপাতাল, কলেজ, যার যেখানে কাজ চলে যায়। ছুটির দিনে অর্ডার মতো সরবরাহ হয়ে থাকে।

কেউ চাউমিন সকালে।

কারও লুচি ছোলার ডাল।

কারও এক গ্লাস দুধ, দু-পিস পাউরুটি।

ফ্রিজে কী আছে না আছে বেদানা খবর রাখে।

মেসো, ডিম আনতে হবে, দুধ আনতে হবে। পাউরুটি আনতে হবে। দুধ আনতে হবে। পাউরুটি আনতে হবে। বেদানাই কে কী খাবে না খাবে, নীচে নেমে জানিয়ে দেয়। প্রিয়নাথের একটাই কাজ লক্ষ রাখা। কোনো কারণেই যেন কেউ না ভাবে, তিনি ঠিক মতো কিচেনের সরবরাহ বজায় রাখতে পারছেন না।

প্রিয়নাথ আজ বাজার থেকে ফিরে দেখলেন, বেদানা ফেরেনি। তিন চারটি ব্যাগ বয়ে আনা তাঁর পক্ষে সম্ভব না বলেই পাঁচটা টাকা দেন রিকশ ভাড়া বাবদ। তিনি হেঁটে চলে আসেন। বেদানা এল না এখনও, কিচেনে হুলস্থল, কখন বাজার আসবে-কখন কী রান্না হবে, তিনি তো যতটা সত্বর সম্ভব বাজার সেরে তাকে ছেড়ে দিয়েছেন, সে না আসার কোনো কারণ থাকতে পারে না। রাস্তায় এগিয়ে দেখলেন, বেদানা হেঁটে আসছে।

তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, কী হল, এত দেরি!

তাঁর সাহস নেই বলার, রিকশার ভাড়া নিলে—অথচ এলে হেঁটে।

বেদানা বলল, কী করব, রিকশা না পেলে কী করব।

দেরি হয়ে যাবে বলে হেঁটেই চলে এলাম। এত বড়ো রাবণের সংসারের বোঝা কার টানতে ইচ্ছে হয় বলুন।

তিনি কথা বাড়ান না, কথা বাড়ালেই, তার মেজাজ অপ্রসন্ন হয়ে যাবে বুঝতে পারেন। এতে তাঁর লেখার ক্ষতি হয়। হাত মুখ ধুয়ে লেখার প্যাড টেনে আবার কয়েক লাইন লিখে ফেললেন। চারপাতা লেখা হয়েছে, আর চারপাতা লেখা হলেই, হাজারখানেক টাকা হয়ে যায়? এই হিসাব কাজ করছে কেবল মাথায়। বিকালেই কাগজ থেকে লোক আসবে লেখাঁটি নিতে। তিনি সকাল থেকে এভাবেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে দু-চার লাইন কিংবা আধ পাতা লেখেন।

তখনই ডোর বেল বেজে উঠল।

এই কুচি, দরজা খুলে দে।

আমরা স্যার বারোয়ারিতলা থেকে এসেছি।

তাদের আবদারের কথা এবার শুনতে হবে, চিফ গেস্ট, না হয় সভাপতি, এবং সংবর্ধনাও হতে পারে তিনি মুখ গম্ভীর করে রাখেন—আচ্ছা ঠিক আছে কবে যেন?

পয়লা মে।

আমি তো থাকব না ভাই।

তিনি আর কোনো কথা বলতেই রাজি না, প্যাড, কলম পাশে পড়ে আছে। কতক্ষণে উঠবে এরা, তারপর নিরাশ হয়ে চলে গেলে আবার আধপাতাও লেখা হয়নি, কুচি এসে হাজির। ঠাম্মার ওষুধ দাও। কুচি এখন রমলার দেখাশোনা করে, রমলা এত ভোগে, অথচ তিনি হাতে ওষুধ না তুলে দিলে, রমলা ওষুধ খেতে ভুলে

যায়। তাঁকে অগত্যা উঠতে হয়। ওষুধ দিয়ে আসতে হয়। কুচি জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কোন ওষুধ কখন খেতে হবে তাও মনে করিয়ে দিতে হয় প্রিয়নাথকে।

প্রিয়নাথ নীচে নেমে দেখলেন, ঘর ফাঁকা, যাক বাঁচা গেল। ঘড়ির দিকে তাকালেন, দশটা বাজে, আর দু-ঘণ্টা হাতে সময় আছে, বারোটায় তাঁকে খেয়ে নিতে হয়, রমলা ঠিক বারোটা বাজার আগেই স্নান সেরে ঠাকুরকে ফুলজল দিয়ে নীচে নেমে আসবে। তাঁর দেরি হলে রমলা খেপে যাবে, এই দু-ঘণ্টার মধ্যে বোধহয় বাকি চারপাতা শেষ করা যাবে না।

আজকাল লেখার জন্য শব্দ বেঁধে দেওয়া থাকে, কখনো তিন হাজার, আবার কখনো ত্রিশ হাজার। পাটিগণিতের মতো অঙ্ক কষে, ক-পাতা কত লাইন, লিখে না দিলে কাগজের অসুবিধা। সব খেয়াল রেখে আর মাত্র চারপাতা। খাওয়ার পর শরীরে বড়োই আলস্য দেখা দেয়। দিবা নিদ্রার অভ্যাস আছে। ঘুম থেকে উঠে বাকি যেটুকু থাকে লিখতে হবে। আর যদি দু-ঘণ্টায় চার পাতা হয়ে যায়—তার লেখার গতি এবং ঘণ্টার পরিমাপ হিসাব মতো না হলে গল্প শেষ নাও করে উঠতে পারেন, ইচ্ছে করলে রাতে লিখতে পারেন, তবে নিশ্চিতভাবে রাতে লিখবেনই এমন বলা যায় না কারণ লোডশেডিং গরম এবং মশার উৎপাত এত বেশি যে রাতে কিছুই করা যায় না। মশারির নীচে ঢুকে কেবল বই পড়া যায়। আর খুবই অনিদ্রায় ভোগেন বলে হাই তোলা যায়।

তাঁর আর রমলার খাওয়া সারতে সারতে সাড়ে বারটা বেজে যায়। তখনই বেদানা ফেরে ছোটো দুই নাতনীকে নিয়ে। স্কুল বাস থেকে তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়, বেদানা তাদের প্রায় টানতে টানতে নিয়ে আসে। এই সময়টায় তিনি চেয়ারে বসে থাকেন। মোটরে আর এক দফা জল তোলেন, কারণ ট্যাঙ্কের জল এই সময়টায় যেটুকু হয়, তুলে রাখেন—কোনো কারণেই যেন দুতলা তিনতলায় জলের অভাব না হয়।

এই সকালটায় নানা উৎপাতের মধ্যে আরও একটি বড়ো উৎপাত—কারণ তিনি নিজেই জানেন না, কখন বাড়িটার পাহারাদার হয়ে গেছেন। যেমন ফোন, হ্যালো ম্যাডাম আছেন। তিনি ডাকেন, কুচি কুচি কুচি এলে বলেন, দ্যাখ তো তোর বড়ো বউদি বের হয়ে গেছে কিনা কলেজে, না বাড়িতেই আছে।

বড়ো বউদি বের হয়নি।

নিয়ে যা। আপনি ধরুন। বাড়িতেই আছে। আবার দু-পাঁচ লাইন—

হ্যালো, ডাক্তার চক্রবর্তী আছেন?

না, নেই।

কোথায়?

হাসপাতালে।

কখন ফিরবে।

রাত হবে। ফোন ছেড়ে আবার পাঁচ-সাত লাইন—

হ্যালো—

বলুন।

আমি বাবা সুপ্রিয়া, আপনার নাতনীরা ফিরেছে?

হ্যাঁ ফিরেছে।

একটু দিন তো ওদের—আবার আট-দশ লাইন—

হ্যালো—

বলুন।

আমি সুকুমার দাস বলছি।

বলুন।

এফ এমে আপনার সাক্ষাৎকার শুনেছি। আপনি যে আমার গাঁয়ের লোক জানতামই না।

তারপর এত কথা যে তিনি বাধ্য হয়ে শুধু শুনে যান। হুঁ হাঁ করেন। কতক্ষণে ফোনের আবদার শেষ যে হবে!

আপনাকে আমাদের বাড়ির সবাই দেখতে চায়। গাড়িতে নিয়ে আসব। কবে সুবিধা হবে।

আপনাকে জানাব। আপনার ফোন নম্বরটা দিন, আসলে যেভাবেই হোক এসব আবদার থেকে আত্মরক্ষার তাঁর উপায় থাকে না বলেই তিনি ফোনের নম্বর চেয়ে নেন, আর দু-পাতা যে তাকে শেষ করতেই হবে। ঘড়ির দিকে তাকান-রমলা ঠিক বাথরুমে ঢুকে গেছে। সে বের হয়ে এলেই তাঁকে চানের ঘরে ঢুকতে হবে।

নাতনীদের খাওয়া হলেই সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে যায়। তারা গিয়ে যে যার বিছানায় শুয়ে পড়ে। তাঁকেও উপরে উঠে যেতে হবে। তাঁরও খাওয়াদাওয়ার পর একটু গড়িয়ে না নিলে, শরীরের জড়তা কাটে না। আর দু-পাতার মধ্যে গল্পটা শেষ করতে হবে—কিন্তু হাতে যে সময় নেই। সন্ধ্যায় কাগজের লোকটি আসবে তিনি যে কী করেন।

এখন বাড়িটা বলতে গেলে খালি। বড়ো বউমাও বের হয়ে গেছে। পার্থর স্কুল চারটায় ছুটি হয়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে পাঁচটা। আসলে পাঁচটার পরই সবাই ফিরতে শুরু করে। কুচির কাজই তখন বারান্দায় বসে থাকা-রান্নার মেয়েটাও চলে আসে, ঘরে ঘরে কুচি পছন্দমতো জলখাবার দিয়ে আসে। কিন্তু এই দুপুরে বাড়িটা খুবই নির্জন। বেদানা নাতনীদের ঘরে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমায়। কোনো দরকারে তাকে ডেকে তোলারও সাহস হয় না।

বউমাদের আসকারায় এই মহিলাটি যে মাথায় চড়ে যাচ্ছে। বউমাদের কাছে ভিজে বেড়াল, আর প্রিয়নাথের কাছে যেন ব্যাঘ। কিছু বলারও থাকে না। বউমারাই তার টাকা জোগায়। খাওয়ার খরচা তো সরকারি। প্রিয়নাথকে সমীহ করার কোনো কারণই থাকতে পারে না। কারণ প্রিয়নাথই বোঝেন এই মহিলা কেনাকাটার নামে কীভাবে টাকা সরায়। তিনি এটা জানেন বলেই আরও বেশি তাঁর ওপর খাপ্পা।

এই যেমন—

ক-কেজি আলু?

পাঁচ কেজি!

প্রিয়নাথ বোঝেন, মহিলাটি দামেও মারে, ওজনেও মারে। যতটা পারেন তিনি নিজে কেনাকাটা করার চেষ্টা করেন। বাজারেও সঙ্গে নিয়ে যান—এটাও বেদানার ক্ষোভের কারণ। যাই হোক, তাঁকে তাড়াতাড়ি গড়াগড়ি দিয়েই উঠে পড়তে হবে। বাকি দু-পাতা লিখে ফেলতে না পারলে, সম্পাদককে দেওয়া কথা ঠিক রাখতে পারবেন না।

তাও তিনটে বেজে গেল। হাতমুখ ধুয়ে লিখতে বসবেন সবে, দরজায় ডোর বেল বাজল, কে এল! কারও তো আসার কথা না।

তুই।

কী করব, চলে এলাম।

নিপুকে যে এস টি ডি করলাম, সে কিছু বলেনি। বাড়িতে কত রকমের অশান্তি জানিস! তোর বউদির এক কথা—কতকাল টানবে? তোর নাম শুনলেই কেমন হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক কথা, পল্লব যেন এ বাড়িতে আর না আসে। আমি কী যে করি না!

পল্লব চুপচাপ বসেই আছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। অভাবের তাড়নায় পাগলা। পাঁচটা মুখ, উপার্জন করার কেউ নেই। পল্লবের পুত্ররাও বড়ো হয়ে গেছে, বেকার, পল্লব সামান্য একটা চা-এর দোকান সম্বল করে, আর মাথার উপরে দাদা তো আছেই, এই ভরসায় সুদিনের অপেক্ষায় বেঁচে আছে।

বউদি কোথায়? পল্লব কেমন চোরের মতো কথাটা বলল।

উপরে। ঘুমিয়ে আছে।

পল্লব কিছুটা যেন স্বস্তি বোধ করছে, যাক ঘুমিয়ে আছে।

তখনই প্রিয়নাথ বললেন, কটার গাড়িতে এলি?

সকাল আটটার গাড়িতে

তখনই মনে হল সিঁড়ি ধরে কেউ নামছে। রমলা হলে ভয়ঙ্কর কাণ্ড বেধে যেতে পারে। অসুস্থ রমলা মাঝে মাঝে মানসিক অবসাদে ভোগে। তখন যে কী হয় তাঁর প্রিয়নাথ বোঝেন তাঁর ভাই-বোনদের প্রতি রমলার প্রচণ্ড উত্মা আছে। তাঁর ভাই বোনদের আর্থিক সঙ্গতি কম। তবু সবার চলে যায়—পল্লবের দু-বেলা অন্ন জোটানোই কঠিন। মাসে মাসে সে এসে উদয় হবেই, তবে এবারে সাংঘাতিক বিপদের মধ্যে আছেন, রমলা বলেই দিয়েছে, এলে এবার ছেড়ে কথা বলব না। ভেবেছে কী!

তাড়াতাড়ি তিনি উঠে গেলেন। চুপিসারে দেখলেন, না রমলা নয়। বেদানা। বোধ হয় কারও ফেরার কথা আছে, ফলের রস কিংবা দই-এর শরবত করতে নামতে পারে।

তিনি ডাকলেন, বেদানা, শোনো।

বলেন।

এদিকে, শোনো।

বলেন।

কিছুতেই আসছে না। শুধু বলেন বলেন করছে।

পল্লব এয়েছে। চা করে দাও। ডিম ভেজে দিও। চারপিস রুটি সেঁকে দাও। বেলা তিনটের সময় ভাতের বন্দোবস্ত করাও কঠিন। ভাতের কথা বললে, তিনি মুখ ঝামটাও খেতে পারেন—কেমন আতঙ্কের মধ্যে আছেন। পল্লব প্রায় চোরের মতোই বলল, কিছু খাব না। ছটার ট্রেন ধরব। ভাত খেতে গেলে দেরি হয়ে যাবে।

পল্লবও বোঝে চুপি চুপি কাজটা না সারতে পারলে দাদার সমূহ বিপদ। এতদূর থেকে এসেছে ভাইটা, কিছু না খেয়ে গেলে মন তাঁর ব্যাজার হয়ে যাবে–তখনই প্রিয়নাথ না বলে পারলেন না, আমার জন্য চা হচ্ছে–কত আর সময় লাগবে! এই বেদানা, আমাদের দু-কাপ চা করে দাও। বেদানা বলল, কাপ তো একটা–

কেন আমার কাপ কী হল।

আপনারটাই আছে, আর কাপ নেই।

তার মানে, এই তো ট্রেতে কাপ মেলা, এটাতে দাও।

এটা বউদির কাপ। ওঁর বাবা এ-কাপে চা খান এলে। বউদির বারণ আছে। প্রিয়নাথ কেন যেন উন্মত্তের মতো ডাইনিং হলে ঢুকে গেলেন। দেওয়ালের কাবার্ডে থরে থরে সাজানো দামি সব কাপ ডিশ। কাচের ভেতর থেকে জ্বলজ্বল করছে। তিনি প্রায় খেপে গিয়েই বললেন, এই তো সেদিন এক ডজন কাপ ডিশ কিনে দেওয়া হল, কোথায় গেল!

আমি কী করে বলব, কোথায় যায়? সরকারি জিনিস, যে যার মতো চা খায়, ভাঙে। কেউ কি দেখার আছে।

কাবার্ড থেকে বের করে নাও। বেদানা খুবই তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, আমি ধরি, আর মুখ ঝামটা খাই। বউদিরা রেখে দিয়েছে, ওদের আত্মীয়স্বজন এলে তারাই বের করে দেয়। চাবি। তাদের কাছে।

তোমার মাসিমার কোপ থেকে বের করে দাও।

দাঁড়ান চাবিটা নিয়ে আসছি।

প্রিয়নাথ আঁতকে উঠলেন, এই বাড়িঘর তাঁর। এই বাড়িটা করার সময় সবার সুযোগ-সুবিধার কথা ভেবে করেছেন, সংসারের জোয়াল এখনও তাঁর ঘাড়ে। তাঁর নিজের কেউ এলে, এই যেমন তাঁর বন্ধু-বান্ধব, অনুরাগী পাঠকও হতে পারে, রমলা সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসবে। কাপ ডিশ বের করে দেবে, তারা চলে গেলে আবার তুলেও রাখবে। এজমালি বাড়ি, এজমালি সংসার, সবই তাঁর, অথচ কিছুতেই তাঁর অধিকার নেই। তাঁর গরিব আত্মীয়স্বজনরা এলে, কারও সাড়া পাওয়া যায় না।

বেদানা সিঁড়ি ধরে উঠছে।

এই শোনো, তোমাকে যেতে হবে না। এক কাজ করো, আমার কাপটায় পল্লবকে চা দাও, আর গেলাসে না হয় আমাকে দাও। তোমার মাসিমাকে আর ডেকে তুলতে হবে না।

অথচ ভিতরে এতই খেপে আছেন, এত তীব্র কষ্ট হচ্ছে যে, লাঠি দিয়ে কাবার্ডের সব কাপ ডিশ কাচ ভেঙে দিতে পারলে তিনি যেন কিছুটা ধাতস্থ হতে পারতেন। এমনকী গোটা বাড়িটায় আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারলে আরও ভালো হত। অথচ পারছেন না। শেকড় ছাড়া জীবনে তিনি নিজেই যেন আজ উৎপাতের শামিল। রমলা জেগে গেলে আর এক কেলেঙ্কারিদেরাজ খুলে দিয়ে বললেন, তোর যা লাগে নিয়ে যা। এই প্রথম মনে হল তাঁর, পল্লব যতটা পারে তুলে নিয়ে গেলে তিনি যেন আজ নিজেকে প্রকৃতই হালকা বোধ করবেন।

পল্লব চলে গেল।

জানলায় বসে আজ তাঁর আর একটি শব্দও লেখার ইচ্ছে হল না। শুধু আকাশ দেখছিলেন, তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতাটি আজ অভুক্ত। পায়ে পায়ে বড়ো হয়ে ওঠা স্নেহ মায়া মমতা তাঁকে তাড়া করছিল। অজ্ঞাতেই কখন যে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছেন।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *