1 of 2

তৃতীয় ভুবন

তৃতীয় ভুবন

কেন জানি কিছু আর তার ভালো লাগছে না।

জীবন একঘেয়ে হয়ে গেলে যা হয়, মাঝে মাঝে খুবই বিষণ্ণ বোধ করে সে। বয়স বাড়ছে।

মাঝে মাঝে মনে হয় কোথাও বের হয়ে পড়া দরকার।

আবার কখনো মনে হয় মাঝে মাঝে কেন, একেবারেই বের হয়ে গেলে হয়। চেনাজানা পৃথিবীর বাইরে, হয়ত সেখানে নদী থাকবে, পাহাড়ও থাকতে পারে আবার যদি দীর্ঘতম কোনো রেলের গুমটিঘরে অদুলার মতো গুমটিম্যানের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, যতদূর চোখ যায় তখন শুধু হিজলের বনভূমি, নীল আকাশ এবং কোনো বালির চরা এবং অদুলা ফিরছে বনভূমি থেকে, হাতে ঝুলছে একটা বুনো হাঁস, কাঁধে শুকনো কাঠ এবং পেছনের শালের জঙ্গল থেকে সে তুলে এনেছে কচুপাতা কুমড়োপাতা, রাতে আগুন জ্বেলে পাখির মাংস পোস্তবাটা দিয়ে কুমড়োপাতার বড়া অথবা কুমড়োফুলের বড়া, গরম ভাত সামনে রেখে ঠিক বলবে, এতকাল কোথায় ছিলেন গ বাবু।

অদুলার কাছে চলে যেতে মন চায় মাঝে মাঝে তার।

আসলে তখন যৌবনের শুরু, হাইস্কুলে চাকরি, স্ত্রী রমার সঙ্গে সেই স্কুলেই আলাপ এবং পরে রেজিস্ট্রি। পরে বিবাহ। অদুলার গুমটিঘর পার হয়ে রমাকে গাঁয়ে ফিরতে হত। অদুলার কাছেই রমা চিঠি রাখত। ভালোবাসার চিঠি।

বিকেলে রেলের ধার ধরে সে বেড়াতে যেত—আসলে অজুহাত, সে জানে রমা অদুলার কাছে একটি চিঠি রেখে যাবে, শত হলেও স্কুলের দিদিমণি রমাকত কথা বলার ইচ্ছে হয়, কিন্তু দিদিমণি যে—খুবই গম্ভীর, অথচ কত হালকা কথা এবং ফুল ফোঁটার মতো সুন্দর কথা রমা তাকে জানাতে চায়। স্কুলের করিডরে কিংবা তার অফিসে যখন সে একা বসে থাকত, দেখলেই বুঝতে পারত রমার চোখমুখ ভারি চঞ্চল কথা বলার জন্য—সে চোখের ইশারায় মানা করত। ছাত্রছাত্রীরা কিছু ভাবতে পারে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা রমার দুর্বলতা টের পেয়ে যেতে পারে। সে তো স্কুলের প্রধান শিক্ষক, তার যে প্রগলভতা শোভা পায় না—রমাকে সে বলেছিল, অফিসে একা থাকলে এস না, গ্রাম জায়গা, কুৎসা রটে যেতে পারে। বরং অদুলাকে বলে যেও, সে আমার খুব বিশ্বাসী জন, এবং আরও বলত, দেখি কলকাতার দিকে কোনো কাজ নিয়ে চলে যেতে পারি কি না—না হলে যে আমরা ভালোবাসার দৃষ্টান্ত হয়ে যাব।

সেই থেকে রমা অদুলার কাছেই চিঠি রেখে যেত। এবং নানাভাবে পরামর্শ, সে কাগজের বিজ্ঞাপন দেখছে, তবে ঠিক কলকাতার কাছে হচ্ছে না, তা না হোক, যেভাবেই হোক জায়গাটা ছাড়তে হবে। স্কুলের মাস্টার-মাস্টারনীর প্রেমের বিয়ে গাঁয়ের মানুষ সহ্য করবে কেন?

আজকাল দোতলার বারান্দায় একা বসে থাকলে তার যে কত স্মৃতি ভেসে আসে।

সেই ঝুপড়ি ঘরবাড়ির কথাও মনে হয়।

মা বাবা ভাই বোন কেউ বাদ যায় না।

অবশ্য তখন বাড়িতে দুবেলা অন্ন জোটানোই কঠিন, ওরা এতগুলি ভাইবোন, বাবার শিষ্যবাড়িতে কুলাত না, যজন যাজনে কুলাত না।

এবং বাড়ি ফিরলেই, মা-র এককথা, আর অভাব যায় না বাবা, তোরা যে কবে বড়ো হবি। তোর বাবা আমাকে পাগল না করে ছাড়বে না, দুদিনের বলে নবদ্বীপে অন্নদা মুন্সির বাড়ি গেল সূর্য পূজার দিনক্ষণ ঠিক করতে, আজ সাতদিন, না চিঠি, কোনো খবর। বাড়ি থেকে বের হলে আমাদের কথা আর তার মনে থাকে না। আমরা বেঁচে আছি কি মরেছি, তাও তার মাথায় থাকে না। তারা ভাইবোনেরা তখন বড়ো সড়কে গিয়ে অপেক্ষা করত বাবা যদি ফেরে।

তাদের খুবই তখন দুরবস্থা। দু-তিন বিঘার মতো জায়গায়, জঙ্গলের মধ্যে, বাবা বাছারি ঘর তুলে, ঠাকুর ঘরের বাছারি তুলে সবে এ দেশে বসবাসের বন্দোবস্ত করছেন, তখন কথায় কথায় সবাইকে ফেলে একটা না একটা কাজের অজুহাত দেখিয়ে বাবার এই ভেগে পড়া যে-কোনো মায়ের পক্ষেই ক্ষেপে যাওয়ার কথা। আসলে তাঁর বাবা বোধহয় পরিবারের অন্নকষ্টের আতঙ্কেই ভেগে যেতেন। কিছু না জোটানো পর্যন্ত দেশান্তরী হয়ে থাকতেন।

কী খাব, বাবার মাথায় নেই।

যাওয়ার আগে বাবা-রমণীকে বলে গেছি, কিছু লাগলে তাকে বলিস। এইটুকু খবর শুধু দিয়ে যেত।

রমণী বাজারের বড়ো মুদি।

কে যাবে রমণীর কাছে।

মা বলত, যা একবার। ঘরেও একমুষ্টি চাল নেই।

আমি পারব না। তার ছিল এক কথা। গেলেই রমণীকাকা দশ কথা শোনায়।

সে অর্থাৎ মানবেন্দ্র মা-র কথা শুনতে রাজি না। রমণীকাকাকে সে ভালোই চেনে। গেলেই বলবে, এই কর্তাঠাকুর তো কিছু বলে যায়নি।

বাবার ধারণা, রমণীর এত বড়ো মুদিখানা, দেশের যজমান, এদেশেও এসে যজমান, কর্তাঠাকুরের চালচুলো ঠিক রাখা রমণীর নৈতিক দায়।

দোতলার বারান্দায় বসে এখন শুধু অতীতের কিছু দৃশ্য, সেই কবেকার কথা সব, যেন এই সেদিন রমার সঙ্গে প্রেম, যেন এই সেদিন। কলকাতায় রওনা হওয়া, দুজনের ফের একই স্কুলে চাকরি এবং রমার স্কুল সকালে, তার দুপুরে, একখণ্ড জমিরও খোঁজ করা হচ্ছেবাড়িতে টাকা পাঠিয়ে সঞ্চয় ভালোই হচ্ছে, একে জীবনযুদ্ধই বলা যায়, পুত্ররা একে একে জন্মাচ্ছে এবং এভাবে তারা বড়োও হয়ে যাচ্ছে।

কীভাবে যে সব হয়ে গেল। একটা বিদ্যুৎ রেখার মতো সব ভেসে ওঠে।

কীভাবে যে কেউ কেউ চলেও গেল।

এই সেদিন যেন বাবার মৃত্যুর খবর এসেছিল। অথচ সেই মৃত্যুর খবরটিও তো প্রায় চব্বিশ বছর আগে। মা তো সত্যি সেদিন গেলেন।

দোতলার বারান্দায় বসে থাকলে তার এমনই মনে হয়।

এত বড় একটা দীর্ঘজীবন এত সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে কীভাবে সে বুঝতেও পারে না।

রমার ঘর খালি।

ডবল খাট বের করে দেওয়া হয়েছে।

তাঁর সম্বল রমার ঘর, রমার দুটো লকার, কিছু মোটা অ্যালবাম—তাতে রমার জীবনের উচ্চাশা এবং তার উচ্চাশার ছবি, ছবির পর ছবি, দীর্ঘ জীবনযাত্রার এই সব ছবি, এক সকাল লেগে যায় ছবিগুলি দেখতে। বাইশ বছরের জীবন থেকে বাষট্টি বছরের জীবন—এই সব ছবি রমার গ্রথিত হয়ে আছে—কখনো পাহাড়ের ছবি, কখনো নদীর পাড়ের ছবি আবার রমা সমুদ্রে সাঁতার কাটছে, সে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে, তারপর দেখা যায় জ্যোৎস্নায় কোনো কুয়াশার ভেতর থেকে উঠে আসছে–রমা হাত ধরে ফিরছে এক শিশুর, তাকে বেলুন কিনে দিয়েছে, তারও পরে বই, আবার এক শিশুর মুখ, কাজের মেয়ে নয়না সংসার সামলাচ্ছে, সকালে তার বাজার, খুবই সকালে ওঠার অভ্যাস, কারণ কঠিন জীবনযুদ্ধ, প্রতিষ্ঠা, শুধু তার নয়। তার পুত্রদেরও। বাজার ফেলে দিয়েই তার নিজের ঘর, অর্থনীতির সরল সহজ গদ্য এবং বই, বাজার ধরে গেছে, বসে থাকলে চলে! স্কুল সিজনে হু হু করে বই বিক্রি।

রমার ঘর বছরখানেক হল খালি। এই ঘরটার মধ্যে হাজারবার শুধু সহবাসের স্মৃতির কথা মুভি ক্যামেরা থাকলে ধরে রাখা যেত—এই সব স্মৃতি প্রিয়, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তার রংও ফিকে হয়ে গেল। শুয়ে থাকলে মনে হয় রাতে রমা পা টিপে টিপে হাঁটছে। সে যে অনিদ্রায় ভুগছে—রমা মরে গিয়েও যেন টের পায়। রমা তার শাখাপ্রশাখা রেখে গেছে—শাখাপ্রশাখার জের তাকে রোজ সামলাতে হচ্ছে।

বারান্দায় চা রেখে গেল আলো। নতুন কাজের মেয়ে—কবে কে রাখল, সে জানে না। তবে তার জামাকাপড় কাচা থেকে বিছানা করা, মশারি টাঙিয়ে দেওয়া, জল রাখা এবং লোডশেডিং যদি হয়, একটি তালপাতার পাখাও শিয়রে রেখে দেয় আলো। খুবই মার্জিতরুচির। বউমারাই তার জন্য আলাদা একটি কাজের মেয়ে রেখে দিয়েছে। কারণ সকাল আটটা থেকেই বাড়িটা খালি হতে থাকে—কারও হাসপাতাল কারও কোর্ট, অফিস, কারও কলেজ। সকাল হতে না হতেই তাদের উঠতে হয়, তাদের আলোদা আয়া আছে, তাদের আবার সবারই মাত্র এক হয় পুত্র নয় কন্যা–তাদের জন্য স্কুল বাস আছে-স্কুলের টিফিন, বাস ফিরলে তাদের নিয়ে আসা—আর বাড়িটাও, রমার সময় একতলা। তিন পুত্র হওয়ার পর দোতলা, বড়ো পুত্রের বিয়ে দিয়ে তিনতলা, রমার তারপর রিটায়ার।

সে বোঝে কাল কত বদলে গেছে।

তারা ছিল আট ভাইবোন।

বাবার রোজগার নেই, সে তত ক্লাস টেনে ওঠার পরই টিউশনি শুরু করে দেয়। এবং সব ভাইবোনকে স্কুল, কলেজ, যে যতটুকু পড়তে পেরেছে, চেষ্টা করেছে। তবে সবার তো একরকমের স্বপ্ন থাকে না, যে যার মত স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে।

রমার স্বপ্ন, অন্তত রমার কাছে সার্থক।

কারণ রমার তিন পুত্রই কৃতী।

রমার তিন বউমাও কৃতী। কলেজ, কোর্ট, প্রশাসন এবং হাসপাতাল, নানা কাজে সবাই ব্যস্ত। কারও সময় নেই। কাজের লোকই বাড়িটার ভরসা।

এতসব হওয়ার পরও কেন যে মনে হয় তাঁর কেউ নেই। রমা চলে যাওয়ায় এতটা সে নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে, ভাবতেই পারেনি।

সে তার সঞ্চিত অর্থ সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে চেয়েছিল। কেউ নিতে রাজি না। তারা নিজেরাই যে নানারকমের আয়করের ঝামেলায় নাজেহাল।

বড়ো পুত্রের এককথা, থাকুক না। এত ব্যস্ত হওয়ার কী আছে?

নেই বলছিস!

না।

অঃ ঠিক আছে। তিনি তবু বড়ো বউমাকে ডেকে বলেছিলেন, লকারের চাবিটা তোমার কাছে রেখে দাও।

কী হবে।

সত্যি তো কী হবে। ওরা তো টিনের চালের বারান্দায় বসে কখনো কাঠালৰীচি ভাজা খায়নি।

কাঁঠালবীচি ভাজা।

কতকাল পর কত দীর্ঘকাল পর, কাঁঠালবীচি নামক একটি বস্তুর চেহারা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। নানারকমের আকার। কাঁঠালের কোয়া থেকে বের করা এই সব বীচি বাছারি ঘরের কোণায় জমা থাকত। সে এবং আট ভাইবোন সকালবেলায় কাঁঠালের কোয়া আর মুড়ি, ভুরিভোজনই বলা চলে। তারা সব পিঠেপিঠি ভাইবোন। ক্লাস টেনে সে পড়ে, টিউশনি করে, মেধাবী বলে ছাত্র-বেতন দিতে হয় না—আর মা তার সেই আট ভাইবোনকে কত সহজেই না সামলাত। পিঠেপিঠে দুই বোন, তারা ফ্রক গায়ে দেয় মা-র দোসর।

এই করুণা, দ্যাখ তোর বাবা কোথায় গেল।

করুণার জবাব, বাবা গোয়ালে।

তুই বসে থাকলি লাবি। কাঁঠালবীচিগুলি নিয়ে পুকুরঘাট থেকে ধুয়ে আন। কত বেলা হয়ে গেল। রোদে শুকোতে দে। আকাশের যা অবস্থা। সরা তো সকাল থেকে মুখ গোমড়া করে রেখেছে।

বাড়িটার কাঁঠাল গাছ, আম গাছ মেলা। বাবার দেশ থেকে আনা শেষ কপর্দক ফুলপাকুড়ের বাগান এবং একটি ডোবা ক্রয় করতে গিয়েই শেষ।

সব ঠিক হয়ে যাবে।

পুত্ররা লায়েক হয়ে গেল বলে।

সারাদিন গজর গজর—মাথার ওপর তো একজন আছেন। তাঁর আশায় এ দেশে চলে এসেছি। কেবল নাই নাই। এত নাই নাই করলে ঈশ্বর আরোপিত হয়। জানো?

আর ঈশ্বর। মারও গলা চড়ে যেত। বলে দিলাম বৃষ্টি বাদলার দিন, কাঠকুটো কিছুই নেই। আমি কি হাত পুড়িয়ে তোমাদের পিন্ডি সেদ্ধ করব।

হবে, সব হবে। এই নিত্য, যা তো বাবা, কাঠকলে যা, আমার কথা বলবি। বলবি বাবা পাঠাল।

তার মনে আছে, বাবার কথা কেউ মান্য করত না। একজন গরিব বামুনের পুত্র কাঠকলে গিয়ে বাবার দোহাই দিলেই কাঠ দিয়ে দেবে কখনো হয়!

নিত্যর এক কথা, আমি পারব না, তুমি সঙ্গে চল।

যাই কখন, আমায় যে অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটছে—সকাল সকাল না গেলে সবাই ঠাকুরমশাইয়ের আশায় বসে থাকবে। যা বাবা নেত্য।

নেত্য ঘাড় কাত করছে না। নেত্য না করলে সে আছে।

তুই যাবি, একবার, তোর মা-র দুখানা হাত—আমাদের যে কিছু সম্বল তোর মা-র হাত দুখানি। তিনি খেতে দিলে খেতে পাস। তিনি আহারের বন্দোবস্ত করেন, তিনি খুঁটে দেন। তিনি ধান সেদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে বস্তায় ভরে দিলে চালকলে নিয়ে যেতে পারিস, সেই অমূল্য হাত দুখানি পুড়িয়ে তোদের পাতে ভাত দিলে ভালো হবে!

মাকে যে খোঁচা দিয়ে কথা বলছে–মা সহ্য করবে কেন।

ভালো হবে না। আমার পেছনে লাগবে না। সংসারটার কী অবস্থা। তুমি তো ঠাকুরকর্তা, যজমান বাড়ি গেলেই ফলাহারের ব্যবস্থা। আমাকে খোঁটা দিয়ে কথা বলতে তোমার বিবেকে বাধে না।

আর তারা অর্থাৎ সে এবং অন্য ভাইবোনেরা বুঝত, লেগে গেল। তখন বারান্দায় বসে থাকাও ঠিক হত না। শুকনো কাঠকুটোর খোঁজ করতেই হয়। সে বের হয়ে যেত একটা লম্বা কোটা নিয়ে গাছের মরা ডাল টেনে নামাত। জমানো খড়কুটো বাইরের উঠোনে ছড়িয়ে দিত নেত্য, তারপর সে ছুটত কাঠকলে। হারানদাদা বাবা পাঠিয়েছে।

দ্যাখেন ওদিকটায় গাছের ছালবাকল পড়ে আছে—নিয়ে যান। ঠাকুরকর্তাকে বলবেন, শনি–সত্যনারায়ণের পূজা আছে। আপনেরা সবাই প্রসাদ নিতে আসবেন।

নেত্য মাথায় শুধু কাঠকুটোই নিয়ে আসত না, সঙ্গে শনি-সত্যনারায়ণের পুজার খবরও নিয়ে আসত।

তখনই বাবার কথা মনে হয়।

প্রায় যেন ধরণী বিজয় করার মতো বলতেন, বুঝলে মনোজের মা, রাখে কৃষ্ণ মারে কে। তোমার আর হাত পুড়িয়ে খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে না।

মা তখন তার যেন খুবই কাতর হয়ে পড়ত, গরিব বামুনটির জন্য।

তার দিকে তাকিয়ে বলত, মনোজ তোর বাবাকে বল, তিনি যেন কিছু মুখে না দিয়ে বাড়ি থেকে বের না হয়। বাড়ি থেকে বের হলে তো, আর বাড়ির কথা মনে থাকে না। কী খান, কোথায় থাকেন, চিন্তা হয় না। তোমাদের বাবামশাইটি কি তা বোঝেন!

তারা আট ভাইবোন। ছোটোটি বারান্দায় হামাগুড়ি দেয়, কান্নাকাটি করলে, হয় লাবি না হয় করুণা কোলে নিয়ে এ-গাছ সে-গাছের নীচে দাঁড়িয়ে পাখপাখালি দেখায়, তো বসে থাকে না, বাসনপত্র ধুয়ে আনছে লবি। কাঁঠালবীচিগুলি উঠোনে চাটাইয়ে বিছিয়ে দিয়েছে। রোজই লাবি যত্ন করে এই বীচি শুকনোর কাজটা করত। মাটির কলসিতে শুকনো বালির মধ্যে রাখা যাবে, না আরও রোদ খাওয়াতে হবে, মা অনুমতি না দিলে মাটির কলসিতে রাখা যেত না। মা হাত দিয়ে দেখত, কী বুঝত কে জানে। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় দু-মাস ধরে কাঁঠাল খাওয়া আর বীচি সংরক্ষণ-পাঁচমেশালি তরকারি হবে, কাঁঠালবীচি, ঘরে চাল আছে, তরিতরকারি নেই, কাঁঠালবীচি সেদ্ধ—সে যে কী সুস্বাদু বীচি সেদ্ধ আর ভাত। সামান্য সর্ষের তেল। কত সামান্য উপকরণে অসামান্য খাওয়া।

সেই মনোজ আর এখন মনোজ নেই। কেউ তাকে মনোজ নামে চেনেই না। শৈশবের মনোজ কখন যে স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবেন্দ্র হয়ে গেল। কী করে যে এতবড় বাড়ি এবং এত খ্যাতি হয়ে গেল বুঝতে পারে না। সংগ্রাম, নিষ্ঠা, অথচ জীবন বড়ো ভারবাহী জন্তু, অথবা এমনও মনে হয়, রমারই কাজ। সেই তাকে সংগ্রামে লিপ্ত করেছে, নিষ্ঠায় কাতর হতে বলেছে, আবার কখনো জীবন বড়ো ভারবাহী জন্তু এমনও মনে করিয়ে দিয়েছে।

আসলে সব কিছুর পেছনে থাকে শুধু একজন নারী।

সে তার কৈশোরকাল থেকেই কোনো নারীর ছলনায় এতদূর এসে বুঝেছে, সব ফাঁকা।

তখন মেজো পুত্র বোধহয় কোর্টে বের হবে—কানে তার কথা উঠেছে, দেখগে তোমার পিতাঠাকুরের পাগলামি শুরু হয়েছে। তাঁর নাকি কিছু ভালো লাগছে না। তাঁকে আজ হোক কাল হোক কোথাও চলে যেতে হবে।

মেজো পুত্র সুরেন জানে মায়ের মৃত্যুর পর বাবার মতি স্থির নেই।

বছর পার হয়ে গেল।

বৎসরান্ত এই সেদিন বেশ জাঁকজমক করেই পালন করা হল। পুত্রেরা পিতামাতার প্রতি কোনোই ত্রুটি রাখার পক্ষপাতী নয়।

একজন বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী গান করলেন।

ছাদে বড়ো পুত্র মন্ত্র পাঠ করছে।

অতিথি-অভ্যাগতরা, এমনকী আত্মীয়স্বজনরা সবাই এসেছে। তার কুশল নিয়েছে।

পুত্ররা ছোটো হয়ে যায় ভেবে মানবেন্দ্র বলেছেন—না ভালোই আছি। সময় হলে যেতেই হয়। তোমরা কেমন আছ বল।

এই যে বাবা, কুশল।

অঃ কুশল, তোমার বাবার নাম কী বল তো!

ছোটোদির ছেলে। জবলপুরে আছে। রেলের ডাক্তার। ভুলে গেছ।

ও হ্যাঁ। মনে থাকে না। কেমন সব গুলিয়ে যায়।

মানবেন্দ্র তখনই ভাবেন, এটাকে কি বাহাত্তরে বলে। এই যে সব গুলিয়ে যাওয়া কুশলকে এমন প্রশ্ন কেন, সবই কি মগজের কোশের কোনো ভ্রম থেকে হয়—শুধু কুশল কেন, অনেক বন্ধুবান্ধবের মুখও ভুলে গেছেন—নাম মনে পড়ে না। তখনই যে কেন মনে হয়, কী আর হবে, কোথাও চলে গেলেই হয়। নিজেকে পরিবারের পক্ষে বোঝাও মনে হয় কখনো।

তার ফুটফরমাশ খাটার মেয়েটাই একমাত্র যখন-তখন তাঁর কাছে আসতে পারে।

সে এসেই পাশের টি-পয়ে একটা রেকাবি রাখল। চিনামাটির সুন্দর প্লেটে দুটো সন্দেশ, একটি কলা এবং একটি হাফবয়েল ডিম। বড়োবাবুর কখন কী মর্জি হবে সে জানে না। তাই রাতেরবেলা মশারি গুঁজে দেওয়ার সময়, সকালে তাঁর জলখাবার কী হবে জেনে নিতে হয়।

জেনে না নিলে কী হয়!

আরে ডিম দিলি কেন, নিয়ে যা। আরে টোস্ট দিলি কেন, নিয়ে যা। দুধ-মুড়ি আম খাব।

বাড়িতে শোরগোল তখন, রান্নার মেয়েটার গলার ঝাঁঝ আছে। যতই ঝাঁঝ থাকুক, বড়োবাবুর বেলায় ট্যা-ফু করতে সাহস হয় না।

তার চিৎকার, একতলা থেকে দোতলা, কিংবা তিনতলার ঘরে আস্তে কথা বললে, কারও সাড়াই পাওয়া যায় না। বড়োবাবু দুধ-আম মুড়ি খাবে বলেছে।

সকালের চায়ের দুধটুকু আছে। খাটাল থেকে দুধ আসতে আসতে নটা বেজে যায়। আম-মুড়ি-দুধ। মুড়ি আছে কি না, বাড়িতে মুড়ি কেউ খায় না। দুধ-মুড়ি আমও কেউ খায় না। সবাই সাহেবি ব্রেকফাস্ট করে-বউমারাও। নাতি-নাতনিরা আতপ চালের সুগন্ধ ভাত, ঘি ডিমসেদ্ধ। হালকা মাছের ঝোল। ছুটির দিনেও একই খাবার। বড়োবাবু তাদের খাবার দেখলে এককথা-আরে আমের সিজন। চলছে। সকালে দুধ-মুড়ি-আম কেন খাস না বুঝি না। গাদা গাদা মাখন পাউরুটি— টোস্ট আর ডিম আর কলা, কখনো আঙুর, নাসপাতি, এগুলো যে বাঙালির খাবার নয়, তিনি তাদের বোঝাতেই পারেন না। নাতি-নাতনিরা তাকে সমীহ করে না। বুড়ো মানুষটা যা খুশি বলুকগে—তারা কিছুটা খায়, কিছুটা ফেলে। মানবেন্দ্র এ সব দেখে মনে মনে খুবই কষ্ট পান। কাজেই আজ সকালে কি তাঁর ব্রেকফাস্ট হবে রাতে কোনো আভাসই দেননি, মাঝে মাঝে তিনি যে চান সংসারে খাওয়া নিয়ে একটা সংকট তৈরি হোক।

বোঝ এবার।

অ মেজো বউদি।

বউদি বাথরুমে। যাওয়ার সময় মেজোপুত্র তাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে যাবে। ছোটো পুত্রবধূর চেম্বার। সকালেই বের হয়ে গেছে। ফিরতে ফিরতে একটা।

আর মেজো বউদি। সাড়া দেবে কী করে। বাথরুমে জলের শব্দ। রান্নার মেয়েটা সিঁড়ি ভেঙে দোতলার উঠেই টের পেল, বাথরুমে জল পড়ছে। দরজা বন্ধ।

সে যে কী করে।

অ মেজো বউদি।

বল।

আরে বড়োবাবু যে বলছে, দুধ-মুড়ি-আম খাবে।

তা দে, দিলেই হয়।

আম পাব কোথায়। মুড়ি পাব কোথায়। ঘরে কি কিছু আছে। খাটাল থেকে এখনও দুধ আসেনি।

দাঁড়া আমি যাচ্ছি।

মেজো বউদিদিরই সংসারের প্রতি কিছুটা নজর আছে। বাঁধাধরা রান্না, এই যেমন আলুভাজা, না হয় আলুপোস্ত। মুগের না হয়, মুসুরির ডাল—মাছ এবং চাটনি—সরকারি রান্না-পুত্ররা পতে কিছু দিলেই হল, তারা কোনোরকমে কিছু মুখে দিয়ে বের হয়ে পড়ে। দেখার কারও সময় নেই–আগে রমা দেখত, তারপর সংসারে গার্জিয়ান হিসেবে মাস দু-এক দেখতে গিয়ে টের পেল সে বড়ো কঠিন ঠাঁই। দু-মাসেই মাথাটা খারাপ।

 বড়ো পুত্রকে ডেকে পাঠাল।

শোন।

তোমাদের রান্নাঘরটা তোমরাই সামলাও।

কেন কী হল!

কী আবার হবে। কে কী খাবে, সেইমতো বাজার করা যায়, এতকাল করেও গেছি—এখন তো দেখছি—ভালমন্দ রান্নার ব্যবস্থা করেও লাভ নেই। এত অপচয় তোমাদের। বাইরে খেয়ে এলে আগে জানাবে না। এই যে তোমরা যখন-তখন বলে দাও, রান্নার মেয়েটাকে আয়া দিয়ে খবর পাঠিয়ে দাও, রাতে খাবে না, খেয়ে এসেছ, আগে বলে যেতে দোষ কী। তোমাদের খাবারগুলো নষ্ট হলে কী হয়?

বড়ো পুত্র মাথা চুলকে বলল, ওরাই বা কী করবে—যা রান্নার ছিরি, বাইরে না খেয়ে কোথায় খাবে।

রান্নাই যদি না করতে পারে, ছাড়িয়ে দাও। এত অপচয় তো ভালো না। তা ছাড়া সবার জিভের স্বাদ বুঝে রান্না সম্ভব! ঝাল বেশি। নুন কম। তেলে ভাসছে। ফোড়ন ঠিক নেই। মুসুরির ডাল-পেঁয়াজ ফোড়ন পছন্দ না, কালোজিরে ফোড়ন পছন্দ না, এই যে কারও পছন্দ, কারও পছন্দ না, এত সব পছন্দ আমারও পছন্দ না। তারপর তিনি হুকুম জারি করে দিয়েছিলেন, বউদের বল কী রান্না হবে, তারা যেন বলে দেয়। তোমাদের মা নেই, তোমাদের এই পছন্দ-অপছন্দের ঠেলা সহ্য করতে না পেরেই বোধহয় তিনি দ্রুত পালালেন—তোমাদের ঘরে ঘরে ফ্রিজ, সেখানেও নানাবিধ খাবারের প্রক্রিয়া থাকে—এত সব ব্যবস্থা যখন আছে, তখন আর আমার দরকার কী! তোমরা যা হয় ব্যবস্থা করো।

বড়োপুত্র বলেছিল, ঠিক আছে আপনি আর সংসারে মাথা গলাতে যাবেন না। সব ঠিক চলে যাবে। কিছু আটকাবে না।

না, সত্যি কিছু আটকাল না। বরং তার ওপর নতুন নতুন নিয়ম জারি হতে শুরু করল।

কাল এত রাত হল আপনার ফিরতে?

ছোটোপুত্রের উলটো চাপ।

কামিনীর সঙ্গে দেখা। সে-ই নিয়ে গেল।

কোথায়?

ভবানীপুরে।

ফিরলেন কী করে?

ওর ড্রাইভার পৌঁছে দিল।

কাউকে বলে যাবেন না! কামিনী কাকা একটা ফোন করে দিতে পারত।

সে বলতে পারত, কাকে ফোন করবে। কেউ কি আমার অপেক্ষায় বসে থাকে!

সোজা মিছে কথা, ফোন করার কথা মনেই হয়নি তার!

চিন্তা হয় না?

বড়োপুত্র তার বসার ঘরে ঢুকে একদিন বলেছিল, রাস্তায় একা হবেন না। আপনি নাকি বাসে উঠে আপনার কোনো এক পিসিমার কাছে চলে গেছিলেন!

কী হয়েছে!

একদম ট্রামে-বাসে উঠবেন না।

কেন!

মাথা ঘুরে পড়েটড়ে গেলে কে দেখবে!

আমার মাথা ঘুরবে!

বয়স হয়েছে, বোঝেন না। আর যখনই কেউ বলে মানবেন্দ্রবাবুকে দেখলাম, মিনিবাসে কোথায় যাচ্ছেন, তখন খারাপ লাগে না! গ্যারেজে খবর দিতে পারতেন। হরনাথকে বললেই গাড়ি বের করে দিত।

সেই বড়োবাবু সকালে আজ দুধ-মুড়ি-আম খাব বলেছে। আমের সিজন চলে যাচ্ছে—দুধ-মুড়ি-আমে মাখামাখাই সুস্বাদু খাবার এখন তাকে না দিলে, সকালে কিছুই খাবে না জানিয়েছে। আলো কিচেনে ঢুকে বলল, কথা কথা। নট নড়নচড়ন।

এখন খোঁজ মুড়ি কোথায়? কোন দোকানে বিক্রি হয়।

এ-বাড়ি থেকে মুড়ির চল সেই কোন অতীত থেকে উঠে গেছে। মেজোবৌদি বলল, চন্দ্রনাথকে ডাক।

চন্দ্রনাথ মেজবৌদির নিজস্ব ড্রাইভার।

শোন চন্দ্রনাথ, এখানে কোন দোকানে মুড়ি পাওয়া যায় জান?

আমার বাড়ির পাশে কোথায় পাওয়া যায় জানি, এখানে কোথায় পাওয়া যায় জানি না।

যাও গাড়ি বের করে তোমার বাড়ির পাশ থেকেই নিয়ে এস।

সে তো অনেক সময় লেগে যাবে!

আমি জানি না। টাকা নাও। যেখান থেকে পার নিয়ে আসবে।

রান্নার মেয়েটা তখন বলল, কেন বউদি এত দূরে যাবার কী দরকার! বাজারে গেলেই পাবে। কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে মুড়ি কোন দোকানে পাওয়া যায়।

সেই তো।

চন্দ্রনাথ গেট দিয়ে বের হওয়ার মুখে একটা লোক বলল, স্যারের সঙ্গে দেখা করব। তিনি আছেন?

যাবেন কোথায়। যান ভিতরে। বসার ঘরে আছেন।

আলো তখন দোতলার বারান্দায় খবর দিল, একজন আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

বল গিয়ে দেখা হবে না! কী চায় জানি। আর ইস্কুল-কলেজ পাঠ্যবই তিনি যে লিখবেন না স্থিরই করে ফেলেছেন। বাজারে ধরে গেলে বছরের পর বছর রয়েলটির টাকা। আর কপালও তার, যাতে হাত দেয় তাই সোনা। এই বইই তার কাল। বিনা পরিশ্রমে টাকা আসতে থাকলে, বাড়িতে মুড়ি থাকে না। চাউমিন থাকে। আম থাকে না, আমূল থাকে।

তোর হাতে কীসের পেকেট পাপাই। আয় তো কাছে। দেখি দেখি।

নাতিটি গদগদ হয়ে বলল, আমূল।

আমূল দিয়ে কী হবে। রান্নাঘরে রেখে আয়।

দাদুর নিবুদ্ধিতায় সে খিল খিল করে হাসছে। দাদু ঠিক ভেবেছে, এটা হল। মাখন। সে বলল, এই দ্যাখ না। মাখন না, ক্যাডবেরি।

মানবেন্দ্র প্যাকেটটা উলটেপালটে দেখল, কত দামরে?

দশ টাকা।

দশ টাকা। সকালে দশটা টাকা পেটে তোর ফাউ হয়ে ঢুকে যাবে। টাকাপয়সার দাম এত কমে গেল কবে।

ঘরে ঘরে ফ্রিজ বাবুদের। ঘরে ঘরে ফ্রিজে কোকোকোলার বোতল। জ্যাম জেলি, কাম্পাকোলা, অরেঞ্জ স্কোয়াস—এখন আর বাড়ি করে কিংবা রাস্তায় তেষ্টা পেলে বউমারা-নাতিরা জল খায় না। ডাবের জল সুস্বাদু এরা জানেই না। আরে এরা বোঝোই না, এই যে, সব দুরারোগ্য ব্যাধি নিত্যনতুন, কর্কট রোগের কথাই ধরা যাক, ঘরে ঘরে এই সব রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এখন তো আর ক্ষয় রোগের প্রকোপ নেই, সর্দিকাশির মতো অসুখটা মাসতিনেক ট্যাবলেট খেলেই আরোগ্যলাভ। নতুন সব প্রোডাক্টে বাজার ছেয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন রোগের প্রোডাক্টও বাজারে ছড়াচ্ছে—এখন তো আর ওলাওঠা কিংবা গুটিবসন্তে কেউ মরে না। কাজেই বাজারে রোগের নতুন নতুন প্রোডাক্ট না ছড়ালে, মানুষ যে মরণশীল সেটাই ভুলে যাবে না জননীরা।

টিভির সামনে বসাই যায় না।

একদিন বড়পুত্রকে ডেকে না বলে পারল না।

এত ঠাণ্ডা খাস না। কী কেমিকেল দেয়, রাস্তাঘাটে তাকানো যায় না, ফ্যাশান যেন, কী খাচ্ছে কেউ জানেই না। আফিমের জল যে মেশায় না কে বলবে! এত হলে নেশা হয়! বাড়িতে পর্যন্ত কোলার উৎপাত। শুধু জল বেচে পয়সা। কী যে হল দেশটা।

বড়োপুত্র বোঝে, তার পিতাঠাকুর চিন্তা-ভাবনায় খুবই সেকেলে। কিছু করারও নেই। মায়ের মৃত্যুর পর আরও জেদি হয়ে উঠছে। এখন পেটি পেটি কোলার বোতল ঠিকই আসে, চন্দ্রনাথ গ্যারেজেই রেখে দেয়—তার দিবানিদ্রার ফাঁকে, ওপরে নীচে, ঘরে ঘরে যার যার ফ্রিজে সে সব সুযোগ বুঝে পাচার হয়ে যায়।

চন্দ্রনাথ আম-মুড়ি নিয়ে ফিরে এল—মেজ বউমার বের হতে দেরি হয়ে গেল। দিন যত যাচ্ছে—তত যেন তার শ্বশুরমশাই জেদি হয়ে উঠছে। কেবল তাদের পছন্দের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাতের অপেক্ষায় তিনি বসে থাকেন।

রাতে ডিনারে পুত্রদের সঙ্গে সে আহার করে। এই একটা সময়, যখন সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। বউমারাও কিচেনে যাবে। তখন রান্নার মেয়ে অথবা আয়ারা যার যার ঘরে আয়েস করে। এই সময়টায় পুত্রদের সঙ্গে গল্পগুজব হয়, তাদের পিতাঠাকুরের মুখে তখন শুধু পুরনো দিনের কথা—তার মা, জেঠিমারা—

ছোটো বউমা বলল, বাবা এক পিস চিকেন পাপরিকা খান। আমি নিজে করেছি। খেয়ে দেখুন, না রিচ না। খান না।

তার এক কথা, না। তোমরা খাও। আমার জিরেবাটা দিয়ে মৌরলা মাছের ঝোলের কাছে কিছু লাগে না।

রাতের বেলাতেই নানা রেসিপি, যার যেদিন ইচ্ছে—বাবা, মাখন ভাতের সঙ্গে ভেটকি নিউবার্গ—খান, খেয়ে দেখুন।

না।

আশ্চর্য সুন্দর সুঘ্রাণ এবং চিনেমাটির প্লেটে সাজানো খাবার—কী দারুণ। খেয়ে দেখুন—বড়ো পুত্রবধূর অনুরোধ, উপরোধ।

না বউমা, তোমরা খাও। বড়োপুত্র প্রায় ক্ষেপেই গেল।

স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, কেন যে দাও। দ্যাখছ পছন্দ করে না।

বড় বউমাটি নাছোড়বান্দা–খাওয়াবেই।

বাবা।

বল।

একটু মুখে দিয়ে দেখুন।

দেখছি।

মুখে দিয়ে বলল, বিস্বাদ। আমি জানি না, কেন তোমরা খাও।

তারপর কিছুটা খেল। এবং প্লেট সরিয়ে দিয়ে বলল, আজ কি ভাত, ডাল, মাছ হয়নি?

হয়েছে। না হলে কাজের লোকেরা খাবে কী?

ওই দাও। এত সুন্দর করে সাজিয়ে যা দিয়েছ লোভ লাগে খেতে, তবে সহ্যও হযে না। পেট ভরে খাওয়া যাবে না।

সে জানে প্রায়ই রাতের ডিনারে এদের এক-একটা রেসিপি, সাধারণত রবিরারেই হয়ে থাকে। আত্মীয়স্বজনও আসে। তবে প্রায় বলতে গেলে সবাই বউমাদের বাপের বাড়ির। তার আত্মীয়স্বজন অপদার্থ, অর্থাৎ গরিব। একবার তো রাতে পূর্ণ, পূর্ণ মানে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা রাতের রেসিপি খেয়ে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।

মানবেন্দ্র কনিষ্ঠ ভ্রাতার খাওয়া দেখেই বুঝেছিল, তার পেট ভরেনি। কারণ তার খেতেই ইচ্ছে হয়নি। জোরজার করে যতটুকু খাওয়া।

কনিষ্ঠ ভ্রাতাটি সেই থেকে রবিবার দিনটিতে কখনো আর আসত না। রেসিপির ঠ্যালা সামলাতে সে রাজি না। আরে ভাত ডাল মাছের কাছে কি কিছু লাগে!

এইভাবে কখনো—চিকেন আলা, চিকেন সামুসিয়া এমনই কত রকম সব বিদঘুটে নাম—

বাবা এটা খান। একটু মুখে দিন, ভেটকির মধ্যে চিংড়ির পুর দিয়ে ক্রিম সসে অসাধারণ রান্না।

মানবেন্দ্র ভাবত, রান্না না, অর্থের গাবরাবাজি, অর্থের চূড়ান্ত অপব্যবহার।

খেতে বসলেই মেজাজ তার নানা কারণেই খাপ্পা হয়ে যায়। ইদানীং মাছ মাংস খাওয়ার তেমন আর আগ্রহ নেই। পেঁয়াজ রসুনের রান্নাও সহ্য করতে পারে না। বাজারের চালানি রুই কাতলা, না হয় ইলিশ, এ দুটো মাছই বেশি হয়। খাওয়ার পাতে বড়ো মাছের টুকরো, খেতে তুলোর মতো, কবেকার মাছ কে জানে, মাছের মাছত্ব বলতে আর কিছু থাকে না। ড্রাইভার চন্দ্রনাথ সকালের বাজার করে। বড়পুত্রের বের হতে দশটা-সাড়ে দশটা হয় বলে, চন্দ্রনাথ সকালটায় প্রায় ফ্রি থাকে।

খেতে বসলেই এক কথা, তখন অবশ্য রান্নায় মেয়েটাই কিচেনের মালিক। দুপুরে সে বলতে গেলে একাই খায়—কেউ তো তখন বাড়ি থাকে না—এই যে চন্দ্রাবতী

আজ্ঞে।

বাজারে ট্যাংরা পুঁটি কি পাওয়া যায় না?

বাবু আমি কী বলব। বাড়িতে ছোটো মাছ কেউ খেতে চায় না।

পাবদা মাছ পাওয়া যায় না।

চন্দ্রাবতী কী বলবে? চুপ করে থাকে। রাতে একদিন প্রায় হুকুমই জারি করে দিল সে।

বড়োপুত্রকে বলল, তোমরা যা খুশি খাও। আমার জন্য জ্যান্ত মাছ চাই। সকালে মক্কেলদের একটু কম আস্কারা দিয়ে বাজারের জন্য একটু সময় বের করে নাও। তোমরা কী হলে। আটটা না বাজলে তোমাদের ঘুম ভাঙে না।

শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে যায় বাবা।

আমি ওসব বুঝি না, তোমরা ভেটকি, চিংড়ি, পচা রুই, পচা ইলিশ যত খুশি খাও। আমি খাব না। আমার জন্য পুঁটি, মৌরলা, তাজা ট্যাংরা, তাজা পাবদার ব্যবস্থা করবে, না পারলে মাছ স্পর্শই করব না। মাংস হলে রেজালা খাসি, কেন দেশি পাঁঠার মাংস পাওয়া যায় না। তোমাদের তাড়নায় মাছ মাংস দুই ছেড়ে দিতে হবে দেখছি।

বড়োপুত্রটি বাবার মরজি বোঝে। যত দিন যাচ্ছে তত অতীতের স্মৃতি তাকে তাড়না করছে। কেমন অবোধ শিশুর মতো অদ্ভুত সব বায়না। যত দিন যাচ্ছে তত মা বাবা ভাই বোন, জেঠি কাকিদের গল্প—তখন কতরকমের রান্না হত—

তিলের বড়া খেয়েছ।

না।

না খাওয়ারই কথা। তাদের জননী এ দেশের মেয়ে, সে পোস্ত ছাড়া কিছু বুঝত না।

তিলের অম্বল, কচি পাটপাতার বড়া, পাটপাতার শাক, মানকচু সেদ্ধ সর্ষেবাটা দিয়ে, কত সব উপাদেয় খাদ্য—আর কাঁঠালবীচি সেদ্ধ গরম ভাত, না তুলনা নেই। য়াতে সেই মোকাম্বা চিংড়ি, কে যেন বলল, ভেটকি মাছের ভেতরে চিংড়ি মাছের পুর দিয়ে নতুন রেসিপি রেসিপির খেতাপুড়ি। সকাল বেলায় উঠেই হুকুম জারি করে দিলেন—তোমরা, বউমারা, নাতিরা যা খায় খাবে। আমি খাব না।

মেজপুত্র একটু বেশি আদরের, সে চিৎকার করে বলল, কারণ মানবেন্দ্র তার বসার ঘরে মেজপুত্রকে ডেকে বলেছিল, তোমাদের ছাঁইপাঁশ আর গেলা যাচ্ছে না। আমার জন্য কাঁঠালবীচি সেদ্ধ দিতে বলবে।

মেজপুত্রটি তর তর করে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গিয়ে খবরটা চাউর করে দিল।

কাঁঠালবীচি সেদ্ধ!

সে আবার কী? সবারই কেমন কৌতূহল জানার।

নীচে গিয়ে জেনে এস। তাঁর হুকুম। তিনি কাঁঠালবীচি সেদ্ধ খাবেন।

বড়ো বউমাকেই মানবেন্দ্র কিছুটা সমীহ করে। হাওয়া গরম। কেউ বাবার ঘরে যেতে রাজি না হওয়ায় সে-ই গেল।

বাবা।

সে ফের লম্বা বাণ্ডিল খুলছিল। গাটার খুলছিল—তারপর উলটোভাবে আবার মুড়ে নিচ্ছিল—কেউ তার ঘরে যে ঢুকেছে, বুঝতে অসুবিধা হয়নি—কিন্তু পাত্তা দিতে রাজি না। চিংড়ি মোকাম্বার জের চলছে—বুঝতে অসুবিধে হল না বড়ো বউমাটির।

বাবা।

বল।

কাঁঠালবীচি যে নেই।

নেই মানে।

শীতকাল না।

তাতে কী হল।

কাঁঠালবীচি পাব কোথায় তাই তো জানি না। আর সেদ্ধ কাঁঠালবীচি দিয়ে শুধু ভাত খাওয়া যায়!

সেদ্ধ কাঁঠালবীচি, সঙ্গে একগণ্ডুষ খাঁটি সরশের তেল—এটাও একটা রেসিপি খেয়েছ কখনো, দারুণ খেতে, মুখ বদলাবার জন্য মোকাম্বা চিংড়ি পর্যন্ত যাওয়ার দরকার হয় না।

ঠিক আছে, জোগাড় করি। দেখি কোথায় পাওয়া যায়। আপনাকে কথা দিলাম আপনার রেসিপিও হবে।

ওই হবে। স্তোক দেওয়া কথা।

মানবেন্দ্র একদিন ডেকে বড়ো বউমাকে বললেন, কী হল। সব পাওয়া যায়, কাঁঠালবীচি পাওয়া যায় না।

চেষ্টা হচ্ছে।

চেষ্টা হচ্ছে মানে!

নিউমার্কেটে পর্যন্ত গেছে আপনার বড়ো ছেলে। কাঁঠালবীচি নামটাই খুঁজে পেল না। যাও বলল, এখন তো বাবু কাঁঠালের সময় নয়। কাঁঠালবীচি পাবেন কোথায়!

কিচ্ছু জান না। কাঁঠালবীচি শুকিয়ে মাটির কলসিতে শুকনো বালির মধ্যে রেখে দিলে কখনো নষ্ট হয় না।

এক নাতি ক্লাস টেনে পড়ে। সে উঁকি দিলে বলল, বীচির হিমঘর।

হিমঘর না, প্রিজারভেশন।

মানবেন্দ্র বলল, আমাদের বাজারে পাওয়া গেল না।

বলল, পাওয়া যাবে। কাঁঠালের দিন আসুক, পাওয়া যাবে।

ততদিন বেঁচে থাকব তো।

আপনি বাবা এমন অলুক্ষণে কথা বলেন। সত্তর বাহাত্তর বয়েস একটা বয়েস।

আমার এখন সেভেনটি ফাইভ চলছে।

ওই হল।

একবার জণ্ডবাবুর বাজারে খোঁজ করবে ত?

আপনার ছেলেকে বলব।

কেন তোমরাও তো বের হও। ছেলেটা সারাদিন এক সময় পায় না। হিল্লি দিল্লি ঘুরে বেড়াতে পার, জণ্ডবাবুর বাজার চেন না। ওখানে মানিকতলার বাজারে ঠিক পাওয়া যাবে। রিফুজিদের বাজার নাই যে পাবে না, এ-দেশের লোক তো চিংড়ি পুঁই ছাড়া কিছু বোঝে না।

শেষদিকে একটু বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করায় বড়োবউমা, দেশের বাড়িতে ফোন করে পূর্ণকাকাকে খবর পাঠাল। পূর্ণকাকার বাড়িতে যে নেই। বাবার কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূর্ণকাকা গরিব মানুষ, তার শ্বশুর অভাব-অনটনে টাকা পাঠান—সম্প্রতি কাকার মেয়ের বিয়ের পণ যে সব খরচাই সামলেছেন।

মানবেন্দ্রর ছেলেরা তাকে একা ছাড়ে না—কোথাও প্রায় যেতেও দেয় না। তীর্থক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া যায় না, শুধু দেশের বাড়ি, দেশের বাড়ি কিছু গরিব পরিবার, ভাইয়েরা যে কেউ কেউ খুবই গরিব, থাকা কোথায়, পাখা নেই, পরিত্যক্ত কম্বলের মতো একটা বসতি, জঙ্গলের পড়ে আছে–শ্বশুরমশাইটির কাছে, এমন সুন্দর জায়গা, ভূ-ভারতে কেন, সারা পৃথিবীতেও খুঁজে পাওয়া যায় না। আজকাল মাঝে মাঝে বলছেন, তাঁর কিছু ভালো লাগছে না, দেশের বাড়িতে যাওয়ারও বায়না।

শ্বশুরমশাইয়ের দেশের এক ভগ্নীপতির বাড়িতে ফোন আছে। এস টি ডি করে তার সঙ্গেই কথা বলেছে বড়োবউমা–পূর্ণকাকাকে খবরটা দেবেন তাঁর বড়দা, কাঁঠালবীচির জন্য প্রায় বলতে গেলে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। সংসারে খুবই অশান্তি চলছে। খুবই আর্জেন্ট, পূর্ণকাকা যদি কারও বাড়ি থেকে কিছু কাঁঠালবীচি নিয়ে আসতে পারেন। যে করে হোক। না হলে হুমকি দিয়েছেন, একাই চলে যাবেন দেশের বাড়িতে। তাঁর ধারণা, গেলে পূর্ণ ঠিক ব্যবস্থা করবে।

ভগ্নীপতিদেরও যে অনেক অনুযোগ।

এত করে বললাম, দাদা দেশে একটা বাড়ি করুন। কিছুতেই তেনার মা রাজি। অর্থাৎ তার দিদিশাশুড়ির এককথা, না বাবা, তোর বাবার স্মৃতি, মাটির ঘর কি ফ্যালনা। সারাজীবন তিনি এই ঘরটাতেই কাটিয়ে দিয়েছেন, লাইট নেই পাখা নেই, আমরা তো মরে যাইনি।

মা বেঁচে থাকতে মানবেন্দ্র বছরে একবার অন্তত যেত। মা কিছুতেই কলকাতার বাড়িতে আসতে রাজি না। তাঁর বড়োছেলের পরিবারটি ম্লেচ্ছ হয়ে গেছে। আচার বিচারের কোনো বালাই নেই। তিনি গিয়ে সেখানে থাকেন কী করে!

মনিঅর্ডারে টাকা যেত, না হয় পূর্ণকাকাই মাসে একবার এসে, কাজের জন্য এবং দিদিশাশুড়ির জন্য টাকা নিয়ে যেত। শ্বশুরমশাই এলে, সেই মাটির ঘরেই আলো পাখা বিনা সাম্রাজ্যে বসবাস করে একেবারে তাজা হয়ে ফিরত। বাবার বানানো বড় একটা চকিতে শুত—ছোট্ট চকিতে মা।

আর মায়ের মৃত্যুর পর ছোটো চকিটি পূর্ণকাকা নিজের ঘরে তুলে নিয়ে গেছে। বড়ো তক্তপোশটিই ছিল মানবেন্দ্রর একমাত্র শোওয়ার জায়গা। জঙ্গলে না হয় মাঠে হাগা-মাতার কাজ সারত। পূর্ণকাকিমা রান্না করে দুবেলা বারান্দায় খেতে দিত। টালির লম্বা বারান্দায় একটা হাতল ভাঙা চেয়ারে বসে গাঁয়ের লোকজনদের সঙ্গে গল্প করত। কী দিন ছিল, কী দেশ ছিল, আর শেষে কী হয়ে গেল সব। শুধু আক্ষেপ!

পূর্ণকাকা এল ঠিক, তবে কাঁঠালবীচি সংগ্রহ করতে পারেনি। গরম পড়ে গেছে চৈত্রমাস। দাদাকে বোঝ প্রবোধ দিয়ে বলেছে—আর দুটো মাস দাদা।

আমি তোর সঙ্গে যাব। আর এক বায়না।

পূর্ণকাকা না বলে পারেননি, ও-ঘরে থাকা যাবে না দাদা। গত বছরের বন্যায় মাটির দেওয়ালে বড়ো বড়ো ফাটল ধরেছে। সাপখোপেরও উৎপাত আছে। হুড়মুড় করে কখন ভেঙে পড়বে-ঘরটায় আপনার ভাইপোরা থাকত—এখন তারাও রাতে শুতে সাহস পাচ্ছে না।

আমার সঙ্গে কি সাপের শত্রুতা আছে। আমাকে কামড়াবে?

না, তা না।

আমরা আগে থাকিনি?

তা থেকেছি।

প্রথমবার তোর মনে নেই, রাতের বেলা, মধ্যরাতে, মনে আছে একটা বিশাল দুধ খরিস মেঝেতে ফস ফস করছিল। মনে নেই।

ওরে বাস, কতবড় সাপটা।

বাবা কী বললেন পূর্ণ?

মনে নেই দাদা।

তা মনে থাকবে কেন, টাকা নিতে আসার কথা তো ভুলে যায় না।

পূর্ণ জানে, দাদার ওই মুশকিল, দেবে, আবার খোঁটাও দেবে। পূর্ণ জানে, দাদার এটা ধাত। মাসোহারা নিতে হলে সহ্য করতে হয়। দাদারও দোষ দেওয়া যায় না, তার নামে মনিঅর্ডার গেলে পাঁচ কান হবেই, তারপর বউদিটি জানতে পারলে সর্বনাশ। সে এলেই যা তা বলত। জোয়ান ব্যাটা, বিয়ে করার সময় খেয়াল ছিল না, আবার পুত্রকন্যাও হয়েছে। এক পয়সা রোজগার নেই, বিয়ে করলে কোন আক্কেলে। সারাজীবন মানুষটাকে জ্বালাচ্ছে।

দাদারও অশান্তির শেষ থাকে না।

পূর্ণই দাদাকে বুদ্ধি দিয়েছিল, আমার টাকা মনিঅর্ডারে পাঠাবেন না। মা, শুধু মা কেন, বোনেরাও বউদিকে জানিয়ে দেয়। কারও অবস্থাই যে খুব একটা পদের না। কনিষ্ঠ ভ্রাতাটিকে মাসোহারা পাঠানো হয়। আর তারা কি সব বানের জলে ভেসে এসেছে। মানবেন্দ্র যে সবারই বড়দা। সুতরাং পূর্ণ নিজেই আসে। গাছের নারকেল, লেবু, আমের দিনে আম, লিচুর দিনে লিচু, কাঁঠাল, বাড়িটা বলতে গেলে মা আর কনিষ্ঠ ভ্রাতাই ভোগ করে।

আমাদের বাড়ির পুকুরপাড়ের গন্ধরাজ লেবু বড়োবউদি। তোমাদের জন্য নিয়ে এলাম। দ্যাখ কত বড়ো হয়েছে।

রমার হয়ে গেল। পূর্ণ না থাকলে, বাড়ির ফল-পাকুড় কে খাওয়াত। সেই তো তবু সম্পর্ক রেখেছে।

মানবেন্দ্র মজা ভোগ করত। আসলে টাকার লোভে এসেছে, রমার মন জয় করা কত সহজ।

আমের দিনে আম।

লিচুর দিনে লিচু।

কখনও নারকেল।

মানবেন্দ্র বলেছিল, সে কি তটস্থ অবস্থা। মেঝে থেকে গলা বের করে ফোঁস ফোঁস করছে, মা বাবাকে ডাকছে, বাবার তো কুম্ভকর্ণের ঘুম। ঘুম ভাঙে না। ঠেলেঠুলে ভোলা হল, বাবা উঠলেনও, হারিকেনের আলোতে দেখলেনও-ও সাপ, তা বেশ বড়ো।

ইঁদুরের যা উৎপাত। একটা ধানের বস্তাও আস্ত নেই। ইঁদুরে ধান খায়, সাপে দর খায়। ধানের বস্তা আস্ত আছে তোমার। সারা মেঝেতে, খাটালের নীচে ইঁদুরের বাসা। ধানের দফা রফা করছে। সাপ না, আসলে মঙ্গলময়ী। ইঁদুরের গুষ্টির তুষ্টি করে ছাড়বে। নাও শুয়ে পড়।

বাবা পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন, নাক ডাকতে থাকলেন, মনে নেই তোর।

হ্যাঁ হ্যাঁ, পূর্ণ জানে দাদার কথায় সায় না দিলে টাকার অঙ্কে এক লাফে অর্ধেক হয়ে যেতে পারে।

তা হলে?

পূর্ণ বুঝতে পারল না। হাঁ করে তাকিয়ে ছিল।

সাপ কামড়াবে কেন। তার সঙ্গে কি আমার শত্রুতা আছে। আমি যাব, সাপই থাকুক, আর গতবারের বন্যায় মাটির দেওয়াল বসেই যাক। বাবার তক্তপোশে শুয়ে থাকলেও শান্তি।

পূর্ণ খুবই ঘাবড়ে গেছে। বাবার আস্ত তক্তপোশটাও যে হাফিজ হয়ে গেছে।

আসল কথা বাবার চকিটা বেশ বড়ই ছিল। তার দুই ছেলে, তারাও লায়েক, দুজনই রঙের মিস্ত্রি। রঙের কাজ করে। বোনের বিয়ে উদ্ধার হয়ে যাওয়ায় তারা আর জ্যাঠাকে সমীহ করে না। এজমালি সম্পত্তি। যে যা কেড়ে নিতে পারে ঠাকুমার বাসনপত্র, কম তো ছিল না, কত বড়ো বড়ো সব কাঁসার থালাবাসন, জামবাটি, তামার ডেগ, প্রেস্টিজ কুকার, শ্বেতপাথরের থালা, বোকনা, কী ছিল না। সবই তাদের বড়পিসি হাতিয়েছে—গাছটাছও পূর্ণ বিক্রি করে দিচ্ছে, বড়দাকে না জানিয়ে—সবই করতে পারে, তবে মা-র ঘরের তক্তপোশটা বের করে দু-আধখান করে, তার রঙের মিস্ত্রির যোগ্য পুত্ররা কেটে যে ফাঁক করে দিয়েছে, আসলে ঘরটায় মানবেন্দ্রের প্রিয় তক্তপোশটিই হাফিজ হয়ে গেছে। দাদার মেলা আছে, ভাইপো-ভাইঝিরাও ভাবছে, জ্যাঠা বুড়ো হয়ে গেছে, আর আসছে না, এমনকী অন্য শরিকরা, সেই ভাই আর বোনই হোক, কাউকে এখন বাড়িটায় ঢুকতেই দেওয়া হয় না। আর জরাজীর্ণ মাটির ঘরটি নিয়েও কারও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মানবেন্দ্রের কাছে এই ঘরবাড়ি তীর্থের সামিল। পূর্ণ ঘর মেরামতের অছিলায় দাদার কাছ থেকে দফে দফে কম টাকাও নিয়ে যায়নি—কিন্তু দাদা যাবে শুনে তার মাথা ঘুরতে শুরু হয়েছে। এবারে আসল খবরটি দিলে যে এ বাড়িতে আর ঢোকা যাবে না, তাও জানে। আসলে তিন বিঘে জমি যদি জবরদখল করে নিতে পারে, জমির দামও মেলা, বিশ-বাইশ হাজার টাকা কাঠা—সেই জমি বারো চোদ্দতে রেজিষ্ট্রি এমনকী বন্টননামা ছাড়াই কেনার মেলা লোক আছে সে জানে। শুধু বসিয়ে দিলেই হল। দাদার সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকল কি গেল বয়ে গেল তার। তার বউদিটি তো তাকে কম অপমান করেনি।

পূর্ণ অগত্যা বলল, এই গরমে গিয়ে কী করবেন। কষ্ট হবে আপনার।

হোক কষ্ট। তবু যাব।

কাঁঠালবীচির জন্য যাবেন, দুমাস বাদেই বৃষ্টি নামবে। কাঁঠালের সিজন শুরু হবে। বাড়ির কাঁঠালও খাওয়া হবে, তার বীচিও পাওয়া যাবে। আমি এসে নিয়ে যাব।

বড়োপুত্রটি অফিস বের হওয়ায় সময় ইশারায় পূর্ণকে ভেতরে যেতে বলল। ভেতরে না, একেবারে বড়োপুত্রের এলাকায়। দাদা ছেলেদের জন্য প্রায় বলতে গেলে প্রাসাদ বানিয়ে রেখেছে। যে যার এলাকায় থাকে। তবে ঘরগুলি তার গুদামখানাই মনে হয়। বড়ো বড়ো সব স্টিলের আলমারি, টিভি, সেও বিশাল এক কোনায় কম্পিউটার, কী যে কাজে লাগে, সে বোঝে না। বড়োপুত্রটি তার বসার ঘরে নিয়ে কাকাকে বসাল।

কী বলছে?

কী আবার বলবে, জানই তো বাড়ি যাবার নামে পাগল। বড়োবউমার চিঠি পেয়েই তো ছুটে এসেছি, দাদা কাঁঠালবীচি সেদ্ধ খাবে। পাওয়া যায়নি।

খবরদার নিয়ে যাবেন না। হার্টের অবস্থা বিশেষ ভালো না। বাড়ি বাড়ি করে সবার মাথা খারাপ করছে। কোথায় বাবা স্কুলের প্রধানশিক্ষক ছিলেন, সেখানেও যাবেন বলছেন। আপনি আবার উসকে দেবেন না।

না, আমি এক পাগল! দাদার সব অভ্যাস বদলে গেছে। সুখী মানুষ, আর রাখবই বা কোথায়! আগে তবু মা-র ঘরটা ছিল, গত বছরের বন্যায় ঘরে জল ঢুকে গেছিল। ঘরটার বয়সও তো কম না। পঞ্চাশ-ষাট বছর তো হবেই। কিছু একটা হয়ে গেলে কেলেঙ্কারি।

পূর্ণ ফের বলল, কিন্তু দাদা যে বলছেন, তাঁর এখানে একদম ভালো লাগছে না। ছাঁইপাঁশ রান্না হয়, একদম মুখে দিতে পারেন না। তাঁকে কেউ গ্রাহ্য করে না। ব্রাত্য হয়ে গেছেন।

সে বলুকগে। আমিও বলেছি, বর্ষা পড়ুক, হরনাথ আপনাকে হিজলের রেল লাইন, অদুলার গুমটিঘর সব দেখিয়ে আনবে। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই বায়না। কিছুতেই কোনো তীর্থভ্রমণে বের হবেন না। আমার শ্বশুরমশাই এত করে বললেন, চলুন বেয়াই দক্ষিণ ভারত ঘুরে আসি, কিছুতেই রাজি করাতে পারলেন না—তাঁর নাকি কোথাও গিয়ে ভালো লাগে না। হোটেলের খাবার সব অখাদ্য— আমরা বড়োই ফাঁপরে পড়ে গেছি। বলেছি গাড়িতে যাবেন, বাড়ি হয়ে ফিরবেন। অদুলার গুমটিঘরও দেখা হবে। সঙ্গে হরনাথ থাকবে, পূর্ণকাকা থাকবে।

পূর্ণ আশ্বাস দিল, সে তোমাদের ভাবতে হবে না। বুঝিয়ে দিলে কথা বুঝবেন।

বড়োপুত্রকে বড়োই অসহায় দেখাচ্ছিল।

বাবার বয়স হয়েছে, হার্টের অবস্থা ভালো না—কিছুই মানতে রাজি না। তাঁর এককথা, আসলে আমাকে তোমরা বাড়ি থেকে বের হতে দিতে চাও, না। আমার কিছু হয়নি। সবাই তোমরা বউমাদের কথায় নাচ।

যাইহোক, শেষ পর্যন্ত পূর্ণ তার দাদাকে সাময়িকভাবে নিবৃত্ত করতে পেরে খুশি।

আমি কথা দিচ্ছি দাদা, জ্যৈষ্ঠমাসের শেষাশেষি আমি আসব আপনার সাধের কাঁঠালবীচি সেদ্ধ আপনি খেতে পাবেন। বাড়িতে গিয়ে বললে, ঝুনুর মা সব ব্যবস্থা করে রাখযে।

শোন আমি কিন্তু কুমড়ো ফুলের বড়া খাব।

খাবেন।

বেলেমাছের চালকুমড়ো পাতার বড়া খাব।

খাবেন।

বাড়িতে কত রেসিপি হয়, হয় না বেগুন দিয়ে গিমাশাক। খেতে বড়োই সুস্বাদু বল। বাড়িতে যা চলছে, পাঁচ-সাতদিন থেকে যা তবেই বুঝতে পারবি।

চপকিয়া স্যালাড, নাম শুনেছিস?

আজ্ঞে না।

বুকিয়া স্যালাড। নাম শুনেছিস?

আজ্ঞে না।

জুকিনি?

না।

ফিস মুনিয়ের, গ্রিলড ফিস, লেমন রাইস-বউমারা রবিবার রাতে রেসিপি করবে, আর উর্ধ্ববাহু হয়ে নাচবে। এসব নাকি একজিকিউটিভ বুফে—বল মাথা ঠিক রাখা যায়। তোর মাথা ঠিক থাকত। ভারতীয়, কন্টিনেন্টাল, চাইনিজ। রবিবার আসে, আবার রবিবার চলে যায়। রবিবারের আতঙ্কে আমার ঘুম গেছে। বিশ্বায়ন বিশ্বায়ন বাইরে চলছে, সেটা যদি ঘরে ঢুকে যায়, ইচ্ছে হয় না পালাই।

তা তো ইচ্ছে হবেই।

তোর বউদি বেঁচে থাকত, দেখতাম মজা।

আমাদেরও কম রেসিপি নেই। কাসুন্দি দিয়ে রসুন সম্বারে নটেশাক কতকাল যে খাই না। কত বলেছি, আমার ভাইরা তো দেশে থাকে—গেলে কতরকমের রেসিপি।

বড়দা আজ লাউশাক করি।

লাউশাক। দারুণ, দারুণ, ভুলেই গেছি।

লাউচিংড়ি।

আমার মা বড়ি দিয়ে যা লাউচিংড়ি করত, ওই এক পদ দিয়েই এই থালা ভাত খাওয়া যায়। কোথায় যে গেল যে সব খাবার! বাড়িতে আমার, দুই পুত্রবধূ লাউ খায় না লাউ আসে না। মাগুরমাছ খায় না নাতিরা-বাড়িতে যা চলছে না।

পূর্ণ খুব হতাশ গলায় বলল, নাতিদের দোষ দিয়ে লাভ নেই দাদা। ঠাকুরের কৃপায় সংসারের কোনো অভাব নেই, শুধু জমছে। ওড়াতে না পারলে টাকার গায়ে ছাতা ধরে যাবে না। গরিবদের বাঁচতে হবে না।

মানবেন্দ্র বড়পুত্রকে ডেকে বলল, পূর্ণ আমাকে নিতে কবে আসবে বলে দাও।

আসবে, নিয়ে যাবে ঠিক।

আমি কিন্তু ট্রেনে যাব।

পূর্ণ বলল, কেন বাড়ির গাড়ি পাওয়া যাবে না?

দ্যাখ পূর্ণ, তুই আমার চেয়ে ভালো বুঝিস। বর্ষা থাকলে রাস্তাঘাটের কী অবস্থা হবে বুঝিস না। এই সেদিন এক ওয়গনার গ্যারেজে ঢুকেছে, নতুন গাড়ি, খানাখন্দে পড়ে গাড়ির বারোটা বাজুক আর কী।

বড়োপুত্র দরজার আড়াল থেকে ইশারায়, বাবার সব কথায় সায় দিয়ে যেতে বলল।

আসলে মানুষটি যে খুবই নিঃসঙ্গ, পুত্ররা বোঝে। এবং সেই কথামতে দিনও স্থির হয়ে গেল। পূর্ণ এলে বড়োপুত্র সাবধান করে দিল, সাবধানে নিয়ে যাবেন। মা না থাকায় আমাদের হয়েছে মুশকিল, একবগ্ন হয়ে গেল। মাথাও যেন কিছুটা বিগড়ে গেছে মনে হয়।

সব ঠিক হয়ে যাবে। কাঁঠালবীচি সেদ্ধ আর ক-ফোঁটা খাঁটি সরষের তেল দিয়ে ভাত পাতে পড়লেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ভাবিস না।

তুলবেন কোথায়।

মেজদার বাড়িতে।

তাদের ছোটোকাকাটির পোশাক খুবই মলিন, টাকাপয়সা যে যায়, সেই টাকাপয়সায় ইচ্ছে করলেই ভালো জামাপ্যান্ট কিনে পরতে পারেন, তবে কিছুতেই পরবেন না, যদি বাবা মাসোহারা বন্ধ করে দেন—তুই তো ভালোই আছিস দেখছি। ফুটানি করতেও শিখে গেছিস—আর দাদার ঘাড়ে চেপে বসে থাকা কেন, তবেই হয়ে গেল।

দুর্গা দুর্গা করে রওনা করিয়ে দেওয়া হল।

মেজপুত্র বলল, চন্দ্রনাথ, বাবাকে ছোটোকাকাকে গাড়ির কামরায় বসিয়ে ট্রেন ছাড়লে তবে ফিরবে।

আজ্ঞে ট্রেন ছাড়তে দেরি করলে!

ও ঠিক আছে, বড়োবউদির গাড়িতে চলে যাব। তুমি ঠিক চারটায় হাসপাতালে চলে যাবে।

শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছেই পূর্ণ কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারল, ফার্স্ট ক্লাস বগি আছে, তবে টিকিট ইস্যু করা হয় না।

তা মান্ধাতা আমলের লাইন, লাইনের দুপাশে যত দূরেই যাও, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, শুধু রিফুজি কলোনি—রিফুজিরা কখনো টিকিট কাটে না। এ লাইনটা চেকারবাবুদের স্বর্গরাজ্য লজঝড়ে ট্রেন, লজঝড়ে যাত্রী, টিকিট না কাটলেও অসুবিধা হওয়ার কথা না।

পূর্ণ আরও জানাল, অর্ডিনারি টিকিট কেটে প্রথম শ্রেণির বগিতে বসে পড়লেই হবে। চেকারবাবুর সঙ্গে পরে রফা করে নিতে হবে।

মানবেন্দ্র বলল, তার মানে।

পূর্ণ বুঝতে পারল, কথাটা শুনে দাদা বিগড়ে গেছে।

আসুন তো দেখা যাক না কী হয়, দুটো টিকিট কাটা আছে।

চন্দ্রনাথ বলল, বাবুর খুব অসুবিধা হবে।

পূৰ্ণর এক ধমক, আমার দাদা না, তোমার দাদা।

চন্দ্রনাথ জানে বড়োবাবু এই সব রফাটফা একদন পছন্দ করে না। শেষ পর্যন্ত ঠিক অর্ডিনারি কামরায় উঠে বসে থাকবে। যা একরোখা মানুষ।

পূর্ণ অভয় দিল, আরে খালি কামরা দেখে উঠলেই হবে। বসার জায়গার অসুবিধা হবে না। পাঁচ-সাত ঘণ্টা তো লাগবে। গাড়িটায় একদিন ভিড় হয় না। শুয়ে-বসে যাওয়ার কোনোই অসুবিধা হবে না। তুমি ভেব না চন্দ্রনাথ। বাড়িতে গিয়ে বলারও দরকার নেই।

আসলে পূর্ণ যে বাড়িতে আশ্বাস দিয়ে এসেছে পুত্রদের, তোরা চিন্তা করিস না। সাড়ে বারোটার গাড়িতে একটা ফার্স্ট ক্লাসের বগি দেয়। ওতে উঠে চলে যাব। এখন চন্দ্রনাথ যদি বাড়িতে গিয়ে বলে দেয় টিকিট পাওয়া গেল না, অর্ডিনারি ক্লাসে উঠেই চলে গেছেন, তা হলে আর এক বিপত্তি। বাবার যাতে অসুবিধা না হয়, সেই ভেবে কাকার হাতে গুচ্ছের টাকা ধরিয়ে দিয়েছে বড়োপুত্রটি।

হয়ত বাবুর পুত্ররা গাড়ি নিয়ে বের হয়ে ট্রেনের আগেই বাড়ি পৌঁছে যাবে। বাবাকে শেষ পর্যন্ত আস্ত নিয়ে নামাতে পারল কি না এমন আশঙ্কার উদ্রেক তাদের মনে হতেই পারে।

আর আশ্চর্য, ট্রেনে ওঠার মুখে দেখা গেল একদম ভিড় নেই। সাধারণ কামরাতেও শুয়ে-বসে যেন সহজেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো যায়। এক ধারে সিট জানালা তুলে দিলে হাওয়া-বাতাসেরও অসুবিধা থাকল না। তবে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি থাকবে না হয় কী করে। এবং মনে হল, তার, ভারি আরাম, ট্রেন ভিজতে ভিজতে ছুটবে, তারা তার যাত্রী।

চন্দ্রনাথ উঠে এসে দেখে গেল।

পূর্ণ বলল, সারা রাস্তায় এরকমই থাকবে। ট্রেনটায় একদম ভিড় নেই। নিজ চোখে দেখে গ্যালে তো।

মানবেন্দ্র এবার চন্দ্রনাথকে এক ধমক লাগাল—কাজে ফাঁকি, যাও নামো, ওর হাসপাতালের দেরি হয়ে যাবে। বাড়িতে গিয়ে বলবে পূর্ণ আমাকে ফাঁকা গাড়িতে বেশ ভালোভাবেই নিয়ে যাচ্ছে। অযথা চিন্তা করতে বারণ করবে।

ট্রেন ছাড়ল।

ট্রেন ছুটছে।

বিধাননগর স্টেশন ধরল না।

তারপর দমদমের কাছাকাছি এসে থেমে গেল।

অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। ভালোই লাগছিল। এত স্বাধীনতা—নেমে বৃষ্টিতে ভিজলেও যেন হয়। তার আর যেন কোনো পিছুটান নেই।

পূর্ণ বলল, বৃষ্টি হয়ে ভালোই হল দাদা। কী বলেন?

কেন রে বৃষ্টি না হলে খুব খারাপ লাগত তোর।

আরে না, বুঝছেন না কেন। এমন ঘনঘোর বৃষ্টিতে বাড়ি থেকে কেউ বের হয়। দুর্যোগ মাথায় করে কার এত দায়। বের হওয়ার! খুব জরুরি কাজ থাকলে এক কথা।

তা অবশ্য ঠিক।

তারপরই মনে হল তার, ট্রেনটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজলে যেতে দেরি হয়ে যাবে।

শেষে মানবেন্দ্র না বলে পারল না, কী রে পূর্ণ ট্রেন তো দেখছি শুরু থেকেই লেট করতে শুরু করল।

না, না, ঠিক শেষে মেকআপ করে দেবে, দ্যাখুন না—ভাগীরথীর পরেই এটা ভালো ট্রেন। আপনি তো ফার্স্ট ক্লাসে উঠলেন না। রফাটফায় আপনার বিশ্বাস নেই। দেখতেন কেউ হয়ত কোনো প্রশ্নই করত না। সারা রাস্তায় দেখবেন, এক দুজন চেকারবাবু যাও থাকবে—কেবল পালিয়ে বেড়াবে।

পালিয়ে বেড়াবে কেন?

আরে যাত্রীর মুখোমুখি পড়ে গেলেই টিকিট চাইতে হবে না। কাজের এত চাপ বাড়িয়ে কী দরকার—এমনিতেই সবাই যখন সব কিছু হাতের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

তখন গাড়িটা নড়ে উঠল।

যাক চলছে—এমন ভাবল মানবেন্দ্র।

তখনই তার মনে হল, এভাবে বর্ষণে জানালার ধারে বসে থাকলে শৈশবের কথা স্মৃতির চূড়ায় ভেসে উঠবেই।

কী রে পূর্ণ তোর মনে পড়ে, বৃষ্টির দিনে আমরা ভাইবোনেরা বারান্দায় বসে কাঁঠালবীচি ভাজা খেতাম। মা বালিতে গরম গরম ভেজে দিত।

পূর্ণ বলল, বাবা বলতেন, কী সামান্য উপকরণ, অথচ আশ্চর্য সুস্বাদু খাবার।

সেই।

দুধকচু দিয়ে মুগের ডাল, মা-ও নেই, সেই রান্নাও নেই। আমাদের তখন কী অভাবের সংসার! বাবার উপার্জন নেই, এতগুলি মুখে অন্ন জোগানোই কঠিন। জমির ধান সম্বল। আর বাড়ির এখানে সেখানে লাউ, শশা, কুমড়ো তেঁড়স ফলনও হত। বাবার গাছ লাগানোর গুণই আলাদা।

আসলে এই সব স্মৃতিই এখনো তাকে দেশের বাড়িতে যাওয়ার জন্য পাগল করে দেয়। বাড়ির অখাদ্য খাবার খেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেই কেন যে মনে হয় দেশ থেকে ঘুরে আসা যাক। এখন তো আর একা যেতে পারেন না। কেউ না কেউ সঙ্গে থাকেই–

বাড়িতে গেলে শোরগোল পড়ে যায়। বড়দা আসছে।

দাদার বাথরুমের অসুবিধা, এখন আর সেই অসুবিধা নেই। দাদা তাকে গুচ্ছের টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। বাড়ির জন্য, যেমন মা-র ঘরটাই ধরা যাক। যা খরচ হবে, তার তিনগুণ দাদার কাছ থেকে সহজেই হাতিয়ে নেওয়া যায়। মাঝে মাঝে সে তার দাদাকে পাগলও ভাবে। বাবার তক্তপোশে শুয়ে এক-দু হপ্তা পার করে দিলে, দাদার নাকি পরমায়ু বেড়ে যায়। পৈতৃক ভিটার নামে মানুষ এমন পাগল হয়। পূর্ণ বোঝে এতে তার পোয়াবারো—তার সংসার খরচ দাদা এমনিতেই দেয়, বাড়ি এলে দু-হাতে টাকা খরচ করতে ভালোবাসে। পরমায়ু বৃদ্ধির তক্তপোশটা যে তার দুই পুত্র সুজন-কুজন বের করে দুফালা করে যার যার ঘরে তুলে নিয়ে গেছে, জ্যাঠা বুড়ো হয়ে গেছে, বাড়ি থেকে বের হওয়া নিষেধ, বাড়ি থেকে বের হলেও গাড়ি না হয় ট্যাক্সিতে—কেউ না কেউ সঙ্গে থাকতে হয়, জ্যাঠার মৃত্যুও ঘনিয়ে আসছে—এমনও ভাবতে পারে—বাড়ির যা কিছু যতটুকু দখল করা যায়। তারা দু-হাতে যা পারছে জ্যাঠার ঘরবাড়ি থেকে তুলে নিচ্ছে। জ্যাঠার এত টাকা খাবে কে। কাজেই পূর্ণর মন ভালো না। কোথায় রাখবে, কোথায় যে শুতে দেবে। দাদা ক্ষেপে গেলে তার যে সব যাবে।

এমন সব স্মৃতির মধ্যেই ট্রেনটা হুস করে স্টেশনে ঢুকে গেল—ওরে বাপস, পঙ্গপালের মতো উড়ে আসছে যেন। ট্রেনের দরজা-জানালায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে সব। কারও হুস নেই এমন মনে হল মানবেন্দ্রর।

গাড়িটার একটাও জানালা নেই। লোহার শিক নেই। মাথার ওপর সব পাখা হাপিজ।

জানালা গলিয়ে দরজা ঠেলেঠুলে যে যার মতো গাড়ির ভেতর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। বাক্সপ্যাঁটরা ধপাস ধপাস ফেলছে। খালি সিট আর একটাও নেই। রক্ষা, সে জানালার ধারে, পূর্ণও জানালার ধারে। এদিকের জানালায় অবশ্য কাচ আছে–তাতেই যেটুকু রক্ষে।

বৃষ্টি ধরে আসায় পূর্ণ জানালার কাচ তুলে দিতেই মিষ্টি হাওয়া। যদিও খালি সিট নেই, তবু যে ট্রেনটা ফাঁকাই। কেউ দাঁড়িয়ে নেই। সরকারের ভারি সুবন্দোবস্ত। গোটা ট্রেনটা জনগণ হাপিজ করতে পারেনি প্রশাসন খুবই কড়া বলে।

আজকাল বয়েস হয়ে যাওয়ায়, সামান্য ভিড়েই হাঁসফাঁস লাগে। বড়োই অস্বস্তি হয়।

কী রে পূর্ণ, কী বুঝছিস।

কিছু ভাববেন না। আমার দায়িত্ব নেই। এই ট্রেনটায় ভিড় থাকে না। সামনের স্টেশনে দেখবেন খালি হয়ে যাবে কামরা।

এরা যে লোকাল যাত্রী দেখলেই বোঝা যায়। তবে লোকাল যাত্রী অনায়াসে বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে পাঁচ-সাত ঘণ্টা পার করে দেবে না, কে বলতে পারে। তারপরই মানবেন্দ্র ভাবল ট্রেনটায় একটা প্রথম শ্রেণির বগি আছে। খুব বেশি ভিড় দেখলে সেখানে না হয় উঠে যাওয়া যাবে।

পূর্ণ বলল, দাদা আপনি চিন্তা করবেন না তো–এরা অধিকাংশই বিনা টিকিটের যাত্রী—সবই সম্ভব, সবাইকে তো বেঁচে থাকতে হবে। যে টিকিট কাটতে পারে কাটুক, যে পারে না, তারও তো একটা উপায় রাখতে হবে।

তখনই মানবেন্দ্র দেখল পাশের বেঞ্চিতে, চার-পাঁচজন লোক একটা কাগজে উপুড় হয়ে কী দেখছে।

সে জানে কী দেখছে—সেই বিপ বিপ শব্দ। সকালেই কাগজটা দেখেছে, মঙ্গলগ্রহে প্রাণ আছে কী নেই-তার ছবি। মানুষ কত কিছু যে ভেবে রাখে, মানুষের জন্মহার খুবই দ্রুতগতির দিকে, এই শতাব্দীর শেষে হাগামোতার জন্যও বোধহয় এই গ্রহে ফাঁকা জায়গা পাওয়া যাবে না। অন্য কোনো গ্রহে বসতি স্থাপনের বন্দোবস্ত যদি করা যায়। ছবিটা দেখার কৌতূহল থাকবেই। গ্রহটির নাম নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে, কত দূরত্বে তাও তাদের কথাবার্তার বিষয়। অত দূরে মানুষের জন্য মহাকাশ ফেরি তৈরি থাকবে। চন্দ্রবিজয় হয়ে গেছে মানুষের এখন একমাত্র মঙ্গলবিজয় বাকি।

মানবেন্দ্রর কেন যে দীর্ঘশ্বাস উঠে এল, আর এক দুর্ভোগ। ট্রেনের বদলে মহাকাশ ফেরি—তখনো হয়ত পৈতৃক ভিটায় ফেরার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যাবে।

সে না হয় ভিড়ে অসুবিধা হলে ফার্স্ট ক্লাসে পূর্ণকে নিয়ে গিয়ে বসবে, কিন্তু চেকার যদি রফা করতে চায়। সে যদি রফায় রাজি না হয়। চেকার বলতেই পারে সর্বত্রই রফা হচ্ছে, আপনার বেলায় ব্যতিক্রম হবে কেন সার। ট্রেনে বোধহয় চাপেন না।

খুব ভুল হয়ে গেল। টিকিট যথাযথভাবে কাটার এই ম্যানিয়া এই একবিংশ শতাব্দীতে থাকা উচিত কি না এও মনে হল তার। সে এত বড়ো লম্বা ট্রেনে একজন চেকারবাবুকেও দেখতে পাচ্ছে না। এত লম্বা ট্রেন, চেকারবিহীন হয়ে থাকলে মানাবে কেন!

আর এও মনে হল তার, পূর্ণর কথাই ঠিক—এরা গরিব মানুষ, গরিব মানুষের পয়সা কোথায়, টিকিট না-ই কাটতে পারে। সে যেতে যেতে হাইরাইজ বিল্ডিংও কম দেখছে না—আবার বস্তি অঞ্চলেও ভরে আছে চারপাশ। ট্রেনই সাধারণের যানবাহন।

ট্রেন চলছে ফের।

বেশ দুলুনি খাচ্ছে।

শহর গঞ্জ, ধানের মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে। একটা ছোটো রেল ব্রিজও পার হয়ে গেল। দু-পাশের দৃশ্যাবলি না হলেও, একপাশের দৃশ্যাবলি ভালোই উপভোগ করা যাচ্ছিল। ট্রেনের গতিও বেড়েছে। এভাবে শেষ পর্যন্ত যেতে পারলে ট্রেনে যাওয়াই সুবিধা, বাসেও যাওয়া যেত—সরকারি বাস মেলা। উত্তরবঙ্গের যে-কোনো বাসে চাপলেই যাওয়া যায়। মুশকিল বয়েস হয়ে যাওয়ায় প্রস্ট্রেটে কিছু গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। ঘণ্টার ঘণ্টায় প্রস্রাব পায়। বাস তো বার বার দাঁড় করানো যায় না। বাস ছাড়লে টানা গতি পেয়ে যায়। সেই কৃষ্ণনগরে পনেরো মিনিটের হল্ট। আগে পিছে বাস দাঁড়ায় ঠিক, লোকও তুলে নেয়। ভিড় গেঞ্জামও থাকে, নেমে যে একটু হালকা হয়ে নেবে তারও উপায় থাকে না। বারবার কতবার বলা যায়, বাস থামাও বাপু।

এসব কারণে বসে যাওয়ার একটা অস্বস্তি থাকে—পুত্ররা তার রাজি হয়নি। বর্ষায় রাস্তা খাটাল হয়ে আছে বলে গাড়িতেও ছাড়তে রাজি হয়নি। এই সব দুর্গতির কথা ভেবেই পূর্ণ পুত্রদের আশ্বাস দিয়ে এসেছে, ট্রেনেই ভালো—ভিড়ও থাকবে না, শুয়ে-বসে-ঘুমিয়ে ট্রেনযাত্রা কাবার করে দেওয়া যাবে।

তবু দুর্গতি থাকলে কপালে কে খণ্ডায়। কাউন্টারে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিই পাওয়া গেল না।

তখনই চাই চা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *