৬
মোফাজ্জল করিম বুঝতে পারছেন না তাঁর হয়েছেটা কী। মাওলানার বাড়ি যাওয়ার রাস্তা তিনি চিনেন না এমনতো না। জুম্মাঘরের ডান দিকের রাস্তা। কতবার গিয়েছেন। অথচ তিনি বাম দিকের রাস্তা ধরে স্কুল ঘরের কাছে চলে এসেছেন। কী অদ্ভুত কাণ্ড!
হেডমাস্টার সাহেব স্লামালিকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম। কে?
আমি শরিয়তুল্লাহ।
মোফাজ্জল করিম বললেন, শরিয়তুল্লাহ কে?
আমি কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল শরিয়তুল্লাহ নখসবন্দি।
ও আচ্ছা আচ্ছা গোস্তাকি মাফ হয়। আপনাকে চিনতে পারি নাই। ভালো আছেন?
ভালো আছি। আমি আপনার উপর সামান্য বেজার আছি।
মোফাজ্জল করিম চিন্তিত গলায় বললেন, কেন?
আপনি সমাজপতি। আপনি যদি মেয়েদের নিয়ে নাচানাচি করেন তাহলে কি ভাবে হয়।
মোফাজ্জল করিম হকচকিয়ে গেলেন। মমতা অতি গলায় বললেন, মেয়েদের নিয়ে কী নাচানাচি?
দল বেঁধে সার্কাস দেখতে গেছেন। যান নাই?
ও আচ্ছা আচ্ছা।
কাজটা ভুল হয়েছে কি-না বলেন?
হুঁ।
সার্কাস আমি এইখানে করতে দিব না। আশেপাশের মাদ্রাসার তালেবুল এলেমদের নিয়ে আসব। দেখেন কী করি। সার্কাসের ম্যানেজার ইয়াকুর আমাকে পাশার চাল দিয়েছে। আমার চাল দেখে নাই।
মোফাজ্জল করিম বললেন, পরে এই নিয়ে কথা হবে। এখন যাই। বিশেষ জরুরি একটা কাজে যাচ্ছি।
শরিয়তুল্লাহ বললেন, বিশেষ জরুরি কাজটা কী?
মওলানা সাহেবের কাছ থেকে দুই খিলি পান আনব।
বলেই মোফাজ্জল করিম আর দাঁড়ালেন না। শরিয়তুল্লাহ নখসবন্দি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। মানুষটার আচার-আচরণ তাঁর কাছে রহস্যময় মনে হচ্ছে।
.
মওলানা অবাক হয়ে বললেন, আপনি পান নিতে এসেছেন?
মোফাজ্জল করিম বললেন, হুঁ।
তিনি মওলানার চোখের দিকে তাকাচ্ছেন না। তিনি চাচ্ছেন না দু’জনের চোখাচুখি হয়। তাঁর দৃষ্টি মাটির দিকে। মওলানা বললেন, পানের জন্য এতদূর আসছেন
হুঁ।
আপনিতো পান খান না।
আজ খাব। আজ কেমন যেন বমি বমি লাগছে। পান খেলে আরাম হবে।
মিথ্যা কথা বলতে গিয়ে মোফাজ্জল করিম মরমে মরে গেলেন। একবার মনে হল সত্যটা বলে ফেলবেন। মাওলানা তাঁর অতি ঘনিষ্ঠজন। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে কিছু গোপন করতে নেই।
মওলানা বললেন, স্যার আপনার ঘটনাটা বলেনতো।
ঘটনা কিছু নাই। আপনি পান দিন। নিয়ে চলে যাব। জর্দা দেয়া পান।
আপনি বসুন। পান আনছি।
মোফাজ্জল করিম জবুথবু হয়ে বসে আছেন। বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে কোথাও ডিপ্রেসন হয়েছে। ডিপ্রেসনের ঝড় বৃষ্টি তিন চার দিন থাকবে। এখন যথেষ্ট শীত। এই শীত আরো বাড়বে। মোফাজ্জল করিম বিড়বিড় করে বললেন, ‘winter of discontent’ কথাটা তিনি কেন বললেন নিজেও জানেন না।
মাওলানা পান নিয়ে এসেছেন। পানের সঙ্গে কাপ ভর্তি চা এনেছেন। মোফাজ্জল করিম চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। চাপা গলায় বললেন, পান আমি এখন খাব না। সঙ্গে করে নিয়ে যাব। ভাত খাওয়ার পরে খাব।
মওলানা বললেন, ভাত আপনি আমার সঙ্গে খাবেন। আমি বেগমকে রাখতে বলেছি খিচুড়ি করতে বলেছি।
মোফাজ্জল করিম বললেন, আমার শরীর ভালো। জ্বর।
আবারো মিথ্যা কথা বলতে হল। মোফাজ্জল করিমের মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
বজলু কি ফিরেছে?
মোফাজ্জল করিম বললেন, ফিরে নাই। বলেই মনে হল বজলু নাই শোনার পর মওলানা তাঁকে এ বাড়িতে থাকার জন্যই চাপাচাপি করবে। তিনি আরেকটা মিথ্যা বললেন, বজলু ফিরেছে। আমি ভুলে গিয়েছিলাম। সে এখন ঘরেই আছে।
বজলুকে বিদায় করে দেন। অন্য কাউকে নেন। বজলু বিরাট ফাঁকিবাজ।
তাই করব। আজই বিদায় করব।
মোফাজ্জল করিম উঠে দাড়ালেন। মাওলানা হাত ধরে তাঁকে জোর করে বসিয়ে দিলেন।
কুহুরানী মেয়েটাকে নিয়ে কী ক্যাচাল যে লেগেছে শুনেছেন?
আবার কী ক্যাচাল?
খোন্দকার আর হাজি মফিজের মধ্যে লেগে গেছে। খবর পেয়েছি হাজি মফিজ আজ সন্ধ্যার ট্রেনে ঢাকা চলে গেছে। একা যায় নাই পরিবার নিয়ে গেছে।
ও আচ্ছা।
তিন বছর আগে হাজি মফিজ টাকা খন্দকারের বাংলাঘর জ্বালায়ে দিয়েছিল, এইবার টাকা খন্দকার শোধ নিবে। সে এখন সরকার পার্টির লোক। তার জোর বেশি।
হুঁ।
সামান্য সার্কাস পার্টির এক মেয়ে নিয়ে কী ধুন্দুমার লেগে গেল দেখেন। খুনাখুনি না হয়ে যায়।
খুনাখুনি হবে না-কি?
হতে পারে ট্রয় নগরী সামান্য একটা মেয়ের জন্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল না?
মোফাজ্জল করিম বললেন, সেই মেয়ে সামান্য ছিল না। বিশ্বের সেরা রূপবতীদের একজন-হেলেন।
রূপ দিয়ে কী হয় বলেন।
কিছু হয় না। কিছুই হয় না। উঠি।
আরে না উঠবেন কী? হাঁস জবেহ হচ্ছে। খিচুড়ি হচ্ছে। খানা খেয়ে তারপর যাবেন।
আপনাকে তো বলেছি আমার শরীর ভালো না।
না খেলে টিফিন কেরিয়ারে খানা দিয়ে দেব। শরীর ভালো হলে খানা খাবেন।
মাওলানা আমার একটা কথা শুনেন-
আমি কোনো কথা শুনাশুনির মধ্যে নাই। আমি আপনাকে যেতে দিব না।
.
উঠানে কার যেন পায়ের শব্দ। কুহুরানী যেখানে বসে আছে সেখান থেকে উঠান দেখা যায়। কিন্তু হারিকেনের আলো এতদূর পৌঁছায় না বলে সব অস্পষ্ট। কে যেন উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। কুহু বলল, পান এনেছেন?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর এল না। উঠানে দাঁড়ানো মানুষটা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। কুহু হারিকেন হাতে হবে বের হয়ে গেল। উঠানে দাঁড়ানো মানুষটা বলল, আপনি কুহুরানী?
কুহু বলল, আপনি কে?
আমার নাম হাসান আলি। আমি খায়রুনন্নেসা আদর্শ হাইস্কুলের একজন শিক্ষক।
চান কী?
হেডমাস্টার সাহেবের খুঁজে এসেছি। স্যার কোথায়?
আপনার স্যার আমার জন্য পান আনতে গিয়েছেন। আজ তাঁর সঙ্গে দেখা হবে না। অন্য একদিন আসেন।
আমি আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলব।
আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা নাই।
আপনার কথা না থাকতে পারে কিন্তু আমার আছে।
কুহু বলল, ভিতরে আসেন।
হাসান আলি ঘরে ঢুকল। চেয়ারে বসল। তার হতভম্ব ভাব এখনো কাটে নি। একটা সার্কাসের মেয়ে কী সুন্দর সেজে বসে আছে। নতুন শাড়ি, গলায় হার। চোখে কাজল।
হাসান আলি বলল, আপনি এইখানে কেন?
কুহু বলল, কোনো একটা জায়গায় ডো আমাকে থাকতে হবে। হবে না?
এইটাই সেই জায়গা?
হুঁ।
রাতে কি এই বাড়িতেই থাকবেন?
অবশ্যই। আমি যাব কোথায়? আপনার কথা শেষ হয়েছে, এখন চলে যান।
হাসান আলি বলল, হেড স্যার এই অঞ্চলের অতি সম্মানিত একজন মানুষ। একজন সম্মানিত মানুষের সম্মান রক্ষা করতে হয়।
কুচু বলল, আপনারা দশজন আছেন, আপনারা সম্মান রক্ষা করেন।
হাসান আলি বলল, আপনি কি পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন?
কুহু বলল, আমার বুঝার প্রয়োজন নাই। আপনারা বুঝতে পারলেই হল। আমি সার্কাস থেকে পালায়ে এসেছি। আমার কোনখানে যাবার জায়গা নাই। এইখানে এসে উঠেছি। এতে যদি আপনাদের হেড স্যারের সম্মানের কোনো হানি হয়, তাহলে একটা কাজ করেন মওলানা ডাকেন। আমাদের বিয়ে পড়ায়ে দেন। আপনাদের হেড স্যারকে জিজ্ঞাস করেন। উনি রাজি আছেন।
উনি রাজি আছেন?
অবশ্যই। উনি রাজি আমি রাজি। মিয়া বিবি দুইজনেই রাজি। আমার কথা শেষ। আমি আপনার সঙ্গে আর কথা বলব না।
হাসান আলি বলল, আপনি সার্কাস থেকে পালিয়ে এসেছেন এইটা আমরা জানি। আপনি যেখানে যেতে চান আমি আপনাকে নিয়ে যাব। কেউ বুঝতে পারবে না। বোরকা পরায়ে নিয়ে যাব। আমি আপনাকে কথা দিলাম।
আপনার এত ঠেকা কেন?
স্যারের জন্য। অতি সম্মানিত একজন মানুষ। তাঁর সম্মান রক্ষা করতে হবে।
বোরকা কি সাথে আছে?
সাথে নাই। জোগাড় করব।
বোরকা জোগাড় করেন। আমিও চিন্তা ভাবনা করি। আপনার সাথে সিগারেট আছে না?
আছে।
কুহু হাসতে হাসতে বলল, ঘরে যখন ঢুকেছেন তখন সিগারেটের গন্ধ পাইছি। আমাকে একটা সিগারেট দেন সিগারেট খাব।
আপনি সিগারেট খান?
আমি সার্কাসের মন্দ মেয়ে, আমি সিগারেট খাব না? আপনি সিগারেট খান আপনিও মন্দ। দুই মন্দে ভালো মিল হইছে ঠিক না?
হাসান আলি সিগারেট দিল। কুহু পায়ের উপর পা তুলে সহজভাবেই সিগারেট টানছে। হাসান আলি বলল, আপনি কি যাবেন আমার সঙ্গে?
কুহু ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, আগে বোরকা জোগার করেন। তারপরে বিবেচনা।
হাসান আলি বলল, আমি বোরকা জোগাড় করে জুম্মা ঘরের পাশে অপেক্ষা করব। শেষ রাতে একটা ট্রেন আছে এগারো সিন্দূর এক্সপ্রেস।
স্টেশন পর্যন্ত যাব কীভাবে? হাঁটতে পারব না। আমার শরীর ভালো না।
আমি গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করব।
গরুর গাড়ি খারাপ কি? আপনেতো আবার ম্যাজিক জানেন। আপনার স্যার বলেছেন। মাঝে মধ্যে ম্যাজিক দেখাবেন। ম্যাজিক আমিও জানি। দড়ি কাটার ম্যাজিক। প্রফেসর বাবুলের কাছ থেকে শিখেছি। আপনারে শিখায়ে দিব। আপনি আমাকে আরেকটা সিগারেট দেন।
হাসান আলি সিগারেটের পুরো প্যাকেট রেখে উঠে দাঁড়াল।
.
বৃষ্টি বেশ ভালোই শুরু হয়েছে। মোফাজ্জল করিম বাড়ির পথ ধরেছেন। তাঁর এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ারে হাঁসের মাংস এবং খিঁচুড়ি। অন্য হাতে ছাতি এবং টর্চ লাইট। ছাতি এবং টর্চ লাইট তিনি এক সঙ্গে কায়দা করতে পারছেন না। রাস্তাও পিছল। তাঁর ভয় হচ্ছে, যে-কোনো সময় তিনি পা পিছলে পড়ে যাবেন। এই বয়সে বেকায়দায় পড়ার ফল খারাপ হবে। জুম্মা ঘরের কাছে এসে তিনি লক্ষ করলেন, কেউ একজন ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। মোফাজ্জল করিম বললেন, কে?
স্যার আমি হাসান।
এখানে কী কর?
আপনার সঙ্গে কথা ছিল স্যার।
এত রাতে আমার সঙ্গে কী কথা? যাও বাড়িতে যাও বাড়িতে গিয়ে ঘুমাও।
আপনার সঙ্গে যাই স্যার? আপনার সঙ্গে কিছু অতি জরুরি কথা ছিল।
অন্যদিন কথা বলবে। Some other time.
মোফাজ্জল করিম অতি দ্রুত বাঁশবনের ভেতর ঢুকে গেলেন। এটা শর্টকাট। বৃষ্টির মধ্যে বাঁশবানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে ভালো লাগছে। জঙ্গলের ভেতর ছোট্ট খালের মতো আছে। শীতকালে খালে পানি থাকে না। বৃষ্টিতে পানি হয়েছে ঝিরঝির শব্দ হচ্ছে। তিনি একবার পেছনে তাকালেন। হাসান আলি এখনো আগের জায়গায় দাড়িয়ে আছে। তিনি বুঝতেই পারছেন না হাসান আলির এমন কী জরুরি কথা যে এক্ষুণি বলতে হবে।
বাড়ির পাশের কাঁঠাল গাছের কাছে এসে মোফাজ্জল করিম থমকে দাঁড়ালেন। উঠানে কুহু বসে আছে। নামাজের জলচৌকির এক কোনায় ঘোমটা দিয়ে বসে সে বৃষ্টি দেখছে। উঠানে আলো নেই। ঘরের ভেতর থেকে হারিকেনের আলো এসে উঠানে পড়েছে।
মোফাজ্জল করিমের মনে হল এই দৃশ্য তিনি আজ প্রথম দেখছেন না, এর আগেও অনেকবার দেখেছেন। ইংরেজিতে এর একটা নামও আছে-deja vau. মোফাজ্জল করিম ভুরু কুঁচকালেন। শব্দটা ইংরেজি না ফরাসি? আজকাল সব গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। কোনো একটা ইংরেজি কবিতা তাঁর নাম মনে নেই। অথচ বিয়ের পর পর জোছনাকে কত আগ্রহ করেই না কবিতা শোনাতেন। প্রথমে ইংরেজিতে তারপর সেটার বাংলা অনুবাদ। রান্নাঘরের একটা কবিতা জোছনার বড়ই প্রিয় ছিল। কী যেন কবিতাটা? কী যেন?
I let myself in at the kitchen door.
‘It’s you,” she said. ‘I can’t get up. Forgive me
Not answering your knock.”
আমি রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লাম। মেয়েটা বলল, ও আচ্ছা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। তুমি দরজা ধাক্কা দিলে শুনেও আমি জবাব দেইনি….
এই পর্যন্ত শুনেই জোছনা বলেছিল- কী আশ্চর্য মেয়েটা জবাব দেয় নি কেন? কেমন মেয়ে সে? আদব কায়দা ভদ্রতা কিছুই শিখে নি?
মোফাজ্জল করিম জোছনার কথাবার্তায় বড়ই বিরক্ত হয়েছিলেন। আচ্ছা আজ যদি তিনি কুহু মেয়েটাকে এই কবিতাটি পড়ে শোনান সেও কি জোয়ানার মতো বলবে- “কী আশ্চর্য মেয়েটা জবাব দেয়নি কেন?” যদি এই ধরনের কিছু বলে তাহলে তা হবে Deja vau.
.
মোহাম্মদ ইয়াকুব গ্লাস ভর্তি জিন নিয়ে বসেছেন। জিনের গ্লাসে প্রচুর পরিমাণে লেবু দেয়া। গ্লাস থেকে লেবুর গন্ধ আসছে। ইয়াকুবের সামনে থানার ওসি সাহেব এবং সেকেন্ড অফিসার বসে আছেন। ওসি সাহেবকে বড়ই চিন্তিত মনে হচ্ছে।
ইয়াকুব বলল, স্যার একটু লেবুর শরবত খাবেন? দুঃশ্চিন্তায় শরীর কষা হয়ে গেছে। লেবুর শরবত খেয়ে কষা ভাবটা দূর করছি।
ওসি সাহের বললেন, লেবুর শরবত খাব না। আমার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিলেন?
আপনার কোন বিষয়ে?
ওসি সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, এতক্ষণ আপনাকে আমি কী বললাম।
কী বললেন মন দিয়ে শুনি নাই। আজকের শো হয় নাই। মিজাজ অত্যধিক খারাপ। আগামীকাল শো হয় কি-না তার নাই ঠিক।
সেকেন্ড অফিসার বললেন, আপনাদের বড় হাতিটা আমাদের একটু দরকার।
ইয়াকুব জিনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, এখন মনে পড়েছে বরকত সাহেবকে হাতির পিঠে চড়িয়ে ফেরত দিতে হবে। হাতি কখন দরকার?
এখনই দরকার।
রাত দুপুরে হাতি নিয়ে কী করবেন? সকালে নিয়ে যান। অঞ্চলের সবাই দেখল আসামি হাতির পিঠে চড়ে ফিরছে।
ওসি সাহেব বললেন, আমি হাতি রাতেই নিয়ে যাব। ঝামেলা শেষ করে হাতি ফেরত দিয়ে যাব।
ইয়াকুব বলল, হাতির শরীর ভালো না। তারপরেও আপনারা থানাওয়ালা আপনাদের কথা আলাদা। বিশ হাজার টাকা খরচ লাগবে। বিশ হাজার টাকা দিয়ে হাতি নিয়ে যান।
কী বললেন?
বললাম বিশ হাজার টাকা দিয়ে হাড়ি নিয়ে যান।
ফাজলামি করছেন?
ফাজলামি তো ওসি সাহেব আপনি করছেন। অ্যারেস্ট করে আসামি ধরে নিয়ে যাচ্ছেন আবার হাতির পিঠে করে ফেরত পাঠাচ্ছেন।
ওসি সাহেব চোখ মুখ লাল করে বললেন, আমার সঙ্গে বদমায়েশি করছ? আমি তোমার স্ক্রু টাইট দিয়ে দেব।
ইয়াকুব খুবই স্বাভাবিকভাবে জিনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, ওসি সাহেব আমরা সবাই জন্মের সময় একটা করে স্ক্রু ড্রাইভার হাতে নিয়ে জন্মাই। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কারো স্ক্রু ড্রাইভার বড় হয় কারো ছোট হয়। বুঝতে পারছি আপনার ক্রু ড্রাইভারটা বড়। আমারটা যে ছোট এ রকম মনে করবেন না।
এই পর্যন্ত বলেই ইয়াকুব শুদ্ধ ইংরেজিতে এবং শুদ্ধ উচ্চারণে বলল, Dear Sir don’t underestimate me. Don’t make this mistake.
ওসি সাহেব হকচকিয়ে গেলেন। ইয়াকুব হালকা গলায় গল্প বলার ভঙ্গিতে বললেন, একবার কমলাকান্দায় শো করতে গেলাম। কমলাকান্দা থানার ওসি সাহেব আপনার মতোই আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করলেন। উনাকে কানে ধরে উঠবোস করায়েছিলাম। ছবি তুলে রেখেছিলাম। ছবি দেখবেন?
কেউ কোনো জবাব দিল না।
ইয়াকুব বললেন, ছবি আছে বললে দেখাতে পারি। ঘটনাটা পরে জানাজানি হয়ে যায়। পত্রিকায়ও উঠেছিল। উনার বিরুদ্ধে পরে ডিপার্টমেন্টাল একশান নেয়।
হয়।
সেকেন্ড অফিসার ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, স্যার চলেন উঠি।
ইয়াকুর বললেন, আরে উঠবেন কী? বসুন। আপনারা বন্ধুভাবে একটা হাতি চাইলেন আর আমি হাতি দিব না তাতো হয় না। চাইতে হবে বন্ধু ভাবে। চোখ গরম করে না।
সেকেন্ড অফিসার উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন এই কথায় আবার বসলেন। ইয়াকুব বললেন, লেবুর শরবত দেই? সামান্য ‘জিন’ মিশানো আছে। জিন এন্ড টনিকের মতো জিন এন্ড লাইমও ভালো।
সেকেন্ড অফিসার বললেন, স্যারের এইসব বদঅভ্যাস নাই। আমি সামান্য খেতে পারি।
ইয়াকুব দরাজ গলায় ডাকলেন, মনজু মনজু।
মনজু ছুটে এল।
ইয়াকুব বললেন, আরো দু’টা গ্লাস দাও।
ওসি সাহেব বললেন, আমি খাব না। এই সব হাবিজাবি আমি খাই না।
ইয়াকুর বললেন, খাওয়ার লোক আসতেছেন। উনার জন্য এডভান্স আনায়ে রাখলাম।
কে?
খন্দকার সাহেব। টাকা খন্দকার।
ওসি সাহেব বললেন, উনি আসতেছেন না-কি?
ইয়াকুব বললেন, আপনার কি কোনো অসুবিধা আছে? উনি আসলেই তো ভালো। সমস্যা মিলমিশ করে নিবেন। উনি গান বাজনার মানুষ। বৃষ্টি বাদলার দিনে গান বাজনা ভালো জমে।
এইখানে গান বাজনা হবে?
আপনার অসুবিধা আছে? অসুবিধা থাকলে চলে যান।
ওসি সাহেব অস্বস্তি নিয়ে তাকাচ্ছেন। তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না। এখানে থাকা ঠিক হবে কি হবে না।
গ্লাস চলে এসেছে। জিনের বোতল চলে এসেছে। তেল পিয়াজ দিয়ে মাথা চিনাবাদাম এসেছে।
ইয়াকুব বললেন, ওসি সাহেব, রাতে আমার সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করবেন। গরুর মাংস ভুনা, প্লেইন পোলাও। আপনি গরুর মাংস খানতো?
ওসি সাহেব প্রশ্নের জবাব দিলেন না।
.
বজলুর জীবন আজ প্রায় ধন্য। মীনাকুমারী সাজগোজ করছে। সে তার পাশেই আছে। পায়ে ঘুঙুর সে বেঁধে দিয়েছে। প্রথমবারে বাঁধন কষা হয়েছিল দ্বিতীয়বারে ঠিক হল।
মীনাকুমারী বলল, বদবু তুই লোকটা কাজের। দেখি চেষ্টা করে তোকে দলে নেয়া যায় কি-না।
বজলু বিনয়ে গলে গিয়ে বলল, হইলে খুবই ভালো হয়। প্রফেসর বাবুল সাবও বলেছেন চেষ্টা নিবেন।
তাহলেতো আর সমস্যাই নাই।
বজলু বলল, উনি বলেছেন দড়ির খেলাও শিখাবেন।
আরো ভালো। তুই হবি প্রফেসর বদবু।
বজলু বলল, আমার কাছে একটা বড় খবর আছে। কুহুরানী কোন বাড়িতে পালায়া আছে আমি জানি। খবরটা আপনেরে প্রথম বললাম।
বজলু ভেবেছিল খবর শুনে মীনাকুমারী চমকে উঠবে সে মোটেই চমকাল না। বজলুর দিকে একবার ফিরেও তাকাল না। সে ঠোঁটে যে ভাবে লিপস্টিক দিচ্ছিল সেই ভাবেই দিতে থাকল। বজলু তার সামনে হাত আয়না ধরে আছে। তাকে স্থির হয়ে থাকতে হচ্ছে। নড়লে আয়না নড়ে যাবে।
বজলু বলল, উনি আছেন আমরার হেডমাস্টার সাহেবের বাড়িতে। হেডমাস্টার সাব লোক অবশ্যি খুবই ভালো। ফেরেশতা আদমি।
তোর সঙ্গে বছর কথা হয়েছে।
কথা হয় নাই, উনি আমারে দেখেন নাই।
মীনাকুমারীর ঠোঁটে লিপিস্টিক দেয়া শেষ হয়েছে। সে বজলুর হাত থেকে আয়না নিতে নিতে বলল, কুহু কই আছে কার বাড়িতে আছে এইসব কাউরে বলার কিছু নাই। সে যদি পালায়া যাইতে পারে আমি খুশি। বুঝেছিস?
জি বুঝেছি।
তুই কিছুই বুঝস নাই। তোর বুঝার প্রয়োজনও নাই। তুই কি আমারে ভাল পাস?
অবশ্যই।
আমারে কি বিবাহ করতে মনে চায়?
বজলু মাথা নিচু করে ফেলল। সে কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়া কি ঠিক হবে? না-কি সে যে ভাবে আছে সেইভাবে বসে থাকবে?
বদ শোন। কুহু রাণী বিষয়ে কাউরে কিছু বলবি না।
জি আইচ্ছা। কাউরে কিছু যদি বলি তাইলে আমি গু খাই। আর আমি বাপের ব্যাটাও না। আমি বেজন্মা।
এইত ঠিক আছে। এখন বল আমারে কেমন দেখায়? লজ্জা পাওয়ার কিছু নাই। ভালো মতো দেখ।
পরীর মতো লাগতেছে।
পরী কখনো দেখেছিস?
ছোটবেলায় দেখছিলাম। বাঁশ বনে। জোছনা রাইত ছিল। আমি গোল্লাছুট খেইল্যা ফিরতেছি হঠাৎ দেখি…
বজলু মহানন্দে গল্প করে যাচ্ছে। মীনাকুমারী ডাকের অপেক্ষা করছে। কমলারাণী গান করবে। সে নাচবে। বাজনা বাজাবে সার্কাসের ব্যান্ড। এই ধরনের গান বাজনার আয়োজন সার্কাসের ভেতরে কখনো হয় না। বাইরে হয়। কারোর বাগান বাড়িতে, কারোর বাংলা ঘরে। আজ সার্কাসের ভিতরেই আসর বসেছে। ম্যানেজার ইয়াকুব ব্যবস্থা করেছেন। প্রয়োজন আছে বলেই করেছেন। মোহম্মদ ইয়াকুব বিনা প্রয়োজনে কিছু করেন না।
.
টাকা খন্দকার চলে এসেছেন। তিনি আনন্দে আছেন। একটু আগে ঘোষণা দিয়েছেন, কুহুরানীকে যেদিন পাওয়া যাবে সেদিনই তিনি পাঁচ হাজার টাকা দেবেন সার্কাসের লোকদের মিষ্টি খাওয়ার জন্য।
ইয়াকুব বললেন মাত্র পাঁচ? আপনার মতো বিশিষ্ট লোক দিবে পাঁচ?
টাকা খন্দকার সঙ্গে সঙ্গে বললেন। আচ্ছা যাও দশ।
ইয়াকুবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে। ওসি সাহেবের সঙ্গেও সম্পর্ক ঠিক হয়ে গেছে। তিনি ওসি সাহেবের হাতি সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। বরকত যেন পায়ে হেঁটে চলে আসে তার জন্যে চিঠি দিয়ে থানায় লোক পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ওসি সাহেব খন্দকারের হাত ধরে বললেন, আপনি যে এমন মহানুভব মানুষ সেটা আগে বুঝতে পারি নাই। আপনার সঙ্গে আমার অর কোনো সমস্যা হবে না।
খন্দকার মাথা দুলাতে দুলাতে বলেছেন, সমস্যা হবে আবার সমাধান হবে। জগতের এই নিয়ম। তবে আমি সমস্যা দেখে পালায়া যাই না। হাজী সাহেব পালায়া গেছেন। খালি বাড়ি। আগুন লাগে কি-না কে জানে!
সেকেন্ড অফিসার চিন্তিত গলায় বললেন, আগুন লাগবে না-কি?
খন্দকার উদাস গলায় বললেন, লাগতেও পারে। আমার বাড়িতে একবার লেগেছিল তারটায় কেন লাগবে না? তবে আগুন লাগলে আমাকে কেউ দোষতে পারবে না। আমি তখন কোথায় ছিলাম? থানাওয়ালাদের সাথে মদ খাইতেছিলাম ঠিক না ওসি সাহেব? খন্দকারের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র ঠিক বলেছি কি-না বলেন?
সবাই মজা পাচ্ছে। ইয়াকুব গলা নিচু করে খন্দকারের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল শরিয়তুল্লাহ সাহেব বড় ঝামেলা করছেন। একটু কি দেখবেন?
খন্দকার আনন্দিত মুখে বললেন, ঝামেলার কথা শুনতে ভালো লাগে। ঝামেলা হবে, ঝামেলা মিটবে। মজাতো এই খানেই। শরিয়তুল্লাহকে নিয়ে চিন্তা নাই। আমার নিজের লোক। প্রয়োজনে তাকে কাজে লাগাই।
.
কুহুরানী খাটে পা উঠিয়ে বসে আছে। তার হাতে লম্বা একটা দড়ি। মোফাজ্জল করিম কাচি হাতে কুহুর সামনে চেয়ারে বসে আছেন।
কুহু বলল, দড়িটার যেখানে আপনার কাটতে ইচ্ছা করে কাটেন।
মোফাজ্জল করিম দড়ি কাটলেন। কুহু কাটা দড়ির দুই খণ্ড হাতের মুঠোয় নিয়ে ফুঁ দিল। কাটা দড়ি জোড়া লেগে গেল। মোফাজ্জল করিম বিড়বিড় করে বললেন, কী আশ্চর্য!
কুহুরানী বলল, ম্যাজিশিয়ান প্রফেসর বাবুলের কাছে শিখেছি। আপনার সঙ্গে কোনো একদিন আমার দেখা হবে, আপনি ম্যাজিক দেখে এত খুশি হবেন জানলে আরো ম্যাজিক শিখতাম। আমি এই একটাই ম্যাজিক জানি। কৌশলটা শিখায়ে দিব?
দাও।
কুহু হাই তুলতে তুলতে বলল, না থাক। সব কৌশল জানা ঠিক না।
মোফাজ্জল করিম বললেন, তোমার মনে হয় জ্বর আবার আসছে। চোখ মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। শুয়ে পড়।
আপনি কী করবেন?
কিছুক্ষণ লেখাপড়া করব। প্রতি রাতে তিনটা করে ইংরেজি শব্দ শিখি। দুই রাত বাদ পড়েছে।
কুহুরানী বিছানায় শুয়ে পড়তে পড়তে বলল, আপনি ঠিক করে বলুনতো, আপনি কি সত্যই আমাকে বিবাহ করবেন?
মোফাজ্জল করিম বেশ কিছু সময় চুপচাপ থেকে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন।
কুহু বলল, কেন করবেন?
মোফাজ্জল করিম বিড়বিড় করে বললেন, তোমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। বিয়ে না করলে তুমি যাবে কোথায়?
কুহু বলল, আপনার সম্মান আপনি বুঝবেন। আমার কী? আমার কিছু না। মধুবাবু একটা ছোট্ট কাজ করবেন?
অবশ্যই করব। বল কী কাজ?
আপনাদের স্কুলের শিক্ষক হাসান আলি নাম। জুম্মাঘরের পাশে অপেক্ষা করছে। তাকে বলে আসবেন যে আমি তার সঙ্গে যাব না। আমি এইখানেই থাকব।
মোফাজ্জল করিম বিস্মিত হয়ে বললেন, হাসান!
জি হাসান। উনি এসেছিলেন। উনি আমাকে এই অঞ্চলের বাইরে পার করে দেবার ব্যবস্থা করেছেন।
ও আচ্ছা।
কুহু বলল, এখান থেকে বের হয়ে যাবই বা কোথায়? আমার কেউ নাই।
কুহু চোখ মুছছে। তার চোখের কাজল লেপ্টে যাচ্ছে। চোখে কাজল মেখে কাঁদলে জোছনাকে যে রকম দেখাতো তাকে অবিকল সে রকম দেখাচ্ছে।
.
মোফাচ্ছেল করিম জুম্মাঘর থেকে ফিরে এসে দেখলেন কুহু ঘরে নেই। জোছনার শাড়ি সুন্দর ভাঁজ করে খাটের উপর রাখা। শাড়ির উপর চন্দ্রহার। সে যে কাপড়ে এই বাড়িতে ঢুকেছিল সেই কাপড়েই চলে গেছে।
.
সার্কাস পার্টির জলসা খুব জমেছে। কিছুক্ষণ আগে ছন্দা এবং কমলারাণীর গান শেষ হয়েছে। গানের সঙ্গে মীনাকুমারীর নাচ। খন্দকার সাহেবের নাচ খুবই পছন্দ হয়েছে। তিনি পাঁচশ’ টাকা বখশিস দিয়েছেন। তাঁর আগ্রহে একই নাচ আবারো হচ্ছে।
এর মধ্যেই মনজু ঢুকে ইয়াকুবের কানে কানে বলেছে, কুহুরানী ফিরে এসেছে।
ইয়াকুব প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বললেন, সে কোথায় ছিল, কী সমাচার কোনো কিছুই জিজ্ঞেস করবে না।
জি আচ্ছা।
সবাইকে বলে দাও কাল থেকে শো হবে।
টাকা খন্দকার বিরক্ত মুখে বললেন, ইয়াকুব তুমি কানাকানিটা বন্ধ কর। তুমি বড় ডিসটার্ব কর।
